সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

কাইল ম্যাকার্থি'র গল্প : গাঙচিল

অনুবাদ: রোখসানা চৌধুরী

যৌন নিপীড়ন বন্ধ করার শ্লোগান সম্বলিত অনুুষ্ঠানের আয়োজনটি ছিল একটি জাদুঘরে। সেখানে খড়কুটো ভরা মৃত প্রাণীদের কুশপুত্তলিকা সাজিয়ে রাখা ছিল। এই সব প্রাণীদের যারা মেরে ফেলেছিল তারাও আজ আর জীবিত নেই, এটা নিশ্চিত। 

অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন একজন অভিনেত্রী। তিনি টিভিতে যৌন নিপীড়নমূলক বিষয়গুলোকে যৌন উত্তেজকভাবেই পরিবেশন করতেন। তিনি তার অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির লাভের সুবিধার্থেই আয়োজনটি করছিলেন। আমি এইসব অনুষ্ঠান নিয়ে, কি বলব, অনেকটাই ক্ষুব্ধচিত্ত ছিলাম।

তারা নারীকে প্রদর্শনযোগ্য পণ্য করে তোলার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নারীকেই ব্যবহার করত, কারণ এভাবে এক টেবিলেই তারা ত্রিশ হাজার ডলারের তহবিল সংগ্রহ করতে পারত। না, এতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না।

এসব অনুষ্ঠানে আগত মহিলাদের একেকজনের হিল জুতোর দামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা যেত। এতেও কোনো সমস্যা ছিল না আমার। জুতোগুলো অবশ্য তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা গাধাদের ঠেলা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রাখার কাজে লাগত।

আমি আসলে ভেবেই পেতাম না এসব যৌন উত্তেজক জুতা অথবা বাল-ছালের দরকারই বা কি? সেইসব মহিলারা আক্ষরিক অর্থে সরাসরি সেক্স করতে চাইলেই বা সমস্যাটা কোথায়?

আমি কেবলই বিরক্ত হতাম এই ভেবে যে নারীবাদ এইসব কিছুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে কত দ্রুত সেইসব ফালতু বিষয় দিয়েই আড়াল হয়ে যাচ্ছে। আমি অপেক্ষায় ছিলাম সেই দিনের, যখন এই অলিখিত যুদ্ধটি তার উদ্দেশ্যকে তুলে ধরতে সক্ষম হবে নির্মোহ আর ক্ষমাহীনভাবে। যখন নারীবাদ কেবলি যৌনতা আর হাই হিলস, খোলামেলা পোশাক কিংবা প্রসাধন দ্রব্যের মতো তুচ্ছ সব বিষয়ে নিয়োজিত থাকায় অভিযুক্ত হবে না। 


সত্যিকার ভাবেই নারীত্বকে বুঝতে পারার মতো কে আছে? আমি এই বিষয়গুলো নিতে পারতাম না। আমার জন্য এই আয়োজনগুলো তাই বিরক্তি উৎপাদন করত।

যেমন, ঠিক এই মুহূর্তের ঝামেলার কথাটা বলি। আজকের পার্টিতে আমি দুই টুকরো ছোট আর স্বচ্ছ শিফন কাপড়ের ড্রেস পরে এসেছি। যেভাবেই হোক শোবার ঘরে প্রাইভেসি থাকে, যেখানে স্তনের ভাঁজ দেখানোর জন্য ব্রা না পড়লেও চলে।

কিন্তু আজ এখানে চারপাশ ঘিরে থাকা অভিনেত্রীদের দেখে মনে হচ্ছে আমি ভুল করে ফেলেছি। আজকের পার্টিতে বুক দেখানোটা হয়তো মূল ব্যাপার ছিল না। আজ এখানে সবাই ভদ্রস্থ সুবেশী ছিল । অথচ আমার বুকগুলো ছিল সেইসব আলগা ভদ্রতার উল্টা অবস্থায়। হিল জুতা টুতা ঠিকই ছিল,কিন্তু নিপলগুলো অসভ্যের মতো চোখে পড়ছিল।

কিন্তু আমার কীই বা করার ছিল। মৃত হাতির দল আশা করি কিছু মনে করেনি। আমি এক পেগ গোলাপী শ্যাম্পেন হাতে নিয়ে পার্টিটা একা একাই উপভোগ করছিলাম। হঠাৎই পৃথিবীর সবচাইতে সুদর্শন জীবিত পুরুষটি বলে উঠল--‘হ্যালো, আমি আন্দ্রে।’

কোন সন্দেহের অবকাশই ছিল না যে সে তার চেহারা ভেঙে টাকা কামিয়েছে। আমরা হাত মেলালাম।

কুশপুত্তলিকার মতই নির্বিকারভাবে সে বলছিল, ‘এখানে শহরের সেরা সব গুণিজনদের সমাবেশ ঘটেছে, তাই না ? আমরা একদম শহরের কেন্দ্রে অবস্থান করছি কিন্তু। দারুণ ব্যাপার।’

‘আমার কাছে তো ম্যানহাটনকে একদম সাধারণই লাগছে।’

সে আমার দিকে যন্ত্রের ভঙ্গিতে তাকাল আর বলল, ‘আমি আছি লসএঞ্জেলসে’। তারপর সর্ম্পূন নিশ্চিত হয়েই যেন জিজ্ঞাসা করল; ‘তুমি কি একজন লেখক?’

আমি মাথা নাড়লাম। ‘তুমি কীভাবে বুঝলে?’ 

কিন্তু সে উত্তেজিতভাবে কথা বলেই যাচ্ছিল, তাই আমার কথা শুনতে পেলোনা। 

‘আমিও একজন লেখক। আমি আমার প্রথম উপন্যাস নিয়ে কাজ করছি। এটা অনেকটা ফকনারের স্টাইলের কাছাকাছি। নৈরাশ্যবাদের ধোয়াশা আর নিয়তিবাদের রহস্যময়তায় পূর্ণ। তুমি জানোই তো, সাধারণ মানুষ এগুলো বুঝতে পারে না। তার ‘এ্যাবসলেম এ্যাবসলেম’ বইটির কথা মনে পড়ে? ওটা কিন্তু পুরাপুরি এ্যাবসার্ড স্টাইলে লেখা।’

‘হুম আমিও একমত।’

‘কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি’। সে আমার দিকে ঝুঁকে এসে চাপা গলায় ঘোঁট পাকানোর ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘আমি কিন্তু উপন্যাসের চাইতেও সিনেমার কথাই বেশি ভাবছি। যেমন ধরো ‘রিয়ার উইন্ডো’ ছবিটির কথা? আমি ঐ ছবিটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। যেখানে আমি থাকি ওটাও একটা বিশাল কাঁচের দালান। ঠিক যেন সেই রিয়ার উইন্ডো। যেটা দিয়ে পেছনের সবকিছু দেখা যায়। এক সময় যেখানে একটা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। আমার উপন্যাসে ঘটনাটি লাগিয়েও দিয়েছি।’ 


‘দাঁড়াও দাঁড়াও, সত্যি সত্যি সেখানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল?’

যদিও আত্মহত্যার প্রসঙ্গে আমরা দুজনই একটু হলেও হার্টবিট মিস করেছিলাম। প্রসঙ্গ পাল্টাতে সে বলে উঠল,

‘যাকগে তুমি কি বিষয়ে লিখছ টিখছ? ’

‘এইতো হতাশা-বিষন্নতা, এই সব আর কি।’ 

‘ওয়াও।’ বলে সে চোখ বন্ধ করল আর নিশ্চল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।

‘কখনো সখনো পারিবারিক বিষয় নিয়েও লিখি।’ আমি যোগ করলাম।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ’-- সে প্রায় চিৎকার করে উঠল। ‘তাহলে আমি হচ্ছি রেমন্ড স্যান্ডলার আর তুমি ডেভিড সেডারিস গোত্রের লেখক।’ আমার এক বন্ধু কোনো এক সময় আমাকে জানিয়েছিল ডেভিড সেডারিস লস এ্যাঞ্জেলসের সাহিত্য জগতে বেশ উঁচুস্থানেই অবস্থান করছে।

তবে সেই লেখক রেডিওতে কাজ করত যা লস এ্যাঞ্জেলসে বইয়ের সমার্থক ছিল কারণ দুটোরই স্ত্রিন ছিলনা। আমি বললাম ‘আমার মনে হয়না আমি ডেভিড সেডারিস টাইপের লেখক।’

‘তাই? কিন্তু তোমরা তো পরিবার টরিবার নিয়ে লেখো।’

‘হ্যাঁ। তা বটে।’

আমি আর কোন বির্তকে জড়াতে চাইলাম না। আমরা দুজনই অস্বস্তিকরভাবে নীরব হয়ে গেলাম। আন্দ্রের সুসজ্জিত কেশবিন্যাসের ফাঁক দিয়ে আমি এক ওয়েটারের দিকে নজর রাখছিলাম যে গোলাপী শ্যাম্পেনের ট্রে নিয়ে ঘুরছিল।

আন্দ্রে হঠাৎ উচ্ছুসিত হয়ে বলে উঠল, ‘আমি বাজি ধরতে পারি তুমি চেখভের ভক্ত তাই না?’

আমি আরেকটা ড্রিংক নিতে নিতে বললাম। ‘হ্যাঁ আমি চেখভকে পছন্দ করি বটে। এক সময় প্রচুর পড়েছি।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমিও চেখভ পছন্দ করি। ঐ যে ছোট গল্পটা কি নাম যেন, সি গাল? সাংঘাতিক কাজ।’

‘নাটক নাটক, ওটা ছোট গল্প না, সিগাল একটা নাটক।’

‘আরে হ্যাঁ, আমি আসলে তাই বোঝাতে চাইছিলাম।’

আমি শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলাম। আর সেই এ্যালকোহল আমাকে আকর্ষণের ঢেউয়ে দোলাচ্ছিল। 

আমি তার চিবাতে থাকা চোয়ালের কাছাকাছি গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “এই নাটকটি থিয়েটারে মঞ্চস্থ হওয়ার সময় সবচেয়ে দুরূহ মুহূর্তটি হলো ‘আমি একটি গাঙচিল’ এটা বলা। সবচেয়ে ভাবগম্ভীর মুহূর্ত আবার একই সাথে কিছুটা প্রহেলিকাময়।”

‘তাহলে শুরু কর।’

‘কি?’

‘ঐ লাইনটা বলো দেখি। কখন এটা বলে সে ? যুদ্ধ চলার সময়ে?’

‘আরে না ? এটা তো একজন মহিলার উপলব্ধি, সে ছিল বেদনার প্রতিমূর্তি।’

‘আমি একটা গাঙচিল।’

‘হ্যাঁ ঠিক এরকমই সে এভাবেই বলেছিল।’

কিন্তু আন্দ্রে আমার দিকে সবিশেষ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল। আমি একটু সামলে নিলাম নিজেকে।


‘হ্যাঁ, আসলেই অংশটুকু দারুন ছিল।’

‘এখন তুমি এটা করে দেখাও।’

‘আরে না, কী বলো আমি কি অভিনয় জানি নাকি।’

‘আরে ধুর, তুমি আরো ভালো পারবে। আমি বাজি ধরতে পারি।’ উৎসাহে তার চোখ চকচক করছিল।

‘আমি গাঙচিল’।

‘আবার বলো’ সে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিল।

‘আমি একটা গাঙচিল’।

‘আবার’ তার শ্বাস অদ্ভুতভাবে দ্রুততর হচ্ছিল। 

‘ওয়াও। দারুণ! তুমি আমাকে সেই মেয়েটির কথা মনে করিয়ে দিলে। তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্কে ছিল। সে ছিল পুরোপুরি নারীবাদী মহিলা।’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও। এটা কীভাবে জানা সম্ভব যে আমি নারীবাদী কি না।’

‘আরে শোনো, তুমি তার আজব কান্ডকীর্তি শুনলে বুঝতে পারবে। আমি তার সাথে যখন বিছানায় যেতাম, সে তখন আমাকে ঘুষি মারত। তাও আবার মুখে।’

সে আমার দিকে বুনো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। 

‘আর আমি ওভাবে পারতাম না।’

আমি ভাবার চেষ্টা করছিলাম থাপ্পড় মারার চেয়ে ঘুষি তার কাছে খারাপ মনে হলো কেন।

‘আর সে আমাকে ঘুষি মারতেই থাকত। শক্ত শক্ত ঘুষি।’

‘আর তাই তুমিও তাকে ঘুষি মারতে।’

আমি পুরো ঘটনাটা জানতে চাচ্ছিলাম। ‘আরে আমিও তো নারীবাদী। বিশ্বাস করো।’ সে পরিষ্কার করতে চেষ্টা করল।

‘অথচ এই মেয়েটা স্রেফ একটা পাগল ছিল। সে বলতে থাকত, আমাকে আরো শক্ত করে মারো দেখি। সে আসলে সত্যিকার অর্থেই দৃঢ়চেতা স্বনির্ভর নারী ছিল। তোমার কী মনে হয় এ সম্পর্কে?’

‘আমার কী মনে হয় ?কী মনে হবে?’

আমি চোখ বন্ধ করলাম। দেখতে পেলাম সুদৃশ্য কাচের দালান। জানালা-সিনেমার পর্দা সবকিছু কাঁচ দিয়ে মোড়ানো। প্রহেলিকা নয়, কাঁচের মত স্বচ্ছ। সবকিছু যেন রিয়ার ভিউ মিররে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

‘আমি ভাবছিলাম নারী হওয়াটাই একটা কান্ডজ্ঞানহীন বিষয়।’

আন্দ্রে এ ব্যাপারে সহজেই সহমত পোষণ করে মাথা নাড়ল আর তার গভীর কালো ফোলা ফোলা চোখে একরাশ করুণা ভরা সমবেদনা নিয়ে বলল, ‘আমি জানি।’

তারপর সে চলে গেল। বাকি রাত তাকে আর দেখা গেলো না। এটা খুব কষ্টদায়ক ছিল, কারণ আমি তাকে বলতে পারলামনা আমি আমার ফোন থেকে কী জানতে পেরেছিলাম। 

‘আমি গাঙচিল।’ এটা বলারও আগে নীনা বলেছিল আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তারপর সে বলেছিল, আমি একটা গাঙচিল।

না, ঠিক তাও নয়। বলেছিল, আমি একজন অভিনেত্রী। আমি আমার চারপাশে সেইসব অভিনেত্রীদের দেখতে পাই যারা মৃত নারীদের চরিত্রে সুন্দর অভিনয় করতে পারে।

নীনা বলেছিল, কিন্তু আমি জানতাম না আমার হাতগুলো কীভাবে নাড়াচাড়া করতাম। কেমন করে স্টেজে উঠতাম। তোমরা ভাবতেও পারবেনা তখন কেমন লাগে যখন অভিনয় খারাপ হয়ে যায়।

যখন অভিনয় করতে পারিনা।


অনুবাদক
রোখসানা চৌধুরী
প্রবন্ধকার। অনুবাদক।
অধ্যাপক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন