শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

মো ইয়ানের গল্প : ষাঁড়

অনুবাদ :রাফিক হারিরি

লাও লিনই সর্বপ্রথম জবেহ করা প্রাণির কণ্ঠনালি দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করানোর একটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার করে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশাল আকারের কলসের পানি খুব সহজেই মৃত গরুর ভুঁড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। যেটা আগে সম্ভব ছিল না। ফলে মাংস ফুলে যাওয়ার কারণে শহরের বেশি চালাক মানুষগুলো অতিরিক্ত পানিটাকেই গরুর মাংস মনে করে যে টাকা দিয়ে সেগুলো কিনে নিয়ে যেত, সেটার পরিমাণ ছিল অনেক।


লাও লিনের বেশ শক্ত-সামর্থ একটা ভুঁড়ি ছিল, গর্দানটাও ছিল মজবুত। এককথায় সে ধনী হওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিল। গ্রামের মাথা হয়ে যাওয়ার পর সে তার অনুসারিদেরও গরুর মাংসের ভেতর পানি প্রবেশ করানোর পদ্ধতিটা শিখিয়ে দিল। আর নিজেরাই একচেটিয়া ব্যবসা করতে থাকল। গ্রামের কেউ কেউ অবশ্য তার ওপর খুব ক্ষেপে গেল। তাকে জোতদার ব্যবসায়ীর সাথে তুলনা করল। সে উত্তরে শুধু বলল, ড্রাগনই কেবল ড্রাগন জন্ম দেয়, ফিনিক্স পাখি জন্ম দেয় ফিনিক্স শাবক, আর ইঁদুর কেবল জন্ম নেয় মাটিতে গর্ত খোঁড়ার জন্য। কিছুদিন পর আমরা বুুঝতে পারলাম, লাও লিন হলো কুং ফু মাস্টারের মতো, যে তার শিষ্যদের অনেক কিছু শিক্ষা দিলেও সবকিছু দেয় না। কিছু গোপন শিক্ষা নিজের কাছে রেখে দেয়। যেন বিপদের সময় রক্ষা পেতে পারে।

আমরা দেখলাম, লাও লিনের গরুর মাংসে পানির ইনজেকশন দেওয়ার পরও সেটা বেশ ভালো দেখাত, আর তাজা গন্ধ বের হতো মাংস থেকে। যেটা অন্যদের মাংসে ছিল না। তুমি ইচ্ছে করলে মাংসগুলোকে রোদের আলোতে দুদিন ধরে রেখে দাও। দেখবে সেটা কিছুতেই নষ্ট হচ্ছে না বা গন্ধ ছড়াচ্ছে না। অথচ অন্যদের মাংসগুলো প্রথম দিনেই বিক্রি করতে না পারলে গন্ধ হয়ে যেত। ফলে লাও লিনের গরুর মাংস যদি প্রথম দিন বিক্রি না-ও হতো তবুও সে মাংসের দাম কমাত না। কারণ তার মাংস দ্বিতীয় দিনও তাজা থাকত।

আমার বাবা লাও টোং অবশ্য লাও লিনের চেয়েও অনেক বেশি চালাক ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন লাও লিন পানির সাথে ফরমালিন মিশিয়ে গরুর মাংসের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। আমার বাবা কখনো পদার্থবিজ্ঞান পড়েননি, কিন্তু তিনি বিদ্যুতের পজেটিভ-নেগেটিভের বিষয়ে ভালো জানতেন, আমার বাবা জীববিজ্ঞানও পড়েননি, তারপরেও তিনি মুরগির ডিমের শুক্রাণু ভ্রুণ—এসব বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন। রসায়ন পড়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না, তবুও তিনি বুুঝতে পারতেন ফরমালিন কীভাবে জীবাণুকে ধ্বংস করে গরুর মাংসকে তাজা রাখে। আমার বাবা যদি ধনী হতে চাইতেন, তাহলে তাঁকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। আমি নিশ্চিত। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন মানুষের মাঝে ড্রাগন। ড্রাগনরা কখনো সম্পদ তৈরির লোভ করে না। তোমরা দেখবে ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়ে সেখানে খাবার জমা করে কিন্তু কোনো বাঘকে কখনো দেখেছ গর্ত খুঁড়ে খাবার জমা করতে। বাঘ অধিকাংশ সময় বিশ্রামে কাটায়। ক্ষুধা লাগলে সে শিকারে বের হয়। যতটুকু দরকার ততটুকুই শিকার করে। আমার বাবাও সে রকম ছিলেন। খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, বিশ্রাম করছেন, যখন ক্ষুধা লাগছে তখন কাজে নেমে পড়ছেন। লাও লিনের মতো অসুস্থ টাকা জমানোর ইচ্ছে তাঁর কখনোই ছিল না।

প্রাচীন কালে পাও ডিং নামে খুব বিখ্যাত একজন রাঁধুনি ছিল যে গরু দেখেই অনেক কিছু বলে দিতে পারত। তার চোখে একটা গরু মানে হলো হাড় আর মাংস ছাড়া আর কিছুই না। আমার বাবাও সে রকম একজন। তাঁর চোখ ছুরির চেয়েও ধারালো ছিল। তিনি একটা জীবিত গরু দেখেই বলে দিতে পারতেন, এটাতে কত কেজি মাংস হবে, কতটুকু হাড় থাকবে এর ওজন কতটুকু হবে। এটা যেন লন্ডনের কোনো আধুনিক কসাইখানার আধুনিক প্রযুক্তিগত স্কেলের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। লোকজন প্রথমে আমার বাবাকে ভুয়া মনে করত। কিন্তু বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা দেখল বা০বার হিসাব আসলেই নিখুঁত। ফলে গরুর মালিক আর কসাই দুজনের কাছেই বাবার অন্যরকম একটা দাম তৈরি হলো। কিন্তু বাবা সেগুলোকে পাত্তা দিতেন না। গরুর মালিক যখন তার গরুর ওজন বাড়ানোর বিষয়ে বাবার কাছে এক ভাড় মদ নিয়ে আসত, তখন বাবা সেই মদ বাড়ির সামনের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে বাগানের দেয়ালে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে গরুর মালিককে গালি দিত, আবার একইভাবে কসাই যখন শূকরের মাথা উপহার হিসেবে নিয়ে বাবার কাছে আসত বাবা তখনো তার সাথে একই রকম ব্যবহার করতেন। ফলে তারা দুজনেই বাবাকে বলত মাথামোটা গর্দভ। কিন্তু তারা জানত যে, বাবা গ্রামের সবচেয়ে সত্ মানুষ। লোকজন বাবাকে বিশ্বাস করত। যখন কোনো গরু বেচা-কেনার মামলা হতো তখনো উভয়পক্ষের লোক বাবার কাছে এসে বলত যে দেখি, লাও টোং কী বলে। বাবা গরুবিক্রেতা কিংবা ক্রেতা কারও চোখের দিকেই না তাকিয়ে কেবল গরুটার দিকে তাকিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলা শুরু করতেন গরুটাতে কত কেজি মাংস হবে, কতটুকু হাড্ডি হবে। সবকিছু বলার পর গরুর ক্রেতা আর বিক্রেতা দুজনই খুশি হয়ে বেচা-কেনা করে ফেলত আর বাবার এই পরিশ্রমটুকুর জন্য তাঁর হাতে দশ ইয়ানের একটা নোট ধরিয়ে দিত।

আবার বাবাকে ছাড়া যখন গরু নিলাম উঠত, তখন সেই পুরোনো পদ্ধতিতে নানা রকম ধান্দার মাধ্যমে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যে যেভাবে পারত একজন আরেকজনকে ঠকিয়ে গরু বেচা-কেনা করে ফেলত। আমার বাবার এই দক্ষতা গ্রামে একধরনের বিপ্লব এনে দিয়েছিল। তাঁর তীক্ষ চোখের পরিমাণ শুধু গরুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি শূকর, ভেড়া—এসব দেখেও সব কিছু বলে দিতে পারতেন। এটা যেন দক্ষ একজন কাঠমিস্ত্রির বিষয়, যে খুব ভালো টেবিল বানাতে পারে আবার একই সাথে ভালো চেয়ারও বানাতে পারে।

একদিন গ্রীষ্মের এক সকালে আমি বাবার কাঁধে চড়ে আমাদের ঘরে ঘুরছিলাম। দাদার কাছ থেকে আমার বাবা উত্তরাধিকার সূত্রে তিনটা ঘর পেয়েছে। আমাদের বাড়ির উঠোনের চারপাশ ঝোঁপ দিয়ে একটা পাঁচিলের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমার অলস বাবার কার্যক্রমের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। তিনি কোনো কিছুই করতেন না। যখন কোনো কাজ করতেন তখন আমাদের বাড়ির রান্নাঘরের পাতিল মাংসে পূর্ণ থাকত আর যখন কিছুই করতেন না তখন পাত্র শূন্য থাকত। বাবা যখন মায়ের গালি গালাজ আর অভিশাপের মুখোমুখি হতেন তখন বলত, 'শোনো, খুব শিগগিরই ভালো একটা দিন আসছে। তখন গরিব পিতার এই সন্তানের হাতে ধনী বাবার হিংসুক লোভী ছেলে লাও লিন শেষ হয়ে যাবে।'

বাবা তখন একটা কাল্পনিক বন্দুক মায়ের মাথার দিকে তাক করে গুলি করতেন। মুখে শব্দ করতেন—বুম।

মা ভয়ে চিত্কার করে উঠত।

কিন্তু সেই সুদিন আর আসত না। ফলে মা একইভাবে মানুষের ফেলে দেওয়া পচা আলুগুলো খুঁজে নিয়ে আসতেন আমাদের বাড়ির শূকরকে খাওয়ানোর জন্য। আমাদের বাড়ির ছোট দুটি শূকর কখনোই পেট পুরে খেতে পারত না। তারা সব সময় বিরক্তিকর শব্দ করত। এটা আমাদের জন্য কষ্টকর ছিল।

এক সকালে বাবা শূকর দুটোর ওপর খুব রেগে গেলেন। চিত্কার করে বললেন, 'এই শুয়োরের বাচ্চা, তোদের কী হইছে। যদি এই রকম শব্দ করতে থাকিস তাহলে তোদের দুটোকেই রাতের খাবারের জন্য চুলোয় চড়িয়ে দেব।'

মা তখন বাবার এই কথা শুনে তাঁর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'ভুলেও তুমি এমনটা বলবে না। ওরা আমার শূকর। আমিই ওদের পেলে-পুষে বড় করেছি। ফলে কেউ ওদের একটা লোমও ছিঁড়তে পারবে না।'

বাবা হাসতে হাসতে বললেন, 'শান্ত হও, আমি কোনো কারণেই ওদের হাড় আর লোম স্পর্শ করব না।'

আমি শূকরগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম, সেগুলো খুব মোটা-তাজা নয়। তবে শূকর দুটোর কানগুলো বেশ তাজা। আমার কাছে শূকরের মাথার অংশে কান দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কানের মাংসে কোনো চর্বি নেই, খুব কড়মড়ে হয়। খেতে বেশ ভালো।

আমি বললাম, 'আমরা শূকর দুটোর কানগুলো খেতে পারি।'

মা সাথে সাথেই আমার কান দুটো মোচড় দিয়ে বললেন, 'ছোট শুয়োর, তার আগে আমি তোমার কান কেটে ফেলব।'

মা এত জোরে আমার কান ধরল যে, আমার মনে হলো কান দুটো খুলেই আসছে। আমি চিত্কার করতে থাকলাম। বাবা তখন আমাকে মার হাত থেকে রক্ষা করলেন। মা চুলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আমি মায়ের নাম ধরে তাকে গালি দিলাম।

'ইয়াং ইউঝেন, তুমি একটা বুড়ো মহিলা। আমার জীবনটাকে দোজখ বানিয়ে দিয়েছ।'

মা আগুনচোখে আমার দিকে ফিরে তাকাল। যেন এখনই পুড়িয়ে দেবে।

বাবা সাথে সাথে আমাকে নিয়ে উঠোনে বের হয়ে আসলেন। তারপর নরম সুরে আমাকে বললেন, 'ব্যাটা, তুমি কীভাবে তোমার মায়ের নাম জানলে?'

বাবার দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, 'আমি আপনাকে মায়ের নাম ধরে ডাকতে শুনেছি।'

'তুমি কখন শুনলে, আমি তোমার মাকে ইয়াং ইউঝিন নামে ডেকেছি?'

'আপনি আন্টি উইল্ড মুলকে বলেছেন যে এই ইয়াং ইউঝিন বুড়ো মহিলা আমার জীবনটাকে দোজখ বানিয়ে দিয়েছে।'

বাবা সাথে সাথে আমার মুখ চাপা দিয়ে বললেন, 'এই গাধা, একদম চুপ। তুই তো আমার জীবনটাকে সত্যিই ধ্বংস করে দিবি।'

মা তখনই রান্না ঘর থেকে খুন্তি হাতে নিয়ে বাইরে বের হয়ে তার ছেলেদের ডাকতে থাকল। মা বলল, আজকে যদি কেউ তোরা আমার সাথে না থাকিস, তাহলে বলে দিচ্ছি আজকেই এই পরিবারের শেষ দিন।'

মায়ের চেহারা দেখে আমি বুঝতে পারলাম, মা ঠাট্টা করছে না। আমার বাবা খুব চালাক মানুষ। তিনি দ্রুত আমাকে তাঁর বগলের নিচে ধরে বাড়ির ঝোঁপের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে বের হয়ে এলেন। আমি পেছনের বিষয় নিয়ে একটু চিন্তা করে বুঝতে পারলাম, আমার মা আজকে এত কেন ক্ষেপেছে। আসলে আমি কিংবা বাবা কেউই মার শত্রু না। মার শত্রু হলো উইল্ড মুল খালা। সে গ্রামে একটা মদের দোকান দিয়েছে। মাকে কে বা কারা বুঝিয়েছে কিংবা সে নিজে নিজেই বুঝেছে যে উইল্ড খালা বাবাকে পথ ভুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি অবশ্য বিষয়টা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না যে কে কাকে ভোলাচ্ছে।

সাত থেকে আটজন পশুব্যবসায়ী মাড়াইখানার মেঝেতে নিজ নিজ পাছার ওপর বসে আছে। আমরা সেখানে ঢুকে দেখি, সকলেই সিগারেট খাচ্ছে। তারা কসাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। পাশেই পশুগুলো অন্যমনস্ক হয়ে নিজের মনে জাবর কাটছিল। পশুব্যবসায়ীরা পশ্চিমের কোনো গ্রাম থেকে এসেছে। খুবই হাস্যকর আঞ্চলিক ভাষায় তারা কথা বলছিল। তারা দশ দিন পর দুটা কি তিনটা পশু নিয়ে আসে। খুবই ধীরগতির ট্রেনে করে তারা পশুগুলো নিয়ে গ্রামের স্টেশনে সন্ধ্যার দিকে নামে। মধ্যরাতের আগে তারা আমাদের গ্রামে আসে না। সুযোগ থাকার পরও কেন তারা মধ্যরাতে গ্রামে আসে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে ছিল না। এটা ছিল তাদের গোপনীয়তা। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন বাবা-মাকে এই প্রশ্ন করেছিলাম। প্রশ্ন শুনে তারা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যে আমি কোনো অন্যায় করে ফেলেছি কিংবা এমন একটা প্রশ্ন বোকার মতো করেছি যার উত্তর সবাই জানে।

পশুব্যবসায়ীরা যখন পশুগুলোকে নিয়ে গ্রামের ভেতর মধ্যরাতে ঢোকে, তখনই গ্রামের কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। সেই শব্দে গ্রামের লোকজন জেগে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, পশুব্যবসায়ীরা চলে এসেছে। আমার স্মৃতিতে তারা খুবই রহস্যময় ছিল। সেটার কারণ একটাই তারা মধ্যরাতে গ্রামে প্রবেশ করত।

কোনো কোনো পূর্ণিমার রাতে যখন চাঁদের আলোতে চারপাশ থই থই করত আর কুকুরের দলবদ্ধ চিত্কারে রাতের নীরবতা ভেঙে যেত তখন মা ঘুম থেকে উঠে গায়ে কাঁথা পেঁচিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াত। বাইরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এরপর বাবা তাঁর বন্য খচ্চরটাকে নিয়ে বের হতেন। আমি চুপচাপ ঘুম থেকে উঠতাম। মায়ের ওপর দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতাম পশুব্যবসায়ীরা তাদের পশুগুলো নিয়ে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা আমার কাছে সত্যিকার অর্থেই স্বপ্নদৃশ্যের মতো মনে হতো।

আমাদের গ্রামে বেশ কয়েকটি সরাইখানা ছিল। কিন্তু পশুব্যবসায়ীরা সেখানে আশ্রয় নিত না। তারা মাড়াইখানার এবড়ো-খেবড়ো মেঝেতে তাদের পশুগুলোকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। প্রচুর ঠান্ডা বাতাস কিংবা আবহাওয়া যতই বৈরী হোক না কেন তারা সেখানেই থাকত। তাদের জীবনপদ্ধতিই ছিল অন্যরকম। পশু বিক্রি করত। তারপর মদ খেয়ে মেয়েবাজি করে তাদের সর্বশেষ টাকাটুকু রেখে দিত সস্তায় ধীরগতির কোনো ট্রেনের টিকেটের জন্য। যাতে করে বাড়িতে ফিরে তারা আবার পশু নিয়ে এখানে আসতে পারে।

বাবাকে দেখার পর পশুব্যবসায়ীরা দাঁড়িয়ে গেল। সিগারেটের পেকেট বের করল। বাবাও তাঁর সিগারেট বের করে সিগারেট ধরালেন।

পশুব্যবসায়ীরা একটু মুচকি হাসল। তারপরই দু-তিনজন কসাই সেখানে উপস্থিত হলো। তাদের শরীর থেকে আমি তখনো শূকর কিংবা অন্য কোনো পশুর রক্তের গন্ধ পাচ্ছিলাম। তাদের কাপড়ে রক্তের দাগ ছিল। আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পশুগুলো যেন কসাইদের দেখে একটু কেঁপে উঠল। নিরীহ পশুগুলোর চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন। তাদের হাঁটু কাঁপছে।

কসাইরা উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথেই দরদাম শুরু হয়ে গেল। তারা পশুগুলোকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে চক্র তৈরি করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকল। এখানে সব পশুরই ক্রেতা আছে। পশুগুলো ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তারপরও আমাদের গ্রামের কসাইগুলোর মধ্যে খুব ভাব। প্রথাগতভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেনদরবার শুরু হয়ে গেল। বাবা তখনো তাঁর জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছেন। দেনদরবারের শেষ পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা বাবার কাছে এল। তারা বাবার কাছ থেকে শেষ কথাটুকু শুনতে চায়। বিয়ের লাইসেন্সের মতো ব্যবসায়ীরা একটা লাইসেন্স পেতে চায় বাবার কাছে। কিন্তু আজকে মনে হচ্ছিল বিশেষ কিছু একটা ঘটেছে। কসাইদের চেহারায়, হাসিতে অন্যরকম একটা কিছু দেখা যাচ্ছিল। কসাইদের কাছে বাবা কখনোই খুব প্রিয় ছিলেন না। তাদের চোখে-মুখে একধরনের ষড়যন্ত্রের আভাস দেখতে পাচ্ছি। আমি বাবার দিকে তাকালাম। তিনি তখনো প্রতিদিনের মতো তাঁর সস্তা বিড়ি নির্বাক মুখে টেনে যাচ্ছেন। যেন কিছুই হয়নি। সেখানে ব্যবসায়ীদের সিগারেটগুলো পড়ে থাকত। যখন ব্যবসায়িক আলোচনা শেষ হয়ে যেত, তখন কসাইরা সিগারেটগুলো একত্র করে সেগুলো পুড়িয়ে দিত। কসাইরা সিগারেট খেতে খেতে বাবাকে প্রশংসা করে বলল, লাও লো, তোমার মতো যদি সব চীনারা হতো তাহলে অনেক আগেই চীনে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত।

কথা শুনে বাবা হাসলেন কিন্তু কিছু বললেন না। এই মুহূর্তে গর্বে আমার বুক ফুলে উঠল। মনে হলো আমার বাবা এমন একজন, আমাকে যাঁর মতো হতেই হবে। ব্যবসায়ীরা সকলেই বাবার দিকে ঘুরে তাকাল। অল্প কয়েকজন অন্যদিকে তাকিয়েছিল। কিছু একটা ঘটবে মনে হচ্ছে। সকলেই যেন সেই নাটকের জন্য অপেক্ষা করছে। বাইরে লাল সূর্যটা এর মধ্যেই আকাশে উঠে গেছে। অবশেষে নাটকের মূল চরিত্র মঞ্চে এসে হাজির হলো।

লাও লেন, আমাদের গ্রামের তুখোড় গরু-ব্যবসায়ী। খুব লম্বা শক্ত পেশির বাদামি চোখ আর বাদামি দাড়ির রুক্ষ চেহারার একজন মানুষ। কয়েক মিনিট সে দাঁড়িয়ে থাকল। সকলেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সূর্যের আলো তার চেহারার ওপর এসে পড়ছে। সে সোজা বাবার দিকে হেঁটে এল। কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকাল না। বাবার পেছনে সবুজ প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন সে বাবাকে দেখতেই পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তার চোখে বাবা কিছুই না। একদম ফালতু একটা জিনিস। আমার সেই অল্প বয়সে মনে হচ্ছিল, লাও লেন সূর্যের আলোর কারণে চোখে ঠিকমতো দেখতে পায়নি।

তার পর সে ব্যবসায়ী আর কসাইদের দিকে তাকিয়ে প্যান্টের জিপার খুলল। তার কালো নুনুটা বের করে আমার আর বাবার একদম সামনে মুতে দিল। সারা রাতের জমিয়ে রাখা হলুদ মুত। মুতের ঝাঁজালো গন্ধ টের পেলাম আমি। যে সিগারেটগুলো মেঝেতে পড়ে ছিল, সেগুলো মুতের স্রোতে ভেসে যাওয়া শুরু করল। লাও লেন প্রস্রাব শেষ করার পর ব্যবসায়ী আর কসাইরা সকলেই একসাথে হেসে উঠল। কিন্তু মুহূর্তেই সেই হাসি আবার মিলিয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল, লাও লেন বাবার সাথে ঝগড়া করতে চাচ্ছে। লাও লেনের মুত আমাদের পায়ে, শরীরে এসে পড়েছিল। বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি লাফিয়ে উঠে লাও লেনকে অভিশাপ দিতে থাকলাম। কিন্তু বাবা একটা কথাও বললেন না। পাথরের মতো বসে থাকলেন।

লাও লেন মোতা শেষ করে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে পশুগুলো ছিল সেখানে চলে গেল। দীর্ঘ একটা শ্বাসের শব্দ আমি ব্যবসায়ী আর কসাইদের কাছ থেকে শুনতে পেলাম। তবে বুঝতে পারছিলাম না সেটা কি হতাশার না কি কোনো আনন্দের। কসাইরা পশুগুলোর কাছে এল। ব্যবসায়ীরা দাঁড়িয়ে দরদাম শুরু করল। আমি নিশ্চিত ছিলাম ব্যবসায়ীদের মাথার ভেতর তখন আমার বাবা ঘুরপাক খাচ্ছিল।

কিন্তু আমার বাবা কী করলেন? তিনি কিছুই করলেন না। চুপচাপ মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি এতে মোটেও খুশি ছিলাম না। একজন ছোট্ট বালক হিসেবে আমি দেখেছি, কত বাজেভাবে লাও লেন বাবাকে অপমানিত করেছে। কোনো রকম যুদ্ধ ছাড়া এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। বাবা তখনো মৃত মানুষের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। সেদিনের ব্যবসায়িক লেনদেন বাবার কোনো অংশগ্রহণ ছাড়াই শেষ হয়ে গেল। কাজ শেষ হওয়ার পর অন্যান্য দিনের মতো ব্যবসায়ীরা কিছু ইয়ানের নোট রাখল বাবার কাছে। কিন্তু মাদারচোত জারজ লাওলিন তখন দুটো চকচকে দশ ইয়ানের নোট নিয়ে বাবার মুখের সামনে আঙুলের ভেতর নাড়াচাড়া করল। সে কোনোভাবে বাবাকে রাগাতে চাচ্ছিল। বাবা কিছু বলল না। মনে হলো লাওলেন এতে কিছুটা হতাশ হলো। সে তখন নোটদুটো বাবার পায়ের কাছে ছুড়ে মারল। তার একটা গিয়ে পড়ল লাও লেনের মুতের ওপর। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমার বাবা যেন মরে গেছে। তিনি যেন লাও লেনের মুতের ওপর ভেসে থাকা সিগারেটের চেয়েও অধম কিছু। লাও লেন চলে যাওয়ার পর তার পিছু পিছু ব্যবসায়ী আর কসাইরা হাঁটা দিল। ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে আমাদের জন্য সমবেদনা। যেন আমাদের বাবা আর ছেলের দলটার জন্য এই করুণাটুকুই পাওনা। যাওয়ার সময় অবশ্য তারা অন্যান্য দিন বাবাকে যে পরিমাণ টাকা দেয়, তার চেয়েও দ্বিগুণ টাকা মেঝের ওপর রেখে গেল। তারা চলে যাওয়ার পর মেঝের ওপর পড়ে থাকা টাকাগুলোর দিকে আমি তাকালাম। টাকাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল মৃত পাতা। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। বাবা মুখ তুললেন। তাঁর চোখে-মুখে কোনো দুঃখবোধ কিংবা ক্রোধের চিহ্ন নেই। তিনি আমার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকলেন। যেন তিনি বুঝতেই পারছেন না কেন আমি কাঁদছি। আমার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, 'আপনি আর আমার বাবা নন। আমি আপনাকে আর বাবা বলে ডাকব না। এখন থেকে আমি লাও লেনকে বাবা বলে ডাকব।'

আমার চিত্কার শুনে লোকগুলো আবার আমাদের দিকে ফিরে তাকাল। তারা হাসতে থাকল।

লাও লেন আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, 'জিওটোং, আমি তোমার মতোই একটা ছেলে খুঁজছিলাম। এখন থেকে আমার ঘরে যখন ইচ্ছে তখন তুমি আসতে পারবে। আমার ঘরে তুমি যা চাও তা-ই পাবে। তুমি যদি তোমার মাকেও নিয়ে আসো, আমি তোমাদের দুজনকেই হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নেব।'

আমি এই অপমান আর সহ্য করতে পারলাম না। রাগে ক্ষোভে আমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে খুব সহজেই আমাকে প্রতিহত করে মেঝের ওপর ছুড়ে মারল। আমার মুখে আর ঠোঁটে আঘাত লাগল। ঠোঁট কেটে রক্ত বের হলো।

লাও লেন অট্টহাসি দিয়ে বলল, 'খুদে শয়তান, একটু আগেই আমাকে বাবা বলে আবার এখন আঘাত করছিস। তোর মতো একটা সন্তান কোনো বাবাই চায় না। বানচোত কোথাকার!'

উঠে দাঁড়ানোর জন্য কেউ আমাকে সাহায্য করল না। আমি নিজেই উঠে দাঁড়ালাম। বাবার কাছে হেঁটে গিয়ে তাঁকে ধাক্কা দিলাম। বাবার এতে কিছু হলো না। তিনি রাগ করলেন না অথবা কিছু বললেনও না। শুধু তাঁর বিশাল থাবাটা দিয়ে নিজের মুখটা একবার পরিষ্কার করলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে মাটির ওপর লাও লেনের পেসাবের ওপর যে টাকার নোটগুলো পড়ে ছিল সেগুলো তুললেন। টাকাগুলো গুনে দেখলেন। কাছে এনে ভালো করে দেখলেন টাকাগুলো জাল কি না।

অবশেষে আরেকটা নতুন টাকার নোট যেটা লাও লেন দিয়েছিল পেসাবের ওপর পড়ে থাকার কারণে সেটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। বাবা সেই নোটটাকে নিজের কাপড়ে পরিষ্কার করলেন। পরিষ্কার টাকার নোটগুলো ডান হাতের তালুতে রেখে মধ্যের আঙুল দিয়ে ভালোভাবে গুনতে শুরু করলেন। আমি ছুটে গেলাম বাবার কাছে। আমার ইচ্ছে ছিল টাকাগুলো বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলি, তারপর সেই টাকা লাও লেনের মুখের ওপর ছুড়ে মারি। কিন্তু বাবা আমার থেকেও অনেক বেশি দ্রুত ছিলেন। তাই তিনি সহজেই টাকাগুলো হুট করে তাঁর বাঁ হাতে নিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে রাখলেন। বললেন, 'বোকা ছেলে, কী করছিস তুই? টাকা তো টাকাই। টাকার সাথে রাগ করে লাভ নেই রে, বাপ। টাকার ওপর রাগ করিস না।'

আমি তারপরেও বাবার ডান হাতে ভর করে বাঁ হাতের টাকাগুলো নেওয়ার চেষ্টা করলাম।

বাবা আমার মাথায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন, 'এ রকম করিস না বাপ। ওই দেখ লাও লেনের ষাঁড়টা কেমন ক্ষেপে আছে।'

ষাঁড়টা বিশাল দেহের আর সিং দুটো একেবারে খাড়া খাড়া ছিল। শরীরের মাংসগুলো কেমন চাক চাক হয়ে আছে। ষাঁড়টা দেখতে হলুদ রঙের কিন্তু মুখ আর মাথা একেবারে সাদা। আমি ইতিপূর্বে কোনো সাদা ষাঁড় দেখিনি। দেখতে খুব ভয়ংকর ছিল। ষাঁড়টা যদি তার চোখের কোনা দিয়ে তোমার দিকে তাকায়, তাহলেই ভয়ে তোমার পুরো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। ষাড়ের কথা বলে বাবা কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাকে টাকার বিষয়টা ভুলিয়ে রেখেছিলেন। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম লাও লেন বেশ দম্ভের সাথে তার ষাঁড়টা নিয়ে সেই চত্বর থেকে সরে যাচ্ছে। সে তো এরকমটাই করবে। কারণ গ্রামে আর ব্যবসাক্ষেত্রে যেভাবে তার সন্মান বাড়ছে, তাতে এ রকম করাটাই স্বাভাবিক।

বিশাল আকারের ষাঁড়টা যখন লাও লেন নিয়ে যাচ্ছিল, ষাঁড়টা তখন রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুতেই নড়তে চাইল না। লাও লেন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে দায়িত্ব দিল ষাঁড়টাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই লোকটার সহায়তায়ও লাও লেন ষাঁড়টাকে নাড়াতে পারল না। ষাঁড়টা যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে লাও লেনের শক্তিকে ঠাট্টা করছিল। একজন কসাই ব্যবসায়ী যে পশুর বিষয়ে খুব বেশি অভিজ্ঞ সে এসে ষাঁড়টার কান ধরে মোচড় দিল, লেজ নাড়া দিল। এই রকম করলে যেকোনো পশুই নড়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দানবীয় ষাঁড়টা সেরকম কোনো লক্ষণই দেখাল না। উল্টো সে একরোখার মতো দাঁড়িয়ে থাকল। লাও লেন একটু আগেই বাবার ওপর খুব চোটপাট দেখিয়ে বিজয়ী হয়েছে। তাই এখন সেই অহংকার নিয়েই বেশ জোরে ষাঁড়টাকে সে লাথি মারল। লাথি খেয়েই ক্রুদ্ধ ষাঁড়টা একটা হুংকার ছাড়ল। তারপর মাথাটা নিচু করে লাও লেনকে গুঁতো মেরে একটা খড়ের মতো বাতাসে ছুড়ে মারল। কসাই থেকে শুরু করে পশুব্যবসায়ী সবাই এই ঘটনায় হতবাক হয়ে গেল। কিছুই বলতে পারল না। কেউ লাও লেনকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেল না। ষাঁড়টা আবারও মাথা নিচু করে লাও লেনকে গুঁতো মারার জন্য এগিয়ে এল। লাও লেন এই অবস্থা দেখে মাটির ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকল। এর মধ্যেই ষাঁড়টা তাকে দ্বিতীয়বার তৃতীয়বার গুঁতো মেরেছে। অবশেষে লাও লেন যখন উঠে দাঁড়াল আমরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। লাও লেন দাঁড়িয়ে ষাঁড়টার দিকে তাকিয়ে থাকল। ষাঁড়টা নাক ফুলিয়ে আবারও আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাকে ভীতত্রস্ত একজন ষাঁড়-যোদ্ধার মতো দেখাচ্ছে। অবশেষে লাও লেন পাগলের মতো দৌড় দিল। ষাঁড়টাও লেজ উঁচিয়ে তার পিছু পিছু ছুটতে থাকল। এই অবস্থা দেখে লোকজনও ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে। তারা কেউ লাওলিনের সাহায্যে এগিয়ে এল না। বরং ছুটতে ছুটতে তারা বাবা-মাকে দোষ দিচ্ছিল এই বলে যে, কেন তাদের দুটো পা দিয়েছে, আরও দুটো পা বেশি দিলে তো এই মুহূর্তে আরও জোরে দৌড়ান যেত। তবে ষাঁড়টার বুদ্ধি ভালো ছিল। সে লাও লেন ছাড়া আর কারও দিকে ছুটে গেল না। কাউকে আক্রমণও করল না।

পশুব্যবসায়ীরা সবাই ছুটে গাছের ওপর উঠল। আর পাজি লাও লেন সোজা আমার বাবার দিকে ছুটে গেল। বাবার জামাটা খামচে ধরল। লাও লেন আর বাবা দুজনই একটা দেয়ালকে পিছে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ষাঁড়টা যখন তাদের একেবারে কাছাকাছি চলে এল বাবা তখন তাঁর হাতের টাকাগুলো ষাড়ের মুখের ওপর ছুড়ে মারল। বিড়বিড় করে বলল, 'এই বেটা গরু, তোর আর আমার মধ্যে কোনো খারাপ রক্ত নেই। কোনো শত্রুতা নেই, এখনো নেই, কখনোই ছিল না।'

মুহূর্তেই কেউ কিছু বোঝার আগেই এমনকি ষাঁড়টা বোঝার আগেই ষাড়ের নাকে যে রিংটা পরানো ছিল, সেটা ধরে ষাড়ের মাথাটাকে উঁচু করে ধরলেন বাবা। ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে পড়ল।

পশ্চিম প্রদেশ থেকে যেসব পশুব্যবসায়ীরা তাদের গরুগুলোকে নিয়ে আসে, সেগুলোর নাকে রিং পরানো থাকে। গরুর নাকের রিং হলো সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। যারা গরু লালন-পালন করে, তারা সবাই এটা জানে। কিন্তু আমার বাবা গরু লালন-পালনও করেন না, তিনি কোনো কৃষকও নন। তিনি একেবারেই সাধারণ একজন মানুষ।

আমার চোখে পানি এসে গেল। বাবার জন্য আমার খুব গর্ব হলো। বাবা, একটু আগের লজ্জা আর অপমানের বিপরীতে তোমার বুদ্ধি দিয়ে আবারও তুমি আমাদের সন্মান ফিরিয়ে এনেছ।

অন্যান্য কসাই আর ব্যবসায়ীরা বাবাকে সাহায্য করল ষাঁড়টাকে মাটিতে শুইয়ে ফেলতে। যাতে করে ষাঁড়টা আর কাউকে ক্ষতি করতে না পারে। একজন কসাই খরগোশের মতো বাড়িতে ছুটে একটা ছুরি নিয়ে এল। বিবর্ণ চেহারার লাও লেন তখন কসাইটাকে থামিয়ে দিল। কসাইটা লাও লেনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তাহলে কাজটা কে করবে? কেউ না?'

লাও লেন দৃঢ় চোখে ছুড়িটা হাতে নিয়ে ষাঁড়টার কাছে গেল। তারপর সোজা শুইয়ে রাখা ষাড়ের পেটের ভেতর ছুরিটা চালিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এল। আমার বাবা সেই রক্তে একেবারে লাল হয়ে গেলেন।

ষাড়টা এখন মৃত। সবাই মৃত ষাড়ের ওপর বসে আছে। ক্ষত স্থান থেকে ঝর্ণার মতো রক্ত বের হচ্ছে। সেই রক্তের প্রবাহে ছোট ছোট বুদ্বুদ উঠছে। অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু কেউ কোনো কিছু বলার মতো সাহস পেল না। সবাই মূর্তির মতো চুপ থাকল। কেবলমাত্র আমার বাবা তাঁর মাথাটা উঁচু করে তাঁর হলুদ দৃঢ় দাঁতগুলো বের করে বললেন, 'আকাশের বৃদ্ধ পিতা আমি সত্যিকার অর্থেই খুব ভয় পেয়েছিলাম।'

এইবার সকলেই লাও লেনের দিকে তাকাল। লাও লেন নিজের অস্বস্তি ঢাকার জন্য তখন এক দৃষ্টিতে মৃত ষাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ষাড়ের দুটো পা ছড়িয়ে আছে। মাংসল জায়গাগুলো নড়ছে। একটা নীল চোখ খোলা। সেটা দিয়ে যেন ঘৃণা উগরে দিচ্ছে।

'তুই জাহান্নামে যা।' লাও লেন মৃত পশুটাকে একটা লাথি মেরে বলল।

তারপর সে আমার বাবার দিকে ফিরে বলল, 'তুমি সারা জীবন বুনো হাঁস শিকারের পেছনে ছুটে বেড়িয়েছ আর পেয়েছ হাঁসের ছানা। আমি তোমার জন্য একটা রেখেছি লাওটং। তবে তোমার আর আমার শেষ কিন্তু এখনো হয়নি।'

'কী দিয়ে আবার শেষ হবে? তোমার আর আমার মধ্যে তেমন কিছুই নেই।' বাবা বললেন।

'তুমি তাকে স্পর্শ করবে না।' লাও লেন হিসহিস করে বলল।

'আমি কখনোই তাকে স্পর্শ করতে চাইনি। সেই আমাকে স্পর্শ করতে চেয়েছিল। সে তোমাকে কুকুর বলে ডাকত। সে তোমাকে কখনোই তাকে স্পর্শ করার সুযোগ দেয়নি।' আমার বাবা মুখে একটু বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে রেখে বললেন।

তাদের কথাবার্তার মাথামুন্ডু কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। যদিও পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম তারা মহিলা ব্যবসায়ী ওয়াইল্ড মুলকে নিয়ে কথা বলছে।

আমি বাবাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, 'বাবা কী নিয়ে আপনারা কথা বলছেন?' বাবা বললেন, 'বাচ্চা মানুষের এটা শোনার কোনো দরকার নেই।'

লাও লেন আমাকে বলল, 'বেটা, তুমি না বলেছিলে তুমি আমার পরিবারের একজন হবে। তাহলে এই লোকটাকে কেন বাবা বলে ডাকছ?'

'আপনি কুকুরের পায়খানা ছাড়া আর কিছুই না। আমি কেন আপনাকে বাবা বলব।' আমি লাও লেনকে বললাম।

লাও লেন বলল, 'শোনো ছেলে, এখন তুমি মায়ের কাছে গিয়ে বলো যে তোমার বাবা ওয়াইল্ড মুলের গর্তের ভেতর নিজের পথ খুঁজে পেয়েছে, সেখান থেকে সে বের হতে পারছে না।'

লাও লেনের এই কথা শুনে বাবা সেই ষাড়ের মতো খেপে উঠলেন। মাথা নিচু করে তিনি লাও লেনকে আঘাত করলেন। দুজনেই ঝাপটা-ঝাপটি করে মাটিতে পড়ে গেল। লোকজন এসে দুজনকে পৃথক করল। তবে এর মধ্যেই লাও লেন আমার বাবার দুটো আঙুল ভেঙে ফেলল আর বাবা লাও লেনের কান ছিঁড়ে ফেললেন।

মুখ থেকে কানের অর্ধেক অংশ থুতুর সাথে ফেলে বলল, 'কুত্তার বাচ্চা, তুই আমার ছেলের সামনে কীভাবে এই রকম একটা কথা বলতে পারলি। বেজন্মা কোথাকার!'

(চীনা ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন হাওয়ার্ড গোল্ডব্লেট)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন