সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

প্রশান্ত মৃধা'র গল্প : চোখ জ্বলছে

... আমার চোখ জ্বলছে। চোখ খুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু সিএনজি অটোরিকশার সামনে ড্রাইভারের বাম পাশে বসে না তাকিয়ে উপায় আছে! চোখ বন্ধ করে রাখি কীভাবে? রাস্তা সরু কিন্তু সমতল। জানি একটুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলেই ঝিমুনি আসবে। এই অচেনা বাঁকা রাস্তায় মাঝে মধ্যে দুই-একটি ছোট্ট টিলার ভিতরের সরু রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমি চাইলেই কি চোখ খুলে রাখতে পারি? এ পথ আমার অপরিচিত। সকালে শিবপুর ফেরিঘাট এসেছিলাম। এখন ফিরে যাচ্ছি।

জ্বলতে-থাকা সরু চোখ দুটো খুলে চারপাশ দেখি। সামনে গোপালগঞ্জ... না, না না না, সামনে গোলাপগঞ্জ। গোলাপগঞ্জ নেমে কোনওএকটা রেস্টুরেন্টে চোখে পানির ঝাপটা দেব। তাতে নিশ্চয়ই জ্বালা-করা কমবে। হয়ত কমবে না। কাল সারারাত ঘুমাইনি। ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। রাজবাড়ি হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এসেছিলাম। সেখান থেকে নাইট কোচে সরাসরি সিলেট। সিলেট নেমে তারপর ঠাকইকে এসএমএস দিলাম। কারণ ততক্ষণে আমি সিম পালটেছি। ঠাকই মানুষের নাম হয় এটা আমার জানা ছিল না। কাল সন্ধ্যায় ভাঙ্গা থেকে ঢাকাগামী বাসে ওঠার পর জাজিরার কাছাকাছি আসতে আসতে প্রথম জানলাম ঠাকই একজন মানুষের নাম। সে সিলেটে থাকে। কিন্তু সিলেটের কোথায় থাকে তা আমার জানা নেই। সিলেট দেখতে কেমন, সিলেটে কোথায় বাস থামে-- এসব তখনও আমার জানা ছিল না। আবার নিজের এতদিন ব্যবহৃত সিম দিয়ে কাউকে ফোন করব সে উপায়ও আর নেই। আমাকে শুধু বলে দেওয়া হয়েছে, আমি যেন এখনই সিলেট চলে যাই। সিলেটে ঠাকই আমাকে জানাবে এরপর কী করতে হবে। ঠাকইর দুটো ফোন নাম্বার একটি সিগারেটের বাকসোর গায়ে লিখে আমার হাতে দেয় মুন্না। সঙ্গে এও জানায়, আমার নতুন সিমে ঠাকইর ফোন নাম্বার দুটো এসএমএস করে দিচ্ছে। পথে নেমে এই সিগারেটের প্যাকেটেই নতুন সিগারেট কিনে ভরে নিতে হবে। কোনওভাবেই প্যাকেটটা হাতছাড়া করা যাবে না। কেননা, ওই সিম যদি কোনও কারণে কাজ না করে তাহলে আমি ঠাকইর নাম্বার পাব কোথায়? 

আমি মুন্নাকে তখন বলেছিলাম, ‘ঠাকই আবার মানষির নাম হয় নিকি?’ শুনে, মুন্না হেসেছিল। বলছে, ‘হয়। সিলেটে লেবু কলা নুনু ছামা এসবও নাম হয়। এমনকি ধন নামেরও মানুষ আছে।’ ধন কথাটা একটু টেনে বলল। সেই মুহূর্তে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ার কোনও সুযোগ ছিল না। তাছাড়া আমি আগে কখনও সিলেট আসিনি। মুন্না এসেছে। গোপালগঞ্জে ঠাকইর কাছেই এসেছিল। ফলে মুন্নার কথা মেনে না-নিয়ে উপায় ছিল না। অনুমান করে নিয়েছিলাম, সত্যি সত্যি ঠাকই নামে একজন মানুষ আছে। 

কিন্তু সেই ভোর রাতে সিলেট বাসস্ট্যা-ে নেমেই আমি ভেবেছিলাম, ঠাকইর দেখা পাব। নতুন সিম দিয়ে ঠাকইকে ফোন করতে করতে ভেবেছি, সে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে কোথাও থাকে। কিন্তু সেই সকালে ঠাকই জানায়, আমাকে গোলাপগঞ্জগামী কোনও সিএনজিতে উঠতে হবে। বাসে যেন কোনওক্রমে না উঠি। বাস পথে পথে দাঁড়াবে। সিএনজি পাওয়া যাবে বান্ধের কাছে। একটা রিকশা নিয়ে আমাকে বান্ধ পর্যন্ত আসতে হবে। এই জায়গাগুলো যেমন বান্ধ, হেতিমগঞ্জ-- এসব তখন আমার প্রথম শোনা। গোলাপগঞ্জ জায়গাটার নাম আমি আগে শুনেছি মুন্নার কাছে। সেটা অবশ্য বারবার গোপালগঞ্জ হয়ে যাচ্ছিল। মুন্না জাজিরায় নেমে যাওয়ার আগে বলেছে, একটা কাছের এক জেলার নাম, অন্যটা সিলেটের একটা থানা। তো ঠাকই বলেছে, বান্ধ থেকে সিএনজিতে উঠে সরাসরি গোলাপগঞ্জ নামতে। পথে সিএনজি হেতিমগঞ্জ থামলেও থামতে পারে। আমি যেন কোনওভাবেই রিজার্ভ সিএনজিতে না-উঠি। অবশ্যই আমাকে লাইনের সিএনজিতে উঠতে হবে। 

সিএনজিতে উঠে আমি ডান পাশের সিটে উঠে বসেছি। তখন ড্রাইভার আমার কাছে জানতে চায়, ‘কই যাইতায়?’ কথাটা শুনেই বুঝে উঠতে পারিনি আমি। প্রায় ঠোক্কর খাওয়ার দশা। অথচ ঠাকই বলেছে, বান্ধে যে সিএনজি পাই তার একটায় উঠতে। এগুলো হয়ত বিয়ানীবাজার বিয়ানীবাজার বলে ডাকবে অথবা ডাকবে গোলাপগঞ্জ গোলাপগঞ্জ বলে। আমি যে-কোনওটায় উঠে যাব। তারপর গোলাপগঞ্জ এলে যেন নেমে যাই। ড্রাইভার ওকথা জানতে চাইলে আমি বলি, গোলাপগঞ্জ। সে বলে, তাহলে যেন ওই সামনের খানে উঠি। সামনের সিএনজিতে ততক্ষণে চারজন উঠে গেছে। আমি ড্রাইভারের ডানে উঠি। ভেবেছিলাম পিছনে বসে চোখ দুটো একটু বুজব। সে উপায় হল না। সারা রাত কোনওভাবেই চোখের দুই পাতা এক করিনি। এখনও সে সুযোগ হল না। বাস পৌঁছতে দেরি করেছে। জাজিরায় ফেরির অপেক্ষায় ছিল। মাওয়া ঘাটে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। সে সময়ে বাসের ধারে-কাছে যাইনি। এপারে এসে বাসটা চলতে শুরু করলে সুপারভাইজারের পিছনে পিছনে লাফিয়ে উঠেছি। আর ভেবেছি, কতক্ষণ বাস ঢাকা ছাড়িয়ে সিলেটের রাস্তায় পড়ে। কিন্তু নরসিংদি আসার পরে ফোনে মুন্নার মেসেজ আসে, ঠাকইকে এসএমএস দেওয়ার জন্যে। কিন্তু আমি ঠাকইকে এসএমএস দেবে কি উলটো ঠাকই এসএমএস দিয়ে জানায়, সাবধান। পথে কারও সাথে আলাপ করার দরকার নেই। আমি ‘ওকে’ লেখার পর আবার মেসেজ আসে। যে হোটেলেই থামুক না কেন, আমি যেন ভিতরে না ঢুকি। তখন বেশ খিদে পেয়েছিল। কিন্তু আমি কিছু খাইনি। ওই শেষ রাতে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে পরপর তিনটে সিগারেট টেনেছি। হাতের ছোট্ট বোতলের পানিটুকু শেষ করে একবার ভেবেছিলাম, ভিতরে ঢুকে এক বোতল পানি কিনি। পরে কী মনে করে তাও কিনিনি। এবারও বাস প্রায় রাস্তার কাছাকাছি এলে সুপার ভাইজারের সঙ্গে উঠে পিছনের দিকে নিজের সিটে বসে চোখ বুজি। আর তখন আবার ঠাকইর এসএমএস, ঘুমানো যাবে না। লোকটা যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে চলছে। 

ঠাকইর নির্দেশমতো গোলাপগঞ্জ নেমে আসি একটা ইলেকট্রিসিটি খাম্বার গোড়ায় দাঁড়াই। খেয়াল করি কোন খাম্বার নীচে দুটো ভিত্তিপ্রস্তর আছে। পেয়ে যাই। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ডান হাতে নিই। তখনই আমার পাশে এসে একটা মোটোর বাইক দাঁড়ায়। আমার কাছে শেষ চারটি নাম্বার জানতে চায়। প্রথমে মনে আসছিল না। সিমটা কাল সন্ধ্যায় হাতে পেয়েছি। মনে থাকার কোনও কারণ নেই। তবু বার কয়েক ভেবে শেষ তিন ডিজিট বলি : ফোর থ্রি ফোর! মোটোর বাইকঅলা সন্দেহের চোখে তাকাতে তাকাতে বলে, তার আগেরটা? আমি সিগারেটের প্যাকেট থেকে ঠাকইর নাম্বার দেখাই। বলি, ঠাকই পাঠিয়েছে? সেও বলে, হ্যাঁ, ঠাখ্ই। না, তাও না, ক/খ-এর মাঝামাঝি। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি, কলা? বলেই হাসি। আগে মানুষের নাম, লেবু শুনেছি। কলা কখনও শুনিনি। কলা আমাকে তার মোটোর বাইকের পিছনে বসতে বলে। যদিও মুন্না বলেছিল, সিলেটে সে কলা নামের একজনকে দেখেছে। আমার হাসিটা কলা বোঝে। আমি তার মোটোর বাইকের পিছনে বসামাত্র সে জানায়, তার কলা নাম বাড়ির কেউ রাখেনি, রেখেছেন পাড়ার লোকজন। শুনে আমার আর তাকে প্রশ্ন করা হয় না। সে সুযোগও ছিল না। কেননা কলাই আমার কাছে জানতে চায়, আমি আখনি খাব না পরোটা না সেঁকা রুটি? আখনি শব্দটা এই প্রথম শুনলাম। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। ফলে তা নিয়ে কিছু না-বলে আমি বলি পরোটা হলেই ভালো। তারপর, একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ায়। আমি রেস্টুরেন্টটার নাম পড়ি। নীচে গোলাপগঞ্জ লেখা দেখি। কলা ভিতরে ঢুকে আমার জন্যে তিনটে পরোটা আর একটা ডিমের অর্ডার দেয়। তারপর সেগুলো একটা পলিথিনের ব্যাগে নিয়ে বেরিয়ে এসে আবার মোটোর বাইক স্টার্ট দেয়। আমি শুধু জানতে চেয়েছি, কোথায় যাব। কলা বলে, শিবপুর। 

এখন শিবপুর থেকে ফিরছি। সবমিলে প্রায় ঘণ্টা চারেকের জন্যে শিবপুর যাওয়া। শিবপুর ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছে বুঝলাম, জায়গাটাকে কেউ কেউ শিকপুরও বলে। আমি এখানে একটা ছোট্ট টংঘরে বসেছিলাম। সামনে ডাব বিক্রি করে। দাম জানতে চাইলাম। যা দাম চাইল, তা যশোর-কুষ্টিয়ার চেয়ে একটু বেশি। এ তো ডাবের এলাকা নয়, দাম বেশি হবে, তাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দাম জিজ্ঞাসা করায় একটা সমস্যা হল। আমার কাছে একজন জানতে চাইল, আমার বাড়ি কোথায়? আমি যশোর বলার পরে, ফেরিঘাটে শসা বিক্রি করে একটা ছেলে বলল, ঠাকই ভাইর মেহমান! তারপর কলার নাম করে কী সব বলল। এত দ্রুত যে কথা আমি বুঝতে পারলাম না। 

এখানে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সকাল দশটা। আমি মোবাইলে সময় দেখলাম। কলা আমার জন্যে আল আমিন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে যে নাস্তা কিনেছিল, সেগুলো তার মোটোর বাইকের হ্যান্ডেলেই ঝুলানো রয়ে গেছে। সে আমাকে নামিয়ে দিয়ে কোথায় গেল ঠিক বুঝতে পারলাম না। আর, এই টের পেলাম গোটা রাত্তির জাগরণে এখন আমার চোখ জ্বলছে। 

একটু বাদেই সেই শসাঅলা ছেলেটি আবার আসে। যে-টংঘরটায় আমি বসে আছি তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত নেড়ে বলে, ‘ও ভাইসাব, আমরার লগে আউক্কা।’ এ কথায় আমি ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ‘ও ভাইসাব’ আর ‘আমরার’-- এই দুটো কথার অর্থ আমি বুঝতে পেরেছি। ছেলেটি আবারও বলে, ‘আউক্কা?’ তারপর হাত নাড়ে ও হাসে। এক হাতে তার শাসার ডালা। 

আমি উঠে ছেলেটার পিছন পিছন যাই। একটা রাস্তা ফেরিঘাটের দিকে নেমে গেছে। উপরের দিক দিয়ে আর একটি রাস্তা, পিচঢালা ও সরু। ছেলেটি সেই পথ ধরে এগিয়ে যায়। একটু এগোলে একটা মুদির দোকান। তারপর ভাতের হোটেল। সেখানে ভিতরের দিকে উপরে একটা টেলিভিশন। সবাই প্রায় উলটো ঘুরে সেদিকে চোখ দিয়ে আছে। এত জোরে টেলিভিশনটা চলছে যে রাস্তা থেকেই সংলাপ শোনা যায়। 

আমি শসাঅলা ছেলেটার পিছন পিছন ওই পর্যন্ত পৌঁছতেই কলা ওই হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। হয়ত আমার ব্যাপারে কোনও আলাপ করতে ঢুকেছিল। শসাঅলা ছেলেটি চলে যায়। কলা হোটেলের কাকে যেন গলা তুলে ডাকে। তারপর সে কলার সঙ্গে আসে। এরপর হোটেলের সঙ্গে পিছনের দিকে একটি ছোটো ঘর খুললে, চারদিকে একবার তাকিয়ে কলা আমাকে নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়ে। হোটেলের লোকটা দরজা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে চলে যেতে লাগলে কলা বলে, ‘প্লেট লাগত।’ 

একটু বাদে প্লেট আসে। সঙ্গে পানির বোতল। কলা প্লেটে পরাটা ও ডিম ভাজি বাড়ে। তারপর আমাকে খেতে বলে। আমি বলি, একটু হাতমুখ ধোয়া লাগত। কলা মোবাইল টেপে। হোটেলের লোকটা আসে। তারপর কলা খাটের ওই মাথায় টয়লেট দেখিয়ে জানতে চায়, ওখানে পানি আছে কি না। আমি খাটের পাশের সরু পথ দিয়ে টয়লেটে যাই। ঢুকেই পানির ঝাপটা দিই। চোখ জ্বালা-করা কমে। টের পেয়েছি, সারা রাত্তির জাগরণে আর জার্নির ক্লান্তিতে আমার খিদে লাগছে না, কিন্তু আমাকে খেতে হবে। খেতেই হবে। খুব ভালো হয় যদি খাওয়ার পরে এক কাপ চা খেতে পারি। কলাকে বললে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবে। একবার ভাবলাম, কোনওপ্রকার নি¤œচাপের উদয় হচ্ছে না কেন? টেনশনে। নাকি জার্নিতে? সামনে কমোড। সেদিকে তাকিয়ে থাকি। অপরিস্কার! নোংরা কিন্তু দুর্গন্ধ নেই। কে থাকে এই ঘরে? নিশ্চয়ই এই হোটেলের কেউ। নাকি ঠাকই-কলা আর এদের সাঙ্গপাঙ্গরা। এখানে মৌজমাস্তি করে? চোখে আবার পানি দিই। ঘাড়েও ভেজা হাত বুলাই। তারপর টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসি। 

এই ঘরে কোনও গামছা নেই। পকেটে রুমালও নেই আমার। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে কলার সামনে থেকে পরোটার প্লেট নিই। এই সময় কলা (সম্ভবত ঠাকই-কে) কাকে যেন ফোনে জানায়, কোনও সমস্যা নাই। আউক্কা একটু বাদে--। তারপর আমার কাছে জানতে চায়, ‘চা খাইতানি?’ 

আমি বুঝি সে জানতে চেয়েছে চা খাব কি না? বলি, ‘সিলেট আসলাম, আর চা খাব না?’ 

সে বলে, ‘ইতা চা সবই একই। গোলাপগঞ্জে চা বাগান নাই।’ 

কলা মোবাইল টেপে। আমার মনে হয়, ঠাকই এখনও এল না কেন? মুন্না বলেছে, ঠাকই আমাদেরই বয়েসি। এর আগে মুন্না যখন একবার এসেছিল, ঠাকইর কাছে ছিল, এই গোলাপগঞ্জে। এ সময় কলা পাশের একটা জানালা খোলে। এতক্ষণে বুঝলাম ঘরটা বেশ উঁচু জায়গায়। এখান থেকে নীচে নদী দেখা যায়। পানি একদম তলানিতে। এই দিকের জানালার বেশ নীচে জমি। কেউ নীচ থেকে জানালা দিয়ে তাকাতে পারবে না। অথচ এই জানালা দিয়ে নীচের সবই দেখা যাবে। এই নদীর নাম কুশিয়ারা, মুন্না বলেছিল। ফেরি দেখা যায়। ফেরি এখন ওপারে। এদিকের নদীতে নাকি জোয়ার ভাঁটা হয় না। মুন্নার কাছে একথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। নদী তাতে জোয়ার ভাঁটা হয় না, এমন কোনওদিন শুনিনি। একবার নদীটাকে দেখতে পারলে হত। কিন্তু আমি তো জানি না, আমাকে ঠাকই এখান থেকে বাইরে বের হতে দেবে কি না। 

না, আমি ঠাইর হাতে বন্দি নই, ওর অনুমতি দেয়া না-দেয়ায় কিছু আসে যায় না। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি ঠাকইর জিম্মায়। ও যা ভালো বুঝবে নিশ্চয়ই তাই করবে। এটা নিরাপত্তার প্রশ্ন। 

কলা জানায়, না কোনও অসুবিধা নেই। আমার কাছে সিগারেট লাগবে কি না জানতে চায়। তারপর মোবাইলে মিসড্ কল দেয়। হোটেল থেকে একটা লোক আসে। কলা চা দিতে বলে আর তার কথা বলে কোনও এক সুলতানের দোকান থেকে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট আনতে বলে। আমি বলি, গোল্ডলিফ। পরোটার শেষ টুকরাটা মুখে দিতে দিতে খাটের উপর রাখা গোল্ডলিফের প্যাকেট দেখাই। 

একটু বাদে চা আসে। চায়ে চুমুক দিয়ে আমি সিগারেট জ্বালাই। সঙ্গে সঙ্গে পেটের ভিতরে মোচড় দেয়। আমি বুঝি, আমাকে টয়লেটে যেতে হবে। 

ওদিকে কলা চলে যাবে। আমাকে রেস্ট নিতে বলে সে ওঠে। বলে যায়, কেউ আসলে যেন দরজা না খুলি। ঠাকই আসলেও না। ঠাকইকে বলতে হবে, আমার ফোনে কল দিতে, তারপর দরজা খুলব। এসব কলা আমাকে মনোযোগসহ শেখায়। আমি ভাবি, এই সবই আমার জানা আছে। তবু কলার সিলেটি কথা শুনতে আমার ভালো লাগছিল। মাঝে মাঝে আমাকে বোঝানোর জন্যে সে একটু বইয়ের ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু তা শুনে আমি হাসিনি। কলা দরজা আটকে দিতে বলে বেরোনোর সময় জানায়, ঠাকই বারোটার দিকে আসবে। জকিগঞ্জের দিকে গেছে আমার জন্যে। আমি ভিতর থেকে দরজা আটকে মোবাইলে দেখি বাজে দশটা আটতিরিশ। তারপর টয়লেটে যাই। 

আমি জানতাম অথবা জানতাম না, কিন্তু টয়লেটে গেলেই তা ঘটল, আমি কেন এখানে, সেই পিছনের কথাগুলো মনে পড়তে শুরু করে। কিন্তু আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, এসব কিছুই ভাবব না। যদিও জানি সে সবই আমাকে তাড়া করে ফিরছে। ফলে চাইলেই এর কোনওকিছুই মাথা থেকে নামিয়ে দেয়া যায় না। আমার মুন্নার ছোটো ভাই মাসুদের মুখ মনে পড়ে। শেষ বিকেলে আমাকে গাংনি যাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু গাংনি আর যাওয়া হয়নি। আমরা টেগর লজের সামনে দাঁড়িয়ে। মাসুদ মোটোর বাইক নিয়ে কোথায় যেন গেল। একটু পরই মুন্না আসে। এই পর্যন্ত ভাবতেই হোটেলের টিভির সাউন্ড বাড়ে। কলা বলেছিল, ওদের বলে যাবে, টিভির সাউন্ড যেন কমিয়ে দেয়। এভাবে টিভি চললে এখানে চোখের পাতা কোনওক্রমে এক করা যাবে না। কলা যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ সাউন্ড কমই ছিল। এইমাত্র বাড়ল। গান বাজছে : হানড্রেড পারসেন্ট লাভ লাভ লাভ...। গানটা আগে শুনেছি। ইন্ডিয়ার বাংলা সিনেমার। এই ছোটোখাটো একটা ফেরিঘাটেও ডিস আছে! সিলেটে থাকবে। এটা খুব ধনী এলাকা। মুন্না বলেছিল, বিয়ানীবাজার গোলাপগঞ্জের মানুষ খুবই ধনী। হঠাৎ হঠাৎ বড়ো বড়ো দালান। প্রায় কেউ থাকে না। এখানকার অনেক মানুষ লন্ডনে থাকে। এই রুমটার সামনে রাস্তার ওপাশে একটা পরিত্যক্ত প্রায় ও-সেপড মার্কেট। এমন মার্কেট আমাদের ওদিকেও ছোটো জেলা সদরেও খুব বেশি নেই। আর এখানে এই ফেরিঘাটেও কেউ একদিন এমন একখানা মার্কেট বানিয়েছিল, হয়ত চলেনি তাই পরিত্যক্ত। 

টয়লেট থেকে বেরুতে বেরুতে বুঝলাম, ওই গানটা এখনও আরও জোরে বাজছে। মনে হয় হোটেলে খদ্দের বেশি। পিছনের দিকে শুনতে পায় না বলে সাউন্ড বাড়িয়েছে। কিন্তু টিভি তো একপাশে টিনের বেড়ার উপরের দিকে। ফলে এই ঘরে ওই শব্দে টেকা দায়। আমি আর একটা সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে গুন গুনাই হানড্রেড পারসেন্ট লাভ লাভ লাভ... শুয়ে পড়ি... চোখ বুজতে চেষ্টা করি। কিন্তু হয় না। 

জানি না, এখন যদি তন্দ্রা আসে তো কতক্ষণ ঘুমতে পারব। ঠাকই তো যে কোনও সময় চলে আসতে পারে। কী করছে কে জানে। যাই করুক... মুন্না বলেছে ঠাকই ওস্তাদ লোক... কোনও সমস্যা হবে না। আমরাও ঠাকইর উপর ভরসা হচ্ছে। এই পর্যন্ত আমি নিরাপদ। জানি না আর কতক্ষণ নিরাপদ থাকব। মাথার একদম ভিতরে ভোঁ ভোঁ করতে শুরু করেছে। এই রোগটা মাঝে মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আসলে ঘুম ঠিক না হলে এটা বাড়ে। আর এক কাপ চা খেতে পারলে হত। কলা যাওয়ার সময়ে ঘুমতে বলে যায়নি, বলেছিল, রেস্ট নিন, তার মানে ঠাকই যে কোনও সময়ে আসবে। 

এসময় পাশের হোটেলের টিভির সাউন্ড আপসে কমে যায় যেন, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ গানটার একটি পঙ্ক্তি শুনি। হয়ত এই গানটার জন্যে এমনিতেই সাউন্ড কমে গেছে। ঠান্ডা গান। মা এই গানটা গাইত... তখন আমি ছোটো। নিরালা হোটেলে চা খাওয়ার সময় একবার শুনতে শুনতে মুন্না বলেছিল গানটা বন্ধ করতে, ‘ও মিঠুদা, এই ঠান্ডা গান বন্ধ কইরে কিশোরকুমার লাগাও... সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে।’ শ্রাবণী তখন ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। মুন্না সারাদিন কিশোরকুমারের এই গানটা শুনত। নিরালা হোটেলে চা খেতে এলে ম্যানজার মিঠুদাকে বলত ওই গানটা বাজাতে। কিন্তু এখন নিশিরাতের এক কলি বাজাতে না-বাজাতেই, গানটা থেমে যায়, নাকি চ্যানেল বদল হল? জীবন মানে জি-বাংলা। আর দরজায় টোকা। আমি বলি, ‘কে?’ সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই শসাঅলা ছেলেটার গলা, ‘চা।’ আমি টিনের দরজার নীচ থেকে ঠেলে দিতে বলি। কলা বলে গেছে দরজা না-খুলতে। 

চায়ের কাপ নিয়ে বিছানায় বসে, কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই আবার দরজায় ঠোকা। আর মোবাইলে মিসড্ কল। ঠাকই। আমি দরজা খুলি। 

এতক্ষণে ঠাকইকে দেখলাম। সে বলে, ‘ঘুম আছলা নি?’ আমি একটুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করি। তারপর বুঝি, ‘জানতে চেয়েছে ঘুম ছিলাম কি না? অথবা, ঘুম এসেছিল কি না? 

আমি ঠাকইর দিকে তাকিয়ে থাকি। যথেষ্ট বলবান মানুষ সে। একেবারে পেটানো শরীর, কিন্তু একটু মোটার ধাত আছে। মাথাটা শরীরের তুলনায় ছোটোই, নাকি চুল খুব ছোটো করে কাটিয়েছে। ঠাকই বিষয়টা হয়ত বোঝে যে, আমি তাকে দেখছি। বলে, ‘দেখো কিতা?’ 

আমি এর উত্তরে কিছু বলি না। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জানতে চাই, ‘আছেন ভালো?’ 

‘আপনে কও কেনে?’ ঠাকই বলে, ‘তুমি মুন্নার বন্ধু লাগো না?’ 

কথাটা এত দ্রুত ঠাকই বলল যে, আমার বুঝতে এটু দেরি হল। 

বললাম ‘আচ্ছা--’ 

ঠাকই সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘একেবারে ভুড়ি-উড়ি ফাসাইয়া দেলা!’ 

আমিও সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখের দিকে তাকালাম। কিন্তু কিছু বললাম না। এ বিষয়ে এখন কথা বলতে ভালো লাগছিল না। আসলে আমার মাথার ভিতরে ভোঁ ভোঁ করা ভাবটা যাচ্ছে না। মুখটা এখনও একটু বিস্বাদ লাগছে। ভেবেছিলাম নাস্তা খেলে যাবে, যায়নি। আমি জানি ঠাকই আশা করেছে, আমি এখন ওর সঙ্গে কথা বলি। ঠাকইর দিকে সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিই। আর লাইটারটা তার পাশে রাখি। 

কিন্তু ঠাকই জানায়, সে সিগারেট খায় না। গলা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে দেখে। তারপর বলে, ‘ফেরি ওপার। ভরি গেছে। ছাড়বে।’ 

বুঝলাম না, ঠাকই একথা কেন বলল। অবশ্য এরপর আমাকে জানায়, এখন বেরুতে হবে। ফেরি এপারে আসলে সহজে সিএনজি পাওয়া যাবে। 

আমাকে যেতে হবে লাইনের সিএনজিতে। ফেরিতে পার হবে এমন অনেকেই এখান থেকে সিএনজিতে উঠে গোলাপগঞ্জ যাবে। 

ঠাকই দরজা খোলে। আমরা বাইরে বের হই। রোদ এতক্ষণে চড়ে গেছে। সূর্য মাথার উপর থেকে একটু পশ্চিমে হেলেছে। আমি অবশ্য তাকাইনি। নিজের ছায়া দেখে বুঝলাম। ছায়া ছোটো কিন্তু হেলানো। এখন চোখ খুবই জ্বলছে। একেবারে জ্বালা করছে বলা যায়। খুলতে ইচ্ছে করছে না। রোদের দিকে চোখ দিতেও ইচ্ছে করছে না। আমি ইচ্ছে করেই মাথা নীচু করে রেখেছি। সেই শসাঅলা ছেলেটি কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক থেকেও একটা পথ নীচে নেমে গেছে। সেদিকে ফেরিঘাট। এখানে দাঁড়ালে পন্টুনের এক কোনা দেখা যায়। নদীর পানি একেবারে তলানিতে। তাই মনে হয় যেন ফেরিঘাট কত দূরে। 

ঠাকই এক সিএনজিঅলার সঙ্গে কথা বলে। একেবারে নিখাদ সিলেটিতে সে-কথা। আমি প্রায় কিছুই বুঝিনি। শুধু ফেরি শব্দটা বুঝতে পেরেছি। ভারি অথচ খুব জোরে ঘাতব ঘটাং শব্দ হলে আমিসহ সবাই ফেরিঘাটের দিকে তাকাই। ফেরিটা ঘাটে ভিড়ল। ভেড়ামাত্র, কোনও গাড়ি নামার আগে সামনের লোকেরা পন্টুনে উঠে পড়ছে দেখতে পাই। সেদিকে তাকিয়ে থাকি। বুঝি, এই সিএনজিগুলো লাইনের। লোক ভরলে যাবে। এখনই লোক আসবে। এগুলোর সিরিয়াল আছে। ঠাকই একেবারে সামনেরটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারকে বলেছে, সামনের বামদিকে তাঁর লোক বসবে। আমি ঠাকইর পাশে দাঁড়ানো। বলি, ‘মুন্নার সাথে কখন কথা হয়েছে?’ 

ঠাকই বলে, ‘এই মাত্তর... এইখানে আসার সময়।’ 

‘ও।’ 

ঠাকই স্পষ্ট করে বলে, ‘কোনও অসুবিধা নাই। যেখানে নামচো, তার কান্দায় মানে কাছে কলা থাকবে... নিয়ে যাবে, জকিগঞ্জ--’ 

আমি ঠাকইর চোখে তাকাই। সে আমার মুখে একটু যেন অসহায়ত্ব দেখে। আসলে এই মুহূর্তে আমি অসহায়। জানি না সামনে কী আছে। ঠাকই জকিগঞ্জ বলে যে জায়গার নাম বলল, এর আগে কখনও আমি এই জায়গার নাম শুনিনি, শুনলেনও কেন শুনেছি মনে নেই। কিন্তু এখন বুঝলাম, ওই দিকে নিশ্চয়ই কোনও সীমান্ত বর্ডার ইত্যাদি আছে। মুন্নাও একবার মনে হয় ওই জায়গার নাম বলেছিল, কিন্তু তখন সেভাবে খেয়াল করিনি। 

এখন ঠাকই গলা নীচু করে বলে, ‘সকালের সেই জায়গায় কলা মোটর সাইকেল দিয়ে দাঁড়ানো থাক্ত--’ 

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একবার ভাবলাম, তাহলে এই পর্যন্ত আসলাম কেন? কিন্তু মুহূর্তেই মনে হল, ততক্ষণে ঠাকই হয়ত সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারেনি। হয়ত, সে সময়ে আমার যাওয়ার জন্যে ঠিক সময় ছিল না। এটুকু ভাবতেই ফেরি থেকে উঠে আসা মানুষরা ঢাল বেয়ে উপরে ওঠে। এখানে সিএনজির কাছে চারজন পাঁচজন কেউ একজন কেউ দুজন এমনভাবে দাঁড়ায়। এদিকে পাশের রাস্তা দিয়ে গাড়ি সামনের দিকে যাচ্ছে। এই রাস্তায়ই উঠবে, সামনের দিকে। আমি সেদিকে দেখি। ফেরিঘাটে এই হয়, আমার জানা আছে। কিন্তু দেখতে দেখতে বুঝি আমি আসলেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি। 

একসঙ্গে চারজন, ঠাকইর পাশে দাঁড়ানো সিএনজিঅলাকে বলল, ‘আমরা চারজন--’ সিএনজিঅলা বলল, ‘আসেন।’ ঠাকই তখন পাশ থেকে সরে দাঁড়াল। আমাকে ইঙ্গিতে সামনের বাম দিকের সিটে উঠতে বলে। আমি সেখানে বসামাত্র গলা নীচু করে জানায়, ‘কোনও সমস্যা নাইকা। যাও, দোস্ত--’ এরপর ড্রাইভারের বলে, ‘যারে ভাই--’ 

পিছন থেকে একজন বলে, ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, সিটের এই কোনায় কী যেন একটা।’ 

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটাকে দেখি। মনে হল, আমাদের ও দিকের মানুষ, গলার স্বর আর উচ্চারণে অনেক মিল।’ 

ড্রাইভার বলে, ‘ইতা কিচু না, স্যার--’ 

তবু লোকটা নামে। তার সহযাত্রী দুজন সে নামার পরে জায়গাটা ভালো মতো দেখে। ড্রাইভারের ডান পাশের জন বলে, ‘বুজইন না, নতুন প্যান্ট--’ 

পিছনের দুজন হাসে। সেই লোকটিও। এরা পরস্পর পরিচিত, কথায় বোঝা যায়। নিশ্চয়ই কাছে কোথাও চাকরি করে। সহকর্মী নাকি সবাই। অফিসার হবে। কিন্তু এখন বাজে মোটে একটা, এখন তো কোনও অফিস ছুটি হওয়ার কথা না। ড্রাইভার ডাকল স্যার। এই পথে নিশ্চয়ই এরা নিয়মিত যাতায়াত করে। আমি বুঝতে চেষ্টা করি। আবার চেষ্টা করিও না। সামনে দু-পাশে ফাঁকা মাঠ। সেখানে রোদ একেবারে ঝকমকে। যত দূরে চোখ যায়, রোদ আর রোদ। ডান দিকে অবস্থা পাহাড়। অনেক দূরে। সেখানে আকাশের গায়ে কিছু মেঘ। কিন্তু তাতে বৃষ্টির নিশ্চয় কোনও সম্ভাবনা নেই। ওই মেঘে রোদ আটকায় না। ওই পাহাড়ই নিশ্চয়ই মেঘালয় পাহাড়। শুনেছি না বইয়ে পড়েছি আজ আর মনে নেই। এই মুহূর্তে সেসব কিছুই আমি সত্যি মনে করতে চাই না। মনে করার যেন কোনও কারণ নেই। কী হবে মনে করে। এই রোদে চোখ খুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। চোখ জ্বলছে। কিন্তু ড্রাইভারের এই পাশের সিটে বসে চোখ বন্ধ করে রাখা ঠিক না। বাম হাতে ভর, উপরে ধরে আছি। তন্দ্রা এলে হাত আলগা হয়ে যেতে পারে। তাহলে আর রক্ষা নেই। 

আমি এই পর্যন্ত ভেবেছিলাম। এর মধ্যে সহযাত্রীদের কথায় কান লাগাই। ড্রাইভারের ডান পাশের জন মাথাটা একটু বাম দিকে ঘুরিয়ে বলে, ‘নতুন প্যান্টের কাফ্ফারা পাইলাম না।’ 

আমার ঠিক পিছনের জন তখন বলে, ‘কী আইজকে হবে নিকি?’ 

‘আগে গোলাপগঞ্জ তো যাই--’ 

পিছনের মাঝখানের জন বলে, ‘তুমি তো কুষ্টিয়া আছলা, দেকচো কুষ্টিয়ায়?’ 

‘ওদিকে অমন হয়।’ 

ড্রাইভারের ডান পাশের জন বলে, ‘খালি কুষ্টিয়ার দোষ, ওদিকের দোষ, এদিকে যেন হয় না?’ 

পিছনের মাঝখানের জন জানতে চায়, ‘কী হইচে?’ 

আমার পিছনের জন, ‘আরে বন্ধু বন্ধুরে সামান্য তর্কাতর্কিতে খুন করছে--’ 

কয়েকটা কয়েকটা কাগজে ডিটেইল আছে--’ 

সে আরও জানতে চায়, ‘কী জন্যে?’ 

‘কমুনে, প্যান্টের কাফ্ফারা পাই, খাইতে খাইতে--’ 

সামনের জন মাথা ঘুরিয়ে পিছনের জনকে বলে, ‘আপনি তো কয়দিন আগে কুষ্টিয়ায় ছিলেন, কাউকে চেনেন নাকি?’ 

‘না, না। আমি নিউজটা ডিটেইল দেখিনি। আর আমি ওই এলাকার কলেজে ছিলাম না।’ 

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটিকে দেখি। দেখেছি কি তাকে কখনও কুষ্টিয়া শহরে? মনে পড়ে না। একবার মনে হয় জানতে চাই, আপনি কোন কলেজে ছিলেন? এরা সব কলেজের প্রফেসর? 

এই সময় সে বলে, ‘কী আছে ওই নিউজে?’ 

আমি মনে মনে ভাবি, বলি যে, আমি জানি কী আছে ওই নিউজে। 

আমার পিছনের পাশের জনকে বলে, ‘না নিউজে আপনার কথা নাই। থাকতে পারত। কাগজের অফিসে ফোন করে বলেন, আপনি ছিলেন, তাহলে আপনার নাম দিয়ে দেবে।’ 

সে জানতে চায়, ‘আসামিরা সব পলাতক?’ 

‘তা ছাড়া কী?’ সামনের জন বলে, ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল। কেন সিনেমায় দেখেন না?’ 

আমি ড্রাইভারের পাশ থেকে লোকটাকে দেখি। হাসছে, ‘পুলিস আসিবার পূর্বে অপরাধীরা পালাইয়া গেল।’ 

লোকটা হাসতেই পারে। আসলেই সবাই পালিয়েছে। আমারও হাসি পায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওই দুপুরের রোদে শেষবারের মতন মাসুদের ক্ষুব্ধটা মুখটা মনে পড়ে। মাসুদের সাহস আছে। মুন্নার মতো না। মুন্নাটা একটা ভীতু। শ্রাবণীর জন্যে এখনও কান্দে। সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে। মাসুদ সে তুলনায় অনেক ডেয়ারিং। লোকটার মুখটা দেখতে দেখতে এইটুকু মনে পড়ল। কিন্তু তার পরই রোদে চোখ...। ভীষণ রোদ চোখ জ্বলছে। 

পিছন থেকে একজন, সম্ভবত ওই ডান পাশের জন বলল, ‘আছে নাকি পেপার, কোন কলেজের স্টুডেন্ট--?’ 

আমার পিছনের জন বলে, ‘নামলে দেখি আমরা। প্যান্টের কাফ্ফারাসহ--’ 

আমার হাসি পায়। লোকগুলোর দারুণ রস আছে। একসঙ্গে চাকরি করে নিশ্চয়ই, না-হলে পরস্পরকে এত খোঁচা দিয়ে কথা বলে কেন? 

তখন পিছনের ডানপাশের লোকটি বলে, ‘কদিন আগে আসলাম। নিউজটা দেখতে হবে।’ 

দু-পাশের ফাঁক প্রান্তর রেখে সিএনজি এখন গ্রামের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। পাশের বাড়িগুলো উঁচুতে। চোখে রোদ পড়ছে না। রাস্তার গাছের ছায়া। পিছনের ডানপাশের লোকটা কথা বলেছে। আমি ভাবি, নিউজটা... মাসুদের জন্যেই। রাঙা দৌড়ে এসেছিল। আমি একপাশে দাঁড়ানো। পিছনে টেগর লজ। মাসুদ বলল, ধরেন। আমি বুঝিনি। রাঙাকে ধরেছিলাম। শুধু ধরেছিলাম। মাসুদও রাঙাকে ধরে। আমিও রাঙাকে ধরি। মেহেরপুর যায়নি। রাঙাকে এখানে পাব ভাবিওনি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রাঙা মাসুদের জিনিসটা কোথায়। কিন্তু ততক্ষণে মাসুদ, প্রায় কিছুই বুঝতে না-দিয়ে রাঙার বামদিকের পাঁজরে প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের করে ভরে দেয়। 

আমি রাঙার পিছন দিকে, রক্ত গায়ে লাগেনি। ছেড়ে দিয়ে সরে আসি। বুঝতে পারিনি কী করব। সামনে তাকিয়ে দেখি মাসুদ উধাও। রাস্তার উলটো দিক দিয়ে পর পর দুটো বোমা এসে পড়ে। আমি পালাতে পারি। 

মুন্না হঠাৎ আমার পাশে মোটোর বাইক নিয়ে হাজির হয়। তারপর রাজবাড়ির দিকে। তারপর ভাঙ্গা... তারপর... মুন্না বলে কী করতে হবে...। আমি আসলেই ওই নিউজটার বাকিটুকু জানি না। তারপরে কী হয়েছে। পত্রিকা কী লিখেছে। 

আবার রাস্তার দু-পাশে ফাঁকা জায়গা। একটু বাদে রাস্তা ঘেঁষে দালান। বুঝি সামনেই গোলাপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। সকালে এখানেই নেমেছিলাম, রাস্তার উলটো দিকে। বাঁয়ে হোটেল আল আমিন। সিএনজি থেকে নামি। ঠাকই ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। সামনের রাস্তার উলটো পশে যেতে হবে। একটা বাস দাঁড়ানো। পিছনে কলা, মোটর সাইকেলসহ। ওই চার যাত্রীর একজন ভাড়া দিতে দিতে বলে, ‘কই পেপারটা দেন।’ এটুকু শুনে আমি রাস্তা পার হই। আমার আর চোখে পানি দেয়া হয় না। কলা আমাকে দেখে সাইকেল স্টার্ট দিয়ে বাসটার সামনে গিয়ে থামে। পিছন দিকে সূর্য। আমি কলার পিছনে বসি। বুঝি সিলেটের দিকে যাচ্ছি না। মোটর সাইকেল চলতে শুরু করে। চোখে সরাসরি সূর্য পড়ছে না, কিন্তু রাস্তায় খুব রোদ। আমার চোখ জ্বলছে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন