শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

একটি প্রেমের গল্প II জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা

এমনিতে ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে পারি| কোনো ঝামেলা নেই| শুধু শপিং -এ গেলেই হাজার খানিক সমস্যায় পড়ে যাই! এই তো, গত সপ্তাহে প্লাজায় গিয়েই শুরু হয়ে গেলো পা ব্যথা, কোমর ব্যথা| বসে পড়লাম প্লাজায় রাখা লম্বা একটি বেঞ্চে|
বসার বেশ কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করলাম~ বেঞ্চের অপরদিকে একজন বয়স্ক (আশি-পঁচাশি বছর হবে হয়তো) লোক বসে আছেন| হয়তো সেভাবে খেয়ালও করতাম না কিন্তু দেখি~ তিনি বারবার আমার হাতের দিকে তাকাচ্ছেন আর মুচকি মুচকি হাসছেন! কিছুই বুঝলাম না, কাহিনী কোথায়? হাতে নাকি আমার হাতে ধরা ব্যাগে? ভালো করে তাকিয়েও অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে পেলাম না| পরে ভেবে নিলাম, বয়স্ক মানুষ ~ এমনিতেই হয়তো হাসছেন আর মাথা দোলাচ্ছেন!

কিন্তু না;  'এবার ওঠা যায়' ভেবে যেই না উঠে দাঁড়ালাম, অমনি সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন| অবাক হয়ে বললাম~

- কাকে বলছো? আমাকে?!

-- হ্যাঁ, তোমাকেই| কি নাম তোমার?

- হঠাৎ আমার নাম জিজ্ঞেস করছ কেন! তুমি কি আমায় চেনো?

-- নাহ তোমাকে চিনি না| তবে তোমার আঙুলের মতো আঙ্গুল ছিল এমন একটি ইতালিয়ান মেয়েকে চিনতাম...ষাট বছর আগে|

- বলো কি! আমার আঙুলের মতো আঙ্গুল তো কোনো ইতালিয়ান মেয়ের হওয়ার কথা নয়! আমি বাদামি, আমার আঙ্গুলও বাদামি| ইতালিয়ান মেয়ের আঙ্গুল সাদা ছিল, নিশ্চয়ই? ... সম্ভবত ষাট বছর আগে দেখা সেই মেয়েটিকে হঠাৎ কোনো কারণে তোমার মনে পড়ে গিয়েছে, তাই না?

-- হ্যাঁ তা তো অবশ্যই| তোমাকে মানে তোমার আঙ্গুলগুলো দেখেই তাকে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো! যতদূর মনে করতে পারি, গত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরে তাকে একবারও মনে পড়েনি| আজ মনে পড়লো! ....তার সাথে কিভাবে পরিচয় জানো? ঠিক পরিচয়ও অবশ্য নয় ..

- কিভাবে? (আবার বেঞ্চে বসে পড়তে পড়তে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম)

-- তখন আমি ইতালির একটা গ্রামে থাকি| আমাদের গ্রামের বাইরে বেশ দূরের একটি গ্রামে গিয়েছিলাম একদিন, সাইকেল চালিয়ে| একটা কাজে| ফেরার পথে হঠাৎ ঝড়ের আভাস দেখা দিলো| ভীষণ বাতাস| আমি রাস্তা থেকে নেমে একটা বাড়ির উইন্ডো-শেডে দাঁড়ালাম| বাড়িটা বেশ উঁচু মাটি থেকে| মিনিট দুয়েক দাঁড়াতেই দেখলাম সরু সরু দুইটা সাদা ধবধবে মেয়েলি হাত গাঢ় সবুজ একটি জানালার কপাট বন্ধ করবার চেষ্টা করছে| ঘরের ভেতর সম্ভবত অন্ধকার ছিল| নিচ থেকে ওই স্বল্প সময়ের চেষ্টায় তাই মেয়েটির মুখ দেখতে পাইনি, ভালো করে| তবে বাতাসের কারণে কপাট দ্রুত বন্ধ করতে পারছিলো না, তাই হাতদুটি দেখবার সুযোগ হলো বেশ সময় নিয়ে| সাদা পেলিকনের বুকের পশম দেখেছো খেয়াল করে? ঠিক তেমন পেলব মসৃন তার হাত! আঙ্গুলগুলিও ছিল চিকন লম্বা লম্বা| মুহূর্তে কি যেন ঘটে গেল আমার ভেতর! সবাই হাসবে শুনলে, কিন্তু সত্যিই আমি মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেলাম|

- কি আশ্চর্য! যার প্রেমে পড়েছিলে, তাকে এই রিসেন্ট ৩০-৩৫ বছরে একবারও আর মনে পড়েনি?!?

-- হ্যাঁ ভুল নেই কোনো! প্রেমেই পড়েছিলাম| তবে অদ্ভুত কথা কি জানো?

- কী?

-- তাঁকে আমি আর কখনোই দেখিনি! হাজার চেষ্টাতেও তাঁর কোনো খোঁজ আমি বের করতে পারিনি!

- কেন? ঐ বাসায় নক করলেই তো হয়ে যেত!

-- আমিও তাই ভেবেছিলাম| সেই ভেবেই সেদিন ঘন্টাখানিকের ঝড়-শেষে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম| এক সপ্তাহ নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া শেষ করে যখন নিশ্চিত হলাম, ঐ মেয়েটির সাথে পরিচিত হতেই হবে ~ তখন আবার গেলাম সেই  বাড়িতে|

- তারপর? বললে তাকে সবকিছু?

-- আহা শোনই না! ...ওটা ছিল এক বৃদ্ধা মহিলার বাড়ি| ওখানে উনি অনেককেই গ্রীষ্ম-যাপনের জন্য থাকতে দিতেন| ওই বাড়িতে নক করে জানতে পারলাম ~ ক'দিন আগে মিলান শহর থেকে একটি পরিবার এসেছিল| তাদের ১৬-১৭ বছর বয়সী একমাত্র কন্যা ছিল সে সফরে| বৃদ্ধা (বাড়ির মালিক) সে অতিথি পরিবারের সদস্যদের নাম কষ্টেসৃষ্টি মনে করতে পারলেও, তাদের কোনো ঠিকানা বলতে পারেননি!

- ওহ হো ...

--আমি এর পরের পাঁচ বছর আমার ঠিকানা বদলে মিলান শহরেই আমার পরবর্তী আস্তানা গড়লাম| উদ্দেশ্য একটাই! বুঝেছো নিশ্চয়ই! ওই পাঁচ বছর তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম তাকে| কিন্তু না; পাইনি! কিংবা হয়তো পেয়েছি, বাস্তবে আর চিনতে পারিনি| আসলে একটা চরিত্রের বেশির ভাগটাই যখন কল্পনা করে নিতে হয়, সে 'চরিত্র'টি কখনোই আর 'বাস্তব' এর হয়ে ওঠে না...

- তাহলে ... তাকে তুমি আর কখনোই দেখোনি?

-- নাহ... কখনোই আর দেখিনি ... ৫ বছর পর তার আশা যখন সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছি, ঠিক তখন চমৎকার একটি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়| আমরা বিয়ে করি| জানো, বিয়ের পর আমার স্ত্রীকে ঐ মেয়েটির কথা বলেছিলাম|

- শুনে কি বললেন উনি ..?

-- হো হো করে হাসলো কিছুক্ষণ! তারপর বললো, তুমি আর কিছুদিন পরেই মেয়েটিকে ভুলে যাবে! ভুলে যাবে, কারণ আমরা খুব সুখী একটা দম্পতি হবো! আমরা দুজনই দুজনকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকবো যে অন্য কোনো সুন্দর অঙ্গুলি সমৃদ্ধ তরুণীর কথা ভাবতে ভুলেই যাবো|

- তারপরও একটু একটু মনে পড়েছিল তাকে? ৩০-৩৫ বছর আগে..?

-- নাহ ... অদ্ভুত হলেও সত্যি ~ সেভাবে কখনো আর মনে পড়েনি! মাঝে মাঝে রোজলিন (আমার স্ত্রী) নিজেই মনে করিয়ে দিতো, আমরা দুজনই একটু খুনসুটি করতাম ~ এই এটুকুই! আসলেই 'সুখী বাস্তব জীবন' পুরোনো যেকোনো অপ্রাপ্তিই ভুলিয়ে দেয়!

- কিন্তু আজ? আজ কি বলবে তাকে? আজ যে এমনিতেই মনে পড়ে গেলো অদেখা সেই মেয়েটিকে!

-- হুম ভাবছি ...! কি বলবো তাকে! হয়তো কিছুই বলা লাগবে না! আমাকে হঠাৎ ওর কাছে যেতে দেখে নিজেই হয়তো সব বুঝে নেবে|

- হঠাৎ যাবে কেন? তোমরা কি এক জায়গায় থাকো না?

-- ওহ, তোমাকে বলিনি? রোজলিন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে! ৩০ বছর আগে! আমি ওর কাছে যাই বছরে ৩ বার| ও আগেই বলে দিয়েছিলো এর বেশি যাওয়া যাবে না! যাই ওর জন্মদিনে, আমাদের 'ম্যারেজ ডে'তে আর ওর চলে যাবার দিনটিতে.... ওর প্রিয় হোয়াইট রোজ নিয়ে|

- মানে..?

-- একটা খুব আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে জানো, যখন ওর সাথে দেখা করতে যাই? আমি যাই ভর দুপুরে| পুরো একটা শান্ত নিরিবিলি সময়ে| হ্যাঁ কেউ থাকে না, আমাদের মাঝে| কিন্তু প্রতিবারই আমি ওর কাছে গিয়ে বসবার সাথে সাথে একজোড়া ম্যাগপাই উড়ে আসে! কোত্থেকে যেন উড়ে এসে তারা রোজলিন এর এপিটাফ এর উপরে নয়তো বা আমার কাছাকাছি কোথাও চুপ করে বসে ...!!

ভদ্রলোক হঠাৎ খুব তাড়াহুড়ায় বিদায় নিয়ে চলে গেলেন| তাঁকে গ্রেভ ইয়ার্ডে যেতে হবে|

৩টি মন্তব্য:

  1. খুব মিষ্টি একটা লেখা। হুহু করে একটা দমকা বাতাস এসে কোন সুদূরে নিয়ে যায়!

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পটি এক নিমিষেই পড়ে নিলাম কিন্তু রেশ থেকে গেল দীর্ঘ সময়ের।

    উত্তরমুছুন