বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

যে-কোন কারণেই হোক-ড্যানিয়েলা ডাটন

মূল: ড্যানিয়েলা ডাটন 
অনুবাদ: ফজল হাসান 

যে-কোন কারণে তারা খালে সাঁতার কাটছিল । শেষের দিকের জায়গাটা বেশ ঘোলাটে । কিন্তু কোন কারণে তারা সবাই উপস্থিত হয়েছে । লীলা, তার বাচ্চা ছেলে এবং প্রাক্তন ছাত্র জেমস্ ।
লীলা এবং তার বাচ্চা ছেলের সঙ্গে জেমস্ এসেছিল, নাকি তারা দিনটিকে নিছক উপভোগ করার জন্য এসেছিল, তা স্পষ্ট নয় । যাহোক, কোন এক পর্যায়ে এটা পরিস্কার যে, তারা একসঙ্গে সেখানে গিয়েছিল।

জায়গাটা ছিল সাঁতার কাটার জন্য খুবই জনপ্রিয় এবং শহরের বেশ কাছেই ছিল । ঘাটের উপরের দিকে রয়েছে দোকানপাট এবং কম দামী পানশালা । গাত্র বর্ণের এক রঙা জীর্ণ সাঁতারের পোশাকের জন্য লীলা উদ্বিগ্ন । পোশাকের ইলাস্টিক নষ্ট হয়ে গেছে । তবে লীলা যখন কিনেছিল, সেই সময়ের চেয়ে এখন ভালো করে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকে । তার উরজ কোন রকমে ঢাকা ছিল । তারপরও তাকে খুব বেশি আবেদনময়ী মনে হয়নি । সে বারবার পরখ করে দেখে তার উরজের বোঁটা বেরিয়ে আছে কি না । মনে হয় তার পড়নে যেন প্লাস্টিকের সাঁতারের পোশাক । সবকিছু শক্ত করে চেপে আছে এবং প্রদশর্ণীর জন্য রাখা হয়েছে । সেই মুহূর্তে জেমস্ কী ভাবছে, তা বলা মুশকিল । জেমসের ভাবনার সঙ্গে তার চিন্তা একই তালে চলছিল না । কোন কারণে জেমস্ সেখানে গিয়েছিল । তবে তার ভাবটা এমন যেন সে কখনই সেখানে যায়নি । লীলার ছেলে ভালো সাঁতার জানে । ছোট্ট বাইন মাছ । আলোয় ওর গায়ের চামড়া চকচকে দেখাচ্ছিল । সে অনবরত হাসছিল এবং জেমসও তার হাসির সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল । লীলা দূর থেকে দুজনকে দেখছিল । পানির উপর সাঁতার কেটে একটা শঙচিল চলে গেছে । সেদিন সকালে লীলার ঋতুস্রাব শুরু হয়েছিল । সে ভাবছিল, যখন পানি থেকে উপরে উঠে আসবে, তখন তার সাঁতারের পোশাক রক্তে লাল দেখাবে । তার উরজ বিশাল, এমনকি বেঢপ আকৃতির । জেমস্ অমনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে শব্দহীন হেসেছিল । 

সেমিষ্টার শেষ হবার কয়েক সপ্তাহ আগে লীলা এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিল । শহরেরই ছিল সেই বক্তৃতা । কিন্তু বৌদ্ধ সেন্টারের অবস্থান ছিল বিশাল এবং গাছগাছালি ঘেরা পার্কের মধ্যে । এত বিশাল এবং এত গাছগাছালির ফাঁকে সে যখন কাঠের এবং কাঁচের তৈরি সেন্টারের লেকচার হলে পৌঁছে, তখন তার কাছে মনে হয়েছে, সে হয়তো শহরের বাইরে অন্য কোথাও গিয়ে পৌঁছেছে । সেখানে ছিল শীতল হাওয়া । সে এক গোছা বেগুনি রঙের ফুলের পাশে ছায়ায় থেমেছিল এবং ভেবেছিল, পুরো বনাঞ্চল যেন স্নানে নিমগ্ন । সে কী অন্য কোন মাধ্যমে শুনেছিল ? লরি এন্ডারসনের গল্প দিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু বক্তৃতা আরম্ভ করে । লরি অন্য আরেক ভিক্ষুর বক্তৃতা শুনতে ভিন্ন শহরে গিয়েছিল । আপাতত: দৃষ্টিতে দেখা যায় সেখানে সে কথা দিয়েছিল, বাকি জীবনে ভালো হয়ে যাবে । সম্প্রতি লরি এন্ডারসন সম্পর্কে জানতে পেরেছে যে, সে নাসা’র একজন চিত্রকর । লীলা ভেবেছিল নাসা হয়তো লরিকে মহাশূণ্যে পাঠাবে । জানা যায়, সে গুটি কয়েক গবেষণাগার পরিদর্শণ করেছে । ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণাগারে সে তার লাল নোটবুকে লিখেছে, এমন একদিন আসবে, যেদিন মঙ্গল গ্রহে যাবার জন্য সিঁড়ি থাকবে । গবেষকদের মধ্যে কয়েকজন তার কথায় মুগ্ধ হতে পারেনি । একজন বলেছে, ‘সে কী করবে, কবিতা লিখবে ?’ গল্প এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে । সে অঙ্গীকার করে, বাকি জীবনে ভালো হয়ে যাবে । লরি এন্ডারসন সবার কাছে হাসির পাত্রী । নিজের মন খারাপের কারণ নিয়ে সে নিশ্চিত নয় – সে কী খুব কম, নাকি খুব বেশি অঙ্গীকার করেছে । সে একজন তিববতীয় ভিক্ষুর শরণাপন্ন হয়েছিল এবং তাকে কফি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করেছিল । ভিক্ষু হ্যাঁ বলেছিল এবং জীবনে প্রথম এসপ্রেসো কফি পান করার জন্য বসেছিল । ভিক্ষু কফিতে চুমুক দিচ্ছিল এবং কথা শুনছিল । একসময় সে স্বাভাবিক গতির চেয়ে আরো বেশি তাড়াতাড়ি কথা বলা শুরু করে । সে বলেছে, মোটামুটি যা দাঁড়ায়, বাদ দিন । সে আরো বলেছে, মন হলো বন্য সাদা ঘোড়া, অথবা সে বলেছে, তার মন বন্য সাদা ঘোড়ার মতো । লীলা নিশ্চিত নয় – পাশে বসা মহিলাটি জঘন্য ভাবে কাশতে থাকে । লরি এন্ডারসনের মনটা কী বন্য সাদা ঘোড়ার মতো, নাকি অন্য কারোর ? তার মন ছিল কী – লীলার – বন্য সাদা ঘোড়ারও ?

ফিরে যাওয়ার সময় জেমস্ জিজ্ঞাসা করে তাকে নিয়ে যাওা যাবে কি না । তারা ভেজা টাওয়েল এবং জুতা লীলার গাড়ির পেছনে ছুড়ে ফেলে । লীলার ছেলের বয়স চার বছর । চলন্ত গাড়িতে বসে সে তাদেরকে বলে যে, সে একটা সারমেয় । সে আরো বলে, জন্ম থেকে সবসময়ই সে একটা সারমেয় । ‘তুমি একটা মজার ছেলে,’ জেমস বললো । ‘আমি মজার ছেলে নই । আমি একটা সারমেয়,’ সে বললো । জেমস হাসতে থাকে । তার দাঁত অত্যন্ত সাদা । ‘তোমাকে কোথায় নামাবো ?’ লীলা জিজ্ঞাসা করে । খালের লবনাক্ত পানি শুকিয়ে তার হাতের পশম খাড়া হয়ে আছে । জেমস বললো, সে সহজেই তার বাড়ি হেঁটে যেতে পারবে । লীলার মনে পড়ে, শহরে একটা বক্তৃতার শেষে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে জেমস তার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল । বক্তা ছিলেন বসনিয়ার একজন লেখক, যিনি নিজের কবিতাকে মস্তকহীন অসম্পূর্ণ কাজ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন । তখন শীতকাল ছিল এবং সে ছেলেদের কফি খাইয়েছিল । কিন্তু এখন গ্রীষ্মকাল এবং পুরো শহর যেন গরমে সেদ্ধ হয়ে গেছে । পড়নের জীর্ণ কাপড়ের উপর সে ডেনিমের একজোড়া খাটো পাৎলুন জড়িয়ে নেয় । 

লীলা তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে জেমসকে পানি পান করার প্রস্তাব দেয় । এছাড়া সেই মুহূর্তে তার কী-ই-বা করার ছিল ? বাথরুমে নিজেকে পরিপাটি করার আগে লীলা ছেলেকে পরিস্কার করে শোয়ানোর সময় জেমস রান্নাঘরে দাঁড়িয়েছিল । অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘর, বাথরুম এবং ছেলের শোবার ঘরে নীল রঙ । খালি নেই, পড়নের পোশাক খোলার সময় সে ভাবলো । কড়িডোরের অপর প্রান্তে অবশ্য আরেকটা কক্ষ আছে, যা তার নিজের জন্য । জেমস যখন ঘরে প্রবেশ করে কাপড়চোপড় খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, তখন লীলার পড়নে দুটি তোয়ালে – একটা দিয়ে সে শরীর পেঁচিয়েছে এবং অন্যটা দিয়ে চুল জড়িয়েছে । প্রায় অকস্মাৎ লীলার মনে পড়ে অ্যাইলিন মাইলসের একটা লেখার কথা । সে-টি ছিল জর্জ নামের একজন চিত্রকরের কাহিনী । জর্জের প্রাক্তন ছাত্র কক্ষে প্রবেশ করে পড়নের কাপড় খুলে বিছানায় শুয়ে পড়তো । কক্ষের ভেতরে ছিল শান্ত পরিবেশ, কিন্তু বাইরে ছিল হাজারো শব্দের ঝনঝনানি । জর্জ সেই মডেল ছাত্রকে আঁকতো । শারীরিক ভাবেও তার শ্লীলতাহানি করতো ? ‘দীপ্যমান পাছা,’ তার মনে পড়ে সে পড়েছিল । স্মৃতি থেকে সে চিত্রটি মনে মনে আঁকে । জগতে কী কেউ কোলাহল বিচ্ছিন্ন করতে পারে এবং বলবে ওটা ঘুর্ঘুরে পোকা, ওটা উড়োজাহাজ কিংবা উপরের তলায় দুজন পুরুষের চুমু ? তারপর ছিল একটা স্বপ্নের কাহিনী এবং সেই কাহিনী ছিল অন্য আরেক প্রাক্তন ছাত্রের । সে ছিল ভূতত্ত্বের ছাত্র এবং প্রাকৃতিক ক্ষয় নিয়ে কবিতা লিখেছিল । ‘ভূতত্ত্বে কোন নিখুঁত বৃত্ত নেই,’ এভাবেই শুরু হয়েছিল কবিতাটি । স্বপ্নে সে মহিলাকে মামুলি ধরনের এক হোটেল পর্যন্ত অনুসরণ করে এবং একসময় তাকে ধাক্কা দিয়ে দরজার ভেতরে ঢোকায় । মহিলা সারারাত তাকে ধর্ষণ করেছে । একই লেখায় মাইলস্ স্বীকার করেছে যে, তাজমহল দর্শন তার কাছে হতাশাজনক । জর্জ লেখেছে, আমি অঙ্কন করি । কেননা আমি আঁকতে পছন্দ করি । তার একটা ছবিতে একজন মহিলা এক লোককে এক বাটি স্যুপ পরিবেশন করছে । লোকটির আঙুলের ফাঁকে আঙুল এবং লোকটির উরুর ফাঁকে মহিলার হাত । লোকটির ঠোঁটের ফাঁকে মহিলা সাদা কাগজের মতো শুভ্র দাঁত দেখতে পায় এবং সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে কোন এক বৌদ্ধ সাদা কাগজকে সূর্য হিসাবে সম্ভোধন করেছিল । এক টুকরো কাগজ হলো মেঘ । এটাই হলো বৃষ্টি, প্রতিবন্ধন এবং প্রতিবন্ধনের জননীও । যদি ভালো করে তাকিয়ে দেখা যায়, তবে যে কেউ কাগজের উপর স্বচোক্ষে দেখবে পারবে - উরজের বোঁটা শক্ত, প্রসারিত আঙুল এবং একটা কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে । মাইলস কী তা লেখেননি ? জেমস্ কী তা-ই বোঝাতে চায়নি ? সে-টা অন্যরকম ছিল । সে-টা ছিল আলাদা । তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন লেখা ।



লেখক পরিচিতি: 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারী লেখক, প্রকাশক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড্যানিয়েলা ডাটন । তাঁর জন্ম ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের ভিসিলিয়ায়, ১৯৭৫ সালের ১৮ অক্টোবর । তিনি ইতিহাসে বিএ (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা ক্রুজ), মাষ্টার্স অফ ফাইন আর্টস্ [এমএফএ] (স্কুল অফ দ্য আর্ট ইন্সটিটিউট অফ শিকাগো) এবং ইউনিভার্সিটি অফ ডেনভার থেকে ইংরেজি ও ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এ পিএইচডি ডিগ্রী অর্জণ করেন । পরবর্তীতে ২০১১ সালে তিনি সেন্ট ল্যুই-র ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর সহকারী অধ্যাপক হিসাবে শিক্ষকতা শুরু করেন ।

ড্যানিয়েলা মূলত: ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক । ‘অ্যাটেম্টস্ অ্যাট এ লাইফ’ (২০০৭), ‘স্প্রল’ (২০১০) এবং ‘মার্গারেট দ্য ফার্ষ্ট’ (২০১৬) তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ । উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ‘স্প্রল’ উপন্যাসটি ‘বিলিভার বুক অ্যাওয়ার্ড’এর চুড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল । তাঁর ছোটগল্প বিভিন্ন ম্যাগাজিনে, যেমন ‘হারপার’স, ‘বম্ব’, ‘ফেঞ্চ’ ও ‘নুন’, এবং একাধিক গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে । তিনি ২০১০ সালে প্রকাশক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন । স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর প্রকাশনী সংস্থার নাম ‘ডরোথি’, যা বোদ্ধামহল থেকে ভূঁয়সী প্রশংসা লাভ করেছে । এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে বছরে মাত্র দুটি গ্রন্থ, বিশেষ করে নারী লেখকদের, প্রকাশিত হয় । লেখালেখি, অধ্যপনা এবং প্রকাশনা ছাড়াও তিনি একজন বিশিষ্ট প্রচ্ছদ শিল্পী । কার্লোস ফুয়েন্তেস, স্ট্যানলি ক্রফোর্ড, রবার্ট অ্যাশলির মতো স্বনামধন্য লেখকের গ্রন্থসহ একশ’য়ের উপর বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি এঁকেছেন । 

গল্পসূত্র: 
‘যে-কোন কারণেই হোক’ গল্পটি ড্যানিয়েলা ডাটনের ইংরেজিতে ‘সামহাউ’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি ‘প্যারিস রিভিউ’-এর ২২৪ সংখ্যায় [স্প্রিং, ২০১৮] প্রকাশিত হয়েছে এবং সেখান থেকে নেয়া ।

***** *****

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন