শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

মৃত্তিকা মাইতি'র গল্প : লক্ষ্মীর পাঁচালি

বড়দির মারা যাওয়ার খবর পেয়ে বাপেরবাড়ি এল পূজা।

রাস্তা থেকেই শুনতে পাচ্ছিল কান্নার আওয়াজ। বাড়িতে ঢুকে দেখে, মা দাওয়ায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে কাঁদছে। পূজা গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। মা তখন আরও জোরে ডুকরে কেঁদে ওঠে— ‘যমরাজ আমাকে কেন নিল না, আমার আর কী দেখার বাকি আছে...’

কিছু দূরে বউদি বসে আর পাড়াতো কয়েকজন ঠাকুমা, কাকিমা। তারা বলাবলি করছে লক্ষ্মীর ভাগ্যের কথা। বলছিল আর দু’ফোঁটা চোখের জলও ফেলছিল।

‘মেয়েটার কপালটাই খারাপ।’

‘বিয়ের পরও একটু সুখ পেল না।’

‘ছেলেরাও মায়ের দুঃখ-কষ্ট বুঝল না।’

এক ঠাকুমা বলে ওঠে, ‘পূজা, তোর দিদিকে শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখে আয়, আর তো দেখতে পাবি না। খালপাড়ে নিয়ে গেছে পোড়াতে।’

পূজা জিজ্ঞেস করে, ‘খালপাড়ে কেন? আমাদের শ্মশানে পোড়ানো হল না?’

‘গ্রামের মাথারা তো বলল, বিয়ের পর আলাদা গোত্র হয়েছে। আমাদের শ্মশানে পোড়ানো যাবে না। তাই সবার পরামর্শে খালপাড়েই নিয়ে গেছে।’

পুজা তার বরকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। বিশ্বজিৎ বলে, ‘তুমি পিছনে আস্তে আস্তে এসো, আমি এগোই, যদি কোনও কাজে লাগে।’ বলে সে এগিয়ে যায়।

পূজার বাপের বাড়ি তার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম থেকে ঘন্টা দু’য়েকের রাস্তা। তাও আসা হয় না। আজ খবর পেয়ে এক কাপড়েই চলে এসেছে।

যেতে যেতে পূজার মনে হচ্ছিল, বড়দি মরে গেছে বলে আজ তার কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছে ঠাকুমা-কাকিমাদের। দাঁত উঁচু ছিল বলে এরাই কত মুখ ঝাড়া দিয়েছে বড়দির ছোটবেলায়। কেউ তাকে পছন্দ করত না। ছোটরা সবাই যখন খেলত, বড়রা একসঙ্গে বসে গল্প করত, তখন বড়দিও যেত হাসতে-খেলতে। তখন এরাই বলত, ‘এই কোদালদাঁতি, তোর অত হাসার কী আছে রে? দাঁত ঢোকা, একদম বের করবি না। লোককে দেখাস না ওই দাঁত, ভয় পেয়ে যাবে।’

পুরনো দাঁত ভাঙার পরে দিদির নতুন যে দাঁত গজিয়েছিল তারা আর নিজেদের জায়গায় থাকেনি। ঠোঁট ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সে যখন হাসে তখন দাঁতগুলোই আগে চোখে পড়ে। না হেসে মুখ বন্ধ করে রাখলেও মুখটা সরু হয়ে সামনের দিকে ঠেলে এসেছে মনে হয়। হাসলে অনেকেই তাকে বলত, ‘রাতে অন্ধকারে দাঁত বের করে যদি দাঁড়িয়ে থাকিস, লোকে ভয় পেয়ে পালাবে, নয়তো মূর্ছা যাবে।’ 

দিদির মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়া কোঁকড়া চুল আর চোখদুটো কী সুন্দর টানা টানা। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কখনও তাকে ভাল কথা বলেনি। দাঁত নিয়ে সবাই খোঁটা দিত। দাঁত ছাড়া যেন কারও কিছু চোখেই পড়ত না। ছোটবেলায় যারা তাকে ভালবাসত তারা ছাড়া আজ অবধি তাকে কেউ প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি। পূজা দেখেছিল। তার সামনে হাসি লুকোতে হত না দিদিকে।

একবার বড়দির সঙ্গে রথের মেলায় যাচ্ছিল পূজা। রথের সময় ঘোড়াদৌড় হয়। সেরকমই একটা ঘোড়া দৌড়ে নয়, হেঁটেই আসছিল। বোধহয় সহিসের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিল। পূজা ঘোড়া দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল। সামনের সরু রাস্তায় ঘোড়া আসছে দেখে দিদিও কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। একদিকে বাজবরণের ঝোপ, অন্যদিকে পুকুর। দিদি পূজার হাত ধরে টানছিল আর বলছিল, ‘চল, আমরা নারকেলগাছের পিছনে লুকাই।’

পূজা দেখতে পাচ্ছিল, তাদের একেবারে সামনে এসে পড়েছে ঘোড়াটা। সে আর থাকতে না পেরে বড়দির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা পুকুরে ঝপাং। ঘোড়া তার সহিসের দড়ি মুখে করে নিজের মতো টকটক করে চলে গেল।

পূজাকে পুকুরে সাঁতরাতে দেখে দিদির সে কী হাসি। হাসতে হাসতে ধুলোতেই বসে পড়েছিল।

পুকুর থেকে উঠে এসে দিদির সামনে দাঁড়াল পূজা। তার মাথার চুল বেয়ে, জামা থেকে ঝরঝর করে জল পড়ছে। চোখ বেয়েও জল গড়িয়ে নামছে। এবার রথ দেখার কী হবে? দিদি তখনও সেই বড় বড় দাঁত বের করে হেসে চলেছে। তারপর পূজাও হেসে ফেলেছিল।

দিদির বিয়ে নিয়ে বাড়ির লোককে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। গ্রামে তার বয়েসি, তার চেয়ে ছোট সবারই বিয়ে হয়ে গেছিল। কিন্তু তার আর বিয়ে হয় না। কেউ যে তার জন্য মধ্যস্থতা করবে, কী করে? সবাই জানে তার দাঁতের কথা। কেউ আর সম্বন্ধ নিয়ে আসে না। দু-একজন সাহস করে নিয়ে এসেছিল কিন্তু ছেলের বাড়ির লোক এসে দেখে যাওয়ার পর ফিরে আর যোগাযোগ করেনি।

বাড়ির লোকের মাথায় চিন্তা জাঁকিয়ে বসেছিল। এবার আর লক্ষ্মীর বিয়ে না দিলেই নয়। বয়স প্রায় বাইশ হয়ে গেছে। তার নীচে তিন বোন। তাদের মধ্যে দুই বোন পিঠোপিঠি, তারাও বিয়ের যুগ্যি হয়ে উঠেছে। লক্ষ্মীর বিয়ে না হলে তাদেরও দেওয়া যাচ্ছে না।

পূজা তখন ছোট। ছ’-সাত বছরের হবে। বড়দি তার চেয়ে পনেরো-ষোলো বছরের বড় ছিল। আসলে অনেক পরে হয়েছে পূজা। তাই তার কথা না বলাই ভাল। বাড়ির মধ্যে সে চোখে পড়ার মতো কেউ নয়। পূজা ছাড়া দিদিদের কেউই স্কুলে যায়নি কখনও। পূজা যেমন তেমন করে স্কুলে যায় আর তা ছাড়া সারাদিন বনেবাদাড়ে এ গাছ থেকে ও গাছ লাফিয়ে বেড়ায়। কোনও কোনও দিন সে ঘুরে ঘুরে লাল চুল উড়িয়ে, সেফটিপিন খোলা জামা দুলিয়ে বাড়ি ফিরত। মা তখন ছড়ি হাতে রে রে করে মারতে এলে দিদি ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের হাত থেকে বাঁচাত।

‘কী করছ মা, ছাড়ো, ছাড়ো ওকে।’

ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পূজাকে বুঝিয়ে বলত, ‘মা যখন বারণ করে শুনিস না কেন?’ বলে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করত। স্নান করিয়ে নিজের হাতে খাইয়ে দিত।

মেজদি, সেজদি দুজন দুজনের কোঁদলে সারাদিন ব্যস্ত থাকে। পুজাকে তারা ভালবাসে না। পুজাও তাদের ধারেকাছে ঘেঁষে না। তবে কোনও কাজ করার দরকার হলে তারা পুজাকে বলে।

মেজদি বলে, ‘এই উঠোনটা ঝাঁট দিয়ে দে তো, আমি একটু ও পাড়া থেকে ঘুরে আসছি।’

সেজদি বলে, ‘ডঙায় গরুর কাছে চাট্টি খড় দিয়ে আয় তো।’

এমনি গেলে চিমটি কেটে মেরে তাড়ায়।

বড়দি ছাড়া তাকে ভাল কথা বলার মতো কেউ ছিল না। এতগুলো ভাইবোন। বাবা মারা গেছে ছোটবেলায়। দাদার ওপর সব ভার।

বর্ষাকালে চাষের সময় মাঠে রুইতে গিয়েছিল মহাদেব। মাঠের পাশে একটা তালগাছ থেকে পাকা তাল পড়ে ছিল। কুড়োতে যায় সে। সেই সময় বাজ পড়ে। গাছ আর মানুষ একসঙ্গেই পুড়ে যায়। পূজা তখন খুব ছোট। পরে বড়দির কাছ থেকে জেনেছে। ততদিনে তা গল্প হয়ে গেছে। মা তখন নিরুপায় হয়ে পড়েছিল। একা মেয়েমানুষ, এতগুলো বাচ্চা নিয়ে দিশাহারা। দাদা বড়দির চেয়ে ছোট কিন্তু ছেলে, তাই বাড়ির হাল ধরে। মা চুপ করে যায়। বাড়িতে কারও কথা চলে না। দাদা যা বলে তাই হয়।

আর এখন তো দাদা গোবিন্দই মণ্ডল পরিবারের কর্তা। তার বিয়ের পর তার বউ হয়েছে কত্রী।

বড়দির বিয়ে ঠিক হওয়ায় বাড়ির লোক চিন্তা থেকে রেহাই পেয়েছিল। বরপক্ষ নিজেরাই আগ্র‌হ নিয়ে এসেছে। কোনও দাবিদাওয়া নেই। এককাপড়েই বিয়ে করে নিয়ে যাবে। বকুলতলা গ্র‌ামের সবাই জেনে গেছে লক্ষ্মীর বিয়ে। অনেকে তো এ কথাও বলেছে, ‘এতদিন বাদে মেয়েটার বিয়ের ফুল ফুটল তাহলে।’

বিয়ের দিন সকাল থেকে লক্ষ্মী গুম মেরে বসে ছিল। কান্নাকাটিও করেনি। বাবার কথা মনে পড়ছে হয়তো। বাবা তাকে খুব ভালবাসত। লক্ষ্মীকে যখন পাড়ার লোক দাঁত উঁচু বলে ঠাট্টা করত তখন বাবা তাকে কাছে ডেকে আদর করে বলত, ‘ওদের মনে কালো, তাই ওরা ভাল জিনিস দেখতে পায় না। তুই তো আমার লক্ষ্মী মেয়ে।’

বিয়েতে যারা এসেছিল দাদা তাদের সকলকে পেট ভরে খাইয়েছে। ডাল, মাছের মাথা দিয়ে চচ্চড়ি, মাছের ঝোল, টমেটোর চাটনি, মিষ্টি।

বিয়ে নিয়ে বড়দির মতামতের কেউ ধার ধারেনি। সে নিজেও কোনও আপত্তি জানায়নি। তারপর আবার বরপক্ষ যৌতুক নিচ্ছে না। মানে পণ, গয়নাগাঁটি কিছু দিতে হবে না। বড়দি আপত্তি করলেও কেউ শুনবে না। তাই সে চুপ করে গেছে। বিয়েতে বরের দিক থেকে বিশেষ কেউ আসেনি। ছেলের বাড়ি ওড়িশা, সেখান থেকে কেউ আসতে পারবে না। ছেলের এক বন্ধু মেয়ে দেখতে এসেছিল। সে বিয়ের দিনও ছিল। আর এসেছিল ঘটক ঠাকুরের পরিবার। তারাই বরের দূর সম্পর্কের পিসি-পিসেমশাই। পাশের গ্রাম কুঞ্জমারীতে তাদের বাড়ি। তারাই তো যোগাযোগ করে বিয়েটা দিল। তাদের বাড়ি থেকেই ছেলে বিয়ে করতে এসেছে। বিয়ের পর বউ নিয়ে এখান থেকেই চলে যাবে ওড়িশা। ছেলের ঘরদোর দেখা সম্ভব হয়নি কনেপক্ষের। হাতে চাঁদপানা বর পেয়েছে তাই তারা গলাকাপড়ি হয়ে মেয়েকে তার হাতে তুলে দিয়ে ধন্য হয়েছে।

না, বরকে দেখতে অবশ্য খারাপ নয়। রংটা কালো, মাথার চুলগুলো মোটা খাড়া হয়ে আছে। লম্বা-চওড়া দৈত্যের মতো শরীর। আর বয়সে লক্ষ্মীর থেকে পনেরো বছরের মতো বড়।

পরেরদিন সকালবেলা একটা কান্নার রোল উঠেছিল। মেয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি, তায় এত দূর। তাই তোড়জোড়ও চলছে। দিদি পূজাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মায়ের কথা শুনবি, বদমাইশি করবি না। মা যখন যেটা করতে বারণ করবে, করবি না।’ বলে কাঁদতে শুরু করে। ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মীকে একরকম হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় দু-একজন। পূজা রাস্তার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দিদির সঙ্গে বাড়ির কেউ গেল না? একলা ছেড়ে দিল?

পূজার মনে হয় পেছন থেকে তাকে কেউ ডাকছে। সে ঘুরে দাঁড়ায়।

‘কী রে, কতবার করে ডাকছি, শুনতে পাসনি?’

গ্রামেরই এক বন্ধু, পরমা। ছোটবেলায় দুজনে একসঙ্গে স্কুলে পড়েছে। খেলা করেছে।

‘না রে শুনতে পাইনি। তুই কবে এসেছিস পরমা? বর এসেছে? ছেলে?’

‘ছেলে আর বর শুধু নয়। আরও একটা মেয়েও হয়েছে। সবাই এখানেই। আমার কথা রাখ। তোর ছেলে কোথায়? তার বয়স কত হল?’

‘দশ। তাকে বাড়িতে রেখে এসেছি।’

‘ভাল করেছিস। এখন এখানে নিয়ে এসেই বা কী করতি। তোর দিদির কথাই সকালে বলছিলাম মাকে। মারা যাওয়ার বয়স কি হয়েছিল লক্ষ্মীদির! কী কপাল বল তো। কত কষ্ট পেয়েছে। কখনও কারও কাছে দুঃখ করেনি। আর আমাদের কথা ভাব। শ্বশুরবাড়িতে কিছু হলেই বাচ্চা কোলে বাপের বাড়ি চলে এসে মায়ের কাছে কান্নাকাটি করে বলি, আর যাব না শ্বশুরবাড়ি। কিছুদিন থেকে, মাথা ঠান্ডা হলে তখন আবার ফেরত যাই। তুই শ্মশানে যাচ্ছিস?’

‘হ্যাঁ, যাই রে।’

পরমা দাঁড়িয়েই থাকে। আবার হাঁটতে শুরু করে পূজা। মনে হয়, কত বয়স হয়েছিল বড়দির? বড়জোর ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ। যেতে যেতে বড়দির শ্বশুরবাড়ির কথা মনে পড়ে পূজার। সে এক ঘটনা। বড় হতে হতে লক্ষ্মীর সেই পাঁচালি ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল পূজার কানে।

প্র‌থমে বাস, তারপর লঞ্চ, তারপরে ভ্যানে চড়েও রাস্তা ফুরোয়নি। হেঁটে নদীর শুকনো মোহনা পেরিয়ে লক্ষ্মী পৌঁছেছিল শ্বশুরবাড়ি। তাকে নিয়ে গিয়ে পরমেশ্বর দাঁড়িয়ে ছিল দরজার সামনে।

লক্ষ্মী দেখল— বাড়িতে নতুন বউ এসেছে কিন্তু কোনও আয়োজন নেই। সে তো অবাক। কেউ কি জানে না এ বাড়ির ছেলে বিয়ে করে এসেছে? ঘরটাই বা এত নিচু কেন? তাদের বাড়িও তো মাটির একচালা কিন্তু কত উঁচু দেওয়াল, ভেতরে ভাল করে দাঁড়ানো যায়। এখানে তো হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে। এ কোথায় এসে পড়ল সে? পরমেশ্বর বোধহয় তার মুখ দেখে বুঝতে পারে, বউ তার বাড়িটার দিকে চেয়ে আছে।

সে বলল, ‘এখানকার বাড়িগুলো এরকমই হয়। নদীর ধারে তো, খুব ঘূর্ণিঝড় হয় এখানে। যাতে উড়িয়ে নিয়ে যেতে না পারে তাই এরকম বাড়ি। ঝড় এলে বাড়ির সবাই মিলে ঘরের চালা ধরে ঝুলে থাকতে হয়।’

লক্ষ্মীর কৌতূহল মেটে কিন্তু সে ভাবে, ঘরের ভেতর থেকে এখনও কেউ বেরোচ্ছে না কেন? তখন তার পাশ থেকে পরমেশ্বর ডাক ছাড়ে— ‘কী, কোথায় গেলে সব? বাড়িতে কেউ নেই না কি?’

এবার ভেতর থেকে কতগুলো নানা বয়সের মেয়ে বাইরে এসে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

পরমেশ্বর তাদের বলল, ‘এটা নতুন মা, দ্যাখ। তোদের মা কোথায়?’ বলে লক্ষ্মীকে তাদের কাছে ছেড়ে পরমেশ্বর ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। 

মেয়েরা লক্ষ্মীকে আর একটা ঘরে নিয়ে গেল। তার মুখে কোনও কথা নেই। কলের পুতুলের মতো তাকে যেখানে নিয়ে গিয়ে বসাল, সেখানেই বসল সে।

মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে মেয়েটি তার বয়স চোদ্দো-পনেরো হবে। সে বলল, ‘নতুন মা, আমাদের কোনও ভাই নেই, আমরা চার বোন। বাবা তাই মায়ের সাথে ঝগড়া করে আবার বিয়ে করবে বলে ঘর ছেড়ে চলে গেছিল। আমরা তোমার মেয়ে।’

লক্ষ্মী মাথা তুলে দেখল, মেয়েরা তার দিকে মুখে হালকা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। লক্ষ্মীর মাথা কাজ করছিল না। ভাবনা বন্ধ হয়ে গেছে। সে তাই চুপ করে বসে থাকে।

মেয়েরা আবার বলল, ‘নতুন মা, আমরা খেয়ে ঘুমোতে যাব, তুমিও চলো, আমাদের সাথে খেয়ে নেবে।’

লক্ষ্মীর মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোয় না। শুধু মাথা নাড়িয়ে না বলে। মেয়েরা চলে যায়। 

সে ভাবছিল, তারা সন্ধের মুখে মুখে এসেছিল, এখন বোধহয় অনেক রাত হয়ে গেছে। জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে লক্ষ্মী কিন্তু জানলাটা এত ছোট যে কিছু দেখার কোনও উপায় নেই। সে তখন চেয়ে দেখে ঘরটার চারদিক। একদিকের দেওয়ালে দড়িতে ঝুলছে কতগুলো জামাকাপড়, আর এক কোনায় কতগুলো কাঁথাবালিশ ঢাঁই করে রাখা। ঘরের মাঝখানে একটা টিনের লম্ফ জ্বলছে। 

লক্ষ্মী কোথাও নড়ল না। তাকে আর কেউ ডাকতেও এল না। সে লম্ফর সামনে একটা চাটাইয়ে সারারাত জেগে বসে রইল। সেই রাতে তার ঘরে কেউ আসেনি।

ছেলে না হলে বংশরক্ষা হবে না। তাই বউ থাকতেই লক্ষ্মীকে আবার বিয়ে করেছিল পরমেশ্বর। আগের বউয়ের মন রেখেই সংসার করতে হয়েছিল লক্ষ্মীকে। 

এরপর ছেলেই হল লক্ষ্মীর। দুই ছেলে। তার আবার মেয়ে নেই।

কিন্তু যে ছেলের জন্য পরমেশ্বর আগের বিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করেছিল, এরপর সেই ছেলে পাঞ্চালীও তাকে দিল। চার চারটে মেয়ের পর লক্ষ্মীর সতীন পাঞ্চালীর এক ছেলে হয়। সে তখন বুকে বল পায়। পরমেশ্বরকে বলে, ‘আমার ছেলেই জায়গাজমি সব পাবে। তুমি তোমার বউ-ছেলেদের নিয়ে রাস্তা দেখো।’

শুরু হয় পরমেশ্বর-পাঞ্চালীর গৃহকলহ।

খাটাখাটনি করার অভ্যেস কোনওদিনই নেই পরমেশ্বরের। নিজের জায়গাজমি নেড়েচেড়ে খেয়েছে। এখন কোথায় গিয়ে কাজকর্ম করবে? কী কাজই বা করবে? সে পাঞ্চালীকে বলে, ‘আমার জায়গাজমি, আমি থাকতে পারব না?’ 

পাঞ্চালী তখন ছ-সাত বিঘা জমি থেকে বিঘা খানেক জমি তাকে নিতে বলে। শত হলেও নিজের বর।

কোনওকালেই ঝগড়া বিবাদ ভাললাগে না লক্ষ্মীর। বরাবর এসব এড়িয়ে চলে। তাই সে বলল, ‘এই জমিই আমাদের যথেষ্ট। কপালে থাকলে পরে আরও হবে।’

পরমেশ্বর কিন্তু থাকতে চাইছিল না। ছেলে হওয়ার পর প্র‌থম পক্ষের জোর বেড়ে গেছে। এতদিন বাদে পরমেশ্বরের সেই শ্বশুরবাড়িও মুখ খুলছে। দু’পক্ষের ছেলেরাই বড় হলে সম্পত্তি নিয়ে লাঠালাঠি হতে পারে। পরমেশ্বর লক্ষ্মীকে বলল, ‘মা-বাবা তো অনেকদিন আগেই মরেছে। চলো, এই জমি বেচে, টাকা নিয়ে আমরা মেদিনীপুর চলে যাই। ওখানে একটা জায়গা কিনে ঘর করে থাকব। তোমার দাদাকে বলব একটা কাজ জোগাড় করে দিতে। বিয়ের সময় তো কিছু নিইনি, এখন কিছু সাহায্য করবে।’

লক্ষ্মীর মনে হয়, এখানে আমার কেউ নেই। ওখানে ওদের কাছাকাছি থাকতে পারব। চোখের দেখা দেখতে পাব, কারও কিছু হলে দৌড়ে যেতে পারব। ভাইয়ের বিয়েতে যাওয়া হয়নি, দুই বোনের বিয়ের সময় খবর পাঠিয়েছিল, যেতে পারিনি। ছোট বোনটা আছে। তাকে দেখতে পাব।

সে বলে, ‘তাই চলো, আমরা ওখানে গিয়েই থাকি।’ তারপর মনে হয় তার সতীনের কথা। প্র‌থম প্র‌থম তার সঙ্গে তেমন কথা না বললেও পরে পাঞ্চালীও তার সঙ্গে মানিয়েই চলত। তবে এতদিন বাদে সে বরের ওপর শোধ তুলতে ছাড়েনি। 

লক্ষ্মী পরমেশ্বরকে বলে, ‘তুমি চলে গেলে দিদির কী হবে?’

‘সে নিজেই তো আমাদের তাড়াতে চায়। এখানে থাকলে আরও ঝগড়া হবে।’

বড়দির যখন অত কিছু ঘটে যাচ্ছিল ততদিনে পূজা একদম একলা হয়ে গেছে। তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আগে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলত। স্কুল থাকলেও, না থাকলেও। স্কুল নেই। তাই সে শুধু বাড়ির কাজ করে আর মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়, গোরু চরায়। তবে তখন তার এক অন্য বন্ধু ছিল। আরে! ওই তো, তাকে দেখা যাচ্ছে।

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে গাছের ফাঁক দিয়ে চোখ যায় খালের উলটো পাড়ে নৌকোটার দিকে। নৌকোটা এখনও সেই গাছটার নীচেই বাঁধা? কী করে রয়েছে? রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পচে যায়নি? এতদিন এভাবে কোনও নৌকো থাকে? কে যে বেঁধে রেখে গিয়েছিল ওকে! পূজার মনে হয়— নৌকোটার তো জলে থাকার কথা। তখন মনে হয়নি, এখন মনে হয়— সে মাঠে কেন? জলে কি তার জায়গা হয়নি? মাঠও তো তার জায়গা নয়। জল থেকে কে তাকে ডাঙায় তুলে এনেছিল? সে কি বাতিল ছিল? সে তাহলে তো কারও হতে পারেনি। না জলের, না মাঠের। 

নৌকোটার চোখের দিকে তাকায় পূজা। তার চোখে চোখ রেখে ছোটবেলায় কত কথা বলেছে। এখনও কি সে সেইভাবে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে? ওর গায়ে চোখ আঁকা। দু’পাশে দুটোই। কিন্তু একসঙ্গে কখনই দুটো দেখতে পেত না সে।

নৌকোটার চোখে তো সেই দৃষ্টি নেই। অভিমান করেছে? বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সে এখানে আসতে পারেনি কখনও। পূজার চোখেও কি সেই দৃষ্টি আছে আর?

সে যখন রোজ এখানে গোরু চরাতে আসত, একমাত্র বন্ধু ছিল নৌকোটাই। তিনটে গোরু ছিল বাড়িতে। তাদের চরাবার লোক ছিল না। ছোট ছিল বলে পূজার কাজ ছিল গোরু নিয়ে যাওয়া। ঝড়-বৃষ্টির দিন ছাড়া রোজ সকালে চাট্টি পান্তা কাঁচালঙ্কা আর পেঁয়াজ দিয়ে খেয়ে গোরু নিয়ে বেরিয়ে যেত। ফিরত সেই দুপুরবেলা। গোরুগুলো মাঠে ছেড়ে দিয়ে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলত, ‘লোকের বাগানে ঢুকে ক্ষতি করবি না। যদি করেছিস, তাহলে আমার হাতের এই ছড়িটা দেখছিস তো? এইটা দিয়ে মেরে গা ফুলিয়ে দেব।’ বলে সে তার নিজের কাজে চলে যেত।

নিজের কাজ বলতে পুকুরে নেমে শাপলা খাওয়া। শাপলার ফুল থেকে ফল হয়— ভেটুক। পাকা ভেটুকের ভেতরের দানাগুলো কালচে কালচে। সে হল রাজা ভেটুক। আর যেটা আধপাকা তার ভেতরের দানা হয় লাল। তার নাম মামা ভেটুক। যেটা একেবারেই কাঁচা তার ভেতরটা সবুজ, তাকে বলে আইমা ভেটুক। পুজা সেইগুলো তুলে খায়। চিবোতে চিবোতে যখন দাঁত-মুখ ব্যথা হয়ে যায় আর মুখের ভেতরটা হয়ে যায় কষটা কষটা তখন সে চলে যায় খালে ডুব দিতে, মানে গা ধুতে।

অন্যসময় পূজা তার বন্ধুর সঙ্গে খেলে, তার ঘাড়ের ওপর বসে থাকে, নড়ে না চড়ে না বলে তার ওপর রাগও হয়। আবার তার সঙ্গে কথাও বলে। 

‘রাতে তুই একা একা এখানে থাকিস কী করে! ভয় করে না?’

‘জানিস, আমি ইস্কুলে পড়তাম। বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল— কত বই ছিল। সহজপাঠে তোর কথা আছে, জানিস! নদীর ঘাটের কাছে নৌকো বাঁধা আছে, নাইতে যখন যাই দেখি সে জলের ঢেউয়ে নাচে...।’ 

‘পড়ে আছিস কেন বল তো! চলে যেতে পারিস না জলে?’

যদিও বন্ধুটি বোবা হয়ে গাছের তলায় পড়েই থাকে। কেউ ওই গাছেই তাকে বেঁধে রেখেছে। ঝড়-বৃষ্টি-খরা, সারা বছর বাঁধা পড়ে থেকে থেকে একটা-দুটো পাটা খসে গেছে। রংও জ্বলে গেছে। সে এখন এক পোড়ো নৌকো। কিন্তু তার টানা টানা কালো দুটো চোখে কী যে আছে— পূজাকে টেনে নিয়ে যায়। পূজা কী করে না করে— ওই চোখদুটো তাকে পাহারা দেয়।

এখানে বিঘা কে বিঘা জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। চাষ হয় না। মাঠের এখানে ওখানে একটা দুটো রুগ্‌ন বাবলাগাছ ছাড়া আর কোথাও কোনও প্রাণী নেই। গাছগুলোও লড়াই করে বেঁচে আছে নোনা জলের সঙ্গে। তাই তারা বাড়তে পায় না। বর্ষার সময় একটু মাথা তোলে। নোনা জলে মাথা ঝোঁকায়। খালের নোনা জল ঢুকে ধান নষ্ট করে দেয়। তাই যাদের জমি তারা এখানে চাষ করে না। বর্ষার সময় মাঠে জল জমলে তখন সেখানে মাছ মারে।

সেই নোনা জলই কিছুটা পায় নৌকোটা। ভেসে তো যেতে পারে না। সেই জলেই দোল খেয়ে নেয় কিছুদিন। জল নেমে গেলেই সব শুকনো খটখটে।

মাঠ থেকে দূরে গ্রামের বাড়িঘর গাছপালা সব দেখতে পেত পূজা। আর দেখত— খালপাড়ে সাদা চাঁদোয়া টাঙানো। অন্য কোথাও থেকে এই বকুলতলা গ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে এমন কেউ যদি মারা যায়, তাহলে তাকে গ্রামের শমশানে পোড়াতে দেওয়া হয় না। সেখানে তার পুড়ে যাওয়ার কোনও অধিকার নেই। ওই খালপাড়ে উঁচু উঁচু ঢিবি আছে। তার ওপর পোড়ানো হয়। নয় তো গাড়া হয়। মানে মাটি দেওয়া হয়। যেখানে গাড়া হয় সেই জায়গা যাতে কেউ মাড়িয়ে না ফেলে তাই মাটির ওপর মাটি দিয়ে ছোট্ট মানুষ-পুতুল বানিয়ে তার চার কোনায় এক হাত মাপের চারটে শরকাঠি পুঁতে রাখা হয়। আর তাতে সাদা ধুতির মতো পাতলা আড়াই হাত কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়। একটা মাটির গাড়ুতে পাশে রাখা থাকে জল। যাতে দূর থেকে লোকে দেখে বুঝতে পারে— এখানে কাউকে মাটি দেওয়া হয়েছে।

নৌকোটা রোজ একই জিনিস দেখে। নতুনের মধ্যে পূজা তার গোরুগুলো নিয়ে এসে মাঠে ছেড়ে দিয়ে তার ওপর চড়ে পা দোলায়। তারপর খালের জলে গা ধুতে নেমে যায়। গা ধুতে ধুতে মাথা তুলে নৌকোর দিকে তাকায়। মনে হয়, নৌকোটাও তার দিকে টেরা চোখে তাকিয়ে আছে। নোনা জলে ডুবে ডুবে পূজার চোখ লাল। সে সেই লাল চোখে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। নৌকোর চোখ বড়দির চোখের মতো লাগে কেন তার! বড়দি তো অনেক দূরে। কতদিন দেখেনি সে দিদিকে। এইরকম বোবা হয়েই তাকিয়ে থাকত দিদি। বুকের ভেতর তোলপাড় করতে থাকে। কী বলতে চায় নৌকোটা তাকে? সে নিজে কিছু বুঝতেও পারে না। মনে হয় কষ্টে বুক ফেটে যাবে।

পূজা যখন বাড়ি ফিরত তখন তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখার মতো মূর্তি। চোখদুটো ঘোলাটে, মাথার লাল লাল চুলগুলো পাকানো দড়ির মতো ঝুলছে, গায়ের জামাটা পাঁপড়ের মতো কড়কড়ে, হাতে-পায়ে খড়ি ফুটে আছে। পূজা খুঁটিতে গোরুগুলো বেঁধে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। মা দাওয়া থেকে চিৎকার করে ওঠে, ‘আজ আবার খালে ডুবে এসেছিস? যাওয়ার সময় পইপই করে তোকে বারণ করে দিই, রোজ মার খাস, গায়ের ব্যথা মরে যায়, না তুই ভুলে যাস? দাঁড়া।’ বলে এসে চুলের মুঠিটা ধরে ধাঁইধাঁই করে চড়-থাপ্পড় বসাতে থাকে। বড়দি নেই। পূজাকে বাঁচানোরও কেউ নেই।

বড়দি ফিরে এসেছে জেনে পূজার মন নেচে উঠেছিল। তার প্রাণ যায় রয় যায় রয় অবস্থা।

লক্ষ্মী এসে তার ভাইয়ের এক ছেলে আর মেয়েকে দেখতে পায়। মাকে প্র‌ণাম করার সময় মা মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদে। আবার আনন্দও হয়। মেয়ে-জামাই, দুই নাতি বাড়ির কাছেই থাকবে।

বড়দি পূজাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘কত বড় হয়ে গেছিস তুই? বিয়ের যুগ্যি হয়ে উঠেছিস তো।’ বলে হেসে ওঠে। দিদিকে জড়িয়ে ধরে পূজা পুরনো সেই গন্ধই পায়। ভাবে— আবার কথা বলার বন্ধু পেলাম। যদিও কিছু বলতে পারে না। একসঙ্গে এত কথা মুখে আসে যে বলা হয় না।

পূজা মজা পায় তার দুই বোনপোকে পেয়ে। তারা ওড়িয়ায় বকবক করে চলেছে। দুপুরে তাদের মামি খেতে দিচ্ছিল। মাছের ঝাল আর মাছের ডিম-ঢেঁড়শ-আলু-আমসি সব মিশিয়ে টক। ভাগ্নেদের বোধহয় খুব ভাল লেগেছে। বড় ভাগ্নে বলল, ‘মামি, অর টিকে দিঅ। অর টিকে দিলে সন্তুষ্ট হই যিব।’ তার এই কথা শুনে সবার কী হাসি।

গোবিন্দ তার বড়দিকে একটা জমি দেখে দেয় সস্তায়। সস্তায় কেন? জমিটা পাড়ার মধ্যে নয়। শ্মশানের কাছে। পরমেশ্বর সেখানেই একদিকে পুকুর খোঁড়াল, অন্যদিকে ছোট্টমতো মাটির বাড়ি তুলল

লক্ষ্মী বলেছিল, ‘রাতবিরেতে ছেলেপুলে নিয়ে থাকব, কোনও বিপদ ঘটলে?’ কেউ তার কথা কানে তোলেনি। পূজারও ভাল লাগেনি জায়গাটা। সে দিদিকে বারণ করেছিল, ‘যেও না দিদি। লোকে সন্ধেবেলা ওদিকে যেতে ভয় পায়। তোমরা থাকবে কী করে?’

লক্ষ্মীর কোনও উপায় ছিল না। সারাক্ষণ ছেলেদের নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকত। রাতে কেউ কোথাও নেই। চারদিকে ঘন অন্ধকার। দূরে মাঠ থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে শিয়ালের হুক্কা-হুয়া। সে জানলা দিয়ে শ্মশানের দিকে দেখে। দিনেরবেলা কাকে যেন পোড়ানো হয়েছিল। রাতে তার দগদগে আগুন এই অন্ধকারে লক্ষ্মীকে যেন গিলতে চায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সে তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দেয়।

পরদিন সকালে পূজা আসে দেখা করতে। দিদিকে দেখে তার সন্দেহ হয়। জিজ্ঞেস করে, ‘কাল রাতের বেলা ঘুমোওনি?’

‘ভয়ে আর ঘুমোতে পারিনি। ওইদিকে চেয়ে দ্যাখ, এখনও ধোঁয়া উঠছে।’

‘জামাইবাবু কোথায়?’

‘সে তো সকালেই সাইকেল নিয়ে মাছ নিতে বেরিয়ে গেছে।’

গোবিন্দ জামাইবাবুকে নিয়ে গিয়ে মাছের আড়তদারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছিল। সকালে গিয়ে পাল্লা দরে মাছ তোলে। তারপর একটা ঝুড়িতে কাপড় ঢাকা দিয়ে সাইকেলের পিছনে বেঁধে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে পরমেশ্বর। কিছু মাছ বেঁচে গেলে বাড়িতে নিয়ে আসে রান্নার জন্যে। ছেলেদের এখনও ইস্কুলে ভর্তি করেনি। কিছু দিন যাক, তাদের ওড়িয়া ভাষাটা কাটুক।

লক্ষ্মী বলে, ‘ছেলেদুটো খেলে বেড়ায়। সন্ধে হলেই ঘুমিয়ে পড়ে। তোর জামাইবাবু তো সারাদিন খাটাখাটনি করে ক্লান্ত থাকে। শুলেই অঘোরে ঘুমায়। আমার চোখে ঘুম নেই। ঘুম উড়ে গেছে। এরকম চললে তো বেশি দিন বাঁচব না রে।’

শ্মশানে যেতে হলে বড়দির ঘর পেরিয়েই যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে পূজা তার সামনে এসে দাঁড়াল। এখান থেকেই শ্মশানটার দিকে তাকাল একবার। দিদি খুব ভয় পেত, আবার এই শ্মশানটাকেই যেন তার নিজের গ্র‌ামের মনে করে পাহারা দিত। যাতে অন্য গ্রামের মড়া এখানে পোড়ানো না হয়। আর আজ তারই জায়গা হয়নি এই শ্মশানে। অন্য গোত্র বলে পাঠিয়ে দিয়েছে খালপাড়ে। বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরা সধবা মরলে তো বাপেরবাড়িতে নিয়ে আসা হয় না। যা হওয়ার শ্বশুরবাড়ির ওখানেই হয়। ছেলেদের তো এরকম হয় না! তারা তো গ্রামেরই থাকে। গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেতে হয় না। তাহলে কি মেয়েদের গ্রাম তাদের নিজেদের নয়? বড়দি তাহলে না বাপেরবাড়ির গ্রামের, না শ্বশুরবাড়ির গ্রামের। তার নিজের বলে কি কিছুই ছিল না? না জল, না ডাঙা?

বড়দির বড়ছেলের বউ প্র‌তিমা দরজার সামনে। ‘মাসি তুমি কখন এলে? ঘরে এসে বসো।’

‘না বসব না।’

‘একা এসেছ?’

‘না, তোমার মেসোও এসেছে। এগিয়ে গেছে খালপাড়ের দিকে।’

‘যাও, ওখানে সবাই আছে।’

পূজা জিজ্ঞেস করে, ‘দিদির কী হয়েছিল প্র‌তিমা?’

‘সেরকম কিছুই তো হয়নি। সকালে মা ঘরে ছিল না। আমি রান্না করছিলাম। মা ফেরার পরে ও জিজ্ঞেস করে, কোথায় ছিলে এতক্ষণ। তারপরে মা-বেটায় বচসা হচ্ছিল। মা আগের দিন রাত থেকে কিছু খায়নি বেটার সাথে ঝগড়া করে। বলছিল, কোনদিন ভ্যান চালাস, কোনদিন ভাটায় গিয়ে ইট বয়ে দিস, এই করে সংসার চলবে? সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। মা

মাথা ঘুরে পড়ে যায়। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে এসেছিল।’

পূজা চুপ করে থাকে। মাঝে মাঝে এরকম ঝগড়ার খবর কানে এসেছিল তার।

প্র‌তিমা বলে, ‘ঘরে বসবে না তাহলে?’

পূজা কিছু না বলে এগিয়ে যায়। কাছেই কার্তিকখালি, সেখানকার মেয়ে প্র‌তিমা। এই মেয়েকেই বিয়ে করবে বলে বড়দির সঙ্গে কত ঝগড়া করেছে তার বড়ছেলে। কী অশান্তি করেছে। দিদি বারণ করেছিল। সবে আঠেরো-উনিশ বছর হয়েছে, আরও কয়েকটা বছর যাক, তারপর বিয়ে দেব। বড়ছেলে শোনেনি। সে তখন ভালবাসায় পাগল। উঠতে-বসতে শাসাচ্ছে এই বিষ খাব, এই ফাঁসি নেব। দিদি নিরুপায় হয়ে যায়। ছেলে মরবে কেন, বিয়ে করে যদি বাঁচে, বেঁচে থাক।

বিয়ের পর ছেলে-ছেলের বউ নিজমূর্তি ধারণ করে। নিজের মেয়ে নেই বলে দিদি প্র‌তিমাকে কত ভালবাসত। কাজে কোনও ভুল করলে বুঝিয়ে বলত, প্র‌তিমা এভাবে না, ওভাবে করো। প্র‌তিমা শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো ভাবতে পারেনি। দিদিকে খেতে দিতেও যেন কষ্ট ছিল তার। আর জামাইবাবু কখনও দিদিকে ভালবাসেনি। ছেলের বিয়ের পর বউমাকে দেখে বুঝে গেছে, তাকে খুশি করে চললেই ছেলের কাছে ভাল সেজে কাটিয়ে দেওয়া যাবে জীবনটা।

বড়দির আশা ছিল ছোটছেলে তার কথা বুঝবে। ছেলেবেলা থেকে মায়ের গা ঘেঁষে থাকত। সেই ছেলেও বড় হয়ে দাদার মতো হয়েছে। এই গ্রামেরই কাকে ভালবাসে। বিয়ে না দিলে সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে— সেই কথা শোনায়। ছেলেদুটো কেউই মায়ের মতো হয়নি। দিদি একসময় দুঃখ করে বলত, ‘পূজা, তুই কেন আমার মেয়ে হয়ে জন্মালি না!’

পূজার তখনও বিয়ে হয়নি, কথা চলছে, সেই সময় একটা মেয়েকে পেয়েছিল বড়দি। 

সকালবেলা কাঠ কুড়োতে গিয়ে বাঁধের পাশে দেখে একটা কাপড়ের পুঁটলি। কাছে গিয়ে দেখতে পায় ভেতরে একটা বাচ্চা। কোনও কান্নার শব্দ নেই। সারা গায়ে ছেয়ে রয়েছে লাল পিঁপড়ে। নিঃশব্দে তারাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখনও রক্তমাখা ছোট্ট শরীরটায় পিঁপড়ের কামড়ে চাকা চাকা দাগ। ‘হেই মা গো’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোনওমতে পিঁপড়েগুলোকে ঝেড়ে ফেলেছিল লক্ষ্মী। তারপর বাচ্চাটাকে কোলে তুলে পড়ি কি মরি ফিরেছিল বাড়ি। 

খবর পেয়ে বড়দির কাছে গিয়েছিল পূজা। লক্ষী তখন বাচ্চাটাকে নিয়ে বসে ঝরঝর করে কাঁদছে। পূজাকে দেখেই বলল, ‘একটু আগেও বেঁচে ছিল রে! এতটুকু মেয়েকে কোন পাষণ্ড ফেলে গেল বল তো! মুখে দু’ফোঁটা দুধও দিয়েছিল। কী পাষাণী মা রে! আহা, যদি বাঁচত, আমি আমার কাছেই রেখে দিতাম।’

পূজা আর বড়দিই খালপাড়ে নিয়ে গিয়ে মাটি খুঁড়ে গেড়েছিল মেয়েটাকে। গর্তের মধ্যে বাচ্চাটাকে শুইয়ে দেওয়ার সময় বড়দি কাঁদছিল আর বলছিল, ‘ভালই হয়েছে, মেয়ে জনমের কষ্ট পেতে হল না তোকে।’ 

তাকে মাটি চাপা দেওয়ার পর শরকাঠি পুঁততে হয়নি, টাঙাতে হয়নি চাঁদোয়াও। রাখতে হয়নি গাড়ু ভরে জল। দুই বোন মিলে শুধু একটা ছেট্ট মাটির পুতুল বানিয়ে দিয়েছিল ঢিবির ওপরে। 

খালপাড় থেকে খোল, খঞ্জনির আওয়াজ ভেসে আসছে। যখন বেঁচে ছিল তখন কেউ দিদির দিকে ফিরে দেখেনি। মরে যাওয়ার পর নিয়ম পালন করছে। এখন বোষ্টুম এনে খোল, খঞ্জনি বাজিয়ে গ্রাম জানাচ্ছে। পূজা এগিয়ে যায়

দু’পাশে ধানিজমি, মাঝখান দিয়ে মাটির চওড়া রাস্তা একেবেঁকে চলে গেছে খালপাড় অবধি। রাস্তার দু’পাশে কতরকমের গাছ। কেয়াগাছের জঙ্গল, ঝাঁটিগাছ, তালগাছ, শীত-কাঁটার ঝোপ এখানে ওখানে। এই কাঁটা দিয়ে শীতকালে গ্রামের ছোট মেয়েদের নাক-কান ফোঁড়ানো হয়। কানে দুল, নাকে নথ পরার জন্য। ছোটবেলায় মা দিদিদের কান ফুঁড়িয়েছিল। পূজা তার বড়দির কানে রূপোর রিং দেখে বলেছিল, ‘দিদি, আমার কান কেন ফোঁড়ানো নেই? আমিও তোমার মতো রিং পরব।’ দিদি হেসেছিল। একদিন খেলতে এসে এই কাঁটা ভেঙে পূজার কান ফুঁড়িয়ে দিয়েছিল। পূজা এখন সেই কানে দুল পরে আছে।

গাছের ফাঁক দিয়ে পূজা দেখতে পায় কতগুলো কালো কালো মাথা। পিছন থেকে বিশ্বজিৎ এসে তার কাঁধে হাত রাখল। সে চমকে ঘুরে দাঁড়ায়।

‘এখানে কী দেখছ?’

‘কিছু না।’

‘ওখানে চলো।’ 

দুজনে এগিয়ে যায়। কাছে গিয়ে দেখে সবাই তার চেনা। এখানেই তার দিদির শেষ কাজ হচ্ছে। বড়দির খাটিয়ার পাশে বসে কাঁদছে মেজদি আর সেজদি। বড়দির দুই ছেলে ঘুরেফিরে আসছে। আবার কেউ কিছু কাজ বললে চলে যাচ্ছে। পাড়ার কিছু লোক এসেছে। তাদের মধ্যে কারও মোবাইল বেজে উঠল। সে কাছেই দাঁড়িয়ে কথা বলে চলেছে। গ্রামের মাথা দু-একজন কাজ বোঝাচ্ছে বাকিদের। জামাইবাবু মাথা নিচু করে বসে। দাদা এদিক ওদিক দৌড়োদৌড়ি করে চলেছে। 

দিদি যেন সেজেগুজে ঘুমোচ্ছে। নতুন শাড়ি পরানো। পায়ে আলতা। কপালে চন্দনের ফোঁটা। সিঁথিতে লাল টুকটুকে সিঁদুর। মাথায় তেল দিয়ে সুন্দর করে চুলগুলো আঁচড়ানো। গলায় রজনীগন্ধার মালা। গায়ে আতর ছড়ানো হয়েছে। হাওয়ায় সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে। এখনই চিতায় তোলা হবে। পাশে চিতা সাজানো হচ্ছে।

পূজা পায়ে হাত দিয়ে প্র‌ণাম করে। শোয়া অবস্থায় প্র‌ণাম করলে রেগে যেত বড়দি। বলত, ‘কেউ মরে গেলে এমন প্র‌ণাম করে! আমি কি মরে গেছি!’ বলে পা টেনে নিয়ে ঝেড়ে উঠে পড়ত। এখন আর দিদি রাগ করে উঠে বসবে না। দু’ফোঁটা জল দিদির আলতা পরা পায়ে পড়ল। এক মাথা গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘মড়া ছাড়। সন্ধে হয়ে আসছে, এরপর পোড়াতে দেরি হয়ে যাবে।’

পূজা সরে আসে। সে পোড়ানো দেখতে পারবে না। পোড়ানোর সময় এদিক ওদিক থেকে খোঁচাতে থাকে। যতক্ষণ না মাথা ফাটে ততক্ষণ সবাই দাঁড়িয়ে থাকবে।



পরের দিন ভোর ভোর ঘুম ভেঙে যায় পূজার।

কাল সবাই বাড়ি ফেরার পর বিশ্বজিৎ পূজাকে বলেছিল, ‘চলো, আমরা চলে যাই। এখানে থেকে আর কী করবে?’ 

যায়নি পুজা। রাতটা থেকে গেছে মায়ের কাছে। তার ছেলেটা আছে, তবে গিয়ে তো সেই একই ঘরের কাজ। ঘোমটা টেনে রান্না করে দেওর, ননদ, শ্বশুর, শাশুড়ি সবাইকে খাওয়ানো। শাশুড়ি তো বলবে— যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি আর কষ্ট পেয়ে কী করবে? যার যাওয়ার সময় হবে, তাকে তো যেতেই হবে। কেউ বুঝবে না তার মনের কষ্ট। মুখ শুকনো করে থাকারও অধিকার থাকবে না পূজার। সবার সঙ্গে কথা বলতে হবে। পূজা তাই বরকে রাজি করিয়ে রাতটা থেকে গেছিল। আজই চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি। যাওয়ার আগে খালপাড়টা একবার ঘুরে আসতে চায়।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে পূজা। ভোরবেলা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়— গিয়ে যদি দেখতে পায় বড়দি দাঁড়িয়ে আছে! ছটফটিয়ে ওঠে সে। দেখে মাথার ওপর বিশাল বড় আকাশ। নীচে ফাঁকা মাঠ। হালকা কুয়াশা ঢেকে রেখেছে গ্রামটাকে। গাছপালাগুলো পূজাকে দেখে চুপ করে মুখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। আজ গ্রামটাকে পুলিপিঠের মতো মনে হয় পূজার আর সে নিজে পুলিপিঠের ছই, মানে পুর। এক্ষুনি মুখটা চেপে বন্ধ করে, থালায় সাজিয়ে, কাপড় দিয়ে বেঁধে, ফুটন্ত হাঁড়ির জলে ভাপে বসিয়ে দেওয়া হবে

পূজার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে খালপাড়ের দিকে দৌড়ে যায়। খানিকটা গিয়েই থমকে যেতে হয় তাকে। আরে, নৌকোটাকে তো দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল? কাল তাহলে কী দেখেছিল পূজা? ভুল দেখেছে? নৌকো কি ছিল না? গাছে বাঁধা দড়িটা ছেঁড়া মনে হচ্ছে। না কি দড়িটাও নেই? বাঁধন ছিড়ে চলে গেছে নৌকোটা! কখন গেল? কবে? দড়িটা ছিল কি কোনওদিন?

পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে খালপাড়েই পৌঁছল পূজা। 

না, এখানেও কেউ দাঁড়িয়ে নেই। শুধু কালকের কাঠ পোড়া ছাইগুলো পড়ে আছে।

1 টি মন্তব্য:

  1. অসম্ভব ভাল গল্প।খুব স্পর্শকাতর।পড়তে পড়তে চোখগুলো ছল ছল করে উঠল।আরও গল্প পড়তে চাই।

    উত্তরমুছুন