রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী'র গল্প : খালপোল ও টিনের ঘরের চিত্রকর

নতুন কংক্রিটের পোল তৈরী হওয়ার পর জায়গাটার চেহারা বদলে গেছে। এধারের খালটাকে আর চেনা যায় না। চিনতে কষ্ট হ’ত না, যদি ওপরের ডালপালা ছড়ানো প্রকাণ্ড শিরিষ গাছটা কাটা না পড়ত। কিন্তু যারা পোল তৈরী করতে এসেছিল তারা, গাছটাকে রক্ষা করতে পারেনি।

গাছ গেছে তাই আকাশ বড় হয়ে গেছে, আর তার সঙ্গে কালের পুরোনো জংলী চেহারা পাল্টে গিয়ে শহুরে শ্রী ফুটে উঠেছে। কারোর ভালো লাগে, কারোর লাগে না। শিরীষ গাছের ছায়ায় ছায়ায় কাঁটানটে আর কচুর জঙ্গল ছড়িয়ে থাকত কত! পাখির কিচিরমিচির শোনা গেছে সকাল-সন্ধ্যা। ফড়িং দেখা গেছে, প্রজাপতি দেখা গেছে। এখন সব শেষ। যেন সাদা নতুন চুনকাম করা বিশালকায় সেতু এপারের কালো চকচকে পীচের রাস্তার সঙ্গে ওপারে কাঁচা মাটির পথের মিতালি পাতিয়ে হা-হা করে সারাদিন হাসছে। এমনকি পোলের সাদা ছায়া পড়ে খালের শ্যাওলা রঙের জলটাও যেন আগের মতো নেই। বুনো বুনো ভাবটা চলে গেছে। কেমন একটা ফ্যাকাশে রঙ ধরেছে। যেন গাঁয়ের মেয়ে সবুজ ধনেখালি শাড়ি ছেড়ে সাটিনের ফ্রক চড়িয়েছে, কারোর ভালো লাগে, কারোর লাগে না।

হ্যাঁ, খালপোল মিতালি পাতিয়েছে এপারের সঙ্গে ওপারের। তাই কোনোদিন যাদের দেখা যায়নি, সেই সব জেলে ডোম বাগদীর ছেলেমেয়েরা ওপারের ধুলো বালি কাদা জঙ্গল আর মাটির সঙ্গে নুয়ে পড়া পাতার ঘর, হোগলার ডেরা ছেড়ে এখন হুটহাট পোলের উপর চলে আসে।হাঁটু পর্যন্ত ধূলা, ময়লা কাপড়ে লালচে রুক্ষ চুল, শুকনা মুখ নিয়ে ওরা পোলের ঝকঝকে কার্নিশের ওপর হাত রেখে নিচের জল দেখে হি-হি করে হাসে। ওরা খুশি। ওদের ভালো লাগছে এই পোল। ঠেলাগাড়ির ওপর কচু কুমড়ো ডাব কলা লাউশাকের আঁটি চাপিয়েচাষীরা দিব্যি পোলের উপর দিয়ে গড়গড় এপারের পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে মেটালড করা রাস্তায় নেমে আসে, তারপর ভালো ভালো বাজারগুলো যেদিকে আছে সেদিক ছুটে যায়। যেন রাতারাতি ওরা জেনে ফেলেছে এপারের কোন বাজারে তাদের ডাব মোচা কি কচু লাউশাক চড়া দামে বিক্রী হবে। ওদের মুখে এখন হাসি।

আবার মুখ কালো করে পোলের ওপর এসে দাঁড়ায়, ভুরু কুঁচকে সূর্যাস্তের লাল রঙ দেখতে দেখতে অপ্রসন্ন চোখে ময়লা কাপড় পরা ওপারের নোংরা মুখগুলিকে পাশে দেখে অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এমন মানুষও আছে। তারা এপারের বাসিন্দা। তাদের গায়ে ভাল জামা, পায়ে দামী জুতো। বিকেলের হাওয়া খেতে বেড়াতে বেড়াতে এখানে আসে। কিন্তু এদের সকলেই কিছু অসুখী নয়। নিজের গাড়ি আছে এমন সব সুখী মানুষেরা পোলের ভিড় পিছনে রেখে সোঁ করে ওপারের মাটির রাস্তায় নেমে যায়। প্রচুর ধুলো উড়িয়ে গাড়ি আরো দূরে চলে যায়। তারপর আর দেখা যায় না। হয়তো সবুজ বিকেল দেখতে পাখির কিচিরমিছির শুনতে ওরা বাগদীপাড়া জেলেপাড়া পার হয়ে বনের দিকে চলে গেল। পোলটাকে ওরা ধন্যবাদ জানায়।

কদিন পর্যন্ত পোলটাই একটা বিস্ময়, নতুনত্ব হয়ে রইল ওপারের মানুষ আর এপারের মানুষদের কাছে। তারপর যখন সেই নতুনত্ব যখন সকলের চোখে আস্তে আস্তে সয়ে গেল, স্বাভাবিক হয়ে এল, তারপর একদিন সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল এক অদৃশ্য শিল্পীর হাতের আঁকা নানা চিত্র পোলের গায়ে ফুটে উঠেছে। ফুল লতাপাতা মাছ পাখি। পোলের ঢালু দিকের চুনকামকরা সাদা অংশটায় শিল্পী ভারী যত্ন করে এইসব এঁকে রেখেছে। এ পাশের ঢালুর দিকেও লতাপাতা ফুল মাছ পাখির চিত্র আঁকা রয়েছে। ইঁটের গুঁড়ো নয়তো কাঠকয়লা ঘষে ঘষে চিত্রাঙ্কন করে গেছে শিল্পী। বোঝা যায় তার তুলি নেই, দোকান থেকে রঙ কিনে আনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু সেটা বড় কথা না। অঙ্কনটাই আসল নয় চিত্রগুলিই এখানে বড়। তাছাড়া ইঁটের রংও রং, কয়লার রংও রং।

এপারের ভালো জামাকাপড় প্রা মানুষেরা মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল একটা জিনিয়স। হয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। হয়তো অনাদরে অবহেলায় থেকে নিজেকে তেমন করে প্রকাশ করতে পারছে না।কিন্তু তাতে কি, মহৎ শিল্পীর প্রতিভা নিয়ে যে লোকটার জন্ম হয়েছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আহা কি চমৎকার হাত!

ওপারের ময়লা কাপড় পরা নোংরা চেহারার মানুষগুলি বিচিত্র সব ছবি দেখে হি-হি করে হাসল, ‘পাগলা, মাথায় ছিট আছে বেটার। সারারাত কয়লা আর ইঁটের টুকরো ঘষে ঘষে এই সব কর্ম করে গেছে। খেয়েদেয়ে কাজ ছিল না – দুনিয়ায় কত রকমের জীব আছে রে বাবা।’

জীবকে তারা দেখতে পায়না। গুণগ্রাহী বুদ্ধিমান শহুরে দর্শকদের কাছেও মহৎ শিল্পী অজ্ঞাত থেকে গেল। বেড়াতে এসে, কি ব্রিজ পার হবার সময় টাটা দু দণ্ড দাঁড়িয়ে গেছ লতাপাতা ফুল পাখি মাছ দেখে।

তিনদিন পর পোলের আর এক পাশে চিত্র ফুটে উঠল। এবার আর গাছ ফুল পাখি মাছ না। চন্দ্র সূর্য পর্বত সমুদ্র ঝরণা নদী। ওপারের মানুষগুলো আবার দাঁত বের করে হি-হি করে হাসল। ‘পাগলা বেড়ে কাজ পেয়েছে। সারা পোলটাই চিত্তির করে ফেলবে দেখছি!’

এপারের শহুরে মানুষরা মুগ্ধ বিস্ময়ে কাঠকয়লা ইঁটের টুকরো দিয়ে আঁকা চন্দ্র সূর্য সমুদ্র পর্বত দেখতে দেখতে আদিম সৃষ্টির কথা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আহা যদি একবার দেখতে পেতাম।’ যেন দেখা পাওয়া মাত্র তারা তাকে বরণ করে নিত, সভা করে, তার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিত, তারা খাওয়া প্রা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে জনসাধারণের কাছ থেকে চাঁদা তোলার ধুম পড়ে যেত, সরকারী সাহায্যের জন্য আবেদন নিবেদন আরম্ভ হয়ে যেত।

‘কিন্তু পাগলা দেখা দেবে না।’ ওপারের অশিক্ষিত মানুষগুলো হি-হি করে হাসে। ‘পাগলা জেনে ফেলেছে, গা ঢাকা দিয়ে যতদিন চলা যায় ভাল। না হলে শহুরে বাবুর দল তাকে ধরে বেঁধে বলবে এটা আঁক ওটা এঁকে দে। ফাই-ফরমাস করে বেটার প্রাণচিত করে দেবে। নিজের মর্জিমত অমন চমৎকার চাঁদ ফুল সূয্যি চিত্রি করতে পারবে না। ওপারের নোংরা চেহারার মানুষগুলির এরকম একটা আশঙ্কা করবার কারণ আছে। কেননা তারা চোখের ওপর দেখেছে পোলের গায়ে চন্দ্র সূর্য মাছ পাখি দেখতে বাবুদের মধ্যে হিড়িক পড়ে গেছে। ক্রমেই বাবুর সংখ্যা বাড়ছে, গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে কাগজওয়ালারা এসে যখন-তখন ফটো তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সেদিন একটা লম্বা কালো গাড়ি চেপে ফ্রক পরা বেণী দোলানো এক ঝাঁক মেয়ে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেক চিত্রগুলি দেখে গেল।

‘লোকটা কখন এসব আঁকে রে?’ একটা আর একটিকে বলছিল। ‘অথচ আজ পর্যন্ত শুনেছি কেউ ওকে দেখতেই পেলে না!’

‘রাত্তিরে।’ গম্ভীর হয়ে আর একটি মেয়ে বলেছিল। ‘আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, সব মানুষে যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন এসে এঁকে যায়।’

‘তা হবে।’ চোখ তুলে আর একজন পোলের চার কোণার উঁচু থামগুলি দেখল। গম্বুজের মত চারটে থামের মাথায় বালব ঝুলছে। ‘সারা রাত আলো জ্বলে। আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ও ছবি আঁকে।’

‘আলো না থাকলেও ও ঠিক এঁকে যেত। এই শিল্পী সাধারণ মানুষ না। ঐশ্বরিক শক্তিসম্পন্ন কোনো পুরুষ হবে।’ কথাটা বলেছিলেন এক বৃদ্ধ। মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে। পুরু চশমা নাকে ঝুলিয়ে স্কুলের মেয়দের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গভীর মনোযোগের সাথে ছবি দেখছিলেন।

মেয়েরা তাঁর কথা শুনে চুপ করে গেল।

বৃদ্ধ হাত ঘুরিয়ে বক্তৃতা করলেন, ‘আমাদের এই সমাজ কি আর সমাজ আছে। সভ্যতার সংস্কৃতির বড়াই করে মরছি। অথচ যে দিকে তাকাবে দুর্নীতি ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। সত্যিকারের জ্ঞানী গুণী – বিশেষ করে যদি শিল্পী হন এই অধঃপতিত সমাজে নিজেকে ধরে রাখতে লজ্জাবোধ করেন। উঁ হুঁ এই সমাজের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি নিজের খাপ খাওয়াতে পারেন না। আমার তো মনে হয় এই শিল্পীও শুদ্ধচরিত্রের উন্নতমনা কোনো পুরুষ-ঋষিতুল্য ব্যক্তি – হয়তো তাঁর খাওয়া পরায় কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তা হলেও তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেই নিজের শিল্পীসত্তাকের বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।’

‘আমার মনে হয় আধুনিক সভ্যতাকে ব্যাঙ্গ করতে শিল্পী ইঁট কাঠকয়লা দিয়ে ব্রীজের গায়ে এসব ছবি এঁকে রাখছে। আমরা কৃত্রিম হয়ে গেছি, আমাদের সভ্যতাটা মেকী। সূর্য পাখি ফুল এঁকে শিল্পী বোঝাতে চাইছেন আমরা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’ একটি যুবক বৃদ্ধের সাথে কথা বলছিল। ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, লোকটি সাধক যোগী – বস্তুত সত্যিকারের শিল্পী তাই হয়। কেবল ছবি ও গানের ভিতর দিয়ে মানুষকে শিক্ষা দিতে মাঝে মাঝে এঁরা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন।’

‘তা হবে।’ বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। ‘কেবল আর্টিস্ট বললে এঁদের অপমান করা হয়। এঁরা প্রফেট।’

স্কুলের মেয়েরা কথাগুলির অর্ধেক বুঝল, অর্ধেক বুঝল না। ছবি দেখা শেষ করে আবার তারা দল বেঁধে কালো গাড়িতে গিয়ে চাপল। বৃদ্ধ পোল পার হয়ে অপেক্ষাকৃত মুক্ত নির্মল বায়ুসেবনের আশায় ওপারের দিকে হাঁটতে লাগলেন। যুবকটি শহরের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। ততক্ষণে নতুন দর্শকেরা এসে পোলের উপর ভীড় করে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এটা কি হল। দিন পাঁচ ছয় পর এক সকালে দেখা যায় লতাপাতা ফুল পাখি চন্দ্র সমুদ্র পাহার মুছে দিয়ে অদৃশ্য চিত্রকর পোলের দু পাশটায় সাপ ব্যাঙ বিছা টিকটিকি আরশোলার ছবি এঁকে ভরে রেখেছে। ওপারের অশিক্ষিত মানুষগুলি আবার দাঁত বার করে হাসল। কেননা তারাই আগে দেখল ছবিগুলি। ডাব কুমড়ো লাউশাকের আঁটি বোঝাই ঠেলা গাড়ি নিয়ে সূর্য ওঠার আগে তারা পোলের উপর ছুটে আসে। ঠেলা থামিয়ে কিছুক্ষণের জন্য ওরা দাঁড়িয়ে পড়ে। কেননা ছবিগুলি নতুন। পাখি চাঁদ ফুল সমুদ্র ওদের চোখে পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। সে সব দেখতে ইদানীং তারা বড় একটা গ্রাহ্য করেনি। সঙ্গের ছোট ছেলেটা তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে এক দুই করে গুনতে শুরু করে দেয়, তারপর ঠেলার কাছে ছুটে এসে চেঁচাতে থাকে, ‘মামা, চৌদ্দটা সাপ, আটাশটা ব্যাঙ, তিনকুড়ি আরশোলা, বাইশটা টিকটিকি হি-হি।’ তার হাসির সঙ্গে বড়রাও যোগ দেয়। ‘বাবুদের ভিড় বাড়ছে, তাই ব্যাটা মজা করতে সাপ ব্যাঙ চিত্তির করে রেখেছে, এবার কাগুজে ছোঁড়ারা এসে ফটোক তুলে নিয়ে যাক হা-হা।’

খালের ওধারের বাগদীপাড়ার ছেলেমেয়েরা দিনভোর পোলের এ মাথা ও মাথা ঘুরে সাপ ব্যাঙ আরশোলার ছবি দেখল। ‘পাগলা কাল রাতে গাঁজা টেনেছিল, না হলে গণ্ডায় গণ্ডায় হেলে সাপ চিত্তির করবে কেনে। আর সব কিনা কোলা ব্যাঙ, থপাস করে ছুটছে রে দিদি হি-হি।’

কিন্তু এবারেও শহরের ভদ্রপাড়ার মানুষেরা শিল্পীর নতুন সৃষ্টি দেখতে পোলের ওপর ভীড় করতে ভুল করল না।

‘মর্জি, শিল্পীর নতুন খেয়াল।’ ছবি দেখে তারা মন্তব্য করল।

‘সাধক শিল্পী-প্রকৃতির আর একটা দিক আমাদের চোখের সামনে উন্মোচন করে ধরল।’ সাদা চুল মাথার সেই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে সেদিনের যুবকটি মন্তব্য করল।

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। চশমার পুরু লেন্‌স ভাল করে মুছে নিয়ে ফের সেটা নাকে তুলে দিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করলেন। ‘মানে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, আণবিক সভ্যতার বড়াই করে আমরা যতই লাফালাফি করি না কেন, ধ্বংসের মুখে এসে পৃথিবী থর থর করে কাঁপছে। শিল্পী বলতে চাইছে, দু পায়ের ওপর দাঁড়ানো মানুষের দিন শেষ হতে আর দেরী নেই, ওরা আবার আসছে, আসছে, আবার বুকের ওপর ভর দিয়ে চলা জীবদের রাজত্ব চলবে কয়েক কোটি বছর।’

কথা শুনে স্কুলের মেয়েগুলি গম্ভীর হয়ে গেল। এতক্ষণ ওরা বেশ মজা পাচ্ছিল সাপ ব্যাঙ টিকটিকি আরশোলা বিছার ছবি দেখে। যেন আনাজওয়ালাদের সঙ্গের সেই ছোট ছেলেটির মত এক দুই করে কটা ব্যাঙ কটা টিকটিকি গুনতে আরম্ভ করেছিল। আবহাওয়াটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যেতে ওরা সরে গেল। তবে তাদের আশা রইল আর একদিন হয়তো এসে দেখতে পাবে পোলের গায়ে বাঘ সিংহ বাইসন হাঙর কুমীর আঁকা রয়েছে।

ফাল্গুনের শেষ। এক রাত্রে জোর বৃষ্টি হয়ে গেল। পরদিন সকালে দেখা গেল বৃষ্টির জলে ধোয়ামোছা হয়ে নতুন ব্রীজটা আগের মত তকতকে ঝকঝকে গতে আছে। একটু আঁচড় নেই, একটু দাগ নেই কোথাও। কেউ কোনোদিন পোলের গায়ে চিত্রকর্ম করেছিল কে বলবে। কাজেই আর ভীড় নেই। ওপারের মানুষেরা এপারে এল। বাস দেখল রিকশা দেখল দোকানপাট দেখল, ঝকঝকে পোশাকের শহুরে মানুষগুলির দিকে তাকিয়ে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এপারের কিছু মানুষ ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে খালের ঘোলা জল দেখল, খড় বোঝাই নৌকা দেখল, আকাশ দেখল – কিছু মানুষ ব্রীজ পার হয়ে পাখি দেখল, তারপর আবার শহরের দিকে ফিরে এল। পোল দেখতে, পোলের গায়ে বিচিত্র ছবি দেখতে আজ কেউ দাঁড়ায় না। যেন হাজার বছরের পুরোনো এই সেতু – এর আবার নতুনত্ব কি, এর দিকে তাকাবার আছে কি। দুপুরের গনগনে দোদ মাথায় নিয়ে নিঃসঙ্গ ব্রিজটা মানুষের স্বভাবের কথা চিন্তা করে ঠোট টিপে হাসছিল হয়তো।

অবশ্য পরদিনই সকালবেলা আবার সকলকে চোখ তুলে পোলের দিকে তাকাতে হল। সাপ ব্যাঙ না, হাঙর কুমির বাঘ বাইসন না – আনাজওয়ালাদের সেই ছেলেটা গুণে গুণে দেখেল এধারে কুড়িটা ওধারে কুড়িটা মানুষের মুখ এঁকে রেখে গেছে কে। ‘উঁহুঁ, একটাও পুরুষ মানুষের মুখ না, সব মেয়ে মানুষের মুখ হা-হা।’

ওপারের বাগদী আর জেলেপাড়ায় হেসে লুটোপুটি।

‘বেটার বৌ পালিয়েছে, তাই না মনের দুঃখে ওই কর্ম করেছে। রাতভর মেয়েছেলের মুখ চিত্তির করে গেছে, হি-হি।’

যেন এতকাল পর লোকটা নিজেকে ধরা দিয়েছে, যেন আজ বোঝা গেছে কী দুঃখ বুকে নিয়ে সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। হুঁ, এ সব ব্যাথা নিয়েই তো মানুষ কবিতা লেখে, গান গায়। বিরহী শিল্পীর ছবি আঁকাটাও তাই। তার উপর কিনা –

চোখ বড় করে এপারের সুশ্রী চেহারার সুন্দর পোশাকের মানুষগুলি এপাশে কুড়িটা মুখ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। নারীমুখ ছাড়া আর কি ? বলয়াকৃতি, পূর্ণ চাঁদের আকৃতি, ডিমের আকৃতি, শঙ্খের আকৃতি। নরম রেখার সব মুখ পর পর সাজান।

‘দেখছেন না, ওদের চোখে তৃষ্ণা, অধরে কামনা।’ পক্ককেশ বৃদ্ধের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে সেই যুবক মৃদু মৃদু হাসে। ‘আমার মনে হয়, আমার তো ধারণা হচ্ছে লোকটা ব্যার্থ প্রেমিক সংসার ভালো লাগল না। এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে-’

কথা শেষ করতে দেন না বৃদ্ধ। যেন আজ তিনি ক্ষুব্ধ, ব্যথিত।

‘কিন্তু তা হলেও এতগুলি নারীমুখ এমন প্রকাশ্য স্থানে এঁকে রাখার দরকার ছিল না। এটা অশোভন। এখনি হয়তো স্কুলের মেয়েরা ছুটে আসবে পোলের গায়ে আজ কি আঁকা রয়েছে দেখতে।’

‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে লোকটা সিনিক হয়ে গেছে।’ যুবক ঢোক গিলল, তারপর আস্তে বলল, ‘আমার তো ধারণা শিল্পী বহু নারীর প্রেমপ্রার্থী হয়েছিল। কিন্ত একজনও একটি মেয়েও তার উপর সদয় হয়নি।’

‘তা হবে, তা হওয়া আশ্চর্য না।’ বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। ‘এবং এই কারণে যে লোকটার মাথার দোষ হয়েছে এটাও এখন বুঝতে পারছি।’

‘আমার তাই মনে হয়। তাই সেদিন এতগুলো সাপ ব্যাঙ আরশোলা টিকটিকি এঁকে রেখেছিল, তাই সেদিন দেড় হাজার ফুট লম্বা ব্রিজটা চন্দ্র সূর্য সমুদ্র পর্বত এঁকে ভরে রেখেছিল। পাগল।’

‘এবং বিকৃতদর্শন।’ বৃদ্ধ কঠিন গলায় মন্তব্য করলেন। ‘তার দিকে কোনো রমণী মুখ তুলে তাকাতেও নিশ্চয় লজ্জা পায়। আর – আর সেই রাগে দেখছেন না। সব কটা মুখ লালসাবিকৃত করে আঁকা হয়েছে – আমার তো ইচ্ছা করছে সবগুলো মুখ মুছে ফেলা হোক।’

ভিড় বাড়ছে। গুঞ্জন বাড়ছে। স্কুলের মেয়েদের নিয়ে লম্বা গাড়িটা এসে গেছে। কিন্তু তারা আর গাড়ি থেকে নামল না। বৃদ্ধ গাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নিষেধ করলেন, ‘মা আজ তোমরা ফিরে যাও, এসব ছবি তোমাদের জন্য না।’ কিন্তু তবু যেন দু একটি কৌতুহলী মুখ জানলার বাইরে তাকাতে চেয়েছিল। গাড়ি তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নিতে যুবক তারস্বরে ড্রাইভারকে আদেশ করতে গাড়ি ব্রীজের নীচে নেমে গেল।

‘তাই বলছিলাম ভাই, দুর্নীতি, চতুর্দিকে পাপ।‘ বৃদ্ধ ঘামছিলেন, উত্তেজনায় কাঁপছিলেন। ‘একটু হাওয়া খেতে ব্রীজের দিকে বেড়াতে আসি। এখন দেখছি তাও বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে যদি পোলের গায়ে কেউ চিত্রবিদ্যা ফলাতে থাকে তো আমরা যাই কোথায়।’

‘আপনার মশাই বাড়াবাড়ি।’ যেন বুড়োমতো এক ভদ্রলোক মন্তব্য করলেন। ‘না হয় শখ করে কটা মুখ এঁকেছে – তাতে এমন কি আপত্তিকর –’

ভদ্রলোককে কথা শেষ না করতে দিয়ে যুবকটি চিৎকার করে উঠল। ‘আপনি চুপ করুন, আপনি থামুন, আপত্তি করার যথেষ্ট কারণ আছে। একটা মুখ না, চল্লিশটা মেয়েমুখ যদি কেউ রাস্তার উপর, একটা পোলের গায়ে ইঁট কাঠকয়লা দিয়ে এঁকে রাখে তো বুঝতে হবে, যে এসব এঁকেছে কেবল তারই রুচি বা মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেনি – জনসাধারণের মধ্যে এই বিকৃতির চালান দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে রাত জেগে সে এসব কাজ করে গেছে।’

ভদ্রলোক চুপ। বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে রুমাল বার করলেন, যুবকটিও বার করল। তারপর দু’জনে লেগে গেলেন ছবিগুলি মুখে দিতে। ‘এটা আমার একলার না, সকলের দায়িত্ব।’ বৃদ্ধ থেকে থেকে ঘাড় ফিরিয়ে উপস্থিত শিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, ‘সুতরাং সকলেরই দৃষ্টি রাখতে হবে, যেন আর কোনোদিন এখানে এসব মুখ আঁকা না হয়।’

দু’জনের দেখাদেখি আরও কয়েকজন রুমাল বার করে ওপাশের মুখগুলি মুছতে লেগে গেল। দশ মিনিটের মধে পোল খালি করে দর্শকের দল সরে যায়। পড়ন্ত রোদের আভা গায়ে নিয়ে ব্রিজটা যেন আলস্যের হাই তোলে। আজ আবার তার দিকে কেউ তাকাবার নেই। ঘোলা জলের দিকে স্থির দৃষ্টি মেলে ধরে খালপোল খালের বুকের কাঠবোঝাই নৌকাটির মন্থর গতি দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে ওঠে।

একটানা তিনদিন এভাবে কাটল। কোনো ছবি নেই, কোন দর্শক নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। আনাজের গাড়িগুলি গড়গড় করে পোল পার হয়ে শহরের পীচের রাস্তায় নেমে যায়। পোলের ওপর তারা কোনোদিন দাঁড়িয়েছিল মনে করতে পারে না। জেলে আর বাগদীপাড়ার মানুষগুলো শহরের আলো দেখে গাড়ি দেখে – সময় সময় গুটিগুটি পোল পার হয়ে এধারের সিনেমাঘরের দেয়ালে আটকান রঙিন ছবিগুলির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। বাবুরা হাওয়া খেতে পোলের উপর উঠে জল দেখেন, আকাশ দেখেন। যাদের গাড়ি আছে, তারা ব্রীজ পিছনে রেখে ওপারের ঠাণ্ডা নরম মাটির রাস্তায় নেমে যান। গাঁয়ের বিকেল, বনের পাখির ডাক তাদের প্রিয়। খালপোল না।

রাত্রে বিশাল চাঁদ দেখা দিল আকাশে। চার কোণার গম্বুজের মাথায় ইলেট্রিক বালবগুলিও পোলের গায়ে কম আলো ছড়াল না। কিন্তু আজ কি আর লোকটা ছবি আঁকবে। কেউ কেউ ভাবল, নিশ্চয় তার এমন যত্ন করে আঁকা চিত্র মুছে দেওয়াতে শিল্পী অপমান বোধ করছে। অভিমানে সে আর এদিক মাড়াবে না। কে জানে হয়তো অন্য কোথাও আর কোনো পোলের গায়ে কি বাড়ির দেওয়ালে সে ছবি আঁকছে।

কেউ কেউ ভাবল, কিন্তু তাদের সেই ধারণা যে কত ভুল সকালের লাউ কুমড়ো গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে পোলের উপর উঠে গাঁয়ের মানুষগুলো সকলের আগে তার প্রমাণ পেল। চিত্রগুলির ওপর চোখ পড়তে তারা চোখ ফিরিয়ে নিল। সঙ্গের ছোট ছেলেটি হেসে ফেলেছিল, বড়দের ধমক খেয়ে বেচারা চুপ করে গেল।‘শালার কাণ্ডকারখানা দেখ – ইস্‌ কী কুচ্ছিত চিত্তির করে গেছে সারাটা পোলের গায়ে।’ যেন তারা নিজেরাই লজ্জা পেল ছবিগুলির দিকে তাকাতে। ঠেলা চাপিয়ে তাড়াতাড়ি তারা পোল থেকে নেমে গেল। তারা নেমে গেল, কিন্তু অশ্লীল ছবির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে সে সব উপভোগ করার মানুষের অভাব হল কি।

জেলে আর বাগদীপাড়ার মানুষগুলি হেসে কুটিকুটি।

এপারের বিড়ির দোকান পান দোকানের মানুষগুলি হেসে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ল।

‘কালকের শোধ তুলতে পাগল এসব এঁকে রেখেছ। হি-হি।’

যেন খবরটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অশ্লীল ছবির গন্ধ পেয়ে মাছির ঝাঁকের মত মানুষ পোলের উপর এসে ভিড় করতে লাগল। পোলের দু’পাশে, দু’দিকের ঢালু থেকে আরম্ভ করে উলঙ্গ নরনারীর মিছিল দেখতে ভদ্র অভদ্র শিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে রীতিমত ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি আরম্ভ হয়ে গেল। কেউ ঠোঁট টিপে হাসল- ছোকরার দল হাততালি দিয়ে শিস্‌ দিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে সিটি মেরে উল্লাস প্রকাশ করল।‘এতকাল পর ছবির মত ছবি এঁকে গেছে বেটা। তার গলায় মেডেল ঝুলিয়ে দিতে হয়। আহা। যদি একবার দেখা পেতাম চিত্রকরের!’

‘মেডেল না, জুতোর মালা।’

উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে সকলে ঘাড় ফেরাল। যুবকের সঙ্গী সেই বৃদ্ধ এসে পৌছায়নি! তার আসতে বিকেল। বস্তুত এসব দেখে বুড়োমানুষ্টা কি করবে অনেকে বলাবলি করছিল। ইতিমধ্যে যুবকটি পকেট থেকে রুমাল বের করে ফেলেছে। কিন্তু করলে হবে কি, চায়ের দোকান বিড়ির দোকানের মানুষগুলি হৈ-হৈ করে উঠল, ‘মশাই সবুর করুন সবুর করুন, এখনি সব মুছে ফেলা কেন – এমন চমৎকার চিত্র, আর একটু দেখে নি। আপনিও চোখ ভরে দেখে নিন। আপনার ক্ষমতায় কুলোবে আঁকবার।’

তারা দলে ভারি। রুমালটা পকেটে ভরে যুবক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কতক্ষণে পুরু চশমা চোখে পাকা চুল মাথায় সেই বৃদ্ধ এসে যাবেন, তার অপেক্ষা করতে লাগল, আর অশ্লীল ছবিগুলির উপর চোখে না পড়ে এমনভাবে ঘুরিয়ে, দাঁড়িয়ে খালের জল দেখতে লাগল। এদিক হাসি শিস অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ঠেলাঠেলি বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলত। হঠাৎ সব থেমে গেল, সবাই অন্তত দু মিনিটের জন্য চুপ করে থেক লোকটাকে দেখল। পাগল? দার্শনিক? সাধক? ভণ্ড? মাথায় ধুলোবালি মাখা ঝাকড়া চুল, কোটরগত চক্ষু, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, পরনে ছেঁড়া চট, আর বগল থেকে আরম্ভ করে কব্জি পর্যন্ত দুটো হাতে লাল সাদা নীল হলুদ ন্যাকড়ার টুকরো জড়ানো। হাতে একটা টিনের কৌটো। যার সঙ্গে চোখাচোখি হচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে আর হাতের কৌটো নেড়ে বিড়বিড় করছে, ‘হেল্‌প, হেল্‌প।’

ব্যাপার কি? শিক্ষিত অশিক্ষিত ভদ্র অভদ্র, সকল শ্রেণীর দর্শকের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। কে ও?

‘কে, বুঝতে পারছেন না?’ একজন আঙুল দিয়ে লোকটার খালি খোলা পাঁজর-বের-হওয়া শীর্ণ বুকটা দেখিয়ে দেয়। উল্কি করা উলঙ্গ এক নারীমূর্তি। ‘বুঝতে পারছেন না, এই তো সেই ব্যর্থ প্রেমিক-লুকিয়ে থেকে, লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে চাঁদ সূর্য ফুল পাখি আর নারীমূর্তি এঁকে এঁকে যে বুকের জ্বালা কমাতে চাইছে। তার বুকেও সেই ছবি আঁকা রয়েছে আর কি প্রমাণ চান।’

যেন সকলে একসঙ্গে ঢোক গিলল, অবাক হল, উত্তেজিত হল, ক্রুদ্ধ হল, খুশী হল প্রেমিক শিল্পীর দর্শন পেয়ে।

‘ও আজ হঠাৎ দেখা দিলে বড় ? কি চাইছে ও?’

‘আজ শেষ দিন, সে জানে এখানে আর তার ছবি আঁকা হবে না, নীতিবাগীশের দল এখনি সব ছবি মুছে, হয়ত কাল থেকে এখানে পাহারা বসাবে, পুলিশ মোতায়েন করা হবে – আজ এসেছে সাহাজ্য চাইতে, তার শ্রমের মূল্য, দক্ষিণা –শিল্পীর প্রেমের ক্ষুধা আমরা মেটাতে পারি না, কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো মেটাতে পারি, আর সেই দায়িত্ব আমাদের দিন, সকলে দু-চার আনা করে –

‘ হেল্‌প হেল্‌প’ – উন্মাদ শিল্পী কৌটো নাড়ছে আর মিটিমিটি হাসছে। পোলের এমাথা থেকে ওমাথার দিকে সে এগিয়ে যায় আবার ফিরে আসে।

‘উঁহুঁ, সাহাজ্য-টাহাজ্য পরে হবে!’ সেই যুবক চেঁচিয়ে উঠল। আগে জানা দরকার কোথায় সে থাকে, কি পরিচয়, আর এসব অশ্লীল চিত্র আঁকার উদ্দেশ্য কি – পোলটা তো তার ঘর বাড়ি নয়, স্টুডিও নয় যে, যা খুশি এঁকে রাখলে চলবে, দশটা পুরুষকে, দশটা মেয়েছেলেকে এই ব্রীজের উপর দিয়ে এপার-ওপার করতে হয়।’

‘আচ্ছা, শিল্পীর আবার পরিচয় জিজ্ঞাসা করা কেন।’

একজন একটু রুষ্ট গলায় বলল, ‘শিল্পই তার পরিচয়। বরং প্রশ্ন করুন, এতকাল কোথায় ছিল, যদি এখানে থাকে আর ছবি আঁকতে দেওয়া না হয় তো এর পর কোথায় গিয়ে শিল্পচর্চা করার ইচ্ছা রাখে।’ কথাটার মধ্যে একটু খোঁচাও ছিল।

যুবক ক্রুদ্ধ হয়।

‘কেন লেংটা মেয়েমানুষের ছবি দেখতে আপনিও সেখানে ছুটে যাবেন নাকি।’

‘তা না-হয় গেলাম। ছবি দেখতে দোষ কি- এ তো জলজ্যান্ত কোনো মেয়েছেলে কাপড়-চোপড় ছেড়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে না। কেন, আপনি যে বড় ক্ষেপে যাচ্ছেন, পুরীর মন্দিরে গিয়ে দেখুন না, কত উলঙ্গ ছবি চারদিকে আঁকা রয়েছে।’

‘সেটা মন্দিরে মঠে চলে কলকাতার রাস্তায় চলে না।’

‘কোথাও চলে না, যে-যুগে মঠে মন্দিরে ওসব আঁকা হ’ত, সেটা এ-যুগ নয়, আজ কোনো মন্দিরের গায়ে এসব চিত্র আঁকতে গেলে মানুষ আপত্তি জানাবে। কেন, এক সময়ে তো মানুষ উলঙ্গ, অর্ধ- উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত, এখন কি তা চলে? বলুন, আমার কথার উত্তর দিন।’

সবাই চমকে ওঠে। সেই পক্ককেশ স্থলিতদন্ত বৃদ্ধ। যেন কার কাছে খবর পেয়ে দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে ছুটে এসেছে। উত্তেজনায় কাঁপছে। ‘বলুন, আমার কথার উত্তর দিন, যে-রাস্তায় এসব চিত্র থাকে, আপনার আপনাদের ছেলেমেয়েদের হাত ধরে সে-রাস্তা কী করে পার হবেন? চুপ করে আছেন কেন সব এখন?’

একটা চাপা গুঞ্জন উঠল।

‘না, না, বেটাকে আচ্ছা শিক্ষা দিয়ে দিন – ভবিষ্যতে যাতে আর -’ একজন বলল, ‘এখন কত বড় বড় মেয়েরা স্কুলে কলেজে পড়ছে!’ আর একজন সায় দেয়। ‘এখনি ছবিগুলি মুছে ফেলা হোক।’

‘হ্যাঁ এই মুহূর্তে – আর বেটাকে ভালো করে শিক্ষা দেয়া হোক, যাতে আর কোনোদিন এপথে পা না বাড়ায়।’ একসঙ্গেঅনেকগুলি কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বোঝা গেল, এ-পক্ষ এখন দলে ভারি। যারা হাসছিল, শিস দিচ্ছিল, অশ্লীল ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ততোধিক অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছিল, তারা চুপ, যেন লজ্জায় তারা অধোবদন হয়ে আছে। দু-একজন ইতিমধ্যে সরে গেছে।

‘এই, তুই কোথায় থাকিস?’ বৃদ্ধের সঙ্গী সেই যুবক, পাগলের মত দেখতে, অজ্ঞাতপরিচয় শিল্পীর একটা হাত চেপে ধরল।‘কোথায় তোর আস্তানা?’

‘হি-হি-‘ পাগলের মতো লোকটা হাসে, হাত তুলে আকাশ দেখায়। যেন আকাশে তার ঘরবাড়ী।

বৃদ্ধ হুঙ্কার ছাড়ল।

‘এই বেটা, পাগলামি রাখ্‌ – তুই কোথায় থাকিস?’

‘হেল্‌প হেল্‌প।’

‘তোমার দাঁত ভেঙে দেব।’ যুবক থাবা মেরে তার হাতের কৌটো ফেলে দেয়।

‘হেল্‌প হেল্‌প।’

‘একটা চাঁটি মারুন না।’ পিছন থেকে আর একজন গর্জন করে উঠল। ‘বদ্ধ উন্মাদ।’

‘আমার তো মনে হয় পাগলটাকে যেন পোলের ওপারে একদিন দেখেছিলাম।’ একজন হঠাৎ বলে উঠল।

‘হ্যাঁ আমিও যেন দেখেছিলাম।’ আর-একজন।

‘না, না, ও কথা বলবেন না বাবুরা।’ পোলের ওপারের মানুষগুলি সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল। ‘শহুরে পাগল ছাড়া ওরকম চিত্তির করবে কে।’

‘না গো কর্তা, আমরা নেখাপড়া জানি না, আমাদের পাড়ার কোন মানুষ ছবি আঁকতে জানে না।’ জেলেপাড়ার বাগদীপাড়ার পুরুষ নারী কলরব করে উঠল।

‘ছবি আঁকতে লেখাপড়া জানতে হয় না।’ অশিক্ষিত মানুষগুলির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ ভেংচি কাটেন। ‘পাথরের গায়ে, গাছ খুদে আদিম মানুষেরা নানা চিত্র করে গেছে –জংলী বর্বর ছাড়া এসব প্রকাশ্য জায়গায় এসব আর আঁকবে কে –নির্ঘাত এ তোদের লোক।’

‘উঁহুঁ উঁহুঁ –শহুরে মানুষ।’ ওরা হৈ-হৈ করে উঠল।

এদিকে সেই যুবক উন্মাদ শিল্পীর মাথায় চাঁটি মেরেছে। দাঁড়িয়ে থাকলে আরো মার খেতে হবে, ভয় পেয়ে লোকটা পোলের ওদিকে ছুটে যাচ্ছিল। জেলে আর বাগদীরা পথ ঘুরে দাঁড়াল। ‘এই এই শালা?’

ওদিকে বাধা পেয়ে লোকটা এদিকে ছুটে আসে। শহরের সব মানুষ একসঙ্গে বাধা দেয়, ‘খবরদার এদিকে পা বাড়ালে মাথা ভেঙে দেব।’

পাগল আবার ওদিকে ছোটে, তার শীর্ণ পা দুটো কাঁপছে, চকচকে চোখদুটো কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চাপা আর্তনাদের মত একটা গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে।

‘এই বেটা!’ বাগদীদের একজন লোকটার কোমরে লাথি মারল। হুমড়ি খেয়ে সে পড়ে গেল। ঠোঁট কাটল। ঠোঁটের রক্তে বুকের উল্কি করা নারী মূর্তি লাল হয়ে উঠল। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে পাগল আবার ছোটে এদিকে ছুটে আসে। যেন বাবুদের দিকেই হঠাৎ সরু মত একটা রাস্তা আবিষ্কার করে সে বোঁ করে দৌড় দিয়ে ঢালু বেয়ে খালের ভিতর নেমে যায়, তারপর জলে ঝাঁপ দেয়। আর দেখা যায় না পাগলকে। ডুব দিয়ে ও কোনদিকে গেল, কে জানে। যেন জানার দরকার নেই। ততক্ষণে পুলিশ এসে গেছে। বৃদ্ধের সঙ্গী সেই যুবক হাত নেড়ে পুলিশকে কি বোঝায়। আঙুল দিয়ে পোলের গায়ে অশ্লীল চিত্র দেখায়।

‘পাগলা-মাথা খারাপ আছে।’ হাতের লাঠি ঠুকে ঠুকে পুলিশটা দাঁত বার করে হাসে আর পোলের গায়ে চিত্র-করা উলঙ্গ নরনারীর চিত্র মিছিল দেখে।কিন্তু বেশীক্ষণ দেখতে পায় না। বাবুরা রুমাল দিয়ে ঘষে ঘষে দশ মিনিটের মধ্যে সব ছবি মুছে দিল। জেলে আর বাগদীপাড়ার মানুষেরা কি যেন বলাবলি করতে করতে পোলের উপর নেমে গেল। বাবুরা নেমে এলেন শহরের দিকে।

খালপোল আবার শূন্য নীরব। কিন্তু পোলটা আজ আর দুপুরের রোদলাগা খালের জল বা জলের উপর কাঠ বোঝাই বিশাল নৌকাটার মন্থরগতির দিকে তাকিয়ে নেই। তার দৃষ্টি আর-একটু-দূরে খালের এপারের পীচ ঢালা একটা সরু গলির মুখে নিমগাছের ছায়ায় ঢাকা টিনের ঘরের দিকে। কেননা, নিচু চালের টিনের ঘরের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উমেশও নির্নিমেষ চোখে পোলটাকে দেখছে। বলা চলে উমেশের সঙ্গে খালপোলের একটা চোরা দৃষ্টি বিনিময় হল।

উমেশ ঠোঁট টিপে হাসল। কিন্তু পোল হাসে না। গম্ভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।উমেশ অবশ্য তাতে দুঃখ পায় না। জানলা থেকে সরে গিয়ে তক্তপোশের তলা থেকে জংধরা পুরোনো টিনের সুটকেসটা টেনে বার করে।

‘বেরোচ্ছ নাকি?’ বৌ শুধায়।

‘হুঁ। উমেশ উত্তর করে।

‘আজ বেচতে পারবে এক-আধটা?’

‘মনে হয়, একটা ভাল বাজার পেয়ে গেছি।’ বৌয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে উমেশ হাসে।

বৌ চিবুক নাড়ে।

‘তা বলে আগেই মেয়েটেয়ের ছবিগুলো বের করো না।’

‘না, না, ’ উমেশ মাথা নাড়ে। ‘আগে কালী দুর্গা, বা পরমহংস-টংস যা আঁকা আছে ঝুলিয়ে দেব, তারপর কিছু ল্যাণ্ডস্কেপ, তারপর না-হয়-’ চোরা চোখে পোলটাকে একবার দেখে নিয়ে উমেশ ঢোক গিলল। বৌ ঢোক গিলল। তারপর অস্পষ্ট অস্ফুট গলায় বলল, ‘দেখা যাক।’

রোদটা এখনও চড়া। একটু ছায়া, একটু বিকেলের জন্য উমেশ অপেক্ষা করতে থাকে যদিও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন