সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

ফিলিপাইনের গল্প : ম্যাকটানের সেই ভবিষ্যবক্তা

গল্পকার : নেথান গো 
অনুবাদ- অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় 

-------------------------------------------------------------------------------------
লেখক পরিচিতি
নেথান গো'র জন্ম ও বড় হওয়া দক্ষিণ ফিলিপিন্সে। আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপের স্নাতক। জেল রাইটার্স ওয়ার্কশপেও অংশ নিয়েছেন। ২০১২' তে পেন পুরস্কার পেয়েছেন, Emerging Voices Fellow বিভাগে। কার্ট ব্রাউন পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৭ সালে।
বর্তমানে ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো। 
-------------------------------------------------------------------------------------

তিনি হলেন এককথায় বলতে গেলে- -এক অন্ধ ভবিষ্যতবক্তা। আর তার আছে এক মালিশ-কারখানা। নাম তার 'আনচেইন্ড মেলোডি মাসাজ পার্লার'। সেখানে তিনি করেন মালিশের কাজ। 

পায়ের তালু ঘষে ঘষে মাসাজ করাতেই তার বিশেষ দক্ষতা। সমস্ত ধরনের গ্রন্থিকেই তিনি তার মালিশে উদ্দীপিত করে তুলতে পারেন। বিশেষ করে টেন্ডন ও ফ্যালেঞ্জেসের গ্রন্থিগুলি টেনে টেনে তিনি এক আশ্চর্য মালিশের কায়দা করতে জানেন। 

এমনকি তিনি যেকোনো মানুষকে মাসাজ করে লম্বা পর্যন্ত করে দিতে পারেন। বুড়ো আঙ্গুলের তলায় মালিশ করার এমন সব কৌশল জানা আছে তার। তার এ গুণের কথা অবশ্য জানেও সক্কলে। 

সে ছাড়াও, কথা হচ্ছে, তিনি কিনা আবার মানুষের ভবিষ্যতও বাৎলাতে পারেন। 

১৫২১ সালে ২৬শে এপ্রিল তিনি তার প্রথম ভবিষ্যদ্বাণীটি করেন । 

ফার্দিনান্দ ম্যাগেলানকে তিনি নিষেধ করেছিলেন ম্যাকটানে যেতে। তিনি এও বলেছিলেন যদি ফার্দিনান্দ যায় তবে সে আর ফিরবেনা। তা ফার্দিনান্দ শোনেনি সে কথা। তাকে তার ন্যায্য পাওনা পয়সাটা পর্যন্ত দেয়নি। 

ম্যাকটানে যাওয়ার পরেরদিন সেখানকার এক স্থানীয় লোকের হাতে সে মারা যায়। সেই হত্যাকারীর নামটা আবার ছিল এক মাছের নামানুসরণে। 

এই ভবিষ্যদ্বাণী সে যখন করে তার বয়স তখন মাত্র একুশ। সেই থেকে গত চারশ ছিয়ানব্বই বছর ধরে তার বয়েস সেই একুশেই হয়ে আছে। যেইদিন তার দেহের পুর্ণবৃদ্ধি হোল, সেইদিন থেকে তার বয়েসও গেল থমকে । 

আর সে অন্ধও হয়ে গেল। 


সে জন্মেছিল ম্যাকটান আইল্যান্ডে। পিলিপিন্সে। কিন্তু নানা ধারদেনা হয়ে যাওয়ায় তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে নানা স্থানে। রোজগারের আশায়। ভবিষ্যৎ বলা ছাড়াও তার ছিল আবার জুয়ার নেশা। 

তার ভবিষ্যৎবানীগুলি কখনোই মিলনান্তক ছিলনা। যখন সে তার ক্লায়েন্টের বুড়ো আঙ্গুলে চাপ দিত, সে শুধু বিয়োগান্তক আর দুঃখী সমাপ্তিগুলিই দেখতে পেত। 

তার ক্লায়েন্টদের এইসব দুঃখী, অন্তিম সমাপ্তি  অবশ্য তার জন্যে ভালোই ছিল একপ্রকার। কারণ আর যাই হোক, মরা মানুষে তো আর প্রতিশোধ নেয়না। 
এটা অবশ্য হল আরেক কারণ--  যে কারণে তিনি একজায়গায় থাকেন না। 

আমেরিকান জেনারেল ম্যাকআর্থার এর কথাই ধরুন। তার কাছে মালিশ করাতে এসেছিলেন ২৩শে ডিসেম্বর ১৯৪১। তিনি যে সার্ভিসটি বুক করেছিলেন, সেটি ছিল মালিশ কাম ভবিষ্যৎফল। কিন্তু তিনি তার ভবিষ্যৎবানীকে আমল দেননি। পরের বছর ম্যাকাআর্থার জাপানীদের কাছে হেরে গেলেন। বাটানের দুর্গ তার হাতছাড়া হল। হাজার হাজার ফিলিপিনো সৈনিকের মৃত্যু হল। ম্যাকআর্থার অবশ্য তার পরিবারবর্গকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া পালিয়ে গেছিলেন। আর সেখান থেকে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন তার সেই বিখ্যাত বচন- -'আই শ্যাল রিটার্ন'। 

খুব কম মানুষই আসলে জানতেন ম্যাকাআর্থার আসলে কী ইঙ্গিত করছিলেন। তিনি আসলে এই ভবিষ্যৎবাণীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। এখন অবশ্য খুব কম মানুষই জানেন যে এইরকম কোন ভবিষ্যৎবাণীর কাজ তিনি করে থাকেন। যদিও তিনি এখনো করে চলেছেন। তবে সীমিত। ফোনে কথা বলে ক্লায়েন্ট ঠিক করেন। তিনি একটু ওল্ড-ফ্যাশন্ড। 

আরেকটা কথা, এখনও অবধি প্রায় কেউই জানেননা যে তিনি এখনো ভার্জিন। যদিও তার সুন্দর পেশী আছে। থাকলে কি হবে। সারাজীবন এতো মৃত্যুর ভবিষ্যতবাণী করেছেন যে জন্মদানের কথা তার মাথায়ই আসেনা।

তাতেও তিনি ভদ্রমহিলাদের কাছে এখনো সমান জনপ্রিয়। ভদ্রলোকেদের কাছেও। 

তিনিও কোন বৈষম্য করেননা। তার ওপর তিনি অতিশয় বিনয়ী একজন মানুষ। এই বিনয়ের কারণে প্রায়শই আবার বিপদেও পড়েন। কারণ তিনি না বলতে পারেননা। আর মনে 'না' থাকলে মুখে সেটা বলতেই হয়। সেটাই নিয়ম। 

এই নিয়ে তার একবার খুব শিক্ষা হোল। সেটা ছিল অগাস্ট মাসের ২০ তারিখ। সাল ১৯৮৩। 

ডিক্টেটরের স্ত্রী ইমেল্ডা মার্কোস তাকে একবার প্রাসাদে ডাকলেন। ইমেল্ডার দু'হাজার সাতশো চুরানব্বই জোড়া জুতো ছিল। এতো এতো নানারকম জুতো পায়ে কসরত করলে তো পা মালিশের দরকার হতেই পারে। 

কিন্তু তার চাহিদা ছিল অন্যরকম বা আরও কিছু বেশী। 

তিনি তার পিঠের জায়গায় মালিশ করাতে ইচ্ছুক ছিলেন। 

ইমেল্ডা তখন তার বক্ষের অন্তর্বাস খুলছিলেন, সেইসময় একনায়ক ঘরে ঢুকে পড়েন। ( পুরুষ গুলো হয়ও বাবা খুব ভঙ্গুর)। 

একনায়ক তখন একটা কাস্তে তুলে নিয়ে তাকে হুমকি দিলেন। ডিক্টেটরের বন্ধু তাকে এটা দিয়েছিলেন। 

তিনি এ ব্যাপারে আরও ভয়াবহ কিছু করার মুডে ছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড জরুরী এক মীটিঙের চাপে থাকায় কিছু করে ওঠার আগেই তাকে ফের বেরিয়ে যেতে হয়। 

পরের দিন, একনায়ক এবং তার স্ত্রী একটি অভ্যুত্থানে জন-সমর্থন হারায়। তাদের পতন হয়। 

যদি তারা তার ভবিষ্যৎবাণী শোনার জন্যে সময় দিতেন তবে আগে থেকেই সতর্ক হতে পারতেন। 


এই ছিল শেষবার যখন তিনি কোন প্রভাবশালী মানুষের মালিশের কাজ করলেন। 


আজকাল তিনি খুব নারকেলের মদ পান করেন। সারাক্ষণই। আর অতীতের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকেন। 


যার কথা হচ্ছে, তিনি হলেন এক চাইনিজ ভদ্রমহিলা। তিনি একটা ভালো দিন ধরার জন্যে তার কাছে এলেন। তার ফেরী কোম্পানির উদ্বোধনের জন্যে একটা ভালো দিন চাই তার। 

আমাদের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তাকে বললেন যে তিনি ফরচুন-কুকির মত কিছু বলতে পারবেননা। সেটা তার কাজ না। 

তিনি সম্মত হলেন। আর মালিশ করার আবেদন করলেন। 

সারাজীবন এতোজনের পা মালিশ করেছেন তিনি কিন্তু এমন খরা ওঠা, চামড়া ওঠা পা তিনি আগে কখনো দেখেননি। হলো কি, বেশ কয়েকবার এই মহিলা আসাযাওয়া করার পর তিনি আবার তার পায়ের প্রেমে পড়ে গেলেন একেবারে । তার পায়ের গন্ধ অবধি তার কাছে ধরা দিতে লাগল। কখনো যদি তিনি পেতেন ঘন সয়া-সসের ঘ্রাণ তো আবার কখনো গলানো প্লাস্টিকের। 

একদিন আমাদের মালিশকার তাকে এক কারাওকি বারে আসতে নিমন্ত্রন জানালেন। 

সেখানে গিয়ে তারা মাতাল হয়ে অনেক অনেক গান করছিলেন। 

আবার আরেক রাতে তারা একসাথে সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গেলেন। ঘন অন্ধকারে, হাত ধরাধরি করে। 

আরেকটি রাত্তিরে তিনি তাকে তার কটেজে নিমন্ত্রণ করলেন। নিজে হাতে কাঁকড়া রান্না করেও খাওয়ালেন। 

তারপর তারা যখন এক বিছানায় শুতে গেলেন, আমাদের মালিশকার তাকে তার উপলদ্ধির কথা বলার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। 

তিনি বলতে চাইছিলেন যে যে সেক্স জিনিশটা কি ভীষণরকম ওভাররেটেড। তিনি বলতে চাইছিলেন ব্রহ্মচর্য কিভাবে অনেক বেশী সংযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলতে চাইছিলেন যে অন্ধেরা আসলে কত বেশী সংবেদনশীল। 

কিন্তু ঠিক সে মুহূর্তেই তিনি জানতে পারলেন যে ভদ্রমহিলা বিবাহিতা ও তার দুই সন্তান আছে। 

তিনি আর কিছু বললেননা। তার বদলে তাকে এক দারুণ ফুট-মাসাজ উপহার দিলেন। 

যখন তিনি তার ফ্লেক্সর ডিজিটরাম ব্রেভিসে চাপ দিচ্ছিলেন, যেটা সবাই জানেন যে আমাদের হার্টের সাথে সম্বন্ধযুক্ত, তার সামনে হঠাৎ এক দৃশ্য ভেসে উঠল। তিনি দেখলেন ভদ্রমহিলার স্বামী ও তার পুরো পরিবার ফেরীতে উঠেছেন। পৃথিবীর সুন্দরতম সন্তানদের মা সে। লাল আভাময় গাল তার দুটি সন্তানের আর তার স্বামী এক দীর্ঘদেহী রুপোলী চুলের পুরুষ। ভবিষ্যতদ্রষ্টার হৃদয় ভেঙ্গে দুমড়ে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল এমন সুন্দর পরিবার ফেলে কেউ কখনো আসেনা। তার কষ্ট হচ্ছিল তার আর নিজের পরিবার গড়া হবেনা এই নারীর সাথে। 

তিনি এদিকওদিক তাকিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আর শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও দেখতে পেলেন। তারা আনন্দ করে অনুষ্ঠানের সার্থকতা ঘোষণা করছিল। তিনি শুধু একথা ভেবেই একটু সুখ পাচ্ছিলেন যে তার ভালবাসার মানুষ এক যোগ্য পরিবেশেই কাল কাটাবেন। ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হবেন। তার তো এতে সুখী হওয়ারই কথা। 


একটু বিষণ্ণ মুখে তিনি জানালেন- এইবার এক ব্যতিক্রম করতে চলেছেন তিনি। তিনি এক আনন্দময় কিছুর ভবিষ্যৎবাণী করতে চলেছেন এই প্রথমবার। এই বলে তিনি তাকে একটা শুভ মহরত বেছে দিলেন। 

চীনামহিলা তার গালে চুম্বন করে বিদায় নিলেন। 

এই ছিল তাদের শেষ দেখা। 

অগাস্টের ১৭ তারিখ। ১৯৯৪। একটি ফেরী তার প্রথম যাত্রাতেই জলমগ্ন হল। ডুবে গেল মিন্ডানাও এর তীরে। সমস্ত যাত্রীরাই মারা গেল। 

তিনি যখন এ খবর পেলেন, বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত তিনি ঘুমাতে পারলেননা। 


-হে ঈশ্বর, একি করলে? কেন তুমি আমাকে মিথ্যা ভবিষ্যৎ দেখালে? 

-'আমি তোমাকে কোন ভবিষ্যৎবানী পাঠাইনি। তুমি প্রেমের ঘোরে উদ্বেল ছিলে'- বল্লাম আমি, উত্তরে। 

-কেন ঈশ্বর কেন, তুমি আমার একমাত্র প্রেমকে কেড়ে নিলে ? 

-তুমি প্রেমে পড়বে একথা আমার জানা ছিলনা। তোমার হাতে কয়েক শতাব্দী সময় ছিল। আমি জানিনা তুমি তার মধ্যে কী দেখেছিলে। 

-হে ঈশ্বর, আমি তবে আর কেমন করে বাঁচবো? 

-কান্নাকাটি বন্ধ রেখে, অন্য সবার মত নিজের কাজ কর। 


অক্টোবরের ১০ তারিখ। ১৯৯৪ সাল। সকাল বেলা। প্রাতরাশ খেয়ে উঠবার সময় তার পায়ের পাতাটা চেয়ারে আটকে হোঁচট খেল। তিনি তার পাটা ঘষে মালিশ করতে গেলেন। আর সাথেসাথে তার চোখের সামনে দৃশ্য ফুটে উঠল। তিনি তার নিজের মৃত্যুদৃশ্য দেখতে পেলেন। কিন্তু মুশকিল হল-- তিনি আবার এদৃশ্য দেখে খুব খুশী হয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি বলতে পারলেননা যে তার মৃত্যুটা সৌভাগ্যের কোন ঘটনা কিনা। সৌভাগ্যের হলে তো আবার তা মিথ্যা হয়ে যাবে। 

সে যাই হোক। তাতে কি। মোটকথা এরপর কোন কিছুই তাকে এইসমস্ত কাজ করতে বিরত রাখতে পারেনি। যেমন ধরুন গায়ে রেইনকোট চড়িয়ে ঘোরা। কানে ওয়াকম্যান লাগানো। প্রতি ডিসেম্বরে ক্যালেন্ডার চেক করা। নিয়মিত আবহাওয়া-খবর শোনা ইত্যাদি। 

এমনকি যখন আকাশে খুব মেঘ করে আসে, সমস্ত টুরিস্টরা নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়, তখনও তাকে দেখা যায় একটা বীচ-চেয়ার টেনে সমুদ্রের ধারটিতে সে অপেক্ষারত। কোন এক বিশাল ঝড় বা টাইফুনের অপেক্ষায় সে বসে থাকে। কখন ঝড় এসে তাকে গ্রাস করবে। 


'একাকী নদী গড়ায়, হায় গড়ায়, মিশে যায় সাগরে। সাগরেই মেশে'


একটু হয়তো নাটকীয়। তার এই ডুবে মরতে চাওয়ার শেষ বাসনা। তাও একজন অন্ধ মানুষের। একজন অন্ধ ভবিষ্যৎবক্তার। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই-- এইটিই ছিল তার একমাত্র পার্থিব বাসনা। তাকে যদি আমরা একটুও কখনো ভালবেসে থাকি, তাহলে তার এই সুখের মৃত্যু-বাসনাটি আমরা নাহয় অনুমোদনই করলাম। 




অনুবাদক
অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবি। গল্পকার। প্রবন্ধকার। চলচ্চিত্রকার। অনুবাদক।
মার্কিন দেশে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন