বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

এলিস মুনরো'র গল্প : বালক এবং বালিকারা

অনুবাদঃ নাসরীন সুলতানা

আমার বাবা ছিলেন শেয়াল খামারী। অর্থাৎ তিনি খোঁয়াড়ে রুপালি শেয়াল১ পালতেন; এবং হেমন্ত ও শীতের শুরুতে যখন তাদের লোম সর্বোৎকৃষ্ট অবস্থায় পৌঁছাত তখন তিনি তাদের মেরে চামড়া ছাড়িয়ে নিতেন এবং তাদের খাল-চামড়া হাডসনস বে কোম্পানী বা মন্ট্রিয়ল ফার ট্রেডার্সদের কাছে বিক্রি করতেন। এই কোম্পানীগুলো আমাদেরকে বীরোচিত গল্প-গাঁথার ক্যালেন্ডার২ দিতো যা আমরা রান্নাঘরের দরজার প্রতি পাশেই একটা করে ঝুলিয়ে রাখতাম। সেই সব ক্যালেন্ডারে থাকত শীতল নীল আকাশ, কালো পাইন বন এবং উত্তরের প্রবঞ্চক নদীর পটভুমিতে পালক-শোভিত৩ অভিযাত্রীরা ইংল্যান্ড এবং অথবা ফ্রান্সের পতাকা পুতছে; এবং চমৎকার আদিবাসী লোকদের পিঠ পোর্টাজের৪ দিকে ঝোঁকানো।


বড়দিনের আগের কয়েক সপ্তাহ আমার বাবা রাতের খাবারের পর বাড়ির ভূগর্ভস্থ ভাঁড়ারে কাজ করতেন। ভাঁড়ারটা ছিল চুনকাম করা এবং আলোর জন্য ছিল শুধুমাত্র আমার বাবার কেজো টেবিলের উপরে একটা শত ওয়াটের বাল্ব। আমার ভাই লেয়ার্ড এবং আমি সিঁড়ির উপরের ধাপে বসে তা দেখতাম। আমার বাবা শেয়ালের শরীরের ভিতর দিক থেকে বাইরের দিকে ছাল ছাড়াতেন, অহংভারী লোমের চামড়া বঞ্চিত হয়ে সেগুলোকে বিস্ময়কর ভাবে ছোট, বিশ্রী এবং ইঁদুরের মত লাগতো। উন্মুক্ত, পিচ্ছিল শরীরগুলো বস্তায় সংগ্রহ করে আঁস্তাকুড়ে পুতে রাখা হত। একবার আমার বাবার ঠিকা লোক, হেনরী বেইলি, বস্তাটা দুলিয়ে আমার গায়ে একটা হালকা বাড়ি দিয়ে বলল, “বড়দিনের উপহার”। আমার মা এটাকে মজা হিসেবে নিতে পারেন নি। আসল কথা হল, আমার মা এই পেল্টিং৫ প্রক্রিয়াটা সম্পুর্নভাবে অপছন্দ করতেন- হত্যা করা, চামড়া ছাড়ানো এবং লোম প্রস্তুত করা, এই ধাপগুলোকে একসাথে তাই ডাকা হয় এবং তিনি চাইতেন এগুলো যেন বাড়িতে না করা হয়। এতে গন্ধ হতো। ছালটাকে একটা লম্বা বোর্ডের উপর ভিতর দিকটা উপরে রেখে টেনে প্রসারিত করার পর আমার বাবা সুক্ষ্মভাবে জালের মত ছড়ানো ছোট ছোট রক্তনালির মধ্যে জমাট রক্ত এবং চর্বির বুদবুদ গুলো চেঁছে তুলে ফেলতেন। রক্ত এবং প্রানিজ চর্বির গন্ধ- শিয়ালের নিজের আদি কড়া গন্ধ- বাড়ির সব অংশে ঢুকে যেতো। আমরা কাছে এ গন্ধটা স্বস্তিকর মৌসুমী গন্ধের মতোই মনে হতো যেমন কমলা লেবু এবং সুচালো পাইনের গন্ধ৬।

হেনরী বেইলি শ্বাসনালি সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিল। একবার কাশতে শুরু করলে কাশতে কাশতে যতক্ষন পর্যন্ত তার সরু মুখমন্ডলটা টকটকে লাল না হয়ে যেতো এবং তার রসিকতাপুর্ন হালকা নীল চোখ জলে ভরে না উঠত ততক্ষন পর্যন্ত সে কাশতেই থাকতো। তারপর সে চুলার ঢাকনা সরাতো এবং বেশ দূরে দাঁড়িয়ে কফের একটা বড় দলা জোড়ে ‘ফসস’ করে সরাসরি আগুনের কেন্দ্রে ছুড়ে ফেলতো। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকে তারিফ করতাম- তার এই কীর্তি-কলাপের জন্য, ইচ্ছেমত পেটে ঘর্ঘর শব্দ করতে পারার জন্য এবং তার হাসির জন্য যা ছিল উচু হুইস্লের শব্দ এবং গড়গড় শব্দের মতো, যেটাতে তার বুকের গড়বড়ে সব যন্ত্রপাতির অবস্থা ধরা পরতো। কখনো কখনো তার হাসির কারন বোঝা কঠিন হয়ে পড়তো, তবে আমাদের নিয়ে হাসার সম্ভাবনা তো ছিল বটেই।

আমাদের উপরতলায় ঘুমাতে পাঠিয়ে দেয়ার পরও আমরা শেয়ালের গন্ধ পেতাম এবং হেনরির হাসি শুনতে পেতাম। কিন্তু এই জিনিসগুলো, আমাদের নীচ তলার উষ্ণ, নিরাপদ এবং আলোকিত ভুবনের কথা মনে করিয়ে দিতো যেটা উপর তলার প্রচন্ড ঠান্ডা বন্ধ-বিস্বাদ বাতাসে চুপসে এবং হারিয়ে যেতো বলে মনে হতো। আমরা শীতের রাতকে ভয় পেতাম। আমরা বাইরের ব্যাপারে ভীত ছিলাম না যদিও বছরের সেই সময়টায় আমাদের বাড়ির চতুর্পাশে ঘুমন্ত তিমির মত তুষার স্তুপ কুন্ডুলী পাকিয়ে থাকত, এবং তুষারাবৃত মাঠ ও হিমায়িত জলাভুমি থেকে বাতাস পুরনো জুজুদের কোরাসের মত দুর্বিপাক এবং হুমকিতে সারা রাত আমাদের অতিষ্ঠ করে রাখতো। আমরা আমাদের ঘুমানোর ঘরের ভিতরটা নিয়ে ভীত ছিলাম। সে সময় আমাদের বাড়ির উপরতলাটা সম্পুর্ন করা হয়নি। দেয়ালের উপরের দিকে একটা ইটের চিমনি উঠে গেছিলো। মেঝের মাঝখানে সিঁড়ি ঘরের জন্য চারিদিকে কাঠের রেলিং দেয়া একটা চারকোনা গর্ত ছিল। সিঁড়ি ঘরের অন্যপাশে পরিত্যাক্ত ছোট ছোট অনেক জিনিস ছিল যেমন, এক কোনায় সৈনিকের মত দাঁড়িয়েছিল একটা লিনোলিয়ামের রোল৭, একটা বেতের উপসাগরীয় ঘোড়ার গাড়ি, এক ঝুড়ি ফার্ণ, ফাটল ধরা চিনামাটির জগ এবং বেসিন, মন খারাপ করা বালাক্লাভার যুদ্ধের৮ একটা ছবি। লেয়ার্ড এই সব জিনিস বোঝার মত বয়স হওয়ার পর তাকে আমি বলতাম যে বাদুর এবং কংকাল ওখানে বাস করতো; যখনই আমাদের বাড়ি থেকে বিশ মাইল দুরের জেলা সদরের জেল থেকে কোন লোক পালাতো, আমি কল্পনা করতাম যে, সে কোন না কোন উপায়ে জানালা দিয়ে ঢুকে নিলোলিয়াম রোলের পিছনে লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমদের নিজেদেরকে নিরাপদ রাখার নিজস্ব নিয়মও ছিল। আলো জ্বালানো অবস্থায় আমরা যদি আমাদের বিছানা কার্পেটের যে চারকোনা মধ্যে থাকতো তার বাইরে না যেতাম তা হলে নিরাপদ থাকতাম। আলো বন্ধ থাকলে বিছানা ছাড়া আর কোন জায়গাই নিরাপদ ছিল না। আলো বন্ধ করতে আমি আমার বিছানার শেষ প্রান্তে হাঁটু গেড়ে বসে যতদুর সম্ভব ঝুঁকে লাইটের দড়িটার নাগাল পেতাম।

অন্ধকারে আমরা ভেলার মত সরু বিছানায় শুয়ে সিঁড়ি ঘরের ফাঁকা দিয়ে যে হাল্কা একটু আলো আসতো সেদিকে তাকিয়ে গান করতাম। লেয়ার্ড গাইতো ‘জিংগেল বেল’, এটা সে সব সময়েই গাইতো, বড়দিন হলে বা না হলেও। আমি গাইতাম ‘ড্যানী বয়’। আমি আমার নিজের কন্ঠস্বর ভালবাসতাম, পলকা এবং হৃদয় ছোঁয়া প্রার্থনার মত, অন্ধকারে আরো উর্ধ্বগামী। আস্তে আস্তে আমাদের চোখে জানালার লম্বা হিমায়িত আকৃতি স্পষ্ট হয়ে আসতো- সাদা এবং তমসাচ্ছন্ন। হোয়েন আই এম ডেড, এজ ডেড আই উইল মে বি গানের এই অংশটায় এলে আমি আমার ভেতরে এক ধরনের কাঁপুনি অনুভুব করতাম, যেটা ঠান্ডা চাদরের জন্য নয় বরং আনন্দের কাঁপুনী, যা আমাকে একেবারে বোবা করে দিত। ইউ‘ল নীল এন্ড সে, এন এইভ দেয়ার এবাভ মী- এইভ কি? আমি প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করতে ভুলে যেতাম।

লেয়ার্ড গান থেকে সরাসরি ঘুমিয়ে যেতো। আমি তার প্রশান্তির দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেতাম। তারপর যে সময়টা থাকত সেটা হতো একান্তই আমার, ব্যাক্তিগত এবং সম্ভবত সমস্ত দিনের মধ্যে সবচেয়ে ভাল সময়, আমি নিজেকে কম্বলে ভালভাবে মুড়িয়ে রাতের পর রাত নিজের সাথে আমার যত গল্প, তা শুরু করতাম। এই গল্পগুলো ছিল আমার নিজের সম্পর্কে, যখন আমি আর একটু বড় হলাম, তখন সেগুলো ছিল স্পষ্টতই আমার নিজস্ব জগতের, সেগুলোতে আমার এখন পর্যন্ত না করা মনোবল, সাহস, এবং আত্মবলিদানের সুযোগকে উপস্থাপিত হতো। আমি বোমাক্রান্ত অট্টালিকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করতাম (আসল যুদ্ধ জুবিলী৮ থেকে বহুদুরে ঘটেছে, সেটা আমাকে নিরুৎসাহিত করতো)। আমি দুইটা খ্যাপা নেকড়েকে গুলি করেছিলাম যারা স্কুলের মাঠে ভয় দেখাতো (শিক্ষকরা আতংকগ্রস্থ হয়ে আমার পিছনে গুটিসুটি হয়ে কাঁপত)। সুন্দর এক ঘোড়ায় চড়ে জুবিলীর সদর রাস্তায় উদ্দম্যে ছুটে যেতাম, এখনো করা হয়নি এমন কিছু কাজের বিরত্বের জন্য শহরের মানুষদের অভিবাদন গ্রহন করতে করতে যেতাম(সেখানে কেউ কখনোই ঘোড়ায় চড়েনি শুধুমাত্র অরেঞ্জম্যান্স দিনের প্যারেডের রাজা বিলি৯ ছাড়া)। এই সব গল্পে সব সময় ঘোড়ায় চড়া এবং গুলি করা থাকতো, যদিও আমি মাত্র দুইবার ঘোড়ায় চড়েছিলাম—প্রথমবার কারন আমাদের কোন জিন ছিল না এবং দ্বিতীয়বার আমি একেবারে পিছলে পড়ে ঘোড়ার ক্ষুরের নীচে পড়েছিলাম; সেটা আমার উপর শান্ত ভাবে কয়েক বার পা দিয়েছিল। আমি আসলেই গুলি করা শিখছিলাম কিন্তু তখন পর্যন্ত কোন কিছুতেই আঘাত করতে পারতাম না এমন কি বাড়ির বেড়ার উপরে রাখা টিনের ক্যানেও নয়।

জীবন্ত শিয়ালগুলো একটা জগতে বাস করতো যেটা আমার বাবা তাদের জন্য তৈরী করেছিল। সেটা ছিল মধ্যযুগীয় শহরের মত উঁচু রক্ষা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা এবং রাতের বেলায় তালা দিয়ে বন্ধ করা যায় এমন দরজাও থাকতো। আমাদের এই শহরের রাস্তা বরাবর অনেক বড় বড় শক্ত-পোক্ত খোঁয়াড় ছিল। সেগুলোর প্রত্যেকটাতেই থাকত একজন মানুষ যাওয়া আসা করার মত একটা আসল দরজা, শিয়ালগুলোর উপর নীচ দৌড়াদৌড়ি করার জন্য তার বরাবর কাঠের ঢালু তক্তা এবং একটি শিয়ালের গর্ত—সেগুলো কখনো কখনো বাতাস চলাচলের জন্য ছিদ্রযুক্ত কাপড়ের আলমারীর মত হত—যেখানে তারা ঘুমাতো, শীতের সময় যেখানে তারা ঘুমাতো ও থাকতো এবং সেখানে তাদের বাচ্চা হতো। সেখানে তারের সাথে এমন ভাবে খাওয়ানোর এবং পান করানো পাত্র থাকতো যাতে সেগুলো বাইরে থেকেই খালি করে পরিস্কার করা যায়। পাত্রগুলো পুরনো টিনের ক্যান থেকে তৈরী করা এবং র‍্যাম্প ও ঘর ছিল পুরনো কাঠের। সব কিছু্তেই পরিপাটি এবং উদ্ভাবনের ছোয়া। আমার বাবা ছিল অক্লান্ত উদ্ভাবক এবং পৃথিবীতে তার সবচেয়ে পছন্দের বই হল রবিনসন্স ক্রুসো। খোয়াড়ের নীচ থেকে পানি আনার জন্য তিনি একটি ঠেলাগাড়ির উপর একটা টিনের ড্রাম বসিয়েছিলেন। গ্রীষ্মকালে আমার কাজ ছিল শিয়ালদের দুই বেলা পানের পানি দেয়া। সকালে একবার নয়টা থেকে দশটার মধ্যে এবং আর একবার রাতের খাবারের পর। আমি পাম্প করে ড্রামটা ভরে চাকা গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নামিয়ে গোলাঘরের মধ্য দিয়ে খোয়াড়ে নিয়ে আসতাম। সেখানে আমি থামিয়ে আমার পানির ক্যান ভরে রাস্তা ধরে নিয়ে যেতাম। লেয়ার্ডও আসতো তার ছোট ঘিয়ে এবং সবুজ ক্যান নিয়ে, যেটা আসলে বাগানে পানি দেয়ার জন্য কেনা হয়েছিল। সেও সেটা পুরোপুরি ভরতো এবং হাঁটার সময় পায়ের সাথে ধাক্কা লেগে পানি পড়ে তার ক্যাভাসের জুতো ভিজে যেতো। বাবার আসল পানি দেয়ার ক্যান থাকতো আমার কাছে, যদিও আমি তার মাত্র তিন চতুর্থাংশ ভরে আনতে পারতাম।

সবগুলো শেয়ালেরই নাম ছিল। টিনের পাতে নাম লিখে তাদের খোয়াড়ের দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা হত। জন্মের পরপরই তাদের নাম দেয়া হত না কিন্তু তারা প্রথম বছরের পেল্টিং এর পর বেঁচে থাকলে এবং প্রজননের জন্য নির্বাচিত করলে তাদের নাম দেওয়া হত। আমার বাবা যেগুলোর নাম দিতেন সেগুলো হতো ‘প্রিন্স’, ‘বব’, ‘ওয়ালী’ এবং বেটির মত। যেগুলোর নাম আমি দিতাম সেগুলো হতো ‘ষ্টার’ অথবা ‘তুর্ক’ অথবা ‘মরীন’ বা ‘ডায়ানা’। লেয়ার্ড একজন স্বল্পস্থায়ী ঠিকা মেয়ের নামে একটা নাম রেখেছিল ‘মোড’, একটার নাম রেখেছিল ‘হ্যারল্ড’ স্কুলের একটা ছেলের নামে এবং একটা নাম রেখেছিল ‘মেক্সিকো’ কিন্তু কেন, তা বলেনি।

নাম রাখার মানে এই নয় যে তারা পোষ্য হয়ে যেতো বা এমন কিছু। আমার বাবা ছাড়া আর কেউই খোঁয়াড়ে যেতে পাড়তো না, আর তারও দুইবার শিয়ালের কামড়ে রক্তে বিষ ক্রিয়া হয়েছিল। আমি যখন তাদের পানি আনতাম তখন তারা খোঁয়াড়ের মধ্যে তাদের সৃষ্ট পথে ঘুর ঘুর করতো, কদাচিৎ খেঁক খেঁক করতো, যেটা তারা রাতের জন্য জমিয়ে রাখতো— তখন তারা জেগে সমস্বরে চিৎকার করে সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় মেতে উঠতো। কিন্তু তারা সব সময়েই আমাকে পর্যবেক্ষন করতো, তাদের সরু এবং ধুর্ত মুখমন্ডলে পরিস্কার সোনালী চোখ জ্বল জ্বল করতো। তারা সুন্দর ছিল- তাদের রমণীয় পা, ভারী জমকালো লেজ এবং গাঢ় রংযের পিঠের নীচের দিকে ছড়ানো উজ্জ্বল পশমের জন্য- যেটা থেকে তাদের নামকরন করা হয়েছিল। কিন্তু বিশেষ করে তাদের মুখমন্ডলের জন্য চমৎকার পরিপুর্ন ধুর্ততার মধ্যে তাদের সোনালী চোখ নজর কাড়তো- তারা ছিল সব সময়েই সুন্দর।

পানি আনা ছাড়াও আমার বাবা যখন খোয়ারগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে জন্মানো লম্বা ঘাস, বথুয়া এবং কস্তুরী ফুল কাটতেন তখন আমি তাকে সাহায্য করতাম। তিনি লম্বা হতলের কাস্তে দিয়ে কাটতেন এবং আমি মঈ দিয়ে উঠে স্তুপ করে রাখতাম। তারপর তিনি একটা পিচফর্ক৮ দিয়ে কাটা ঘাসগুলো খোয়ারের উপরে ছুড়ে ছুড়ে দিতেন যাতে তারা ঠান্ডা থাকে এবং লোমগুলো ছায়া পায়- খুব বেশী সুর্যালোকে সেগুলো বাদামী হয়ে যেতো। কাজের সময় বাবা কাজ সম্পর্কিত কথা না হলে আমার সাথে কথা বলতেন না। এই ক্ষেত্রে তিনি আমার মার চেয়ে পুরো বিপরীত ছিলেন। মা উৎফুল্ল থাকলে তিনি আমাকে সব ধরনের কথাই বলতেন— তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন তার কুকুরের নাম কি ছিল, তিনি আর একটু বড় হওয়ার পর যে সব ছেলেদের সাথে তিনি বাইরে ঘুরতে গিয়েছেন তাদের নাম, এবং তার কিছু ড্রেস দেখতে কেমন ছিল, তিনি এখন কল্পনাও করতে পারেন না এখন সেগুলো কি হয়েছে। বাবার যে সব চিন্তা বা গল্পই ছিল না কেন তা ছিল ব্যাক্তিগত, এবং আমি বাবার কাছে লাজুক ছিলাম এবং তাকে কোন প্রশ্ন করতাম না। যাই হোক আমি তার চোখের সামনে কাজ করতাম এবং আমার ভিতর একটা গর্বের অনুভুতি কাজ করতো। একদিন একজন শিয়ালের খাদ্য বিক্রেতা খোয়ারে এসে বাবা্র সাথে কথা বলতে এলে বাবা বলেছিলেন, “আমি আপনার সাথে আমার নতুন কর্মচারীরর পরিচয় করিয়ে দিতে চাই”, আমি রেগে দ্রুত সরে গেছিলাম তবে খুশীতে আমার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল।

বিক্রেতা বললেন, “আমি তো একেবারে বোকাই বনে যাচ্ছিলাম, আমি তো শুধু একটা মেয়েই মনে করেছিলাম”।

ঘাস কাটার পরে, হঠাৎ করেই সেই সময়টাকে বছরের একেবারে শেষর দিক মনে হচ্ছিলো। আমি সন্ধ্যার পুর্বভাগের লালচে আকাশের সংবেদ্যতায় হেমন্তের নিঃশব্দ আগমনীতে ঘাসের মুড়ির উপর হাঁটছিলাম। যখন আমি ট্যাঙ্কটা গড়িয়ে ফটক দিয়ে বের করে তালা বন্ধ করলাম তখন প্রায় অন্ধকার। একরাতে এরকম সময় গোলাবাড়ির সামনের যে উঁচু জায়গাটাকে আমরা হালট বলতাম সেখানে আমার মা-বাবাকে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলাম। আমার বাবা কেবলমাত্র মাংসশালা থেকে ফিরেছেন; তার গায়ে শুকনো রক্তমাখা এপ্রন এবং হাতে এক বালতি কাটা মাংস।

গোলাবাড়ির সামনে এ সময়ে আমার মায়ের থাকাটা অস্বাভাবিক। তিনি সাধারনত ঘর থেকে বের হতেন না, যদি না কোন কিছু করতে হত— যেমন কাপড় মেলতে বা বাগানে আলু তুলতে। তাকে সেখানে বেমানান লাগছিলো, তার মাংশাল পা উন্মুক্ত- যা এখন পর্যন্ত সূর্যালোকের ছোঁয়া পায়নি, এখনো তার গায়ে এপ্রন এবং তা পেটের কাছে ভেজা- রাতের খাবারের পর থালা বাসন ধোয়ার জন্য; একটা রুমালের মধ্যে আবদ্ধ তার চুল ঝাঁটার মত এদিক সেদিক থেকে বেড়িয়ে আছে। তিনি সকালে এভাবে চুল বাঁধতেন আর বলতেন ঠিক ভাবে চুল বাঁধার মত সময় পর্যাপ্ত তার নেই এবং সারা দিনই তা ওভাবেই বাঁধা থাকতো। সেটা সত্যি ছিল, আসলেই তার সময় ছিল না। এ সময় আমাদের পিছনের বারান্দা শহর থেকে কিনে আনা পীচ, আংগুর, নাশপাতি আর আমাদের বাড়িতে জন্মানো পিঁয়াজ, আলু এবং শসার ঝুড়িতে ভরা থাকতো- সবগুলোই জ্যাম, জেলী, প্রিজার্ভস৯, আচার এবং ঝাল সস বানিয়ে সংরক্ষনের অপেক্ষায়। রান্নাঘরে সারাদিনই চুলা জ্বলতে থাকতো, ফুটন্ত পানিতে কাচের বৈয়াম ঠুং ঠ্যাং বাজতো, কখনো কখনো দুই চেয়ারের মাঝে একটা লাঠি থেকে চিজক্লোথের থলে ঝোলানো থাকতো যেটা দিয়ে নীলচে আংগুরের পাল্প ছাকা হতো, জেলি বানানোর জন্য। আমাকে কাজ দেয়া হতো- টেবিলের উপর বসে গরম পানিতে ডুবানো পীচের খোসা ছড়ানো অথবা পিঁয়াজ কাটা, তাতে আমার চোখ জ্বলতো এবং চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। আমার হাতের কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি দৌঁড়ে বাড়ীর বাইরে চলে যেতাম, আমার মা পরবর্তিতে আমাকে দিয়ে কী করাতে চাচ্ছেন তা শোনার দুরত্বের বাইরে চলে যেতাম। আমি গ্রীষ্মকালের গরম, অন্ধকার রান্নাঘর অপছন্দ করতাম- জানালার সবুজ খড়খড়ি এবং মাছিধরার ফাঁদ, টেবিলে সেই একই পুরনো অয়েলক্লথ, ঢেউ খেলানো আয়না এবং অসমতল লিনোলিয়ামের প্লাস্টার। আমার মা এতো বেশী ব্যাস্ত এবং ক্লান্ত থাকতেন যে আমার সাথে সাধারন স্কুল গ্রাজুয়েশন নাচের পার্টি সম্পর্কে কথা বলার মত তার কোন মনোবস্থা থাকত না; তার সারা মুখে ঘাম ঝরতো এবং সে সব সময়েই বৈয়ামের দিকে নির্দেশ করে চিনির কাপ খালি করতে করতে নিচু স্বরে গুনতে থাকতেন। সব কিছু দেখে আমার মনে হতো বাসা-বাড়ির কাজ কখনোই শেষ হবার নয়, একঘেয়ে এবং বিচ্ছিরিভাবে নিরানন্দ; ঘরের বাইরে যে সব কাজ করা হয় এবং আমার বাবার কাজ, প্রথাগত ভাবেই গুরুত্বপুর্ন।

আমি ট্যাঙ্কটা চাকার উপর দিয়ে গড়িয়ে নিয়ে গোলাবাড়ির সামনে রাখতাম এবং তখন আমার মায়ের কথা শুনতে পেতাম, “লেয়ার্ড আর একটু বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো, তারপর তুমি তার কাছ থেকে প্রকৃত সাহায্য পাবে”।

আমার বাবা কি বলতেন তা আমি শুনতে পাইনি। তবে তিনি যেভাবে দাঁড়িয়ে- যেন তিনি কোন শিয়ালের খাবার বিক্রেতাদের বা অপরিচিত মানুষের কথা বিনয়ের সাথে শুনছেন, আমার কথা শুনতেন, আমি তাতেই খুশী ছিলাম, কিন্তু তার চোখে মুখে আসল কাজ আদায়ের প্রত্যাশা থকতো। আমি চিন্তা করলাম আমার মা’র এখানে করার মত কোন কাজ নেই এবং চাচ্ছিলাম আমার বাবাও একইভাবে সেটা বুঝুক। চিন্তা করুক। তিনি লেয়ার্ডের সম্পর্কে কী কিছু বলতে চাইছেন? সে কারো কোন সাহায্যেই আসে না। সে এখন কোথায়? সে দোলনায় নিজে নিজে ঘুরে ঘুরে দোল খেতে খেতে অসুস্থ বোধ করছে, অথবা শুঁয়ো পোকা ধরছে।“সে কখনোই আমার কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরোটা সময় থাকে না। এবং তারপর আমি তাকে আরো বেশী বাড়ির কাজে লাগাতে পারবো”, আমার মাকে বলতে শুনলাম। মা’র আমার সম্পর্কে একটা নিরব খেঁদের কথা আমি শুনতাম যেটা আমাকে সব সময়েই অস্বস্তিতে ফেলতো। “আমি যেই পিছনে ঘাড় ঘুরিয়েছি আর অমনি সে দৌড়ে পালিয়েছে, আমার মনে হয় না যে আদৌ পরিবারে কোন মেয়ে আছে”।

আমি সরে গিয়ে গোলাবাড়ির কোনায় শেয়ালের খাবারের একটা বস্তার উপর বসতাম— যখন এই সব কথা চলতো তখন আর বের হতে চাইতাম না। আমার মনে হতো আমার মাকে বিশ্বাস করা যায় না। তিনি আমার বাবা’র চেয়ে নরম মনের ছিলেন কিন্তু তাকে সহজেই বোকা বানানো যেতো, কিন্তু তার উপরে নির্ভর করা যেতো না এবং এর আসল কারন, তিনি যা বলেন এবং করেন তা কেন বলেন বা করেন তা জানা যেতো না। তিনি আমাকে ভাল বাসতেন, এবং রাত জেগে আমার পছন্দের কঠিন ডিজাইনের জামা আমার স্কুল শুরুর দিনে পরার জন্য বানাতেন; আবার তিনি আমার শত্রুও ছিলেন। তিনি সব সময় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেন। তিনি এখন আমাকে আরো বেশী সময় বাড়ির থাকার জন্য ষড়যন্ত্র করছেন, যদিও তিনি জানতেন যে আমি তা অপছন্দ করি (করন তিনি জানতেন যে আমি তা অপছন্দ করি) এবং আমার বাবার কাজের সাহায্য করা থেকে দূরে রাখতে চাইছেন। আমার কাছে মনে হলো সে তিনি এখন সেটা শুধুমাত্র তার একগুয়েমী এবং তার ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা থেকে করছেন। আমার এটা মনে হতো না যে তিনি একাকীত্বে ভুগছেন কিম্বা ইর্ষান্বিত। উঠতি বয়সের কারো এমন হয় না; তারা ভাগ্যবান। আমি বসে একটা খাবাবের বস্তার উপর পায়ের গোড়ালি দিয়ে বিরক্তিকর ভাবে লাথি মারছিলাম, এতে ধুলা উড়ছিল-সে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি বের হয়ে আসিনি।

যাই হোক না কেন, আমি আশা করতাম না যে, তিনি যা বলেন আমার বাবা তার কোন গুরুত্ব দেন। কে ভাবতে পারে, লেয়ার্ড আমার কাজ করতে পারবে— লেয়ার্ড তালা বন্ধ করা এবং একটি লাঠির মাথায় পাতা দিয়ে পানপাত্র পরিস্কার করার কথা মনে রাখতে পারবে, অথবা এমন কি ছলকে না ফেলে দিয়ে চাকার উপর দিয়ে পানির ট্যাংক গড়িয়ে আনতে পারবে? এতে বোঝা যায় আসলে আমার মা কাজ কি ভাবে করতে হয় তা কত কম জানেন।

আমি বলতে ভুলে গেছিলাম যে শিয়ালদের খাওয়ানো হতো। আমার বাবার রক্তমাখা এপ্রন আমাকে এটা মনে করিয়ে দিয়েছে। তাদেরকে ঘোড়ার মাংশ খাওয়ানো হতো। সেই সময়ে, তখনও অধিকাংশ কৃষক ঘোড়া রাখতো এবং যখন কোন ঘোড়া খুব বুড়ো হয়ে আর কাজ না করতে পারতো অথবা পা ভেংগে যেতো, বা নীচে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারতো না, যা ঘোড়ারা কখনো কখনো করে থাকে, তখন ঘোড়ার মালিক আমার বাবাকে ডাকতো, এবং তখন তিনি আর হেনরী ট্রাক নিয়ে সেই ফার্মে যেতেন। সাধারনত, তারা সেখানেই গুলি করতো এবং কেটে কুটে মাংস বানাতো এবং কৃষকে পাঁচ থেকে বারো ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করতো। যদি আগে থেকেই তাদের কাছে বেশী মাংস মজুদ থাকতো তাহলে তারা ঘোড়াটাকে জীবন্ত নিয়ে এসে আমাদের আস্তাবলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত রাখতো যতদিন পর্যন্ত না মাংসের প্রয়োজন পড়ে। যুদ্ধের পর কৃষকরা ট্রাক্টর কিনছিলো এবং ধীরে ধীরে ঘোড়ার ব্যাবহার কমে যাচ্ছিলো যে এক সময় আর তাদের কোন ব্যাবহার ছিল না। এটা যদি শীতে হতো তাহলে আমরা ঘোড়াটাকে আমাদের আস্তাবলে বসন্তকাল পর্যন্ত রাখতাম এ কারনে আমাদের প্রচুর খড় থাকতো এবং যদি বেশী তুষারপাত হতো- এবং লাংগল দিয়ে যদি আমাদের রাস্তা ঠিকমত পরিস্কার করা না যেতো- সেই ক্ষেত্রে ঘোড়া এবং একটা কাটার১০ বা ঘোড়া টানা স্লেজ নিয়ে শহরে যাওয়া সুবিধা জনক ছিল।

যে শীতে আমার বয়স এগারো হলো সে বছর আমাদের আস্তাবলে দুইটা ঘোড়া ছিল। আগে তাদের কী নাম ছিল আমরা তা জানতাম না সুতরাং আমরা তাদের ম্যাক এবং ফ্লোরা নামে ডাকতাম। ম্যাক ছিল বুড়ো- কালো, শ্রমিকাশ্ব১১, মলিন এবং নিরীহ। ফ্লোরা হলো পিংগল বর্নের ঘোটকী এবং সরদার ধরনের। আমারা দুটোকেই স্লেজেr জন্য বাইরে নিতাম। ম্যাক ছিল ধীর প্রকৃতির এবং সহজেই তাকে নিয়ন্ত্রন করা যেতো। রাস্তায় ফ্লোরার গতি পরিবর্তনের সময় গাড়ি এমনকি অন্য ঘোড়াকেও সাবধান করার জন্য তাকে ভায়লেন্ট এলার্ম দেয়া হয়েছিল কিন্তু আমরা তার দ্রুতগতি এবং উচ্চপদক্ষেপ এবং সাধারন ভাবে তার সাহস এবং বন্ধনহীন উচ্ছ্বাসের জন্য পছন্দ করতাম। শনিবারে আমরা নীচে আস্তাবলে যেতাম, আরামদায়ক এবং পশুগন্ধি অন্ধকার আস্তাবলের দরজা খুলতে না খুলতেই ফ্লোরা তার মাথা বের করে দিতো, চোখ ঘুরাতো, হতাশ ভাবে মৃদু হ্রেস্বাধ্বনি করতো এবং টানাটানি করে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টায় সেখানে একটা স্নায়ু সংকটের সৃষ্টি করতো। তার অশ্বশালায় যাওয়া নিরাপদ ছিল না, সে লাথি মারতে পারতো।

এ শীতেও সেই একই বিষয়ে আমি অনেক বেশী পরিমানে শুনতে শুরু করি- আমার মায়ের চিন্তাধারা, তিনি যখন গোলাবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমি এখন আর নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। মনে হচ্ছিল যে, এই একটা বিষয়ের উপর আমার চারিদিকের মানুষের চিন্তার অবিচলিত আন্তঃপ্রবাহে এক ধরনের মিল আছে, এবং তা অপরিবর্তনীয়। আগে আমার কাছে বালিকা শব্দটিও শিশু শব্দটির মত নিষ্পাপ এবং ভাড়মুক্ত মনে হতো; এখন এটা প্রতিয়মান যে সেটা এরকম কিছু নয়। ‘বালিকা’ তেমন নয়, যেমন আমি চিন্তা করেছিলাম, এবং যেমন আমি ছিলাম; এটা সে রকম যে রকম আমাকে ভবিষ্যতে হতেই হবে। এটা হলো একটা সংগা, যার মধ্যে সব সময়েই একটা জবরদস্তির বিষয় থাকে- এবং সাথে ভর্তসনা, গঞ্জনা, তিরস্কার এবং হতাশার তো থাকেই। এটা আমার কাছে একটা তামাশার মত ছিল। একদিন লেয়ার্ড এবং আমি মারামারি করছিলাম, এবং এবারই প্রথমবারের মত তার বিরুদ্ধে আমার সব শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছিল; তথাপি সে আমাকে ধরে ফেলে এবং এক মুহূর্তের মধ্যে আমার বাহুতে পিন ফুটিয়ে দিয়েছিল, আসলেই খুব ব্যাথা পেয়েছিলাম। হেনরী সেটা দেখে হেসেছিল এবং বললেছিলো, “ওহ! লেয়ার্ড তোমাকে কয় দিনের মধ্যেই দেখিয়ে দেবে”। লেয়ার্ড বেশ তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছিল। আমিও বড় হচ্ছিলাম।

আমার নানী আমাদের সাথে কয়েক সপ্তাহ থাকার জন্য এলেন এবং আমি অন্য বিষয়ে শুনলাম।

“মেয়েদের ওরকম দড়াম করে দরজা বন্ধ করতে হয় না”।

“মেয়েদের হাটু গুছিয়ে এক সাথে নিয়ে বসতে হয়”।

এবং সব চেয়ে বাজে ব্যাপার হতো যখন আমি তাকে কোন প্রশ্ন করতাম। তিনি বলতেন “এটা মেয়েদের বোঝার বিষয় নয়”। আমি দড়াম করে শব্দ করে দরজা বন্ধ করা অব্যাহত রাখলাম এবং যতটা সম্ভব বিশ্রী ভাবে বসার চেষ্টা করতাম- এটা ভেবে যে এভাবে করে আমি আমাকে মুক্ত রাখতে পারবো।

বসন্ত এলে ঘোড়াগুলোকে গোলাবাড়ির আংগিনায় যেতে দেয়া হতো। ম্যাক গোলাবাড়ির দেয়ালের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গলা এবং নিতম্ব চুলকানর চেস্টা করতো, কিন্তু ফ্লোরা দুলকি চালে উপর-নীচ করতো এবং পিছনে বেড়ার দিকে যেতো, বেড়ার গোড়ার লোহার পাতের সাথে ক্ষুর দিয়ে ঠকঠক শব্দ করতো। বরফের স্তর দ্রুত কমে গিয়ে শক্ত ধুসর এবং বাদামী মাটি বেরিয়ে পরতো, শীতের চমৎকার ভুদৃশ্যের পরে ভুমির পরিচিত এই উত্থান এবং পতন সমতল এবং বিরান দেখা যেতো। শীতের পর মুক্তির শুরুর একটা বিশেষ অনুভুতি ছিল। এখন আমরা জুতোর উপর শুধুমাত্র একটা পাতলা রাবার পরতাম, আমদের পা অসম্ভব ভাবে হালকা লাগতো। এক শনিবারে আমরা আস্তাবলে গিয়ে দেখলাম সব দরজা খোলা, অনভ্যস্ত সুর্যালোক এবং মুক্ত বাতাস চলাচলের জন্য। হেনরী সেখানে ছিল, অলস ভাবে তার ক্যালেন্ডারের সংগ্রহ দেখছিল সেগুলো আস্তাবলের এক অংশের অশ্ব শালার পিছনে লাগানো ছিল সম্ভবত আমার মা তা কখনোই দেখেন নি।

“আসো, তোমার পুরনো বন্ধু ম্যাককে বিদায় বলো,” হেনরী বলল। “এখানে তোমরা তাকে যব খাওয়াতে পারো”। সে লেয়ার্ডের হাতের কাপে কিছু যব দিল এবং লেয়ার্ড ম্যাককে খাওয়াতে গেল। ম্যাকের দাঁতগুলো আকাবাকা এবং খুব খারাপ ছিল। সে ধীরে ধীরে ধৈর্য্যসহ তার মুখের যবগুলো নাড়াচাড়া করে চিবানোর জন্য একটা মাড়ির দাঁতের গোড়া খুঁজছিল। “দুর্ভাগা বুড়ো ম্যাক” হেনরী শোকার্তভাবে বলল। “যখন একটা ঘোড়ার দাঁত চলে যায় মানে সেও শেষ হয়ে যায়। এটা স্বাভাবিক নিয়ম”।

“তোমরা কি তাকে আজকে গুলি করতে চাইছো”? আমি বললাম। ম্যাক এবং ফ্লোরা এত বেশীদিন ধরে আমাদের আস্তাবলে আছে যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম তাদের গুলি করে হত্যা করার কথা। হেনরী আমাকে কোন উত্তর দেয়নি তার পরিবর্তে সে উচ্চ স্বরে কাঁপা-কাঁপা বিদ্রুপত্বাক দুঃখভরা গলায় গান গাইতে শুরু করলো। “হায় সেখানে আর কোন কাজ নেই হতভাগা আংকেল নেডের জন্য, তিনি সেখানে যাচ্ছেন যেখানে সব অন্ধকার যায়”।

ম্যাকের পুরু কালচে জিহ্বা সযত্নে লেয়ার্ডের হাত থেকে খেয়ে যাচ্ছিল। গান শেষ হওয়ার আগেই আমি চলে গিয়ে সরু রাস্তার উপর বসে পড়লাম।

আমি কখনোই তাদেরকে ঘোড়াকে গুলি করে মারতে দেখিনি কিন্তু আমি জানতাম কোথায় এ কাজগুলো করা হতো। গেল গ্রীষ্মকালে আমি এবং লেয়ার্ড অপ্রত্যাশিত ভাবে ঘোড়ার নাড়িভুরি দেখে ফেলেছিলাম- সেগুলো মাটি চাপা দেয়ার আগেই। আমারা ভেবেছিলাম যে একটা বড় কালচে সাপ সুর্যের আলোতে পেঁচিয়ে আছে। জায়গাটা ছিল গোলাবাড়ির পাশের মাঠ। আমি চিন্তা করেছিলাম যে যদি আমরা গোলাবাড়ির ভিতরে যেতে পাড়তাম এবং দেখার জন্য একটা বড়-প্রসস্ত ফাটল অথবা গিট-গর্ত১২ পেতাম, তাহলে আমরা তাদেরকে সে কাজগুলো করতে দেখতে পেতাম। এটা এমন কিছু না যে আমি দেখতে চাইতাম, এটা ঠিক সেই রকম, যদি আসলে কিছু ঘটেই তা হলে তা দেখা এবং জানাটা ভালো।

আমার বাবা বাড়ি থেকে একটা বন্দুক নিয়ে বেড়িয়ে এলেন।

“তুমি এখানে কি করছো”? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

“কিছুই না”।

“উপরে যাও এবং বাড়িতে ভিতরে খেলা করো”।

তিনি লেয়ার্ডকে আস্তাবলের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। আমি লেয়ার্ডকে বললাম, “তারা কি ভাবে মার্ককে গুলি করবে কি তুমি দেখতে চাও”? এবং তার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই আমি তাকে গোলাবাড়ির সামনের দরজার দিকে নিয়ে গেলাম, সেটা সতর্কতার সাথে খুললাম এবং ভিতরে গেলাম। “চুপ করে থাকবে না হলে তারা আমাদের কথা শুনে ফেলবে", আমি তাকে বললাম। আমরা আস্তাবলের মধ্যে আমার বাবা এবং হেনরীর কথা শুনতে পেলাম; তারপর ম্যাককে তার অশ্বশালা থেকে বের করার ভারী ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পেলাম।

মাচাটা ছিল ঠান্ড এবং অন্ধকারময়, ফাটল দিয়ে সূর্য-রশ্মি আঁকাবাঁকা এবং সুক্ষ্ম ভাবে বিচ্ছুরিত হয়ে ভিতরে এসে পড়েছে। নীচু খড়ের গাদা। আমাদের পায়ের নীচের পৃথিবী এবড়ো থেবড়ো, উঁচুনিচু, ঘুর্নায়মান এবং পিচ্ছিল- আমাদের পা পিছলে যাচ্ছিলো। প্রায় চার ফুট উপর দিয়ে দেয়ালের চারিদিকে একটা কড়িকাঠ গেছে। আমরা খড় জড়ো করে একটা শক্ত স্তুপ বানালাম এবং আমি লেয়ার্ডকে উপরে তুলে দিলাম এবং আমি নিজেও উঠলাম। কড়িকাঠটা খুব প্রশস্ত ছিল না। আমরা গোলাঘরের দেয়ালে হাত ঠেস দিয়ে সেটা বরাবর ধীরে ধীরে আগালাম। সেখানে অনেক গিট-গর্ত ছিল, এবং আমি এমন একটা ফুটো খুঁজে পেলাম যেটা দিয়ে আমি যেটা দেখতে চাচ্ছিলাম তা দেখতে পেলাম- গোলাবাড়ির উঠোনের একটা কোনা, ফটক এবং মাঠের কিছুটা অংশ। লেয়ার্ডের দেখার জন্য কোন গিট-গর্ত ছিলনা এবং সে এ নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করা শুরু করলো।

আমি তাকে দুইটা বোর্ডের মাঝখানে একটা চওড়া ফাটল দেখিয়ে দিলাম, “চুপ থাকো এবং অপেক্ষা করো। তারা যদি তোমার শব্দ শুনতে পায় তাহলে আমারা দুজনেই ঝামেলায় পড়বো”।

আমার বাবাকে তার বন্দুক নিয়ে দেখা গেল। হেনরী ম্যাকের গলার দড়ি ধরে নিয়ে আসছিলো। সে তা ছেড়ে দিয়ে তার সিগারেটের কাগজ এবং তামাক বের করলো; আমার বাবা এবং তার জন্য সিগারেট বানালো। যখন এ করা সব হচ্ছিল তখন ম্যাক বেড়ার পুরনো-শুকনো মরা ঘাসে গন্ধ শুঁকছিল। তারপর আমার বাবা ফটক খুলল এবং তারা ম্যাককে বাইরে নিয়ে গেল। হেনরী ম্যাককে রাস্তা থেকে সরিয়ে মাঠে নিয়ে গেল এবং তারা নিজেদের মধ্যে খুব নীচু স্বরে কথা বলছিলো যে আমরা তা শুনতে পেলাম না। ম্যাক আবারো এক গ্রাস কাঁচা ঘাস খুঁজতে শুরু করলো কিন্তু পাওয়া গেল না। আমার বাবা একটা সোজা লাইন বরাবর হেটে একটু দূরে তার জন্য প্রয়োজনীয় দুরত্বে থামলেন। হেনরীও ম্যাকের কাছ থেকে দূরে সরে গেল তবে পাশের দিকে তারপরও হাল্কা ভাবে ম্যাকের গলার দড়িটা ধরে ছিল। আমার বাবা বন্দুকটা তুললেন এবং ম্যাক সে দিকে তাকালো যেন সে কিছু একটা লক্ষ্য করছে এবং বাবা তাকে গুলি করলেন। ম্যাক সাথে সাথেই ঢলে পড়লো না কিন্তু আন্দোলিত হলো, পাশে কাৎ হলো এবং পড়ে গেল, প্রথমে তার পাশে এবং পরে তার পিঠের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়লো, এবং বিস্ময়করভাবে কয়েক মুহুর্তের জন্য সে তার পা দিয়ে বাতাসে লাথি মারলো। এটা দেখে হেনরী হাসলো যেন ম্যাক তার সাথে কোন চাতুরী করেছে। লেয়ার্ড যে গুলি করার দেখে বিস্ময়ে একটা গভীর গোঙ্গানির মত দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করলো, “সে মরে নি”। এবং আমার কাছে মনে হলো হয়ত সেটাই সত্যি। কিন্তু তার পা থেমে গেল এবং সে আবারো তার এক পাশে গড়িয়ে পড়লো এবং তার মাংশপেশী কেঁপে কেঁপে থেমে গেল। পুরুষ দুজন তার দিকে হেঁটে গেল এবং ব্যাবসায়িক দৃষ্টিকোন থেকে তাকে দেখলো, তারা নুয়ে তার কপালের যেখানে গুল বিদ্ধ হয়েছিলো তা পরোখ করে দেখল, এই বার আমি বাদামী ঘাসের উপর তার রক্ত দেখলাম।

“এখন তার চামরা ছাড়াবে এবং তার পর কেটে টুকরা করবে” আমি বললাম। “ চলো যাই” আমরা পা একটু একটু কাঁপছিল এবং আমি কৃতজ্ঞচিত্তে খড়ের উপর লাফ দিলাম। “এখন তুমি দেখলে তো তারা কিভাবে একটা ঘোড়াকে গুলি করে হত্যা করে” আমি তাকে অভিনন্দন করার মত করে বললাম, যেন আমি তা আগে অনেকবার দেখেছি। “চলো দেখি গিয়ে গোলাবাড়ির কোন বিড়ালের ছানা খড়ের মধ্যে আছে কিনা”। লেয়ার্ডা লাফ দিয়ে নামলো। তাকে আমার আবার শিশু এবং বাধ্যগত মনে হলো। হঠাৎ আমার মনে পড়লো যখন সে খুব ছোট ছিল তখন কি ভাবে আমি তাকে একবার গোলাবাড়িতে এনেছিলাম এবং মঈ বেয়ে তাকে কড়িকাঠের উপর উঠতে বলেছিলাম। সে সময়টাও ছিল বসন্ত কাল। আমি কিছুটা আনন্দের প্রয়োজনে কাজটা করেছিলাম, এমন একটা কিছু ঘটার ইচ্ছে থেকে, যেটা সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারি। সে একটা ছোট্ট ভারী বাদামী এবং সাদা চেকের কোট পরেছিল যেটা আমার একটা কোট থেকে ছোট করে বানানো। আমি তাকে যেমন বলেছিলাম তেমন ভাবেই সে পুরোটা বেয়ে উঠলো এবং এমন একটা কড়িকাঠের উপর বসলো যেটার একপাশে থেকে খড়ের গাদা অনেক নীচে ছিল এবং অন্যপাশে পাশে ভান্ডারের মেঝে এবং তার উপর কিছু পুরনো যন্ত্র পাতি রাখা ছিল। তারপর আমি চিৎকার করতে করতে দৌড়ে গিয়ে আমার বাবাকে বললাম, “লেয়ার্ড সবচেয়ে উচু কড়িকাঠের উপর উঠেছে”। আমার বাবা এলেন, আমার মা এলেন, আমার বাবা মঈয়ের একেবারে উপরে উঠে লেয়ার্ডের কাছে গিয়ে খুব ধীরে ধীরে কথা বললেন এবং কোলে করে তাকে নামিয়ে আনলেন এবং সে সময় আমার মা সেই মঈয়ে হেলান দিয়ে কান্না শুরু করলেন। তারা আমাকে বললো “তুমি কেন তাকে দেখে রাখোনি”? কিন্তু কেউ কখনোই সত্যটা জানলো না। লেয়ার্ড তখন অতো কথা বলতে পারতো না। কিন্তু আমি যখনই বাদামী সাদা চেকের কোটটা ক্লোজেটে ঝুলানো দেখতাম অথবা পুরনো কাপড়ের ব্যাগের একেবারে নীচের দিকে- যেটাই ছিল ওটা শেষ গন্তব্য, তখন অদূরীভূত অপরাধের বিষন্নতায় আমার পেটের ভিতর একটা চাপ অনুভব করতাম।

আমি লেয়ার্ডের দিকে তাকালাম, এমন কি তার এ সব কিছু মনেই নেই, আমি নিজেও এ জিনিস মনে করতে চাই না, শীতের প্রকোপে ফ্যাকাশে মুখ। তার অভিব্যাক্তিতে ভয় বা বিপর্যয় ছিল না তবে তার দৃষ্টি দূরে কোথাও ঘনীভুত ছিল।

“শোনো”, আমি অস্বাভাবিক প্রফুল্লতা এবং বন্ধুত্বপুর্ন গলায় বললাম, “তুমি তো কাউকে এটা বলতে যাচ্ছো না, তাই না?”

সে অন্যমনস্কভাবে বললো, “না”।

“কিড়া”

“কিড়া”, সে বললো। সে পিছনে হাত নিয়ে আঙ্গুলে ক্রস১৩ করছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার পিছনের হাত খপ করে ধরলাম। এমনকি এর পরেও সে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে; এবং এ ভাবেই কথাটা বের হয়ে যেতে পারে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, সে যা দেখেছে তা তার মন থেকে মুছে ফেলার জন্য আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে- আমার মনে হয়েছিল যে সে একই সময় অনেক কিছু মনে রাখতে পারে না। আমি কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলাম তা দিয়ে সে দিন বিকেলে আমরা জুবিলীতে গিয়ে একটা প্রদর্শনী দেখলাম, সেটাতে জুডি ক্যানোভা১৪ ছিল, আমরা অনেক হাসলাম এবং তারপর আমি ভাবলাম, সব ঠিক আছে।

দুই সপ্তাহ পরে আমরা জানলাম তারা ফ্লোরাকেও গুলি করে হত্যা করবে। আমি আগের রাতে জেনেছিলাম-যখন আমার মা আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত খড় আছে কিনা। আমার বাবা বললেন, “হুম, আগামী কালের পর থেকে ওখানে গাভী থাকবে এবং আমরা তাকে আরো এক সপ্তাহ পর ঘাস খাওয়াতে পারবো”। সুতরাং আমি জেনেছিলাম যে সকালে ফ্লোরার পালা।

এবার আমি দেখার কথা ভাবলাম না। এটা এমন কিছু যা শুধু একবারই দেখা যায়। আমি তখন থেকেই এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতাম না, কিন্তু কোন কোন সময় যখন আমি ব্যাস্ত থাকতাম, স্কুলে থাকতাম অথবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়ানোর সময় যখন ভাবতাম যে বড় হলে আমি সুন্দরী হতে পারি তখন পুরো দৃশ্যটাই আমার চোখে ভাসতোঃ আমি দেখতে পেতাম আমার বাবার সহজ এবং পাকা হাতের বন্দুকের তাক, এবং ম্যাকের শুন্যের মধ্যে পা ছোড়া- এবং তা দেখে হেনরীর হাসি শুনতে পেতাম। আমার খুব বেশী ধরনের ভয় বা তার বিপরীত অনুভুতি ছিল না যেটা সাধারনত শহরে বড় হওয়া বাচ্চাদের মধ্যে থাকে; আমি প্রয়োজনে প্রানীদের মৃত্যু দেখে খুব বেশী অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু তারপরও আমরা একটু লজ্জা লাগতো এবং সেখানে একটা নতুন সচেতনতা- আমার মনোভাব, আমার বাবার কাজ এবং তার ধারনার প্রতি বাঁধা দান করা।

দিনটা খুব সুন্দর ছিল এবং আমরা আমাদের উঠোনে শীত-ঝড়ে ভেংগে পড়া গাছের ডাল-পালা কুড়াচ্ছিলাম। এটা আমাদের করতে বলা হয়েছিলো এবং আমরা নিজেরাও করতে চেয়েছিলাম কারন আমরা সেগুলো টীপীতে১৫ ব্যাবহার করতে পারবো। আমরা ফ্লোরার মৃদু হ্রেস্বা ধ্বনি, আমার বাবার কন্ঠস্বর এবং হেনরীর চিৎকার শুনতে পেলাম এবং কী হচ্ছে তা দেখার জন্য আমরা দৌড়ে গোলাবাড়ির উঠানে গেলাম।

আস্তাবলের দরজা খোলা ছিল। হেনরী মাত্র ফ্লোরাকে বের করে এনেছে এবং ফ্লোরা তার কাছ থেকে পালিয়েছে। সে গোলাবাড়ির উঠোনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ে ছোটাছুটি করছে। আমরা বেয়ে বেড়ার উপরে উঠলাম। সে দৌড়াচ্ছে, মৃদু হ্রেস্বা ধ্বনি করছে, পিছনের পায়ে ভর করে উপড়ে উঠছে, পশ্চিমা সিনেমার ঘোড়ার মত পিছনে পা তুলে লাফাচ্ছে এবং আস্ফলন করছে, একটা বড় খামারের মুক্ত ঘোড়ার মতো, যদিও সে ছিল শুধুমাত্র একটা পুরনো শ্রমিকাশ্ব-একটা পিংগল বর্নের ঘোটকী। এ সব কসরৎ ছিল রোমাঞ্চকর। আমার বাবা এবং হেনরী তার পিছু পিছু দৌড়ে তার গলার ঝুলন্ত দড়ি ধরার চেষ্টা করছিলো। তারা এক কোনায় এ কাজটা করার চেষ্টা করছিলো, এবং তারা প্রায় যখন সফল হচ্ছিল ঠিক তখনই সে তাদের দুজনের মাঝখান থেকে দৌড় দিয়েছিল, উন্মত্ত এবং গোলাবাড়ির কোনা ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। বেড়া পার হয়ে যাওয়ার সময় আমরা রেলিংয়ের ঝন ঝন শব্দ এবং হেনরীর চিৎকার “সে এখন মাঠে” শুনতে পেলাম।

অর্থাৎ সে এখন বাড়ীর পাশের লম্বা ‘এল’ আকারের মাঠে। যদি সে মাঠের মাঝখানে চলে যায়, গলির দিকে অগ্রসর হয়, ফটক খোলা ছিল; আজ সকালে ট্রাকটাকে মাঠে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার বাবা আমার দিকে চিৎকার করলেন কারন আমি বেড়ার অন্য পাশে গলির কাছাকাছি ছিলাম “যাও এবং দরজা বন্ধো করো!”

আমি খুব দ্রুত দৌড় দিয়েছিলাম। বাগানের মধ্য দিয়ে গাছ পালা পেড়িয়ে যেখানে আমাদের দোলনা ঝুলানো ছিল এবং গলির উপরের খানা-খন্দ লাফ দিয়ে পেরিয়ে গেলাম। খোলা দরজাটা সেখানে ছিল। সে বের হয়নি, আমি তাকে রাস্তার উপরে দেখিনি। সে অবশ্যই দৌড়ে অন্য প্রান্তে গিয়েছিলো। দরজাটা বন্ধ করার ধাতব টুকরাটা খুব ভারী ছিল। আমি নুড়ি পাথরের ভিতর থেকে সেটা তুলে রাস্তায় বরাবর যেতে থাকলাম। আমি রাস্তার মাঝ বরাবর এলে সে দৃষ্টি গোচরীভুত হল। ব্লগাহীন ভাবে সোজা আমার দিকে আসছিলো। ফটকের চেইন তখনই বন্ধ করার ঠিক সময় ছিল। লেয়ার্ড আমাকে সাহায্য করার জন্য খানা খন্দ হামাগুড়ি দিয়ে আসছিলো।

দরজা বন্ধ করার পরিবর্তে আমি যতদুর সম্ভব প্রশস্ত করে খুলে রাখলাম। আমি এটা করার ব্যাপারে আগে কোন সিদ্ধান্ত নেই নি, এটা ছিল সেটা যেটা আমি ঠিক তখনই করেছিলাম। ফ্লোরা কখনোই তার গতি কমায়নি। সে ব্লগাহীন ভাবে দৌড়ে আমাকে পার করে চলে গেল এবং লেয়ার্ড উপর নীচ লাফাতে লাফাতে চিৎকার করে বললো, “বন্ধ করো, ওটা বন্ধ করো”! যদিও তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিলো। আমি যেটা করেছি তা দেখতে পাওয়ার এক মিনিট পরেই আমার বাবা এবং হেনরীকে মাঠে দেখা গেল। তারা শুধুমাত্র দেখলো যে ফ্লোরা শহরের রাস্তার দিকে যাচ্ছে। তারা সম্ভবত ভেবেছিল যে আমি সেখানে দেরীতে পৌঁছেছি।

তারা এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করে একটা মুহুর্তও নষ্ট করলো না। তারা গোলাবাড়িতে ফিরে গিয়ে তারা যে বন্দুক এবং চাকু ব্যাবহার করে তা নিল এবং সেগুলো ট্রাকে তুললো; তারপর তারা ট্রাকটা ঘুরিয়ে মাঠে আমাদের দিকে এলো। লেয়ার্ড তাদেরকে বললো, “আমাকেও নিয়ে চলো, আমাকেও নিয়ে চলো”! হেনরী থামিয়ে তাকে তুলে নিলো। তারা সবাই চলে গেলে আমি ফটক বন্ধ করে দিলাম।

আমি ধরে নিয়েছিলাম যে, লেয়ার্ড বলে দিতে পারে। আমি ভাবছিলাম আমার কী হয়েছিলো! আমি তো কখনো এর আগে আমার বাবা অবাধ্য হইনি, বুঝতে পারছিলাম না কেন এবার হলাম! ফ্লোরা আসলে পালিয়ে যেতে পারবে না। তারা তাকে ধরে ট্রাকে তুলবে। যদি তারা তাকে আজ সকালে নাও ধরতে পারে তাহলে কেউ না কেউ তাকে দেখবে এবং বিকালে বা আগামিকাল সকালে ফোন করবে। সেখানে তার জন্য কোন বন্য চারনভুমি নেই। শেয়ালের খাবারের জন্য আমাদের মাংস দরকার এবং আমাদের জীবন ধারনের জন্য শেয়াল দরকার। আমি যা কিছু করেছি তা শুধু আমার বাবার কাজকে আরো বাড়িয়েই দিয়েছি মাত্র যিনি ইতিমধ্যে যথেষ্ট কঠিন পরিশ্রম করেছেন। এবং যখন আমার বাবা এ ব্যাপারটা জানতে পারবেন তিনি আমাকে আর বিশ্বাস করবেন না। তিনি জানবেন যে আমি সম্পুর্নভাবে তার পক্ষে নই। আমি ফ্লোরার পক্ষে এবং তা আমাদের কারো জন্যই কোন উপকারই করতে পারলো না এমন কি ফ্লোরার জন্যও নয়। ঠিক একই ভাবে আমিও অনুশোচনা করিনি; যখন সে দৌড়ে আমার দিকে আসছিলো তখন আমি দরজা খুলে ধরেছিলাম এবং সেটাই একমাত্র কাজ যেটা তখন আমার পক্ষে করা সম্ভব ছিল।

আমি ঘরে ফিরে গেলাম। আমার মা জিজ্ঞেস করলেন, “ওখানে এতো কিছু কি হলো”? আমি বললাম যে ফ্লোরা বেড়ায় লাত্থি দিয়ে পালিয়ে গেছে। “আহারে তোমার বাবা” তিনি বললেন, “তাকে এখন গ্রামের ভিতর তার পিছে পিছে ছুটতে হবে”। “আচ্ছা, তা হলে তো তাদের বেলা একটার আগে লাঞ্চের কোন পরিকল্পা নেই” তিনি ইস্ত্রী করার টেবিল খুলে খুলতে বললেন। আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম যে, ভালোটার জন্যই চিন্তা করুন এবং আমার সাথে উপর তলায় গিয়ে আমার বিছানায় কিছুক্ষন বসুন।

ইদানিং আমি কক্ষের আমার অংশটুকু বর্নাঢ্য করে সাজানো চেষ্টা করছি। বিছানায় পুরনো লেইসের পর্দা বিছিয়েছি, এবং আমি নিজেই ছাপা স্কার্টের বেচে যাওয়া কাপড় দিয়ে ড্রেসিং টেবিল ঢেকে দিয়েছি। আমার এবং লেয়ার্ডের বিছানার মাঝখানে বিশেষ ধরনের একটা ব্যারিকেড দিয়ে আমার অংশকে আলাদা করার পরিকল্পনাও করেছি। সূর্যালোকে সেই লেইসের পর্দাকে ধুলামলিন নেকড়া মনে হতো। আমরা রাতে আর গান করতাম না। এক রাতে যখন আমি গান করছিলাম লেয়ার্ড বললো, “তোমাকে বোকা মনে হচ্ছে”, আমি গাল অব্যাহত রাখলাম কিন্তু পরে রাতে আর শুরুই করিনি। যাই হোক, তার আর প্রয়োজনও পড়তো না কারন আমরা আর ভয়ই পেতাম না। আমরা জানতাম যে সেখানে কিছু পুরনো আসবাবপত্র, পুরনো পাঁচমিশালি জিনিস এলোমেলো ভাবে রাখা আছে। আমরা সেই নিয়মটা আর রাখিনি। এখনো লেয়ার্ড ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি জেগে থাকি এবং নিজে নিজে গল্প বলি, এবং এমনকি সেই সমস্ত গল্পের মধ্যে ভিন্ন কিছু- কিছু রহস্যময় পরিবর্তনও ঘটতো। হয়ত গল্পটা আগের মতোই শুরু হতো কিন্তু একটা পুর্ব-নির্ধারিত বিপদ- আগুন অথবা বন্য প্রানী এবং কিছু দিনের জন্য আমি মানুষদের উদ্ধার করতাম; তারপর বিষয়গুলো পরিবর্তন ঘটতো এবং তার পরিবর্তে কেউ আমাকে উদ্ধার করতো। উদ্ধারকারী স্কুলের আমাদের ক্লাসের কোন ছেলে হতো অথবা এমনকি আমাদের শিক্ষক মিষ্টার ক্যাম্পবেলও হতে পারতেন, যিনি মেয়েদের বগলে কাতুকুতু দিতেন। এবং এই সময়ে এসে গল্পের দৈর্ঘ পরিবর্তন হতো- আমাকে দেখতে কেমন লাগবে, আমার চুল কতো বড় থাকবে এবং কি ধরনের ড্রেস আমি পরে থাকবো; এই সময়ের মধ্যে আমি যখন এই সব জিনিস নিয়ে উত্তেজিত থাকতাম ততক্ষনে গল্পের বাস্তবতা হারিয়ে যেতো।

বেলা একটারও পরে ট্রাকটা ফিরে এলো। পিছনটা তেরপল দিয়ে ঢাকা, তার মানে সেটার ভিতর মাংস আছে। আমার মাকে আবার সব খাবার গরম করতে হবে। হেনরী এবং আমার বাবা তাদের রক্তমাখা ওভাঅরল গোলাবাড়িতে পরিবর্তন করে একটা সাধারন কাজের উপযোগী ওভারঅল পরেছে, এবং তারা তাদের হাত, গলা এবং মুখমন্ডল সিঙ্কে ধুয়েছে, এবং তাদের চুলে জলের ছিটা দিয়ে চুল আচড়ে নিয়েছে। একটা রক্তের দাগ দেখানোর জন্য লেয়ার্ড হাত তুললো, “আমরা গুলি করে বুড়ো ফ্লোরাকে মেরে ফেলেছি এবং কেটে পঞ্চাশ টুকরো করেছি”।

“বেশ” আমার মা বললো, “আমি এ সব শুনতে চাই না”। “এবং এ ভাবে খাবার টেবিলে দেখতেও চাই না”। আমার বাবাকে দিয়ে তার গায়ের রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলানো হলো। আমরা বসে ছিলাম এবং আমার বাবা বললেন, গ্রেস এবং হেনরী তার চিউয়িং গাম তার কাটা চামচের মাথায় লাগিয়েছে, সাধারনত তিনি যে ভাবে করে থাকেন; যখন তিনি সেটা তুললেন তখন সেটার নকশার জন্য তার আমাদের প্রশংসা করা উচিৎ ছিল। আমরা ভাপে রান্না বেশী সিদ্ধ সব্জির বাটি একজনের কাছে থেকে আর একজনের কাছে পাস করছিলাম। লেয়ার্ড টেবিলের অন্য প্রান্তে আমাকে ইংগিতে দেখালো এবং গর্বভরে স্পষ্ট গলায় বললো, “যা-ই হোক, এটা ছিল তারই দোষ, ফ্লোরার পালানোতে”।

“কী”? আমার বাবা বললেন।

“সে ফটক বন্ধ করতে পারতো, সে তা করেনি। সে সেটা খুলে রেখেছিল এবং ফ্লোরা দৌড়ে গেল”।

টেবিলের সবাই আমার দিকে তাকালো। আমি মাথা নাড়লাম এবং অনেক কষ্টে মুখের খাবার গিললাম। লজ্জায় আমার চোখেঢ় পানির বন্য বইলো। আমার বাবা বিরক্তিকর একটা শব্দ করলেন, “তুমি ওটা কেন করেছিলে”!

আমি উত্তর দেইনি। আমার হাতের কাটা-চামচ পাশে রেখে আমাকে টেবিল থেকে বিতরনের অপেক্ষায় ছিলাম। তখনও উপরের দিকে তাকাইনি। কিন্তু সেটা ঘটেনি। কিছু সময়ের জন্য কেউ কোন কথা বলেনি, তারপর লেয়ার্ড বললো, “সে কাঁদছে”।

“কিচ্ছু হয়নি”, আমার বাবা বললেন। তিনি সহজভাবে এবং এমনকি মজা করে এমন শব্দ বললেন যা সারা জীবনের জন্য আমার কান্নাকে বন্ধ করে দিলো। “সে শুধুমাত্র একটা বালিকা” তিনি বললেন। আমি কোন প্রতিবাদ করিনি এমনকি আমার মন থেকেও না। আসলে বোধ হয় সেটাই সত্যি ছিল।

__________________________

টীকাঃ

১।রুপালী শেয়ালঃ সাধারন শেয়ালের একটা ধরন যার লোম কালো কিন্তু লোমের শীর্ষভাগ সাদাটে।

২। বীরোচিত গল্প-গাঁথার ক্যালেন্ডারঃ যে ক্যালেন্ডারে কোন বীরোচিত ঘটনার ছবি ব্যাবহার করা হয়।

৩। পালক-শোভিত অভিযাত্রীঃ বীরত্বের প্রতীক হিসেবে বিজিতকে পাখীর পালক দিয়ে সন্মান জানানো হয়।

৪। পোর্টাজেরঃ দুইটা নাব্য জলাভুমি (নদী ইত্যাদি) এর মাঝের ডাংগায় জলযান বহন করার জন্য যে পথ (অবশ্য এই প্রক্রিয়াকে পোর্টেজ বলে)।কখনো কখনো জলপথে কোন বাধা থাকলেও এটা করা হয়। গোড়ার দিকের অভিযাত্রীদের এটা করতে হয়েছে।

৫। সুচালো পাইনের গন্ধঃ পাইনের পাতাকে পাইন নিডল বলে। অনেকের কাছেই পাইনের গন্ধে টাটকা, শীতের উৎসবের অমেজের মত মনে হয়। তবে খাবারের পরে খাবারঘর বা নিজের শরীর থেকে খাবারের গন্ধ দূর করতে পাইনের পাতা সিদ্ধ করে পাইনের সুগন্ধি বানানো হয়।

৬। বালাক্লাভার যুদ্ধঃ বালাক্লাভা বর্তমান ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্ত একটা শহর। পুর্ব এটা ক্রেমিয়ান উপদ্বীপের অন্ত্ররভুক্ত ছিল।১৮৫৩-১৮৫৬ এ রাশিয়ার ইতিহাসে ক্রেমিয়ান যুদ্ধ বা পুর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধ নামে একটা যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে রাশিয়া ফ্রান্স, বৃটেন, অটমান রাজত্ব এবং সারদিনিয়া রাজ্যের সাথে তার মিত্রতা হারায়। সেই যুদ্ধের সময় ১৮৫৪ সালের ২৫শে অক্টোবর বালাক্লাভাতে একটা যুদ্ধ হয় সেই যুদ্ধে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর এলাকায় তার নৌঘাটি হারায়।

৭। পিচফর্কঃ লম্বা হাতলযুক্ত কাটা চামচের মত একটা যন্ত্র যা হাতে চালানো হয় এবং যাতে বড় বড় ফাকা চওড়া এবং ধারালো যা দিয়ে খড় তোলা এবং নিক্ষেপ করা যায়।

৮। জুবিলীঃ একটা ছোট শহর, যেখানে শিয়ালের এই খামারটা ছিল।

৮। প্রিজার্ভসঃ ফল এবং সবজি লবন বা চিনিতে সংরক্ষন করা/ মোরব্বা।

৯। অরেঞ্জম্যান্স দিনের প্যারেডের রাজা বিলিঃ বর্তমান ফ্রান্সের দক্ষিনে ১৬৭৩-১৭১৩ সাল পর্যন্ত “প্রিন্সিপিটালিটি অব অরেঞ্জ” নামে একটা সামন্ততান্ত্রিক এলাকা ছিল। এরা অভিজাত এবং উচ্চ শ্রেনীর মধ্যে “প্রিন্স অব অরেঞ্জ” নামে একটা খেতাব দিত। ইংল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম-৩ (১৬৫০-১৭০২) এই প্রিন্স অব অরেঞ্জ খেতাব পেয়েছিলেন। তিনিই সাধারনের মাঝে রাজা বিলি নামে পরিচিত ছিলেন। ১৬৮৮ সাল রাজা বিলির (কিং অব অরেঞ্জ) সাথে রাজা জেমস-২ এর যুদ্ধ হয় এবং এতে রাজা বিলি জয়লাভ করেন। প্রতি বছর জুলাইয়ের ১২ তারিখে কানাডাতে এই দিনের স্মরনে প্যারেড হয়।

১০। কাটারঃ হাল্কা, খোলা ঘোড়া-টানা স্লেজ।

১১। শ্রমিকাশ্ব/ওয়ার্কহর্সঃ যে ঘোড়াগুলো শ্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়, দৌড়ানো বা চড়ার জন্য নয়।

১২। গিট-গর্তঃ গাছে গিট হলে তা দিয়ে তক্তা করলে সেই গিটের জায়গাটা অন্য জায়গার চেয়ে বেশি চওড়া হয় এবং অন্য তক্তার সাথে লাগিয়ে বেড়া বা পাটাতন করলে কিছুটা ফাকা থাকে।

১৩। আঙ্গুলে ক্রসঃ খৃষ্টান ধর্ম মতে স্রষ্টার অনুকুল্য পাওয়ার জন্য এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে আংগুলে ক্রস তৈরী করা হয়।

১৪। জুডি ক্যানোভাঃ একজন আমেরিকান কৌতুকাভিনেত্রী, অভিনেত্রী, সংগীত শিল্পী এবং রেডিও ব্যাক্তিত্ব। জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯১৩ এবং মৃত্যু ৫ আগষ্ট ১৯৮৩।

১৫। টীপীঃ পশু চামড়া বা গাছের বাকল দিয়ে তৈরী স্থানান্তরযোগ্য কোনাকৃতির তাবুর মত ঘর বিশেষ যা মেরু অঞ্চলের আদিবাসী আমেরিকানরা ব্যাবহার করে।

অনুবাদক পরিচিতি
নাসরীন সুলতানা

কবি। অনুবাদক।
ব্লগার।
পেশায় কৃষিবিদ। 
সহযোগী প্রফেসর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববদ্যালয়
কানাডা প্রবাসী।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন