সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

বুলগাকভের গল্প : নকশী রুমাল

অনুবাদক : বিষ্ণুপ্রিয়া চৌধুরী

আপনি যদি কখনো গ্রামের রাস্তায় গাড়ি না চেপে থাকেন তাহলে সে বিষয়ে আপনাকে বলে কোনো লাভ নেই। কারণ আপনি ব্যাপারটা কিসুই বুঝবেন না। আর যদি সে অভিজ্ঞতা আপনার হয়ে থাকে তাহলে ও কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে পাপের ভাগী আমি হতে চাই না।

মোদ্দা কথা হলো সদর শহর গ্রাচীয়ভ্কা থেকে মুরীয়ভো হাসপাতালের মাঝে বত্রিশ মাইল রাস্তা আসতে আমাদের লেগেছে ঝাড়া চব্বিশ ঘন্টা। এই ১৯১৬র ১৬ই সেপ্টেম্বর দুপুর দুটোয় আমরা গ্রাচিযভ্কার বার সীমানায় ভুট্টার গুমটিতে ছিলাম। আর সেই অবিস্মরণীয় ১৯১৬র ১৭ই সেপ্টেম্বর ঠিক দুটো পাঁচে পৌছুলাম মুরীয়ভো হাসপাতালের সামনে। ঠান্ডায় আমার পা দুটো জমে ততক্ষণে যেন দুখন্ড হাড়ে পরিনত হয়েছে। আমি বিমূঢ়্ ভাবে ইয়ার্ড এর নেতানো ঘাসে দাঁড়িয়ে মনে মনে আমার মেডিকেল বই আতিপাতি করে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম-- শীতে প্রত্যঙ্গের অস্থিকরণ বিষয়টা আদৌ চিকিৎসা বিজ্ঞানস্বীকৃত কোনো বিকার নাকি পুরোটাই কাল রাত্রে গ্রাবিলোভকাতে আমার স্বপ্নপ্রসুত? আর অস্থিকরণের ল্যাটিনটাই বা কি? ভাবতে ভাবতে প্রত্যেকটা পেশী টনটন করে উঠল। আর আমার আঙ্গুলের কথা তো ছেড়ে দেযাই ভালো, বুটের ভিতর পড়ে আছে কাঠের টুকরোর মত। ভয়ে, হতাশায় গাল দিতে লাগলাম তামাম ডাক্তারি পেশাকে। আর সঙ্গে কি কুক্ষণে পাঁচবচ্ছর আগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমার এপ্লিকেশন খানা!

এই পুরো সময় এমন মিহি হয়ে বৃষ্টিটা পড়ছিল যেন চালুনির ভিতর দিয়ে। কোটখানা ভিজে ঢোল, আমি ব্যর্থ ভাবে একবার ডানহাত দিয়ে সুটকেসটা তোলার চেষ্টা করলাম-- শেষতক হয়ে ভেজা ঘাসে থুতু ফেললাম খানিকটা। আমার আঙ্গুলের আর কোনো কিছুই ধরার ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিলনা। এমন সময় চিকিৎসা শাস্ত্রে গজগজ আমার মাথায় এলো। রোগের নামটা “পলসি”--“পারালিসিস”---হতাশ ভাবে বলে উঠলাম।

“রাস্তাখানার যা হাল, এ মানিয়ে নিতেই তো এক জন্ম লেগে যাবে মনে হয়” আমি ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে জমে নীল ঠোট নাড়িয়ে বললাম। যদিও জানি এতে সে বেচারার কিছুই করার নেই।

ড্রাইভার বললে, “আহ কমরেড ডাক্তার! আমি পনের বচ্ছর এই রাস্তায় গাড়ি চালাছি, এখনো মানিয়ে নিতে পারিনি”

শুনে শিউরে উঠে বাইরের দিকে তাকালাম। হাসপাতাল বাড়ির চুনখসা দেয়াল, আসিস্টান্ট কোয়ার্টার এর ন্যাড়া কাঠের দেয়াল, আর আমার নিজের হবু দোতলা বাড়ির রহস্যময় ও খালি জানলাগুলো দেখে কবর-শিলার কথা মনে হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে থাকলাম। ল্যাটিন শব্দমালার বদলে আমার বিস্রস্ত, বিমূর্ত মাথায় আচমকা ভেসে এলো “সালুত, দিমুর চেস্ত এত পিউরে.... বিদায় বিদায়, আবার হয়ত দেখা হবে এক যুগ বা তারও পরে, ও আমার লাল-সোনালী বলসই থিয়েটার, আমার মস্কো, দোকানপাট, জানলা.. বিদায় বিদায়...”

পরের বার একটা শীপস্কিনকোট পরতে হবে। অবশ্য সেটা হতে হতে অক্টোবর মাঝামাঝি, আর তখন এক নয়, একজোড়া ওই বস্তু প্রয়োজন হবে। মাসখানেকের আগে আর গ্রাচিয়ভ্কা যাওয়ার কোনো আশা আছে বলেতো মনে হয় না। তার ওপর এই রাস্তায় রাত্রিবাস! এই যাত্রায় ওই পনের মাইল মৃত্যুকুপের মত অন্ধকারে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার যোগাড় হয়েছিল। শেষতক গ্রাবিলোভ্কাতে এক স্কুলমাস্টারের বাড়িতে বাকিরাতটুকু কাটিয়ে আজ আবার সকাল সত্তায় রওনা দিয়েছিলাম...

গাড়ির গতি দেখে মনে হচ্ছিল এরচে হেঁটে আসলে বোধ হয় তাড়াতাড়ি হত। একবার তো একটা চাকা বসে গেল কাদায় আর অন্যটা বেঁকে আকাশে, সুটকেসটা দড়াম করে পড়ল আমার পায়ে। একবার এদিকে নড়ে বসি তো পরমুহুর্তে অন্যদিকে ঠেলা দিতে হয়। আর এসবের মধ্যে বৃষ্টির বিরাম নেই। হাড় মজ্জা বরফ করে সে ঝিরঝির করে পড়েই চলেছে। বললে লোকে বিশ্বাস কররে না, কিন্তু ধুসর, অখদ্যে সেপ্টেম্বরের সকালবেলাতেও আপনি আক্ষরিক অর্থেই জমে যেতে পারেন। আর তিলেতিলে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকার সময় আপনার চোখের সামনে দেখার মত কিছুই থাকবেনা। ডানদিকে আগামাথাহীন ন্যাড়া ভুশুন্ডির মাঠ আর বাদিকে খাবলা কয়েক ঝোঁপ-ঝাড়ে ভাঙ্গাচোরা চারপাচটা কুঁড়েঘর। না কোনো প্রাণের স্পন্দন না কোনো শব্দ।

শেষপর্যন্ত নড়ানো গেল সুটকেসটা। ড্রাইভারটা কোনমতে ওটাকে ঠেলে দিল আমার দিকে। হ্যান্ডেলটা ধরতে গেলাম কিন্তু আমার হাত যথারীতি কাজ করলো না। আর বইপত্র আর হাবিজাবিতে ঠাসাঠাসি জগদ্দল সজোরে পতিত হলেন আমার শ্রীচরণ পিষ্ট করে।

“ হায় ভগবান--!” ড্রাইভার আর্তনাদ করে ওঠে। যদিও এতে বিচলিত হবার মত অনুভুতি তখন আমার পায়ের আর অবশিষ্ট নেই।

“কেউ আছেন? হ্যালো!” মুরগির ডানার মত দু-হাত প্রাণপনে নাড়তে নাড়তে ড্রাইভার চেঁচাতে থাকে “ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এসেছি, ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এসেছি!”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আসিস্টান্ট কোয়াটারের অন্ধকার জানলাগুলোয় দেখা দিল কটা মুখ। আর দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। দেখলাম পরনে হতশ্রী কোট আর বুট, কে যেন একটা খোড়াতে খোড়াতে এগিয়ে আসছে। লোকটা এসেই খুব বিনয়ীভাবে টুপি খুলে আমাকে স্বাগত জানালো--

“গুড ডে, কমরেড ডাক্তার!”

“ তা আপনার পরিচয়টা ?” জানতে চাইলাম আমি।

“আগ্গে, অধমের নাম য়েগরভিচ, এখানকার দারোয়ান। আমরা আপনের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম”।

সময় নষ্ট না করে লোকটা ঝটপট আমার বাক্সটা কাঁধে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমিও প্যান্টের পকেটে পার্সটার হদিস করার চেষ্টা করতে করতে ওর পিছু নিলাম।

সত্যি বলতে যে জিনিসগুলো ছাড়া মানুষের চলেনা তার তালিকা খুব একটা বড় না, আর সেই তালিকার প্রথম জিনিসটা হলো আগুন। . মস্কোতে যখন শুনলাম আমাকে পান্ডববর্জিত মুরিয়ভোতে যেতে হবে তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সেখানে গিয়ে গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলব. তখন আসলে ছোকরা চেহারার (ওরফে তারুণ্য) জন্য আমায় বিস্তর ঝামেলা পোয়াতে হত। নিজেকে ড.অমুক বলে পরিচয় দিলেই লোকে ভুরু কুচকে বলতো --

“তাই নাকি? সত্যি? আমি ভাবলাম ছাত্র বোধ হয়।”

“না, আমি ডিগ্রী পেয়ে গেছি” আমি যথাসম্ভব শান্ত ভাবে উত্তর দিতাম আর ভাবতাম “এবার একটা চশমা না পরলেই নয়!” বলা বাহুল্য, আমার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চোখে (যা তখনও অভিজ্ঞতার জালে অস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি)ও বস্তুটির কোনো মানে ছিল না। অবশেষে লোকের অসহ্য স্নেহমিশ্রিত অবজ্ঞাকে উপযুক্ত জবাব দিতে আমি নিজের জন্য একটা বিশেষ ব্যক্তিত্ব বানিয়ে তোলার উদ্যোগ করলাম যা দেখেই কিনা আমজনতার মনে বেশ একটা সন্মানের উদ্রেক হবে-- আমি অন্যান্য সদ্য ইউনিভার্সিটি পাশ চব্বিশ বছরের ছোকরাদের মত চঞ্চলতা, আবেগতাড়িত হাবভাব একেবারে বন্ধ করলাম, সে জায়গায় চিবিয়ে কথা , গেরাম্ভরী হাটাচলা এসব শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম, সেসবের কিছুই আমার যে কাকের গায়ে ময়ুর পুচ্ছ হয়েছিল, তা বুঝলাম অনতিবিলম্বেই। স্টাডি অবধি যাবার আর ধৈর্য রইলো না। স্বরোপিত ব্যক্তিত্ববিধি জলাঞ্জলি দিয়ে আমি রান্নাঘরের আগুনের সামনেই জুতো খুলে কুঁজো হয়ে বসে পড়লাম। ফায়ার প্লেসের আগুনের দিকে এমন ভাবে আমার দৃষ্টি আটকে গেল যে ওই অবস্থায় আমাকে কেউ দেখলে নির্ঘাত ভাবত আমি আগুন পুজো করি। আমার বাঁদিকে একটা উল্টানো বালতির ওপর রেখেছিলাম আমার জুতোজোড়া, পাশে পড়েছিলো একটা ছালছাড়ানো মোরগ। ঘাড়ের কাছে তখনও রক্ত লেগে আছে। রংবেরঙের পালক গুলো ডাই করা হয়েছে পাশটিতে।

এর মধ্যেই আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে জরুরি কাজগুলো সেরে ফেলেছিলাম-- এক হলো য়েগরিচএর বউ আসকানিয়াকে রান্নার লোক হিসেবে নিযুক্ত করা। বুঝলাম তারই পরিণতি স্বরূপ আসকানিয়া মোরগটাকে জবাই করেছে আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ওটা আমার খাবারে রূপান্তরিত হবে। সবার সাথে একে একে আলাপও হয়ে গেল। আমার কম্পাউন্ডার- -মানে হাতুড়ে সহকারী- -দেমিয়ান লুকিচ, আর দুইজন আয়া-- পেলাগিয়া ইভানোভনা আর আনা নিকলায়েভ্না। হাসপাতাল ঘুরে দেখতে দেখতেই বুঝলাম এদের যন্ত্রপাতির কোনো অভাব নেই। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে স্বীকার করতেই হলো এসব ঝা-চকচকে সামগ্রীর বেশিরভাগের ব্যবহার সম্পর্কে আমার বিন্দুবিসর্গ জানা নেই। সত্যি বলতে আদ্ধেক জিনিস চোখেই দেখিনি এর আগে।

“ হুম! তা আপনাদের ব্যবস্থা তো অতিউত্তম দেখছি!” আমি গম্ভীর ভাবে বললাম।

“ আগ্গে স্যার, এসবি আপনার আগে যিনি ছিলেন-- লীয়পোল্ড লীয়পলদোভিচ এর কৃতিত্ত্ব। উনি তো স্যার সেই সকাল থেকে সূর্য ডোবা অব্দি অপারেশন করতেন।”

শুনেই ঘাম দিল আমার, সারিসারি তাকগুলোর দিকে গোমরা মুখে তাকিয়ে থাকলাম।

“এতে অন্তত চল্লিশটা রুগীর জায়গা করা যাবে” ওয়ার্ড দেখে বললাম আমি।

“লীয়পল্ড লেয়পলদভিচ তো কখনো কখনো পঞ্চাশজনকেও রাখতেন এখানে”--দেমিয়ান খানিকটা সান্ত্বনা দেবার স্বরে বলল। আনা নিকলায়েভ্নার মাথায় চুড়ো করা পাকাচুল, তিনি বলে উঠলেন--

“ ডাক্তার তোমায় দেখতে কিন্তু এক্কেবারে তরুনটি...আশ্চর্য! দেখলে কে বলবে ডাক্তার! মনে হয় যেন ছাত্র”।

“হা কপাল” আমি মনে মনে বললাম “ মনে হয় মাঝে মাঝে লোকে শুধু ইচ্ছে করে এইটা করে!”

“হুম—ইয়ে—তা তরুণই বলা চলে..” দাঁত কিড়মিড় করতে করতে উত্তর দিলাম।

তারপর আমায় ফার্মাসি পর্যবেক্ষণে নিয়ে যাওয়া হলো। উঁকি মেরেই বুঝলাম-- ডাক্তারি শাস্ত্রে উল্লেখিত যাবতীয় ওষুধ সেখানে জড়ো করা রয়েছে। ঘর দুটোতেই জরিবুটির কড়া গন্ধ, তাকে লক্ষ রকম পাঁচন। এমনকি বেশ কিছু বিলিতি পেটেন্ট মেডিসিনও চোখে পড়লো, যেগুলো বলা বাহুল্য, আমি বাপের জন্মে নাম শুনিনি।

“এসব ওই লীয়পল্ড মশাই আনিয়েছিলেন” পেলাগিয়া বেশ গর্ব করে জানালো।

এই মহান চিকিৎসক যিনি পিছনে ফেলে গেছেন ছোট্ট গ্রাম মুইর্ভো, তার প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে গেল আমার মন, “এনাকে জিনিয়াস ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না” ভাবলাম।

আগুন ছাড়া মানুষের আর যা লাগে তা হলো তার হুশ-তাল। মোরগটার সদ্ব্যবহার করে ফেলেছি আগেই। য়েগরিচ তোষকে খড় ভরে চাদর পেতে শোবার ব্যাবস্থা করে দিয়েছে। আগুনটাও জ্বলছে বেশ। আমি স্টাডিতে মহান ডাক্তার লীয়পল্ডএর তৃতীয় কীর্তি- ভর ভর্তি বুককেসটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম বিস্ময়বিভূত হয়ে। গুনে দেখলাম প্রায় ত্রিশ খন্ড রাশিয়ান ও জর্মন সার্জারী ম্যানুয়াল, সঙ্গে থেরাপিউটিকস এর বইপত্র আর চামড়া বাঁধানো অপূর্ব এনাটমি এটলাসের সংগ্রহ!

“সন্ধে বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশ আমি হুশ-তাল ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগলাম; নিজেকে কেমন একটা গোয়ার-গোবিন্দ, অসুখী লাগছিল”।

“আমার কী করার আছে, আমি আমার ডিগ্রী পেয়েছি, তাও যেমন তেমন নয়--একেবারে ফার্স্ট ক্লাস, হুহু বাবা! আমি তো বলেইছিলাম ওদের যে আমি জুনিয়র হিসেবে প্রাকটিস আরম্ভ করতে চাই, তা ওনারাই বললেন, শুরু করলে আপনিই সব জ্ঞান হয়ে যাবে” --নিজের সাথে নিজেই খিটখিট করতে লাগলাম।

এই এখন যদি কেউ হার্নিয়া নিয়ে এসে উপস্থিত হয় জ্ঞান আপনিই হয়ে যাবে? উপরন্তু সেই রোগীর জ্ঞানেরই বা কি হবে যখন আমার হাত তার দায়িত্ব নেবে? সে কি ওপারে পৌঁছে জ্ঞান ফিরে পাবে? কথাটা ভেবেই আমার রক্ত জল হয়ে এলো।

তারপর আছে পেরিটনায়টিস! কিংবা ক্রুপ, গাঁয়ের ছেলেপিলেদের হামেশাই লেগে থাকে... ট্র্যাকিয়তমিটা ঠিক কখন করা উচিত? মানে না করতে হলেও যে আমার অবস্থার কিছু উন্নতি হবে তাতো নয়... তারপর---তারপর--- প্রসব। ভুলেই গেছিলাম! সে যে আরো সাংঘাতিক ব্যাপার- হাজার জটিলতা, বাচ্চার পজিশন গণ্ডগোল—হায় হায়! আমি যে অকুল পাথারে পড়ব। উফ কি বোকার মত কাজটাই করেছি। এ চাকরি আমার তখুনি প্রত্যাখান করা উচিত ছিল, মানে উচিত--এই মুহুর্তে! আমি নয়, এদের দরকার দ্বিতীয় এক লীয়পল্ড!

মহা উদ্বিগ্ন হয়ে আলোআঁধারি স্টাডিতে পায়চারী করতে লাগলাম। লণ্ঠনের কাছে গেলেই তার কাচে আর জানলার শার্সিতে নিজের ফ্যাকাশে মুখটা ফুটে উঠছিলো বার বার। বাইরে দিগন্ত প্রসারিত অন্ধকার।

“আমি হলাম ঠকবাজ দিমিত্রি-- সবটাই ভুয়ো আর মিথ্যে”। টেবিলের ওপর বসে পড়লাম আবার। ঝাড়া দুটি ঘন্টা এই তীব্র আত্ম-বঞ্চনার পর যখন আমার স্নায়ুও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে তখন আসতে খানিকটা শান্ত হলাম। তারপর ভাবতে বসলাম ভবিষ্যত কর্মপন্থা।

“ওরা বলল এখন ওয়ার্ড প্রায় খালি। গ্রামে এখন যব ঝাড়াই চলছে। আর রাস্তার অবস্থাতো প্রায় অগম্য...”

“এই সময়েই হার্নিয়া নিয়ে এসে উপস্থিত হয় কেউ”-- জলদগম্ভীর গলায় কে যেন বলল আমার মাথার ভিতরে. “ এই ঠান্ডায় সর্দি সারাতে কেউ ওই রাস্তা পেরুবে না কিন্তু হার্নিয়া, হার্নিয়া যদি থাকে তাহলে সে আসবেই আসবে ডাক্তারবাবু!”

আমি কেঁপে উঠলাম চিন্তায়। “শুধু শুদু আজগুবি দুশ্চিন্তা বন্ধ করো। হার্নিয়া যে আসবেই তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই...একবার শুরু করে ফেলেছ যখন তখন আর পিছু হাটবার উপায় নেই।”

“ভেবে দেখো” --মাথার ভিতর থেকে ভেসে এলো তিক্ত কন্ঠস্বর।

“বেশ, তাই হোক... রেফারেন্স বই ছাড়া এক পা এগুবো না আমি. যদি ওষুধ লিখতে হয় তাহলে হাত ধুতে ধুতে ভেবে নেব আর বই খোলা থাকবে রুগীর খাতার ওপরেই। সোজাসাপটা ওষুধ দেব-- সোডিয়াম সালিসাইলিট্, পাচ গ্রাম পাউডার দিনে তিনবার।

“তারচে বেকিং সোডা লিখলেই পারো!” কন্ঠস্বর এবার বিশ্রী মজা করতে লাগলো আমার সাথে!

“সোডার সাথে এর কি সম্পর্ক? সেরম হলে আমি ইপিকাকুয়ানহার মিকচারও লিখতে পারি-- একশো আশি টু দুশো সিসি”।

যদিও কেউ সত্যি সত্যি ইপিকাকুয়ানহা চায়নি তাও আমি তড়িঘড়ি ফার্মাকোপিয়া খুলে পড়তে বসলাম ইপিকাকুয়ানহা নিয়ে—পড়তে গিয়েই চোখে পড়ল ইনসপিরিন নামক বস্তুটি আসলে কুইনাইন ডাইগ্লায়কলিক অ্যাসিডের ইথিরিয়াল সালফেট ছাড়া আর কিছুই নয়। বলা হচ্ছে, এটি নাকি মোটেই কুইনাইন এর মত খেতে নয়। তালে এইটা কিজন্যে দেয় রে বাবা? কিকরেই বা দেয়? পাউডার নাকি...ধুর ছাই!”

“সবই তো বুঝলাম কিন্তু হার্নিয়াটা সামলাবে কি করে!” সেই ভয়্মাখা স্বরটা আমাকে খুচিয়েই চলল।

“ কি আবার করব, রোগীকে জলে বসিয়ে রাখব আর ব্যথা কমানোর চেষ্টা করব।”

“কিন্তু যদি সেটা তির্যক হার্নিয়া হয়, তখন? তখন কি করবে চাঁদু?” ভয় একটা প্রেতের মতন আমার কানে ফিস ফিশ করতে লাগলো-- “তখন তো সেটাকে কেটে বার করতে হবে তোমায়”। আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম.।তখন ক্লান্ত কন্ঠস্বর বললো--

“ঘুমিয়ে পড় ডাক্তার। শান্ত হও। দেখো বাইরে কি স্থির স্থব্ধ অন্ধকার। প্রান্তর শীতল, ঘুমন্ত। ওখানে কোনো হার্নিয়া নেই। কাল সকালে আবার ভেবো। এখন ফেলে দাও বই--এই আধারে জটিল হার্নিয়ার অগ্র পশ্চাত উদ্ধার করার তোমার কম্ম নয়। ঘুমাও..

ও কখন এসেছিল সেটা আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে দরজার খিলেনের কর্কশ আওয়াজ, আসকানিয়ার চিৎকার আর বাইরে একটা গরুর গাড়ির দাড়ানোর শব্দ।

লোকটার মাথায় টুপি ছিলোনা, কোটের বোতামগুলো খোলা, চোখে খ্যাপাটে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। এসেই আছড়ে পরে মাটিতে কপাল ঠুকতে লাগলো।

“আর উদ্ধার নেই”-- মনে মনে ভাবলাম।

“আরে ব্যাপারটা কি বলবেন তো?” আমি খানিক ইতস্তত করে ওর নোংরা জামার হাতাটা টেনে সোজা করলাম লোকটাকে। আমার প্রশ্ন শুনে কান্নায় বিকৃত মুখ তুলে তাকালো সে। তারপর বিড়বিড় করে আধা অসংলগ্ন, হাপ ধরা গলায় যা উত্তর দিলো তার সারমর্ম মোটামুটি এই রকম:

“ডাক্তারবাবু...বাবু.....ওই একমাত্তর মেয়েটাই আমার সম্বল।” বলেই সে আবার তীক্ষ্ণ গলায় এমন ককিয়ে উঠলো যে ঘরের ল্যাম্প শেড গুলো যেন কেপে উঠলো।

“ আহ! কিসের শাস্তি দিচ্ছো ভগবান এই ভাবে! কী অপরাধ করেছি আমি ”-- বলতে বলতে সে নিজের হাত মুচড়াতে লাগলো আর কাঠের মেঝেতে সজোরে মাথা ঠুকতে লাগলো,ভয় হচ্ছিল মাটি বা মাথা দুটোর একটা এখুনি ভবলীলা সাঙ্গ হবে।

আমার মুখ থেকে রক্ত হারিয়ে যাচ্ছিলো, বুঝতে পারছিলাম,

“তার হয়েছে কি সেটা বলবেন তো?” জিগ্গেস করলাম আবার।

লোকটা আচমকা উঠে আমার কাছে ছুটে এসে ফিসফিস করে বললো, “যা চাইবেন দেবো, যত টাকা চান, টাকা ফুরোলে খাবার, জিনিস পত্র...আমার সর্বস্ব আপনাকে দিয়ে দেব ডাক্তারবাবু, মেয়েতে বাঁচিয়ে দিন। যদি পঙ্গু হয়ে যায় তাতেও আমার কিছু যায় আসে না, আমার অবস্থায় একটা মেয়ে বসিয়ে খাওয়াতে আমার কিছু অসুবিধে হবে না..শুধু ওকে বাঁচিয়ে দিন!”

আসকানিয়ার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম দরজার ওধারে। আমার বুকের ওপর একটা চাপ নেমে আসছিল, আমি আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠলাম--“ কিন্তু কি হয়েছে না বললে তো--!

এইবার লোকটা এক মুহুর্তের জন্য চুপ করে গেল। তারপর দুচোখ ভরা শূন্যতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল। যেন কি একটা গোপন কথা বলছে-- “ব্রেকে পড়ে গেছে”

“ব্রেক?”

“ওই যে জব মাড়াই করে, বুঝলেন না , মাড়াই কলের ব্রেকে...” আকসানিয়া আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।

“নাও...উৎকৃষ্ট শুরুয়াত... কী মরতে এসেছিলাম এখানে!” ভাবলাম আমি।

“কে হয় তোমার?” জিগেস করলাম।

“আমার মেয়ে...” লোকটা নিচুস্বরে মিনতি করলো-- “দয়া করুন ডাক্তারবাবু”। বলেই আবার মাটিতে নুয়ে পড়ল লোকটা, চাষাড়ে চুল এলোমেলো হয়ে ওর চোখ ঢেকে গেছিলো।

প্রেসার ল্যাম্পটা ব্যাঁকা টিনশেডের উপর জ্বলছিল। উষ্ণ আলোয় ঘরখানা উজ্জ্বল লাগছিল বেশ। মেয়েটিকে অপারেশন টেবিলে সাদা পরিষ্কার অয়েলক্লথের ওপর শোয়ানো। ওকে দেখা মাত্রই আমার মাথা থেকে হার্নিয়া সংক্রান্ত যাবতীয় চিন্তা অদৃশ্য হলো।

মেয়েটির লালচে চুলের গুছি অবিন্যস্ত ভাবে ঝুলছিল। লম্বা বিনুনিটা টেবিল থেকে নেমে গেছে মাটি পর্যন্ত। মেয়েটার ক্যালিকো স্কার্টের বিভিন্ন জায়গা ছিন্নভিন্ন হয়ে রক্তে ভেজা। রক্তের রং খয়েরি থেকে কালচে তৈলাক্ত লাল হয়ে রয়েছে জায়গায় জায়গায়। কাগজের মত ফ্যাকাশে মুখের পাশে কেরোসিনের আলোটাকেও বেশি প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল। একটা ফরসা নিস্পন্দ, প্লাস্টার অফ প্যারিসের ছাচেঢালা মুখখানা থেকে একটা দুষ্প্রাপ্য, অপূর্ব সৌন্দর্য যেন হারিয়ে যাচ্ছিলো আমার চোখের সামনে। আমি হলফ করে বলতে পারি এরকম মুখ মানুষ জীবনে এক আধবারই হয়তবা দেখতে পায়। দশ সেকেন্ড অপারেশন থিয়েটারে কেউ কথা বলছিল না, তারপর দরজার ওপার থেকে ভেসে এলো বিলাপ আর কান্নার উদ্গার।

“পাগল হয়ে গেছে বেচারা”-- ভাবলাম আমি, “নার্সরা নিশ্চই দেখছে, সত্যি এত সুন্দর কেন দেখতে একে? লোকটার গঠন ভালো কিন্তু এর জন্মদাত্রী নিশ্চই নজরকাড়া সুন্দরী ছিল...তবে কি বিপত্নীক?”

“বিপত্নীক?” জিগ্গেস করলাম

“হু”, পেলাগিয়া ঠান্ডা উত্তর দিলো।

দেমিয়ান লুকিচ, একটানে, যেন রাগের বশেই, টেনে ছিড়ে দিল স্কার্টটা দেহ উন্মুক্ত হতেই দেখলাম যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অবস্থা বহু গুন খারাপ। বা পা বলতে কিছুই বাকি ছিলোনা থ্যাতলানো মাংস এন্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ হাড় ছাড়া. ডান পায়ের অবস্থাও দেখলাম তথৈবচ, হাটু আর গোড়ালির মাঝের হাড় দুটুকরো হয়ে চামড়া ফেড়ে বেরিয়ে এসছে। বলা বাহুল্য, পায়ে কোনো সাড় আছে বলে হলো না।

“তাহলে...”কম্পাউন্ডারটা এটুকু বলেই থেমে গেল।

মুহূর্ত খানেকের মধ্যে সম্বিত ফিরতেই আমি নাড়ি দেখলাম, অতি ক্ষীণ। তাও অনিয়মিত। দেখলাম মেয়েটির ঠোট নীল হয়ে আসছে. হাল ছেড়ে দিতে যাব এমন সময় যেন অতি গভীর থেকে উঠে এলো একটা প্রাণের স্পন্দন।

“ক্যাম্ফোর!” চিৎকার করে উঠলাম আমি। নিজের গলা নিজের কাছেই যেন অচেনা মনে হোলো।

আনা নিকলেভনা বলল--“আর কি হবে! বরঞ্চ শান্তিতে মরতে দিন বেচারীকে!”

“ যা বলেছি সেটা করুন!” আমার বলায় কি ছিল জানিনা কিন্তু আনা আর বাক্যব্যয় না করে একটা আম্পুল ভাঙ্গলো. হলুদ তরল সিরিঞ্জ বেয়ে ঢুকে গেল রোগিনীর শরীরে।

কম্পাউন্ডারকে দেখে মনে হলো সে যেন অপেক্ষা করছে মেয়েটার শেষনিঃশ্বাসের জন্যে।

আরেকবার ক্যাম্ফর দিতে বললাম। বুঝতে পারছিলাম কী এক অজ্ঞাত আলোয় ভরে উঠছে আমার ভিতর অব্দি। আমি জানি, এর মৃত্যু নিশ্চিত। আমার ডাক্তারি ছুরির তলায় এখুনি শেষ হবে এর জীবন। একফোটা রক্ত বাকি নেই যার শরীরে তাকে অপারেশন করে বাচানো অসম্ভব। উফ, এতক্ষণও লাগে একটা জীবন শেষ হতে!

“অপারেশন এর জন্য রেডি করো একে, পা এম্পুট করতে হবে”--আমার নিজের গলা নিজেই চিনতে পারছিলামনা আর। অন্যদের বিস্মিত, বিরক্ত দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে আমি কাজে মন দিলাম। ওরাও আমাকে নাছোড় বুঝে যন্ত্রপাতি গোছাতে লাগলো। মৃতপ্রায় দেহতার ক্ষীণ কিন্তু অটল প্রাণশক্তি দেখে ভগবানকে বললাম--“একে অপারেশনটা শেষ হওয়া অব্দি বাঁচিয়ে রাখো”। টুপির নিচের জমতে থাকা ঘাম আনা নিকলেভনা গজ দিয়ে মুছে নিল আর আমি ডাক্তারি ইস্কুলে শেখা বিদ্যেকে প্রয়োগ করতে শুরু করলাম। দক্ষ কশাইএর মত ছুরি দিয়ে একটা নিপূন ছেদ করলাম উরুতে, বিনা রক্তপাতে ত্বক চিরে ভিতরের পেশী-ধমনী উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। একবার ভয় হলো যদি ধমনী ছিড়ে যায় তাহলে কি করব কিন্তু সেই দুশ্চিন্তাতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তার মাংশ, শিরা ধমনীর জাল ভেদ করতে লাগলাম। ছিন্ন ধমনীমুখ গুলো ফরসেপ দিয়ে বন্ধ করে দিলাম রক্তপাত ছাড়াই...কি যেন “আরটেরিয়া... বলে ছাতার মাথা..”মনে পরলো না কিন্তু ততক্ষণে অপারেশন থিয়েটারের চেহারা বদলে গেছে। এক গাদা ফরসেপ ঝুলছে ক্ষত থেকে, আসিস্টান্টরা টেনে রাখছে মাংস, চামড়া আর আমি শেষ পর্যন্ত ধারালো করাতখানা দিয়ে হাড় কাটতে শুরু করলাম. মেয়েটা মরেনি তখনও. প্রাণের কি আশ্চর্য টান!

অবশেষে লুকিচের হাতে রইলো একখানা কাটা পা আর, টেবিলে এক তৃতীয়াংশ হারানো একটি মেয়ে। কম্পিত বক্ষে আমি ক্ষত সেলাই করতে শুরু করলাম বড় বড় ফোড় তুলে, পুঁজ বেরোনোর জন্যে গজের সলতেও ঢুকিয়ে রাখলাম এক ফাঁকে. মেয়েটার মোমের মত মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম--

“বেঁচে আছে?”

“বেঁচে আছে!” আনা আর কম্পাউন্ডের একসঙ্গে বলে উঠলো।

“অন্য পাটা হাত না দিলে মনে হয় আরো কিছুক্ষণ টিকে যাবে, অন্তত অপারেশন থিয়েটারে মরবে না”।

“প্লাস্টার করো-- ওদের কথাকে গ্রাহ্য করলাম না। অন্য পা প্লাস্টার হলে ওকে বেডে দেয়া হলো।

হাসপাতালের করিডোর দিয়ে কারা যেন সরে গেল। একটা বিস্রস্ত ছায়ামূর্তি দেয়ালে ঠেস দিয়ে ফোঁপাচ্ছিল... আমি একটা ঘোরের ভিতর হাতের রক্ত ধুতে লাগলাম. ক্রমশ শান্তি নেমে এলো।

“ডাক্তারসাহেব নিশ্চই অনেক এম্পুট করেছেন আগে তাই না? আপনার হাত লীয়পল্ড স্যারের মতই!” আনাদের গলায় বিস্ময় আর শ্রদ্ধা স্পষ্ট!

“করেছি খান দুএক”--অকারণেই বললাম মিথ্যেটা। “পেশেন্ট মারা গেলে আমায় খবর দিও”-- বলে ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

অন্ধকার জানলার কাচে একটা বিবর্ণ মুখ ভেসে ছিল। আমি তার দিকে চেয়ে ভাবলাম--“নাহ, আমাকে মোটেই ঠকবাজ দিমিত্রির মত দেখতে নয়।” শুধু মনে হলো যেন বয়েসটা একটু বেড়ে গেছে হঠাৎই। স্টাডি ল্যাম্পের পাশে বসে ভাবলাম শেষবারের মতো একবার দেখে আসি মেয়েটাকে। খানিকবাদেই তো খবর আসবে…

.................................................................................................................................
মাস আড়াই পরের কথা. শীতের ঝকঝকে সকাল। লোকটা এলো, এতদিনে ভালো ভাবে দেখলাম তাকে--পয়তাল্লিশ বছরের সুপুরুষ চেহারা, চোখের দৃষ্টি উজ্জল।লোকটার পিছন পিছন ক্রাচ নিয়ে ঢুকে এলো অপূর্ব এক সুন্দরী। একখানা পা নেই তার, পরনে লাল পাড় চওড়া ঘেরের স্কার্ট। আমার সাথে চোখা-চোখি হতেই তার গালে গোলাপির আভা।

“ মস্কোতে... এই ... এখানে গেলে ওরা তোমাকে প্রস্থেটিক পা লাগিয়ে দেবে...বুঝেছ?” কাগজে ঠিকানা লিখতে লিখতে বললাম।

“চুমো খা ওনার হাতে”--মেয়ের বাবা আচমকাই হুকুম করলো আর আমি এমন হকচকিয়ে গেলাম যে ঠোটের বদলে চুমু খেয়ে ফেললাম কন্যের নাকটিতে!

তারপর সে বাড়িয়ে ধরল একটা নকশাকরা রুমাল। কাচা হাতের সেলাই দিয়ে আঁকা মোরগ একখানা। তবে এইটাই সে এদ্দিন তার বালিশের নিচে লুকাচ্ছিল। রাউন্ড দিয়ে গিয়ে দেখতাম তার বিছানার পাশে রঙিন সুতোর টুকরো টাকরা।

“এ আমি নিতে পারিনা..” বলতেই সে এমন ভাবে চাইলো আমার দিকে যে--!

রুমালটা টাঙিয়ে রেখেছিলাম মুরীয়ভোতে আমার বিছানার মাথায়। তারপরেও ওটা আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছিল বেশ কিছুদিন, তারপর পুরনো হয়ে রং জ্বলে, একসময় হারিয়ে গেল ঠিক যেভাবে ফিকে হতে হতে অদৃশ্য হয় স্মৃতিরা।




অনুবাদক পরিচিতি
বিষ্ণুপ্রিয়া চৌধুরী
আমেরিকার মিশিগানে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন