বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

দীপেন ভট্টাচার্যের ‘দিতার ঘড়ি’ নিয়ে আলোচনা

আলোচনা: মৌসুমী কাদের

যদিও প্রচ্ছদে লেখা আছে ‘দিতার ঘড়ি’ একটি বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী কিন্তু বাস্তবে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের আঙ্গিকে বইটিকে বিচার করা ঠিক হবে না। দীপেন ভট্টাচার্য শুধুমাত্র যে ‘বিজ্ঞান লেখক’ এই পরিচিতি তার লেখার ব্যাপ্তিকে খাটো করে। তাঁর অনেক গল্পে বিজ্ঞানের পটভূমি থাকে ঠিকই, কিন্তু সেটা ছাড়িয়ে মানবিক ইচ্ছা ও সম্পর্কও অনেক বেশী প্রাধান্য পায়।
গল্পপাঠে প্রকাশিত তাঁর ‘অসিতোপল কিংবদন্তী’, ‘করুণাধারা’, ‘সিনেস্থেশিয়া’ কিংবা ‘নিস্তার মোল্লার মহাভারত’ এই ধারার কয়েকটি গল্প সেটা প্রমান করে। তাই আগেই বলে নিচ্ছি, যারা ‘দিতার ঘড়ি’ বইটি পড়বেন তাদের যে বিজ্ঞান বিষয়ে অনেক জানতে হবে এমন কোন কথা নেই। তবে জানা থাকলে বুঝতে সহজ। আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী নই, সে কারণে বইটি খুঁটিয়ে বোঝার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আমার ছিলই। তাছাড়া বিজ্ঞান কাহিনী, ভৌতিক কাহিনী, এসবের খুব একটা ভক্তও আমি নই। আজ পর্যন্ত যে ক’টা ‘বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী’ পড়েছি তার মধ্যে অন্যতম কঠিন বই এটি। তার মূল কারণ এর কাহিনীটি এক রৈখিক নয়, একটা সরলরেখায় গল্পটা ভ্রমণ করে না, বরং 'সময়' ও 'বাস্তবতা' নিয়ে একটা পরীক্ষার ফলাফল বুঝতে পাঠককে ধৈর্য ধরতে হয়। বোঝাই গেছে লেখক অনেক চিন্তা ভাবনা করে সময় নিয়ে পাঠকের জন্য যতটা সম্ভব বোধগম্য করে কাহিনীটি লিখেছেন। সেকারণে কিছু কিছু বিষয় বারবার উল্লেখ করেছেন এবং চিন্তায় কোন ছাড় দেননি। আবার ভাষা ও কাহিনী একই গতিতে সমান্তরালে হেঁটেছে। সেখানে লেখক অসংখ্য পরিশীলিত শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার করেছেন।  পাঠক হিসেবে সচেতনভাবে সেগুলো গ্রহণ করবার দায় ছিল আমার। 

এখন বলি, কেন এ লেখাটি লিখতে ইচ্ছে হলো। বইটি যখন পড়তে শুরু করেছিলাম তখন শেষ করাটা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ কয়েক পাতার পর কিছুতেই লেখাটা টানছিলোনা। একেতো বিষয়ের দিক থেকে এটি আমার ভালো লাগার কাছাকাছিও নয়, দ্বিতীয়ত আমি বিজ্ঞান বুঝিনা। লেখক অবশ্য আমাকে আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন যে দশ পাতার পর অনেকেই এটা শেষ করতে পারেনি। ‘সেই সতর্ক’ একটা প্রতিযোগীতার মন তৈরী করেছিল বটে। সেকারণে আমি অনেক সময় নিয়ে সাবওয়েতে দাঁড়িয়ে, অফিসের ফাঁকে ফাঁকে, ব্যায়ামাগারে বিশ্রামের ফাঁকে বইটা শেষ করবার চেষ্টা করেছি। এই যে শেষ করেছি সেটার পেছনের আরেকটি কারণ ছিল কাহিনীটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটি জানবার কৌতুহল। শেষ পর্যন্ত পড়ে মনে হলো, ‘ওয়াও; এটা শুধু বিজ্ঞান-কাহিনী নয়, আরো অনেক কিছু' যা পাঠককে বুঝে নিতে হবে। 

গল্পের প্লটটি সম্পর্কে বইয়ের ফ্ল্যাপে যেভাবে লেখা আছে সেটি হুবহু তুলে দিচ্ছি; 

‘কোনো এক অজানা সময়ে চিতা সামরিক বাহিনী দখল করে রেখেছিল সমতল ভূমি। তাদের যুদ্ধ ছিল সমতলের সময় নিরূপণের দর্শনের বিরুদ্ধে, ঘড়ি নির্মাণের বিরুদ্ধে। প্রথমে চিতারা নিষিদ্ধ করেছিল সেকেন্ডের কাঁটার ব্যবহার, তারপর মিনিটের কাঁটা, অবশেষে ঘণ্টার কাঁটার ব্যবহার নিষিদ্ধ হলো। তাদের নির্মমতায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল সমতল। সেই সমতলে অতীতে বাস করতেন মনীষী বিজ্ঞানীরা, যাঁদের যান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করা হতো। এই ভয়াবহ সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য যান্ত্রিকেরা অতীতেই এক পথের সন্ধান দিয়ে গিয়েছিলেন। সমতলকে জয়ী করতেই সেই সমাধানের পথে ভ্রমণ করে আমাদের তরুণ প্রটাগনিস্ট ত., ... ...।’ 

ফ্ল্যাপ পড়ে বোঝার উপায় নেই সমতলভূমি কি? কেনইবা চিতারা ঘড়ি নির্মাণের বিরোধী ছিল। পড়া শেষে বোঝা গেল ত. নামের (এমন বাস্তব/ অবাস্তব নাম কস্মিনকালেও শুনিনি) এই কাহিনীর তরুণ প্রটাগনিস্ট, চিতাদের বিপরীতে ‘পার্টিজান’দের পক্ষে কাজ করে। সে একজন ‘বর্ষিয়ান যান্ত্রিক’ ঘড়িনির্মাতা ‘অসিতোপল’কে রাজধানী থেকে উদ্ধার করে মুক্তাঞ্চলে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ঘড়িনির্মাতা ভুলক্রমে চিতাদের হাতে ধরা পড়ে। তাকে ধরার পর চিতারা তার উপর জঘন্য অত্যাচার করে, যেমন পাকিস্থানীরা করেছিল একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে। সেই সময়েই তার সাথে পরিচয় হয় দার্শনিক মৈনাকের, যার সময়-তত্ত্বের ইতিহাস চিতারা ধ্বংস করে দিতে চায়। কিন্তু মৈনাক সমতলে অতীত ইতিহাস ঘড়িনির্মাতাকে মৃত্যুর আগে জানিয়ে দিয়ে যায়। মৈনাকের মৃত্যুর পর ‘ঘড়িনির্মাতা অসিতোপল’ পার্টিজানদের বাঁচাবার চেষ্টা করেন। তার কন্যা দিতাকে মেরে ফেলার হুমকি স্বত্তেও তিনি চিতাদের ধ্বংস করার একটা জটিল পরিকল্পনা করেন। আর সেটি হোল চিতাদেরই তৈরী ডাইনাসোর যন্ত্র ব্যবহার করে তার সাথে কতগুলো ঘড়ি যুক্ত করে তাদের ধ্বংস করা। 

সমস্ত পরিকল্পনাটি সম্পন্ন করতে ঘড়িনির্মাতা অসিতোপলের দিতার কাছে রক্ষিত ঘড়িটির প্রয়োজন হয়। আর তাই সে প্রটাগনিস্ট ত.কে দিতার কাছে রক্ষিত সেই বিশেষ ঘড়িটি এনে দিতে বলে। আর এই ঘড়ি আনতে সে ব্যর্থ হলেই সমতলের ধ্বংস অনিবার্য সেকথাও জানিয়ে দেয়। ঘটনার পরম্পরায় প্রটাগনিস্ট ত. গোপন মিশনে বেরিয়ে দিতার ঘড়িটি উদ্ধার করে এবং নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পার্টিজানরা রাজধানীর কেন্দ্রে চিতা হেডকোয়ার্টারে প্রতি আক্রমণ করে এবং এই মিশনের অংশ হিসেবে ত.কে একটি গোপন সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যা তাকে ঘড়িনির্মাতার কাছে পৌঁছে দেয়। 

সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে এক পর্যায়ে প্রটাগনিস্ট ত. একটি T- আকৃতির জাংশন খুঁজে পায়। যেখানে তাকে মোড় নিতে হবে ডানে অথবা বামে। আর এখানেই ঘটে এক অতিলৌকিক কোয়ান্টাম ব্যতিচার। তরুণ প্রটাগনিস্টের সামনে তখন একাধিক সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়। সে ডানে যেতে পারে, অথবা বামে যেতে পারে কিংবা ফিরেও আসতে পারে। আর একারনেই গল্পটির তিনরকম সমাপ্তি লক্ষ করা যায়। একটিতে চিতা দলের পরাজয় ঘটে, আরেকটিতে বাস্তবতায় চিতা দলের পরাজয় ঘটলেও ‘দ্বিতীয় বাহিনী’ আবার সমতলকে করায়ত্ত করে। এভাবে আমরা তিনটি সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তরুণ প্রটাগনিস্ট ত.কে তিনটি ফলাফলে বিভক্ত হতে দেখি এবং পরিচিত হই -ত.১, ত.২, এবং ত.৩ এর সঙ্গে। 

তবে একটা জায়গায় কিছুতেই যেন যুক্তিগুলো মেলানো যায় না। ৩.২ যখন সুরঙের ভেতরে ঢোকে তারপর দশ বছর পেরিয়ে যায়। এবং সে একটি ঘরে এসে পৌছয় যেখানে দিতা এবং অসিতোপল অপেক্ষা করছিলেন। এই দশ বছর ধরে ৩.২ এর সুরঙ্গে হাঁটাই যুদ্ধ থামাতে সাহায্য করেছিল। নিজের অজান্তেই সে বিভিন্ন পৃথিবী বা মহাবিশ্বের জন্ম দেয় যা যান্থিকেরা আগেই ঘটবে, বলে জানিয়ে গিয়েছিলেন। 

গল্পের শেষে দেখা যায় আসলে কাহিনীর চাবিকাঠি ধরা ছিল আদ্রিকার হাতে (দার্শনিক মৈনাকের প্রাক্তন স্ত্রী) যিনি ছিলেন একজন যান্ত্রিক। আমরা বুঝতে পারি তিনিই সেই আদি যান্ত্রিকদের একজন যিনি পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্যে অন্যান্যদের ব্যবহার করেছিলেন। এবং সবশেষে (চ্যাপ্টার ২৯) স্পষ্টই দেখা যায় যে তুরা পাহাড়ের নকশার রচয়িতা মালিকা ভবিষৎ সম্ভাবনার হিসেব করেই এই সুরঙ্গ গড়ার কাজটি শুরু করেছিলেন। 

আগেই বলেছি বইটিকে শুধুই বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বললে ভুল বলা হবে। এতে বিজ্ঞান ও দর্শন, সাহিত্য সবকিছুর এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছে যা বুঝতে বিজ্ঞানের ছাত্র হবার দরকার পড়ে না। আবার বিজ্ঞানের ছাত্র না হলে ‘কোয়ান্টাম ব্যতিচার’ কী জিনিস বোঝা যায় না। যে প্রশ্নটি থেকে এই কাহিনীর উদয় হয়েছে বলে মনে হয়, সেটি হলো, যদি পৃথিবীকে সময়হীন করে রাখা হয় তাহলে কি ধরণের ঘটনা বা বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের? ঘড়ির সময় কি নানা বিশ্বকে নানা ভাগে ভাগ করতে পারে? লেখক তিনটি সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তিনরকম দৃশ্যের বর্ননা করে এই সত্য প্রমান করেছেন ... যে এক মহাবিশ্ব ভাগ হয়ে যেতে পারে কয়েকটি মহাবিশ্বে। 

বইটি পড়ে কয়েকটি বিষয় জোড়ালো ভাবে ভাবিয়েছে। সায়েন্স ফিকশনে সাধারনত বিদেশি নাম রাখা হয়। কিন্তু লেখক এই লেখাটিতে প্রায় প্রতিটি চরিত্রের নাম রেখেছেন বাংলায়। অসিতোপল, মৃত্তিকা, দিতা, মৈনাক, আদ্রিকা, আরাত্রিক, শেফালিকা, কর্ণিক, আর্ক, সমুদ্র, ইত্যাদি। ভাষার প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এমন যত্ন করে কেউ বাংলা নামকরন করে না। এই নাম নিয়ে বইটিতে লেখক নিজেই লিখেছেন, ‘একটা নাম যেন একটা কম্পাস, বহুদূরের সামুদ্রিক বায়ু যেমন পালতোলা কোনো হতভাগ্য জাহাজকে অজানা মরুদ্বীপের দিকে নিয়ে যেতে পারে-একটা নাম হতে পারে সে রকম একটা অবাধ্য-অশান্ত হাওয়া, সেই নাম পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। পাঠক তখন অভিযোগ করতে পারেন, তাঁরা এই নামসংবলিত কোন ব্যক্তির কাছে থেকে অন্য ধরনের আচরণ আশা করেছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে নামহীন মানুষ হচ্ছে পালহীন জাহাজ, মহাসমুদ্রের মাঝে সে এক অচলায়তন’। 

এছাড়াও ঘড়ি নির্মাণের নানা কৌশলের বর্ণনা, সময় নির্ধারণের নানা উপায়, ইত্যাদির সাথে সাথে লেখকের সূক্ষ্ম দর্শন ও গভীর জীবনবোধ যেভাবে আলোচনায় বা স্বগোক্তিতে ব্যবহৃত হয়েছে তার কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি; 

২.১। ‘জীবনের পথ একটানা নয়, তাতে ছেদ আছে, সে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে ঝাঁপ দিয়ে চলে’। (পৃষ্ঠা ৩৪) 

২.২। ‘মানুষ মনে করে তারা দায়বদ্ধ, দায়বদ্ধ তাদের পরিবারের কাছে, তাদের সমাজের কাছে, তাদের দেশের কাছে, তাদের পুরোহিতদের কাছে। তারা তাদের দায়িত্ব খুব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে’। ...আর এইসব দায়বদ্ধ মায়ের ভালো ছেলে রাজাকার ‘ক্যাপ্টেন কর্নিক’ই বিজ্ঞানী মৈনাকের বুকের হাড় ভেঙে ফেলে। কাজেই লেখকের এই ‘দায়বদ্ধতা’ নিয়ে প্রবল সংশয় আছে, সেটা বোঝা যায়। (পৃষ্ঠা ৪৭) 

২.৩। ‘অসীমের সাথে অসীম যোগ হলে অসীমই হতে পারে। কিন্তু অসীমের থেকে অসীম বিয়োগ করলে যে কোন ফলাফল হতে পারে...এক, দুই, পাঁচ লাখ অসীম, যে কোন সংখ্যা’। (পৃষ্ঠা ৫১) 

২.৪। সমতলের মানুষের না আছে ওয়াইন, না আছে নৃত্য, না আছে পাথর। এই তিনটে জিনিস একটা জাতিকে যেমন নমনীয় করে, তেমনই দৃঢ় করতে পারে। (পৃষ্ঠা ৫৪) 

২.৫। ‘তোমরা সমাজকে ভাবো একটা গাছ, যে তার আকৃতি ঠিক রেখে শুধু কোষ বদলাবে। কোষ বদলালে যে আকৃতি বদলে যেতে পারে, তা তোমরা স্বীকার করো না। তাই তোমাদের সমাজ বদলায় না।’ (পৃষ্ঠা ৫৫) 

২.৬ ‘বেঁচে থাকা কি এতই জরুরি? কোথায় গেল তার আত্মসম্মান? কোথায় গেল তার আকাশচুম্বী সৃজনশীলতা? (পৃষ্ঠা ৬১) 

২.৭ ‘অপূর্ণ প্রেম হতে পারে একটি মহান হৃদয়ানুভূতি, কিন্তু তোমার নিজের সৃষ্ট মহিমার আসন থেকে পতন তোমাকে শূন্য করে দেয়, উদ্দেশ্যহীন করে দেয়,’ (পৃষ্ঠা ৭০) 

২.৮। মানুষ প্রকৃতগতভাবে প্রতিযোগী, বিবর্তনের ধারায় অন্য মানুষ, অন্য গোষ্ঠী তারা প্রাকৃতিক শত্রু, না চাইলেও সে নিজেকে জাতিভূক্ত, দলভূক্ত করতে চায়। (পৃষ্ঠা ১১৪) 

২.৯। ‘শুধু কাদা নিয়ে একটা জাতি বাঁচতে পারে না। বাঁচার জন্য পাথর চাই।’ (পৃষ্ঠা ১৫০) 

৩.০। ‘মানুষের মনের সবচেয়ে গভীরে এক অন্ধকার বাস করে, সেই অন্ধকার মহাবিশ্বের আদি অন্ধকার, কারণ যে ইলেক্ট্রনসমষ্টি তাদের তড়িৎ সংযোগে মন আর স্মৃতির সৃষ্টি করে, সেই মন আর স্মৃতির বাইরে মহাবিশ্বের রূপ আর কি হতে পারে?’ (পৃষ্ঠা ১৫২) 

আমরা জানি, একটি স্বপ্নের দেশ কল্পনা করে কাহিনী রচনা করা চাট্টিখানি কথা না। কিন্তু লেখক সেটা সার্থকভাবেই করেছেন। ‘দিতার ঘড়ি’র কাহিনিটি কাল্পনিক হলেও এতে একটি আদর্শিক মুক্তি খোঁজার চেষ্টা আছে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দ্বারা তাড়িত; বোধে ও বর্ননায়, দুটোতেই। এগুলো সবই আমরা অভিজ্ঞতায় জানি, চিনি, সেই রাজাকারের দৃষ্টি, সেই ইয়াহিয়া জেনারেলের হুংকার, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের বলিদান। এর সবই যেন কাহিনীতে ছায়া হয়ে এসেছে। 

ধরা যাক লেখক বাংলাদেশকেই কল্পনা করতে চেয়েছেন, যেখানে একসময়ে যান্ত্রিকেরা ছিলেন, সুজলা সুফলা করে সাজাতে চেয়েছিলেন তারা দেশটি। কিন্তু পাকিস্থানী হায়নারা এসে তাদের চিন্তা এবং কাজকে তছনছ করে দিল। তারা বুদ্ধিজীবীদের অত্যাচার করে স্মৃতিশক্তি কেড়ে নিল, হত্যা করল তাদের। কিন্তু শত বাধার পরও ‘সেই সংস্কৃতি’ ‘সেই মূল্যবোধ’ ধরে রাখতে চাইলেন যান্ত্রিকেরা। তরুনদের আবার দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করলেন। চিতারূপী পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী এবং জেনারেল হিসেবে ইয়াহিয়াকে চেনা গেল। এমনকি আরাত্রিকের চরিত্রে যেন খন্দকার মোশতাক হুবহু মিশে গেল। কিন্তু তারপরও মানুষ চেনা ভীষন কঠিন হয়ে পড়লো। কে মুক্তিযোদ্ধা কে রাজাকার চেনা যায় না। ভীড়ে লুকিয়ে থাকে ‘দ্বিতীয় বাহিনী’র রাজাকাররা। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে, এরা মুক্তিযুদ্ধকেও ব্যবহার করে। আবার যান্ত্রিকেরা অপেক্ষা করে আরেকটা পরিবর্তনের। এমনটাই কি হতে পারেনা কি এই কাহিনীর ছায়া?

আমার কাছে ‘দিতার ঘড়ি’ মূলত ১৯৭১-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কাহিনী। ফলে বইটি পড়ে শেষ করবার পর এর ছায়া মাথায় গেঁথে গেছে। বর্তমান বাংলাদেশে বিশ্বাসঘাতক-রাজাকারদের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে এবং যে প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষমতায় আসবার চেষ্টা করছে তাতে করে এই ‘দিতার ঘড়ি’র কাহিনী তরুনদের নতুনভাবে চেতনা জাগাতে সক্ষম হবে বৈকি। 

বাংলাদেশে এই বইটি নিয়ে তেমন আলোচনা হয় নি। আমার মনে হয় এর অন্যতম কারণ হল বইয়ের প্রচ্ছদে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি দেখে পরিণত পাঠকেরা মনে করেন এটা কিশোরদের জন্য লেখা, তাই তাঁরা বইটিকে এড়িয়ে গেছেন। দ্বিতীয় কারণ হল কাহিনীটির গঠন, যা কিনা সহজপাঠ্য নয়। কিন্তু বলতেই হবে বইটি একেবারেই ভিন্ন স্বাদের। নিজের আয়ত্বের বাইরে এরকম কল্পবিজ্ঞান কখনও পড়ি নি। তাই, হাঁটতে হাঁটতে এখনো মাথায় ভাসছে সেই সুরঙ দৃশ্য। যার শেষে এক আশ্চর্য্য সুন্দর শহর অপেক্ষা করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন