সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

রমাপদ চৌধুরীর গল্প : ঝুমরা বিবির মেলা

দারোগা অবিনাশবাবু বললেন, নির্ঘাত বাপবেটায় রেষারেষি হয়েছিলো কোনো-- 

কথা আর শেষ করতে হলো না। রেঞ্জার অমিয়বাবুও হাসলেন—অসম্ভব নয়, বুড়ো এই বছরখানেক আগে নাকি ষোলো-সতেরো বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছিলো।

থানার সিপাই কালী মণ্ডল বললে, স্যার, নিজেই যখন সারেন্ডার করেছে তখন ব্যাপারটাও জানা যাবে, কিন্তু ডাকাত ব্যাটা মরে ঠকিয়ে গেল স্যার। 

বুধন কিস্কুর মত্যুতে বিশেষ করে দারোগা অবিনশবাবুই ঠকে গেলেন। এতদিনের তল্লাশ-তদন্ত সব ব্যর্থ হয়ে গেল। 

ময়নাগড় থেকে বরকাডিহি, সারা কোলিয়ারি অঞ্চলটার অধিবাসীরা ভয়ে কাঁপত দুর্ধর্ষ ডাকাত বুধন কিস্কুর নামে। তুড়ুক চাষীরা বলতো, ঝুমরা বিবি ডাইন হয়ে বুধনকেও শিখিয়ে দিয়েছে ঝাড়নি মন্তর। মারাং বুরুর পুজো দিয়ে সিদ্ধাই হয়েছে বুধন, আর তাই শালাই গাছের মাথায় চড়ে সোঁ-সোঁ করে উড়ে গিয়ে আজ এখানে কাল সেখানে ডাকাতি নয়তো রাহাজানি করে ফিরে আসে। থানা-হাকিমের সাধ্য নেই যে বুধনের টিকিতে হাত দেয়। 

টিকি অবশ্য ছিলো না বুধনের, বাপের মতো নুরও রাখতো না। বুধন কিস্কু নামটাই ঘুরতো লোকের মুখে মুখে। কিন্তু আসল চেহারাটা কেউই দেখেনি। দেখে থাকলেও এমন বুকের পাটা কারও ছিলো না যে, পুলিসের কাছে সে কথা জানায়। একরামপুর থানার দারোগা অবিনাশবাবু তাই হার মেনেছিলেন। আর সরকারী ডাক লুটের পর ঝুমরা বিবির মেয়ে আসমিনার খুনের তদন্ত করতে করতে যখন বুধন কিস্কুর প্রায় সব ঘাঁটিগলো জানা হয়ে গেছে, সোনাডির চারদিকে প্লেন-ড্রেস বসানো--শুধু গ্রেপ্তারের অপেক্ষা, সেই সময় কিনা— 

ছেলের ঘাড়ে টাঙির কোপ তো নয়, যেন অবিনাশবাবুর প্রোমোশনের পায়েই কুড়ল বসিয়ে দিলে মিঞামাঝি। 

অবিনাশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সারাটা জীবন এই একরামপুরের জঙ্গলেই কাটাতে হবে দেখছি। বুধনের দলেরই একটা লোক এসে খবর দেবে আর হাতে হাতকড়া পরাবো ভেবেছিলাম। তা বদলির আর আশা নেই। 

নিরাশ হবারই কথা। যে জঙ্গলে এক বছরের বেশী কোনো দারোগা টিকতো না, সেই বুনো তল্লাটে অবিনাশবাবুর জীবনই শেষ হতে চললো। 

ছোট ছোট টিলার ঢেউ ময়নাগড় থেকে বরকাডিহি অবধি। আর শাল-শালাই, মহয়া আর আমলকীর গভীর জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট সাঁওতালী গ্রাম। মাঝপথে একটা রোগা নদী-সোনাতুলসী। সোনাতুলসীর পারে খানকয়েক বাংলো। ফরেস্ট অফিসার ও তার সহকারীদের দপ্তর-আবাস, বদলি হলেও যাঁদের সেই এক অরণ্য থেকে আরেক অরণ্য। কিন্তু অবিনাশবাবু তো বদলি হয়ে আধা-শহর ময়নাগড়ে যেতে পারতেন, কিংবা বরকাডিহিতে। তা নয়, এই জঙ্গলের মধ্যে থানা-হাকিম হয়ে শুকনো সেলামে পেট ভরানো। 

কাছাকাছির মধ্যে সোনাতুলসীর ওপারে ছোট একটি গ্রাম। পাহাড়ের ঢালু উপত্যকায় দু-চার বিঘে লাল মাটির ক্ষেত, আর দু-দশ ঘর তুড়ুক চাষী। তুড়ুক, অর্থাৎ মুসলমান। 

বোধ হয় কোনো প্রাচীনকালে তুর্কি সৈন্যের আগমন ঘটেছিলো এই অরণ্যাঞ্চলে, আর সেইজন্যেই মুসলমানদের নাম হয়েছিলো তুড়ুক। যেমন হিন্দুদের নাম ছিলো দেকো। 

একরামপুরের তুড়ুক চাষীরা এককালে ছিলো বনচর মানুষ। চাষের ক্ষেতে স্থায়ী ডেরা বেঁধে কিভাবে যেন মুসলমান হয়ে যায়। অবশ্য নামেই তুড়ুক, আচারে-বিচারে সিকি ভাগ মুসলমানী, বারো আনা সাঁওতালী। মুখে সেই সাঁওতালী রড়, উদর ছিটেফোঁটা মেশানো। দেবদেবী সেই কিঁসাড় বোঙা, হাড়াম বোঙা, রামসালগি লিটা, জমসিম বোঙা। কিন্তু ওপারের লোক যেমন বলতো সবচেয়ে বড় হলে সিঙে বোঙা, তেমনি তুড়ুকদের সবচেয়ে বড় দেবতা এল্লা বোঙা! সেই এল্লা বোঙার কসম খেয়ে বড়ো মিঞামাঝি বললে, হুজুর থানা-হাকিম–মিছা বলবো নাই। থানা-হাকিম আপনি, সাজা দিবার হয় লঁটকে দে। লঁটকে দে, অর্থাৎ ফাঁসি দে। 

শুনে হাসলেন অবিনাশবাবু, পাণ্ডে, সহায়, সিপাই কালী মণ্ডল। আর হাসলেন অমিয় বাবু। বললেন, থানা-হাকিম! বেশ নামটি দিয়েছে কিন্তু। 

দারোগা অবিনাশবাবু থানা-হাকিম, আর জমাদার গোবিন্দ সহায় ছিলো দারোগা। বনপুলিসের দপ্তরে বসতেন বলে রেঞ্জার অমিয়বাবুর নাম ছিলো জঙ্গল-সাহেব। 

জঙ্গল-সাহেবের বাংলোর বারান্দায় বসেই যথারীতি গল্পগুজব চলছিলো। রেঞ্জার অমিয়বাবু, দারোগা অবিনাশবাবু, জমাদার গোবিন্দ সহায়, এফও হৃদয়নাথ পাণ্ডে এবং আরো দু-চারজন চাপরাসী আর কনস্টেবল। বাইরে অমাবস্যার অন্ধকারে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমক দিচ্ছিলো। অঝোর ধারায় বৃষ্টি তো নয় যেন আলকাতরার প্লাবন। 

গাছের পাতার খসখসানি, বৃষ্টির রিমঝিম আর বনফড়িঙের ঝিঁ ঝিঁ–এরই মাঝে হঠাৎ একসময় ঠুকঠুক করে এসে হাজির হলো বুড়ো মিঞামাঝি! 

একমনে খইনি টিপছিলো জমাদার গোবিন্দ সহায়, মেঝেতে বসে বসে। তারই সামনে এসে দাঁড়ালো বুড়ো।—সেলাম দার্গাসাহেব। 

সরাসরি অবিনাশবাবুর কাছে এগিয়ে যাবার সাহস হলো না। শু্ধু গামছায় বাঁধা পুটলিটা সামনে নামিয়ে রাখলো সে। 

টিমটিমে একটা লণ্ঠন জ্বলছিলো বারান্দায়, তাই প্রথমটা বুঝতে পারেনি গোবিন্দ সহায়। ক্ষেতের খরমুজা দর্শনী এনেছে ভেবে বাঁ হাতে দুটো ফাঁপা তালি দিলে, তারপর খইনি টেপা বন্ধ রেখে গামছাটা খুলেই আঁতকে উঠলো--আরে রাম রাম সিয়ারাম, এ তো তিন শো দো নম্বর কেস আছে। 

অমিয়বাবু, কিংবা পাণ্ডে তো দুরের কথা, অবিনাশবাবুও আঁতকে উঠেছিলেন। তারপর বললেন, এই বৃষ্টিবাদলের রাতে জ্বালালে দেখছি। 

পরক্ষণে বুড়োর মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারলেন অবিনাশবাবু--আরে, সোনাডির মিঞামাঝি না? 

--হঁ থানা-হাকিম। আপনারাই তো লঁটকে দিতিস হুজুর, তা বেটারে আমি কোঁপাই দিছি। 

অবিনাশবাবু, বুঝতে পারলেন না। জিগ্যেস করলেন, লঁটকে দিতাম ? কেন, কে তোর বেটা? 

—ডারীটা আনে দেখ না। উ হলো আমার বেটা বুধন কিস্কু। দে হুজুর, লঁটকে দে। 

অবিনাশবাবু হাসলেন। --বুড়ো-হাকিমের কাছে বিচার হবে তবে তো; ফাঁসি দিয়ে দেবো এখনই ? কিন্তু বুধন কে? ডাকাত বুধন কি তোর ছেলে নাকি? 

বুড়ো ঘাড় নাড়লে শুধু।—হঁ। 

অবিনাশবাবু গোবিন্দ সহায়কে বললেন, বুড়োকে হাজতে রেখে ব্যবস্থা কর গোবিন্দ, মাথাটা এনেছে, ধড়টাও আনতে হবে তো। 

বুড়ো মিঞামাঝি বুঝলো কথাটা। বললে, সে হুজুর সোনাডিতে আছে, বুড়ো হয়েছি, মুর্দা আনবার তাকত্‌ কুথায়? কিন্তু হাজত দিবি কানে হুজুর, লঁটকে দে। বোঙারা স্বপ্ন দিলেন, বেঁটারে কুঁরবানি দে ; তো কুঁরবানি দিছি, এখন লঁটকে দে। 

ছেলেকে খুন করেছে, সুতরাং ফাঁসি দিলেই যেন বুড়োর শান্তি। 

কিন্তু অবিনাশবাবুর দুঃখ, বুধন কিস্কুর গলায় ফাঁসির দড়িটা নিজেই তুলে দিতে পারলেন না। 

গোবিন্দ সহায় জনকয়েক কনস্টেবল, সিপাই কালী মণ্ডল আর কোমরে দড়ি বাঁধা মিঞামাঝিকে নিয়ে চলে যেতেই অমিয়বাবু বললেন, কি ব্যাপার বলুন তো? কেমন যেন রহসা-রহস্য ঠেকছে ! 

অবিনাশবাবু, হাসলেন।--রহস্য? রহস্য নয়, রীতিমতো রহস্য-উপন্যাস। 

উপন্যাস সত্যিই। 

তুড়ুক সাঁওতালদের গ্রাম সোনাডি। আর সে গাঁয়ের দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিলো বুধন কিস্কু। ময়নাগড় থেকে বরকাডিহি, সারা তল্লাটের যত খুনজখম, ডাকাতি, রাহাজানি সব কিছুর জন্যে লোকে দায়ী করতে বুধনকে। অথচ সাহস করে কেউ কিছু বলতো না। লোকটা যে কেমন দেখতে, কোথায় থাকে, কার ছেলে, কোনো খবরই পাওয়া যেতো না। আর কি করেই বা পাওয়া যাবে। গাঁয়ের সাওতালরা বলতো, ও হুজুর ডাইনের মন্ত্র শিখেছে ঝুমরা বিবির কাছে। মাংরা বুরুর নাম করে এখনই মানুষ আবার এখনই হরিণ, নয়তো পাখি। হাওয়ায় নাকি উড়ে যেতে পারে বুধন, সোনাতুলসীর জলে মিশে যেতে পারে। 

আরেকজনের কথাও লোকে বলতো। সে হলো হরকরা নির্মল সিং। নির্মল সিংও নাকি মন্ত্র শিখেছিলা ঝুমরা বিবির মেয়ে আসমিনার কাছে, ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম শব্দ করে হাওয়ায় উড়ে যেতো সেও। 

লাঠির মাথায় ঘুঙুর বাঁধা, পিঠে মেলব্যাগ নিয়ে ময়নাগড় থেকে বরকাডিহি ছুটতো নির্মল সিং। ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম শব্দ আসতো সন্ধ্যের দিকে, আর মাঝে মাঝে টানা-টানা চিৎকার : স-র-কা-রী ডা-ক! 

আবার ছুটতো নির্মল সিং, ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম । পিঠের মেলব্যাগে থাকতো চিঠিপত্র, পার্সেল, টাকাকড়ি। শনিবারে শুধু মনি অর্ডারই নয়, সেভিংস ব্যাংকের টাকাও জমা পাঠানো হতো বড় ডাকঘরে।। 

ডাক-হরকরার ওপর কেউ কোনো দিন লোভের হাত বাড়ায়নি। কিন্তু হঠাৎ পরপর দু দিন নির্মল সিং-এর ঘুঙুর বাজলো না। খবর এসে পৌঁছলো তৃতীয় দিনে। 

রেঞ্জার অমিয়বাবু, ভেবেছিলেন, লোকটা বুঝি বা এতদিনে অসুখে পড়লো। 

কিন্তু অসুখ নয়, চিরনিদ্রা। সোনাতুলসীর পাড়ে তল্লাশি করে পাওয়া গেল মেলব্যাগটা। হরকরার লাঠি আর মেলব্যাগ যেমনকার তেমনি পড়ে আছে, আর কাছেই একটি মৃতদেহ। 

না, নির্মল সিং নয়, আঠারো-বিশ বছরের একটি পূর্ণযৌবনা সাঁওতালী মেয়ে। কেউ যেন গলা টিপে মেরেছে তাকে। 

গাঁয়ের লোক বললে, ঝুমরা বিবির মেয়ে অসমিনা। মায়ের মতো মেয়েও ছিলো ডাইন। নির্মল সিংকে বশ করেছিলো মেয়েটা, লোভ দেখিয়েছিলো, তারপর সুযোগ দেখে কলিজা বের করে খেয়ে নিয়েছে, তাই নির্মল সিং বাতাসে মিশে গেছে। ডাইনরা যখন মানুষের কলিজা খায় তখন আর চিহ্ন রাখে না। 

কিন্তু আসমিনা মরলো কি করে? 

বুড়োরা বললে, মা-মেয়ে দুই-ই ছিলো ডাইন। মাকে ভাগ না দিয়ে নির্মল সিংকে খেয়ে নিয়েছে বলে ঝুমরা বিবি মেয়ের বুক চিরে কলিজা বের করে নিয়েছে। 

—তুরা তো হাসিস বাবুরা ! ডাইন আছে কি না পরখ দেখলি তো হকিম? বড়ো মিঞা-মাঝি বলেছি অবিনাশবাবুকে। 

বড়ো মিঞামাঝি ছিলো গাঁয়ের মাথা। বিঘে দুই-তিন জমি ছিলে বুড়োর। জনারের চাষ করতো। 

তার কাছে গিয়ে হাজির হলেন অবিনাশবাবু, সঙ্গে জমাদার গোবিন্দ সহায়, জনকয়েক কনস্টেবল আর সিপাই কালী মণ্ডলকে নিয়ে। 

বললেন, তোরা সকলে মিলে সাহায্য না করলে এ ডাকাত ব্যাটাকে ধরা যাবে না। 

বুধন যে মিঞামাঝিরই ছেলে তা তো জানতেন না। মিঞামাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা খাটিয়া পেতে দিলো বসবার জন্যে। তারপর বললে, ঝুমরা বিবিটাই আসামী হুজুর, ডাইনটাকে লঁটকে দে, দেখবি বুধন ভালো হয়ে যাবে। 

অবিনাশবাবু বুঝলেন, কাজ হবে না এভাবে। রেঞ্জার অমিয়বাবুকে এসে বললেন, কি করা যায় বলুন তো। লোকটার কোনো হদিসই কেউ দিচ্ছে না। সবারই ভয় বুধনকে ধরিয়ে দিলে ডাইনে কলিজা খেয়ে নেবে তার। 

সোনাডির লোকগুলোর ওপর নাকি বোঙাদের দৃষ্টি ছিলো আগে। তারপর এই ঝুমরা বিবি ডাইন হলো। অন্ধকার রাতে মন্ত্র পড়ে স্বামীকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বেরিয়ে যেতো ঝুমরা বিবি। একটা ঝাঁটা রেখে যেতো স্বামীর কাছে। আর মন্ত্রের ঘোরে ঝাঁটাটা জড়িয়ে শুয়ে সে ভাবতো ঝুমরা বিবিই বুঝি বা শুয়ে আছে। ঝুমরা তখন কুলোর ওপর একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে বেরিয়ে যেতো। 

গাঁয়ের অনেকে দেখেছে এ দৃশ্য, এল্লা বোঙার কসম খেয়ে বলতে তারা। 

সে এক ভয়ঙ্কর চেহারা। কপালে চকচক করতে তেল-সিদুঁর, হাতে প্রদীপ, ঝুমরা বিবির কালো পাথরের শরীর দেখে মনে হতো যেন জোয়ান মরদের শক্তি তার হাতে। আর গুর্ভিন মেয়ের মতো তার ভারি লাজ দেখে যে পুরুষের মন চঞ্চল হতো, তারই কলিজা মুঠোয় পুরে নিতো ঝুমরা বিবি। শুধু কি তাই, সব ডেরা ঘুরে ঘুরে কোথাও ভায়ে ভায়ে ঝামেলার মন্ত্র পড়ে আসতো, বাপ-বেটীতে পাপ লাগাতো, গোলার হুড়ুতে পোকা লাগিয়ে গাঁয়ের লোককে ভুখা মারতো। 

বুড়ো মিঞামাঝি বলেছিলো, তখুন জানতাম না থানা-হাকিম, সত্যি ডাইন বটেক, কি ঝুটা। 

--কি করে জানলি? সিপাই কালী মণ্ডল জিগ্যেস করেছিলো। 

মিঞামাঝি তার আধা-মাকুন্দ নুরে হাত বুলিয়ে বলেছিলো, ডাইন দেখলে চুপ থাকতে হয়। তো জনের বিচার যখন বললে, ঝুমরা বিবি ডাইন, তখন গাঁয়ের সক্কলে বললে, আমরাও দেখেছি বটে। 

সেই ঋমরা বিবির বশ হলো বুধন কিস্কু। বোঙাদের ধরম মানলো না, নিজেকে ভাসিয়ে দিলো পাপের গাড়ায়। 

দারোগা অবিনাশবাবুরও চোখ ছলছল করে উঠেছিলো, অমিয়বাবুর কাছে সে কাহিনী বলতে বলতে।
বলেছিলেন, কত দুঃখে যে মানুষ নিজের ছেলেকে মারতে পারে বুড়োর কাছে না শুনলে বুঝবেন না অমিয়বাবু। ঠিগিয়া শাদি হওয়ার পর আধা-জীবন কেটে যেতেও নাকি ছেলেপিলে হয়নি মিঞামাঝির। না বেটা, না বেটী। তারপর ছেলে দিয়েই মারা গেল মিঞামাঝির প্রথম বউ! 

-তারপর? 

-মা না থাকলে বাপের আদর পেয়ে যা হয়। বুধন কিন্তু চাষবাস ছেড়ে শিকার করে বেড়ায়। ছোটখাট চুরি-জোচ্চুরি করে। তবু বাপ শক্ত হতে পারে না। শেষে ছেলে যখন জোয়ান হলো, পঞ্চায়েত বললে, বিধবা ঝুমরা বিবির সঙ্গে বুধনের পীরিত হয়েছে। ভয় দেখিয়ে জরিমানা করে কোনো কিছুতেই যখন কাজ হলো না, তখন সবাই বললে, ঝুমরা বিবি ডাইনী। ওকে গাঁ থেকে তাড়াতে হবে। 

অমিয়বাবু বললেন, শুধু দুটো জিনিসই দেখেছি ওদের জীবনে সত্যি, বোঙা আর ডাইনী। 

অবিনাশবাবু বললেন, কিন্তু ডাইনী বললেই তো হবে না, জনের কাছে বিচার হলে তবে। ওঝার কাছে খড়ি গুনিয়ে তারপর ধুনো সুপুরি ভাঁউনিচ নিয়ে যেতে হবে জনের কাছে। 


হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় স্টেটমেন্ট দিচ্ছিলো বুড়ো মিঞামাঝি। অবিনাশবাবুর কথা শুনে বললে, হ্যাঁ হুজুর, জনে সব ঠিক ঠিক বললে, পরে বুন্দা চাইলে। বুন্দার টাকাটা দিলাম তো বললে, বেটার মাথায় ডাইন ভর করেছে। তো পুছলাম ডাইন আছে কোন ওড়ায়? জন ঠিকানা বললে। তল্লাশ করে ঝুমরা বিবি ডাইন হলো। তো গাঁয়ের লোক হড়মড়ম মার দিলে, বে-আবরু করে ভাগায় দিলে মা-বেটীরে। 

অগত্যা গাঁয়ের বাইরে গিয়ে ডেরা বাঁধলো ঝুমরা। 

সেই ঝুমরা বিবির খোঁজে লোক পাঠালেন অবিনাশবাবু। কিন্তু পরপর তিন দিন কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না তার। শেষে বুধন কিস্কুর ডেড বডি আর বুড়ো মিঞামাঝিকে চালান করে দিতে হলো বরকাকাডিহিতে। 

দিনকয়েক পরে ঝুমরা বিবি ফিরে এসে যখন শুনলো বুড়ো মিঞামাঝি টাঙির কোঁপে কেটে ফেলেছে তার ছেলে বুধন কিস্কুকে, তখন কেঁদে গড়িয়ে পড়লো সে। 

চোখের জল মুছে বললে, লঁটকা হবে তো হুজুর ওই বুড়োটার? অবিনাশবাবু স্বভাবসুলভ রসিকতায় বললেন, কেন বাবা, বুধন কে ছিলো তোমার যে তার বাপকে লঁটকে দিতে চাও? 

ঝুমরা বিবি চোখের জল মুছে বললে, হুজুর, বুধনই বাঁচায়ে রাখেছিলো আমাদের। না হলে ভুখা মরতাম থানা-হাকিম। 

--তবে সতী ঠাকরুন, মেয়ে যখন মরে পড়ে ছিলো সোনাতুলসীর পাড়ে, তখন কেন বুধন কিস্কুর নামে ডায়েরি লিখিয়েছিলে? 

সবটা হয়তো বুঝলো না ঝুমরা বিবি, তবু যেটকু বুঝলো সেইটকুতেই অপ্রতিভ হলো। 

বললে, সে হকিম অনেক কথা। 

যত চোখের জল মোছে ঝুমরা বিবি, ততই জলে ভরে আসে তার চোখ। 

গাঁয়ের লোক বিটলা করে গাঁয়ের বাইরে তাড়িয়ে দিলে কি হবে, বুধন কিস্কু তার মন থেকে তাড়াতে পারেনি ঝুমরা বিবিকে। 

অমিয়বাবু হেসে বললেন, পীরিত বটে। ওর চেয়ে দশ বছরের বড় এ মাগীটা, তার সঙ্গে কিনা... 

অবিনাশ্বাবু হাসলেন। যার সাথে যার মন মজে— 

ফরেস্ট অফিসার পাণ্ডে বললে, সাচ্‌ অবিনাশবাবু। আগে পানি পিয়ে পিছু জাতি বিচার। 

তা এখানে জাত তো একই, তফাত যেটুকু তা শুধু বয়সের। তা ছাড়া ডাকাত বুধন ছিলো বলেই না ঝুমরা বিবি ভুখা মরেনি। মেয়েকে নিয়ে গাঁয়ের বাইরে ও যখন ডেরা বাঁধলে তখন ওর না আছে জমি, না চাঁদি। আর পয়সা দিলেও কেউ এক কণা চাল বেচতো না ওকে। সেই সময় বুধন কখনো কখনো মাঝরাতে একা হাজির হতো। চাল-ডাল সোনাদানা লুটের মাল খানিকটা এনে দিতো ঝুমরা বিবিকে। হাঁড়িয়া খেয়ে ঝুমরা বিবির সঙ্গে রাত কাটাতো, আর উধাও হতো ভোর চমক দেবার আগেই। 

সেসব দিনের কথা বলতে বলতে হাঁটতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলে ঝুমরা বিবি। 

বললে, হাঁড়িয়া খেলেই মনের ভিতরটা বেয়াদপ হয়ে যায় থানা-হাকিম। ভালো মানুষটা পাপী হয়ে যায়। 

অথাৎ মনে পাপ ঢোকে। বুধনের মনেও একদিন সেই পাপ ঢুকলো। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে এসে বুধন ডাকু হাঁড়িয়া চাইলে। তারপর নেশা যখন জমে উঠেছে, তখন হঠাৎ ঝুমরা বিবিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে ! বললে, বেটীকে লিয়ে আয়। 

--ডাকু নেশা করলে হুজুর বাঘের মতো তেজ হয়। ঝুমরা বিবি বললে। 

অবিনাশবাবু বললেন, আর তাই মেয়েকে এনে দিলি, কেমন ? 

ঝুমরা বিবি লজ্জায় মাথা তুলতে পারলো না। 

--তারপর? 

তারপর বুধন যখনই আসতো, হাঁড়িয়া চাইতো। হাঁড়িয়া খেয়ে রাত কাটাতো আসমিনার সঙ্গে। শেষে হঠাৎ একদিন সন্ধ্যেবেলায় এসে হাজির হলো। বললে, বেটীকে লিয়ে আয়। 

অমিয়বাবু, বললেন, বাঃ, বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! 

অমিয়বাবু, হাসলেন।--তারপর? ডেকে দিলি আসমিনাকে? 

ঝুমরা বিবি মুখ তুললো এতক্ষণে। বললে, না হুজুর, আসমিনা সাঁজের বেলায় সোনাতুলসী থেকে পানি আনতো। তখন বেটী গাডায় পানি আনতে গেছে শুনে টাঙিটা লিয়ে চলে গেল বুধন। তারপর তো তুই জানিস হুজুর। বলে কাঁদলে ঝুমরা, ঠিক সেদিন মেয়ের মৃতদেহের ওপর লুটিয়ে পড়ে যেভাবে কেঁদেছিলো। 

সব শুনে অবিনাশবাবু বললেন, তবে আবার বুধনের বাপটাকে লঁটকে দিতে চাস কেন? মরেছে ভালোই হয়েছে। 

ঝুমরা বিবি চলে যেতেই অমিয়বাবু বললেন, ফাঁসি হবে? 
--পাগল হয়েছেন? হাসলেন অবিনাশবাবু। বললেন, বছর কয়েক জেল অবশ্য হবেই। 

মাসকয়েক পরে একদিন বরকাডিহি থেকে ফিরে এসে বললেন, জেলই হলো অমিয়বাবু, চার বছর। বুড়ো মিঞামাঝি এমন স্টেটমেন্ট দিলে যে, কোর্ট সুদ্ধ লোকের চোখে জল এলো। 

–কি বললে? উদগ্রীব হয়ে উঠলেন অমিয়বাবু। 

-বললে, হজুর জন্ম দিয়েছি আমি, জীবনও নিয়েছি আমি। এখন আইনে ফাঁসি দিতে হয় দে। যে ছেলেকে কোলে-পিঠে করে আদর-যত্নে মানুষ করেছি, সে যখন ভালো হলো না, ডাকাতি রাহাজানি করে, মেয়েদের বেইজ্জত করে এল্লা বোঙার কাছে বেইমান হলো তখন তাকে কেটে ফেলবো না তো মুর্গি বলি দিয়ে তার পুজো করবো! 

অমিয়বাবু, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কথাটা ঠিকই। 

ক্ষোভের হাসি হাসলেন অবিনাশবাবু। ওর বেটার নাকি দোষ ছিলো না, ডাইনীর বশ হয়েছিলো। কিন্তু রায়ে জেল হয়েছে শুনে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলে বুড়ো। ভাবলাম, ফাঁসি হবার জন্যে এত আগ্রহ যার সে লোক জেল হয়েছে বলে কাঁদে? জিগ্যেস করলাম তো বললে, হুজুর, হিসাব ভুল হয়ে গেছে। লঁটকা না হলে বোঙারা খুশী হবেন নাই, বুধন ভালো হবে নাই। 

একট চুপ করে থেকে অবিনাশ বললেন, বোধ হয় পাগল হয়ে গেছে ছেলেকে খুন করে। কিন্তু ডাইনী ভোলেনি। 

পাণ্ডেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, বিশওয়াস্‌, অমিয়বাবু। 
বিশ্বাস ! 

সত্যি তাই। অদ্ভুত মানুষ এই তুড়ুক চাষীরা। একবার যা বিশ্বাস করে, সারা জীবনেও তার নড়চড় হবে না, অমিয়বাবু বলতেন। বলতেন নতুন দারোগা সুধীনবাবুকে। 

অবিনাশবাবু বরকাডিহিতেই বদলি হয়ে গিয়েছিলেন, আর তাঁর জায়গায় এসেছিলেন সুধীনবাবু। 

খুনজখম বা ডাকাতি-রাহাজানির কেস এলেই বুধন কি আর বুড়ো মিঞামাঝির গল্প শোনাতেন অমিয়বাবু। 

বলতেন, সে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড সুধীনবাবু। সন্ধ্যেবেলায় ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে, বসে গল্প করছি আমরা, হঠাৎ সেই সময় ঠুকঠুক করে এসে হাজির হলো বুড়ো মিঞামাঝি, গামছায় ছেলের কাটা মুণ্ডুটাটা বেঁধে নিয়ে ! সে কি আজকের কথা, সে প্রায় তিন-চার বছর হলো ! 

সেদিনও এমনি কি একটা গল্প হচ্ছিলো, হঠাৎ সিপাই কালী মণ্ডল ছুটতে ছুটতে এসে বললে, সোনাডির একটা গাছে গলায় দড়ি লাগিয়ে একজন বুড়ো ঝুলছে স্যার। 

--আত্মহত্যা? সুধীনবাবু প্রশ্ন করলেন। 

—হ্যাঁ স্যার, সুইসাইড কেস। কালী মণ্ডল বললে। 

অমিয়বাবু, সুধীনবা্বু, পাণ্ডে, সহায় সকলেই বেরিয়ে পড়লো। হাঁটুজল সোনাতুলসী পার হয়ে এসে দেখলে, ভিড় ভেঙে পড়েছে গাছটার কাছে। 

একটা সিপাই গাছে উঠে দড়িটা কেটে দিলো, ঝুপ করে মাটিতে পড়লো মৃতদেহটা। 

অমিয়বাবু, ঝুঁকে পড়ে দেখলেন। বুড়ো থুত্থুড়ে একটা লোক, মুখের চামড়া জিলজিল হয়ে গেছে! 

কে যেন বলল, জঙ্গল-সাহেব, কয়েদ মকুব হয়েছিলো তাই সোনাডিতে ফিরে এসেছিলো বুড়ো মিঞামাঝি। 

আরেকজন কে বললে, ডাইনটা মন্ত্র পড়ে বুড়োকে লঁটকে দিয়েছে হুজুর। 

শুধু ঝুমরা বিবি বললে, না হুজুর, ডাইন নই আমি। বেটা বাপের কথা রাখে নাই হজুর, তাই গলায় দড়ি দিয়েছে বুড়ো। বেটা বুধন বলেছিলো, জান বাঁচায় দিলে রাহাজানি করবে নাই। 

অমিয়বাবু ধমক দিয়ে বললেন, কি বলছিস যা-তা। 

সিপাই কালী মণ্ডল বললে, ঠিকই বলছে স্যার। গাঁয়ের লোকও বলছে, বুধন কিস্কু বেঁচে আছে। 

--বুধন কিন্তু বেঁচে আছে? বিস্মিত না হয়ে পারেন না অমিয়বাবু। 

কালী মণ্ডল বললে, তা না হলে এত রাহাজানি হয় এখনো? ডাইনীটা বলেছিলো, কে একটা লোক নাকি থানায় খবর দিতে আসছিলো, তাকেই তিন শো দুই করে দিয়েছিলো বুধন। অথচ গাঁয়ের চারিদিকে তখন পুলিস। 

--তারপর? 

--তারপর বাপের কাছে মাঝরাত্তিরে গিয়ে বলেছিলো, এবার জান বাঁচিয়ে পালাতে দে, ডাকাতি ছেড়ে চাষবাস দেখবো। তা স্যার, তুড়ুকই হোক, সাঁওতালই হোক, বাপের প্রাণ তো। ডেড বডিটাই বুধনের বলে চালিয়ে দিলো। 

সুধীনবাবু, অস্ফুটে বললেন, স্ট্রেঞ্জ! 

কালী মণ্ডল বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। বুড়ো ভেবেছিলো খুনের দায়ে ফাঁসি হবে ওর। আর ফাঁসি হলে তখন বাপের কলিজা বেটার বুকে এসে ঢুকবে। ডাইনী তখন ওর ছেলেকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারবে না। 

অমিয়বাবু, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, অন্ধ বিশ্বাস! এইজন্যেই উন্নতি হলো না লোকগুলার! 

কালী মণ্ডলও দীর্ঘশ্বাস ফেললে।—যা বলেছেন স্যার। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে লোকটা যখন ফিরলো, গাঁয়ের লোকদের নাকি চিনতেই পারেনি, একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে গিয়েছিলো। 

--তাই নাকি? বিস্মিত হলেন সুধীনবাবু। 

--হ্যাঁ স্যার। কালী মণ্ডলের চোখও যেন ছলছল করে উঠলো। বললে, বুড়ো নাকি ছুটে বেড়াতো আর বলতো, ‘লঁটকা হলো নাই, হিসাব ভুল হয়ে গেছে’। ফাঁসি হলেই যেন শান্তি পেতো বড়ো। 

আর সেইজন্যই হয়তো নিজের গলায় নিজেই ফাঁসির দড়ি পরালে। 

কিন্তু সোনাডির তুড়ুকরা বললে, না হুজুর, বেটার কলিজা খেয়ে মিঠা লেগেছিলো ডাইনটার। তো বাপের কলিজাও খেয়ে নিছে। 


এ ঘটনার পর বহু দিন মাস বছর পার হয়ে গেছে। একরামপুরের থানা উঠে গেছে বরকাডিহিতে, বন-পুলিসের দপ্তরে এসেছে নতুন লোক, সবাই ভুলে গেছে ঝুমরা বিবিকে, বুড়ো মিঞামাঝিকে, ডাকাত বুধন কিস্কুকে। কিন্তু সোনাডির তুড়ুক চাষীরা ভোলেনি সে ঘটনা। এখনো শীতকালের দিনে সারা গাঁয়ের লোকে মেলা বসায়--ঝুমরা বিবির মেলা। মেয়েপুরুষ দিনরাত নাচে গায়, দোকানীদের সারি বসে--মিঠাই, ‘মাণ্ডী', রঙিন কাচের জলচুড়ির। আর ভিড় ভেঙে পড়ে মোরগ-লড়াইয়ের দিনে। চারপাশের লোক ছড়া বাঁধে, গান গায় ঝুমরা আর মিঞামাঝির নামে। এল্লা বোঙার পুজো দিয়ে একটা মোরগের নাম দেয় ঝুমরা অন্যটার মিঞামাঝি—তারপর দুজনেরই পায়ে ছুরি বেঁধে ছেড়ে দেয়। 

যে বছর ‘ডাইন' মরে, আনন্দ ধরে না আর গাঁয়ের লোকের। আর যেবারে ‘মিঞামাঝি’ মোরগটার চোট লাগে, সেবারে এল্লা বোঙার পুজো চলে সাত দিন ধরে। গাঁয়ের লোকের মুখ শুকিয়ে যায়। 

কিন্তু মিঞামাঝির সন্তানস্নেহের দিকটা চোখে পড়ে না ওদের। ছেলের জান বাঁচাবার জন্যে, ছেলেকে ভালো করবার জন্যে বাপ নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি লাগাবে—এই তো সাধারণ নীতি। এ ব্যাপারে বিস্মিত হবে কেন সোনাডির চাষীরা। 

আমি নিজেও দেখেছি এ মেলা, ঝুমরা বিবির মেলা। দেখেছি সোনাডির মোরগ-লড়াই। এখন একে গল্প বলতে হয় গল্প বলুন, ইতিহাস বলতে হয় ইতিহাস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন