বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

প্রশান্ত মৃধার গল্প : অচিন ধামাইল

বাসটা হঠাৎ আচমকা নিকলিতে থামে।

বিরতিহীন বাস। এভাবে থামা বাস মালিক সমিতির আইনসিদ্ধ নয়, কিন্তু থামে। হেলপার-কন্ডাক্টর কেউ চাপড় মেরে থামায়। ভেতরে কী পরিমাণে যাত্রী আছে তার ওপর নির্ভর করে এই থামাথামি। যাত্রী বেশ কম। ফলে চারখাই পার হওয়ার পর থেকেই ধারণা ছিল থামবে।

চারদিকে হালকা কুয়াশার আস্তরণমতো। তবে এ-কুয়াশা নয়, বিকেলে হালকা বৃষ্টিপাতের পর সীমান্তের পাহাড়ে জমে থাকা জলের বাতাসে ছড়ানো আভাস। শীত আসি আসি। বাসের জানালা একটু খোলা থাকলে সেখান থেকে শীতল বাতাস ঘা মারে। এখনো তীব্র নয়। শেষ বিকেলে আচমকা বৃষ্টিটুকু না-হলে বাতাস এমন ভারি আর শীতল হতো না।

ড্রাইভার তীব্র ব্রেক কষলে তন্দ্রা টুটে গেছে। চারখাই থেকে রানাপিং – রাস্তা অপেক্ষাকৃত মসৃণ আর সোজা। বাস দ্রম্নত চলে। দুপাশেই হাওর। সন্ধ্যার মুখে এ-সময়ে বৃষ্টিতে চারধারে ভিজেভাব থাকায় চোখ জড়িয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক!

কিন্তু এমন আচমকা ব্রেক! সামনে কিছু পড়ল? হতে পারে। কে চোখ খোলে। আমার পিছন ও ডানপাশের দুজন যাত্রী এমন হঠাৎ থামানোয় ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে শুরু করেছে। এতে চোখ খুলে যাওয়া স্বাভাবিক। প্রায় প্রতিদিন এমন ঘটনার সঙ্গে পরিচিতি, তাই এক চোখ মেলে আমি চারপাশ দেখি। দরজার পাশের সিটদুটো ফাঁকা। তার পরের সিটে বসেছি। এক চোখ মেলে বুঝতে পারলাম যাত্রী তোলার জন্যেই এমনভাবে ব্রেক করেছে ড্রাইভার। ভাবখানা এই, সামনে কিছু-একটা পড়েছিল। সেই জন্যে এমন ব্রেক কষা! এমন অজুহাত বানাতে এ-লাইনের ড্রাইভাররা ওস্তাদ। হেলপাররা সত্যিকারের হেলপার, কন্ডাক্টরও সত্যিকারের সংযোগকারী!

প্রথমে পরপর দুজন পুরুষ ওঠে। একবার চোখ খুলি মাত্র। কন্ডাক্টর দ্রম্নত উঠতে বলে তাদের। নিচে বোরকা-পরা এক নারী দাঁড়িয়ে, তাকে যাবে কি-না জানতে চেয়ে দ্রম্নত উঠতে বলে। চোখ পুরোপুরি না খুললেও কথা কানে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি কী হচ্ছে! ওই নারীর পাশে দাঁড়ানো হেলপার। সে বাসে আবার প্রায় লাফিয়ে উঠছে। তখন বিকট চিৎকার দিয়ে গলির মুখে দাঁড়ানো একজনকে ডাকে। ওই চিৎকারে চোখ খুললাম। সে-লোক সিগারেট ধরাচ্ছে। মনে হয় ধরাতে দেরি হচ্ছে। ওই নারী তখনো বাসের দরজার নিচে দাঁড়ানো। সিগারেট জ্বালিয়ে লোকটা তার পাশে এসে সে উঠবে কি-না জানতে চায়। তারপর হেলপারের হাতে সিগারেটটা দিয়ে বাসে ওঠে। ওই মহিলা তখন একবার উলটোদিকে তাকিয়ে হেলপারকে পাশ কেটে বাসের ফুটবোর্ডে পা রাখে। সেখানে দাঁড়ায় একটু। পরেরটায় ওঠে। হেলপার তখন নিচেরটায়। বাসের গায়ে থাবা দেয়, ‘যান বাড়ান -’ বলে। এসব অতি দ্রম্নত ঘটে। সব মিলে খুব বেশি হলে কুড়ি কি পঁচিশ সেকেন্ড। প্রায় প্রতিদিন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ায় অভ্যস্ত। চোখ আবার ধরে এসেছে। ভাবছি, একটা মাফলার থাকলে গলায় জড়িয়ে নেওয়া যেত। গতবারের অভ্যাসে সাইড ব্যাগে একবার হাত দেওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু এখনো তো সেভাবে শীত পড়েনি, ব্যাগে মাফলার রাখার প্রশ্নই নেই। গায়েই সকালে সোয়েটার জড়াইনি। প্রয়োজনও ছিল না, হালকা ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছিল, তবে তা পুরোপুরি উত্তুরে নয়। বৃষ্টির কারণে হয়তো।

হেলপারের পাশ গলে এসে ওই মহিলা বাসের ভেতরে উঠে সামনে-পিছনে তাকায়। মুখে নেকাব। কিন্তু বড়ো চোখদুটো বোঝা যায়, আলো জ্বললে আরো ভালো বোঝা যেত। বাসের ভেতরে আলো কমে এসেছে। আমারও চোখ লাগানো। চশমা খুলে জামায় বুকের কাছে ঝুলিয়ে রেখেছি। ফলে জড়ানো-চোখ খুলেই তাকানোমাত্র সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠবে না; তাই ওই চোখ জোড়া বাসের সামনে-পিছনে কী তালাশ করছে, তাই-বা বুঝে নিই কী করে?

সামনে-পিছনে দেখে সে বাসের গতির তালেই প্রায় ধপ করে সামনের ফাঁকা সিটদুটোর বাইরের দিকেরটায় বসে পড়ে। আমি তার পিছনে। জানালার পাশে। এবার সে আমার মুখ ভালোভাবে নিরিখ করে। প্রায় পলকহীন। আমিও চোখ তুলে তাকাই। তার এই আচরণে আমার চোখ তুলে তাকানো স্বাভাবিক। চোখ জানালার বাইরে ছিল, সেখান থেকে তার চোখে। আমিও অপলক। তার তাকানোয় মনে হয়েছে আমায় কিছু বলতে চায়। ভাবি, এমনিতেই উঠব কি উঠব-না করে সে এই বাসে উঠেছে। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যায় আছে, না-হলে বারবার এভাবে তাকাচ্ছে কেন?

আমি তার চোখ ও মুখ থেকে চোখ সরিয়েছি। ইতোমধ্যে সেও সামনে ফিরেছে। আবার একবার ফিরে তাকায়। আমায় দেখে। আবার সামনে তাকায়। আমি তার আচরণ একটু অস্বাভাবিক মনে করলেও পাত্তা দিই না। আবার চোখ বুজি। সে তার পাশের জানালা খোলে, বাতাসের ঝাপটা লাগে মুখে। আমার চোখ আপসে খুলে যায়। দেখি, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, জানালাটা খুলে সে পিছনে তাকিয়েছে। এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে আমায় কিছু বলতে চায়! তার এই তাকানোর ভঙ্গিতে আমি সত্যি অবাক! মুখখানা দেখতে পারলে অন্তত বুঝতে পারতাম, কেন সে এভাবে তাকাচ্ছে, আমার পরিচিত কি-না; কিন্তু মুখঢাকা নেকাব-পরা এই নারী সত্যি আমার কাছে অপরিচিত। বাস বলেই হয়তো এমন আচরণে সাড়া দেওয়ার সাহস হচ্ছে, একলা থাকলে এড়িয়ে যেতাম।

সে বলে, ‘আমায় চিনছেন?’

হা কপাল, মুখঢাকা একজন মানুষকে আমি কী করে চিনি! আমার পরিচিত কেউ? তা যদি হয়, তাহলে কণ্ঠস্বরেই তো চিনতে পারতাম। বেশ, পরিচিত কেউ নয়। তাহলে আমার নাম ধরেই ডাকত। আবার অল্পপরিচিত, তাহলে সেও তো নিজের পরিচয় দিত। আগেই বলত না, আমায় চিনতে পারছেন? এ ভীষণ দোটানা। একবারে বলা যাচ্ছে না, চিনতে পারিনি। তবু চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে স্মৃতি হাতড়াই। নিকট অতীতকে একটানে সামনে আনি। দেখেছি এমন কাউকে কখনো। আর যদি দেখেও থাকি, মুখ না-দেখে মানুষকে চেনার উপায় কী? নেকাবের ওপর থেকে মুখ অনুমান করি, সেইসঙ্গে সামনে বসে থাকা মানুষটার গড়নও। সে ওই কথা বলে আমার দিকে তাকিয়েই আছে। আমার উত্তরের অপেক্ষায়!

নিরুপায় আমি ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ি। অর্থাৎ, চিনতে পারিনি। আমি এই মুহূর্তে অসহায়। তাকিয়ে থাকি, যদি সে তার পরিচয় দেয়। অথবা মুখের সামনে থেকে পর্দা সরায়। ডানপাশের যাত্রীদের কৌতূহল, হয়তো আমার পিছনেও তা প্রবাহিত হয়েছে। সে সবই অনুমান। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েই থাকে। আমি চোখ সরাই না। সেও না। যেন বেশ একটা মজা পাওয়া গেছে।

এবার আবার সে জিজ্ঞাসা করে, শুদ্ধ বাংলার বদলে আধা উত্তর-ঢাকা আধা-ময়মনসিংহের উচ্চারণ তার গলায়, ‘আমারে চিনচোইন না?’

আমি আবার ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ি। একইভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এবার তার যেন অপলক চোখ জোড়া দিয়ে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে তাকে চেনার! কিন্তু তাতে লাভ? আমার পক্ষে তবু অসম্ভব!

এবার নিজের অপারগতা আর তার আচরণে হেসে ফেলি। কিন্তু তাকিয়েই বুঝি, সেও আমার চিনতে না-পারায় বিস্মিত। তাই নেকাবের ওপর থেকে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে আছে। এদিকে বুঝতে পারছি, সে আবার আমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে। সে আমায় চিনিয়ে ছাড়বে তাকে। অথবা হতে পারে আমি তাকে বেশ ভালোভাবেই চিনি, কিন্তু মুখ-ঢাকা-থাকায় চিনতে পারছি না। তা হলে হবে অপরাধ! যদিও অত উদাসীন মানুষ আমি কোনোকালেই নই। পথচেনা মানুষকে মনে রাখতে পারি। বাড়িঘর
ঠিকুজি-কুলজি আমি সবার জানতে চাই না ঠিকই, তবু যেটুকু পরিচয় হয়, সে-পথের সঞ্চয়টুকু চিরদিন সঙ্গে রাখার চেষ্টা করি। সবসময় যে পারি তা হয়তো নয়। অত আত্মবিশ্বাস কোনো বিষয়েই আমার নেই, তবে নিজের ভেতরে সে-চেষ্টা থাকে, তা জানি। পথের মানুষ বন্ধুরও বাড়া। পথের মানুষ সবচেয়ে জরুরি, পথের মানুষই এই জীবনের বড়ো সঞ্চয়। পথিকের পথ আর সহযাত্রী ছাড়া সহায় কে?

কিন্তু এই নারী অথবা মেয়েটি আমায় তো সমস্যায়ই ফেলে দিলো। এমনভাবে বলছে যেন কতকালের চেনা আমি তার। অথচ দেখতে পাচ্ছি শুধু তার চোখ দুটি। সেগুলো ছোটোও না বড়োও না। তবে ডান-বাঁয়ের চেয়ে এই চোখ ওপরে-নিচে আকৃতিতে বেশি, দেখেই বুঝতে পারছি। সেখানে কৌতূহল। কেন আমি তাকে চিনছি না। এবার যদি সে কোথায় কখন কীভাবে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই জানায় তো আমার পক্ষে সুবিধাই হয়!

এ-সময়ে কন্ডাক্টর তার কাছে গোলাপগঞ্জের ভাড়া চায়। যেন এই পথের যাত্রী হিসেবে কন্ডাক্টরের জানা আছে, সে সামনে গোলাপগঞ্জে নেমে যাবে। এটা আমারও অনুমান। বাস গোলাপগঞ্জে থামবে। সেটা বড়ো স্টপেজ। একটু বেশিক্ষণ দাঁড়াবে। এই মহিলা ওখানেই নামবে, যদি ততক্ষণে তার কাছে থেকে ভাড়া আদায় না হয়। কন্ডাক্টরের কথায় তেমন তাড়া। এর ভেতরে লক্ষ করলাম, কন্ডাক্টরের কথায় যেন একটু তুচ্ছজ্ঞান। আবার, যেইমাত্র আমার সঙ্গে কথা বলেছে, তারপর এই এখন এই ভাড়া চাওয়ার সময়ে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে সেই বিস্ময়ও, এই নারী কী করে আমাকে চেনে।

মানুষের চোখে কত পদের রঙ্গ ভাসে। একজনের চোখে, শুধুমাত্র চোখ জোড়াতেই আমি তাকে চিনি কি-না সেই আকুতি; অন্যজনের, আমি তাকে চিনিনি, তাও সেখানে রঙ্গ ও কৌতূহল। হোক, যা-ই হোক, এই মুহূর্তে আমি ভেবে পাই না, কীভাবে তাকে শনাক্ত করি। যেভাবে তাকাচ্ছে, তাকিয়েছে, তাতে নিশ্চিত হওয়া একটা ব্যাপার আছে। আর গলার উচ্ছ্বাস, চোখের নাচন, সবমিলে যতটা বয়েস তার ভেবেছি, তাও হয়তো নয়। তবে এই মেয়েটিকে আগে কোনোদিন দেখেছি, পরিচয় ছিল বলে তো মনে পড়ে না। কিন্তু তার কথায় তো মনে হচ্ছে সে সত্যি আমায় চেনে।

ভাড়া চাওয়ায় কন্ডাক্টরকে সে বলল, ‘দিরাম, দিরাম!’

এ-কথায় আবার ধন্দ বাড়ল আমার। যদি এখন সে ধন্দটুকু খোলাসা করার সুযোগ সে দেয়। একটু আগে আমাকে পরিচয় দেওয়ার কথায় মনে হয়েছে সে ঢাকাইয়া অথবা ময়মনসিংহা, এবার এইমাত্র এমনভাবে বলল যেন এ-অঞ্চলেরই মানুষ। উচ্চারণের লগৎও বেশ। তাহলে কোথায় দেখেছি? কোথায় আলাপ হয়েছিল তার সঙ্গে? গাজীপুর কিংবা সাভারে? অথবা, ময়মনসিংহে? সাভারে হলে নবীনগর? ময়মনসিংহে হলে গাঙিনার পাড়ে? নাকি এই এখানে। গোলাপগঞ্জ, ঢাকা দক্ষিণ, শিবপুর নাকি রানাপিং, চারখাইয়ের রাস্তায় জকিগঞ্জ যাবার পথে। নাকি সিলেটে, রেলস্টেশনে কিংবা খাদিমনগরে। অথবা, আমি ভাবছিলাম, কমলগঞ্জে!

বেশ ধন্দে পড়া গেল। সেটুকু মিটানোর সুযোগ এখন সে আমায় দেবে কেন? বাসের গতি বেড়েছে। ডানদিকে গ্যাসফিল্ডের চুড়োর আলোয় চোখ আলোকিত। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। হয়ে আসছে কি, গাঢ় না হলেও অন্ধকার হয়ে গেছে। আজ মেঘলা, পাহাড়ে কিছু বৃষ্টিও হয়েছে, তাই একটু আগেই চরাচরের রং ধরে এসেছে।

এই যে কথাগুলো ভাবছি, এই সুযোগ বাসের গতির মতন।

এইমাত্র পিছনে ঘুরে তার চোখ আবার আমার মুখে। এবার সে একেবারে মরিয়া হয়ে বলে, ‘কিতা, চিনচোইন না, আমারে?’

আমি অসহায়। এমন পরীক্ষার মুখে জীবনে কখনো পড়িনি। যার মুখ দেখিনি, দেখতে পারছি না তার কাছে কবুল করতে হবে তাকে চিনি কি-না। এর চেয়ে জটিল অবস্থা আর কী হতে পারে? বলতেও পারছি না, এবার অবগুণ্ঠন তোলো। অথবা, মুখের ওই ঢাকনাটা সরাও মেয়ে, আমি দেখি তোমার চাঁদবদনখানা। দেখি তোমায় চিনতে পারি কি-না!

এবার আর ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকালাম না। অপলক তাকিয়ে থাকলাম ওই নেকাবঅলা মুখখানার দিকেই। যতক্ষণ সে সামনে না তাকায়। সামনে তাকালে ডাকব? নাকি জানতে চাইব কোথায় আমাদের দেখা হয়েছিল। অথবা, কীভাবে চিন-পরিচয়।

সেও মাথা সামনে নিল না। আমার অসহায়ত্ব পড়ে নিতে পারল। বলল, ‘ওই যে একদিন, শিবপুরে ফেরির লাগি দাঁড়াই থাকি থাকি বাদে খেয়া পার হইছিলাম। আপনার সাথে আর একজন। আপনারা আমার ভাড়া দিয়া দিছিলেন, মনে নাই?’



দুই

সত্যি মনে ছিল না। মনে পড়েনি, সে কোন বিদায় সন্ধ্যাবেলা, এক নৌকায় আমি আর সে আর সঙ্গে আরেকজনসহ পার হয়েছিলাম। সত্যি মনে ছিল না। এই মনে পড়ল। এই মাত্র, সেই বিগত দিন। কোনো-একদিন আমরা একসঙ্গে পার হয়েছিলাম। যদি সে এখন ‘ও গো পথের সাথি’ বলে গেয়ে ওঠে গান?

তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি ওই একবারই আরো স্পষ্ট করে তার চোখের দিকে তাকালাম। যদিও সে একপ্রকার অভিমানেই যেন এখন মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছে সামনে। চিনতে পেরেছি বলার আগপর্যন্ত যেন ওই মুখ আর ফেরাবে না! দেখবে না আমায়। এই অভিমান যেন খুব স্বাভাবিক। হতে পারে। কিন্তু মুখ না-দেখলে হঠাৎই-বা আমি তাকে চিনি কী করে? সে-কথা এখন বলাও তো যায় না। এক বিকেলে, এক খেয়ায় পারাপারের পরে প্রকাশ্য মানুষই কি মনে থাকে? নাও তো থাকতে পারে! আর তার মুখখানা না দেখে, শুধু চোখ আর বাসে ওঠার মুহূর্তের এই অবয়ব দেখে কীভাবে চিনতে পারি! তবু অভিমান?

তা অভিমান যেন তার ভূষণই। যদিও সেই বিগত দিনের অপরাহ্ণবেলায় তো তার চোখে-মুখে একই রকম অভিমানের খেলা দেখেছিলাম, আমি আর আমার সঙ্গী। সেদিন প্রকৃতই দুর্যোগের মুখে তার অভিমান দানা বেঁধেছিল সহযোগীদের ওপর। তবে অনিশ্চিত পারাপারের সাহস ছিল তার সঙ্গে। সেই পারাপারে, আমাদের সঙ্গে সেই মোরা যাত্রী একই তরণির সময়টুকুতে তার সঙ্গে যা কথা হয়েছিল তাই পুঁজি উভয় পক্ষের। সে-কথা আজ আর আমার মনে নেই, সেই সহযাত্রী সঙ্গীও নেই আমার সঙ্গে, হয়তো তারও মনে নেই, কিন্তু সে ঠিকই মনে রেখেছে।

এখন সেকথা মনে করে আমায় লজ্জায়ই ফেলে দিলো। গায়ে-গতরে ভদ্দরলোকি স্বভাব, তা দিয়ে অস্বীকারও তো করা যায় ওই পরিচয়ের সূত্র। না বাপু, তোমায় চিনিনে, দেখিনি কোনোকালে! আবার উলটোটাই তো তার দিক থেকে, বন্ধু, আছো তো ভালো! কতদিন দেখা হয়নি। এতদিন কোথায় ছিলেন?

পথের মানুষদের এই স্বভাব। জিপসি যাযাবর মানুষ সে-স্বভাব নিয়েই পথ হাঁটে। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী পথকেই ঘর মনে করে। বাউল পথেই ক্ষণিকের আখড়া বানায়। যেখানে দেখা মানুষকেই ওগো পথের সাথি বলে বুকে জড়িয়ে ধরে। কাছে টেনে নেয়, আবার দূরে চলে যায়। আবার দেখা হলে চিনতে পারে। একদিন এই পথে, ওই জায়গায় এই দিনে ওই ক্ষণে দেখা হয়েছিল, সেদিন আমাদের দুজনেরই গন্তব্য ছিল একই, অন্তত একমুহূর্তের জন্যে। তারপর পথ গিয়েছিল বেঁকে। আবার সব পথ এসে যদি কখনো কোনোদিন কোথাও মিলে যায়। সেদিন দেখা হওয়ামাত্র চিনে নেওয়া। আজ আমি চিনতে পারিনি সেই চেনাটাই। সে চিনেছে সত্যি! একেবারে পরিচয়সমেত। আমার সেদিনের সঙ্গীর গড়নও নির্ভুল। এখন উপায়, এখন আমি পিছিয়ে আসি কী করে?

নদীর ওপারে ফেরি আটকা পড়েছিল। আমি আর আমার সেই সঙ্গী সেদিনের মতো কাজ থেকে ফিরছিলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। ফেরি আটকা পড়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না। সচরাচর যে-পথে আসি, তার থেকে এই পথ একটু শর্টকাট। শুধু ফেরি পার হতে হয়। মাঝেমধ্যে যখন এ-পথে এসেছি, যানবাহনের ভিড় ছিল যথেষ্ট। এপার ওপার সচল। আজো তাই। এপারে চায়ের দোকানে বসে চা খেয়েছি। কিন্তু তখনো মনে হয়নি যানবাহন আজ একটু কমই আসছে। জানা ছিল অভিজ্ঞতায়, এমন হয়। একটু আগেই এপারের সবশেষ যানটাকে নিয়ে ওপার গেছে ফেরি। আর সেটা আমরা দেখতে দেখতে এসে মিস করেছি। হতে পারে, জীবনে কতবার দেখতে দেখতে সামনে থেকে ট্রেন ছেড়ে যায়। কেউ ধরতে পারে, কেউ পারে না। কেউ দরজা থেকে হাত বাড়িয়ে দেয়। কারো হাত বাড়ানোই থাকে। পস্ন্যাটফর্মের লোকটি দৌড়েও সে-হাত ধরতে পারে না। এই তো ব্যাপার।

এ-ঘাটের যাত্রী হিসেবে, ফেরির বিষয়টা আমাদের জানাই ছিল। এখন একটু সময় লাগবে। এই মাত্র ছেড়ে গেল। ওপারে যাবে। খরস্রোতা কুশিয়ারার গভীর বুক চিড়ে তখন কাকচক্ষু পাহাড়ি জল। স্বচ্ছ কিন্তু বালু আর পাথর মিশে থাকায় একটু ভারী। কদিন আগে ঢল নেমেছিল। তারপর আবার শুকিয়েছে। একটানে সে জল নিচে মেঘনায় চলে গেছে। দুই পাড় একেবারে ক্যালানো যেন সব দাঁত বেরিয়ে গেছে। বর্ষায় নদী কত গভীর মাঝনদীতে থাকলে তা বোঝা যায়। বাংলার প্রতিটি নদীর চরিত্র আলাদা। এক নদীর সঙ্গে অন্য নদীর জল যেমন মিশ খায় না, তেমনি খেয়ার নৌকার কি বৈঠা গড়নও পৃথক। হয়তো প্রতিটি নদীর স্রোতের আলাদা আলাদা আড় বুঝে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নদীমাতৃক এই জনগোষ্ঠী নিজের প্রয়োজনেই এই কারিগরি রপ্ত করে নিয়েছিল।

সে যাক। কুশিয়ারার এই শিবপুর ঘাটের ফেরি নিয়ে কথা হচ্ছিল। সে ফেরি ওপারে গেছে। আমরা অপার হয়ে বসে আছি এপারে। ফেরির প্রতীক্ষায়। সেজন্যে দ্বিতীয় কাপ চা-ও শেষ। চাইলে এতক্ষণে হয়তো নৌকায় পার হওয়া যেত। একবার পন্টুনের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আজ একজন মাঝিও নেই। কেন কে জানে। যানবাহন কম বলেই হয়তো। তবে কি সব চন্দরপুরের দিকে ছুটেছে। নাকি অন্য কোনো বিষয়। হতে পারে, একজন বলেছিল, এ-ঘাটের একটা ফেরি আজ না কাল চন্দরপুরের দিকে নিয়ে গেছে কোনো দরকারে। তাহলেও তো এখন এখানে অন্তত সিএনজি অটোরিকশার যাত্রীর ভিড় থাকার কথা ছিল। তাও তেমন নেই।

কী জানি। আজ হয়তো পঞ্জিকায় কি রাশিচক্রে আমার জন্যে লেখা আছে যাত্রা নাসিত্ম। অথবা, যাত্রা অশুভ। কিন্তু সকালবেলা তো ভালোভাবেই এসেছিলাম, পরিবহনের নাম ছিল শুভযাত্রা। তাহলে, যাত্রা নাসিত্ম নয়; বরং, যাত্রা সামান্য অশুভ অথবা কিঞ্চিৎ সংকটপূর্ণ! আহা কতকাল পঞ্জিকা দেখা হয় না, এমনকি খবরের কাগজের রাশিফলের পৃষ্ঠায়ও তো দেওয়া হয় না চোখ। এমন ভবিষ্যদ্বাণী ছিল কি-না, আজ ঘরে ফিরে দেখতে হবে!

এ-সময় জানা গেল, ওপারে ফেরি খারাপ হয়েছে। যে-যাত্রীরা সরাসরি যানে পার হবে তাদের একজন অন্যজনকে জানাল সে-সংবাদ। শুনে, আমি আমার সঙ্গীর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমরা কাটা-পথের। দ্রম্নত যাবার জন্যে এভাবে আসি। আমাদের দুজনের সঙ্গে সিএনজিতে আরো যে তিনজন এসেছিলেন, তারা আশেপাশের। ওপারে যাবে না। তাই হয়তো আমাদের সঙ্গেই কোনো চায়ের দোকানে ঢুকে, তারপর বাড়ির দিকে চলে গেছে। এতক্ষণে দুপুরের খাবার খেয়ে নাক ঢেকে দিবানিদ্রায় নিশ্চয়ই তাদের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।

মানুষ ভেতরে ভেতরে অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। যেন আমরা মাত্র দুজন ওপারের যাত্রী না হওয়াই ছিল ভালো। সঙ্গে আর কেউ নেই কেন। তাই সহযাত্রীদের নিশ্চিতে বাড়ি চলে যাওয়াটা ভেতরে ভেতরে কষ্ট দিচ্ছে। নাকি খাওয়ার চিমত্মা। এ-ঘাটের হোটেলগুলোয় ভাত-মাছ পাওয়া যায়। এই নদীর মাছ। একটু আগে পন্টুনে গিয়ে দেখেছি, সেখানে তো বটেই, এর কাছাকাছি নদীর কূলে বড়শিতে মাছ ধরছে কয়েকজন। ছিপ নেই। সুতোয় বাঁধা বড়শি। আধার গেঁথে দূরে নদীর অনেক খানিক ভেতরে ছুড়ে দেয়। তারপর বসে থাকে। শুনেছি, বোয়াল বাঁধে। যদিও আজ পর্যন্ত কোনোদিন চোখে পড়েনি। সেই মাছ এই হোটেলগুলোয় বিক্রি করে কেউ। আশেপাশে হাওর আছে। এখন হাওরের জল শুকিয়ে গেছে। হাটে বাজারে মাছের অভাব নেই এ-অঞ্চলে।

এসব জানা থাকার পর এই হোটেলগুলোর একটাতেও দুপুরে ভাত-মাছ খাইনি। চা-শিঙাড়া খেয়েছি শুধু। এখন বেলা গড়িয়ে পশ্চিমে চলে গেছে। পেটে ঘণ্টাখানেক আগে যে শিঙাড়াটা পড়েছিল তার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। খেতে যদি হয়, তা গোলাপগঞ্জ গিয়ে। বনরাজ হোটেলের পরোটা আর ছোলার ডালের সঙ্গে আলুকুচির ঝোল আর পোড়া শুকনো মরিচের স্বাদ দারুণ!

নিজেদের জানালাম, হয়তো মনে মনেই, সে হবেক্ষণ। আগে তো ওপারে যাই। এভাবে ফেরি বন্ধ হলে, নদীর ওপারে গেলেও তো গোলাপগঞ্জ যাওয়ার কিছু জুটবে কি-না সন্দেহ! তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় কী। উপায় নেইও। এখনই তো প্রায় মাথায় হাত দিয়েই বসে আছি।

এই সময় পন্টুনের দিক থেকে হাঁক শোনা গেল, ওপার! ওপার!

তাহলে এতক্ষণে সে এসেছে। যে নিয়ে যাবে ওপারে। কিন্তু আমাদের মনের তলানিতে তো শঙ্কার শেষ নেই। নৌকায় গেলে এতক্ষণে যে কোনোভাবে হয়তো যাওয়া হতো। এই পন্টুন থেকে না-হোক, দোকানগুলো রেখে নদীর পার ধরে একটু এগিয়ে গিয়েও তো উঠতে পারতাম ওপার যাওয়ার একটা নৌকায়। কেউ কেউ হয়তো সেভাবে এই ভবনদী পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু নেড়ে ঠেকলে বেলতলায় আবার যেতে পারে, কিন্তু ঘরপোড়া গরু সিঁদুর মেঘ দেখলে বাড়ির পথ ধরে।

এই নদীতে, এই পন্টুনেই, এখানে, এই যে সামনে, ও জায়গায়ই, এক ভরা বর্ষায় নৌকায় উঠতে উঠতে, সে নৌকা তলিয়ে আমাদের দুজনেরই একদিন ডুবে মরার দশা হয়েছিল। সঙ্গে যারা ছিলেন, প্রত্যেকেই, যদি আঁকড়ে পন্টুনের সামনে ফেরিতে গাড়ি ওঠার বাড়িয়ে-রাখা পাটাতনটা কোনোভাবে না-ধরতে পারতাম, যদি ঝুলে না-থাকার সুযোগ হতো, যদি সেই ঝুলে-থাকার মুহূর্তে পাশে থেকে অন্য নৌকা এসে উদ্ধার না-করত আর ওপর থেকে কেউ টেনে না-তুলত, তাহলে নদীতে পড়তাম। বাঁচতাম হয়তো। কিন্তু সেদিন স্রোত ছিল তীব্র। ঘাড়ে ছিল সাইড ব্যাগ। ভেসেও তো যেতে পারতাম। এখন জল টানার পরও এই শান্ত কুশিয়ারার কূলে দাঁড়িয়েও সেই ভয় যায় না। সেদিন সঙ্গের সহযাত্রীরা বলেছিল, এরপর যদি দুদ- দেরিও হয় হবে, তবু আর কখনোই জীবন বাজি রেখে ওভাবে নৌকায় আসার কোনো অর্থ নেই। হুঁ, যার ব্যাগে ছিল প্রায় লাখখানেক টাকা, তিনি বলেছিলেন, যদি ভেসে যেত এই ব্যাগ, তাহলে কাল অফিসকে কী জবাব দিতাম।

কিন্তু এখন নিরুপায়। ওই নৌকাই অগতির গতি! যেতে হবে। ফেরি ভালো হবে না। এটা আসলে নষ্ট ফেরি, কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে একদিন চালানো হয়েছিল। ভালোটা চন্দরপুর নিয়ে গেছে। ওটা না-আসা পর্যন্ত এই লাইনে আর ফেরি চলবে না। এখন ফেরারও উপায় নেই। সামনে যেতে হবে। নৌকাই একমাত্র সম্বল। তাও সংখ্যায় বিরল। এখন যা পাওয়া যায়, যেটা পাওয়া যায়। তবে একটা যখন পাওয়া গেছে, ওটাই একবার ছেড়ে ওপার দিয়ে আসতে আর কতক্ষণ! তবে, দেরি হয়ে গেছে। বিকেলের দিকে গড়িয়েছে দিন। এখন চাখানা থেকে গাত্রোত্থান করা দরকার!

সঙ্গীকে বললাম, ‘চলুন যাওয়া যাক, যদি ওপারের খেয়া পাওয়া যায়!’

তিনি আমার দিকে চোখে রহস্য ঝুলিয়ে তাকালেন, কারণ এই যে খেয়াঅলা ওপার ওপার বলে ডাকছে সে তবে যাবে কোথায়!

যাবে কোথায়, তা তিনি দেখার সুযোগ পাননি। দোকানের ভেতরে সামনে খালি চায়ের কাপ নিয়ে বসেছিলেন। আমি বাইরে, পন্টুনের দিকে চোখ, খেয়ার সেই বারকি নাওখানা ছেড়ে গেছে। আর একখানা এখনো দেখা যাচ্ছে না। পন্টুনের কাছে গেলে ওখানা ফিরে আসার পরে জায়গা পেতে পারি। আর এর ভেতরে যদি আশেপাশে থেকে আর একখানা এসে উদয় হয় তো মুশকিল আসান।

তিনি হাসলেন, পন্টুনে তাকিয়ে। আমার রহস্য বুঝতে পেরেছেন। অনুমান করে নিয়েছেন, ওই যে মাঝগাঙে নাওখানা যাচ্ছে, ওখানা ফিরে এলে যাওয়া যাবে। একখানা নৌকা যখন এসেছে, আরো আসবে অথবা ওখানাকেই উঁচুগলায় ডেকে আনা যাবে ওপার থেকে। বিকেল হয়ে এলে আরো তো মানুষ আসবে, তখনো কি নৌকা জুটবে না!

আমরা পন্টুনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনে কুশিয়ারা। যে জায়গা থেকে নেমে নৌকায় ওঠার পরে গত বর্ষায় আমাদের নৌকা ডুবেছিল, সেখানে নিচে তাকালাম। দুজনের চোখেই সে-স্মৃতির রোমন্থন হলো যেন। কিন্তু ও নিয়ে কথা নেই। এক মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় অমন ঘটেছিল। কী হতো সেদিন একটুক্ষণ ফেরির জন্যে অপেক্ষা করলে! সন্ধ্যার পরে, ওই অন্ধকারে অমন করার কোনো দরকারই ছিল না! অনেকবারই সেই সন্ধ্যার হঠকারিতা নিয়ে কথা হয়েছে, তা নিয়ে বাড়তি কথা অপ্রয়োজনীয়। বরং এখন কীভাবে ওপারে যাওয়া যাবে, নৌকা এসে কোথায় দাঁড়াতে বলতে হবে, সেসব দেখে নিয়ে ওপারে তাকিয়ে থাকা!

তখন পিছনে ঘুরতেই দেখি, একটি মেয়ে। প্রায় বেদেনির সাজ। মাজায় শাড়ি প্যাঁচানো। কোমরের কাছে ধরা একটা পুঁটলি। হয়তো আমাদেরই মতন ওপারে যাওয়ার জন্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা তার দিকে তাকালাম। বুঝতে চাইলাম, সেও যাবে কি-না।

মেয়েটা ছোটখাটো। গায়ের রং ফর্সা। ঠোঁটে একটু আগে লাগানো হালকা লিপস্টিক। চুল দুই বেণি-বাঁধা। বয়েস আনুমানিক কুড়ি ছাড়িয়েছে। এই ফাঁকা পন্টুনে তার দুই সহযাত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় জড়তাহীন। জানি, আমরা জিজ্ঞাসা না-করলে সে-ই বলবে অথবা জানতে চাইবে, আমরা ওপারে যাব কি-না। অথবা এমন অপেক্ষমাণ মানুষ দেখে তো এমনিতে তার বোঝার কথা। যদি সেও যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সঙ্গী হবে।

তাই হলো। এ-সময়ে আমাদের সঙ্গে একটি কথাও বলল না, পন্টুনের থেকে নদীর তীরে তাকিয়ে যেন সে জলে ছায়া দেখার চেষ্টা করল। তারপর ফিরে গেল পারের দিকে। সেখান থেকে উলটো ফিরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল একটুক্ষণ। ওপারের নৌকাটা সবে পাড়ে ভিড়েছে। যাত্রী না-হলে এখনই এপারে আসবে না। একটুক্ষণ অপেক্ষা করবে। দেখবে যাত্রী পায় কি-না। তারপর ধীরে ধীরে চলে আসবে এপারে। আমাদের নেবে। এসব আমাদের যেমন জানা আছে, এই মেয়েটির উত্তাপ ও উত্তেজনাহীন চাহনিতে বুঝতে পারি, সেও জানে।

তবে এই মুহূর্তে তার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, ওপারে চেয়ে থাকার ভঙ্গিটা দারুণ! এমন সচরাচর আমাদের নাগরিক চোখে ধরা পড়ে না। অদ্ভুত লাগছে। কখনো আসা-যাওয়ার পথে বাস-রাস্তা থেকে বেদের আবাস দেখেছি এক-দুটো। আজকাল নৌকায় তাদের প্রায় চলাচল নেই। হয়তো ভ্যানে করে কাছাকাছি কোথাও যায়। নৌকার ছইয়ের মতন দেখতে ছোট ছোট ঘর তোলে ফাঁকা কোনো মাঠের প্রান্তে। আট-দশটি অমন অস্থায়ী ঘর। মাঝখানে এক চিলতে উঠোন। সেখানে হামাগুড়ি দেওয়া থেকে একটু বড়ো শিশুরা খেলা করে। দুই-একজন পুরুষ থাকে। নারীরা জীবিকায়। দিনের প্রথম কি শেষভাগ হলে প্রায় সবাইকেই দেখা যায়। ওসময়ে,
গ্রাম-গ্রামান্তরে হেঁটে আসা কোনো নারীকে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার সুযোগও থাকে না। তখন ওভাবে কেন দাঁড়াবে তারা। এখন পথক্লান্ত এই নারী ওপারে যাওয়ার বিরতির সময়টুকুও এভাবে দাঁড়িয়েছে। যেন এই তার সারাদিনের কাজের শেষে বিশ্রাম।

এ-সময় নদীর পাশ থেকে, আমাদেরই প্রায় অগোচরে পন্টুনে একখানা বারকি নাও এসে দাঁড়াল। মাঝি ওপরে চোখ তুলে তাকিয়েছে। আমাদের নিয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গী জানতে চাইলেন, কই ছিল সে। জানাল সে-কথা। দুপুরে খাওয়ার জন্যে বাড়ি গিয়েছিল। এসে নদীর কূলে বসে দেখে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাই তাড়াতাড়ি এসেছে। নয়তো আর একটু বাদে আসত।

আচ্ছা, বোঝো অবস্থা। এই হেমন্তের মাঝামাঝি, দুপুরে খাওয়া সেরে একপ্রস্ত ভাতঘুম দিয়ে আবার কাজে বেরিয়েছে মানুষ। আর আমরা এখনো পথে। শুধু পথে নই, একেবারে অনিশ্চিত গন্তব্যে! এইমাত্র ওপারে নেওয়ার কা-ারি এসে হাজির হলো। অপার আমাদের এখন পার করবেন।

কিন্তু ওই জায়গা থেকে তো নৌকায় ওঠা যাবে না। আমার সঙ্গী সেকথা মাঝিকে মনে করিয়ে দিলেন। আর মাঝিও দেখি সঙ্গে সঙ্গে মনে করতে পারল, সেই সন্ধ্যার কথা। ছোকরা বলে স্মৃতি টাটকা। নাকি অমন ঘটনা কমই ঘটে। সেদিন সে কাছেই ছিল। সেই নৌকাখানা ছিল তার চাচাত ভাইয়ের। সে-কথাও মনে করিয়ে দিলো। পরে আমাদের ওপারে দিয়ে এসেছিল তার ছোট চাচা! দেখো কা-, যে-কথা যতভাবেই ভুলতে চাও না কেন কারো কারো কাছে তা একেবারে গল্প হয়ে রয়। আর একটু টোকা পড়লে খুলে নিয়ে বসে একেবারে খোল-নলচেসমেত।

পন্টুনের খুব নিরাপদ জায়গায় মাঝি নৌকা ভেড়াল এবার। একটু সিঁড়িমতনও আছে। অনায়াসে নৌকায় উঠে বসা যাবে। উঠবার সময় যেন একটু সামলে উঠি, নৌকায় যেন বেশি দোলা না লাগে। পুরনো ভীতির কারণে আমি আর সঙ্গী তাই করলাম। জোয়ান মাঝির নির্দেশ বলে কথা। নিজেও হুশিয়ার সে। পন্টুনের একপাশ সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল।

মেয়েটা তখন আমাদের পিছনেই। আমি আগে নৌকায় উঠে পিছনে তাকিয়ে সঙ্গীর ওঠা লক্ষ করছি, ধরেছি পন্টুনের একপাশ। বারকি নৌকা বড়ো দোল খায়। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ করছি, সে আমাদের সঙ্গী হয় কি-না। তেমন উদ্যোগ তার আচরণে নেই। নৌকার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকল। উঠল না। কারণটা বুঝলাম একটু বাদে। সে জানে, দুজন নিয়ে নৌকা ছাড়বে না এই নওজোয়ান মাঝি। অন্তত চারজন লাগবে, পাঁচজন হলে আরো ভালো। ওদিকে আমাদের পেটে এতক্ষণে ছুঁচো ডন দিচ্ছে। নৌকায় উঠেছি, ওপার যাব এখনই, কিন্তু গোলাপগঞ্জ কতক্ষণে যাব তার ঠিক নেই। সেখানে না-গেলে খাওয়াও নেই। ফলে একটুবার চেয়ে মাঝিকে প্রস্তাব দেবো। দুজনে দেবো চারজনের ভাড়া, তুমি ভাই ছাড়ো, ওপারে তুলে দাও। ওপার গিয়েও তো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একটা সিএনজি অটোরিকশাও জুটবে বলে মনে হয় না।

আমার সঙ্গী তাই-ই বললেন, ‘ছাড়িদাও বা, দিরাম আমরা আর দুইজনোর ভাড়া!’ মাঝিও রাজি। যেন এই প্রস্তাবের জন্যেই অপেক্ষায় ছিল সে। আর তখনই, ওই মেয়েটি প্রায় লাফিয়ে মাঝির উলটো দিকে নৌকায় উঠল। এখন আমাদের মুখ তার দিকে। মাঝির সামনের গলুইয়ে আমার সঙ্গী আর তার পরেরটায় আমি। মাঝির দিকে পিঠ। তার মুখ মাঝির দিকে। আমরা মুখোমুখি। সে লাফিয়ে উঠতেই মাঝি যেন একটু বেজার।

তাও যেন স্বাভাবিকই। জোয়ান মাঝির ভঙ্গিটা এমন, তুই ভাই যাবি আগে বললেই হতো। আবার ভেতরে খবরটাও তো তার হয়তো জানা, এই বেদেনি ভাড়া দেবে না। লোক ওঠা শেষ হলে তারপর এভাবেই উঠবে। তাই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। আমাদের সঙ্গে মাঝির রফা হলে তারপর উঠে বসেছে। মানে, এরাই তো তোমায় দেবে চারজনের ভাড়া, তো এখন আমি উঠলেই কি আর না উঠলেই কি। শতেক ঘাট ও বারোরকম মানুষের সঙ্গে মিশে, জীবনের নানা সুবিধা-অসুবিধায় ঠোক্কর খেয়ে এদের আসলেই জানা আছে কীভাবে পথ চলতে হয়। জীবনকে চালিয়ে নিতে হয়। প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ধৈর্য ধারণ করতে পারে। কখনোই হতাশ হয় না, সুযোগকে কাজে লাগাতে জানে।

এই যেমন, মাঝির বেজার মুখখানাকে ভালো করতে যেন সেদিকে ফিরে সে হাসল। হাসিটা সুন্দর। মাড়ির ডানদিকের খানিকটা বেরিয়ে পড়ে। তারপর বলল, ‘আইজ পানিতে কোনো রাগ নাই।’

অর্থাৎ, প্রায় স্রোতহীন। হ্যাঁ, পাহাড় থেকে ঢল নামা শেষ। এ-বছর আর তা ঘটার সম্ভাবনাও নেই, যদি হঠাৎ প্রকৃতি খেয়াল না পালটায়। সাধারণত তা ঘটে না।

মেয়েটির এই কথায় মাঝি বলল না কিছু। হাসির জবাবও দিলো না। এই আচরণে এটুকু অন্তত বোঝা গেল, এদের এমন ব্যবহারে সে অভ্যস্ত। ঘুরিয়ে নিল মুখ। মেয়েটি তখন আমাদের খেয়াল করল। এখন ওপারে নামার পরে, মাঝির সঙ্গে যা হিসেব আমাদের। সে যেন আমাদেরই সহযাত্রী।

আমার সঙ্গী বললেন, ‘এই জায়গায় কতদিন ধরি?’

সে জানাল, মাসখানেক।

তারপর একটু উদাস ভঙ্গিতে নদীর দুই দিকে তাকাল। রোদ মরে এসেছে। প্রায় মাঝনদীতে নৌকার গলুইর একেবারে সামনে একটি মেয়ে। ভেতরের দিকে ফেরা। গায়ে একটু হলদে রঙের ছাপা শাড়ি। লাল রঙের বস্নাউজ। পা ছড়িয়ে বসায় শাড়ির নিচের সবুজ সায়ার একেবারে নিচের পাড় খানিকটা বেরিয়ে আছে। আমাদের দিকে তার মনোযোগ নেই। আবার আছেও, যদি প্রশ্ন করি তাহলে নিশ্চয়ই উত্তর দেবে। কিন্তু তার আগে একটু আগে কথার জবাব দিলো যেন, ‘এই যে চন্দরপুর আছে না -’ সে ডান হাতের তর্জনী তুলে দেখায়। হা, কুশিয়ারা সেদিকে পুব মুখে নেমে গেছে। সেদিকেও একটা ফেরিঘাট আছে। ব্রিজ হচ্ছে। তখন এই ফেরিঘাটটাই হয়তো আর থাকবে না। ওদিক থেকেও আমাদের যাওয়া-আসা আছে। নদী সেখানে আরো প্রশস্ত ও গভীর। একটু পরেই হয়তো এই নদীতে কোনো আন্তর্দেশীয় জলযান পণ্য বহন করে সুতারকান্দি স্থলবন্দরের পাশ ধরে চলে যাবে শিলচরের দিকে। অর্থাৎ তার হাতের বাঁয়ে। ওই যে তাকালে খাসিয়া-জৈমত্মা পাহাড়ের ছাপ দেখা যায়। সেদিকে এখন আর আমাদের চোখ পড়বে না। বরং উলটোদিকে, নদীর স্রোত যেদিকে নেমে যাচ্ছে, সেদিকে সে আমাদের দেখতে বলল। তাকালাম। কিন্তু সামনেই বাঁক নিয়েছে নদী। ওদিকে তাকিয়ে আর কী। বরং, তার কথামতো দিঙ্নির্দেশনা মেনে নিই।

তাহলে, ওইদিকে ওই চন্দরপুর ফেরিঘাটের কাছে, সেখানে আছে তাদের বহর। মেয়েটি জানিয়ে চলল। মনে হলো, কোনো কারণে আজ এদিকে ফেরি বন্ধ হওয়ায় তার সঙ্গী-সাথিরা এদিক থেকে চলে গেছে। সে গিয়েছিল ভেতরের দিকে কোনো গ্রামে। ফিরে এসে এই ফেরিঘাটের কাছে আর তাদের কাউকে পায়নি। এ-খবর তার জন্যে মোটেও দুঃখজনক নয়, কথার ভঙ্গিতে মনে হলো। এমন ঘটনা ঘটে থাকে। কীভাবে নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে হয়, জানা আছে এই স্বাধীনচেতা নারীর। স্বাধীনচেতা, অন্তত তার একটু আগের অতীতকে শুনে তাই মনে হলো। সবাই মিলে বেরিয়েছে, এই বহরগ্রাম শিবপুরের আশেপাশের গ্রামে একজন-দুইজন গিয়েছে। তারপর হয়তো সবাই এক জায়গায় যখন মিলিত হওয়ার কথা, তখন সে একটু দেরিই করে ফেলেছিল। সঙ্গীরা উলটোদিক দিয়ে ফিরে গেছে বহরের কাছে। জানে সে যেতে পারবে। এখনো ওদিকে যানবাহন কমে আসায়, সে ধরেছে আরেক পথ। ওপার যাবে, সেখানে থেকে গোলাপগঞ্জের দিকে যাবে খানিকটা, তারপর বাঁয়ের হাতায় ঢাকা দক্ষিণের দিকে গিয়ে চলে যাবে চন্দরপুর। এ কদিনে এ-অঞ্চলের পথঘাট তার ভালোই চেনা আছে। অথবা নদীর পাড় ধরেই হেঁটে সামনে কোনো রাস্তায় উঠবে।

আমার সঙ্গী তাই বললেন আমাকে, ‘জানেন তো, জিপসি যাযাবরদের ঐতিহ্য?’

‘হুঁ, পথ হেঁটে পথ চিনে নেয়।’

আমাদের এ-কথা সে খেয়াল করল না। বরং, আমাদের কাছে যেমন তার পরিচয় খোলাসা হয়েছে, তবে সে কেন আমাদের পরিচয় সাকিন ঠিকুজি-কুলজির হিসেব নেবে না। যত কেতাদুরস্তই লাগুক, সেও বারোবাজারের মানুষ দেখে আর চড়ায় বা চিন পরিচয়, এখন আমাদেরটা নিতে তো কোনো দোষ নেই। সঙ্গী জানালেন, একটা কাজে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে এই পথে যাই।

নৌকা পারে যেতে আর বেশি বাকি নেই। কিন্তু পারের এদিকে স্রোত। তাই একটু উলটোদিকে যেতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে কূলের দিকে। আর নামার ব্যবস্থাও এপাশের পন্টুনের গা-ঘেঁষে নয়। আর-একটু ভেতরে নদীর পাড়ে। নৌকা যতটা সম্ভব হালকা চরের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হবে। তারপর পাশাপাশি বাঁধা কয়েকটা নৌকার ওপর দিয়ে আমরা যাব ডাঙায়।

সঙ্গী বললেন, ‘অনন্তকাল ধরে এইভাবে হাঁটছে।’

‘হুঁ।’

তখনই, মেয়েটি একটু উদাসভাবে যেন আমাদের বলছে না কিন্তু আমাদের কথা ধরে উত্তর দিয়ে গেল, ‘হাঁটন ছাড়া উপায় কী? হাঁটনেই পেটের ভাত হয়।’

এবার বিস্ময়ে তার মুখে তাকাই। সেখানে রোদ। একগোছা চুল তার মুখে পড়েছে। সেটা সরাল আলতো করে। পোটলাটা ডান-পাশ থেকে আনল বাঁ-পাশে। অনাদি অনন্তকাল এভাবে হেঁটে চলছে এই মেয়ে। আরো হাঁটবে। পৃথিবীর অগম্য প্রান্তরে হেঁটে যাবে। নদী থাকলে সে থাকবে। যদিও এখনই নদীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমেছে। তবে মানুষ থাকলে থাকবে। কিন্তু আজকাল তাদের বিদ্যায় মানুষ সাড়া দেয় কম। সেই যে ছোটবেলায় হঠাৎ দেখতাম আমাদের শহরের রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে হাঁক দিচ্ছে। একসঙ্গে দুই-তিনজন। পাশাপাশি দু-তিনটে বাড়িতে এক-একজন করে ঢুকে যেত। অথবা একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটু কর্কশ সুরেলা গলায় জানাত, বাতের বিষ ঝাড়াই, পুরান বেদনা সারাই, দাঁতের পোক ফেলাই। অর্থাৎ, এ-কাজে তোমাদের দুয়ারে এসেছি, যদি প্রয়োজন তো জানাও। কারো আঁচলে শক্ত করে কোমরে বাঁধা থাকত কোলের শিশু। হঠাৎ সে কোনো গাছতলায় অথবা বাড়ির সামনের সিঁড়িতে বসে শিশুকে মাই দিত। ওদিকে তাদের আগমনে কোনো কোনো উন্মুক্ত বাড়িতে এ-কথাও বলত কেউ কেউ, এই রে বেদেনিরা আইছে, কোন জিনিসটা যে হাতে বাঁধিয়ে নিয়ে যায় তার ঠিক আছে। সামলে রাখ। কবে কোন বাড়ির সামনে থেকে রাতে রাখা একটা হারিকেন নাকি এই বেদেনিরা নিয়ে উধাও হয়েছিল।

কিন্তু তখন তাদের সত্যি ডাক পড়ত। তাই পেটে ভাত ছিল। কিন্তু আজ? কী জানি, যদি কোথাও কিছু না-ই জুটবে তাহলে এভাবে জলকাদা বর্ষা মাড়িয়ে রৌদ্রহীন কি রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এত কষ্ট মাথায় নিয়ে তারা কেন পথ হাঁটে!

‘তা তো সত্যি। সবাই ভাতের লাগি হাঁটতে বাইর হয়।’

এই বলে আমার সঙ্গী তার কথায় সায় দিলে, সে জানাতে চায়, ‘ভাইর বাড়ি সিলেটে।’

সঙ্গী ‘জি অয় অয়’ বলার পরে তার কাছেই জানতে চায়, আমার বাড়ি কোথায়। সেটা বলে, তার বাড়ি কোথায় জানতে চেয়ে তিনি যেন একটু ভুলই করলেন। ওদের বাড়িঘর, জাত-ধর্ম তো প্রায় থাকতে নেই। তবু জানাল গাজীপুর-ময়মনসিংহ এই এলাকার একটা জনপদের নাম। সেখানে নাকি তার বাবা থাকে। ওই জায়গায় আবার ফিরে যাবে। একটু অবোধ্যই থাকল বিষয়টা। সেটা সে স্পষ্ট করার আগে আমি সঙ্গীকে বললাম, বাঙালির চোখে তারা ছোট জাত। আর ধর্মের দিক থেকে বহুকাল তারা নিধর্মী। বাংলায় এখনো বেদেদের একাশং প্রচলিত কোনো ধর্মের আশ্রয়ে আসেনি। আরো কাছে কোথাও কোথাও বাজনদার আর ধুনচিরা – ওই যারা লেপ-তোশক বানায়।

আমাদের আলোচনা সে শুনেছে। তখন অবশ্য জানাচ্ছিল, সে কাদের সঙ্গে ওখান থেকে কতদিন ধরে এসেছে। কিন্তু আমাদের আলোচনা শুনে উত্তাপহীনভাবে তার ধর্মপরিচয়ও জানিয়ে দিলো। তারা ঈদ করে। কোরবানি দেয়।

সঙ্গী তখন আমায় জানালেন, প্রায় মেইন স্ট্রিমের সঙ্গে মিলে গেছে।

জানতে চাইলাম, ‘আবার কবে ফিরে যাবেন?’

‘এই পানি টানলেই।’

‘পানি টানলেই, কোনদিকে যাবেন?’

‘ঢাকার দিকে।’ ঈষৎ হাসল। আমার উচ্চারণ তার মতো হয়নি, ‘গাজীপুর-ময়মনসিংহ চেনোইন।’

‘চিনি। চেনব না কেন?’

‘গেছোইন?’

‘হুঁ -’

‘কবে গেছোইন?’

জানালাম। নৌকা তীরের কাছে। আমার সঙ্গী তাকে জানিয়ে দিলো, আমি কেন তাকে এই প্রশ্ন করছি। যেন প্রশ্ন করে এখনই এই মানুষটাকে নিয়ে লিখতে বসে যাব। অথচ, সে কী বুঝল কে জানে। দুজনকে অবাক করে বলল, ‘মানুষ দেখলেই সব বুঝি!’ সে আমাকে দেখেই নাকি তা বুঝে গেছে।

আমি একটু কপট রাগের চোখে সঙ্গীর দিকে তাকালাম। তিনি হাসছেন। ভাবটা এই, এবার ঠেলা সামলাও। অথচ সাধারণত ঠেলা সামলানো কী, উলটো ঘটে। এমন কোনো উদ্দেশ্য থাকুক কি না-ই থাকুক লক্ষ করেছি, পরিচয়পর্ব উন্মোচিত হলেই মানুষের কথা বলার ধরন বদলে যায়। সে খোলসে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে বের করে আনতে সময় লাগে। কখনো উলটো পথে হাঁটতে হয়। তার চেয়ে স্রেফ আলাপে, এ-কথা বলায় ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হওয়া বা জানাশোনা একটু এগোলে বরং মানুষকে জানা সহজ হয়।

এদিকে আমরা আর যেন বিষয়টা পাত্তা দিলাম না। অথবা আমি একটু উদাসী ভঙ্গি করলাম। আর সঙ্গী নৌকার ভাড়া মিটিয়ে নেমে আসার আগে তার কাছে জানতে চাইলাম, এখন এই শিবপুরের গ্রামের দিকে সে যাবে কি-না? সে জানাল, বেলা পড়ে গেছে। বেশিক্ষণ পথে থাকতে পারবে না। নদীর পাড় ধরে এগোবে। মাঝখানে হঠাৎ ঢুকে পড়বে কোনো গাঁয়ে।

চোখে সূর্য পড়ায় মাথায় আঁচল তুলে দিলো সে। এককোনা দিয়ে মুখটাও মুছে নিল। তারপর একবার চোখের দিকে তাকিয়ে ডানহাতটা একটু তুলে কিছু না-বলেই নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকল। একবার ফিরল, এবার তাকাল আমার সঙ্গীর দিকে। হাসল। এই হাসিটাই তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া।

সঙ্গী বললেন, সাহস আছে। এই নদীর পাড় ধরে যাবে।

এবার একথা শুনে সে ফিরে তাকাল। চোখে আত্মবিশ্বাস। এইটুকু সাহস তো থাকতে হয়।

হুঁ, অচেনা পথ। নদীর পাড় ধরে ধরে, প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে নদীর পাড়ের একচিলতে মাঠে নিজেদের বহরের কাছে যাওয়া। সে যাবে, যেতে পারবে। পথ হারাবে না। এর ভেতরে নিজের পেশার কাজও করবে। জীবিকা বলে কথা। বলেছে সে, তাতে পেটে ভাত!

আমি সঙ্গীকে বললাম, ‘দেখলেন নামটা জানা হলো না!’

‘জানি আমি। বলেছে। সুমাইয়া!’

‘আমি তো শুনলাম না।’

‘আপনি মাঝির সঙ্গে কথা বলছিলেন, নদীর স্রোত নিয়ে, তখন।’



তিন

পিছনের কথা এতখানিক ভাববার সুযোগ কি সুমাইয়া আমায় দিয়েছে। তার আগেই আমার দিকে উলটো ফিরে সেদিনের দেখা হওয়াটা কেন মনে পড়ছে না, তা নিয়ে আরো কিছু কথা বলেছে। ওদিকে সে গোলাপগঞ্জে নামবে, কন্ডাক্টর তার কাছে আবার ভাড়া চেয়েছে আর সে আমার সঙ্গে জরুরি আলাপে ব্যস্ত তাই আবার ‘দিরাম’ বলেছে। তারপর যেন টাকা খুঁজছে এমন ভঙ্গির ফাঁকে আমি কন্ডাক্টরকে জানালাম, আমি দেবো।

এখন এদিকে আজ কোথায় এসেছিলাম, এটুকু জানানোর ফাঁকে বছরদুই আগে দেখা সেই মেয়েটির সঙ্গে আজকের আবৃত মেয়েটিকে মিলাই। কল্পনায় তার মুখ দেখতে চেষ্টা করি। সে-স্মৃতি খুব দানা বাঁধে না, জোড়াও লাগে না। তবু সেই নিঃসঙ্গ নির্ভীক আর স্বাধীন সুমাইয়ার নদীর পাড় বেয়ে নিজের গন্তব্যে হেঁটে যাওয়া চোখে ভাসে। একটু মোটা হয়েছে কি। নাকি আমার বোঝার ভুল। বাসে ওঠার সময়ে মনে হয়েছিল সে সালোয়ার পরে আছে। এর ভেতরে সে এটুকুও মনে করিয়ে দেয়, ‘মনে নাই? আপনার সাতের জনরে নামও কইছিলাম।’ সেই নামও বলে, ‘ছুমাইয়া!’ হা, আমাকে বলেনি অথবা আমার শোনা হয়নি। কিন্তু অতটা ভুলে যাওয়ার কথা আমার নয়। মনে পড়েছে, সে উলটোদিকে নদীর পাড় ধরে হেঁটে যেতে যেতে আমার সঙ্গী তার নাম বলেছিলেন।

কিন্তু, সে আর এখন আমার সামনে যে-জন – তারা একই মানুষ? এই আশ্চর্য-হওয়া আমার চোখে-মুখে। তার সঙ্গে কথা বললেও, আমি যে অবাক তা সে বুঝতে পারছে। সাতঘাট থেকে কানাকড়ি নিয়ে ফেরা এই মেয়ে, না, এখন আর মেয়ে বলা ঠিক হচ্ছে না, এই নারী আমার চোখের ভাষা যে নিমিষেই পড়তে পারবে, তাই তো স্বাভাবিক!

‘আপনারা আইলেন গোলাপগঞ্জের দিক, ওই শিবপুর দিয়া। আর আমি গাঙের কূল ধরি চন্দরপুর! চন্দরপুর -’

চন্দরপুর বলে সে থামল। সামনে তাকাল। এই রাস্তায় সামনে গোলাপগঞ্জ।

সুমাইয়া সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘গোলাপগঞ্জ নামতাম। আপনি কই যাইতা, সিলেট? নামোন গোলাপগঞ্জ, বাদের গাড়িতে যাইয়োন!’

কী সহজ প্রস্তাব। একটু মেঘলা দিন। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে চেয়েছিলাম গন্তব্যে। অথচ সুমাইয়া এখন এমন দাবিতে প্রস্তাবটা জানাল, আমার পক্ষে প্রত্যাখ্যান যেন অসম্ভব। তাছাড়া নিকলি থেকে এইটুকু পথ আসতেই, তার সঙ্গে আলাপে, তার অতীত ও বর্তমানের ফাঁকটুকু অথবা দূরত্বটুকু বুঝে নিতে আমার ভেতরে যেন কোনো জেদ চেপেছে। সেদিনের সঙ্গে আজকের মানুষটাতে কত তফাৎ! যদি কারণটা জানা যায়। বলবে তো সে, এখন তার সঙ্গে নামলে?
সে-কথাটুকু শোনার জন্যে এক জায়গায় বসতে হবে। আচ্ছা, বনরাজে গিয়ে বসা যেতে পারে। যদিও অনুমানে বুঝি, এখানকার হোটেলের ভেতরে হয়তো বেদেনিকে বসতে দেবে না। এখন সুমাইয়া তো আর বেদেনি নয়। সে-পরিচয় লুপ্ত। সাধারণ গৃহবধূ। এখন আমার সঙ্গী নারী।

তাই সই। সুমাইয়ার প্রস্তাবে রাজি। প্রস্তাবের ধরনেই তো বোঝা গেছে, সে আমায় কিছু বলতে চায়। আমি রাজি না হলে জোর খাটাবে না। নেমে চলে যাবে নিজের পথে। হয়তো আর কোনোদিনও দেখা হবে না।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। সুমাইয়া তখনো বসা। কন্ডাক্টরের কাছে গিয়ে ভাড়া দিলাম। সে জানতে চাইল, ‘সিলেট যাইতায় নায় কেনে?’

আমি, ‘কাজ আছে -’ বলে হেলপারের কাছাকাছি। বাস থামতে না থামতেই নেমে পড়লাম। থামলে সুমাইয়া নামল।

বাস-রাস্তা রেখে ভেতরের পথে হাঁটতেই সুমাইয়া আমার এদিকে এমনভাবে চাইল, বুঝলাম নেকাবের ভেতরে হাসছে সে। বলল, ‘আবার দেখা হই গেল!’ কথাটা এমনভাবে বলল যেন যেদিন ওই কুশিয়ারা নদীর পাড় বেয়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল সেদিন আমাদের ভেতরে যেন একথা হয়েছিল যে আবার দেখা হবে।

বললাম, ‘ভালো আছেন? সব খবর ভালো?’ এরপর ইচ্ছে ছিল জানাই তার পোশাকের এমন পরিবর্তনের জন্যেই চিনতে পারিনি।
সে-পরিবর্তনের কারণও সঙ্গে জিজ্ঞেস করে নিতাম। অথচ তার আগেই সে বলল, ‘আপনি আমারে আপনে কন কেনে? আমি আপনার কত ছুড!’

তা সে বলল বটে। কিন্তু বয়েসে যত ছোটই হোক পথের পরিচয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে কী করে তুমি বলি।

‘আচ্ছা, সে হবে।’ বলে কথা না-উলটে, ওই স্নেহের প্রশ্রয়ের জায়গা থেকেই যেন জানতে চাইলাম, ‘ওই নিকলির দিকে কোনো কাজে?’

সামনে বনরাজ রেস্টুরেন্ট। পরিচিত খাবারের দোকান। এখানে এই প্রায় সন্ধ্যার মুখে অন্তত এক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে। আমাকে আবার ফিরতে হবে। চন্দরপুরের দিকে যেতে হলে সুমাইয়াকেও ফিরতে হবে দ্রম্নত। তার গন্তব্য আমার অজানা। এমন তো হতে পারে, এই গোলাপগঞ্জেই সে থাকে।

সুমাইয়া বলল, ‘হুঁ।’ অর্থাৎ নিকলির দিকে কোনো কাজেই গিয়েছিল। এর বেশি এখন আর বলতে চায় না। আমি তার পায়ের গতি বুঝতে চাইলাম। বনরাজের সামনের ফুটপাতে দাঁড়ালাম, সে দাঁড়ায় কি-না, নাকি রাস্তার উলটোদিকে যেখানে চন্দরপুর অথবা শিবপুর যাওয়ার সিএনজি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে সেখানে চলে যায়। না, সে আমার সঙ্গে দাঁড়াল। আমার সংকোচটা যেন সে বুঝতে পারছে। অথবা আমার গন্তব্য বুঝে নিতে চাইছে। কিন্তু আমি তো নেমেছি সুমাইয়ার কথায়। ফলে বনরাজের দিকে আঙুল তুলে বললাম, ‘ওই জায়গায় যেয়ে বসি। চা-পরোটা খাওয়া যাবে।’

‘চলেন।’ অসংকোচে বলল সে।

ওয়েটার আসার আগে তার কাছে জানতে চাইলাম, আমার সঙ্গে কোনো কথা আছে তার।

সুমাইয়া ‘হুঁ’ বলল একটু জোর দিয়ে। ওয়েটার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি সুমাইয়াকে ভাত খাবে কি-না বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দুইদিকে মাথা নেড়ে বলল, ‘চা-পরোটা।’ তারপর বিড়বিড় করল, ‘আমারে এই দোকানের লোক চিনতে পারলে হাসত!’

সে খানিকটা জানি আমি। আবার এও ভাবি, সে নিশ্চয়ই বেদেনি হিসেবেও এই দোকানে ঢুকেছে। এদিকের রাস্তায়ও তো তাদের দেখেছি কখনো কখনো। কিন্তু এমন বিড়বিড় করে বলছে কেন?

আমার জন্যে এলো একখানা পরোটা ও ডাল। সে ডালে শুকনো মরিচ ভাজি। তার জন্যে পরোটা ও চা। আমার চা পরে দেবে। ফিল্টার পানি দেবে কি-না ওয়েটার জানতে চাইল। পরোটা খুঁটে অথবা একটু ছিঁড়ে মুখে দেওয়ার আগে সুমাইয়া আমার চোখে তাকাল। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে মুখের নেকাব সরাল। আবার তাকাল। একটু পরোটা মুখে দিতে দিতে বলল, ‘আপনারে চিনতে পারায় খুব অবাক হইছেন?’

আমি দুইদিকে মাথা নাড়ি। অর্থাৎ, মোটেও অবাক হইনি! আমার সামনে সেই বছরদুয়েক আগের মুখ। প্রায় একই। কোনো পরিবর্তন নেই।

‘তাহলে?’ এবার গলার স্বর একটু বাড়িয়ে সে বলল, ‘আমারে এইভাবে দেইখা অবাক হইচেন?’

‘হুঁ।’ বললাম। সঙ্গে আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। এবার আমার কৌতূহলের উত্তর সুমাইয়াই দেবে বুঝতে পারলাম। জানতে চাইল, ‘সময় আছে?’

তা খানিক আছে। বরং, সে যদি চন্দরপুরের দিকে যায়, তাহলে অন্ধকার হয়ে গেলে যেতে অসুবিধা হতে পারে। বুঝলাম সে হিসেব তার আছে।



চার

আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে, কুশিয়ারার পাড় ধরে নিজেদের বহরের দিকে যেতে যেতে, ওই পথটুকু যাওয়ার মাঝখানেই সুমাইয়ার জীবনে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন ঘটে।

এই কথা জানিয়েছিল সে। অনায়াস স্বীকারোক্তি। আমাকে আর কিছু জানতে চাওয়ার সুযোগও দেয়নি। অথবা, তখন সে-কথা শুনতে উদ্গ্রীব আমার আর কিছু জানার প্রয়োজনও ছিল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকা।

পথে একজন বড়শি বাইছিল। সুমাইয়াই তার কাছে দাঁড়ায়। এ-পথে আগে আসেনি। আর কতটা পথ গেলে চন্দরপুর? জানতে চাইলে সে বলেছিল, দুটো বাঁক ঘুরে গেলে, সামনের বাঁকের পরই দেখা যাবে চন্দরপুর ফেরিঘাট। তবে নদীর এ-পাড় ধরে যেতে তাকে আরো একটা বাঁক ঘুরতে হবে। তখন সেই লোকটি তার কাছে জানতে চেয়েছিল, কোথায় কতদূর থেকে এসেছে সে। সে বহরগ্রামের কথা জানালে, জানতে চেয়েছিল, তাহলে নদী পার হয়েছে কীভাবে?

সেকথা বলার পরে, লোকটা পাশে একটা প্যাকেটে রাখা ঠোঙা থেকে মুড়ি খায়। সুমাইয়াকেও খেতে বলে। এতক্ষণের পথ হাঁটায় সুমাইয়ার খিদে পেয়েছিল। পানির তেষ্টাও। লোকটা পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে মাথার ওপর বড়ো লাঠিতে বাঁধা ছাতা ঠিক করে। দুইদিকে তাকায়। সুমাইয়াকে ছাতার নিচে বসতে বলে। তারপর উঠে নদীর পারের বাঁশঝোপের দিকে যায় মাছের আধার আনতে। সুমাইয়া বসে থাকে। লোকটা অনেকক্ষণ হওয়ার পরেও আর আসে না। সুমাইয়া ভেবেছে, মনে হয় কোনো বাইরের কাজে গেছে। আজো সুমাইয়া জানে না, লোকটা অতক্ষণের জন্যে কেন গিয়েছিল।

ফিরে এসে জানতে চায়, এই যে দুনিয়াদারি ঘুরে বেড়ানো, এই কাজ ভালো লাগে? সুমাইয়া জানে তার উত্তর। জাতের কাজ।
মা-নানিরে করতে দেখেছে, এখন সেও করে। এর আর ভালোমন্দ কী? এই জীবনে এই কাজ ছাড়া আর কোনো কিছুই জানে না তো সে।

লোকটার কথা ভালো লাগে সুমাইয়ার। কী একটানা একটু দূরে নদীর পানির দিকে সারাদিন তাকিয়ে থাকে। চোখ জোড়া তুলে মাঝে মাঝে তাকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করে। ছাতার ছায়ায় তারা দুজন বসে থাকে। কিন্তু এই রকম জোয়ান তাজা মানুষ সারাদিন এভাবে বসে বসে মাছ ধরে। অন্য কোনো কাজ করে না। সুমাইয়া জানতে চেয়েছিল, মাছ ওঠে? লোকটা খুব অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। বলেছে, ওঠে। না উঠলে কেউ সারাদিন বসে থাকে। ভালো আধার দিলে, গোয়াল (বোয়াল) মাছ ওঠে। যদিও সুমাইয়া জানে বোয়াল ধরতে ইঁদুর অথবা মরা ব্যাঙ দিতে হয়। লোকটা কী ব্যাঙ খুঁজতে এতক্ষণের জন্যে ওই বাঁশবাগানের আশেপাশে গিয়েছিল?

লোকটা একইভাবে সুমাইয়ার দিকে চেয়ে থাকে। মাছধরা নিয়ে গুনগুনায়। তাকিয়ে থাকে। সুমাইয়ার একবার মনে হয়, উঠে যায়। আবার কী মনে করে অমন তাকিয়ে থাকাটা দেখতেই যেন বসে থাকে। সে তাকায়। লোকটা বলে, আইজকার মতন মাছ সে কোনোদিন ধরে নাই।

সুমাইয়া সে-কথার অর্থ বোঝে না। বরং জানতে চায়, কোথায় সে মাছ। লোকটা তার বামহাতখানা বাড়িয়ে, সুমাইয়ার ডানহাত ধরে নদীর দিকে দেখায়। ওই যে মাছের গালসিতে রশি দিয়ে পানিতে ছেড়ে দেওয়া। সুমাইয়া দেখে, নিচের দিকে একটা লোহার খুঁট, সেখান থেকে একটা রশি নদীর পানিতে নেমে গেছে। নিশ্চয়ই সেই রশির মাথায়, পানির ভেতরে বড়ো কোনো মাছ আছে। সেদিকেই সে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। লোকটাও চুপ।

ফাঁকে একবার সুমাইয়ার দিকে তাকায়। শরীরও নিরিখ করে। সুমাইয়া বোঝে। ভাবে, এবার ওঠা দরকার। একটু জিরানো হলো। তখন লোকটা জানতে চায়, আজকের বড়ো মাছটা দেখবে না? সুমাইয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়।

লোকটি তখন সুমাইয়ার গা-ঘেঁষে আসে। একবার দুইবার পিছনে তাকায়। ডানে-বামেও তাকায় না। সামনে নদী। ডানে-বাঁয়ে একবার দেখে নিলেই হয়। কোথাও কেউ নেই। সুনসান চরাচরে সে সুমাইয়ার ডানহাত ধরে বলে, এইডা আমার আজকের বড়ো মাছ!

সুমাইয়ার তাতে অবাক লাগে না। বড়ো অদ্ভুত চোখে তখন তার দিকে তাকিয়েছিল, সেও লোকটির দিকে চেয়ে দেখেছে, কেমন হাসিমুখে এ-কথা বলেছে। অস্বাভাবিক রহস্য। যখন গলাটা নামিয়ে জানতে চায়, ‘এই সারাডাদিন গ্রামে গ্রামে হাঁটি পাও কত? তাতে পেট চলে।’

সুমাইয়া জানিয়েছিল, তা যা-ই পায় নিয়ে মার কাছে দে। কিন্তু লোকটা তার আগেই বলে, কত? যাই পাক সে, তার চেয়ে বেশি তাকে দেবে। বলে একইভাবে হাসে ও তাকায়। এই ইঙ্গিত সুমাইয়ার এখন আরো অদ্ভুত লাগে। এমন না যে এই ইঙ্গিত সে বোঝে না, এতে সে আগেও সাড়া দেয়নি, কিন্তু এই লোকটি। তার এমন কথা। সে তো ভেবেছিল, এই লোক তাকে অন্য কথা শোনাবে। অদ্ভুত সে-কথা। যা কেউ তাকে বলেনি। তাদের বহরের এক ছোকরা তাকে বলেছে বটে। তার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে কোনোদিন। এমনই সে অন্যদের ক্ষেত্রে দেখে এসেছে। তাহলে তার ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু একটু আগে তার মনে হয়েছিল, অমন করে তার দিকে কেউ তাকায়নি। সে-ই হঠাৎ সারাদিনের হিসাব পাওনা গ-া এইভাবে মিটিয়ে দিতে চাইছে।

সে-কথা বলার পরও লোকটার মুখে সেই একই হাসি। একটু লজ্জা পাওয়া চোখে সুমাইয়া তাকায়। লোকটি তার হাত ছাড়েনি। আবার ডানে-বাঁয়ে না দেখার মতো করে দেখে, পিছনে অপলক কী যেন দেখল। সুমাইয়াও পিছনে তাকায়। সেই ঘন বাঁশঝাড়, তারপাশে একটা শিরীষ, সেটাও বড়ো। তারপর জঙ্গল মতন। নদীর কূল থেকে সেটুকু তফাতে, ভরা নদীতে যতদূর পর্যন্ত পানি ওঠে। তারপর, মুহূর্তে ফিরে, সুমাইয়ার চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, লোকটা উঠে দাঁড়ায়। হাতে টান পড়ায় সুমাইয়াকেও দাঁড়াতে হয়। লোকটা হাত ছাড়ে না। সুমাইয়া তার চোখ দেখে। লোকটা সুমাইয়াকে হাত ধরে ওই বাঁশবাগানের দিকে নিয়ে যায়।

সুমাইয়া অজানা এক ঘোরে পড়ে। হাতটা ফাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে দাঁড়ায়। তখন লোকটি তার দিকে তাকিয়েছিল, সুমাইয়া যাবে কি-না যেন তাই বুঝতে। কিন্তু তখন সে তো তার অধীন যেন। আপসে হাঁটে। এক পাশ দিয়ে সামনে বাঁশঝোপ ফেলে একটু ভেতরে ঢোকে। পাশের মোড়টার পরে যেখানে অন্য গাছের জঙ্গল শুরু সে পর্যন্ত গিয়ে দেখে মাটিতে পলিথিন পাতা। মাথার দিকে একটা পুঁটলি মতন, প্রায় বালিশ। লোকটা বড়শি পেতে কখনো এখানে এসে কিছু সময়ের জন্যে শুয়ে থাকে। পাশে একটা বড়ো পানির বোতল।

এতকিছু দেখার আগেই লোকটা সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরে। আরো কাছে টানে। আঁকড়ায়। সুমাইয়ার সঙ্গের পুঁটলিটা নিচে রাখে। পিঠে হাত আঁকড়ে ধরতে টান দেয় লোকটা। সুমাইয়ার মাথা তোলে, ঠোঁটে ঠোঁট গোঁজে। লোকটা তাকে শুইয়ে ফেলে। সুমাইয়া তাকে বাধা দেয়নি।

কিন্তু একটু পরে, এই কিছুক্ষণ পরে, হঠাৎ ওই পলিথিনের ওপর শোয়া সুমাইয়া চোখ খুলে দেখে, তার শরীরের দুই পাশে মানুষের আরো পা। লোকটা ততক্ষণে থেমে গেছে। ঘাড় উঁচু করে তাকিয়েছে।

‘আবিদ ভাই!’ সুমাইয়া সেই জানতে পারল লোকটার নাম আবিদ।

তখন এর ফয়সালা কী? এই মেয়ের সঙ্গে আবিদকে তারা বিয়ে দেবে। নাকি তারাই এই মেয়ের সঙ্গে। না, সে প্রস্তাব তারা দেয়নি। বিয়ে দেবে। হয়তো আবিদের সঙ্গে তাদের শত্রম্নতা ছিল। তারা অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিল। কিন্তু কোথায় ছিল! আজো সুমাইয়া তা জানে না, কোথা থেকে এসেছিল তারা। আবিদও পরে তাকে বলেনি।

সেখান থেকে তাদের দুজনকে সেই চারজন ফেরিঘাটের দিকে নিয়ে যায়। সেখানের মসজিদের ইমাম সাহেবকে আনবে। তাদের বিয়ে পড়িয়ে দেবে। সেই শেষ বিকালে সুমাইয়া ওই ঘাটে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল। আশেপাশের রেস্টুরেন্ট ও দোকান থেকে সবাই এসেছে। মোবাইলে ডেকে এনেছে অনেককে।

– ওই ছেড়ি তোর জাত কিতা?

– বাইদানির আবার জাত কিতা।

সুমাইয়া বলেছিল সে মুসলমান।

– বাইদানির আবার মুসলমান ইহুদি!

– নাম কিতা?

– বাড়ি কই?

– বাইদানি গো আবার বাড়িঘর থাহেনি?

সুমাইয়া বলেছিল বাড়ি কোথায়, কেউ বিশ্বাস করেনি।

– শ্রীপুর না ছিরিপুর কি তা?

– আবিদ তাকে কত দিতে চেয়েছে?

– টেকা দিরাম, যাবি আমার সাত? তারপর আঙুল তুলে পাশের ভাঙা মার্কেটটা দেখায়। প্রায় পরিত্যক্ত। দোকানগুলোর সামনে ঘাস গজিয়েছে। গেটের ওপরে কী লেখা সুমাইয়া পড়তে পারে না। জীবনেও সে স্কুলে যায়নি। তবে বাপের পরিচিত একজন অনেকদিন আগে অ-আ-ই পড়িয়েছিল। সে বিদ্যায় এই মার্কেটের নাম সে পড়তে পারে না। তাকে যদি সত্যি পিছনে নিয়ে যায়! সেই লোকটা কোথায়? আবিদ। লোকটা একটু পরে আসে। মাথায় একটা টুপি। কিন্তু ইমাম সাহেব এই মেয়েকে মসজিদের বারান্দায়ও নেবেন না। তাহলে এই দোকানে। টিভিতে একটা হিন্দি ছবি চলছিল। সবাই মোনাজাত ধরলে তা বন্ধ করে দেয় দোকানদার। সুরাইয়ার উকিল বাপ হয় একজন। সুরাইয়া বলে কবুল, আবিদও। বাদবাকি কিছুই সে জানে না। কাজির অফিস গোলাপগঞ্জ। সেখানে পরে গেলেও চলবে। একজন আবিদকে বলে, ‘এহোন বাঁশবাগানে না, বাড়িত নিয়ে চালা!’

অন্য একজন বলে, ‘আবিদের বাপ বাড়িত উঠতে দেবে নি বা!’

আর একজন, ‘মিঠা কই, মুখ মিঠাকরন লাগব!’

আবিদ উঠে যায়। ভিড় পাতলা হয়।

‘বাইদানির বিয়া দিচোইন?’ আশেপাশে এমন কথা শোনা যায়। কেউ কেউ সুমাইয়া দেখতে কেমন তাও বলে। আবিদ তখন একটি সিএনজির পিছনের সিট থেকে গলা বাড়িয়ে সুমাইয়াকে ডাকে। সুমাইয়া ওঠে। আবিদের পাশে তার এক বন্ধু। সে এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। মনমরা হয়েছিল।

দোকান থেকে শোনা যায়, ‘আবিদ ওই লই পলায়।’

যদিও সুমাইয়া তখনো জানে না কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে।

তবে, আবিদ আর বন্ধু লিপুর কথোপকথনে বোঝে, এ সবই শত্রম্নতা।

আবিদের সঙ্গে কবে এ-পাড়ের ঘাট ডাকঅলার ঝগড়া হয়েছিল, সেই শোধ তুলল।

তাদের কথায় মনে হয়, যেন এরাই সুমাইয়াকে তার কাছে পাঠিয়েছিল।

সেদিন সুমাইয়া তো ঘাটঅলার টেবিল পর্যন্ত আসেইনি। ঘাটঅলা আমার সেদিন সঙ্গীকে বলেছিল, ‘নায়ে তিনজন পার হইচোইন, তিনজনের পয়সা দেওন লাগবে।’ ততক্ষণে সুমাইয়া নদীর পাড় ধরে পথ এগিয়েছে নিজের গন্তব্যের দিকে। অথচ সে-গন্তব্যে আর পৌঁছানো হয়নি তার। আমাদের তো সিএনজি পেতে একটু দেরি হয়েছিল, তখন সুমাইয়া আবিদের কাছে। তারপর গোলাপগঞ্জে পৌঁছে আমরা বনরাজে বসেছিলাম। হয়তো তখন সুমাইয়া আর আবিদের বিয়ে পড়ানো হচ্ছিল।

এরপর অবশ্য আর কিছুই শোনার ছিল না। সুমাইয়া বলে যেতে পারত, বলেও ছিল। তাকে নিয়ে বাড়িতে ঢোকা সম্ভব নয়, তাই সে-রাতে গোলাপগঞ্জ হয়ে হেতিমগঞ্জে। সেখান থেকে খাদিমনগর। লিপু কথা বলার জন্যে আবিদকে অন্য একটা সিম দিয়েছিল। সেটা দিয়ে শুধু লিপুর সঙ্গেই আবিদের যোগাযোগ হতো।

তারপর একদিন সে আবিদদের বাড়ি যায়। আবিদের দুলাভাই আর লিপুই এসে তাদের নিয়ে যায়। পরে শুনেছে সে, এরপর তাদের বহর থেকে শিবপুর ঘাটে লোক এসেছিল। চন্দরপুরে তাদের বহরে গিয়ে কেউ একজন বলেছিল, এই ঘাটের এক বেদেনির সঙ্গে একজনের বিয়ে হয়েছে। ঘাট থেকে আবিদদের বাড়ির কথা বলাও হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আবিদ নেই। সে-বাড়ির কেউ কিছু জানে না।

সত্যি, সুমাইয়া এতদিন কিছুই জানত না। কষ্টে থাকুক আর যাই হোক, আবিদকে তার ভালো লেগেছিল, কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে তাকে বলা হয়, আর কোনোদিন বহরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারবে না। সুমাইয়া রাখেনি। এভাবে চলতে হবে, সুমাইয়া তাই চলে। বলেই সে নেকাবটা টেনে দিয়ে একবার মুখে ঢেকে দেখায়।

তারপর সুমাইয়া হেসে বলে, ‘তবু মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ থাকে। এই আপনাদের পথে দেখলে না মাতি (কথা না বলে) পারতাইম?’

আমি সুমাইয়াকে দেখি। কী স্পষ্ট! কী স্বাধীন ভেতরে ভেতরে। তখন আজ কেন সে বেরিয়েছিল, তাও জানা গেল।

তাদের বহর থেকে একদিন এই গোলাপগঞ্জে আসলে, অন্য বহরের আরেকটি মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। সেই মেয়ের সঙ্গে সুমাইয়া সই পাতায়। নাম চাঁপা। চাঁপার বাচ্চা হয়েছে কদিন আগে। নিকলির উত্তরে তাদের বহর। তার বাচ্চা দেখতে গেছিল সুমাইয়া। আবিদ যেতে দিয়েছে। যদিও বলেছে, বাড়ির কেউ যেন জানে না। তাই প্রতিবেশী এক ননদের সঙ্গে ডাক্তার দেখানোর কথা বলে বের হয়েছে। আসলে সেই ননদ গেছে বাজারের ভেতরে তার নাগরের সঙ্গে দেখা করতে। এখানেই আসবে। নয়তো সুমাইয়া যাবে তাদের কাছে। তারপর ফিরে যাবে শিবপুর!

সুমাইয়া আমায় মনে করিয়ে দেয়, আমার দেরি হয়ে গেল। সে মুখে নেকাবের ঢাকনা দেয়। আমার পিছনে উঠে আসে। ওঠার আগে বলে, ‘আবার কোনোদিন এই পথে দেখা হই যাবে, ভাই!’

আমি বলি, ‘হুঁ, হই যাবে। ভালো থাইকেন!

সুমাইয়া আবার মনে করায়, ‘আমারে আপনে কইন কেনে?’

বলি, ‘ভালো থাইকো।’

‘আপনেও!’

বনরাজের বাইরে এসে দাঁড়াতেই, একটা সিগারেট ধরাব কি-না ভাবি। সুমাইয়া তখন পাশে এসে দাঁড়ায়। বুঝলাম, মুখখানা ভেতরে হাসি হাসি। একটু সলজ্জ। আমার কাছে জানতে চায়, ‘আমার ইতা লিখতাইনি?’

আমি চকিতে আড়চোখে তাকাই, ‘কী?’

‘ইতা! এই যে ছুমাইয়ার কথা কইলাম?’

আমি তার দিকে তাকাই। সে আমার মন্তব্যের আগেই বলে, ‘যাইগি!’

আমার মনে হয়, সে অন্য কারো গল্প এতক্ষণ আমায় শুনিয়ে গেল। অথচ, সেই গল্পটা তার নিজেরই জীবনের! স্বাধীনতা থেকে অবগুণ্ঠনের!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন