সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

মাহরীন ফেরদৌস'এর গল্প : নিঝুম বিদায় বেলা

যে কোন ধরনের উচ্চতা নিয়ে আমার তীব্র ভীতি আছে । পাহাড় , টিলা , ব্রিজ , সাঁকো থেকে শুরু করে দো’তলা বাসে পর্যন্ত আমি উঠতে পারি ন। আমার অস্থির লাগে, দম বন্ধ হয়ে আসে । মনে হয় এখনই খুব খারাপ কিছু ঘটবে এবং এরপর আমি অন্ধকার কোন জগতে নিমজ্জিত হব । শুধু তাই নয় যে কোন ধরণের নতুন সম্পর্ক, সম্পর্কের দায়িত্ব আমাকে আতংকিত করে ফেলে । আমার জগত খুব ছোট । সেখানে আমার বাবা-মা বাদে নতুন কোন সম্পর্ক নিয়ে আমি ভাবি না । আমার তেমন কোন বন্ধুও নেই ।
সঙ্গ প্রয়োজন হলে আমি রাতে সিনেমা ছেড়ে ঘুমাই । সিনেমার শব্দ , কথোপকথন আমার জন্য ‘ সফট নয়েজ ’ এর মত কাজ করে । ঘুম ভালো হয় । কোথাও যাওয়ার পথে আমি কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনি । ট্রেনে অধিকাংশ সময় বই পড়ি । ঘরে একা থাকার সময় গিয়ার ভিয়ারে থ্রিডি সিনেমা দেখি । আমার প্রতিটি মুহূর্ত কে ব্যস্ত রাখতে আমি প্রযুক্তি অথবা বইয়ের কোন না কোন সাহায্য নেই । আমি একটা বিদেশি ফার্মে কাজ করি , এবং সেখানেও খুব প্রয়োজন না পড়লে আমাকে কেউ ঘাঁটায় না । শুধুমাত্র নিজের কাজ নিয়ে আমি অত্যন্ত সচেতন বলে আমি এই সুবিধাটুকু অর্জন করতে পেরেছি । এছাড়াও , আমি সবার আগে অফিসে পৌঁছে যাই এবং বেশিরভাগ সময়ই সবার পরে অফিস থেকে ফিরি । হয়ত পরোক্ষভাবে সেটাও একটি কারণ । 

আজ আমার জন্য গতানুগতিকতার বাইরের একটি দিন । যদিও আমি এমন দিনের অভিজ্ঞতা আগে বেশ কয়েকবারই পেয়েছি । তবু প্রতিবারই আমার মনে হয়েছে একই দিনে কেউ আমাকে পাহাড় , ব্রিজ , বহুতল ভবন থেকে শুরু করে সমস্ত উচ্চতা থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে যাচ্ছে । এমন দিনগুলোতে আমি আমি অদ্ভুত এক আঁধারে ঢেকে যাই । আমার মধ্যে পৃথিবীর শেষ স্টেশন এর সর্বশেষ গাড়িটা ধরার মত তাড়া কাজ করতে থাকে । মাথার ভেতরে ভোঁতা একটা যন্ত্রণা দানা বাঁধে। আমি মনে মনে পাবলো নেরুদার সনেটের দু এক লাইন আউড়ে ফেলি । অবশ্য একটা ভুল তথ্য দিয়ে ফেলেছি । সব সম্পর্ক আসলে আমাকে অন্য উচ্চতাভীতিতে নিয়ে যায় না । গল্প , উপন্যাস , কবিতা , গান এবং সিনেমা আমার আবেগ কে স্পর্শ করতে পারে । সেখানের আবেগ দেখতে বা অনুভব করতে আমি পুলক বোধ করি । 

- ‘ কী হল চল? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।’ ভেতরের ঘর থেকে উচ্চস্বরে বলে ওঠে আমার মা । কার কন্ঠ শুনে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বাইরের ঘরে এসে হাজির হয় আমার বাবা । আমি আমার দুঃখময়তা হাতে করে নিয়ে নিঃশব্দে তাদের পিছু নেই । আমার নিজেকে কাকতাড়ুয়ার মতো লাগে । নিজেকে দীনহীন এক কবির মতোও লাগে যার হয়ত অন্য কোন নক্ষত্রে জন্ম নেবার কথা ছিল ।

উবারে উঠে আমি চালকের পাশের সিটে বসি । আমার মনে হয় আজ যেন আমার স্কুলের প্রথম দিন । নিয়ম বেঁধে আমাকে পোশাক পরিয়ে , ব্যাগ চরিয়ে স্কুলে পাঠানো হচ্ছে । আমি চাই কিংবা না চাই আজ আমাকে যেতেই হবে । উবারের ভেতরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাসে আমার কেমন যেন দম বন্ধ বন্ধ লাগে । এক্রোফোবিয়া , এনথ্রোপোফোবিয়া এর সাথে সাথে কি তবে আমার ক্লাসট্রোফোবিয়াও সঙ্গী হয়ে গেল নাকি ? নিজের জন্য আমার নিজেরই কেমন যেন দুঃখ বোধ হয় । আমার আবার স্কুলে যাওয়ার কথা মনে হয় সেই সাথে মনে পড়ে ওরহান পামুকের স্কুলজীবন নিয়ে লেখা একটা গ্রন্থের কথা । সেখানে একটা ‘আমি’ চরিত্র থাকে । যে স্কুলে যেতে চায় না । চায় না কারণ , তার খুব ঘুম পায়, সে ভয় পায় , অন্য শিশুরা তার পথ আটকায় । সে আকাশ দেখে । মেঘ দেখে । গাছের ছবি আঁকে , পাতাহীন গাছের ছবি । তার খুব একলা লাগে । তার গাল বেয়ে কান্না নেমে আসে । এক সময় সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে 

‘আমি বাইরের কোনো একটি মেঘ হতে চাই। 
ইরেজার, নোটখাতা আর কলম : 
এগুলো সব মুরগিকে খাইয়ে দাও।‘ 

খুব হাস্যকর কথা । খুব । অথচ আমি জানি এই লেখা পড়ে আমি নিজেকে কতবার খুঁজে পেয়েছি । কতবার ক্ষণিক জোনাকির মত জেগে উঠে দপ করে নিভে গিয়েছি । আজ কেমন দিন ? আজ কি আমার জ্বলে ওঠার দিন নাকি নিভে যাওয়ার ? আমি জানি না । আমি কিচ্ছু জানি না । 

প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাই । যেখানে এসেছি সেটা বেশ পুরানো লাল ইটের দো’তলা বাড়ি । ঝুল বারান্দা আর বাইরের দরজা অজস্র মানিপ্ল্যান্ট গাছে ছেয়ে আছে । গাড়ি থেকে নেমে মা আমার কাছে এসে আলতো স্বরে বলেন , ‘এবারের মেয়েটিকে অন্তত ভালো মত দেখিস । নিজ থেকে কিছু কথা বলিস । প্রতিবারের মত আর বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে চাই না ।’

আমি মায়ের কথার উত্তর দেই না । ঘাড় তুলে ছাদের হালকা সবুজ রঙের রেলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকি । ব্যাপারটা হল এমন , যে মানুষ যা পছন্দ করে না তা যদি তার সাথে বার বার হতেই থাকে এক সময় সে খুব ভাবলেশহীন হয়ে যায় । যেমন আমি একটা সিনেমায় দেখেছিলাম , এক দম্পতি একে অন্যকে ঝগড়ার সময় প্রতিবারই ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলত । এবং প্রতিবারই এই কথা বলার জন্য তারা দুঃখ পেয়ে কাঁদত এবং পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইত । এভাবে চলতে চলতে এক সময় সত্যি তাদের মাঝে বিচ্ছেদ চলে আসল । সেদিন তারা কেউ কাঁদল না , কেউ ক্ষমা চাইল না । জীবন সঙ্গী খুঁজে নেবার এই প্রচলিত কৃত্রিম নিয়ম আমার অপছন্দের শীর্ষে । তার এখন আর আমার কিছুই যায় আসে না । শুধুই বাধ্যগত ভৃত্যের মত বাবা মায়ের সাথে আসা ছাড়া । আমি লাল দেয়ালে সবুজ মানিপ্ল্যান্টে ছেয়ে থাকা কিছুটা মলিন বাসার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে যাই । 

আমরা বসার ঘরে শান্ত হয়ে বসে থাকি । আমি একমনে নিজের হাতের রেখাগুলো দেখতে থাকি । মনে মনে নিজের সাথে নিজেকে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে রাখতে চাই । মিনিট কয়েক পর এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক- ভদ্রমহিলার সাথে সে আসে । আমি একটু মুখ তুলি । গতানুগতিক রীতি অনুযায়ী শাড়ি নয় , বরং ঘরোয়া সালোয়ার কামিজ পরনে । শান্ত অথচ গম্ভীর মুখ্রশ্রী । কিছুটা লম্বাটে ধাঁচ । এটুকু দেখেই আমি চোখ সরিয়ে নেই । তার সাথে আমার চোখাচোখি হয় না । সে কথা বলে আমার মায়ের সাথে , বাবার সাথে । তারপর আমি না তাকিয়েও বুঝতে পারি সে আমার দিকে তাকিয়েছে । সাথে সাথেই কেন যেন বিদ্যুৎ চমকের মত কেঁপে উঠি এবং প্রচন্ড বিচলিত বোধ করি । ভেতরে ভেতরে আমার শরীরের প্রতিটি কোষ থর থর করে কাঁপতে থাকে । আমার মনে হয় আমি হা করে আছি আর কেউ চামুক ভরে ভরে বিষাদ ঢেলে দিচ্ছে আমার মধ্যে । ফোঁটা ফোঁটা কান্না আর হাসি বুনে দিচ্ছে কেউ মাথার ভেতর । অনেক উঁচু একটা গম্বুজ বিশাল বড় দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে । আমি জানি দেয়ালের ওপারে যেতে না চাইলেও আমাকে যেতে হবে । আমার কপালে , কানের পাশে , গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে । কোথা থেকে যেন একটা অচেনা নির্যাস ছুটে আসে আমার দিকে আর আমি বুঝতে পারি এখন কী হবে ! 

আমি জেনে যাই মেয়েটির নাম প্রজ্ঞা । সে ইংরেজিতে সঠিকভাবে নিজের নাম লেখে Progma । যা নিয়ে প্রায়শই অনেকে হাসাহাসি করে। তার প্রিয় রঙ সবুজ । প্রিয় ফুল জারুল। অন্যান্য অনেকের মত সে বৃষ্টি দেখলে আবেগি হয়ে ওঠে না । তার ভালো লাগে ঝকঝকে রোদেলা দিন । আর তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হল ‘টর্ট ল’। 

তার মা এসে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় , সে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে - ‘হ্যালো ।’ 

আমি কাঁপা কাঁপা শরীরে হাত বাড়িয়ে দেই । এবং সাথে সাথেই সে আমাকে এক প্রচন্ড টানে নিয়ে যায় তাদের সবুজ রেলিং ঘেরা ছাদে । সেই ছাদে আছে অজস্র স্পাইডার লিলি ফুল । সেই ফুল থেকে মৃদুমন্দ ঘ্রাণ ভেসে আসে । আমার হলুদ রঙের এক মধ্য দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মেঘের অপেক্ষা করি । পাশের বাসার ছাদে রঙিন ঘুড়ির ভেসে যাওয়া দেখি । প্রজ্ঞা পিঠময় তার ঘন কোঁকড়া চুল ছড়িয়ে ছাদে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায় । আমি হাতে একটা গল্পের বই নিয়ে রেলিং এর ওপর ঝুঁকে থাকি। 

- ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন না ।’ প্রজ্ঞার কথা শুনে আমি চকিত দৃষ্টি দেই । হঠাৎ আমার খুব শূন্য লাগে । চোখের তারায় আকাশের সব বিষণ্ণতা এসে জমা হয় । সবকিছু খুব অস্পষ্ট লাগে । দূর বহু দূর থেকে কে যেন বলে ওঠে , ‘তোমরা কথা বলো । আমরা পাশের ঘরে যাচ্ছি ।’ 

- ‘আপনি কি খুব কম কথা বলেন ?’ 

আমি অস্বচ্ছ একটা ধারণা দেওয়ার মত করে নিচু স্বরে বলি , ‘ঠিক তা না ।’ 

- ‘আপনার মা আপনাকে নিয়ে অনেক গল্প করেছেন ফোনে । এও বলেছেন আপনি বিয়ে করতে খুব একটা আগ্রহী নন ।’ আমি আরও বিব্রত হই । তারপর অপেক্ষা করতে থাকি সে আর কি বলবে তা শোনার জন্য ।

- ‘দেখুন , সরাসরিই বলি । আমি নিজেও আসলে এখন বিয়ে করতে চাই না । পারিবারিক চাপ আর আবেগীয় টানাপোড়েনে পড়ে গিয়ে আজকে দেখা করার জন্য রাজী হয়েছি । বিয়ে নিয়ে যদি আপনার নিজের আগ্রহ না থাকে তাহলে এর চেয়ে আনন্দের সংবাদ আপাতত আমার জন্য আর কিছু নেই । আপনি কি তাহলে বাড়ি যেয়ে না আমার ব্যাপারে না করে দিতে পারবেন ?’ 

কোথায় যেন চুরচুর করে অসংখ্য কাচ ভেঙ্গে পড়তে থাকে । অথচ কোন শব্দ হয় না । আমার খুব কষ্ট হয় এবং বুক ভেঙ্গে যেতে থাকে । আমি আমার ডান হাতের দিকে তাকাই , সেই হাতে প্রজ্ঞার হাতের স্পর্শ লেগে আছে । আমি দেখতে পাই হাসপাতালে প্রজ্ঞা আমার বাবার হাত শক্ত করে ধরে আছে। আমি আর মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছি । দেখতে পাই কোন এক শীতের বিকেলে প্রজ্ঞা লন্ডনের থেমস নদীর পাশে গিয়ে আমাকে ফোন করছে । ওখানে খুব ঠান্ডা । বরফ পড়ছে। ওর মাথায় বেশ বড় একটা সাদা রঙের উলের টুপি । 

- ‘ কী হল ? আপনি কি আমার কথায় খুব আহত হলেন নাকি ?’ 

- ‘ন...না । অস্ফুটভাবে বলি আমি । আপনার ভিসা হয়ে গিয়েছে ?’ 

প্রজ্ঞা চমকে যায় কিছুটা । তার লম্বাটে মুখ আরেকটু লম্বা হয় । মুখটা আরেকটু গাম্ভীর্যে আবৃত হয় । সে বলে ওঠে - ‘কিভাবে জানলেন এই বিষয়ে ? আমি তো এখনও এমব্যাসি থেকে খবর পাই নি ।‘ 

- ‘আমি জানি ।’ 

- ‘আপনি কি গ্রিক মিথলজির দৈবশক্তি প্রাপ্ত কোন দেবতা ?’ সূক্ষ্ণ খোঁচার স্পর্শ পাই আমি তার কথায় । এই খোঁচা আমার অনেক পরিচিত মনে হয় । আমি জানি প্রজ্ঞা বিরক্ত হলে তা সরাসরি প্রকাশ না করে সুক্ষ্ণভাবে বলে । 

- ‘আপনার...’ একটু থামি আমি কথার মাঝে । তারপর আবার শুরু করি । ‘আপনার মায়ের সাথে বেশি মনোমালিন্যে যাবেন না । রাগ করে নিজের চুল কেটে ফেলবেন না ।’ 

প্রজ্ঞা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় । তারপর বলে, ‘আপনি কি কোন স্টকার ? কী কী জানেন আর ?’ আমি বুঝতে পারি তার কন্ঠস্বর অসম্ভব শীতল হয়ে উঠছে । 

আমি নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য খোলস সৃষ্টি করতে চেষ্টা করতে থাকি । একসাথে এত কথা আমি বহুদিন কারও সাথে বলি নি । এমনকি নিজের সাথেও নয় । যেন হাঁপিয়ে উঠি । আমি কিভাবে বলি , তার সাথে দেখা হবার পর থেকে আমার কাছে এক হাজার এক রাত্রির গল্প আছে । কী উত্তর দেব তাকে আমি ? বলতে কি পারব যে গিয়ার ভিয়ারের থ্রিডি সিনেমার মত করে সব দেখতে পাচ্ছি ? বলতে পারব যে আমি জেনে গিয়েছি , অসীম নামের বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত লোকটি ওকে খুব কষ্ট দেবে ? তারপর তিন বছর বাদে দেশে ফিরে এসে সবকিছু অচেনা মনে হবে ওর ? নাকি এটা বলব , আমাদের বিয়ের সুদীর্ঘ দশ বছরে সন্তানহীন থাকার কারণে তাকে একসময় নিয়মিত মানসিক থেরাপি নিতে হবে ? আমি আত্মসমপর্ণ করব নাকি তার উপহাস নেব ? আমার চারপাশে যেন ভারী বর্ষণ হতে শুরু করে । আমার মনে হয় আমার হৃৎপিণ্ডটা শরীরের ভেতর থেকে ছিটকে বের হয়ে সেই বর্ষনে ভিজতে শুরু করবে । আমি লম্বা শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করতে থাকি । 

- ‘দেজা ভু ।’ বিড়বিড় করি আমি । তারপর কিছুটা চঞ্চল হয়ে ওঠে বলি , ‘আমাকে ক্ষমা করো । আমি আজ বাড়ি ফিরে তোমার পরিবারকে না করে দেব কিন্তু তারপরেও আমাদের একসাথেই থাকা হবে । আমি আর কিছু বলতে পারব না ।’ 

- ‘মানে ?’ কিছুটা জোরেই বলে ওঠে সে । এরপর আর কিছু না বলে অস্থিরভাবে নিজের চুলে হাত চালিয়ে হেঁটে হেঁটে সামনের সোফায় আমার মুখোমুখি বসে । 

তারপর মৃদু ঘাড় কাত বলে - ‘সিনেমাটিক! আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল , ঘরকুনো , আঁতেল ধরণের ছেলেরা খুব খুঁতখুঁতে হয় । যাই হোক , আমি জানি না আপনি এতকিছু কিভাবে জেনেছেন । কেন জেনেছেন । আর জানতেও চাইছি না । এই বিয়ের প্রস্তাব থেকে আমাকে মুক্ত করে দিলেই আমি খুশি হব । আমি আসলেই দেশের বাইরে চলে যেতে চাই , এবং সেখানেই আমার থিতু হবার ইচ্ছে । আপনি না করে দিলে অনেক ঝামেলামুক্ত হয়ে যাব । না করা উপলক্ষে আগাম ধন্যবাদ রইল ।’ 

আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিরক্তি ঢেকে ভদ্রতা সুলভ একটু হাসি দিয়ে সে একরাশ কোঁকড়া চুল ছড়িয়ে পাশের ঘরে চলে যায় । আমি ম্লান মুখে বিশাল বড় ঘরটায় একাকী বসে থাকি । কেন যেন মনে হয় সুখ আর দুঃখ কর্পূরের মত আমার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে । অনেক উঁচু কোন জায়গা থেকে আমি পা পিছলে পড়ে যাচ্ছি । আর আলগা হয়ে যাচ্ছে আমার হৃদয় । আমি দেখতে পাই বিয়ের প্রায় এগার বছরের মাথায় পেছনের কোমরে এক হাত রেখে বেশ অতিকায় একটা পেট নিয়ে প্রজ্ঞা খাবার ঘরের দিকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে । তারপর কী হবে ? যেই আমি কয়েক ঘন্টা আগেও ভিন্ন এক মানুষ ছিলাম সেই আমিই কেমন যেন বদলে যাই । নিজের অনাগত সন্তানকে দেখার জন্য উৎসুক করতে থাকি । যেন আমি এক বসাতেই এক জীবনের সবটুকু পরিণতি দেখে নেওয়ার পণ করেছি । যেন বা সারা বছরের সিলেবাস এক লহমায় শিখে নিয়ে সব পরীক্ষা দিয়ে দেব । কিন্তু আমাকে হতাশ হতে হয় । আমি আর কিছু দেখতে পাই না । আর কোন ভবিষ্যৎ ভেসে ওঠে না । আমার সামনে ধীরলয়ে প্রজ্ঞার খাবার ঘরে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য চলতে থাকে । আমি আমার অনুভবে সেই নতুন সত্ত্বার স্পর্শ পাওয়ার গভীর তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি । আমার চোখ ভিজে আসতে থাকে । পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সে অতীতে ফিরে যেতে চায় নাকি ভবিষ্যৎ দেখতে চায় , বেশির ভাগ বোকা মানুষগুলোই ভবিষ্যৎ দেখতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । অথচ এটা খুব খুব ভুল সিদ্ধান্ত । নিশ্চিত বা অনিশিচত কোন ভবিষ্যৎকেই সময়ের আগে দেখে কোন লাভ নেই । শুধুই দুঃখ । শুধুই কাছাকাছি বিষাদ ছুঁয়ে দেখা । আর কিছুই নয় । কেন যেন আমার আর কোন কিছু বা কারও কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না । ভেতরের ঘর থেকে কিছু হাস্যজ্জল মানুষদের গল্পের টুকরো টুকরো শব্দ ভেসে আসে । আমি দো’তলার বসার ঘর থেকে দ্রুত নেমে আসি। ভবিষ্যতের সাক্ষ্য নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত আমার হাতে আর কিছুই নেই । 

শুধু গেইট দিয়ে বের হয়ে যাবার সময় আমি বুঝতে পারি , আজ থেকে ঠিক তিন বছর পরের এক বিমর্ষ প্রজ্ঞা দাঁড়িয়ে আছে ছাদের কিনারে । আর আমি পেছনে না তাকিয়ে তার দিকে ‘ আবার হবে দেখা ’ র মত নিঝুম বিদায়ি হাত নেড়ে ফিরে যাবার পথ ধরি । 






৩টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. গল্প ভালো লেগেছে। আপনার লেখার সরল অথচ মোহময় ভঙ্গিটা দারুণ। পাঠক এতে আটকে যাবেন অজান্তেই। আপনার আরো গল্প পড়তে চাই মাহরীন ফেরদৌস। বানানের প্রতি আরেকটু মনোযোগ দেবার বিনীত অনুরোধ থাকলো। শুভকামনা।

    উত্তরমুছুন
  3. গল্পটার মধ্যে দুটো জিনিস খুবই নাখুত ভাবে না পড়লে চোখে পড়বেনা। তাহলো প্রথমত অাপু এখানে একজন মানুষকে তার দেজ্যা ভূ অর্থাৎ মনে হচ্ছে যেনো ঘটনাটা এর অাগে কোথাও ঘটেছে এমনটি। এমন ক্ষমতা কিংবা হিমুর মতো অাধ্যাত্মিকতা দিয়েছে।
    এবং সবশেষে এমন একটি কথা জুড়ে দিয়েছে যেনো লেখক বনফুলের লেখখার মতো শেষ বাক্যে সমগ্র ভাব জুড়ে দেয়। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন