সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

দীপক দাসের গল্প : হাঁসুয়া চাঁদের রাতে

লোথরোটা মরে গেল সবাইকে অবাক করে। অমন দুর্দান্ত প্রকৃতির লোথরো! পাথরকোঁদা শরীর। বাহু দু’টো যেন পঞ্চায়েত থেকে রাস্তার পাশে বসানো মেহগনি গাছের গুঁড়ি। সরল, শক্ত। উদোম গায়ে কাজ করলে ওর শরীরটা যেন সমুদ্র। পেশিগুলো অনবরত ঢেউয়ের মতো নড়ে।

পাকুয়ার হাটে একবার ভোলাকে দু’হাতে তুলে দড়াম করে আছাড় দিয়েছিল ও। ভোলা এলাকার ধর্মের ষাঁড়। হাটে পসারিদের থেকে তোলা তুলে বেড়ায়। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। কত আর খাবার পায়? খিদের জ্বালায় মাঝে মাঝে গৃহস্থের বাড়িতে নয়তো ফসলের খেতে হানা দেয়। সেবার লোথরোর এক চিলতে বেগুন খেতে হানা দিয়েছিল। বাড়ি ছিল না লোথরো। কাজ থেকে ফিরে ঝুমরির কাছে শুনে মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল ওর। ছুটে হাটে গিয়ে শিং ধরে মেরেছিল একপাক। রাগ হওয়াই স্বাভাবিক। কাজ মেলে না ঠিকঠাক। টুকরোটাকরা জমিতে ফসল ফলানোর চেষ্টা। তাতেও যদি গরুতে খাবলা মারে! লোথরোর সেই রাগ কেউ কেউ দেখে ফেলেছিল। তারাই ঘটনাটা পল্লবিত করে। তবে কেউ সন্দেহ করেনি। কারণ তারা দেখেছে গাজোলের বাইচ প্রতিযোগিতায় লোথরোর নৌকা যেন তির হয়ে যায়। রাস্তার কাজে ওর গাঁইতি ডান্ডার মুখ পর্যন্ত বসে যায় মাটির গভীরে।

এমন দুর্দান্ত প্রকৃতির লোথরোর কী অসহায় মৃত্যু। পুকুর ঘাটে ধাপের খাঁজে আটকেছিল ওর দেহটা। কোথাও কোনও রক্তের দাগ নেই। 


দুই

চাঁদে মিলল জলের সন্ধান। মনুষ্যপ্রেরিত চন্দ্রযান চাঁদের শান্তির দেশে বিস্ফোরণের তরঙ্গ তুলে জলের সন্ধান পেয়েছে। বড় দেশের বড় মাথারা আশা করছেন, এবার হয়তো ডলারের অনেক হাতে প্রাণপণে চাঁদের ঊষরতা দূর করে মনুষ্য শাবকদের বসবাসের উপযুক্ত করে তোলা যাবে। খবরটা পড়ে হাসি পেল সত্যপ্রিয়বাবুর। তার মানে আর একটা ব্রহ্মাণ্ড খণ্ডকে অ-বাসভূমি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিশ্বমাথারা। একটা বাসভূমি পেয়েও তাকে সুন্দর রাখতে পারেনি।প্রাণপণে জঞ্জাল সরানোর বদলে আরও বর্জ্য জমা করেছে। সত্যপ্রিয়বাবুর ভারী অবাক লাগে দুনিয়ার এই হালচাল। এই ধনকৈল গ্রামে না এলে বুঝতেই পারতেন না একই দেশের মধ্যেই রয়েছে আরেকটি দেশ। সে দেশ সঠিক আকারের নয়। দোমড়ানো মোচড়ানো। দেশ তো অনেক বড় ব্যাপার। রাজ্যের মধ্যেই কী ভীষণ তফাৎ মানুষের জীবনে জীবনে। 

ছিলেন পেনশন দফতরের বড় কর্তা। অফিস, আত্মীয়ের বাড়ি আর মাঝে মাঝে ফ্যামিলি ট্যুর ছাড়া তেমন ঘোরাঘুরি হয়নি। ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। অবসরের পরে গ্রামের বাড়িতে ফিরবেন ভেবেছিলেন। বাধ সাধলেন দানিয়েল মুর্মু। পেনশনের কাগজপত্র ঠিক করতে আসতেন। সহজ, সরল এক আদিবাসী। ওঁর পরিবার মিশনারিদের কাছে ধর্মান্তরিত হয়ে গ্রাম ছেড়েছিল। কোনও মতে মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিও জুটে গিয়েছিল। পশ্চাৎবাসীরা যাতে কাউকে পশ্চাতে টানতে না পারে সে জন্য সরকার নানা ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু লাভ কী কিছু হয়েছে? প্রশ্ন তোলেন দানিয়েল নিজেই। তারপর আহ্বান জানান সত্যপ্রিয়বাবুকে, ‘আসুন একবার আমার ছেড়ে আসা গ্রামে।’ 

দেখতেই এসেছিলেন সত্যপ্রিয়বাবু। দেখাটা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেল। একটা পোক্ত দু’কামরা বানিয়ে নিয়েছেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চেষ্টা করেন আদিবাসী মেয়ে পুরুষদের পড়াতে। কিন্তু কাদের পড়াবেন? গ্রামের বহু পুরুষ ভিন দেশে খাটতে গিয়েছে। মেয়েরা কাজের খোঁজে ইতিউতি ঘোরে। নয়তো বাচ্চা সামলায়। কয়েকটা বাচ্চা ইস্কুলে যায়। কিন্তু মিড ডে মিল খাওয়ার আগে। পাতে খাবার পড়লেই দে ছুট। তাঁর স্ত্রী একটা স্বনির্ভর দল খোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু চেষ্টা বিফলে গিয়েছে। হাতের কাজ শেখা, টাকা জমানো, এত সময় ওদের নেই। ওরা প্রতিদিনের জোগাড়ের চেষ্টায় থাকে। নতুন কিছু করাতেও মানসিক বাধা আছে। 

দানিয়েল মাঝে মাঝে আসেন। দু’একদিন থাকেন। মাতৃভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করেন নিজের কৌমের লোকজনদের। কিন্তু তা-ও সফল হয় না। চাকরি করা, শহরবাসী দানিয়েলের চামড়া চকচকে হয়েছে। লব্জ বদলেছে। গা থেকে বের হওয়া সেন্টের গন্ধ ওকে মূল ধারার থেকে আলাদা করে দিয়েছে। দানিয়েল মাঝে মাঝে মজা করে বলেন, ‘আমি হলাম সরকারি পরিকল্পনা রচয়িতা। আর আপনারা সরকারি চাকুরে। মাঝে মাঝে ফিল্ড ভিজিটে আসিন। আমি না ঘরকা না ঘাটকা।’

তবে সত্যপ্রিয়বাবু একজনকে খুঁজে পেয়েছেন। সে কুসুম।

তিন

কাজে যাওয়ার আগে একবার সত্যবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে ভাবছিল কুসুম। রবিবার ধলদিঘি কাটানো শুরু হবে ১০০ দিনের কাজের পয়সায়। চিরকি আর সুকুরমণিকে ওখানেই ধরতে হবে। চিরকির বাচ্চাটা লাল আর সুকুরমণিরটা কমলা। অঙ্গনওয়াড়ির দিদির কাছ থেকে খবর মিলেছে ওই দু’টো বাচ্চা সবচেয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে। ভুগবে না কেন? কী খেতে পায় ওরা? চিরকির বর ভিন রাজ্যে কাজে গিয়েছিল। সেখানেই মারা যায় কাজের সময়ে দুর্ঘটনায়। বাচ্চাটা তখন পেটে। তখন থেকেই তো চিরকি ভাল করে খেতে পায় না। ওর বর যে কোম্পানির হয়ে কাজে গিয়েছিল তারা দশ হাজার টাকা দিয়েছিল। একটা জীবনের দাম। ক’দিন চলে ওই টাকায়? টিপে টিপে খরচ করে টেনেছিল বছর খানেক। তারপর দুধের ছেলেকে নিয়ে খাটতে বেরিয়েছে। কাজ কী আর জোটে সহজে! নিজে খেতে পায় না। ছেলে পুষ্টি পাবে কোথায়? স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে চায় না। সময়ও কোথায়? সুকুরমণির স্বামী আছে, কাজ নেই। তার ওপর চার ছেলে মেয়ের বাবা-মা। সরকার এখন পঞ্চায়েত অফিসে, হাসপাতালে বিনে পয়সায় কন্ডোম বিলি করে। তবুও ওরা যাবে না। 

কুসুম একবার মেয়েদের মধ্যে লুকিয়ে কন্ডোম বিলির চেষ্টা করেছিল। ওদের মরদরা নাকি বলে, মজা নাই। এমনিতেই বেশি মজা। কুসুম এ কথাটা ভদ্দর ঘরের বউদের মুখেও শুনেছে। ও যে নার্সিংহোমে কাজ করে সেখানের আলোচনায়। কুসুমের কন্ডোম বিলি স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। যারা কুসুমকে একটু আধটু সমীহ করে তারা নিয়েছে। সেগুলো গোটা গোটাই মিলেছে পুকুড় পাড়ের ঝোপে। বাচ্চারা বেলুন ভেবে সেগুলো ফুলিয়ে উড়িয়েছিল। 


চার

কীভাবে চিরকি আর সুকুরমণিকে বোঝানো যায় কুসুমকে সেটাই বোঝাচ্ছিলেন সত্যপ্রিয়বাবু। রবিবার দানিয়েল আসবেন। তাঁকেও সঙ্গে নিতে হবে। 

এই আদিবাসী পাড়ায় কুসুমকে উজ্জ্বল বলে মনে হয় সত্যপ্রিয়বাবুর। ওকে দেখলে মনে জোর পান তিনি। ভাবেন, একটা কুসুম যখন আছে তখন আরও কুসুম মিলবেই। একদিন ঠিক বুঝবে তারা। নিজেদের ভাল মন্দ।

কুসুম লেগে থাকে। সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যেও ঠিক সময় করে নেয়। আশ্চর্য প্রাণশক্তি ওর। দূরের একটা নার্সিংহোমে আয়ার কাজ করে। নামেই আয়া। নার্সের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। ওটি’তেও কাজ করে। বিকেলে চলে আসে সত্যপ্রিয়বাবুর কাছে। নানা বিষয়ে কথা হয়। তিন জনে বের হন পাড়ায়। সার্বিক স্বাস্থ্যবিধান, জননী সুরক্ষা নিয়ে কথা হয় গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে। সত্যপ্রিয়বাবু মনে মনে শ্রদ্ধা করেন কুসুমের বাবাকে। ভদ্রলোক মা মরা মেয়েকে অন্তত লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন কিছুটা। কুসুম এইট পাশ। এলাকায় এখনও মেয়েদের মধ্যে মাধ্যমিক পাশ নেই। ছেলেদের মধ্যে একজন উচ্চ মাধ্যমিক ফেল রয়েছে। সে কোটায় চাকরি পেয়ে শহরে থাকে। মাধ্যমিক পাশ করে যেত কুসুমও। যদি না বাবাটা হঠাৎ মারা যেত। সত্যপ্রিয়বাবু চেষ্টা করছেন কুসুমকে যদি কোনও সরকারি চাকরি জোগাড় করে দেওয়া যায়। দানিয়েলও চেষ্টা করছেন। 

কুসুম আর সত্যপ্রিয়বাবু বসে গল্প করছেন। নানা বিষয়ে টুকটাক গল্প চলছে। সেদিন সার্বিক স্বাস্থ্যবিধানের কাজ নিয়ে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির সঙ্গে বাদানুবাদ হয়েছে তাঁর। যে এনজিও’কে স্যানিটারি মার্ট তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছে তারা ভুল তথ্য দিয়ে টাকা আদায় করছে। এই গ্রামে শৌচালয় রয়েছে মাত্র পাঁচটি পরিবারের। একজন কুসুম। দু’জন ভিন রাজ্যে শ্রমিক চালানের দফাদার। আরেক জন ওই উচ্চ মাধ্যমিক ফেল সরকারি চাকুরে। কম খরচে হলেও সে বাবা-মায়ের জন্য সরকারি শৌচালয় বানিয়ে দিয়েছে। বাকি পরিবারটি নিজের পয়সাতেই করেছে। কিন্তু সরকারি খাতায় আছে, ৩৭ শতাংশ পরিবার শৌচালয় পেয়েছে। সমিতির সভাপতির বোধহয় কাটমানি জোটে। তাই সেদিন অত উত্তপ্ত হয়েছিলেন। 

কুসুমকে ঝামেলা নিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করেছিলেন। হঠাৎ একটা চিৎকার শুনতে পেলেন, বাবু রে...এ বাবু...। সত্যপ্রিয়বাবু দেখলেন চুড়কা দৌড়ে আসছে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, ‘লোথরোটা মরে গেছে। কুথাও আঘাত নাই।’ শুনে চমকে ওঠেন সত্যপ্রিয়বাবু। 

খুব অবাক হয়ে কুসুম চেয়ার থেকে উঠে পড়ে। 


পাঁচ

দু’জনে দু’রকম কথা ভাবছে লোথরোর বাড়ি যেতে যেতে। কুসুমের মনে পড়ছে ওকে নিজের মুঠোয় করতে চাওয়া লোথরোর কথা। লোথরো অনেককেই যে ভাবে নিজের মুঠোয় ভরেছিল। ওর বউ ঝুমরি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে। না মেনে উপায় কী? অমন মরদের সঙ্গে এঁটে ওঠাই মুশকিল। কুসুমকে পায়নি বলেই ওর প্রতি লোথরোর আগ্রহটা বেশি ছিল। কুসুমকে কোথায় যেন একটু আলাদা মনে করত লোথরো। কুসুমের মুশকিলটা এখানেই। লোথরো বাড়িতে কুসুমের কথা বলত। আর ঝুমরি খেপে যেত। পাড়ার মেয়েরা কুসুমকে ঈর্ষা করে। কুসুম বোঝে সেটা। 

সত্যপ্রিয়বাবুর একটা কথা মনে পড়ছে। লোথরোর একটা কথা। সবেমাত্র এসেছেন এলাকায়। দু’চারজন বাচ্চাকে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা চলছে। লোথরোর ভাইপোটাও আছে সেই দলে। ভাইপোর পড়াশোনার খবর জিজ্ঞাসা করেছিল ও। সত্যি কথাই বলেছিলেন তিনি। বড্ড দুর্দান্ত। পড়াশোনায় মন নেই। লোথরো হেসে বলেছিল, ‘আন্ধার রে বাবু। বড় আন্ধার। তুই একা লড়তে লারবি।’ খুব অবাক হয়েছিলেন লোথরোর কথা শুনে। 

কিন্তু জোয়ান ছেলেটা মারা গেল কী করে?


ছয়

লোথরোর দেহটা দাওয়ায় শোয়ানো। বাড়ি লোকে ভর্তি। ঝুমরি আর লোথরোর বউদি বিলাপের সুরে কাঁদছে। পাড়ার মেয়েরা সান্ত্বনা দিয়ে গিয়ে বিলাপ করে ফেলছে। লোথরোর দাদা পাড়ার লোকের সঙ্গে কিছু আলোচনা করছিল। সত্যপ্রিয়বাবুরা ঢুকতেই সব রব ক্ষণিকের জন্য থেমে গেল। ঝুমরি আর মেয়েরা দু’জনের দিকে তাকাল।

লোথরোকে ভাল করে দেখেও কিছু বুঝতে পারলেন না সত্যপ্রিয়বাবু। কাজের সূত্রে মৃতদেহ দেখা কুসুমের চোখেও কিছু ধরা পড়ল না। অনেকক্ষণ দেখার পর কুসুমের মনে হল লোথরোর ডান চোখের কোণটা একটু ফোলা। ভাল করে না দেখলে বোঝা যাবে না। মাথার পাশে হাত দিল কুসুম। একটা গুটলি মতো ফোলা। ঝাঁকড়া চুলে ঢাকা পড়ে আছে। কুসুম সত্যপ্রিয়বাবুর দিকে তাকাল। উনিও হাত রাখলেন। এটাই হয়তো ওর মৃত্যুর কারণ। তখনই লোথরোর ভাইপোটা কাঁদতে কাঁদতে কুসুমের কাছে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার যেন কাঁদতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাইপোকে খুব ভালবাসত লোথরো। কুসুমের সঙ্গেও পাড়ার বাচ্চাদের বেশ ভাব। 

ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল কুসুম। গা খুব গরম। কপালে হাত দিয়ে বুঝল জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ওর মাকে বলল। লোথরোর বৌদি বলল, কাল রাত থেকে জ্বর। কুসুম ছেলেটার হাত ধরতে গিয়ে দেখল, একটা আঙুলে নোংরা কাপড় জড়ানো। হাতটা তুলল কুসুম। আঙুলটায় পুঁজ জমে গন্ধ ছুটে গিয়েছে। ওর মা বলল, দু’দিন আগে ডাব কাটতে গিয়ে আঙুলটা প্রায় উড়িয়ে দিয়েছে। কুসুম তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়ার কথা বলল। দেরি হলে ক্ষতি হতে পারে। 

কুসুমের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। দু’জনে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে শুনতে পেল একটা জটলায় আলোচনা হচ্ছে। এসব গুদরাবোঙ্গার কাজ। গুদরাবোঙ্গার নজর পড়েছে লোথরোর ওপর। সত্যপ্রিয়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, গুদরাবোঙ্গা কী? কুসুম বলল, অপদেবতা। দু’জনে তখন লোথরোর বাড়ি ছাড়িয়ে অনেকটা চলে এসেছে। ভীষণ একটা কোলাহল উঠল। লোথরোর বাড়ি থেকেই এল।


সাত

অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না কুসুমের। মনটা খুব ভার লাগছে। লোথরোর ভাইপোটার খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। কাজ থেকে ফিরে সত্যপ্রিয়বাবুর কাছে গিয়েছিল। উনিই বললেন, ওঁরা লোথরোদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরেই নাকি বাচ্চাটা মাটিতে পড়ে ছটপট করতে শুরু করে। ভীষণ খিঁচুনি হচ্ছিল। শুনে কুসুম বলল, ধনুষ্টঙ্কার হতে পারে। আঙুলটা বিষিয়ে গিয়েছিল বোধহয়। 

শুধু না জানার কারণে একটা বাচ্চা মরে গেল। পাড়ার এরকম কত বাচ্চা যে...কুসুম কুসুম...কে যেন ডাকল। কুসুম সাড়া দিল, কে? হামি ঝুমরি। দরজা খুল বিপদ। বুকটা একবার কেঁপে ওঠে কুসুমের। একটা পরিবারের ওপর দিয়ে একদিনে আর কত বিপদ আসবে? ও দরজা খোলে। ঝুমরি আর লোথরোর বউদি দাঁড়িয়ে আছে। কী হয়েছে...কথা শেষের আগেই দু’টো বলিষ্ঠ হাত ওর মুখটা চেপে ধরে। আরও কতগুলো হাত মিল চাগিয়ে নেয়। 

যেখানে ওঁরা ওকে নামাল সেখানটা বনজঙ্গলের মতো। কুসুম বুঝতে পারে ফরেস্টে এনেছে। চিৎকার করলে কেউ শুনতে পাবে না। তবুও একজন গলায় হাঁসুয়া ধরে শাসায়, চেঁচালেই কেটে ফেলব। গলাটা চিনতে পারে কুসুম, ঢবো। বহুদিন ওর গা ঘেঁষার চেষ্টা করেছে। ও আতঙ্কিত গলায় বলে, আমাকে কেন ধরে এনেছিস? 

এনেছিস! একটা গলা থেকে ব্যঙ্গ ঝড়ে। বাবুদের বুলি বুলতে লেগেচিস যে বড়! তুই একটা ডান আচিস।

ডাইনি! কথাটা শুনেই সারা শরীর কেঁপে ওঠে কুসুমের। তবুও গলাটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে, তুই কী বলছিস, চুড়কা!

কী বলচি? ঝুমরি আর ধোনি বলেছে তোর নজরে পড়েই লোথরোটা মরেছে।

ঘাটে অন্ধকারে পড়ে গিয়ে লোথরোর মাথায় চোট লেগেছিল।

চোট লেগেছিল! রক্ত বের হয় নাই। তাগড়া ছেলেটা মরে গেল? তুই ভিতর থিকে ওর জানটা খেয়ে লিয়েছিলি।

আর ওর ভাইপো? তুই ওর আঙুলটো দেখলি তারপরেই কাটা মুরগির মতো ছটপটটে মরে গেল।

তোকে লিয়ে পাড়ায় বহুত অশান্তি। বউরা বলে।

গলাগুলো এক এক করে চিনতে পারে কুসুম। বেলন, মাঝি, মারান, তেঁতলিয়া। আরও কয়েকজন আছে। এরা অনেকেই ওর দিকে ঝুঁকেছিল। কুসুমের মনে পড়ে।

কুসুম গলায় জোর এনে বলে, লোথরোর ভাইপোর ধনুষ্টঙ্কার হয়ে গিয়েছিল। ওর কাটা আঙুলটা বিষিয়ে গিয়েছিল। 

বাজে কথা রাখ। আমাদের জানগুরু বলেছে, পাড়ায় ডান ঢুকেচে। তার বিয়া হয় নাই। ও পুরুষদের কাছে টানে। তারপর মারে। 

জানগুরু! কুসুম আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে একটা হাত ওর মুখ চেপে ধরে। আরও কতকগুলো হাত ওর হাত-পা মাটির সঙ্গে ঠেসে ধরে। বাকি হাতগুলো শরীরের নানা জায়গায় ঘুরতে থাকে। পরস্পর বিরোধী দু’টো হাতের মধ্যে লড়াই বেধে যায়। হাতগুলো হুড়োহুড়ি করে তার শরীরের সব আবরণ খুলে ফেলে। যেন দেরি হয়ে গেলে আর কিছুই মিলবে না, এমন ভাব। অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে না পেলেও কেমন যেন লজ্জা করতে থাকে কুসুমের। তারপরই ঘটে যায় বড় অঘটন। একজন আরেকজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে উঠে বসে ওর ওপর...

এতগুলো শরীরকে সয়েও মরেনি বুঝতে পেরে কুসুম আশ্চর্য হয়ে যায়। ওর মনে হতে থাকে, সত্যিই ও ডাইনি। অসীম ক্ষমতা ওর। পাড়ার সব পুরুষকেই ও একদিনে আশ্রয় দিতে পারে নিজের শরীরে। তখনও বোধহয় একজনের কিছু পাওয়া বাকি ছিল। সেই লোকটা ওর শরীরের ওপর উঠতেই ওর মনে হল, পিঠের নীচের মাটিটা অসমান। জমিটা একটু সমান হলে কষ্টটা কম হত। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। খুব জলতেষ্টা পেয়েছে।

জলের কথা মনে পড়তেই চাঁদের কথা মনে পড়ে যায় কুসুমের। চাঁদে নাকি জল আছে! কুসুম সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে চাঁদের দিকে ছোটে। আকাশে তখন একফালি চাঁদ। কুসুম ছুটতে থাকে চাঁদের দিকে। কিন্তু চাঁদের কাছে পৌঁছে অবাক হয়। সেখানে আগে থেকেই পৌঁছে গিয়েছে ঢবোরা। লোভী চোখে ওরা চাঁদে নামার অপেক্ষায়। 

এখন কী করবে কুসুম? তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। বুকটা মনে হচ্ছে ফেটে যাবে। আস্তে আস্তে চোখ দু’টো বড় হতে হতে স্থির হয়ে যায় কুসুমের। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে।

হাঁসুয়ার মতো চকচকে এক ফালি চাঁদ!


---------------
দীপক দাস
গ্রাম+ ডাকঘর- পাতিহাল, জেলা-হাওড়
ডাকসূচক-৭১১৪১০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন