সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

এঞ্জেলের লণ্ড্রী

লুসিয়া বার্লিন 
আনুবাদ : দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়

বছর খানেক হবে, কিছুটা অদ্ভুত ভাবেই দেখা হতো আমাদের। প্রায়ই । সব দিন যে একই সময়ে তেমনটা নয় । কোনদিন হয়তো বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে । সোমবার । রাস্তার আলোগুলো অন্ধকারের মাপটা ঠিক বুঝতে না পেরে বেশ বিভ্রান্তির সঙ্গে দপদপ করে জ্বলে উঠে আবার নিভে যাচ্ছে । কোনদিন আবার শীতের রোদ মাখতে মাখতে পূব দিকের দেওয়াল ঘড়িতে সাড়ে তিনটে । রাস্তাঘাটে শুক্রবার বিকেলের বাড়ি ফেরার হালকা ব্যাস্ততা ।
কিন্তু যখনই আমি এঞ্জলে পৌঁছাতাম, দেখতাম ঠিক বসে আছেন এক ভদ্রলোক । যেন অনেকক্ষণ এসেছেন, আর ফেরারও কোনো তাড়া নেই । বয়সের ক্লান্তির স্পষ্ট কিছু ছাপ মুখে চোখে নিয়ে বসে আছেন পুরনো বেতের চেয়ারটার বাম দিক ঘেঁষে । সাদা পাটের মতো চুল নেমে গেছে জীর্ণ এক মুখমণ্ডলের দুপাশ বেয়ে । স্থির, গভীর, লালচে দুচোখ । লম্বা চুলের শেষে দিকটা গোলাপি রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো দায়সারা বিনুনি । ফ্যাকাসে লেভি জিন্স ছাড়িয়ে দুটো সরু পা হাওয়াই চপ্পলের খয়ে যাওয়া অবশিষ্টে আটকে আছে। কোথাও যাবার তাড়া নেই । 

মিসেস আরমিতেজ এমনই বয়স্ক হলেও বেশ অন্যরকম ছিলেন। অনেক বছর আগেকার কথা । নিউইয়র্ক । ফীফটিন ষ্ট্রীটের সান -জুয়ান লণ্ড্রী । সেটা ছিল পোর্টোরিকানদের পাড়া । লণ্ড্রীর মেঝে জুড়ে সাবানের ফেনা । আমার মতো যারা সেখানে প্রায়ই আসতো তারা জানতো ঠিক কিভাবে পিচ্ছিল মেঝে থেকে শুকনো শুকনো দ্বীপ খুঁজে নিয়ে দরজা থেকে লণ্ড্রী মেসিন, অথবা সেখান থেকে ড্রায়িং মেশিন পর্যন্ত পোঁছান যায় । আমার বাচ্চারা তখন ছোটো ছোটো । প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে যাই জামা কাপড় কাচতে সেখানে । উনি থাকতেন ফোর-সি’তে, আমার ঠিক উপরের ভাড়াবাড়িতে । একদিন লণ্ড্রী শেষে ফেরার পথে আমার হাতটা টেনে আলিঙ্গনের ভঙ্গীতে একটা চাবি গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, 

‘যদি পরের বার আর দেখা না হয়, আমাকে একটু খুঁজো আমার ঘরে, কেমন?’ 

আমিও নিয়েছিলাম নিঃশব্দে । ক্ষণিক ওনার চশমা পেরিয়ে স্থির শুস্ক চোখে চোখ রাখতে রাখতে দৃষ্টি আবছা হয়ে আসছিলো । আর দেখা হয়নি । মিসেস আরমিতেজ চলে যান সোমবারে । বাড়ির সুপার ওনাকে মৃত অবস্থায় পায়। ঠিক কিভাবে সেটা জানা হয়নি আর । আমিও সান-জুয়ানে আর ফিরিনি কোনদিন । 

মাসের পর মাস আমি আর সেই বয়স্ক রেড-ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক একটা বেতের চেয়ারের দুধারে বসে থাকি, অথচ কোনও দিন একটাও কথা বলা হয়নি । ঠিক যেন ট্রেন স্টেশনের অপেক্ষা । সময় অল্প, তাই আলাপ করে কি লাভ । একটু নড়ে চড়ে বসলে জীর্ণ চেয়ারের আলগা বুননে বেতে বেত ঘষে যাওয়ার আওয়াজে নৈঃশব্দ ভাঙতো। ওনার হাতে ঠোঙায় মোড়া কিছু একটা পানিয়ো থাকতো। আর সব সময় তার চোখ লেগে থাকতো ঠিক আমার হাতে । সরাসরি নয়, আমাদের চেয়ারের উলটো দিকে একটা পুরনো আয়নায় । প্রথম প্রথম আমি কিছু মনে করতাম না । একটা বয়স্ক মানুষ ঝাপসা আয়নার ওপার থেকে আমার হাতের দিকে চেয়ে আছে , তো কি হয়েছে ? দিনের পর দিন লোকটা এক দৃষ্টিতে আমার হাত দুটো লক্ষ্য করেন। লণ্ড্রীতে কাপড় দেওয়া থেকে, একের পর একটা জামা, তোয়ালে গোছানো, গুনে গুনে কয়েন বাছা, টেবিলে পরে থাকা কত বছরের পুরনো ম্যাগাজিনের পাতা ওলটানো, বা সিগারেটে আগুন ছোঁয়ানো, আমি যাই করি, লোকটা শুধু আমার হাতের দিকে চেয়ে থাকেন । তারপর এমন চলতে চলতে, আমার সন্দেহ হতে লাগলো । আমার হাতেই কি কিছু ? তারপর একদিন ধরা পড়ে গেলাম এই অস্বস্তিটুকুর কাছে । আমাদের দুজনেরই চোখ মিলে গেলো সেই পুরনো আবছা আয়নায় । আমি একটু ইতস্থত বোধ করে আয়নায় নিজের সঙ্গে চোখ মিলিয়ে আমার হাতের দিকে তাকালাম । আমার হাতের ক্ষতের দাগ, একাকিত্ব, কনুইয়ের চারপাশ থেকে বাহুমুল পর্যন্ত বয়সের ঝুলন্ত বার্তা । স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমার বাচ্চাদের বেড়ে ওঠা , পুরুষের স্পর্শ, আর একটা ফুলে ভরা বাগান । আমার চোখ আয়নায় নেমে এলে খেয়াল করলাম লোকটার চোখেও অস্থিরতা, আর হাতদুটো গুতিয়ে হাঁটুর আড়ালে আটকে গেছে । অন্যদিনের মতো হাতের কাঁপুনিটা নেই । সব থেমে আছে টানটান ফ্যাকাসে শিরার শক্ত বাঁধুনিতে । 

লণ্ড্রীর বাইরে মিসেস আরমিতেজের সঙ্গে আমার বড় একটা কথা হতো না । একবারই মনে আছে । সে এক অদ্ভুত কাণ্ড । খুব ডাকাডাকি করছেন। বেরিয়ে এসে শুনি ওনার ফ্ল্যাটের টয়লেট থেকে জল উপচে পড়েছে । শুধু তাই নয়; সেই উপচে পড়া জল নিচে আমাদের ফ্লোরের ঝাড়বাতি জুড়ে ফিনকি দিয়ে ঝরছে । ফিলামেন্ট থেকে ছড়ানো আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঝরতে থাকা জল পুরানো বাড়ির ধুলোর সঙ্গে মিশে দেওয়ালে রামধনু রং এঁকে দিচ্ছে মুহুর্মুহু । সেটা দেখতে দেখতে উনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, 

‘সত্যি কি আশ্চর্য, না ?’ সেই ঠাণ্ডা, মৃতপ্রায় হাতের স্পর্শটা আজও অনুভব করি । 

ভদ্রলোকের নাম টোনি । আপাচে রেড-ইন্ডিয়ান । মুলত উত্তর আমেরিকার উত্তরে তাদের পূর্বপুরুষদের বাস ছিল। একদিন আমি কাপড় গোছাচ্ছি, হঠাৎ পেছন থেকে আমার কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ পেলাম । আমি জানতাম ওটা টোনি । ফিরে দেখি তিনটে খুচরো পয়সা হাতে-- আমাকে দিতে চাইছেন । আমি প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম ‘ধন্যবাদ’। তার পরেই খেয়াল করলাম, ওঁর হাতটা ভয়ঙ্কর কাঁপছে । পয়সাগুলো ড্রায়িং মেশিনে দেওয়া ওনার পক্ষে সম্ভব নয় । এমনিতেই মেশিনগুলোতে খুচরো ঢোকানো রীতিমতো কষ্টের ব্যাপার। প্রথমে একটা কাঁটাকে এক চক্কর ঘুরিয়ে এক হাতে আটকে রাখতে হবে, আর অন্য হাতে নির্দিষ্ট খাঁজে পয়সা আটকে রেখে, একটা হাতল দিয়ে সজরে ঠেলতে হবে যাতে সেটা ভেতরে ঢুকে যায় । তারপর আবার কাঁটাটা যেখানে ছিল সেখানে ঘুরিয়ে পরের পয়সাটা ঢোকানোর জন্য তৈরি হতে হবে । এই ভাবে তিন তিন বার । যাই হোক আমি পয়সাগুলো নিয়ে পিছন ঘুরতেই দেখি টোনি নেই । প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে টোনি ফিরল । প্রায় টলতে টলতে । ওর জামাকাপড়গুলো প্রায় শুকিয়ে এসেছিল । আমারও গোছানো প্রায় শেষ । ড্রাইং মেশিনের দরজাটা খুলতে চেষ্টা করল । না পেরে মেশিনের লাগোয়া হলুদ প্লাস্টিকের টুলটায় বসেই যেন নিথর হয়ে গেলো । এঞ্জেল আর আমি ওকে ধরাধরি করে দুজন মিলে পাশের ইস্ত্রি-ঘরে নিয়ে এলাম । মেঝেতে শুইয়ে এঞ্জেল একটা ভেজানো মোজা নিয়ে মাথায় ঘাড়ে ছুঁতে ছুঁতে দরদী গলায় বিড়বিড় করতে থাকল, 

“ভাই আমার, ফিরে এসো।ফিরে এসো। আমি জানি কি হচ্ছে তোমার ? এমন আমারও হয়েছে । কিচ্ছু হবে না। আর একটু ,আর একটু । সব ঠিক হয়ে যাবে । ” 

কার মনের কি খবর কেই বা কতটুকু জানতে পারে । টোনি চোখ খুলছিল না । 

এঞ্জেলের লণ্ড্রী ছিল আল্বুকারকিতে । নেউমেক্সিকোর ফোর্থ স্ট্রীটে । জরাজীর্ণ কয়েকটা দোকান পাশাপাশি । কাঁচের জানালার ওপাশে ধুলোপড়া কিছু জিনিসপত্র, রঙচটা সাইনবোর্ড । বড় বড় হরফে হাতে লেখা--মূল্য ছাড়ের হাতছানি । উলটো দিকে একটা পরিত্যক্ত পারকিং লটে হাজারো আবর্জনা জমা করা রয়েছে । অকেজো গাড়ির পার্টস থেকে বাতিল টয়লেট, কি নেই সেখানে । সেকেন্ডহ্যান্ড জামা কাপড়ের দোকানে সৈনিকদের পুরনো কোট, টুপি, জুতো আর একবাক্স জোড়াহীন মোজা । ওই রাস্তা ধরে দুপা এগিয়েই কয়েকটা সস্তা মোটেল আর এঞ্জেলের লণ্ড্রী । সেখানে নানা রকম লোকের আনাগনা । সবাই যে বয়স্ক তেমনটা নয় । কমবয়সী চিকানা - ইন্ডিয়ান মেয়েগুলোকে দেখতাম । গোলাপি তোয়ালে, ছোট ছোট জামা কাপড়, নাইটি এসবের সঙ্গে সঙ্গে স্বামীদের নীল রঙের কোট কাচত ওরা । কোটের হাতায় বা বুকপকেটে ওদের নাম লেখা থাকতো । ড্রায়িং মেশিনের কাঁচে সেই নাম গুলো ক্ষণিক উঠে এলে,আমি পড়ে ফেলার চেষ্টা করতাম । টিনা, করকি, জুনিওর । 

সর্বস্বান্ত, বাড়িঘর ছাড়া যাযাবর কিছু লোকও আঞ্জেলে আসতো । পুরনো তোশক, বালিশ, জং ধরা চেয়ার আরও যে কতো কি বাঁধা থাকতো ওদের ভাঙ্গাচোরা পুরনো বুইকের মাথায় । ওরা পরনের প্রায় সব জামা কাপড় খুলে লণ্ড্রী করতে দিয়ে গাড়িতে বসে বসে সস্তা পানিও খেত । শেষ হলে কৌটোটা দুমরে মুষড়ে দিয়ে ফেলে দিতো পারকিং লটেই । 

তবে এঞ্জেল আসলে রেড- ইন্ডিয়ানদের জায়গা । বেশির ভাগই পাবলো ইন্ডিয়ান । ওদের বাস সান-ফেলিপে, লাগুনা অথবা সান্দিয়া, এই সব জায়গায় । টোনিই একমাত্র আপাচে ইন্ডিয়ান যাকে আমি চিনতাম । আমি দেখতাম ইন্ডিয়ানদের প্রিয় সব রঙ । গোলাপী, গাঢ় বেগুনি, কমলা, লাল সব জামা কাপড় ড্রায়িং মেশিনের আবছা, আর্দ্র কাঁচে ঘুরপাক খেতে খেতে নানা রঙ্গের বৃত্ত তৈরি করার চেষ্টা করছে । পারছেনা । আবার হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ । 

আমি কি কারণে এখানে আসতাম, ঠিক গুছিয়ে ভাবিনি কখনো । বিশেষত, এটা আমার বাড়ি থেকে বেশ দূরে; শহরের একদম অন্য প্রান্তে । বাড়ির কাছেই ইউনিভার্সিটির সাজানো ক্যাম্পাস । শীততাপ নিয়ন্ত্রিত লণ্ড্রী । মোজাইকের মেঝে যেখানে শেষ, সেখান থেকে উঠে গেছে পাথরের কারুকার্য করা দেওয়াল । নানান দেশের মানুষ সেখানে । ভেন্ডিং মেশিন থেকে উঁকি মারতো কোকো-কোলা, জিরো-বার আরও কত কি-ই । মায়েরা বাচ্চাদের বায়নায় সাড়া দিয়ে কিনে দিতো সেসব । সেখানে সুন্দর ভাবে হলুদ হরফে লেখা ‘আপনার রঙ, আপনার পরিচয়, আমরা বাঁচিয়ে রাখি’। রঙ বাঁচানোর সেই প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে আমি একদিন একটা সবুজ বিছানার চাদর নিয়ে সারা শহর ঘুরে কেন জানিনা সেই এঞ্জেলেই পৌঁছালাম। চাদরটা কদিনেই বেগুনি না হলেও, একেবারে মেঠোসবুজ ফ্যাকাসে হয়ে গেছিলো । তবু আমার এঞ্জেল ভাল লাগতো আর ভালো লাগতো রেড-ইন্ডিয়ানদের রঙ্গিন লণ্ড্রী। আকেজো কোকের মেশিন, অকেজো টেলিফোন, স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে সব আমাকে নিউ ইয়র্কের সান-জুয়ান মনে করিয়ে দিত । বার বার মনে আসতো একটা কথা, 

‘আমি কি বৃহস্পতিবার সান-জুয়ান থেকে ফেরার পথে মিস আরমেতাজকে খুঁজতে যেতাম?’ 

টোনি কাগজে মোড়া জিন-বিমের বোতলে চুমুক দিয়ে আমার হাতের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে , অনেক কথা বলে যেতো অকারণে। 

‘তোমাকে কি বলেছি যে আমি আপাচেদের নেতা ছিলাম ?’ । 

বলতো তবু ওর বউ অন্যদের ঘর পরিস্কার করতো । ওদের চার চারটে ছেলে ছিল । ছোটটা আত্মহত্যা করেছে খুব কম বয়সে । বড়জন ভিয়েতনাম গেছিলো । আর ফেরেনি । বাকি দুজনই স্কুল বাসের ড্রাইভার । আমি তেমন উৎসাহ না দেখালে হঠাৎ বলে উঠত, 

‘তোমাকে কেন পছন্দ করি, জানো ?’ 

আমি যদি বলতাম ‘না , কেন’? 

আয়নায় আঙ্গুল দেখিয়ে বলে উঠতো টোনি ‘তোমার গায়ের রঙ এমন সুন্দর লাল বলে ’ 

আমার গায়ের রঙ লালচে ঠিকই, তবে আমি সেভাবে রেড-ইন্ডিয়ানদের গায়ের রঙ নিয়ে ভাবিনি, আর সত্যি কথা বলতে কি আমি কখনো লাল-রঙ্গা ইন্ডিয়ানও দেখিনি । আমি কিছু না বললে টোনি আবার বলে চলতো, 

‘তোমার নামের উচ্চারণটা ইতালিতে কেমন হবে বলতো ?, লু-চিই-আআ’ 

টোনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালিতে ছিল । ওর গলা ঝুলত বিশাল একটা নামের তাবিজ । খুব সম্ভত ইস্পাতের । একটা বিশ্বযুদ্ধের ঝড় ওর ওপর দিয়ে গেছে সেটা খুব স্পষ্ট বোঝা যেতো । তাবিজটার একদিকটা তোবড়ানো দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম 

‘বুলেট?’ 

টোনি কিছুটা অপ্রতাশিত ভাবে বলে ওঠে 

‘না না । দাঁত । বুলেটের ভয়েই কামড়াতাম তো !’ 

আমরা দুজনেই হেঁসে উঠেছিলাম । কিছুক্ষণ চুপ করে কথায় কথায় টোনি আবার বলেছিল, 

‘আজ বড্ড গরম, চলো আমরা আমার কাম্পারে গিয়ে বিশ্রাম করি,’ 

আমি দেওয়ালে সাঁটা ফ্যাকাসে সবজে রঙের সাইনবোর্ডগুলো দেখিয়ে বলেছিলাম 

‘দয়া করে চলতি ওয়াশিংমেশিন ছেড়ে যাবেন না’। 

খুব হেঁসে উঠেছিলাম আমরা । আবার কিছুক্ষণ সব চুপচাপ । শেষ না হওয়া কথা শুরু হল না আর । শুধু ওয়াশিং মেশিনের আবর্তে জল, কাপড়, সাবন, ফেনা মিশে ছপাৎ, ছপাৎ আওয়াজ স্কানে আসছে । কেমন যেন নোনতা একটা বাতাস; ছন্দময় সমুদ্রের ঢেউ একে একে ছুঁয়ে দিচ্ছে আমাদের পা । টোনি আমার হাত ছুঁয়ে আছে । 

হঠাৎ একটা ট্রেন চলে গেছে কখন অদুরে একটা রেল লাইন দিয়ে । টোনি আমাকে একটু ঝাঁকি দিয়ে বলল-- 

“শুনলে ? ইস্পাতের দৈত্য ঘোড়া !” 

আমরা আবার নতুন করে হেঁসে উঠলাম । আমার কিছু কিছু বদ্ধ ধারণা ছিল । যেমন সব আফ্রিকান চার্লি পার্কারের খুব ভক্ত হবেই , জার্মানরা খুব বাজে লোক , আর এই ইন্ডিয়ানদের হাস্য রসিকতা খুব জঘ্ন্য প্রকৃতির। টোনির সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে সেই ধারণাটা কিছুটা দৃঢ়ই হতো এক এক দিন। সময় কাটতে না চাইলে টোনি আমাকে বার বলে উঠত ‘একটা লোক জুতোর ফিতে বাঁধছিল নিচু হয়ে । আরেক জন পেছনে এক লাথি মেরে বলল ‘তুমি সব সময় তোমার জুতো বাঁধছ কেন ?’ বা ‘একজন ওয়েটার এক ডিস খাবার পরিবেশন করতে এনে, কারুর গায়ে সব খাবার ফেলে দিয়ে বলল ‘যাঃ , আমি আবার ছড়ালাম ?’। বলতে বলতে নিজেই হো হো করে হাঁসতে হাঁসতে চোখের জল মুছত । 

একদিন টোনি খুব টালমাটাল অবস্থায় । মানে পুরোপুরি মাতাল । পারকিং লটে কয়েকটা অকির (অক্লাহামার ইন্ডিয়ান) সঙ্গে একটা ঝামেলা হয়েছে । ওরা ওর জিন বিমের বোতলটা কাড়তে চেয়েছিল । ও মার খেয়েও দেয়নি সেটা । 

আমার লণ্ড্রী হয়ে গেছিল ; কাপড়গুলোকে খুব সাবধানে ড্রায়িং মেশিনের দিকে যাচ্ছিলাম । টোনি সে পথে আমাকে পেয়ে বিড়বিড় করতে করতে এলো। আমার হাতে তিনটে কয়েন গুঁজে দিলো । আমি আমার আর টোনির জামা কাপড় মেসিনে দিতে গেলাম । টলতে টলতে চেয়ারে বসে টোনি খুব চেষ্টা করেও বোতলের ছিপিটা খুলতে পারছিলো না । আমি ফিরে এসে অন্য দিকটায় বসতেই টোনি চীৎকার করে উঠলো-- 

“কেউ জানে না যে আমি আপাচের নেতা ! ভেবেছে কি ? আমার সঙ্গে ইয়ার্কি ?’ 

ছিপিটার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আবার জোরে চেঁচিয়ে উঠলো-- 

‘আঃ , হচ্ছেটা কি?’ 

ওর চোখটা তখনো আয়নায়, আমার হাতের দিকে । কেন জানিনা বলে ফেললাম, 

‘আপাচেদের নেতা, তুমি লণ্ড্রী করতেও পারো না?’ 

আমার হয়তো বলা উচিৎ হয়নি । টোনি একটা ফ্যাকাসে হেঁসে বলল -- 

“ তুমি কোথা থেকে এসেছ, লাল-চামড়ার মেয়ে?” 

আমি একটা সিগারেট বার করে সেটার দিকে তাকাতে তাকাতে, টোনিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম 

“ আমার প্রথম সিগারেট এক রাজপুত্র ধরিয়ে দিয়েছিলো, বিশ্বাস করতে পারো ‘’? 

টোনি কিছুটা তাচ্ছিলের ভাব নিয়ে বলল -- 

“ কেন বিশ্বাস করবোনা ? আগুন চাই? ” 

আমরা মৃদু হেসে চেয়ারে বসতেই, টোনি বাম দিকটায় ঠেস দিয়ে বেহুঁশ হয়ে গেলো। আর আমিও একা হয়ে গেলাম আয়নায় । আমাদের থেকে একটু দূরে একটা মেয়ে বসে ছিল । যেন একটা ঘন এক কুয়াশার ওধারে দেখতে পাচ্ছিলাম ওর অবয়ব একটা আদল । মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে এক স্বল্পদেহি শরীর চেয়ারের সঙ্গে মিশে আছে । যেন কোনও আলাদা অস্তিস্ত্ব নেই । পাতলা কোচকানো চুলের ওধারে মুখ, চোখ দেখা যাচ্ছিল না পরিস্কার । লণ্ড্রী মেশিনের অন্তহীন আবর্তন ওকে আগলে রেখেছিল, তবু ফাঁক দিয়ে যেন এক তরুণ মায়ের সদ্যজাতকে হারানোর কান্না শুনতে পেলাম । আবার নিঃশব্দ ; একটু পরে মেয়েটা জামা কাপড় একটা আকাশী রঙের ঝুড়িতে গুছিয়ে সেই নৈঃশব্দের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেলো । আমি আর টোনি একা তখন লণ্ড্রীতে । আমি আমার আর টোনির জামা কাপড়ের শুকলো কিনা দেখে ফিরে এসে আবার বসলাম । আয়নায় চোখ পড়লো আমার হাতের দিকে, তারপর চিবুক,ঠোঁট হয়ে দেখতে দেখতে আমার নিলাভ চোখের সৌন্দর্যে আটকে গেলাম । দেখতে পেলাম চিলির সমুদ্রতট , ভিনা দেল মার । জাহাজের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠছে শেষ রোদের পাহারায় । আমি একটা ধার করা সিগারেট হাতে ঘুরছিলাম । এক সুপুরুষ যুবককে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে দেখে এগিয়ে গেলাম । একটা আগুন চাইলাম। প্রিন্স এলি খান এক গাল মিষ্টি হাসি হেঁসে বললেন ‘শুভসন্ধ্যা’ । আসলে ওঁর কাছে লাইটার ছিলো না । 

ততক্ষণে এঞ্জেলের লণ্ড্রীতে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । সমস্ত মেসিন থেমে গেছে । রাস্তার আলো গুলো নিশ্চিত ভাবে জ্বলে আছে । ওদের আলো এসে টেবিলে রাখা পুরনো ম্যাগাজিন গুলোতে পড়েছে । আমি আমার জামাকাপড় গুছিয়ে বসেছিলাম । এঞ্জেল ফিরে এলে, বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম । এরপরও অনেকদিন এঞ্জেলে এসেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারিনা কখন ওই বয়স্ক রেড-ইন্ডিয়ানকে শেষ দেখেছিলাম ।




অনুবাদক পরিচিতি
দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মিশিগানে থাকেন।
কবি। ফটোগ্রাফার। বিজ্ঞানী। 

২টি মন্তব্য: