শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

সাগরিকা রায়ের গল্পঃ রক্ত

ইদানীং শরীরের অভ্যন্তরে একটা অস্বস্তি অনুভূত হয়।
কিছুটা সাপের খোলস ছাড়ার মত অবস্থা । ঠিক এই রকম এক অস্বস্তি নিয়ে যাপন বড় কষ্টদায়ক। অনীশের অবস্থাটা এই রকম । বসে আছে , কি হাঁটছে জনপূর্ণ রাজপথ দিয়ে ,ঝট করে পায়ের পাতা থেকে রক্তস্রোত হুড়োহুড়ি করে উপর দিকে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। ভয়ানক অস্বস্তি । শরীর কি আর বশে থাকে এই অবস্থায় ? ভেবেছিল আজ তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে যাবে । কিন্তু বুকটা এমন ধড়ফড় করে উঠল যে ,কমনরুমে দশমিনিট বসে থাকতে হল । অনুপবাবু ডাস্টার ঝাড়তে ঝাড়তে তাকালেন-কী হল ? বাড়ি যাবেন বলছিলেন ? 

-হ্যাঁ , শরীরটা বড্ড …টায়ার্ড লাগছে ।অনীশ ফ্যাকাশে হাসে । 

-আপনি সুগারটা টেস্ট করান অনীশদা, প্রবীর জীবন বিজ্ঞান পড়ায়।চশমার কাচ মুছছিল রুমাল দিয়ে –মনে হচ্ছে আপনার সুগার হয়েছে । 

-সুগার ? সর্বনাশ ! একগাদা খরচ ! 

-খরচ কমবে বলুন । চিনি , আলু , মিষ্টি , ভাত …সব কমে যাবে । পয়সার সাশ্রয় হবে । হা হা হাসে প্রবীর। 

-না , মাসে মাসে টেস্ট করানো…ঝামেলা ! 

অনুপবাবু চেয়ার টেনে বসতে বসতে তাকালেন–সুগার হয়েছেই ভাবছেন কেন ? তবে ডাক্তার দেখানো দরকার । দুর্বল লাগে বলছিলেন না ? 

, দুর্বল ? তাতো লাগেই । ভেবেছিল বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নেবে । কিন্তু বলাকা ! 

-নাঃ ! উঠি ভাই , আজ আবার ফার্নিচারের দোকানে যেতে হবে । অফার চলছে । একটা গিজার নিয়ে নেব ভাবছি । আর ফার্নিচারের ওখানে সোফাসেটের খোঁজ করব । 

-ঝট করে এতসব ! কী ব্যাপার অনীশদা ?প্রবীর ঘাড় উঁচু করে-মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি ,এখনই এত কিছু ? 

-এক কাজ করুন অনীশ বাবু ,কিনছেনই যখন , ব্রডওয়ে মড্যুলার সোফা নিয়ে নিন । অনুপবাবু বুদ্ধি বাতলে দেন-এখন মড্যুলার ওয়ারড্রোব কিনছে লোকে । দাম একটু বেশি হলেও আভিজাত্য বাড়িয়ে দিচ্ছে । 

বুক ধড়ফড় করে অনীশের । একেবারে বলাকার সুরে গলা মেলাচ্ছেন অনুপবাবু । মড্যুলার কিচেন মড্যুলার কিচেন করে পাগল করে দিচ্ছে বলাকা । কী যে করে অনীশ ! উঠে দাঁড়ায় ও । দেরি হলে বলাকা বিরক্ত হবে । ওর বাপের বাড়ির লোকজন আসার আগেই ঘরদোর সাজিয়ে ফেলতে হবে । 

-আপনার কী ধরণের পছন্দ ? কাঠের চেয়ারের ধরণের? নাকি ভারি ধরণের ? ব্রিটিশ ঘরানা পছন্দ হলে কিন্তু দামটা চড়ার দিকে যাবে । 

-আমার মিসেসের পছন্দ ব্রডওয়ে মড্যুলার সোফা । আমি বলি কি আজকাল কতরকম বেরিয়েছে । হালকার মধ্যে…! এতকাল তো কাঠের চেয়ারেই চলেছে । তবে বলাকা মানে আমার মিসেস বলেন যে প্রেস্টিজ বলে একটা ব্যাপার আছে । যুগ পালটে গেছে । যাপন পদ্ধতিও পালটে গেছে । ওসব মান্ধাতার আমলের মাল এখন চলছে না। বন্ধু বান্ধব আসে। ।তাদের ইন্টেরিওর ডেকরেটর দিয়ে বাড়ি সাজানো । কি সব জিনিস ! । মোমবাতির স্ট্যান্ডটা অব্দি অন্যরকম , হা হা হা ! আমার মা তোবড়ানো বাটি উপুড় করে মোম বসিয়ে দিত ! আমার শ্বশুরবাড়ি আধুনিক মেজাজের । ওর বাবা কবেই মড্যুলার কিচেন করেছেন ।এছাড়া সোফা , ফ্রিজ এসব এখন জলভাত । আমি আসলে ছোট থেকে যেভাবে বড় হয়েছি , নিজেকে পালটাতে পারিনা !কিন্তু বলাকা আত্মীয়-স্বজনদের সামনে লজ্জা পায় আর কি । হীনমন্যতায় ভোগে । হাসে অনীশ । 

-এখন বাড়ির ডিজাইন যেভাবে হচ্ছে , জামা কাপড় চেঞ্জ করার জায়গা নেই । দীপেন রাগত মুখে জলের গেলাস হাতে তোলে । অল্পদিন আগে বাড়ি করেছে ও । প্রবলেম ফেস করছে হয়তো । 

-আমার মতে ড্রয়িং কাম্ ডাইনিং সিস্টেমটা বাজে । বাইরের লোকের সামনে বসে কী খাচ্ছি , ডেকে দেখানো ছাড়া আর কি? 

অনুপবাবু সায় দেন –একটা আলাদা বসার ঘর দরকার । সেপারেট ব্যবস্থা না থাকলে…মুশকিল ফেস করতে হয় । এখন সবারই আছে। 

তা আছে !ভাল লাগে সাজানো গোছানো ঘরে ঢুকতে । বড় বউদি তক্তপোশ সরিয়ে খাট ঢুকিয়ে ছিল ঘরে । এবারে বলাকা ! মেয়ের জন্মদিনের আগে পালটে ফেলতে চায় ও । যাপন পদ্ধতি কি হিসেব করে পালটে ফেলা  যায় ? সেদিন বলাকার মা বাবা , বোন, বোনের বর দেবাশিস , সবাই থাকছে ।বলাকা সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল শুনে । আমন্ত্রণ না জানিয়ে পারেই বা কি করে ? সব ঝাল ঝেড়েছে অনীশের উপর । আসলে বিয়ের পর থেকেই ও বারবার চাপ দিয়েছে । মা ওর কথায় আমল দেয়নি । অনীশ মায়ের দিকটাকে মেনে নিয়েছিল । সত্যিই তো ! কী দরকার পয়সার অপচয় করার ? প্রয়োজন কি কখনো শেষ হয় ? কিন্তু যুদ্ধ ক্রমাগত চালাতে চালাতে দুর্বল হয়ে পড়েছে অনীশ । বলাকার বোনের সাজানো ফ্ল্যাটের পাশে নিজেদের মান্ধাতার আমলের নিম্নবিত্ত মানসিকতার বাড়ি একটা অস্বস্তি নিয়ে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল । এখনও ভেজা গামছা দরজার উপর দলা পাকিয়ে পড়ে থাকে । খেয়ে উঠে কেউ বা পর্দায় ভেজা হাত মুছে নেয়। বলাকা খিটখিট করে অনীশের স্বভাব কিছুটা চেঞ্জ করতে পেরেছে । এখন অনীশের চোখও পালটাচ্ছে । তবু কাঠের চেয়ার কি দোষ করলো ও বুঝতে পারেনা । বলাকা নাক সিঁটকেছিল ওর কথা শুনে । অনীশ ঝামেলা চায়নি । বলেছে- হবে,সব হবে । তবে, একদিনে কি পালটে ফেলা ্যায় ?এতদিনের অভ্যেস বলে কথা ।আস্তে আস্তে পালটে দেব দেখ ! 

কাঁধের উপর থেকে অনীশের হাত সরিয়ে দিয়েছিল বলাকা –আমি কার্পেটের দাম করেছিলাম । সাত হাজার চেয়েছে। দাম কমাবে না । দেবাশিস ওই একই দামে কিনেছে। 

-সা…ত হাজার ? বলে কি লোকগুলো ? ধুর , ওরা ঠকায় ওইভাবে । বিমানদার বাড়িতে কেমন সুন্দর সিন্থেটিক মাদুর দেখে এলাম সেদিন । ফাইন। দরকারে ধুতেও পারবে।এখন অনেকেই অমন ইউজ করছে ।শিশির কিনল দেখলাম । 

-তা…ই ? এমনভাবে তাকায় বলাকা যে সব গোলমাল হতে বাধ্য। 

সর্বনাশ ! এই মুহূর্তে কার্পেটের কথা কেন মনে পড়ল ? গিজার , সোফা প্লাস কার্পেট মিলিয়ে কত দাঁড়াচ্ছে ? নাইলনের মাদুর অবশ্য ইন্সটলমেন্টে পাওয়া  যায় ! তবু বলাকা ওগুলো পছন্দ করবে কিনা ! 

স্কুল থেকে বেরিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে চলেছিল অনীশ ।হাতে সময় আছে। এ সময়ে ফাঁকা জায়গায় হাঁটতে হাঁটতে নিজের সঙ্গে একটু পরামর্শ করা যাবে। যেমন , মেয়ের জন্মদিনে কতজন লোক নিমন্ত্রিত হবে , বলাকা বলেছিল , বাবা হয়ে মেয়ের জন্য ভাল বার্থডে গিফট আনা উচিত ।পাঁচ জন দেখবে ! তো সেটা নিয়েও ভাবা উচিত । একটা ড্রেস হাজার দুইএর নীচে হবেনা বলেছে বলাকা ।এখন ঘটনা হল ড্রেসটা নাকি ঠিক গিফট নয়। গিফট বিষয়টা অন্যরকম । টেডি বিয়ার বা অন্য কিছু যেমন ট্যাব , কিন্ডেল… ! কত কিছু জানে বলাকা ! মা এত জানতো না বলে বাবা সুখে জীবন কাটাচ্ছে এখনো ।  

-অনীশদা ! বাবাঃ ! এত কি ভাবতে ভাবতে চলেছেন ? ক…খন থেকে ডাকছি ! লং কামিজ আর লেগিন্সে রীহা আরও ঝলমলে । ও আজকাল এসব পোশাক পরে নাকি ? 

-তোমাকে চেনাই যাচ্ছে না । তুমি সত্যি রীহা তো ? 

-ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছি । তারপরে যাব  টিটি তে । টেবল টেনিস । ও দারুণ খেলছে এখন । রাজ্যস্তরে খেলছে । 

তোমার ছেলে ? কত বয়স হল ?আট না সাত ? 

হেসে ফেলে রীহা --বারো মশাই । আসা যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন কেন ? ব্যস্ত ? 
হাসতে হাসতে ,কথা বলতে বলতে যাচ্ছে রীহা। অনীশ অবাক হয় । সেই শাড়ি পরা জড়োসড়ো রীহা কেমন স্বচ্ছন্দ ! স্টেপ কাট দুলিয়ে হাসছে । ফাঙ্কি সাঙ্কি চশমা চোখে। ফলস নাকি ? কে জানে ! কত পালটে গেছে চারপাশ। সবাই পালটে নিচ্ছে নিজেকে ।কবে এসব ঠিক হল ?ও কেন এই পরিবর্তিত  পরিস্থিতির কথাটা জানতে পারেনি ? 

সোফা নামক বস্তুটি কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শরীর আরও খারাপ বোধ হতে লাগল । বলাকাকে বলতে গিয়েও পারেনি । অযথা চিন্তা করবে । কিন্তু এখন না বলেও উপায় নেই । শরীর ঝিমঝিম করছে । রিকশায় বসেই বলাকা বুঝে ফেলল অনীশ অসুস্থ ।  

-কী হল ? বলাকা উদগ্রীব হল । 

-দুর্বল লাগছে খুব । 

-তাহলে , আজই চল ডাক্তার দত্তর চেম্বারে । ফার্নিচারগুলো নামিয়ে সুদীপকে নিয়ে চলে যাও । 

ডাক্তার দত্তর চেম্বারে পৌঁছে শরীরটা বশে থাকতে চাইছিল না । সুদীপ অবস্থা দেখে ভয় পেল । ঝট করে এমন হবে ভাবতে পারেনি । ডাক্তার আশানুরূপ কথাও বললেন না । পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানালেন-- রক্ত শূন্যতা । অ্যানিমিক । রক্ত দিতে হবে । তার আগে একটা পরীক্ষা করতে হবে । 

অনীশ অসহায় চোখে তাকাল ।ওষুধের গন্ধ ভরা চেম্বারে দম বন্ধ হয়ে আসছিল ওর । সুদীপ ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে । কবে নাগাদ পরীক্ষা করাতে হবে , তাই জানতে চাইছে । 

-পারলে আজ করিয়ে নিন । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব । খস খস শব্দে প্রেসক্রিপশন রচিত হচ্ছে । অনীশ টাকা গোনার শব্দ পাচ্ছিল । 

-ডাক্তারবাবু , আপনি কী সন্দেহ করছেন ? গলা কাঁপে অনীশের । 

-সন্দেহ কিছু নয় । আপনার শরীরে হিমোগ্লোবিনের অভাব হয়েছে । হিমোগ্লোবিনটা পরীক্ষা করাতে হবে । 

-হিমোগ্লোবিন !ফ্যাসফ্যাস করে অনীশ । 

-ইয়েস । দেখুন , রক্ত এমন একটা সাবজেক্ট , যার মধ্যে লোহিত ও শ্বেত কণিকা থাকে । রেড অ্যন্ড হোয়াইট সেল । এখন হমোগ্লোবিন অক্সিজেন বহনের কাজ করে বলে শুদ্ধ রক্ত দেখায় টকটকে লাল । যদি হিমোগ্লোবিন 100 ml রক্তে 15 gmথাকে , তবে দেহ সুস্থ বুঝতে হবে । কিন্তু 100ml রক্তে 7gm হলে রক্তশূণ্যতার পূর্বাভাস বলা  যায় ।  

-যদি আরও কমে  যায় ? অনীশ পায়ের নীচে টলমলে মাটি অনুভব করে ।  

-আরও বলতে 100ml রক্তে 5gm । এটি ভাল নয় । তাই বলছিলাম রক্ত পরীক্ষা করতে । 

-তাহলে রক্ত নিতে হবে ? মানে ওই হিমোগ্লোবিনের কথাটা আর কি ! সুদীপ কাঁচুমাচু মুখ করে । হিস্ট্রির ছাত্র এর বেশি এগোতে সাহস পায় না । 

-মনে হচ্ছে । তবে হোয়াইট সেলের মাত্রা ঠিক আছে । 

চেম্বার থেকে বের হতে হতে মানিব্যাগটা পকেটে পোরে অনীশ । কার মুখ দেখে যে উঠেছিল আজ !ব্যাগটা ঘন ঘন বের হচ্ছে পকেট থেকে । 

-ডাক্তার দাসগুপ্তর প্যাথলজিতে  যাই চল ।সুদীপ দাঁড়িয়ে পড়ে ।  

-এখন থাক , 

-ভয় কী ?যত চটপট হয় , তত ভাল । 
সুদীপের জুলুমে বাধ্য হল অনীশ । সূচের মুখে রক্ত উঠে কাচের শিশিতে জমা হল । নাম যদি উলটে যায় , এরা মনে রাখবে কী করে কার রক্ত কোনটা ?এই সময়ে একটা অদ্ভুত কথা মনে এল অনীশের । যদিও চিনচিনে একটা অনুভূতি ছিল , তবু যে ছেলেটি রক্ত নিয়ে গম্ভীর মুখে চলে যাচ্ছে , তার দিকে তাকিয়ে কথাটা কেন যে মনে এল ! আর এল তো এল , জিগ্যেস না করে পারল না-আচ্ছা , কত বছর আপনি এখানে আছেন ?  

-পাঁচ । ছেলেটির নির্লিপ্ত স্বর । 

- তাহলে , আপনি অনেক রকম রক্ত দেখেছেন নিশ্চয় ? এক একটি মানুষের এক একরকম রক্ত ! সব রক্ত কি একই রকম ? 

-হুঁ। ছেলেটি অনীশের দিকে তাকাল না পর্যন্ত , উপর থেকে সবই এক । 

কাছে এগিয়ে যায় অনীশ ।অনেক জানে ছেলেটি ।এমন একটি মানুষকেই ও খুঁজছিল মনে মনে ।চারপাশে এত যে পরিবর্তন , সে কি রক্তের ছোঁয়ায় ? বিশেষ একটি রক্ত যে স্লাইডে ছিল , তা কি অন্য রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল । কী পাওয়ার নেশায় চারপাশে এত পরিবর্তন ? কী খোঁজে মানুষ ?বনেদিয়ানা ? কার রক্ত মিশে গেছে সর্বত্র ?  

-আপনি নীল রক্ত দেখেছেন ? ফিসফিস করে অনীশ । গলা কাঁপে উত্তেজনায়। 

-দেখেছি । ছেলেটি কী একটা কাজ করতে করতে চোখ না তুলেই জবাব দেয়। 

-সত্যি ? কোথায় দেখেছেন ?   

-অতো মনে নেই । তবে আপনিও দেখতে পারেন । অসম্ভব কিছু নয় । যদি রক্তের মধ্যে অক্সিজেন কম থাকে , কার্বন ডাই অক্সাইড বেশি থাকে , তখন রক্ত খানিকটা নীলচে হয়ে ্যায় 

সুদীপ দাঁড়াতে চাইছিল না । সন্ধেতে টিউশনি আছে ওর । কাল সকাল দশটার দিকে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। অনীশ রাস্তায় নেমে চারপাশে তাকাল । অটো নেই । রিকশাও । হেঁটে অদ্দূর যাওয়া! 

-_এই জন্য বলি একটা বাইক কিনে নাও । এখন সবারই চার চাকা আছে। সুদীপ ভ্রু কুঁচকে তাকাল । ওর দৃষ্টি দেখে শিরশির করে সুঁচফোটা জায়গাটা । সুদীপও কি পালটে যাচ্ছে নাকি ? বলাকার মত ? খোলস ছাড়ছে সাপ । শব্দ পায় অনীশ । 

-সবার গাড়ি ? 

-তো ? ছোট ছোট গাড়ি দেখনা পথে ঘাটে ? এখন সাইকেলের জায়গা নিয়েছে গাড়ি । কম পক্ষে বাইক তো থাকবে ! লাইফ স্টাইল অন্য রকম হয়ে গেছে দাদা । 

হাসি চাপতে না পেরে অন্য দিকে তাকাল অনীশ । বাবা শুনলে বলবে – ছাল নেই কুত্তার বাঘা নাম ! 

-তুমি কী করবে ? বাড়ি চলে যাও । পারবে ? 

-হ্যাঁ , পারবো । একটা রিকশা দেখি… 

সুদীপই রিকশা ডাকল । উঠেও বসল পাশে । মাঝ রাস্তায় নেমে যাবে । 

সন্ধের বাতাসে কিসের যেন গন্ধ মিশে থাকে । চারদিক থমথমে । মনটা ঠান্ডা হয়ে যায় । বলাকা হয়তো এতক্ষণে ঘর গুছিয়ে ফেলেছে । ওর বহুদিনের শখ –একটা ড্রয়িং রুম না হলে…মন খারাপ করতো ও। আসলে যেখানেই যায়, ড্রয়িং কাম্ ডাইনিং হলটা কেমন সাজানো গোছানো দেখে অর্থের গন্ধ নাকে ঠেকতো । হোস্টের কথায় , হাবেভাবে অহম মিশে আছে দেখত । হয়তো হীনমন্যতায় ভুগতো বলাকা । হতেই পারে বোনের সামনেই সেই রোগ চাগাড় দেয় । আর তাই এমন মন খারাপ করা ! 

ড্রয়িংরুমে দামী পেইন্টিং , কালো কাচের সেন্টার টেবিলে গোছানো নানাবিধ ম্যাগাজিন এসবই এখন জীবনযাত্রার অঙ্গ ।বলাকা একটু আগে বুঝেছে । অনীশ বেশ দেরিতে । নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উত্তরণ একটা কম্পিটিশন ছাড়া আর কী ? 

-আমি নেমে যাচ্ছি , তুমি সাবধানে যেও । সুদীপ নেমে গেল । বাড়ি বেশি দূরে নয় । 

বাইরের পর্দা পালটে ফেলেছে বলাকা ।এটা আবার কবে কিনলো ? ঘরে ঢুকে চমকে গেল অনীশ ।বাঃ ! পুবের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে সোফাসেট । সাদা লেসের ঢাকনা পড়েছে তাতে । মাঝে টেবিল । কালো কাচের সেন্টার টেবিল বলাকার বোনের বাড়িতেও আছে ।কিছু ম্যাগাজিন রাখতে হবে ওখানে । কিছু বই আছে । সেগুলো রাখলে কেমন হয় ? মেঝের দিকে তাকাতেই মন খিঁচড়ে গেল । নতুন মাদুরটা মেঝেতে ফেলে রেখেছে কে ?নিশ্চয় মনা !মেয়েটা বড় অগোছালো । অনীশ ত্বরিতে মেঝে থেকে মাদুর গুটিয়ে দরজার কোনে রেখে দিল । 

-ওমা , তুমি কখন এলে ?ডাক্তার কী বললেন ?বলাকার ঝলমলে মুখ অনীশকে নয় , ঘরকে নিরীক্ষণ করছিল ।যেন অন্যের বাড়ি দেখছে এভাবে নিজের ঘর পরীক্ষা করে ও । তারপরই চমকে ওঠে- এ কি ?মাদুর কোথায়? মেঝেতে পেতে রেখেছিলাম । কি সুন্দর দেখাচ্ছিল ! দরজার কোন থেকে ফের গোটানো মাদুর খুলে মেঝেতে পেতে দেয় বলাকা ।মনেমনে জিভ কাটে অনীশ। পালটে যাওয়া একদিনে সম্ভব নয় । 

বাড়ি ফিরে খবর দিল সুদীপ । ফেরার পথে ডাক্তার দাশগুপ্তের প্যাথলজি ল্যাব হয়ে এসেছে ও । রিপোর্ট রেডি ছিল । রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তার দত্তর কাছেও গিয়েছিল । রক্তে হিমোগ্লোবিনের পারসেন্টিজ কম আছে । রক্ত নিতে হবে । 

-রক্ত ? পাব কোথায় ? 

-পলাশের কাছে যাব ভাবছি । 

-পলাশ ? 

-আমার বন্ধু । ঠেকে আসে মাঝে মধ্যে ।বড়লোক । শখ চেপেছিল রক্ত দান করবে ।দেখি , শখটা আছে কিনা এখনও । নয়তো অন্য ব্যবস্থা করবো । ও পজেটিভ । সবসময় পাওয়া যায় । পলাশ ভাল ছেলে । বনেদি বড়লোক । পূর্বপুরুষ জমিদার ছিল । নীল রক্তের লোক ওরা । 

-অত বড়লোক ! দেবে ? 

-তো কি ?আমাদের কাজ হল যেনতেন প্রকারেণ কাজ হাসিল করা । বড়লোক হলে অসুবিধে কী ? 

সব শুনে স্তব্ধ হয়ে পড়ে অনীশ । আগামী কালই রক্ত নিতে হবে ?নীল রক্ত ? 

-হ্যাঁ দাদা।দেরি করে লাভ কী ? 

লাভ নেই জানে অনীশ । নার্সিং হোমের বেডে শুয়েও অস্বস্তি যায় না । হাসপাতালে না নিয়ে এখানে আনার কী দরকার ছিল ? বাজে খরচ !তবে পলাশ ছেলেটি বড্ড আমুদে ।এত বড়লোক বোঝা যায় না। অনীশ দেখে সরু পাইপ বেয়ে নীল রক্ত ওর শরীরে ঢুকছে । তীব্র অস্বস্তি হচ্ছিল । নীল কেন রক্তটা ? কার্বন ডাই অক্সাইড বেশি আছে বলে ?ডাক্তার দত্ত অবাক হলেন অনীশের অস্বস্তি দেখে । কোন অসুবিধে নেই । তবু রক্ত যেন স্বচ্ছন্দ গতি পাচ্ছে না !অন্য শরীরে স্বাভাবিক ভাবে বিচরণ করতে পারছে না । 

-কী হল ? কোন অসুবিধে ? 

-না , ঠিক আছে । অনীশ ধাতস্থ হচ্ছিল । বুঝতে পারছিল পলাশের শরীর থেকে রক্ত এসে ওর শিরার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে । এবার লাংসে যাবে । অক্সিজেন নিয়ে কার্বনডাই অক্সাইড ছেড়ে লাল রক্ত হয়ে হার্টে ফিরে আসবে । আসলে নীল রক্ত শরীরে অস্বস্তি সৃষ্টি করছে । রক্তের মধ্যের তরঙ্গ তাই পালটাতে সময় নিচ্ছে । চিত্র বিচিত্র রূপে পালটাচ্ছে তরঙ্গ । তবে সময় নিচ্ছে বড্ড । 

স্বাভাবিক । এত তাড়াতাড়ি সব পালটে ফেলা সম্ভব কি ?  





1 টি মন্তব্য: