রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

অর্ক চট্টোপাধ্যায়এর গল্প : ট্যাচু

লুকোচুরি খেলার বিকেলগুলো সন্ধ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেখতে পেলে ধাপ্পা নয়, বরং দূর থেকে না ছুঁয়ে 'স্ট্যাচু’ বলতে হবে। 'স্ট্যাচু' বললেই স্থির। 'স্ট্যাচু' বললেই খেলা শেষ। 'স্ট্যাচু' বললেই সন্ধ্যে। 

'স্ট্যাচু' বললে সব থেমে যায়। সবাই থেমে যায়। 'স্ট্যাচু' বললে দেশ থেমে যায়? আর সময়? 

"হারাণ মাঝির বিধবা বৌটার আর কোন উপায় ছিল না, গলায় দড়ি দিয়ে মরল। বাইশবছরী আঁটো মড়া এখন তরতর করে খালের ঘোলা জলে ভেসে যাচ্ছে। দুটো কাক অনেক্ষণ ধরে ডেকে আসছিল এখন ফিরে যাবে।" 

মনসুর মিঞার দোকানে মাংস কাটার পরবর্তীতে যে সন্ধ্যা নামে তার নাম দূরত্ব। আলিবাবা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখে বাচ্চাদের লুকোচুরি খেলা। দূর থেকে দেখে। তার গায়ে পাঁঠা কাটা গন্ধ, তাকে কেউ 'ট্যাচু' খেলতে ডাকবে না। 

"আগামী নির্বাচন উপলক্ষে মনুমেনট ময়দানে যে মিটিং ডাকা হয়েছিল তাতে খুব হাঙগামা হয়, ট্রাম-বাস পোড়ে, পার্ক স্ট্রীটের মোড়ে মহাত্মা গান্ধীর যে স্ট্যাচুটা ছিল কি করে সেটা ভেঙে যায়। সবাই যখন দুঃখ করছে, হায় রাম একি হল বলছে, তখন আমেরিকা ঘোষণা করল তারা টাকা দিয়ে ওখানে একটি সোনার গান্ধী বানিয়ে দেবে।" 

আলিবাবা ভাবে একা একাই খেলবে। নিজেই নিজেকে 'ট্যাচু' বলবে। দেখবে ট্যাচু বললে সব থেমে যায় কিনা। ট্যাচু বললে কি পাঁঠা কাটা বন্ধ হয়ে যাবে? তারপর কি ও ইস্কুল যেতে পারবে আবার? সব থেমে গিয়ে কি নতুন কিছু শুরু হবে? 

"হারাণ মাঝির বিধবা বৌ কেন আত্মহত্যা করল তার সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গভরমেনটের হিসেব অনুযায়ী এ বছর পশ্চিমবংগ খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত রাজ্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এক ভাষণে বলিয়াছেন, আমাদের দেশের একটি লোককেও দুর্ভিক্ষ-পীড়িত হইয়্যা দ্যাট ইজ না খাইয়া মরিতে দিব না। কেহ কেহ বলেন আমাদের অধিকাংশ খাদ্যশস্য ইঁদুরে খাইয়া ফেলিতেছে। ইঁদুরের বংশ নির্বংশ করিতে পারিলেই আমরা নিশ্চিন্ত হই। " 

আলিবাবা নিজেকে 'ট্যাচু' বলে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। সন্ধ্যা ঘন হয়। একটু দূরে, মাঠের উল্টোদিক বরাবর যে রাস্তাটা গেছে তার কোণের দিকের ম্যানহোলটা খুলে সন্ধ্যার থেকেও ঘন একটা লোক উঠে আসে। আলিবাবাকে দেখতে পেয়ে সেও ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সন্ধ্যাটা যেন ঘুরপাক খেতে থাকে। 

"একজন বিখ্যাত জননেতা সারাদিন যিনি নানাধরনের সমাজসেবায় ব্যস্ত থাকেন দুপুরের খাবার টেবিলে বসতে গিয়েই দুর্গন্ধ: টেবিলের ওপর হারাণ মাঝির বৌয়ের মড়া পড়ে আছে। ভোর রাতে ট্রাম চালাতে চালাতে ট্রাম-কনডাকটার হঠাৎ নাকে রুমাল চেপে ধরে বিস্ফারিত চোখে দ্যাখে চলার পথ বন্ধ, রাস্তার ওপর হারাণ মাঝির বৌয়ের মড়া শুয়ে আছে। সারা শহরময় খবর ছড়িয়ে পড়ল। সবাই ভীত, মরা মাছের চোখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গণ্যমান্যদের ঘরের চৌকির নিচে, আলমারির পেছনে, খাবার ঘরের মেঝেতে, কলতলার অন্ধকারে হারাণ মাঝির বৌয়ের মড়া পাওয়া যাচ্ছে।" 

ম্যানহোল। অর্থাৎ মানুষের গর্ত? আলিবাবা এতটুকুই ইংরেজি জানে। কিন্তু প্রশ্ন হল, গর্তটা তো রাস্তায়? মানুষের শরীরে তো আর নয়! তাহলে ওকে ম্যানহোল কেন বলে? কে বা কারা ঢোকে ঐ ম্যানহোলের ভেতর? আরো বড় প্রশ্ন হল, কেন ঢোকে? নাকি ঢুকতে হয়, যেমন আলিবাবাকে পাঁঠা কাটতে হয়? 

"সকালবেলা আমেরিকান বিমানটি দমদমে নামছে, চারিদিকে গণ্যমান্য সবাই অপেক্ষা করে রয়েছেন, এক সম্ভ্রমপূর্ণ মুহূর্ত, এই বিমানে গান্ধীজীর সোনারমূর্তি রয়েছে। ভিড়ের ভেতর থেকে শোনা গেল গান্ধী আমাদের আদর্শ গান্ধী আমাদের আরাধ্য। দেড় বছরের অনাথ বাচ্চাটি সমানে কেঁদে চলেছে। কে যেন হাত তুলে আকাশে কাক-শকুন উড়ছে দেখিয়ে দিল। এবার কাঠের বাক্স নামানো হচ্ছে, ডালাটা খোলা হবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রধান তাঁর দস্তানাপরা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন গান্ধীজীর সোনারমূর্তি স্পর্শ করার জন্য। সৈন্যবাহিনী রাজকীয় মর্যাদায় দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় পতাকা, সিল্কের তৈরি পৎ পৎ উড়ছে। ড্রাম বাজছে তালে তালে। অনেক ফালতু লোক ব্যাপার কি দেখার জন্য দূর থেকে উঁকি ঝুঁকি মারছে, তাদের ঘেষতে দেওয়া হচ্ছে না। এক সময় বাক্সটার ডালা খোলা হল, এবং সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত উপস্থিত জনবর্গ সবিস্ময়ে দেখলেন বাক্সটার উপরে হারাণ মাঝির বৌয়ের গলিত মড়াটি শোয়ানো রয়েছে। সকলে সমবেত চমকালেন, নাকে রুমাল দিলেন এবং বুঝতে পারলেন হারাণ মাঝির বৌয়ের মড়া না সরালে সোনার গান্ধীমূর্তির নাগাল পাওয়া যাবে না।" 

ট্যাচু। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাচ্চারা যে যার বাড়িতে ফিরে গেছে। আলিবাবা আর ম্যানহোলের হোলম্যান এইদুজন কিন্তু স্থির। একে অপরের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। যেন একে অন্যকে চেনে। আলিবাবা ভাবে, তবে কি ও আমার সঙ্গে ট্যাচু খেলবে? ট্যাচু বললেই সব থেমে যাবে। পুরোনো জিনিস থেমে গেলে কি নতুন জিনিস তৈরী হবে? 

"Your avatar shall stand tall, Sardar. In the midst of the river, on the Varata Bawa Tekri. We watch with hope that your Avatar shall watch over and stop all that is unjust, against unity, equity and sustainability. We seek the blessings and support of your iron hand for today and for ever. We look forward to having you there when adivasis raise their voice, amidst festive tourists who will gather on the 31st and everyday, with or without your legacy, but all vows for a new touristocracy. We know you alone will listen to the adi-vasis, their cry halt, inspiring them to fight for their rights and the Mother River’s too ! Narmada appeals to you, Sardar!" 

নদী বয়ে যাবে স্থানীয় আদিবাসীদের বেকারজীবনের মতো। দেশে একটা একতা আসবে। জনমিনিষ্যিহীন স্থানে পৃথিবীর উচ্চতম মূর্তি দেখতে থাকবে আদিবাসীদের। দেখবে নর্মদা নদী। তারপর একদিন পাশের গ্রামের আদিবাসী বাচ্চা, যার নাম আলিবাবা নয়, এসে তিনশো কোটির সুবিশাল প্যাটেল-মূর্তির সামনে দাঁড়াবে আর বলবে 'ট্যাচু'! 

ট্যাচু বললে ধাতু গলে ছড়িয়ে পড়বে পশ্চিমাকাশে। 
ট্যাচু বললে খেলা শেষ হবে। 
ট্যাচু বললে সন্ধ্যা নেমে আসবে। 



--------------------------------------------------------
ঋণস্বীকার: সুবিমল মিশ্র এবং মেধা পাটকর।




লেখক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায়
গল্পকার, প্রবন্ধকার, অনুবাদক। 

২টি মন্তব্য: