বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

কৃষ্ণা দাসের গল্প : নির্বীজ

#এক#

অন্যদিনের মতোই প্রতিভাস ঘুম থেকে উঠে দু’কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলো কিচেন থেকে। এখন নভেম্বর মাসের শেষের দিক। তবুও সকালের দিকে বেশ ঠান্ডা। উঠতে ইচ্ছা করছে না। প্রতিভাস কাপ দুটো সাইড টেবলে রেখে নরম করে বলল, “গুড মর্নিং!”


আমি মুখটা লেপের ভেতর থেকে বার করে ওর দিকে তাকালাম । ইউনিফর্ম পরা, ক্লিন সেভড্, সদ্য স্নান সারা প্রতিভাসকে পবিত্র লাগছে ।

প্রতিভাস বিছানায় আমার পাশে বসল। আমি ওর কোলে মাথা তুলে দিলাম, প্রতিভাস কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”

আমি তাও উঠলাম না। প্রতিভাস আমার চুলগুলো বিলি কাটতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করলাম ।

ফোনটা বেজে উঠল। প্রতিভাস আমার মাথাটা যত্নে বিছানায় নামিয়ে উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল। তার পর ফিরে এসে বলল, “বুয়া আমি চললাম, তুমি খেয়ে নিও।”

আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম, “কটা বাজে?”।

“আটটা।”

প্রতিভাস বুটের ফিতে বেঁধে টুপিটা হাতে নিয়ে নিল । আমি কাছে এসে দাঁড়ালাম। প্রতিভাস আমায় আলতো জড়িয়ে বলল, “আসি, তাড়াতাড়ি ফিরবো।”

আমি কিছু বললাম না, শুধু জড়িয়ে থাকলাম। প্রতিভাস আমার বাসি চোখে চুমু খেয়ে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। আমি জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলাম ড্রাইভার জিপ ছেড়ে দিল।

এবার সারাটা দিন আমি একা। প্রতিভাস ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে । আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাথরুমে ঢুকলাম ।

এটা অযোধ্যা পাহাড়ের গা ঘেঁষে রঙ্গা’তে রেঞ্জার বাংলো। প্রতিভাসকে সবাই ‘রেঞ্জার সাব’ বলে ডাকে। তার খুব নামডাক এ তল্লাটে। কাগজের পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের বিয়ে হয়েছে এই পাঁচবছর হল। প্রতিক্ষণেই কলকাতাকে খুব মিস করি। ওখানকার হইচই, ওখানকার মানুষের ভিড়, বন্ধু, আত্মীয় ,সব। এখানের এই নিঃশব্দতা কেমন যেন বুকে উপর চেপে ধরে। কেমন মন কেমন করা। মনে হয় আমি দম বন্ধ হয়ে মারা পড়ব। বিয়ের সময় মা বাবা দাদা বলেছিল “অযোধ্যা তো কাছেই, তুই আসবি, আমরাও যাব। যাওয়া আসা লেগেই থাকবে”। কিন্তু কোথায় কী !

আমি আজকাল হাঁটতে বের হই। কী করব সময় যেন কাটে না । বাংলোয় কাজ করার জন্য মংলু আছে, রান্না করে গঙ্গামাই। আমার কোন কাজ নেই। আমার সমস্ত দিনটা কেমন যেন পড়ে পড়ে ঘুমায়। মা দাদা বাবা ফোন করত আগে রোজ। সারাদিনে অনেকবার । কী করছি? কী খাচ্ছি? এই সব । এখন আর রোজ করে না।

মাঝে মাঝে ভাবি এই কি জীবন? যা আমি চেয়েছিলাম? উত্তর আসে কিন্তু আমি শুনতে চাই না কিছুতেই । আমার কী এমন যোগ্যতা আছে যে নিজের জীবন নিজে বেছে নেব? আমি কোন রকমে টেনেটুনে পাস গ্রাজুয়েট । লোকে বলে আমি কালো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছি আমি সুন্দরী বোধ হয় তেমন নই, ওই কাজ চালানো গোছের। এমন মেয়ের প্রতিভাসের মতো স্বামী পাওয়াটা কম ভাগ্যের ব্যাপার নয়। প্রতিভাস ছোট থেকেই মিশনে মানুষ । তার বাবা, মা, ভাই, বোন কেউ নেই। থাকলেও কেউ তা জানে না । জ্ঞান হবার পর থেকে সে নিজেকে অনাথ ছাড়া আর কিছু দেখেনি। এই বিয়েটা সে নাকি করতেই চায়নি। শিবানন্দ মহারাজ এক প্রকার জোর করেই বিয়েটা দিয়েছেন ।

হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে এসেছি । বাংলো ছাড়িয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে মুন্ডা বস্তির কাছে । রুকমনি আজও দেখি খোঁপায় জবা লাগিয়ে মহাদেওয়ের সাথে হাসতে হাসতে কথা বলছে । ওকে দেখে অবাক লাগে । কালো পাথর খুদে যেন তৈরি । শরীরের চড়াই উতরাই নিয়ে অপরূপ ভাস্কর্য । বয়স উনিশ কুড়ি হবে । পরনে খাঁটো করে একটা লাল ছাপা শাড়ি আঁটসাঁট করে পরা । অনাবৃত কাঁধ পিঠ আর ভরাট বুকের এক দিক অল্প দৃশ্যমান । তাকে আমার বনদেবীর মতো লাগে । নিষ্পাপ , হাসি খুশি । মহাদেও ওর বর, কুচকুচে কালো, দেহাতি গড়নের বছর বাইশ তেইশের সেও টগবগে জোয়ান । তার মুখেও হাসি লেগে থাকে । সে রুকমনির সাথে কারণে অকারণে ফিসফিস করে কথা বলে, হা হা করে অট্টহাস্য করে, আর দুলে দুলে হাঁটে । মুখ দেখলে কেমন বাচ্চা বাচ্চা লাগে । মনে হয় এ মানুষটার শরীর বড় হয়েছে বটে তবে মন নয় । কখনও শাল গাছের তলায় দুপুরে বসে চোখ কুঁচকে দুটিতে বিড়ি টানে, তো কখনও হাড়িয়া খেয়ে দুটিতে শুকনো পাতায় শুয়ে থাকে পাশাপাশি । তাকে কাজ করতে বিশেষ দেখি না । সে মোড়লের এক ও অদ্বিতীয় ছেলে । মহাদেওয়ের পর মোড়লের বাকি ছয় সন্তানের সবই নাকি মেয়ে ।

এ সবই আমার বুড়ি রাধুনি গঙ্গামাই বলেছে । এ তল্টাটে সব খবর তার নখদর্পণে ।

বাংলোয় ফিরে গঙ্গামাইকে জিজ্ঞেস করলাম রসুই ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, “রুকমনির কত দিন বিয়ে হয়েছে গো?”

“এহ্ পাঁচ সাল হোবে বিবিজি ।”

“পাঁচ বছর বিয়ে হল বাচ্চা কাচ্চা কটা?”

“নেহি হ্যায় বিবিজি ।”

“নেই?”

“নেহি বিবিজি।”

“আহারে! কার দোষ গঙ্গামাই?”

“বহ্ যব্ পেট সে থি তব উসকি একসিডেন্ হুয়া থা । ঘোড়ে গাড়ি সে উলট পঢা । চোট ভি লাগা পেট মে । বস উসকি তকদির গয়া । বচ্চা ভি গয়া, আউর ডক্ডর নে কঁহা -বহ কভি মা নেহি হো সকতি।”

কী জানি কেন রুকমনির জন্য মনটা খুব খারাপ লাগল । পশ্চিমের বারান্দায় রোদ এসেছে । আমার রোদটাকে হাহাকার মনে হল । আমি রোদের থেকে চোখ সরিয়ে আমার ঘরে চলে এলাম ।



#দুই#

প্রতিভাস আর আমি আজ বেরিয়েছি । কোনই কারণ নেই । আসলে আজ রবিবার । প্রতিভাস অনেক দিন পর আমাকে ঘুরতে নিয়ে বেরল । আমরা হুন্ড্রু জলপ্রপাত দেখতে এলাম।

প্রতিভাস একটা ডিপ ব্লু জিনস পরেছে সঙ্গে স্ট্রাইপ্ড্ ফুল স্লিভস্ শার্ট । ও কে বরাবরের মত স্মার্ট লাগছে । আমি পরেছি হলুদ শাড়ি প্রতিভাসের পছন্দ মতো ।

এখানে এলে খুব পা ভেজাতে ইচ্ছা করে । পাহাড়ের ওপর থেকে জলধারা লাফিয়ে নামছে নীচে । কিছু বাচ্চা সেখানে লাফালাফি করছে । আমি আর প্রতিভাস একটু দূরে পাথরের ওপর এসে বসলাম । প্রতিভাস বরাবর কম কথা বলে । বিয়ের আগে আমি খুব কথা বলতাম, এখন আর বলা হয়ে ওঠে না । সারদিন একা । একটা যদি বাচ্চা থাকত! আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি ।

প্রতিভাস সেটা লক্ষ করে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় । আমি বলি, “এবার বোধহয় আমাদের ইসু নেওয়া যেতে পারে । তুমি কী বল?”

কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে প্রতিভাস বলে, “আমি এখনো প্রস্তুত নই।”

আমি অবাক । আমাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হল । কলকাতায় গেলে মা কেবল বলেন, “এবার তোরা বাচ্চা না নিলে আমি কি পারবো মানুষ করে দিতে? আমারো তো বয়েস হচ্ছে । আর দেরি করিস না বুয়া।”

আসলে ঠিক দেরিটা আমার ইচ্ছেয় নয় । অনেকবার মার কথাটা প্রতিভাস কে বলেছি । ও আশ্চর্য নিশ্চুপ করে থাকে । বুঝতে পারি না ওর সমস্যাটা কী ।

আজ জলের দিকে তাকিয়ে ওর ছায়াটা দেখলাম । সুঠাম সুন্দর । আমি প্রতিভাসের দিকে তাকালাম, সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালাম । ও আমার চোখ এড়িয়ে দূরে জলের আবর্তে তাকিয়ে ।

“কী ভাবে তুমি প্রস্তুত হবে? আর কবে?”

প্রতিভাস চমকে উঠল মনে হল । আসলে এই প্রথম আমি ওর চোখের ওপর প্রশ্ন ছুড়ে মারলাম । কয়েক সেকেন্ড, তার পর ও অসহিষ্ণু হয়ে বলল, “আমি চাই আমার বাচ্চাকে পৃথিবীর সেরাটা দিতে । সেরা খাবার, সেরা শিক্ষা, সেরা জীবন । কিন্তু তা এখন সম্ভব নয়।”

ও আর দাঁড়াল না । আমাকে ফেলেই হনহন করে চলে গেল ওপরে জিপের কাছে । আমি জানি এর পরে আমার কথাগুলো ও শুনতে চায় না বা শুনেও তার উত্তর দিতে পরতো না । আমি বলতাম “সেরার কোন শেষ নেই, তাই সে কথা না ভেবে আমরা যেমন- তেমন ভাবেই তাকে মানুষ করবো । তুমি শুধু রাজি হও।”

না এসব মনেই থেকে গেল, আমি আর বললাম না । আমিও ওর পিছে পিছে উঠে এলাম ।

# তিন#

আজ খুব বাড়ির জন্য মন কেমন করছে । মা বলছিল কাল বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না । মারও নাকি হাঁটুর যন্ত্রণাটা বেড়েছে । কিন্তু তবুও যাব না । কী করবো গিয়ে? দাদাই সব করছে, দাদার হাতে যদি কিছু টাকা দিয়ে আসতে পারতাম! প্রতিভাসের কাছে টাকা চাইতে লজ্জা করে । বিশেষ করে ও যদি আমার বাবা মা কে আপন ভাবতো তবুও চাওয়া যেত । কিন্তু ও এখনো আমার বাবা মাকে ‘মিস্টার বোস’ ‘মিসেস বোস’ বলে সম্বোধণ করে । মানছি ও আশ্রমের ঘেরা টোপে মানুষ হয়েছে, তাই বলে এখন তো বলতে পারে । গত পাঁচ বছরে মাত্র একবার আমার বাপের বাড়ি গিয়েছে এবং সেটাও বিয়েতে । প্রথম প্রথম মা বাবা দাদা খুব বলত ওকে যাবার জন্য, এখন আর বলে না ।

আজ আর হাঁটতে গেলাম না । ঘরে বিছানায় শুয়ে বসে কাটালাম । জানলার পাশে বুনো কুল গাছে নিটোল গোল গোল কুল ধরেছে । খেয়ে দেখেছি , খুব টক ।

গঙ্গামাই ঘরে ঢুকলো, “ক্যা বিবিজি তবিয়ত ঠিক নেহি হ্যায় ক্যা?”

“হ্যাঁ গঙ্গামাই, শরীর ঠিক আছে।”

“তব্?”

“মন ভালো নেই।”

“বহ্ তো সহি। আব দেখো রুকমনি কো ………..কিতনা বদ নসিব হ্যায়।”

“কেন ওর কী হয়েছে?” আমি উৎকন্ঠিত হয়ে উঠলাম ।

“অর ক্যা? মহাদেওকো ফির সাদি দেনে কী তৈয়ার চল রহি হ্যায়।”

“মানে? কেন?” ভেতর ভেতর উৎকন্ঠাটা বাড়ল ।

“বিবিজি মহাদেও সরপঞ্চকা একহি বেটা । উসকা বচ্চা নেহি ইসিলিয়ে সরপঞ্চ উসকা দুসরা সাদি দেকর ওয়ারিশ আনে কা বন্দবস্ত কররাহা হ্য্য়।”

আমি মানস চোখে দেখলাম রুকমনি কাঁদছে । আমার মন আরো খারাপ হয়ে গেল । আমি ঘর অন্ধকার করে ঘুমানোর বৃথা চেস্টা চালিয়ে গেলাম ।


রাতে বৃষ্টি শুরু হল । খবরে দেখলাম নিম্নচাপ । দক্ষিণ বঙ্গ ভাসিয়ে এবার মেঘ এসেছে পশ্চিমে । রাতে প্রতিভাসের সাথে তুমুল ঝগড়া হল । না ঠিক ঝগড়া নয়, একতরফা আমি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছি।“আর কত কাল লাগবে প্রতিভাস? তোমার প্রস্তুত হতে হতে যে আমি বুড়ি হয়ে যাব?”

উত্তরে প্রতিভাস খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি চাইলে ডিভোর্স নিতে পারো । আমি বাঁধা দেব না, শুধু ভুল বুঝ না।” আমি ফ্যালফ্যল করে তাকিয়ে রইলাম, একী কথা বলল প্রতিভাস? “ডিভোর্স?”

কত সহজে বলল কথাটা । এমন কথা ভাবল কী করে? আমি যে কক্ষনো এমন ভাবতেই পারিনি । বুকের ভেতর জলছ্বাস উঠল । কিন্তু কিচ্ছু না বুঝতে দিয়ে পাশ ফিরে শুলাম । শুধু শুধু চোখের জল বাঁধ ভেঙে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে । আমি প্রাণপণ তা রোধের জন্য চেষ্টা করে গেলাম ।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙেই ঠিক করলাম আজ মার কাছে যাব । কিন্তু কেমন করে? এত বৃষ্টিতে রাস্তায় বেরিয়ে যদি কোন সমস্যায় পড়ি? তবু প্রতিভাস কে বললাম । ও হ্যাঁ না কিছু বলল না ।

প্রতিভাস সকালে উঠে আজ কফি বানায়নি । আমি বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে দেখি কখন যে তৈরী হয়ে বেরিয়ে গেছে জানি না । যাবার আগে বলেও গেল না । অঝোর বর্ষণে কেমন কাঁদতে ইচ্ছা হল । কিন্তু কেন যে পারছি না জানি না । শুধু বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে ।

আমি তৈরী হয়ে ওকে ফোন করলাম । প্রথমটা ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল । তার পর ও রিং ব্যাক করল ।বললাম, “আমি আসছি তাহলে।”

ও বলল “একেবারে?”

আমি হতবাক! এ কী কথা? আমি কি কখনো বলেছি একেবারে যাব? এত ওরই কথা । খুব অভিমান হল, চুপ করে থাকলাম । একটু পরে দেখি লাইনটা কেটে গেছে । চোখের জল মুছে হাঁক দিলাম, “মংলু গাড়ি ডাকো”



#চার#

প্রতিভাসের সঙ্গে যোগাযোগ নেই অনেক কাল । আমি কলকাতা যাবার পর দাদা সব শুনে বলেছিল “চাইলে তুই এখানেই থাকতে পারিস বুয়া ।আর চাইলে ফিরেও যেতে পারিস” । সপ্তাহ খানেক অপেক্ষা করে আমি একদিন প্রতিভাসকে ফোন করি । ও ফোন রিসিভ না করে এসএমএস এ লিখলো “তুমি চাইলে এখানে আসতেও পারো আর না চাইলে ওখানেই থাকতে পারো।” ঠিক দাদার মত কথা । অনেক দুঃখেও হাসি পেল ।

আমি কী? কোন বস্তু ? আমার ওপর কারুর কোন টান নেই ? কারো কোন অধিকার নেই ? নিজেকে খুব মূল্যহীন লাগল । কেবল গ্রাসাচ্ছেদনের জন্য কি আমার এখানে ওখানে অবস্থান? ঠিক করলাম নিজের পায়ে দাঁড়াব তার পর ঠিক করব কোথায় থাকব ।

আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে একটা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে নাম লেখাই । যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মূল্যবোধ, সমাজ সচেতনা বাড়ায় । অবাক লাগল কিছু দিনের মধ্যেই আমি আমার কাজে কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ি । ধীরে ধীরে আমার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে । আর গত দু বছরে আমি প্রকৃত স্বাবলম্বী হয়ে উঠি । এখন নিজেকে অনেক সুরক্ষিত বোধ করি । অনেক আত্মবিশ্বাসী ।

একদিন আমাদের টিম এল রঙ্গাতে । আমি এক সঙ্গে অনেক স্মৃতি নিয়ে চুপ করে বসে রইলাম সেন্টারে ।কী জানি প্রতিভাস কেমন আছে? আমাদের ডিভোর্স হয়নি, তাই ও যে আর বিয়ে করেনি তা নিশ্চিত । সারাদিন নানা ওয়ার্কশপের পর আমি ফিরে এলাম রঙ্গা গেস্ট হাউসে আরো কিছু সঙ্গীর সঙ্গে । রাতের খাবারের দেরি আছে । আমি ওয়ার্কর্সিট গুলো মেলাচ্ছি হঠাৎ শুনলাম, “বিবিজি আপ?”

তাকিয়ে দেখি গঙ্গামাই । একটুও বদলায়নি, শুধু চুলটা পুরো সাদা হয়ে গেছে । আমি দেখে খুব খুশি হলাম । চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি, হয়তো জড়িয়েও ধরতাম । কিন্তু নিজেকে সংযত করে বলি “আরে গঙ্গামাই কেমন আছো?”

গঙ্গামাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল, “কিয়ঁ বিবিজি ? আপ সাব কো কিয়ঁ ছোড় দিয়া?”।

আমি কী বলবো ? বললেও কি ও বুঝবে? তাছাড়া বলবই বা কেন? আমি বললাম “তোমার সাব কেমন আছে?”

“আপ খুদ হী দেখলেনা।” ও চলে যাচ্ছিল । আমি বুঝলাম অনেক অনুযোগ আমার ওপর । বললাম, “গঙ্গা মাই রুকমনি কেমন আছে?”

ও ফিরে তাকাল । তার পর কাছে এসে বলল, “বড়িয়া!”

আমি উত্তর শুনে একটু অবাক হলেও ভালো লাগল । বললাম, “মহাদেওর নতুন বউযের কটা বাচ্চা?”

শুনে গঙ্গামাই ফোকলা হেসে বলল, “এক ভি নেহি।”

গঙ্গামাই এর হাসিটা দেখে অবাক হলাম । “হায় এবার কী তবে মহাদেও তৃতীয় বিয়ে করবে?”

গঙ্গামাই হেসে বলল, “মহাদেওকো অর কোই সাদি দেনে কী জুলুম নেহী করেগা ।”

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না । গঙ্গামাই বলল “বিবিজি মহাদেব রুকমনিকো কভি নেহি ছোড়েগা ।জুলুম করনে কী কোই বাতই নেহী । বহ নির্বীজ করলিয়া।”

“নির্বীজ? মানে ভ্যাসেকটমি?”

“জি জি, বহি।”

আমি হাঁ হয়ে গেলাম । এমনও হয়? এমনও হয় সভ্য শিক্ষিত জগত থেকে দূরে তথাকথিত গ্র্রাম্য অশিক্ষিত এক যুবকের? আমি মনে মনে মহাদেওকে স্যালুট করলাম ।


আমাদের কাজ শেষ । এবার ফিরে যাব কোলকাতা । এই কয়দিনে প্রতিভাসের কথা খুব মনে পড়েছে। যতবার মনে পড়েছে ততবার মহাদেওর সাথে তুলনা চলে এসেছে । আজ মনে হয় প্রতিভাসের সমস্যাটা মানসিক।

নিজের পিতৃমাতৃ পরিচয়হীনতা ওকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে রেখেছে । এমনিতে ও মানুষ খারাপ ছিল না । বার বার মনে হচ্ছে আমার আরও একটু ধৈর্যশীল হওয়া উচিত ছিল ।

কখন পায়ে পায়ে রেঞ্জার বাংলোর কাছে চলে এসেছি জানি না । চার পাঁচটা বাচ্চা খেলা করছে বাংলোর সিঁড়িতে । কার বাচ্চা? সুসভ্য পোষাক, যত্নের ছাপ তাদের শরীরে । কার বা কাদের বাচ্চা ? আমি ওদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটাকে কোলে তুলে নিলাম । বছর দেড় দুয়েক হবে । কালো আর হৃষ্টপুষ্ট । বড় বড় দুস্টুমি মাখা চোখ, মাথা ভরা চুলে কপাল ঢাকা । বাচ্চাটা আমার কোলে চুপ, আমার কাঁধে মাথা রেখে বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে । বড় নিশ্চিন্ত, বড় মায়াময় । আর অদ্ভুত ভালো লাগায় আমার মন প্রাণ কানায় কানায় ভরে যাচ্ছে ।

মংলু ছুটে এল । ওর চোখে অবাক দৃষ্টি । ও যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না বিবিজীকে দেখছে । আমি হেসে বললাম, “মংলু কেমন আছো?”

ও ঘাড় নেড়ে বলল ভালো । আমি বললাম, “বাচ্চাগুলো কার মংলু?”

মংলু বলল, “এহ্ বাচ্চে সোব বিন মা বাপকে । সাব সোব কো পালতে হেঁ।”

মুহূর্তে আমার পা টলে গেল । আমার গলা-বুক জ্বলে গেল । অসহ্য ভালোলাগায় প্রতিভাস আমার চেতন অচেতন সমস্ত মন দখল করে নিল । আমি দেওয়ালির আলোকিত রাতের মতো অপার্থিব আনন্দে সবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছি, ঠিক তখনই দেখি প্রতিভাসের জিপটা আস্তে আস্তে গেট পেরিয়ে বাগানে নুড়ি ঢালা পথে আমার কাছে এগিয়ে আসছে ।

৫টি মন্তব্য: