সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

হাড়িকাঠের মেয়েটা


মূল গল্প : ক্যাথলিন কলিন্স 
অনুবাদ কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

আমাদের সংসারের উনোনে আমার বোনটা নিত্যদিন পুড়ত। আমি ওর ছেতরে থাকা হাত ওর ঝুলন্ত পায়ের অস্বাভাবিক চলা ওর জিভ থেকে অকারণ অনবরত লালা গড়াতে দেখেছি। আমি চিৎকার করে উঠেছি আর ওরা ওকে ঘিরে ফেলেছে তুলে ফেলেছে সেই চাদরে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খিঁচুনিতে পড়ে থেকে থেকে ক্লান্তি আর অপরাধবোধের ছাপে ওর মুখটা বিদ্ধস্ত হয়ে ছিল, আমার বোন আমার বোন এক ধূর্ত আর কুৎসিত সাংসারিক বৃত্তের লোকেদের চোখের সামনে আক্রান্ত।

ওর নাম ছিল জোসেফিন। ছোটো ডাকসই করে বলার নরম করে জোসি কিমবা জো ডাকার কখনও ছাড় ছিল না, ওর নাম বলতে হত পুরোটাই অর্থাৎ জোসেফিন। দীঘল চোখগুলো সতর্ক হয়ে থাকত বিপদের আশঙ্কায় মুখটা যেমন ঠেলে অনেকটা বেরিয়ে থাকত ঠোঁটগুলো তেমনই অনেকটা ছড়িয়ে থাকত যেন আরাম পেতে। এক হাড়-চামড়াসর্বস্ব হাঁটুতে হাঁটুলাগা মেয়ে যে খুব কষ্ট করে চেয়ে থাকত আর একদিন তার চোখ উলটে গেল আর ঠোঁটদুটো কাঁপতে লাগল থরথর করে। 

ওর ঘর ছিল সবচেয়ে ওপরতলায় একটা ছোট্ট জায়গা কাঠের ছাদ দেওয়া যেটা নিচে ওর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত। হলদে গোলাপ তার বিছানার চাদরে। একটা চকচকে কালো মেঝে তার পায়ে। ভোরে সে উঠত তাড়াতাড়ি আমাদের আগে দরজার ওপারে গিয়ে বসতে যেন ছোঁ মেরে দৌড় দিত। 

সকালের স্তব্ধতার মধ্যে ওর সরু পাগুলো লাফাত বিছানার বাইরে চোখ টেরিয়ে যেত ও সিঁড়ি দিয়ে পিছলে পড়ত। আমরা সকলে যখন ঘুমোতাম ও শুনত আর অপেক্ষা করত। কে ওকে শুভেচ্ছা জানাবে যখন দরজা খোলা হবে কে ওকে হেসে ভোরবেলা ভালোবাসা জানাবে? আমার বাবা বাথরুমে যাওয়ার পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে ওর ছোট্ট শরীরের ওপরে। দরজার ফাটল দিয়ে ও লক্ষ করে আমার ধীরস্থির মা হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা করতে। 

ও বসে অপেক্ষা করে। কেউ ওর হাত ধরে ওঠাতে আসে না। দিন বয়ে যায়। কিন্তু আগামীকাল ও আবার শুরু করবে তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি আরও তাড়াতাড়ি। 

জলখাবারের সময় ও খাবে না। ওর মাথা পিছন দিকে হেলে পড়বে যখন আমরা লক্ষ করব ততক্ষণে চোখগুলো কোটরের ভিতরে হারিয়ে যাবে। ক্রদ্ধ জনতার মতো আমরা তিনজন অপেক্ষা করব আর নজর রাখব। তারপর ও ফিরে আসবে ধীরে ধীরে ওর মাথা উঠে আসবে ওপরে চোখগুলো ফিরে আসবে নিজেদের জায়গায় ও হাসবে ভয়ে ভয়ে একটা বোকাবোকা বিড়বিড়ানি ওর ঠোঁটদুটোকে বাইরের দিকে অনেকখানি ঠেলে দেবে। তারপর আমাদের বাবা সর্বশক্তি দিয়ে একটা প্রচণ্ড থাপ্পড় মারবে যেটা ওকে ঝাঁকিয়ে দেবে যতক্ষণ না ওর বিড়বিড়ানি থামে টেরিয়ে যাওয়া চোখে স্থির দৃষ্টি নিয়ে ও বসে আমাদের তিনজনের মাঝে একটা তোবড়ানো হাসি উপড়ে বেরিয়ে আসে ওর দুই ঠোঁট ঠেলে। 

আমার বাবা যেদিন আমার মাকে বিয়ে করল আমার বোন তখন তিন বছরের। ও সেই অনুষ্ঠানে লাফাতে লাফাতে গিয়েছিল পাতলা ডানা আর ঠোঁটওয়ালা ছোট্ট পাখির মতো, পুরনো স্মৃতিগুলোই ওকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে এক অতীতের গর্ভ এক প্রাচীন চুমু ওকে ঘুমতে পাঠাত আর ঘুম থেকে তুলত। প্রাচীন কাঁধের উচ্চতায় বসে ও দেখেছিল আমাদের বাবা নিজেকে যুক্ত করছে এক সুন্দরী মহিলার সঙ্গে যার চোখ এক অতি পুরনো চাকরানির, গাল শক্ত আর কালো চুল জড়ো করা তার মাথায় অনেক অনেক অনেক ওপরে। সেপ্টেম্বরের এক উষ্ণ উজ্জ্বল নীল দিনে গাছ আর আকাশের সঙ্গে জোসেফিন তার উঁচু আসনের ওপরে বসে একটা উঁচু ঠোঁটওয়ালা পাখির মত বাতাসের গন্ধ শুঁকছিল একটা পুরনো সুরের জন্যে এক মোটুসোটু গোলগাল মায়ের জন্য -- একবার এক মোটুসোটু গোলগাল মা যে জানলার ধারে বসেছিল আর মরে গেল শুধু যেন কেবল জানলার ধারে বসে ছিল আর মরে গেল। 

ওরা ওকে তুলে নিচে নামালে ও ওর রোগা পাগুলো দিয়ে পেঁচিয়ে আমার বাবার লম্বা ঋজু কাঠামো বেয়ে পাগলের মতো উঠতে চাইছিল শুধু তার মুখটা পর্যন্ত, শেষ একটা আলিঙ্গনের জন্যে সেই উষ্ণ দিনটা ওকে পিষে মেরে ফেলার আগে। আমার একটা মা ছিল আগে -- আগে আমার একটা মা ছিল না। কেউ উত্তর দিল না। সেই কালো চুলের সুন্দরী মহিলা হাসল নিঃশব্দে, একটা বরফজমা হাসি রোগা বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দিল সেই প্রাচীন হাতে যেটা তাকে শেষবারের মত জড়িয়ে ধরল। 

একটা ঘর যেটা কেবল ওর মনের মধ্যেই ছিল, প্রশস্ত আর নীল যেখানে রাতে কেউ আসত তাকে পড়ে শোনাতে। একটা আরামদায়ক মোটা কুশন দেওয়া চেয়ার ছিল যেটা খোলা জানলার পাশে রাখা থাকত আর একটা গ্লাস থাকত ওর কাছে সেই আরামদায়ক চেয়ারে বসা মহিলাকে জল ছেটানোর জন্যে। কেউ একজন ছিল যে ওর নাম ধরে ডাকত জো-সে-ফিন বলে তার মধ্যে একটা হাসি ছিল এক কবোষ্ণ চোখ ছিল আর একটা কোল ছিল দোলা দেওয়ার জন্যে। সেখানেই... ও ওঠে বসত, প্রতিহিংসায় জেগে থাকা এক ছোট্ট ঈগল ছটফট করত ওর স্মৃতির প্রান্তে, যেখানে মৃত্যুর সন্দেহ প্রবল হয়ে যাতায়াত করে করে ওকে বিপর্যস্ত করে তুলত, ফিসফিস করা নারী যে ওর মাথায় বিলি কাটত এক বাবা যার লজ্জিত ভাঙাচোরা মুখ একটা সিঁড়ি সে চার হাতেপায়ে উঠত আর নামত উঠত আর নামত সকলের সামনে যেখানে এক গভীর দুঃখের মুকুট পরে ওর তীক্ষ্ণ ছোট্ট হাতদুটো ডানার মতো উঠত আর নামত। 

কালো চুলের সেই মহিলা ওকে বিছানায় শুইয়ে দিত। তুমি কি আমার নতুন মা ও জিজ্ঞেস করত তুমি কি আমার নতুন মা যখন কাঠের সেই ছাদ ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত ঘুমে আর জাগরণে, জানলায় ওপারে চলে যেত হলদে গোলাপ ও একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত সেই সুন্দর গালের মহিলার দিকে তুমি কি আমার নতুন মা, আর সেই মহিলার কঠোর চোখ ওর নজরে আসে আমিই তোমার মা, তার চোয়াল শক্ত চোখ বড়ো বড়ো। শিশুটি স্থির হয় না ঠাণ্ডা বিছানায় শরীর মোচড়ায় তুমি আমার নতুন মা সে জিজ্ঞেস করে আমাদের সদ্য হওয়া মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সেই নিস্তব্ধ নীল ঘরে এক গেলাস জল চায় সেই মুখ তুমি আমার নতুন মা ও মোচড় দেয় ওর তীক্ষ্ণ ছোট্ট দেহটা স্থির হয় না। 

এই গল্পের উলটোদিকে আছে আরেকটা গল্প, এক সুন্দরী মহিলা যার গালের হনুদুটো উঁচু, এক লজ্জিত মুখের পুরুষ যার দীর্ঘ ঋজু কাঠামো, এক ভালোবাসা আর ভালোবাসার কেবল প্রথা পালন, এক ক্ষতি আর বেদনা... এক সুন্দরী মহিলার মুখে এক পুরনো দাসীর চোখ, এক দীর্ঘকায় মানুষের এক চোখে এক লজ্জাবোধের গল্প। এক পারিবারিক গল্প যেটা তার দৃষ্টিভ্রমের আঙুল ছড়িয়ে দেয় যতক্ষণ না সেগুলো পৌঁছয় এক হাড় জিরজিরে মেয়ের কাছে ওর ওপর তলার ঘরে। 

সুন্দরী মহিলার নাম লেটিশিয়া। সে যখন শরীর মোচড়ানো শিশুটির মা হয়ে আসে তখন তার বয়েস আটতিরিশ। লেস বসানো জামার কলার তার তার গোল্লা গোল্লা চোখ বসানো গোল মুখকে ফ্রেমে বাঁধিয়েছিল, তার পোশাক ছিল ঘন কালো সে হাঁটলে যেটা খরখর করত, তার কঠোর ভাব চার্চের ইস্কুলের শিক্ষিকার মতো যেটা তার উজ্জ্বল করুণাঘন হাসির তলায় ডানা ঝাঁপটাতো মিষ্টি গলা যা পাথরের জিনিসকেও কাঁপিয়ে তুলত, এক অতীতের দাসীর বর্তমান ইতোমধ্যেই স্থির হয়ে গেছিল সেই উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসির পিছনে। 

লেটিশিয়ার মার নাম ছিল সেইডি। এক চওড়া কাঠামোর মহিলা যার মোটা বিনুনি ঝুলত পিছনে আর যার চোখ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের মতো স্তব্ধ। ওর বাবা হুড আকণ্ঠ মদ খেয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকত তার চিবনো তামাকের পিকদানির পাশে আর তার মোদো চেহারার ভিতরে ভিতরেই শুকিয়ে যেত দিনের পর দিন। ওর এক বোন ছিল ল্যাভিনিয়া, চিটবাদামের মতো ভঙ্গুর এক হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো যোগ ছিল তার লেটিশিয়ার সঙ্গে, যেন এক পিঁপড়ের সঙ্গে বিরাট ওকগাছের যোগ। 

দীর্ঘ ঋজু মানুষটা হল রোল্যান্ড। তার বয়েস বত্তিরিশ -- আটতিরিশের সঙ্গে তার ছয় বছর ব্যবধানের ভারসাম্য সে রাখল এক সদ্যোজাতের বেদনার মোচড়ানিতে। এই ছবছরের ব্যবধান তার লেগে থাকার স্বভাবের জন্য বিগড়ে যায়নি। লোকটা নিজেকে দেখাত যে, সে যেমন দেখার মতো সুন্দর কথার ভঙ্গিতেও তেমনই কঠোর আর তার্কিক। এই নিষ্কণ্টক যাপনের নিচে ছিল বিশৃঙ্খলা, একেবারে অগণিত বিশৃঙ্খলা একটা চাক বানিয়েছিল রাগ আর দুঃখের। 

ওর বাবার নাম ছিল জেরেমি এক অদূরদর্শী পাগলাটে লোক যে তার পাঁচ ছেলের ওপরে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ, সেই ঝড়েই তার ঘর ভেঙেছে ছেলেমেয়েদের ছড়িয়ে দিয়েছে, এক শূন্যতার হাহাকার তাদের সবার মনের মাঝখানে। তার মা এলা এক বড়সড় চেহারার মহিলা যার ঘন খয়েরি মেহগিনি রঙের চুল পেঁচিয়ে তুলে শক্ত করে বাঁধা। সে জেরেমির ঘোলাদৃষ্টির কেন্দ্রে থাকা এক কঠোর অনড় মানুষ। 

এরা সকলেই নিগ্রো, কী অন্ধকার এক অসুখী জীবন, কী হতাশাজনক এক বোধ যে গাঁথা ছিল এই নিষ্ঠুর পারিবারিক ছবিতে কে বলবে কিন্তু এই সব্বাই নিগ্রো। 

মৃত্যু এই ছবিতে জায়গা করে নেয়, এক সুন্দরী নারী যার মধ্যে কোনও ক্লান্তির চিহ্ন নেই -- এক শীতল হাসি তার ঠোঁটে আর ভুরুতে, মৃত্যু আঁকা থাকে সেই ছবিতে যেখানে যুদ্ধ হঠাৎ থেমে যায় এক মিষ্টি প্রবল শক্তির জীবনের সঙ্গে, মৃত্যু স্থান করে নেয় এই ছবিতে আর এক মা এক মামণি -- স্বর্গের ভগবান আশীর্বাদ করে এক মায়ের সঙ্গে সংযোগে। 

জোসেফিনকেই আমরা আমাদের ক্ষতগুলিকে বহন করানোর জন্য বেছে নিয়েছিলাম যে চোখ উলটে বিড়বিড় করে সংশয়ে ভোগে পিন কুশনের মতো যার চারপাশ দিয়ে পিন বেরিয়ে থাকে জোসেফিনকেই আমরা বেছে নিয়েছিলাম ওর তীক্ষ্ণ কান্না আর অঙ্গভঙ্গি ওর খিঁচুনি লাগা নিয়েই এই জোসেফিন -- ওকে আমরা বেছে নিয়েছিলাম। 

সেই ক্ষত তার বাতাসে ঘুষি মেরে ড্রাম বাজানোর কঠিন ও চিৎকার আমাদের বাবার জন্য ও চিৎকার করত -- আমি ঘুমতে চাই না আমাকে ঘুপ পাড়িয়ো না -- এক ফাঁপা ডানা ঝাপটানো বাবার অনুপস্থিতিকে সরাতে একজোড়া গোল গোল চোখ যা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর অপেক্ষা করছে তাকে সরাতে -- আমি ঘুমতে চাই না ও চিৎকার করে ওর ছোট্ট ডানা ঝাপটায় খিঁচুনি লাগে চোখ উলটে যায় সেই চোখে সে লক্ষ করে -- আমি ঘুমবো না ও চিৎকার করে সেও গোল গোল চোখ পাথরের মতো শক্ত হয় কেবল যন্ত্রণা পড়ে থাকে, চায় ও স্থির হোক কেবল যন্ত্রণাটুকুই পড়ে থাকে ও চায় ও যাতে স্থির হতে পারে। 

যন্ত্রণার গোঙানির বদলে লেটেশিয়ার মাথায় ওর নাচের মতো ডানা ঝাপটানো তাকেও আহতের দলে নিয়ে আসে। 

বাড়িটা শান্ত ছিল রোদ্দুর ঘুরে বেরাচ্ছিল ভিতরে বাইরে বাচ্চাটা ঘুমচ্ছিল। জোসেফিন খাট বেয়ে নামে সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে দেখতে স্তব্ধ আর শান্ত তার হাত ধরে ওর কড়ে আঙুল একবার আগুপিছু করে তার মুখ ছোঁয় বাচ্চাটা চোখ খোলে না ওর মোচড়ানো শরীর নিয়ে বেয়ে ওঠে বাচ্চার ঘেরা খাটে আর স্মৃতিহীন মাংসপিণ্ডের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। 

কে লক্ষ রাখবে এক নতুন নারীর ওপর তার আঁটসাঁট জামা উজ্জ্বল লাল ঠোঁট গোল চোখ ঘোলাটে আর দুর্বল সে এঘর ওঘর করে ওপর নিচ করে নতুন বাড়ির বারান্দায় অতীতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। এক নতুন নারী নজর রাখে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে অনভ্যস্ত ভাবে নজর রাখে আমার বাবার জোরালো উপস্থিতি সেই আশ্চর্য ঘরে যেখানে স্যাডি আর হুড নেই। এক নবাগতা নারী লক্ষ রাখে এক মৃদু কিন্তু কঠোর শব্দের ওপর যখন সে হাঁটে মিষ্টি ফিসফিসানির মধ্যে যখন সে হাঁটে এক নবাগতা নারী নজর রাখে ভোঁতা মরচের ওপর আমাদের চকচকে উন্মাদনার জন্যে। 

বাড়িটা শান্ত। জোসেফিন ঘুমোচ্ছে বাচ্চাটার পাশে, লেটিশিয়া বসে কুরুশ বোনে বিকেলের রোদে। সামনের দরজা খোলা যাতে সে দরজাটা পেরতে পারে জোসেফিন জেগে ওঠে মোচড় খেয়ে সিঁড়ি দিয়ে পিছলে নামে তার হাতের মধ্যে। রোল্যান্ড তাকায়। লেটিশিয়া দরজার সামনে আসে। বাচ্চাটা শুরু করে নড়াচড়া ওর চোখে ঘুরতে শুরু করে ওর মাথা পিছনে ঝুঁকে যায় আবার সামনে আসে বাচ্চাটা নড়াচড়া করতে শুরু করে। রোল্যান্ড তাকায়। লেটিশিয়া দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। বাচ্চাটা নড়াচড়া করে জিভ বের করে চিৎকার করে ছটফট করে একটা অকাজের বাঁদরের মতো বাচ্চাটা নড়াচড়া করে। রোল্যান্ড দেখে। লেটিশিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাচ্চাটা নড়াচড়া করে জিভ বের করে চিৎকার করে ছটফট করে একটা আকাজের বাঁদরের মতো বাচ্চাটা নড়াচড়া করে। রোল্যান্ড দেখে। লেটিশিয়া দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। বাচ্চাটা নড়াচড়া করে একটা রাঁধার পাত্র ওদের চোখের সামনে দীপ্ত হয়ে ওঠে রোল্যান্ড যায় মেয়েটাকে হাতে তুলে নেয় নিয়ে যায় তার ঘরে। বাচ্চাটা উঠে গেছে সে দরজা বন্ধ করে হলুদ গোলাপের ওপর বসে বলতে শুরু করে, একটা মা দরকার ছিল -- একটা মা, ওর মুখ দোমড়ানো অপরাধবোধ আর দুঃখে, একটা মা দরকার ছিল -- একটা মা, সে কাঁদতে শুরু করে। ঘরটা স্তব্ধ জোসেফিন তার শরীর মোচড়ানো থামিয়ে দিয়েছে সহজেই শেষ পর্যন্ত বন্ধ দরজার পিছনে, সে তার পরিচিত বেদনার গন্ধ আর ভুলবোঝাবুঝির মধ্যে ভেসে চলে সহজেই শেষ পর্যন্ত তার সেই ভয়ানক জায়গাটায় যেখানে কেবল তারা তিনজন যেতে পারত কেবল তারা তিনজনই যেতে পারত। 

শরীরে ক্ষত নিয়েই ও আমাদের কষ্টগুলো বহন করত সেইখানেতেই যুদ্ধগুলো লড়া হত ওর শরীরে আরও এক রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র উঠে আসত ওর বিক্ষত শরীরে ও আমাদের বেদনাকে বহন করত অকস্মাৎ ছায়ার থেকে বেরিয়ে বা ছায়ায় ঢেকে এক ছোট্ট সৈন্যের মতো। 

লেটিশিয়া আর রোল্যান্ডের মধ্যে কোনও কিছুই গড়ে ওঠে না। দেয়াল ওঠে, বাড়ি ভিতর থেকে বন্ধ কিচ্ছু নড়ে না। সব গতি আসে জোসেফিনের থেকে। মুখে বুড়ো আঙুল গোঁজা ওর দেহ কেঁপে ওঠে সব গতিই আসে জোসেফিনের দিক থেকে। 

ও সব সময়েই পায়ের তলায় দাবানো নিজেকে ঘুরিয়ে দেয় স্নায়ুবিকারের আর হেরে যাওয়ার একটা ধোঁয়াটে পর্দার দিকে, ও একটা ঝোপঝাড়ের উঠোন যেটাকে আমরা নিড়োতে পারি। 

ও সব সময়েই পায়ের তলায় দাবানো লড়াইয়ের উত্তাপে ও দুই দিকের হয়েই যুদ্ধ করে লেটিশিয়াকে সাহায্য করে পা ছুঁড়ে আর রোল্যান্ডের এগিয়ে থাকা শরীরে শক্ত ছোট্ট হাতের ঠেলায়। 

ও সব সময়েই পায়ের তলায় দাবানো এক শরীর মোচড়ানোতে যা মৃত স্মৃতিদের জাগিয়ে তোলে আর ড্রামের আওয়াজকে। 

তারপর একদিন ও ফেটে পড়ল। ওর ছোট্ট পা উড়ে গেল ওর জেদি হাত ওকে আকাশে নিয়ে গেল ওর মাথা খটখট করে দুলতে লাগল ওর শ্রমক্লান্ত চোখ কোটর থেকে উড়ে গেল এক হঠাৎ আসা অস্থির হাওয়া ওকে ছিন্নভিন্ন করে দিল অনেক যুদ্ধ ওর মাটিতে হয়েছে ও আর স্থির থাকতে পারে না। একসঙ্গে সবাই মিলে ওদের ওকে আটকাতেই হত। সবাই মিলে সেই সুন্দরী কঠিন চোখের মহিলা সেই উষ্ণ বাবা যুক্ত ছিল অতীতের সময়ে তাদের ওকে আটকাতেই হত যতক্ষণ না ওদের অস্বস্তিকর সহাবস্থান ওর গায়ে সেঁটে যায়।


অনুবাদক : কণিষ্ক ভট্টাচার্য

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন