সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র গল্প : আত্মসুখ

“অশোক কি ঘুমিয়ে পড়েছ?” 

ঘুমের ঘোরে অশোক পাশফেরা অবস্থা থেকে চিত হয়ে শোন। হাতদুটি বুকের ওপরে রাখা। এ অবস্থায় ঘুমোলে অশোককে বোবায় ধরে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় মরে যাচ্ছেন আর ঠিক যেন মরে যাওয়ার আগের মুহূর্তে একটা বড় শ্বাস নিয়ে ধড়ফড় করে ওঠেন। আজ এখনও সেরকম অবস্থায় এসে পৌঁছননি।
ঘুম যেন ঠিক গাঢ় নয়। কেউ যদি নিঃশব্দে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেখে তাহলে দেখতে পাবে যে অশোকের চোখ বন্ধ করা, ঘুমোচ্ছেনও তবু যেন মুখের রেখাগুলি স্থির নয়। ভ্রু-যুগলে দেখা যাবে অল্প ভাঁজ। এপ্রিলের মাঝামাঝি, এসি চলছে তবু গলা ও ঘাড়ের খাঁজে জমেছে ঘাম। অবশ্য মশারি টাঙানো আছে বলে ঠাণ্ডা খানিক কম বোধ হচ্ছে বিছানায়। 

“অশোক ... অশোক শুনতে পাচ্ছো? পাশ ফিরে শোও” 

এবার অশোক চমকে ওঠেন আর বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসতে যান। 

“ না না উঠে বসতে হবে না শুয়েই থাকো। তুমি সন্ধ্যে রাত্রে ঘুমোচ্ছো দেখে অবাক হয়েছি, সবে তো পৌনে এগারটা বাজে। অবশ্য জানি ক’রাত তোমার ঘুম হয়নি। খুব টানাপোড়েন তো গেল” 

অশোক কাঠ হয়ে শুয়ে থাকে। এখন চোখ খোলা। ঘর অন্ধকার। ঘরটা বেশ বড়। দেওয়ালের গা ঘেঁসে দুটো সিঙ্গল সোফা রাখা, মাঝে একটা টি-টেবল। কথাটা ওইদিক থেকেই আসছে। আজই অশোক একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলেন। দু-তিনদিন যাবৎ  বাড়ি ফেরার কোনো ঠিকই ছিল না। আর তার আগে দিল্লিতেও ওই একই অবস্থা ছিল। আর শরীর দিচ্ছিল না। আজ তাই রাতে হালকা খাবার খেয়ে, স্নান সেরে খানিক পরেই শুয়ে পড়েন। ঘুমিয়েও পড়েছিলেন প্রায় তখুনি। 

“ মশা কি বেশি ? মশারি তো তোমার পছন্দ নয়। নিম্ন-মধ্যবিত্ত চালার ঘরের এঁদোমি নয়কি মশারি টাঙিয়ে শোওয়া?” 

অশোক খুব সন্তর্পণে বাঁহাতের তর্জনি হালকা নাড়িয়ে বোঝেন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েননি, কিন্তু বোবায় ধরছে। অন্ধকারের দিকে মুখ রেখে জিজ্ঞেস করতেও পারছেন না “কে তুমি?”। কন্ঠ পরিচিত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব! 

অশোক সত্যিই মশারিটা আজই কিনেছেন। ধপধপে সাদা ফোল্ডিং মশারি। দেওয়ালে পেরেক পুঁততে হয়নি মশারির দড়ি বাঁধার জন্য। খাটও ছতরিবিহীন। এরকম স্মার্ট একটা মশারি কিনতে পেরে অশোকের মন বেশ প্রসন্ন হয়েছিল। 

“ অশোক দিল্লির হোটেলের রুমের মসক্যুইটো রিপেল্যান্টটা কি পুরনো ছিল? কাজ হচ্ছিল না? তোমার স্যুটকেসে তো স্প্রে থাকে পাশের রুমে কি স্প্রে করেছিলে একবারও ? তোমার রুমে করে ছিলে আমি গন্ধ পেয়েছিলাম”। 

হ্যাঁ এটা ঠিক অশোক নিজের ঘরে স্প্রে করেছিল, পাশের ঘরে করেনি বা অশোক ওর হাতে দিয়েও বলেনি – তুমিও একবার স্প্রে করে নিও দিল্লিতেও মশার উৎপাত। 

******** 

রাতটুকু এপাশ-ওপাশ করে কোনো মতে কাটিয়ে বেশ ভোরেই উঠে পরেন অশোক। বাথরুমে আয়নায় নিজেকে দেখেন, চোখ-মুখ বেশ ফোলা। কাল রাতে ফিরে স্নানের সময় দাড়ি কামিয়েছেন তাই, খোঁচা দাড়ি নেই। অশোক অবশ্য প্রতিদিনই দাড়ি কামান। রাতে বেরোনো থাকলে দুবার। আয়নায় দাঁড়িয়েই ঠিক করে নেন ক’কেজি ওজন কমাতেই হবে এবার। ট্রাকস্যুট পরে বেরিয়ে যান প্রাতঃভ্রমনে। না আর কোনো গাফিলতি নয়, ফিট রাখতে হবে নিজেকে। কত কাজ! বাড়ি ফিরে দেখেন রান্নার মেয়েটি আর ঠিকে বউ দু’জনেই এসে গেছে। ডুপ্লিকেট চাবি থাকে রান্না করার মেয়ে রিনার কাছে। 

“ দাদা চা নাও। এতদিন ধরে নাওয়া-খাওয়ার ঠিক ছিল না। আজ আমি রুটি করিনি, ভাত আর হালকা মাঝের ঝোল টিফিনবাস্কোতে দিয়ে দেব। তরকারি সব্জি আর কার জন্য দেব গো দাদা,...... কাল বাড়ি ফিরে এত কেঁদেছি সুজনদাদার জন্য”। 

অশোক চায়ে চুমুক দিতে দিতে শুনতে পান রিনা কাঁদছে। অফিসে লাঞ্চের সময় রিনার পাঠানো তরকারি সুজন রেলিশ করে খেতো। অশোকের ফ্ল্যাটে এলে রিনাকে সেকথার উল্লেখ করেছে। অশোক একবার ভাবলেন সোজা অফিসেই যাবেন, কিন্তু এত দিনের অভ্যেসে ওর গাড়ি সুজনের সেলিমপুরের বাড়ির সামনে এসেই দাঁড়াল। গ্যারেজে সুজনের সাদা টয়োটা অ্যালটিস গাড়িটায় ধুলোর পুরু স্তর পড়েছে। গাড়িটা সদ্যই কিনেছিল সুজন, বড় প্রিয় ছিল ওর। চোখ সরিয়ে নেন অশোক, দরজার কলিং বেলে আঙুল রাখেন। দরজা খোলে পর্ণার বউদি। অশোককে দেখেই মুখটা শক্ত হয়ে ওঠে। অশোক নিজেই সোফায় বসে সেন্টার টেবিলে রাখা খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে জোরে পর্নাকে ডাকেন - “ পর্ণা – পর্ণা”। দেওয়ালের দিকে একটা ছোট টেবিলে সুজনের ছবিতে মালা পরানো, অশোক বিরক্ত মুখে চোখ সরিয়েই দেখেন পর্ণা এসে দাঁড়িয়েছে, সাদা শাড়ি পরে। চোখ-মুখ বসে গেছে। 

“ একী তুমি সাদা শাড়ি পরে এভাবে আছো কেন পর্ণা ? এসব কি? আর সুজনের ওই ছবিটা মালা পরানো -- সরাও- আমি সহ্য করতে পারছি না ”। কাল শ্রাদ্ধে এই ছবিটাই রাখা ছিল, মালায় মালায় সুজনের মুখ ঢেকে গেছিল। সবাই প্রায় হাতে সাদা মালা নিয়ে এসেছিল, কেউ কেউ রজনীগন্ধার স্টিকের গোছা। সামনে ধপধপে সাদা শাড়িতে পাথরের মূর্তি হয়ে পর্ণা। টুকুনও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে। অশোক কি করবে বুঝতে পারছিল না কাল, হ্যাঁ সেও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিই পরে ছিল কিন্তু মালা পরায়নি সুজনের ছবিতে। 

“ সবাই তো এরকম ছবি রাখে বাড়িতে—“ পর্ণার বউদি ছবি সরানোয় আপত্তি তোলে। অশোক ওঁর কথা সম্পূর্ন অগ্রাহ্য করে পর্ণা কে জিজ্ঞেস করেন - টুকুন কোথায়? নিজের ঘরে আছে ?” পর্ণা ঘাড় হেলায়। অশোক গটগট করে পর্ণার বউদির পাশ দিয়ে টুকুনের ঘরে গিয়ে ঢোকেন। চেয়ারে বসা টুকুন, সামনে টেবিলে বই খোলা। পেছন থেকে গিয়ে অশোক ওর কামানো মাথায় হাত দিয়ে ডাকেন – “টুকুন”। 

অশোকের মনে হলো টুকুন একটু আড়ষ্ট হলো যেন। নিজের বাবার থেকে অশোককাকুর সাথে টুকুনের বরাবরই বেশি ভাব। কিন্তু আজ সবই অন্যরকম। ওকে দেখে মায়া হয় অশোকের, চোদ্দ বছর বয়েসে বাবা চলে যাওয়া, খুব ধাক্কা ওর পক্ষে। অশোক জানে তাকেই বার করে আনতে হবে টুকুনকে, এই থমকে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে। 

পর্ণার কাছ থেকে অফিসের লকারের সুজনের কাছে যে চাবিটা থাকতো সেটা নিয়ে অশোক বেরিয়ে গেলেন। গাড়িতে একা কখনও অফিসে যাননি তা নয় কিন্তু আজ পাশের সিটটা বড্ড ফাঁকা লাগল। সেই কবে থেকে যেন! 

******** 

সেও সেই দিল্লিতেই। একটা কনফারেন্স ছিল, রাতে হোটেল শেরাটনে পার্টিতে আলাপ সুজনের সঙ্গে। অশোক কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে গেছেন, আর সুজনের নিজস্ব ফার্ম। প্রথম প্রথম রাতে ডালহৌসি থেকে ফেরার পথে অশোক সুজনের পার্কস্ট্রিটের অফিসে যেতেন মাঝে মাঝে, অবশ্য সুজনের প্রবল জোরাজুরিতেই। পরে চাকরি ছেড়ে একসাথে এই চার্টাড ফার্মে কাজ শুরু অশোকের। টুকুন তখন সবে দু’বছরের। কিছুদিনের পর থেকেই রাতের খাওয়া প্রায় রোজই সুজনের বাড়িতে সেরে অশোক ফিরতেন বাঘাযতীনে নিজের ফ্ল্যাটে। তখনও বিয়ে করব না এমন ইচ্ছে জোরালো হয়নি অশোকের। তবে সুজনের বাড়ি যেতে যেতে সে ইচ্ছে মিলিয়ে গেছে । পর্ণার সৌন্দর্য্য শরীর মন দু’য়েই। আধুনিক নারী হয়েও পর্ণা এখনকার নারীদের থেকে বেশ আলাদা। অশোক চারধারে অতি-আধুনিক যে মহিলাদের ভীড় দেখেন পর্ণা তাদের থেকে আলাদা। আবার সমস্ত ধরনের সংস্কার মুক্ত। অশোকের একলা জীবনে সুজনের পরিবার নিয়ে এলো প্রশান্তি। পর্ণা পোরট্রেট আঁকে। কতবার যে অশোককে পর্ণার আঁকার ঘরে মডেল হয়ে বসে থাকতে হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা! পর্ণা আঁকে অশোককে আর অশোক আঁকড়ায় আত্মসুখ। সুজন কাজ-পাগল, হুল্লোড়ে মানুষ। অশোক ফার্মের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হাল ধরায় সুজন নিশ্চিন্ত। ফার্মের বিস্তার, নামডাক বেড়ে ওঠে। অফিসের একটা বিশেষ আলমারির তালার ব্যবস্থা ব্যাঙ্কের লকারের মতো। পরপর দুটো চাবি দিয়ে খোলে। একটা চাবি অশোকের কাছে আর একটা সুজনের কাছে থাকত। এইসব অশোকেরই পরিকল্পনা। 

অশোক সুজনের চাবিটা পর্ণার কাছেই রাখবেন। অফিস ফেরার পথে যেমন যেতেন এখনও গিয়ে অশোক সুজনের চাবিটা পর্ণার কাছেই রেখে আসবেন। পরের দিন সকালে অফিসে আসার পথে আবার নিয়ে আসবেন। আর দুপুরে ফোনে বলবেন পর্ণাকে ওই বউদিকে ভাগাতে। যত্তসব! সাদা শাড়ি পরিয়ে রেখেছে। রেগে ওঠেন অশোক। 

অফিসে ঢুকতেই সমস্ত কর্মচারী দাঁড়িয়ে পড়ে। দুজনে ঢুকতেন একসাথে অফিসে, সুজন হাসিমুখে দু’এক কথা কর্মচারীদের সাথে বলে নিজের চেম্বারে প্রতিদিন। অশোক অবশ্য আগে গম্ভীর ভাবে সোজা নিজের চেম্বারে গিয়েই ঢুকতেন। আজ দাঁড়ালেন অশোক, সকলের দিকে একবার চোখ তুলে দেখলেন , ম্লান, দুঃখী মুখে সকলে দাঁড়িয়ে। অশোকের মনে হলো সবাই তাঁর কাছে শেষ মুহূর্তের কিছু কথা শুনতে চায়। 

“ সুজন স্যারের প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিকে সকলে মিলে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ আর এটাই হবে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র পথ, সবাই কাজ শুরু করুন” 

বলে অশোক চলেই যাচ্ছিলেন, অফিসের সবচাইতে বয়স্ক কর্মচারী দাসবাবু আটকালেন – “ স্যার এক মিনিটের নীরবতা একটু ...”। এক মিনিট পর অশোক চেম্বারে ঢুকলেন। পাশাপাশি দুটো চেম্বার মাঝখানে একটা দরজাও আছে, সেটা বেশির ভাগ সময় বন্ধই থাকত, মাঝে মধ্যে কোনো কনফিডেনসিয়াল মিটিং দুজনের থাকলে বাইরের দরজা দুটো বন্ধ করে ভেতরের দরজা খুলে রাখতেন। অশোক প্রথমেই মাঝখানেরর দরজাটা খুলে সুজনের চেম্বারের বাইরে দরজাটা লক করে দিলেন। এরই মধ্যে দেখলেন সুজনের টেবিলের ওপর সুজনের একটা ছবি ল্যামিনেট করে তাতে সাদা মালা দেওয়া। দাসবাবুর কাজ, বিরক্ত হলেও কিছু বললেন না অশোক, নিজের চেম্বারে এসে বসল। দিল্লি যাবার আগের রাতে প্রায় সাড়ে নটা দশটা অবদি দুজনে কাজ করেছেন সুজনের চেম্বারে। বার বার পর্ণা তাড়া দিচ্ছিল অশোকের ফোনে। সুজন বলল – তুমি বেরিয়ে যাও অশোক, আমি একটু পরেই একটা ক্যাব বুক করে চলে যাব, এর পর পর্ণা ক্ষেপে যাবে আর খেতে টেতে দেবে না”। 

পর্ণার চরিত্রর সাথে ক্ষেপে গিয়ে খেতে না দেওয়া এসব একেবারেই মানায় না, কিন্তু সুজন অশোককে যেতে বলছিল। অশোক যাননি, পরের দিন ভোরেই দিল্লির ফ্লাইট, কাজ-পাগল সুজনকে একা রেখে গেলে কখন যে ফিরবে কোনো ঠিক নেই। অশোকের ইচ্ছে হচ্ছিল যে এক সপ্তাহ দেখা হবে না, একটু পর্ণার সাথে আলাদা কথা হলে ভালো লাগত, কিন্তু একসাথেই আরো আধ-ঘন্টা পরে সুজনকে নিয়ে দু’জনে ফিরেছিলেন। পর্ণা কে একদিন না দেখলে অশোকের বুকটা টনটন করে। কাজে মন বসে না, ছটফট করেন। করছিল সেইদিন রাতেও অফিসে, যখন পর্ণা বারবার ফোন করছিল। 

আজ আর বেশিক্ষণ অফিসে থাকতে ইচ্ছে করছে না, অশোকের। যদিও কাজ প্রচুর। একা কিভাবে টানবেন সব কাজ! প্লেসমেন্ট সেন্টারে ফোন করে অশোক একজন অভিজ্ঞ চার্টাড একাউন্ট্যান্টের রিকোয়ারমেন্ট জানান। বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসেন। কোথায় যাবেন এখন ? বছরের পর বছর দুজনে অফিস থেকে সুজনের বাড়ি ফিরেছেন তারপর একেবারে রাতের খাওয়া সেরে অশোক ফিরেছে্ন নিজের ফ্ল্যাটে। পর্ণার বউদি যতদিন থাকবে ততদিন রাতে অশোকের ওখানে যাওয়া ভালো দেখায় না, কিন্তু পর্ণারা ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করবে তো! 

নিজের ফ্ল্যাটেই ফিরে এলেন অশোক। সারা ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেন। সন্ধ্যেয় এই একাকীত্ব বড় ভয়ানক। জানলা খুলতে গিয়ে কি মনে হতে জানলা খুললেন না আর । মসক্যুইটো রিপেল্যান্ট লাগিয়ে দিলেন তিনটে ঘরেই। মশা যদিও একটাও চোখে পড়েনি। স্নান করতে ঢোকেন অশোক, দরজাটা বন্ধ করতে যেতেই ডাক টা কানে আসে – অশোক- 

অশোক জোরে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করেন। শোবার ঘরে না বসে ড্রয়িংরুমে বেতের সোফায় এসে বসেন। সোফাটা পর্ণার পছন্দের, একটা শিল্প-মেলা থেকে। এই ঘরের দেওয়ালে পর্ণার আঁকা ছবিই শুধু টাঙানো। সবই পোরট্রেট। একটা ছবিতে সুজন আর অশোকের বেশ খুশির কোনো মুহূর্ত ধরা আছে। ইদানিং সুজন বেশ ভারী হয়ে যাচ্ছিল, ব্যায়াম, ডায়েটিং এসবের ধার ধারত না ও। বললে বলত – “ওসব তুমি আর পর্ণা করো, আমার কম খাওয়া পোশায় না”। অশোকের খিদে পাচ্ছে, ফ্রিজ খুলে দেখেন কিছু আছে কি না। একগাদা আপেল রাখা, দিল্লি রওনা হবার আগের দিন এক পার্টি দিয়ে গেছিল, সুজন প্রায় পুরো টুকরিটাই অশোকের গাড়িতে তুলে দিয়েছিল। রিনা ফ্রিজে গুছিয়ে রেখেছে। একটা আপেল বার করে ভালো করে ধুয়ে সোফায় এসে বসেন অশোক। একটা জার্নাল খোলেন, দু’এক পাতা ওলটানোর পরই বন্ধ করে দেন। রিমোট দিয়ে টিভি অন করে চ্যানেল পালটাতে থাকেন, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট খুলে সাউন্ড অফ করে দেন অশোক। দুটো পুরুষ সিংহ কামড়াকামড়ি করছে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটি সিংহী অন্যদিকে দেখছে। বিরক্তি তে টিভি অফ করেন অশোক। মোবাইল নিয়ে পর্ণাকে ফোন করেন – “পর্ণা” - 

“ অফিস থেকে বেরোওনি এখনো? কখন আসবে?” পর্ণার ক্লান্ত গলায় প্রশ্ন। পর্ণা-পর্ণা-পর্ণা! চোখটা জ্বালা করে ওঠে অশোকের। পর্ণা এই পরিস্থিতিতেও খেয়াল রাখছে অশোকের খাওয়ার কথা। অশোক নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে শুনে, চুপ করে থাকে কিছু বলে না। পর্ণার এই নীরবতাও অশোকের কাছে খুব কষ্টের। কিছু বলল না ও অশোককে। সুজনকে হাসপাতালে ভর্তী করেই পর্না কে জানিয়েছিল, পর্ণা তখুনি দিল্লি আসতে চেয়েছিল। কিন্তু অশোক চান নি যে পর্ণা একা দিল্লি যাক। সব শেষে যখন সুজনের দেহ নিয়ে ফেরেন অশোক তখন থেকেই আর পর্ণা কিচ্ছু বলেনি। অশোকের ভয় লাগছিল পর্ণার কাছে যেতে। যদি কোনো জবাবদিহি করতে হয়। “ ডেঙ্গু তো অনেকের হয় অশোক দা, তুমি কি দেরি করে ফেলেছিলে ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে?” । না পর্ণা এমন কোনো প্রশ্নই করেনি এখনো পর্যন্ত। 

“ পর্ণা তোমরা খেয়ে নাও, টুকুন কে খাইয়ে দাও। পর্ণা আমি সকালেই যাব। পর্ণা – পর্ণা আমি আছি, আছি তোমার সাথে ”। পর্ণার ফোন কেটে গেছে, অশোকের হাতের মোবাইল তখনো কানে। 

“ হা হা হা” 

অশোক চমকে তাকায় পর্ণার আঁকা সুজন আর অশোকের একসাথে ছবির দিকে। সুজন হাসছে। অশোকের মনে হয় সুজনের ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে আর ওখান থেকেই হাসির আওয়াজ। কান চেপে ধরে অশোক। 

পর্ণা! সুজন যে মারা যাবে এ আমি বুঝতে পারিনি। হ্যাঁ জানি মানুষ মারা যায় এই অসুখে, তবু আমি এ আশঙ্কা করিনি। বিশ্বাস করো পর্ণা। ... হাসপাতালে তখন ছিলাম না ? হ্যাঁ ছিলাম না, আমি একটা কাজে বেরিয়ে ছিলাম। দরকার ছিল একটা। ...... কি দরকার ? সুজন কে হাসপাতালে ভর্তি করে আমি নিজের জন্যই ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। নিজেকে দেখাতে। আমি ভয় পেয়েছিলাম পর্ণা......আচ্ছা দুজনে মিলে অসুস্থ হয়ে পরার কোন মানে হয়? কে কাকে দেখবে তখন। দেরি হয়েছিল ফিরতে, ......হ্যাঁ হ্যাঁ হয়েছিল কি করব! দিল্লিতে গাড়ি চলতেই চায় না সন্ধ্যে হলে। যখন ফিরে এলাম ... তখন সুজনের প্লেটলেট একেবারে তলানি তে! হাহ! 

সুজন সুজন তুমি তো জানো। নিজের আর সুজনের ছবিটা দেওয়াল থেকে পেড়ে অশোক চিৎকার করতে লাগল। ছবির সুজন তখন ব্যস্ত অশোকের সাথে সেই পুরনো আনন্দের মুহূর্তেই। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন