বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

নাসরীন জাহানের গল্প : পুরুষ

ভবঘুরে মেঘের ছায়া উঠোনে। এক চিলতে রোদ। ডালিম গাছের সরু ডালের ছায়া রোদের ওপর নাচছে। তাই দেখছে বুলু। কী বিচ্ছিরি আকাশ। মেঘ আছে। বৃষ্টি নেই। উঠোনটা নিকোনো। কাদায় স্যাঁতসেতে হলে সুন্দর হতো। পায়ের গোড়ালি ডুবে গেছে কাদায়। অথবা ইস্ত্রি করা ঝকঝকে শার্টে ছলকে পড়েছে খয়েরি পানি।
বাহ্ সুন্দর। বুলু হাততালি দেয়। বারান্দার এক কোণে পিড়ে পেতে বসেছে শেলী। বুকে ওড়না নেই। বুলুর মাথার রগ দপদপ করছে। মেজভাই, বড়ভাই কাজে গেছে। বাসায় কোনো পুরুষ নেই। দুই হাঁটুতে আয়না সেট করা। ক্রিম ঘষছে মুখে। নিশ্চিন্তে। বাসায় কোনো পুরুষ নেই। হাই উঠাচ্ছে শেলী। বুলু রোদ দেখে। মাথাটা বারান্দায় শুইয়ে আকাশ দেখে। একটা চিল উড়ছে।

এই অবেলায় চিল উড়তাছে ক্যা ?
তার কথার কোনো উত্তর আসে না।

বুলু যেন উঠোনের বৃষ্টিতে বসা একটা ব্যাঙ। অথবা লোম উঠে যাওয়া নেড়ি কুকুর। হঠাৎ ঘেউ-উ করে উঠেছে। সবার কান ছুঁয়ে গেছে শব্দটা। শুধু ছুঁয়ে গেছে। কেউ শোনে নি। আমি যে একটা কথা কইলাম কারও কানে গেছে ? 

বুলু দাঁত চেপে বলে। মা রান্নাঘরে ফুঁ দিয়ে চুলো ধরাচ্ছেন। তারই একটানা ফুঁত ফুঁত শব্দ কানে আসছে। রোদটা সরে উঠোনের এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শেলী কামিজ উঠিয়ে পাজামা কষে দড়ি লাগাচ্ছে। অবশ হয়ে আসছে শরীর। সে-তো বুলু। সে কি কোনো পুরুষ ? তার সামনে বসে সবাই যার যার গোপনীয় কাজ সারতে পারে। সরু পা দুটোর দিকে তাকায়। ইচ্ছে হয় ওই দুটোকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে।

রোদ সরে শেওলা পড়া দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। বুলুর মাথা নুয়ে আসে। হঠাৎ চারপাশের প্রকৃতি টুকরো হয়ে যায়। বেসুরো একটা গলার বিস্ফোরণ হয়।

আমি কি এই বাড়ির নেড়িকুত্তা ?

শেলী ঝাঁকিয়ে ওঠে- ক্যান, কী অইছে ?

আয়না হাতে নিয়ে সে ঘরের দিকে যাচ্ছে। লাল ফিতের ফুল বেণির ডগায় লাফাচ্ছে। বেণিসহ সে অদৃশ্য হয়ে যায়। ‘কী অইছে’ ? বলেই সে হাওয়া। কার কী হয়েছে জানার প্রয়োজন নেই তার।

যেন ভরদুপুরে কোনো ফকির দরজায় এসেছে। সে বলছে, ব্যাটা এমন চিল্লায় ক্যান ? মাথার ঝাঁজ শরীর পেরিয়ে সরু পায়ে ভর করছে। লাল হয়ে উঠছে মুখ। পারলে দৌড়ে সে রান্না ঘরে গিয়ে মা-কে টেনে এনে উঠোনে ফেলে দেয়। সিঁড়ির পাশে একটা কাচের টুকরো পড়েছিল। দুই পা ছেঁচড়ে সে উবু হয়। রোদ এখন মেহেদিগাছে। একটা চড়ুই লাফাচ্ছে সরু ডালে। বুলুর সরু পায়ে। প্রকৃতি ছিঁড়ে যায় হঠাৎ। একটা চিৎকার। মা দৌড়ে আসেন। তাঁর চোখে ধোঁয়া। ধোঁয়ার ঘোর কেটে গেলে বিস্ময়। সরু পায়ের অনেকটা ছিঁড়ে ফেলেছে বুলু। কাঁচের টুকরো রক্তাক্ত। বুলু হাসছে। পা গড়িয়ে বারান্দায় পড়ছে রক্ত।

আমার মরণ হয় না ক্যান ? কান্নার মতো শব্দ হয় মার গলায়। এটা হতাশা সূচক বাক্য ছাড়া আর কিছু না। এইটুকু কারণে কেউ মৃত্যু চায় না। মৃত্যু অনেক বড় ব্যাপার। বুলু একবার আত্মহতা করার চেষ্টা করে দেখেছে। আনন্দে ভরে উঠেছে বুকটা। মার বিস্ময়ে ভরা চোখ এবং কষ্টকর মুখটা চমৎকার লাগছে দেখতে। বুলুর চোখে পলক পড়ে না। সে মা-কে দেখছে। তার পায়ে মার ন্যাকড়া বেঁধে দেওয়া দেখছে। বারান্দা থেকে রক্ত পরিষ্কার করা দেখছে। মা কত দিন পর তাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত হয়েছেন। দরজায় শেলীর অস্তিত্ব, নিজের ঠ্যাং কাইটা আবার নিজেই চিক্কোর দিছে। হিঃ হিঃ একখান চিজ বটে!

জমাট হয়ে আসতে থাকা রক্ত ফের চিড়িক দিয়ে ওঠে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় সে। বাপের দু’নম্বর বউয়ের এই মেয়েটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সে। মেঝেভাই, বড়ভাই এলে মাথায় ওড়না টানে। বুলু কাছে এলে বলে, পিঠটা চুলকায়া দেও না, খুব ঘামটি অইছে। বুলুর সত্তায় একজন বাইশ বছরের যুবক কামড় বসায়, যাবতীয় অশ্লীল শব্দ তার গলা দিয়ে ঠোঁট পর্যন্ত এসে আটকে যায়। সে নিজেকে বহুবার সংযত করে। একবার ইচ্ছে হয় শেলীর কাছ থেকে আয়নাটা এনে দেখে, তার ন্যাড়া মাথা, ডালিম গাছের ডালের মতো সরু পা দেখে তাকে কোনো মহিলা মনে হয় কি না। শেলীর সব আচরণই তার সঙ্গে এমন সহজ, নিজেকে একমুহূর্তের জন্যও তার সামনে স্ত্রী অথবা ক্লীব লিঙ্গ জাতীয় ছাড়া কিছু মনে হয় না। বুলু উঠোন দেখে। তার দৃষ্টি নিস্তেজ হয়ে আসে।

রাতে ঘুম আসে না। ব্যথায় টনটন করছে পা। বুলুর কান্না আসে। সবাই নিশ্চিতে ঘুমোচ্ছে। মা-ও। ছেলেবেলা থেকেই সে জানে, সে মরে গেলে মা স্বস্তি পেত। মার প্রার্থনাটা হয়তো এরকম, আল্লাহ তুমি বুলুরে ওঠায়া নেও, ওর এই শাস্তি আমি সহ্য করবার পারি না। এবং পরক্ষণেই, ছি! আলাই বালাই, আমি এইডা কী কইতাছি। বুলু সব বোঝে। খুব ভালোই বোঝে, সে মরে গেলে মা ভীষণ কষ্ট পাবেন, বিলাপ দিয়ে কাঁদবেন, কিন্তু অবচেতনভাবে নিশ্চিন্তও হবেন।

মাঝরাতে চিৎকার দিয়ে ওঠে সে। কাউকে ঘুমোতে দেবে না। মৃদু হারিকেনের আলো-ছায়া সমস্ত ঘরে। পায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। আস্ত টিনের চাল তার বুকের ওপরে এসে পড়ছে। হারিকেনের আগুন কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেছে। নিজের গলায়ই দড়ি দিয়ে চেপে ধরেছিল সে একদিন। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছিল। তারপর শিথিল হয়ে এসেছিল হাত। পুরো ঘটনাটাই প্রাকৃতিকভাবে ঘটেছিল। তার মনে হচ্ছে, আবারও কেউ তার গলা চেপে ধরেছে। হাঁসফাঁস করে গলায় হাত দেয় সে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা। মনে হচ্ছে গলাতেই। হাতড়ে হাতড়ে উঠে বসে। না, গলা না। যন্ত্রণার উৎস পা। হারিকেন নেভে নি। সমস্ত ঘরে আলোআঁধারি ছায়া। আম্মা! কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে ওঠে বুলু। 

মা গড়িয়ে গড়িয়ে মেঝেতে ঘুমোচ্ছেন। মা যেন বুলুর মতোই বয়স্ক শিশু। ঘুমোলে খুব গড়াগড়ি করেন। সহজে সজাগ হতে চান না। খুব ভোরে সবাই উঠে গেলে রোজই মটকা মেরে পড়ে থাকেন। তাকে ডাকাডাকি করে শেষে শেলীই রান্নাঘরে দপদপ পা ফেলে চলে যায়। মা’র পা চুলকানো, উঁকি দিয়ে শেলী গিয়েছে কি না দেখা, সবই লক্ষ করে বুলু। মা-কে খুব বয়স্ক মানুষের মতো বলতে ইচ্ছে হয়, তোমার এই সক্কাল বেলায় উঠতে না পারার অভ্যেসটা আর গেল না মা।

এ রকম বলতে পারলে নিজেকে মূল্যবান মনে হতো এবং ব্যাপারটা আনন্দদায়ক হতো। কিন্তু এসব কথা তো কানে কানে বলা যায় না। আরও জোরে বলবে সে? মাথা খারাপ ? শেলী আর বড়ভাই মেজভাইয়ের হাসির সামনে ?

মা উঠে বসেছেন, তখনো চেঁচাচ্ছে বুলু। আমি কি একটা মানুষ ? নাকি রাস্তার কুত্তা ? মা মুখ চেপে ধরেন বুলুর, চুপ কর বাপ, তোর ভাইয়েরা ঘুমাইতাছে।

আরও জোরে চেঁচায় সে, আমি কাউরে ডরাই ? সহ্য করবার না পারলে লাথি দিয়া ড্রেনে ফালায়া দিবার পারো না আমারে ?

চুপ কর! মা হারিকেন জ্বালান। কী অইছে ?

কিছু না। শুয়ে পড়ে বুলু। যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে। এটা কোনো ব্যাপার না। শারীরিক কোনো যন্ত্রণা বিচলিত করে না তাকে। মার কষ্টকর এবং ভয়ার্ত মুখটা মনের যন্ত্রণা সরিয়ে দিচ্ছে অনেকটা।

মা তার পাশে শুয়ে তার আধ ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। এক সময় তাঁর হাত শিথিল হয়ে আসে। বড়ভাই, মেজভাই এক চৌকিতে। পাশের ছোট্ট দম বন্ধ করা রুমের এক চৌকিতে ঘুমোয় শেলী। বুলুর পাশে না শুলে উনার ঘুম আসে না। মা-ই প্রথম বাইশ বছরের যুবককে এই বাড়িতে খোকা বানিয়ে রেখেছেন। বুলু কি তার পুরুষত্বের কথা সবাইকে চেঁচিয়ে বোঝাবে ? তারা নিজেরা সেটা স্বীকার করে না কেন ? বুলুর জেদ বাড়ছে, সে বিছানার পাশে চিলিমচি রেখে ইচ্ছে করেই বিছানায় পেচ্ছাপ করে ফেলে। সকালে মায়ের আরেকটা হতভম্ব মুখ দেখা যাবে। তার চেয়েও মুগ্ধকর শেলীর বিরক্তিকর চেহারা। এখন ঘুম আসছে বুলুর চোখে।

সকালে, রাতে রুটিন মতো যা ভেবে রেখেছিল, বুলু তাই ঘটে। বড়ভাই আঙুল নাড়িয়ে চিল্লাচিল্লি করে, হারামজাদা বজ্জাত, ইচ্ছা কইরাই এইসব করে। তবে মার কান্নাকাটির মাত্রাটা একটু বেশি হওয়ায় বিচলিত বোধ করে বুলু। মা উঠোনের রোদে কাঁথা চাদর ছুড়ে দিতে দিতে ঘনঘন নাক ঝাড়ছেন, সহ্য হয় না, মরণ হয় না কেন, যন্ত্রণা- এইসব টুকরো টুকরো শব্দ বুলুর নিঃসাড় সত্তায় গেঁথে যেতে থাকে। ভাইবোনের উল্মম্ফনের মুখে সে টুঁ শব্দটি করে না।

তারা চলে যাওয়ার পরও বুলু অনেকক্ষণ নড়ে না। রোজকার রুটিনমতো রোদের সরে যাওয়া এবং কাত হয়ে আকাশে মেঘের অনুপস্থিতি লক্ষ করতে থাকে সে। দুপুর পেরোলে সে লক্ষ করে, প্রায় প্রতিদিনকার মতো শেলীর খুপরির মতো ঘরে একজন পুরুষের গলা শোনা যাচ্ছে। দরজা এমনভাবে ভেজানো, না ভেজালেও চলত। মাঝে অনেকটা ফাঁক। বারান্দা দিয়ে নিজেকে ছেঁচড়ে সে সেই ঘরে উঁকি দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে। তার খুব আনন্দ হয়। শেলীকে দারুণভাবে অপ্রস্তুত করে তার বিচলিত মুখটা বেশ রসিয়ে দেখা যাবে। অনেক কষ্টে নিজেকে সে দরজা পর্যন্ত টেনে নেয়। যা ভেবেছিল, পাটশোলার মতো শুকনো ড্যাঙা ছেলেটা বোকার মতো শেলীর গালে চুমু খাচ্ছে। 

তাকে দেখে ছেলেটা অপ্রস্তুত হয়ে শেলীকে নাড়া দেয়। বুলু তখনো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। শেলী হকচকিয়ে তাকায়। বুলু বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে ওঠে। শেলী বলছে- ও বুলু, কিচ্ছু অইবো না, বলে সে নির্লজ্জের মতো তার মুখ দিয়ে পাটশোলার মতো ছেলেটাকে ঢেকে দেয়।

বুলু পা ছেঁচড়ে নিজের জায়গায় ফিরে আসে। পায়ের ন্যাকড়া একটানে খুলে ফেলে। জায়গাটা ফুলে হলুদ হয়ে আছে। যন্ত্রণা হচ্ছে। পায়ের চেয়ে বেশি মাথায়। আকাশ ডাকছে। রোদে ভরা আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। বুলুর চোখ পায়ে।

আমি কি এই বাড়ির জারজ পোলা ? বলতে চায়, কিন্তু এ কথার কোনো প্রভাব নেই কোথাও। বুলু চেপে ধরে ফুলে ওঠা হলুদ জায়গাটায়। পুঁজ বেরুচ্ছে। অন্ধকার লাগছে চারপাশ। প্রচণ্ড ব্যথায় ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে শরীর। চিৎকার করে ওঠে বুলু, আম্মা...।

মহিলা এই বাড়ির বাঁদি। রান্নাঘরে কিছু একটা করছে। বাড়ির কর্তা বড়ভাই দুজন বাবা মরার পর কর্তা হয়ে একেবারে জাতে উঠে গেছে। সারা দিন দুটো জোয়ান পুরুষ কী যে কাজ করে বাইরে! ডালের পানি আর চিচিঙ্গা ভাজি খেতে খেতে বুলুর বমি আসার জোগাড় হয়েছে। মা তো সাবেকি মা হয়ে এক আধ বেলা প্রায়ই না খেয়ে থেকেও হেসে হেসে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেন।

বড়ভাই দুজন কি বাল ফালায় ? চিৎকার করে বুলু, জুতসই হচ্ছে শব্দগুলো। হালকা হয়ে উঠছে বুক। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। কী হইছে ?--

কী হইছে দেখো না। এইডা কি মাগিবাড়ি ?

এইবার বুলুর বুক ঝরঝরে হয়ে ওঠে। নিশ্চয়ই প্রেমিকসহ শেলী শুনছে কথাগুলো। প্রতিশোধটা ঠিকমতোই নেওয়া হচ্ছে।

তোর মরণ দ্যায় না কেন আল্লায় ? মা’র হতাশা চারপাশকেও প্রভাবিত করে। শেলী বেরিয়ে আসে, আরে ল্যাংড়াগুলা কি অত সহজে মরে ? বুড়া বয়সে আপনের ঘাড়ে বইসা রক্ত চুষব কে ?

মা রান্না ঘরে চলে গেলে ভেবে পায় না বুলু, মা মরণ প্রসঙ্গে ‘আমার’ না ‘তোর’ শব্দ ব্যবহার করেছে। শেলীর কথায় মনে হচ্ছে শব্দটা তোরই হবে। ফের কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। ডালিমগাছে চড়ুই লাফাচ্ছে। অথবা ঘরের পাশে মেহেদি গাছে। রোজই লাফায়। কিন্তু এখন লাফাচ্ছে বুলুর মাথার রগের মধ্যে, পায়ের হলুদ ঘা-টার ওপর।--‘ও বুলু, কিচ্ছু অইব না।’ 

শেলীর কথাগুলো ধোঁয়ার মতো, তীব্র এক ঝাঁজের মতো বুলুকে ঘোলাটে করে দেয়। বুলু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। একটা মুরগি দাওয়ায় লাফাচ্ছিল যেন। শেলী তাকে ‘হেস’ করে তাড়িয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে নি। শেলী সম্পর্কে মা প্রায়ই তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘একই রক্তের ভাই-বোন তোরা, অর সাথে লাগস ক্যান অত ?’ ওই রক্তের সম্পর্কের বোনটার কাছে সে একটা জড় পদার্থ। মাথায় খুন চেপে যায় বুলুর। কিন্তু নিজের ক্ষমতার দৌড় জানে সে। এবং এজন্যই সমস্ত যন্ত্রণা, ঘৃণা, ক্রোধ নিয়ে একসময় বিস্ফোরিত হয় সে, একসময় গুটিয়ে যায় নিজের মধ্যে। এখন নিজেকে গোটাতে হচ্ছে বলে ক্রমেই সে ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মা ঘরে সেলাই করছেন। গড়িয়ে সিঁড়িতে নামে বুলু। এক সময় কাদাভর্তি উঠোনে। হলুদ কাটা জায়গাটায় কাদা ঢুকছে। সমস্ত শরীর মাথা কাদায় একাকার হয়ে যাচ্ছে। মা বারান্দায় এসে চোখ কপালে তোলেন, পাগল হইলি তুই ? আরও কী কী বলে হাত ইশারা করছেন ভেতরে যাওয়ার জন্য। 

বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। মাকে বিচলিত লাগছে। আজ রাতে আত্মহত্যা করবে বুলু। এই পঙ্গু জীবনের অবসান ঘটাবে। ঘরের প্রতিটি সত্তাকে, অস্তিত্বকে বোঝাবে সে একজন রক্তমাংসে গড়া অস্তিত্ব। মোট কথা সে সমস্ত উপেক্ষা-অনীহার দৃষ্টির মুখে থুথু ছুড়ে দেবে। আজ হোক, কাল হোক, পরশু হোক সে চারদিকে দাউদাউ আগুন লাগিয়ে তবেই মরবে। ক্রমশ শীতল হয়ে আসে মাথা। পায়ের ছেঁড়া জায়গাটা সমস্ত যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। এই প্রচণ্ড বৃষ্টির নিচেও ঘুম পাচ্ছে বুলুর।

অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে। অনেক পরে মাঝখানের দরজায় শব্দ হয়। একজন তরুণী বেরিয়ে আসে। বাথরুমে যেতে হলে মাঝের রুম ডিঙিয়ে বারান্দায় যেতে হয়। তরুণী বারান্দার পাশে বেড়া দিয়ে ঢাকা বাথরুমে চলে যায়। নিজেকে টেনে গড়িয়ে গড়িয়ে বারান্দায় আসে বুলু। শ্বাসরুদ্ধকর কিছুটা সময় এইভাবে কাটে। 

আকাশটা মেঘে ঢাকা। ডালিম অথবা মেহেদিগাছটার অস্তিত্ব সেই অন্ধকারে মিশে গেছে। তরুণী বেরিয়ে এসেছে। বুলুর হাতে এক পশুর শক্তি। মুহূর্তে সে তরুণীর দু’পা করে নিচে ফেলে দেয়। 

একটা চিৎকার। বুলুর মাথায় রক্ত, শরীরে আগুন। ধস্তাধস্তির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ঘরের মানুষগুলোরও। বুলু সমস্ত রক্তসম্পর্ক অসম্পর্কের ঊর্ধ্বে চলে গিয়ে তীব্রভাবে বোঝাতে চায়, সে একজন মানুষ। একজন পুরুষ।


রচনাকাল : ১৯৮৫

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন