বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

সাগুফতা শারমীন তানিয়া'র গল্প : মালঞ্চমালার বাগান

১.
আকাশে জ্যা রচনা করিয়া অদৃশ্য হইতেছে চক্রবাক। সন্ধ্যার নীলা আলো নিভিয়া যাইতেছে, শাল-পিয়ালের বনে অন্ধকার রচিত হইতেছে।
পূর্বদিকের আকাশে বাদাবনের উপর দিয়া, কালনেমিজটা জঙ্গলের উপর দিয়া ক্ষীরের থালার ন্যায় হলুদ চাঁদ উঠিতেছে। মাদারগাছের বেড়া দেয়া মালঞ্চমালার কুটির, সম্মুখে ফুলের বাগান, পাছদুয়ারে শনক্ষেতে ফুটিয়াছে শনফুল।
কন্যার ঠোঁট তেলাকুচ ফলের ন্যায় রাঙা, মুচকুন্দ ফুলের পাপড়ির ন্যায় দেহের বরণ, ভুঁই অবধি বাহিয়া পড়া কেশ চিরিয়া চিরিয়া কবরী বাঁধা- তাহাতে একখানা স্বর্ণকেতকী। তাহার পায়ের গোছ চিরুনির ন্যায়, রাজরাণী হইবার সর্বসুলক্ষণযুক্তা কন্যা। সর্বাপেক্ষা সুন্দর তাহার চোখের অমৃত চাহনি, পালরাজাদের পরে এমন করিয়া কেহ জোড়া অতলায়তন সরোবর খুঁড়িতে পারেনাই। কন্যার নাম মালঞ্চমালা। শ্যামায়মান সন্ধ্যার অল্প জোছনায় চিকণ সেঁওতি-মালা গলায় পরিয়া বিলাতি গাবগাছতলায় বসিয়া মালঞ্চমালা আত্মহারা হইয়া বসিয়া ভাবিতেছে- লোকে অযথাই কর্মের জয়গান লিখিয়া গিয়াছে- কর্মের সাধ্য কি জন্মের ভেদ মোচন করে। জন্ম যথাতথা হইলে কি আর চলে, কাজলরেখা আর কাঁকনদাসী… জন্মেরই তো ভেদাভেদ, নহে কি? একজন রাজার ঘরে ঘরকন্নার সুশিক্ষা পাইয়াছে,আরেকজন শাক কুড়াইয়া ঘুঁটে কুড়াইয়া বড় হইয়াছে- যে ক্ষীরমুরলী পিঠা ইহজীবনে চাখেই নাই সে তাহা কী করিয়া বানাইবে? যে গোবরছড়া দিয়া ঘর নিকাইয়াছে কেবল, সে আলিপনা দিবে কী রূপে? ছুঁচকুমার তো বংশের কথা সুলুকসন্ধান করে নাই, প্রাণদাত্রী বলিয়া কৃতজ্ঞতাস্বীকার করিয়া বিবাহ করিয়াছিল কাঁকনদাসীকে, জ্বলন্ত ঘিয়ের বাতি সাক্ষী মানিয়া স্ত্রীর সম্মান দিয়াছিল। সমাজ ছুঁচকুমারের সেই মুহূর্তের প্রমাদ শুধরাইতে সেই দাসীকে শেষে জীয়ন্তে গোর দিল। জন্ম-অভাগিনী তো কাজলরেখা নয়, জন্ম হইতে অভাগিনী কাঁকনদাসী, জন্ম ইস্তক অভাগিনী মালঞ্চমালা। 

২.

রৌদ্রঢালা এই মালঞ্চে মালঞ্চমালা ছিল বার বছরের আতপ –কন্যা,কাঁটাকাঙালির কন্টকাচ্ছন্ন গাছে একখানা হলুদিয়া ফুল। রৌদ্রে কুল শুকাইতে দেয়, ঘৃতকুমারীর সত্ত্ব শুকায়, বেলশুঁঠ শুকায়, মালিনীমাসীর সহিত কালমেঘের রস দিয়া এলাচের খোসা বাটিয়া দুগ্ধপোষ্য শিশুর রোগ সারিবার বটিকা বানাইয়া শুকায়, কলাইয়ের ডাল বাটিয়া নির্জল কুমুড়া মিশাইয়া কুমুড়াবড়ি বানাইয়া শুকাইতে দেয়। বিরলে বসিয়া কন্যা ভূর্জপত্রে হরীতকির কালি দিয়া মনে যে ছন্দ আসে, লিখিয়া রাখে। বেলা বাড়িলে তিন খাবল তৈল মাথায় দিয়া গায়েগতরে ক্ষারখৈল দিয়া পুকুরে স্নান সারে। তাহার সামান্য জীবন, সহজ তাহার গার্হস্থ্য। উড়িয়া আসা কাক ছাড়া উপদ্রব বলিতে নাই। 

রাজ্যে একদিন ঘোর আপদ দেখা দিল, হাতীশালের হাতী ‘কূম্ভপীড়’ আসিয়া পথঘাট তছনছ করিতে লাগিল, ঘোড়াশালের ঘোড়ারা খাড়া হইয়া মরিয়া গেল, রাজার পক্ষীরাজ ‘হরিকালী’ দানা খাওয়া ছাড়িল। রাজপুত্র জন্মিয়াছে, ধারা তারা বিধাতারা কলমের খোঁচা দিয়া লিখিয়া গিয়াছে কুমারের আয়ূ মাত্র বার দিন। অবশেষে স্বর্ণকর্পূরী আমগাছের তলায় দেখা দিলেন জ্যোতির্ময় বৃদ্ধ বিপ্র, নিদান দিলেন- বার বছরের কন্যার সহিত বিবাহ দিলে বার দিনের কুমার বাঁচিবে। 

বিধাতার লিখন, কে করিবে খন্ডন। রাজ্যে কি আর দ্বাদশবর্ষীয়া কন্যা আছিল না? কোটালিনীর কন্যা মালঞ্চমালা ছাড়া আর কাহারো নুপুরের শিঞ্জনে হাঁসের ঝাঁক নামিবার শব্দ হইতো না? আজ আর তাহা ভাবিয়া লাভ কী। মাতা প্রথমে অমঙ্গল-আশংকায় ফ্যাঁচ করিয়া উঠিলেন, “কুঁড়ে বাঁধি, কুঁড়েয় আছি, তার তলেও রাজার হাঁচি!”, সেই মাতাই চোখের জলে ভাসিয়া কন্যা সাজাইলেন। পিতা কয়েদ হইলো, বাসরের বেসাত ছাড়াই শূন্যে আনিয়া কন্যার বিবাহ হইলো। মঙ্গলবস্ত্রের ঘেরাটোপে বুদ্ধিহীন অসহায় শিশুর সহিত অসহায়া মালঞ্চমালার শুভদৃষ্টি হইলো, নবজাতের গায়ে বিবাহের জোড় তাহারই প্রস্রাবে সিক্ত। রাজা কোটালের সহিত জলচলে সম্মত হইলেন কি না জানা গেল না, কোটালদুহিতার হাতের বাড়া ভাত রাজা-রাণী খাইবেন কি না বোঝা গেল না, পতি মরিলে পতি সতীর হাতে দিবেন কি না সেই প্রশ্নেও রাজা জ্বলিয়া উঠিলেন। কী বা এমন চাহিয়াছিল সে... সেই তো দুধের গাই, চন্দনের কাঠ, মুক্তার ঝিনুক আর মোতির চামচ, শ্বেত সরিষার বালিশ আর ঘনফোঁড়ের কাঁথা... রাজা কি জানিতেন না, এইসব বার বৎসরের কিশোরীর প্রয়োজনীয় বস্তু নহে? রাজা মালঞ্চমালার সেই হংসগ্রীব হাত কাটিলেন, অমৃত চাহনির চোখ পুড়িলেন, বাসর ভাঙিলেন, তাহাকে মাথা মুড়াইয়া ঘোল ঢালিয়া দর্পণ হাতে দিয়া শহর ঘুরাইলেন। আহা, রাজা না মোহন খাজা, চিতায় চড়াইয়া দিলেন পুত্রবধূকে। 

৩.

কাহারা আসিয়া জিজ্ঞাসা করিত, “মালঞ্চ লো, পতি কি ঘুমে না যমে?” পিশাচ আসিয়া তাহার রক্তধারা চাটিতে চাহিত, মরাখেকো আসিয়া বারদিনের শিশুর মৃতদেহ খাইতে চাহিত, দৈত্য দানো দশদিক আঁধার করিয়া আসিয়া খাই-খাই রব করিত... তাহার ভিতরে মালঞ্চমালা বার বছরের কিশোরী সতীর পূণ্যে স্বতঃস্ফূর্ত শিখায় জ্বলিল, জ্বলিতেই লাগিল, কিশোরীর হাত কর্তিত, চক্ষু উৎপাটিত, মুন্ডিত মস্তক, সতীত্বের পরীক্ষা বড় ভয়াল। কে এক সমবয়স্কা মেয়ে স্বরূপসখী জন্মান্তরের এয়োতি আসিয়া তাহাকে ডাকিল, সে তবু রা কাড়িল না। তবেই তাহার হাত গজাইল, চোখ গজাইল, চুল গজাইল, কোলে শিশু চন্দ্রমানিক হাত-পা নাড়িয়া বাঁচিয়া উঠিল। কিশোরী স্ত্রী অবশেষে শিশু স্বামীকে নাওয়াইলো, বাঘের দুধ আনিয়া খাওয়াইলো, খেলা দিল। রাজাজ্ঞা তাহাকে নবীন কৈশোরের মান-অভিমানময় সংসার করিবার অধিকার দেয়নাই, মাতার দায় দিয়াছে। গহন অরণ্যের শ্যামচ্ছায়ায় বাঘবাঘিনীর প্রহরায় চন্দ্রমানিক কলায় কলায় বাড়িল। চন্দ্রে যত কলা বাড়িল, মালঞ্চে তত ফুল শুকাইল। বার বৎসর কাটাইয়া, একদিন শ্বাপদের ক্রোড় ছাড়িয়া মালঞ্চমালা মালিনীর ঘরে ফিরিল। 

কৈশোরোত্তীর্ণার নবীন যৌবন নিলক্ষ্যার চড়া। মালঞ্চমালা অন্ন-ব্যঞ্জন রাঁধিয়া বাড়িয়া দেন, আড়ালের কুঠুরীতে লুকান, মালিনী বুড়ি আসিয়া চন্দ্রমানিককে খাইতে দেয়, মালঞ্চমালার মনে ভয়, কী জানি, যদি কুমার ‘মা’ ডাক দিয়া বসে! বার বছরের বালক নীলরাজা ঝাঁপ দিয়া মায়ের দুধের বোঁট মুখে লইয়াছিলেন, বার বছরে চন্দ্রমানিকের শৈশব আজিও কাটে নাই। বার বছরে শুধু শৈশব কাটিয়াছিল মালঞ্চমালার, কৈশোর যৌবন সকলি ঘুচিয়া গিয়াছিল, থাক সেই কথা। নওলকিশোরের সাজপোশাক জোটায় মালঞ্চমালা, তাহার চৌদোল যোগায় মালঞ্চমালা, তাহাকে হরিকালী পক্ষীরাজের পিঠে চাপায় মালঞ্চমালা। সন্তর্পণে কিশোর স্বামীর পদধূলি লয় মালঞ্চমালা যেন স্বামী বুঝিতে না পায়, স্বামী জিজ্ঞাসা করে- “কে দাও ব্যঞ্জন কে দাও ভাত, অগ্নির আলোয় যেন দেখেছিলাম তোমার দু’খান হাত! আশপাশে থাকিয়াও ছায়ায় মিলাও, রাঁধিয়া দাও বাড়িয়া খাওয়াও না, তুমি কে?” কে দিবে উত্তর? উত্তর জানে পিশাচ- দৈত্য-দানো, উত্তর জানে চিতার দে-দে করিয়া ওঠা লেলিহান শিখা, সমাজ তাহার কী জানিবে, তাহাদের সাক্ষ্যই বা কে মানিবে। যে যৌবন বিলাতি গাবের ফল- মখমলী লাল, যে যৌবন মুচকুন্দফুল তপ্তকাঞ্চনবর্ণ… তাহা সতীত্বের পরীক্ষা দিতে কাটিল। মালঞ্চমালা কৃষ্ণসার হরিণের পায়ে সকল পরীক্ষা তো পাশ করিল, হৃদয় ভাঙিয়া গেলেও হরিণপায়ে দৌড়িল, কিন্তু এই হরিণ অবশেষে গর্ভিণী হরিণ, হৃদয়ভারে শ্লথ। কাহার সিন্দুর নিয়া যৌবন পার করিল সে, দুধবর্ণ রাজার কন্যাকে জয় করিতে যে পক্ষীরাজে সওয়ার হইয়াছে? কোন শ্বশুরের পথের ধুলি কেশে মুছিল, যে রাজকন্যা-পুত্রবধূ পাইয়া একপাক নাচন দিয়া বলিতেছে- “রাজকন্যা পেলাম বৌ/ কোটালকন্যা ফেলে থোও?”

৪.

মালঞ্চমালা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া স্থান ত্যাগ করিয়া উঠিল, মাথার উপর বাদুড় আসিয়া পাখসাট মারিয়া গাবের শাঁস খাইয়া যাইতেছে। কুটীর ঘিরিয়া কনকধুতুরা ফুটিয়াছে,সোনালী অতসী ফুটিয়াছে। শুধু মালঞ্চমালার পদ্মবনে হেমন্ত আসিয়াছে, হিমের শ্বাসে তাহার সকল লাবণ্য মরিতেছে। রাজপুরীতে শেষ অবধি তাহার নামে রাজডঙ্কায় কাঠী পড়িয়াছিল, প্রজারা ক্ষীর-ননী-ছানা ছড়াইয়া ছিটাইয়া খাইয়া তাহার নামে কল্যাণকামনা করিয়াছিল তো, বাঘেরাও নগদবিদায় পাইয়াছিল, কোটাল রাজার কোল পাইয়াছিল। রাজা তো কথা রাখিয়াছিলেন, দুধবর্ণ রাজার কন্যা সেই যে ‘জ্যোচ্ছনা নিশির ফুল’… সেই কাঞ্চীকে পাটরাণী করিয়াছিলেন, মালঞ্চমালাকে করিয়াছিলেন ঠাকুরাণী। কোথা স্বামীসোহাগিনী পাটরাণী, কোথা ভাঁড়ারের শস্যলক্ষী ঠাকুরাণী! কে চাহিয়াছিল ‘নাকের বদলে নরুন’? মালঞ্চমালা সতীর তেজ বিকীর্ণ করিয়া গেল, প্রেম পাইলো না, স্ত্রী হইতে পাইলো না, সংসারে মাতৃসমা অধীশ্বরী হইলো কোনোমতে, বোধকরি দক্ষিণারঞ্জনও বুঝিতে পারিতেছিলেন না বার বৎসরের বড় প্রায়বিগতযৌবনা এই স্ত্রীকে রূপকথায় আর কোন মাহাত্ম্য দিবেন। হাঃ কিশোরীপ্রীতি। যেদিকে তাকাইবে, সেইদিকে বয়স্থ লোকে বিলোল চোখে কিশোরী খুঁজিতেছে! পুরাতন কর্পূর দাহপ্রশমক, লোকে নতুন কর্পূরের দাহ খুঁজিতেছে। একটিমাত্র মানবজীবন, একখানি যৌবন যোগসাধনায় যাইবে, আর তাহার অমৃতফল খাইবে অন্য লোকে, পাটরাণীর মহলে মালঞ্চমালার অন্তর বেতের ডগার মতন পলতার নতীর মতন কাঁপিতে লাগিল। সে রাজপুরী হইতে পলাইয়া আসিল। 

নির্বাপিত-তেজ সতীকে কে লুকাইতে দেখিয়াছে? সীতার পাতালপ্রবেশের অব্যবহিতকালপূর্বে কি কেহ তাহার মুখ দেখিয়াছিল, কেমন দেখিতে হয় অপমানে-বেদনায়-অসহনীয় অপব্যয়ে বিদীর্ণ হৃদয়? 

৫.

মালঞ্চমালার কাহিনী এইখানে এই তরুতলায় অবহেলায় শেষ হইতে পারিত, বর্গাকৃতি কাঁথায় চাঁদ-সুরযের তলায় হাঁসা আর হাঁসির রৌদ্রবিগলিত দিন সিলাই করিয়া কাঁথামুড়ি দিয়া তাহার মৃত্যু হইতে পারিত। হইবে না। সতীত্বের দায় বহুকাল হয় জুড়াইয়া গিয়াছে (আশা করি)। ভূভারতে পুরুষকে জলের তলায় মকরমৎস্যা টানিয়া লইতে পারে, পুরুষকে স্বয়মাগতা রাক্ষসী বিবাহ করিতে পারে, মালঞ্চমালার যৌবন বিফলে যাইবে কেন? 

গেল বহুদূর। ধানক্ষেত ছাড়াইয়া, তালবন মাড়াইয়া, যেইদিকে সিঁদুরবেচুনিরা আসে না, যেইদিকে শাঁখাপরানিরা আসে না, দিকপবন যেদিকে লহিয়া যায়- জনমানুষের বসতিহীন গভীর বনে, বাঘ আসিবার আগে বাঘডাঁশা ডাকিয়া যায়, মাথার উপর চন্দ্রাতপের ন্যায় বৃক্ষশাখায় শাখায় বাঁদরে হুপ হুপ গুপ গুপ জলগুপ তেলগুপ শব্দ করে। কেঁদোবাঘের কাছে একদা মালঞ্চমালা আপনাকে আহুতি দিয়া স্বামীর প্রাণভিক্ষা করিয়াছিল, আজ সে গায়ের কাণি মাথার কেশ ছিঁড়িয়া নোনা জলে-কাদামাটিতে আছাড় খাইয়া কাঁদিয়া পড়িল- “হা বাঘমামা মামী, এইবার আসিয়া আমাকে খাও, তপ্ত মনুষ্যরক্তে তোমাদের পরান জুড়াও।” তাহার কান্নায় কেহ আসিল না। মানুষের পৃথিবী হইতে বাঘের পৃথিবী আলাদা হইয়াছে বহুকাল হয়। কাঁদিতে কাঁদিতে ক্লান্ত হইয়া মালঞ্চমালা ঘুমাইয়া পড়িল, স্বপন দেখিল অ্যান্ডারসন সাহেবের ‘একাঙ্গুরী’র ন্যায় তাহাকেও কোন কুনাব্যাঙ মুখে করিয়া পদ্মপলাশের কুটীরে লহিয়া গিয়া কয়েদ করিয়া রাখিতেছে। নির্জলা উপোসী মালঞ্চ ঘুমের ঘোরে কাঁদিতে লাগিল। হায় আমি কোন জনমে মায়ের দুধ দাঁতে কাটিলাম, কোন জনমে ঝিয়ারীরে ক্ষারখৈল না দিলাম, কোন জনমে গেরস্তের শিল নোড়া আলগ করিলাম, কোন জনমে সাধুফকিরকে তেল-ছোলা-মাষকলাই না দান করিলাম! কন্যাসমা মাতা, মাতৃসমা স্ত্রী, হায় আমি কী? হায় মাতা ধরণী, তোমার এই লজ্জাসকাতরা ঝিকেও সপ্তপাতালে কোল দেও। 

ঘুমে কি স্বপনে মালঞ্চমালা দেখিল, বন দুইভাগ হইয়া তাহাকে পথ করিয়া দিতেছে। সেই পথ গিয়া থামিয়াছে সাত ক্রোশ সরোবরে, সরোবরের মধ্যিখানে স্ফটিকের প্রাসাদ আর সুন্দর বাগান। সেই বাগানের নাম ‘দিলতোড়বাগ’ হইবেও বা। জলে জলপদ্ম, স্থলে স্থলপদ্ম। মধুর সুবাস আকাশ অধিকার করিয়াছে, মৌমাছির গুঞ্জন বাতাসে। মালঞ্চমালাকে কে এক অদৃশ্য মায়া আসিয়া প্রাসাদে প্রবেশ করাইল। কাঁচা হলুদ- আকন্দের আঠা-সোন্দা-মেথি- চন্দন দিয়া তাহাকে স্নান করাইল, গায়ে দিল মূর্চ্ছিত অপরাজিতার ন্যায় নীলাম্বরী, পায়ে দিল রাজস্যাঁকরার তৈয়ার করা আগুনঝরা সোনার মল। কাটখোলায় চমকাইলে যেমন শুষ্ক মসলায় তেজ আসে, তেমন করিয়া তাহার চোখে অমৃত ফিরিয়া আসিল, সুগন্ধী কেশে মেঘ ঢাকিল। মালঞ্চমালা মায়ার হাতে কয়েদ হইলো, কিন্তু হইলো না। 

তারপর দিন গেল কি মাস গেল। তিথি ঘুরিল, আকাশের রঙ বদলাইলো যেন পিঠালি গুলিয়া ঝোলের ন্যায় গাঢ় করিয়া দিল অন্ধকার। রাতচরা পাখি উসখুস করিয়া ডাকিয়া উঠিল, ডাকিতেই থাকিল। প্রাসাদের কুমার আসিয়া দেখা দিল মালঞ্চমালাকে। সপ্তমুখ-তীক্ষ্ণশৃঙ্গ-নীলপৃষ্ঠ পশুর ন্যায় আকার, পশুর ন্যায় ভীরু, বিপদাশংকাকাতর তাহার ভঙ্গি। মালঞ্চমালা এইবারও আড়াল হইতে যত্ন করিয়া ভাত রাঁধিল, মুক্তকেশী বেগুন দিয়া নহলামাছের ভাঙ্গা রাঁধিয়া দিল, গাছপাঁঠার ঝোল রাঁধিয়া দিল, বাড়িয়া দিল না। বাড়িয়া দিতে গেলে পশু কাছে আসিবে না। মকরসংক্রান্তির পিঠা যেমন করিয়া মালিনীমাসীর সহিত গ্রামান্তে গিয়া শেয়ালকে ভোগ দিয়া আসিত, মালঞ্চমালা সেইরূপ করিল। দ্বিধা কাটাইয়া সেই ভীষণদর্শন পশু কাছে আসিয়া খাইলো, একদিন দুইদিন প্রতিদিন, তুষ্ট হইয়া একদিন পশু গাহিল, একদিন আনন্দে তাহাকে নাম ধরিয়া ডাকিল, একদিন বাগানের বেদীতে পাশে আসিয়া বসিল। একদিন ক্ষীরের থালার ন্যায় চাঁদ উঠিলে মালঞ্চমালার জুলফের কেশ চিরিয়া স্বর্ণকেতকী ফুল পরাইয়া দিল। স্বরলিপিতে শুদ্ধ সুর এক এক করিয়া বাজিয়া একদিন দুরূহ সংগীত শুরু হইলো, আকাশ শব্দগুণে ভরিল, জল মধুররসে ভরিল। ত্রিলোকপরিত্যক্ত এই প্রাসাদের বাহান্ন জানালার হীরার ঝালরে- পাটবস্ত্রের ঢাকনে আলো জ্বলিয়া উঠিল। কত অদৃশ্য শঙ্খে আরতিধ্বনি বাজিল। 

এইখানে বলা প্রয়োজন, দূরদেশে মালঞ্চমালার এক ফরাসী ভগিনী ছিল,রক্তের ভগিনী নহে, জাত-ভগিনী। ভগিনীর নাম ‘সুন্দরী’। সওদাগরের কন্যা ‘সুন্দরী’ রূপে চিনি-সবরীকলা, গুণে ত্রিফলা। সুন্দরীর বাপের নবলক্ষ বেসাত জলে ডুবিয়া গেল, বাপ এক দানবাকৃতি জন্তুর প্রাসাদে ঠাঁই পাইল, প্রাসাদের বাগানের একখানা গোলাপ বাপ তাঁর আদরিনী কন্যা সুন্দরীর জন্য চয়ন করিয়াছিল বলিয়া বাপকে ফুলের বিনিময়ে জন্তুর কাছে সুন্দরীকে দিয়া আসিতে হইলো। কালে কালে সুন্দরী সেই পাষাণপ্রাসাদে জন্তুর সান্নিধ্যে থাকিতে গিয়া আবিষ্কার করিল, জন্তুর যাহা আছে মানুষের তাহা নাই- স্ত্রীকূল ইহাদের হৃদয় ও দেহের সঙ্গী, যৌবন একটি অর্থহীন শব্দ,‘মাতৃসমা’ ইত্যাদি শব্দের আড়াল দিয়া যৌবনকে প্রতারণা করা এইখানে ততোধিক অর্থহীন। আহা, সেই সুন্দরীর ভালবাসা পাইবার কপাল বিভাজ্য হইয়া মালঞ্চমালার কিছু জুটিতে পারে না? জুটিল। লোকসমক্ষে নহে, আড়ালে। এই মায়াপুরীতে তাহারও একটি শার্দূলকুমার জুটিয়া গেল, যাহার প্রণয়পীড়নে মালঞ্চমালার যাহা কিছু দেহাতীত- যাহা কিছু সামাজিক পংক্তির অর্থহীনতার বাহিরে, তাহার অভিষেক ঘটিল। এইখানে পংক্তিবিভাজন নাই, জন্মমাত্র দোষ হইবার কিছু নাই,তুচ্ছ হইবার কিছু নাই, আপন প্রবৃত্তিবলে জীব আসিয়া আরেক জীবকে আশ্রয় করে। তৃষ্ণায় পান করিতে দিয়াছে যে দয়াময়ী ভালবাসিয়া খাইতে দিয়াছে যে দয়াময়ী তাহার দয়ার প্রতিফলস্বরূপ জীব তাহাকে ভালবাসে। বেশ একখানা পাকা বামুনের হাতে রাঁধা লাফড়ার ন্যায় লপেট হইলো মালঞ্চমালা আর বিকটদর্শন পশুর সেই সংসারযাপনের চিত্রটি, বেশ ঝোল-ঝোল মজিয়া আসা সংসার। 

বাগানের নিরালায় বিরলে বসিয়া মাঝে মাঝে অবশ্য মালঞ্চমালার চক্ষে চন্দ্রমানিকের নবনীতকোমল শরীরখানি ভাসে, শঙ্খমালার বুকের দুধের মতন টসটস করিয়া অবারণ তাহার চক্ষের জল ঝরে, আহা মানুষের মন। 

১৭/০৩/২০১৭

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন