বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

রমানাথ রায়'এর গল্প : একটা গল্প বলি

শুনুন, একটা গল্প বলি। গল্পটা এই: একটা লোক ছিল। লোকটার একটা ভাল নাম ছিল। কিন্তু সেই নামে তাকে কেউ ডাকে না। সবাই তাকে ঠাট্টা করে পাপোশ বলে ডাকে। আমিও এখানে তার এই পাপোশ নামটাই রেখে দিলাম। পাপোশ চাকরি করে। একটা ফ্ল্যাটে থাকে। ফ্ল্যাটে তার বউ আছে, পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে। অথচ মনে তার সুখ নেই। বউ দিনরাত অসুখে ভোগে। সব সময় বিছানায় পড়ে থাকে। আর ছেলেটা একটু যেন হাবাগোবা। এদের নিয়ে দিন কাটাতে কাটাতে পাপোশ একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ল।

সংসারের ওপর তার ঘেন্না ধরে গেল। ঠিক করল, হয় সে সন্ন্যাসী হবে, নয় সে আর একটা বিয়ে করবে। তবে সন্ন্যাসী হওয়ার চেয়ে বিয়ে করা অনেক সহজ। সে তাই ভেবেচিন্তে বিয়ে করবে বলে ঠিক করল। কিন্তু বউ বেঁচে থাকতে আবার কি বিয়ে করা যায়? এক উকিল বন্ধু বলল, বউ যদি কোর্টে স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ না করে, তা হলে একটা কেন, একাধিক বিয়ে একজন করতে পারে। নালিশ না করলেই হল। কথাটা পাপোশের মনে ধরল।

একদিন পাপোশ বউকে বলল, আমি আবার বিয়ে করতে চাই। বউ আকাশ থেকে পড়ল, কেন?

— তুমি অসুস্থ। সংসার চালানোর ক্ষমতা তোমার নেই।

বউ হতবাক হয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্বামী কোনওদিন তাকে এ রকম একটা কথা বলতে পারে তা সে কল্পনা করতে পারেনি। তবে সে বেশ কিছুদিন ধরে বুঝতে পারছিল, তার ওপর স্বামীর আর আগের মতো টান নেই। তার দিকে তাকিয়ে আর হাসে না। তার পাশে বসে আর গল্প করে না। সে মাঝে মাঝে পেটের ব্যথায় ছটফট করে। তার তখন কাজ করা দূরে থাক, ওঠাবসার ক্ষমতা পর্যন্ত থাকে না। অথচ স্বামীর এ নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। কোনওদিন একটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় না। তার বাপের বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ। তাই তাকে মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়। ফলে স্বামী বিয়ে করলে তার কিছু করার নেই। তার চোখ ফেটে প্রায় জল চলে এল।

পাপোশ বউকে চুপ করে থাকতে দেখে অধৈর্য হয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, কী হল? চুপ করে রইলে কেন? কিছু বলো। বউ চোখের জল চেপে বলল, কী বলব?

— আমি আর একটা বউ ঘরে আনতে চাই। তোমার আপত্তি নেই তো?

বউ আর চোখের জল সামলাতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি তোমার কী করেছি? তুমি আবার বিয়ে করবে কেন?

পাপোশ নির্বিকার কণ্ঠে বলল, তোমাকে নিয়ে আমি আর শান্তি পাচ্ছি না। তাই আমি আবার বিয়ে করব।

— তা হলে তাই করো।

— হ্যাঁ, তাই করব। তবে একটা কথা বলে রাখি, বিয়ের পর আমার বিরুদ্ধে কোর্টে গিয়ে নালিশ করলে ভাল হবে না। তোমার এখানে থাকা-খাওয়া চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। বুঝতে পেরেছ?

বাপের বাড়ির ওপর বউয়ের ভরসা নেই, সে তাই বলল, আচ্ছা।


পাত্রী ঠিক করাই আছে। সামনের ফ্ল্যাটে থাকে। নাম ঝর্না। বয়স ছাব্বিশ। ফরসা রং। হলদে দাঁত। ছোট ছোট চোখ। লেখাপড়া বিশেষ হয়নি। কোনও রকমে বি এ পাশ করে বসে আছে। সংসারে আছে বিধবা মা আর এক দাদা। দাদা সাধারণ চাকরি করে। সংসার ঠিকমতো চালাতে পারে না। পাপোশের কাছে মাঝে মাঝে টাকা ধার নেয়। ফলে পাপোশের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলার ক্ষমতা তার নেই। তার চোখের সামনে বোন পাপোশের সঙ্গে বসে বসে গল্প করে। ঘুরে বেড়ায়। তার খারাপ লাগে। অথচ কিছু বলতে পারে না। চুপ করে থাকে। সে বোনের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। নানা সম্বন্ধ নিয়ে আসে। তবে পাপোশ সব সম্বন্ধ ভেঙে দেয়। সে ঝর্নাকে কারও হাতে তুলে দিতে পারবে না। কারণ, সে ঝর্নাকে ভালবাসে। সে ঝর্নাকে বিয়ে করতে চায়। তবে সে কতদিন ঝর্নার বিয়ে আটকে রাখবে? সে সমস্যায় পড়ে গেল। ভাবতে লাগল কী করা যায়!

একদিন পাপোশ চানাচুর খেতে খেতে ঝর্নাকে বলল, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে। ঝর্না জিজ্ঞেস করল, কী কথা?

— আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

— এ তো খুব ভাল কথা। তবে তার আগে তোমার ওই বউটাকে তো ডিভোর্স করা দরকার।

— ডিভোর্সের দরকার নেই। বউকে জিজ্ঞেস করেছি। আমার বিয়েতে বউয়ের আপত্তি নেই।

— এখন বলছে আপত্তি নেই। আমাদের বিয়ের পরে তোমার বউ যদি কোর্টে গিয়ে নালিশ করে?

— সে সাহস ওর হবে না।

— আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। আমাকে বিয়ে করতে হলে হয় বউকে মেরে ফেলতে হবে, নয় ডিভোর্স করতে হবে।

— এ দুটোর কোনওটারই দরকার নেই।

— দরকার আছে।

— এ নিয়ে জেদ কোরো না। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব।

— তা হলে এক কাজ করো।

— কী?

— বিয়ে না করে এখন আমরা যেমন দিন কাটাচ্ছি সে ভাবেই সারাজীবন কাটিয়ে দেব।

— সে হয় না।

— কেন?

— তোমার মা যদি তোমাকে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন!

— দিলে কী যায় আসে! আমি স্বামীর ঘর করব নাকি! বিয়ের পর থানায় গিয়ে স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদের বিরুদ্ধে এফ আই আর করে বাড়ি চলে আসব। ঠেলা বুঝবে। আইন এখন মেয়েদের পক্ষে। আমাকে যে বিয়ে করবে সেই বিপদে পড়ে যাবে।

পাপোশ এ কথা শুনে খুশি হয়ে বলল, কিন্তু স্বামীকে পেয়ে আমাকে যদি ভুলে যাও! ঝর্না হেসে বলল, তোমাকে কি ভোলা যায়! বলে একটু থেমে বলল, তবে তুমি এ নিয়ে মার সঙ্গে আলোচনা করতে পারো।


পাপোশ একদিন কপাল ঠুকে ঝর্নার মার সঙ্গে দেখা করল, দেখা করে প্রথমেই কথাটা তুলল না। না তুলে প্রথমে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন?

— ভাল না।

— কেন?

— হাঁটুতে বাতের ব্যথা।

— ঠিক মতো ওষুঝ খাচ্ছেন তো?

— খাচ্ছি। কিন্তু সারছে না।

তারপর আরও নানা কথা বলতে বলতে পাপোশ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ঝর্নার বিয়ে দেবেন না?

— দেব। কিন্তু ও বিয়ে করতে চাইছে না। ওর জন্যে বড় চিন্তা হয়। ওর কপালে কী যে আছে তা জানি না।

— ওর জন্যে ভাববেন না। আমি তো আছি।

ঝর্নার মা কথাটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, তার মানে? পাপোশ ঢোক গিলে বলল, আপনার যদি আপত্তি না থাকে তা হলে আমি ওকে বিয়ে করতে পারি।

এ কথায় ঝর্নার মা স্তম্ভিত হয়ে গেল। পাপোশের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এমন চিন্তা ওর মাথায় এল কী করে? ঝর্নার মা উত্তেজিত হয়ে বলল, না, এ হয় না। পাপোশ নাছোড়বান্দা। জিজ্ঞেস করল, কেন হয় না?

— ঘরে তোমার বউ আছে, ছেলে আছে। তোমার সঙ্গে কী করে আমার মেয়ের বিয়ে দেব?

— আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। আমার বউ এ বিয়েতে কোনও আপত্তি করবে না।

— আজ হয়তো করবে না। দু’ দিন পরে করবে।

— করবে না। ওর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।

— যতই কথা হোক, তোমার বউ যতদিন বেঁচে আছে, ততদিন তোমার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।

এ কথায় পাপোশ রেগে গেল। বলল, আপনাদের আপদে-বিপদে আমি কত সাহায্য করে থাকি। অথচ আমার দরকারে আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারছেন না! আপনার মধ্যে কোনও কৃতজ্ঞতা বোধ নেই! ঝর্নার মাও রেগে গেল। বলল, কী বলতে চাও তুমি? আমাদের মাঝে মাঝে টাকা দিয়ে সাহায্য করো বলে, তুমি যা বলবে তাই করতে হবে?

— হ্যাঁ, তাই করতে হবে।

— তা হয় না। আমি তা পারব না।

— পারব না বললে হবে না। পারতে হবে। নইলে আর কোনওদিন কোনও সাহায্য আমার কাছ থেকে পাবেন না।

ঝর্নার মা তা শুনে একটু চিন্তা করে বলল, তা হলে এক কাজ করো। পাপোশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী?

— তোমার বউ তো অসুস্থ। বেশিদিন বোধহয় বাঁচবে না। বাঁচবে?

— না। বেশিদিন বাঁচবে না।

— তা হলে না-মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। বউ মরে গেলে ঝর্নাকে বিয়ে কোরো। তখন আমার আপত্তি থাকবে না।

— তার মানে আপনি এখন ঝর্নাকে আমার হাতে তুলে দেবেন না?

— না।

পাপোশ বুঝতে পারল কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তার কপালে ঝর্না নেই। সে মন খারাপ করে নিজের ফ্ল্যাটে চলে এল। ঝর্নার মা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। ছেলেকে ডেকে সব কথা খুলে বলল। বলে জিজ্ঞেস করল, এখন আমাদের কী করা উচিত? ঝর্নার দাদা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল, তুমি কী করতে চাও?

— আর দেরি নয়। এখনই ঝর্নার বিয়ে দেওয়া উচিত।

— ও যদি আপত্তি করে?

— করুক। তুই আজ থেকে ওর বিয়ের চেষ্টা কর।


অনেক কষ্টে হাতে-পায়ে ধরে একটা পাত্র পাওয়া গেল। পাত্রের নাম লাল্টু। লাল্টুর একটা ওষুধের দোকান আছে। দোকানটা ভাল চলে। লাল্টুর বাবা একজন নামকরা উকিল। এমন পাত্র পেয়ে ঝর্নার দাদা খুশি হল। কিন্তু ঝর্না খুশি হল না। পাপোশকে ডেকে বলল, মা আবার আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি এখন কী করব? পাপোশ বলল, তুমি বিয়েতে মত দিও না।

— মা তা হলে আমাকে আস্ত রাখবে না। আমাকে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দেবে।

— কী করব তা হলে?

— আমরা বরং পালিয়ে যাই।

— যাহ্‌! সে হয় না।

— কেন?

— পালিয়ে গেলে তোমার কিছু হবে না। আমার ক্ষতি হবে।

— কী ক্ষতি?

— ধরা পড়ে গেলে আমার শাস্তি হবে। আমার চাকরি চলে যেতে পারে।

— এ তো অদ্ভুত কথা! তুমি আমাকে চাও, অথচ আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না! হিন্দি সিনেমায় তো এ রকম হামেশা হয়।

— জীবনটা হিন্দি সিনেমা নয়।

— তা হলে কী করব?

পাপোশ অনেক ভেবেচিন্তে বলল, তুমি এখানে বিয়ে করো। বিয়ের পর একটা ঝগড়া বাধিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসো।

— কী ভাবে ঝগড়া বাধাব?

— প্রথম থেকেই ছেলেটাকে বলতে শুরু করবে, তোমার মাকে আমি সহ্য করতে পারছি না। তোমার মার সঙ্গে থাকা যায় না। এই সব বলতে বলতে একদিন বলবে, তোমাকে দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে। ছেলে স্বাভাবিক ভাবেই মাকে চাইবে। তখন তুমি বলবে, তা হলে চললাম। তুমি তোমার মাকে নিয়ে থাকো। তারপর মার কাছে ফিরে এসে বনিয়ে বানিয়ে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের গল্প বলবে। সবাই তখন তোমার কথাই বিশ্বাস করবে।

— তারপর?

— তারপর ডিভোর্স।

— তারপর?

— আমাদের বিয়ে।

— কিন্তু অনেক ছেলে বউ-পাগলা আছে। লাল্টু যদি তাদের মতো হয়? যদি বলে, মাকে চাই না, আমি তোমাকেই চাই? আমি তখন কী করব?

— তোমাদের ফ্ল্যাটে লাল্টুকে নিয়ে আসবে। তবে লাল্টু আসবে না। আত্মসম্মান যাদের আছে, তারা আসে না। আর যদি আসে, তখন দেখা যাবে। এ নিয়ে ভেবো না।

— আর একটা কথা। মা-দাদা যদি আবার আমাকে শ্বশুরবাড়ি ফেরত পাঠাতে চায়?

— তুমি যাবে না। তুমি বলবে, আমি যাব না। গেলে আমাকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মেরে ফেলবে।

ঝর্না তা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তা হলে এখানে বিয়ের নাটকটা করব?

— হ্যাঁ, করো।


ঝর্নার সঙ্গে লাল্টুর বিয়ে হয়ে গেল। লাল্টুর বাবা কোনও দেনাপাওনার মধ্যে গেলেন না। শুধু তাই নয়, তিনি যে বিয়েতে পণ নেননি, সেই কথাটা সাক্ষ্য রেখে মেয়ের মা ও দাদাকে দিয়ে লিখিয়ে নিলেন। ঝর্নার মার একটা খাট দেওয়ার ইচ্ছে ছিল, সেটাও লাল্টুর বাবার প্রবল আপত্তিতে দিতে পারল না। লাল্টুর মার ছেলের বউকে একটা হার দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। লাল্টুর বাবা বলল, দু-এক বছর যাক। তারপর হার কিনে দিও।

লাল্টুর মা জিজ্ঞেস করল, এ কথা বলছ কেন?

— আজকাল বিয়ে বড় একটা টিকছে না। এই বিয়েও টিকবে কি না জানি না।

— তা হলে ছেলের বিয়ে দিলে কেন?

— বাবা হিসেবে কর্তব্য করলাম। বলে একটু থেমে লাল্টুর বাবা বলল, ছেলেটা যদি কাউকে ভালবেসে বিয়ে করত, তা হলে এত ভাবনা ছিল না। লাল্টুর মা বলল, ভালবেসে বিয়ে করেও তো বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।

— তা যাচ্ছে। তবে ছেলে ভালবেসে বিয়ে করলে বাপের দায়িত্ব থাকে না। বলে লাল্টুর বাবা প্রসঙ্গ ঘোরাল। বলল, এ সব কথা এখন থাক। এবার একটা কাজের কথা বলি। লাল্টুর মা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী?

— আমি তো সারাদিন বাড়ি থাকি না। বউমার আচার-আচরণের দিকে একটু লক্ষ রেখো। কাকে ফোন করে কী বলছে সেটা জানার চেষ্টা কোরো। অস্বাভাবিক কিছু দেখলে বা শুনলে আমাকে বলবে। বলে লাল্টুর বাবা হেসে ফেলল। হেসে বলল, আজকাল ছেলের বিয়ে দিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন ছেলের বউ তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ফাঁসিয়ে দেবে তার ঠিক নেই। থানায় গিয়ে বললেই হল, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার ওপর শারীরিক মানসিক অত্যাচার করেছে। তারপর খেলা শুরু হয়ে যাবে। এখন রাতদিন এই হচ্ছে। আমার হাতেই এখন এ রকম প্রায় দশটা মামলা আছে।

লাল্টুর মা এবার ধমক দিয়ে বলল, তুমি এত দুশ্চিন্তা করছ কেন? আমার বউমা কোনও গোলমাল পাকাবে না।

— না পাকালেই ভাল।

কিন্তু লাল্টুর বাবার আশঙ্কা যে কত দূর সত্য তা এক মাস যেতে না যেতে বোঝা গেল। বিয়ের পর থেকে পাপোশের শেখানো কথা মতো ঝর্না লাল্টুকে রোজ বলত, তোমার মাকে সহ্য করতে পারছি না। তোমার মার সঙ্গে থাকা যায় না। চলো, আমরা আলাদা হয়ে যাই। লাল্টু এ সব কথায় কান দিত না। সে জানত, তার মার মতো নিরীহ শান্ত মহিলা সংসারে খুব কম আছে। তার মার সঙ্গে কারও বিবাদ হতে পারে না। হওয়া অসম্ভব। ফলে ঝর্নার কথা সে বিশ্বাস করত না। তার মার বিরুদ্ধে ঝর্না কিছু বলতে গেলে সে তাকে থামিয়ে দিত। মাঝে মাঝে ধমকও দিত। এর ফল ভাল হল না।

একদিন সন্ধেবেলা ঝর্না লাল্টুকে বলল, আমি এ বাড়িতে থাকব না।

লাল্টু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?

— তোমার মা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে।

— কেন?

— তোমার মার চোখ দুটো বড় বড়, টানা টানা।

— তাতে কী?

— আমার চোখ দুটো ছোট ছোট, কুতকুতে।

— তাতে কী?

— তোমার মার দাঁতগুলো সাদা, ধবধবে। আমার দাঁতগুলো হলদে, নোংরা।

— তাতে কী?

— তোমার মা রান্না করতে পারে। আমি পারি না। তোমার মা সেলাই করতে পারে। আমি পারি না। তোমার মা গান গাইতে পারে। আমি পারি না। তোমার মাকে সবাই মানে। আমাকে কেউ মানে না। আমার পক্ষে এ বাড়িতে আর এক মুহূর্ত থাকা সম্ভব নয়।

লাল্টু হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী বলতে চাইছ?

— তোমাকে যে কোনও একজনকে বেছে নিতে হবে।

— তার মানে?

— তুমি তোমার মাকে চাও না আমাকে চাও?

— আমি দুজনকেই চাই।

— ও কথা বললে হবে না। যে কোনও একজনকে বেছে নিতে হবে।

লাল্টু এবার ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, আমি মাকে চাই।

— তা হলে চললাম। বলে ঝর্না সুটকেস গোছাতে বসল।

লাল্টু তা দেখে বাবাকে গিয়ে বলল, ঝর্না এ বাড়িতে থাকবে না। ও চলে যাচ্ছে। লাল্টুর বাবা সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষী রেখে ঝর্নাকে দিয়ে কাগজে লিখিয়ে নিল, আমি একজনকে ভালবাসি। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই বিয়ে হয়েছিল। আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করে যাচ্ছি। আমার ওপর শ্বশুরবাড়ির কেউ কোনও শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার করেনি। বাড়ির বাইরে পা দিয়ে ঝর্না বুঝতে পারল এ সব কথা তার লেখা উচিত হয়নি। কিন্তু না লিখে তার উপায় ছিল না। এখন সে মার কাছে গিয়ে কী বলবে?


ঝর্নাকে দেখে সবাই অবাক হল। ঝর্নার মা জিজ্ঞেস করল, তুই একা? জামাই কোথায়? ঝর্না কাঁদতে শুরু করল। ঝর্নার দাদা জিজ্ঞেস করল, কাঁদছিস কেন? ঝর্না কাঁদতে কাঁদতে বলল, তাড়িয়ে দিয়েছে। ঝর্নার মার কথাটা বিশ্বাস হল না। মেয়েকে তার চেয়ে বেশি কেউ চেনে না। তার কেন যেন মনে হল, মেয়ের কথা সত্যি নয়। এর পিছনে পাপোশ আছে। কিন্তু তার এখন কিছু করার নেই। তাই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কিছু আর জিজ্ঞেস করল না।

ঝর্নার দাদা জিজ্ঞেস করল, তাড়িয়ে দিল কেন? কী হয়েছে? ঝর্না তখন বানিয়ে বানিয়ে অত্যাচারের নানা কাল্পনিক কাহিনী বলতে লাগল। ঝর্নার মা এ সবের একটা কথাও বিশ্বাস করল না। ঝর্নার দাদা ঝর্নার প্রতিটি কথাই বিশ্বাস করল। বলল, আমার বোনের ওপর অত্যাচার! আমি ওদের মজা দেখিয়ে ছাড়ব। সঙ্গে সঙ্গে মামাদের ডাকা হল। ল্যাংড়া দাদুকে ডাকা হল। পাপোশকে ডাকা হল। ল্যাংড়া দাদু সব শুনে বলল, আমার ফুলের মতো নাতনি। তার ওপর অত্যাচার!

এক মামা মদ খেয়ে রোজ বউকে মারধোর করে। সে বলল, ঝর্নার ওপর এই অত্যাচার মানে নারী জাতির ওপর অত্যাচার। আর এক মামা ঘুষ দিয়ে সবে একটা চাকরিতে ঢুকেছে। সে বলল, আমি মামলা করে পনেরো লাখ টাকা আদায় করে ছাড়ব। অন্য এক মামা দালালি করে সংসার চালায়। সে ভাইয়ের কানে কানে বলল, টাকাটা কিন্তু তুই একা নিস না। সকলের মধ্যে সমান ভাগ করে দিবি। আমার এখন টাকার খুব দরকার।

পাপোশ বলল, আমাদের এই আলাপ-আলোচনার দরকার নেই। এখন একটা উকিল চাই। সবাই পাপোশের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ, এখন একটা উকিল চাই। কিন্তু উকিল কোথায় পাওয়া যাবে? পাপোশ বলল, আমার জানাশোনা একটা উকিল আছে। তাকে ডেকে আনব? সবাই একসঙ্গে বলে উঠল। হ্যাঁ, এখনই।

পাপোশ এ কথা শুনে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। একটা উকিল ডেকে আনল। উকিল ঝর্নাকে দিয়ে একটা মিথ্যে অভিযোগ লেখাল। তারপর বাড়ির সবাই মিলে সেই অভিযোগ থানায় গিয়ে জমা দিল। থানার অফিসার ঝর্নাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আর শ্বশুরবাড়ি যাবে না?

ঝর্না শান্ত গলায় বলল, না।

— তুমি তা হলে কী চাও?

— ওদের উচিত শাস্তি দিতে চাই। আর ডিভোর্স চাই।

— এ তো তোমার শেখানো কথা। এর ফল কিন্তু ভাল হবে না।

ঝর্না দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, আমার ভালর দরকার নেই।

অফিসার তা শুনে হাসলেন। তিনি চোখের সামনে মেয়েটার সর্বনাশ দেখতে পেলেন। তাঁর একটু কষ্ট হল। তবে মুখে কিছু বললেন না।


না, শেষপর্যন্ত কিছু হল না। লাল্টুদের কোনও শাস্তি হল না। এমনকী তাদের কাছ থেকে পনেরো লাখ টাকা দূরে থাক, পনেরো পয়সাও আদায় করা গেল না। অথচ ডিভোর্স হয়ে গেল। লাল্টুর বাড়ির সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সবাই শান্তি ফিরে পেল। কিন্তু পাপোশের মনে শান্তি নেই। ফলে ভাল করে খেতে পারে না, ঘুমোতে পারে না। তার একটাই চিন্তা, ঝর্নাকে এবার কি সে বিয়ে করতে পারবে? ঝর্নার মা কোনও আপত্তি করবে না তো? শেষে একদিন ঝর্নার মার কাছে গিয়ে হাজির হল। বলল, যা হবার তা হল। ঝর্নাকে তো আবার বিয়ে দিতে হবে। এ নিয়ে কিছু ভেবেছেন? ঝর্নার মা বলল, ভাবার কিছু নেই। ওই হতচ্ছাড়িকে এখন কে বিয়ে করবে? পাপোশ বলল, আপনি ভাববেন না। আমি ওকে বিয়ে করব। আপনার এতে আপত্তি নেই তো?

ঝর্নার মা এ কথায় ভীষণ বিরক্ত হল। পাপোশ এত নির্লজ্জ কেন? এত নাছোড়বান্দা কেন? ঘরে তার বউ আছে, ছেলে আছে। তার পরেও বিয়ে! অথচ বলার কিছু নেই। ঝর্নাও যে পাপোশকে চায়। পাপোশ ছাড়া আর কাউকে ওর মনে ধরছে না। খুব সমস্যায় পড়ে গেল ঝর্নার মা। সে কী বলবে ভেবে পেল না। শেষে তার হঠাৎ মহাভারতের দাসরাজের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল কন্যা সত্যবতীকে প্রার্থনা করলে দাসরাজ রাজা শান্তনুকে কী বলেছিলেন। ঝর্নার মা তাই আর চিন্তা না করে বলল, বিয়ে দিতে পারি। তবে তার আগে একটা লেখাপড়া করতে হবে।

পাপোশ জিজ্ঞেস করল, কী লেখাপড়া?

— তোমার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ঝর্নার নামে দানপত্র করে লিখে দিতে হবে। রাজি আছ?

পাপোশ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, এই ফ্ল্যাটটাও দিতে হবে?

— নিশ্চয়।

— তা হলে আমায় একটু ভাবতে দিন।

তারপর পাপোশ কয়েকদিন ধরে কথাটা ভাবল। গ্রামে তার তিরিশ বিঘে জমি আছে, একটা বাড়ি আছে। ব্যাঙ্কে তার কয়েক লাখ টাকা আছে। ঝর্নাকে এ সব দান করতে তার কষ্ট হবে। তবে কষ্ট হলেও দিতে পারবে। কিন্তু এই ফ্ল্যাট সে কিছুতেই ঝর্নাকে দান করতে পারবে না। দান করলে এই ফ্ল্যাট ঝর্নার হবে। তখন এতে তার কোনও অধিকার থাকবে না। ফ্ল্যাট পেয়ে ঝর্না প্রথমেই তার সতীনকে তাড়াবে, সতীনের ছেলেকে তাড়াবে। এমনকী দরকার হলে তাকেও তাড়াবে। পাপোশ চোখের সামনে তার ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। না, আর ঝর্না নয়। ঝর্নাকে এবার ভুলে যেতে হবে। তার জীবন থেকে ঝর্নাকে মুছে ফেলতে হবে। কিন্তু কী ভাবে? হঠাৎ একটা উপায় তার মাথায় এল। দু-তিন দিন পরে সে ঝর্নার মাকে গিয়ে বলল, আমি আপনার শর্ত মানতে রাজি আছি। তবে তার আগে আমার একটা শর্ত আছে।

ঝর্নার মা জিজ্ঞেস করল, কী শর্ত?

— ঝর্নাকে সীতার মতো অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। যদি এই পরীক্ষায় সে পাশ করে, তা হলে আমি আপনার শর্ত মেনে নেব। ঝর্নাকে আমার সব সম্পত্তি দান করব। আপনি এতে রাজি?

— আমি রাজি। তবে ঝর্না রাজি হবে কি না জানি না। এটা ওর ব্যাপার।

— তা হলে ওকে ডেকে কথাটা জিজ্ঞেস করুন।

ঝর্না এই সময় পাশের ফ্ল্যাটে ছিল। তাকে ডেকে আনা হল। সব কথা বলা হল। সব শুনে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পাপোশ কী চায়? তার উদ্দেশ্য কী? পাপোশের কথা শুনে সে স্বামীকে ত্যাগ করেছে, এখন সেই পাপোশ তাকে পরীক্ষা করতে চাইছে! জানতে চাইছে তার শরীর ও মন সীতার মতো শুদ্ধ কি না! পবিত্র কি না! পাপোশের প্রতি ঘৃণায় তার নাক কুঁচকে গেল। সে বলল, আমি কোনও পরীক্ষা দেব না।

এ কথায় ঝর্নার মা নিশ্চিন্ত হল। পাপোশও নিশ্চিন্ত হল। শুধু ঝর্না নিশ্চিন্ত থাকতে পারল না। দু’ দিন পরে কাউকে না জানিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। রেখে গেল একটা চিঠি। চিঠিটা এই: মা, আমি চললাম। তোমাদের সংসারে বোঝা হয়ে বাঁচতে চাই না। ভয় নেই, আমি মরব না। আমি বাঁচব। নিজের মতো করেই বাঁচব। আমার জন্যে চিন্তা কোরো না। আমি ভীষণ ভুল করেছি, অপরাধ করেছি। তার শাস্তিও পেয়েছি। তুমি আমায় ক্ষমা কোরো। আশীর্বাদ কোরো, আমি যেন জীবনে শান্তি খুঁজে পাই।

লেখকের কথা: এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক, যদি বাস্তবে কারও সঙ্গে মিল থেকে যায় তা হলে আমি দুঃখিত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন