রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

শিপা সুলতানার গল্প : মধুমতি




মুই তুমার দেহত যামু...মোরে তুমার দেহত নেও মনু...

পাহাড়ের ঢালে হেলে পড়া কাঠবাদাম গাছের গোড়ায় বসেছিলো মাঘাই। নীচের দিকে তাকালে শাদা শাদা ফেনার নদীটিকে দিদিমার চুল খোয়ানো ধবল সিঁথির মতো লাগে, মাথাও ঘুরে। উপরেও সরাসরি আকাশ দেখা যায় না, পাহাড়ের বাঁকানো চূড়া কুজোঁ বুড়িদের মতো হেলে আছে তার দিকেই। এই দিকে বাঁচোয়া। বৃষ্টি শুরু হলে সময় মিলে, খানিকটা ভেতরে সরে গেলে মাঝারি আকারের ঝড় পর্যন্ত সামলানো যায়। কিন্তু বেয়াক্কেল ধারার কথা শুনে সেই দিদিমার সিঁথিতেই পড়ে যাচ্ছিলো সে।
মাঘাই উঠে সেই খোপমতো জায়গায় গিয়ে বসে। কিষণা বসে আছে বাদাম গাছের মাঝ বরাবর। একবারেই শূন্যে। সেদিকে তাকিয়ে থাকলেও বুক কাঁপে তার। পুরনো বাদাম গাছ, তায় পান্ডার বেটির নরম মাখন মাখন বড় শরীর। সূর্য যখন চোখ বরাবর উঠে, সূর্যের রঙ আর কিষণার রঙ মাখামাখি হয়ে মাঘাইর সামনে থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বুক ধুকপুক করে মিনতি করে সে 'লামিয়া আও গো পরি...' 

কিষনা হাসে, তার সাথে হাসে বুড়ো বাদামগাছ। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে মাঘাই। 

মুই তুমার দেহত যাইবার লই মনু... 

আগেরবার পান্ডার বেটির আহ্লাদ ভেবেছিলো মাঘাই, এবার এই সন্ধ্যাকালে কিষনার চোখে আগুন দেখলো সে। 

মাথা খারাপ নি? আমি দুই পয়সার এক বেটাৃ 

গ্রাম সর্দারের বেটির কাছে সে বেটা না মুলার ডেটা। হাতখানাই ধরতে পারলো না আজ পর্যন্ত। হাত কিষনা বাড়িয়েই আছে কিন্তু মাঘাই জানে সে হাত আগুনের। মা বাপ হারা মাঘাই এই আগুন পোহাতে পারে, পুড়ে মরা পর্যন্ত কোনো লোভ নাই তার। বললো 'ইতা মাত আর দুইদিন মাতিও না পরি। আমার দেশ বউত দুরই, ইতা পাড়ার পর পাড়া, নদী, জঙ্গল...ইতা বউত দুরইর দেশ... 

দূর দেশ থেকে কি সে নিজে আসে নি!... 

অনো বও পরি... 

কিষনার হাতের পুটলিটি নিজের হাতে নিয়ে বরুন গাছের তলায় বসে পড়ে মাঘাই। কোনো রদবদল নেই কোনোখানে। গাছের যা একটু ছাল বাকল পুরান হয়েছে। চারদিকে যেই সেই সারি সারি টিলা। টিলার মাথা দেখা যায় না, তবু মাথায় যে আধার বেড়েছে বাতাসের সুনসান নিরবতায়ই তা বোঝা যাচ্ছে। 

কিষনা ধীরে ধীরে বসে পড়ে মাঘাইর পাশে। বসার জন্য কোনো জায়গায়ই না এই গাছের তলা। গুনতে সে পারে না, না-হলে ফটফট গুনে ফেলতে পারতো পাতা কয়টি। তবে গাছের গুড়াটি পয়পরিস্কার। মানুষজন রোজ রোজ যে বসে, তা ধবধবে ঢিবি দেখেই বুঝে গেছে সে। বসে উহ্ করে আরাম প্রকাশ না করে পারেনা কিষনা। আড়াই দিনের পথ, হেঁটে, দৌড়ে, রেলে, নৌকায়, ফের হেঁটে দুইদিনে তাকে নিয়ে গাঁয়ে চলে এসেছে মাঘাই। রাতে বনে বনে আঁধার নেমেছে, দুজনে মোটা মোটা গাছে চড়ে বাঘ ভালু থেকে প্রান বাঁচিয়ে এতোদূর এসে ঘোড়ার হাতে মরতে চায় না বলে এখানে জিরিয়ে নেয়া। বসে পায়ের পাতা ডলতে থাকে কিষনা। সেই ভোর থেকে মাথার উপর সূর্য, এখন কি আহ্নিক না মধ্যাহ্ন? রোদের যে তেজ, দ্বিপ্রহর না হয়ে যায়ই না। আর মাঘাই যখন বসতে বলেছে, এ দ্বিপ্রহরই। দিবসের এই লগ্নে কেউ এই হাইন্দ পাড়ি দিয়ে না ওপারে যায়, না এপারে আসে। লোকজন গ্রাম থেকে এমন আন্দাজ করে বের হয় বা হাট থেকে বাড়ি ফিরে যেনো দিন বা রাতের মধ্য প্রহরে ঘোড়ামারা হাইন্দ পাড়ি দিতে না হয় তাদের। যদিবা হাইন্দের মুখে এসেই পড়ে, হাইন্দে না ঢুকে কাছাকাছি কোথাও বসে ঘনঘন সূর্যের গতিবিধি মাফতে থাকে। ভেতরে ঢুকে প্রাণ দেয়ার চে দ’ুদন্ড বসাই উত্তম। 

কেউ কি সত্যি সত্যি মরেছিলো গো মনু? 

কিষনার বাজুতে চিমটি কাটে মাঘাই। হাইন্দের মুখে বসে এমন কথা কেউ বলে? মরবেনা কেনো! সে যখন হামাগুড়ি দিচ্ছে, সে বছরই তো পাশের গাঁয়ের লোকটা মরলো। কাজের ধান্ধায় মাথার ঠিক ছিলো না হয়তো, বেখেয়ালে ঢুকে পড়েছে হাইন্দের ভেতর। অমনি সেই বিশাল ঘোড়া, যে কী না দুই পাহাড়ে দুই পা ফেলে দাঁড়িয়ে আছে জনম জনম ধরে, চেপে ধরে আছে দুই পাহাড় কে। মুখামুখি জমজ বোনের মতো দুটি পাহাড়। ঘোড়ার আদেশে পাহাড় দুটি চেপে ধরে লোকটাকে, সেখানেই দম বন্ধ হয়ে মারা যায় মানুষটি... 

মাঘাই নি রে? ইয়াল্লা তুই কই থাকি? লগে ই কে? ই পরি পাইলে কইরে ভাই? তুই কই আছলে অতোদিন? 

গাছ তলায় বসতে গিয়ে বসে না বুড়ো লোকটি। কপাল বেয়ে ঘামের ফোটা চোখে ঢুকে পড়েছে মাঘাইর। চোখ কচলে দেখে উঁচা বাড়ির হাজি দাদা। হাতে সেই একই রকম পাকানো কালো লাঠি আর মাথায় বিশাল এক ছাতা, তবু তার ফর্সা তনু জুড়ে ঘামের ধারা, যেনো শাদা বালুর উপর দিয়ে বহা চিকন চিকন জলের নাবতলা! দাদা নি রে বো! ফাল দিয়ে উঠে লোকটাকে জাপটে ধরে মাঘাই। জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে সে। গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে যে এতোদিন পরদেশে ছিলো। পরদেশই, এক মানচিত্র, এক গভর্মেন্ট, কিন্তু কই বাংলা আর কই লংলা! যে ক'বার বাড়ির কথা, গ্রামের কথা মনে পড়েছে, সবার আগে মনে পড়েছে হাজি দাদার কথা। মনে হয়েছে একদিন যে সে হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিলো নিজে নিজে, হারিয়ে যাবার দিন এই মানুষটি সামনে পড়লে বলতো 'যাইছ না রে ভাই, আল্লার দুনিয়াইত সব জাগা সমান, দুই আত আর দুই পাও থাকলে মানুষ গরীব থাকে নি, এক ব্যবস্থা অইবো দেখিছ..' 

বহুদিন পাহাড়ের খোঁপে শুয়ে আসমান দেখতে দেখতে ভেবেছে মাঘাই, সে কি অভাবের তাড়া খেয়ে গ্রাম ছেড়েছিলো? সে কি মায়ের জন্য গ্রাম ছাড়ে নাই? শুধু কি গ্রাম! দেশ, মহাদেশ, সাত সাগর, আসমানও কি ছাড়িয়ে যেতে চায় নি সে! 

দ্রুত হেঁটে হাইন্দ পেরিয়ে ওপারে গিয়ে গতি ধীর করে ফের চলতে থাকে তিন জন। 

এমন বাড়িতে বউবিনি রাখা গেলেও আগুন রাখা যায় না, হাজি দাদার বাড়িতেই আছে তারা। বছরের ধান চাল আলু টালু রাখার উগার ঘরে ঠেলে ঠুলে একখানা চৌকি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, চাল ডাল যা লাগে এখান থেকেই নিচ্ছে, পুকুর থেকে মাছও। বাল্লার কোনায় তুলা উনুনে দুইবেলা রান্নাবাড়া করে নিচ্ছে কিষনা। এমনকি এ বাড়ির মানুষের পাতে খেতে মাঘাইর আপত্তির বালাই নেই, জাত সে খুইয়েছে সেই গ্রাম ছাড়ার পরপর। কিষনা পরের ঝি, তায় গ্রাম সর্দারের। জাতপাতের কড়াকড়ি তাদের আদিবাসীদেরও খুব রয়ে গেছে এখনো। তা রাঁধতে পারলে খাক না আলাদা। 

আগুনের মতো কন্যাকে দেখতে আর কোন কোন গ্রামের লোক বাকি নাই কে জানে। উঁচা বাড়িতে মেহমানদারী বেড়ে গেছে এ কয়দিন। 

বাড়িঘরে ভাঙ্গা বেড়া পর্যন্ত নাই, বাল্লা থেকে বাঁশ কাটা, টিলা থেকে আঠাঁল মাটি আনা, ছন কেটে আনা বন থেকে, দুই বেলা খেতে আর ঘুমাতে বাড়ি আসে মাঘাই। আত্মীয় পড়শিও হাত ধুয়ে বসে নাই, যে যেভাবে পারে দু’দন্ড গায়ে গতরে খেটে যাচ্ছে, তবু ভাল, গাঁয়ের ছেলে গাঁয়ে ফিরেছে। হাজি দাদা যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই জ্ঞাতিদের মুখ এঁটে নিয়েছে মাঘাই। কি লাভ পরের বেটিকে হেনস্তা করে। হিন্দুর ঝি ই বলা হোক কিষনাকে। 

পাক্কা দুইটি আনা হাতে ধরিয়ে দিলেন হাজি দাদা। কাল মঙ্গলবার। গৃহ প্রবেশ। তা পান, সিঁদুর এটা ওটা যা লাগে বনে বাদাড়েই আছে, কি কি লাগে তা সে না জানলে জ্ঞাতিরা তো জানে, তার জন্য কড়ি লাগেনা। চাঁদের আলোয় উঠানে বসে হুকা টানতে টানতে কুটু মিয়ার গান শুনছিলেন দাদা। 

ও মনা প্রাণে বাছবা না... 

কুটু দাদার লগে লগে তার সঙ্গী কালা কুকুরটা ও মাথা ডান বাম করছিলো। ঘরে শেষ বারিতে মহিলাদের খাওয়া চলছে, দুটো খেয়ে কিষনাও তার অপেক্ষায় জেগে আছে, গান শেষ হলে পান মুখে পুরে 'আয় রে আমার কালা ভাই' বলে কুকুরটিকে নিয়ে উঠে পড়বেন কুটু দাদা। মাঘাইও উঠি উঠি করছিলো, তখন আনা দুটি পান্জাবির পকেট থেকে বের করে তার হাতে দিলেন হাজি দাদা। দিয়েই হাত সরিয়ে নিলেন না, চেপে ধরলেন কয়েক মুহুর্ত। মাঘাই তরতর করে কেঁপে ওঠে। না বললেও মাঘাই জানে এ আনা দুটি মায়ের ভাল মন্দ কেনার জন্য। হাজি দাদা টের পান এই কাঁপুনি, শক্ত মোটা হাতে চাপ দিয়ে ধরে থাকেন তার হাত। জোছনার আলোয় তার চোখের ভেতর তাকায় মাঘাই, সে চোখে সাহস আর ভরসা... 

আয় রে আমার কালা ভাই... হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান কুটু দাদা, শোয়া থেকে উঠে গাঁয়ের বালু ঝেড়ে কালাও উঠে পড়ে। তারপর তার আগে আগে হাঁটতে থাকে। গ্রাম পেরিয়ে পাশের গ্রামে কুটু মিয়াকে নিয়ে যাবে সে। পাহারা দিয়ে দিয়ে। 

রাঁধাবাড়া শেষ হতেই কিষনা মাঘাইর দিকে তাকায়। একখানি শোবার ঘরের সাথে এক চিলতে রসুইঘর। তাতেই সারা সন্ধ্যা জামাই বউ কুপি জ্বালিয়ে বসে থাকে, এক ঘন্টার কাটা বাছা সারা সন্ধ্যা দুজনে কুলিয়ে উঠতে না পারার ভান করে। একজন মাছ কুটে তো অন্যজন ফের চোখের সামনে নিয়ে আঁশ খুঁজে, তরকারী কুটা আর শেষ হয় না। উঁচা বাড়ির পান্জেগানা মসজিদে যখন এশার আজান দেয় তালফা হুজুর, প্রতিটি বাক্য স্পষ্ট শুনতে পায় মাঘাই, তারপরেই যেনো চির নৈ:শব্দে ঢুকে পড়ে গ্রামখানি। পুরোপুরি নিথর হয়ে যাবার আগে আগে কলা পাতা টেনে নেয় মাঘাই। গরম একহাতা ভাত নেয় তাতে, তারপর যেদিনের যে তরকারী। আজ কিষনা চিংড়ি দিয়ে ঝিঙ্গে রেঁধেছে, সাথে বাঁধাকপির নিরামিষ। দুপুরের ভোনা ডিমের ঝোল আছে কড়াইর তলায়, বাসী ঝোল নেবে না সে। যদিও ডিম ভোনা দিয়ে মা নাকী রসিয়ে বসিয়ে দুটো ভাত বেশিই খেতো। সত্য কীনা জানে না মাঘাই। কানা পিসি জন্মের কানা ছিলো। মার বাড়তি ভাত খাওয়া দেখতো কীভাবে! 

শাশুড়ির ভাত বাড়ে না কিষনা তবে রাতের বেলা কুপি উঁচা করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের আর সুবলদের বাড়ির মাঝখানে যে উঁচু ঢিবি, সেখানে এক বয়েসি তেঁতুল গাছ। এমন বয়েসি যে বড় হতে হতে দু/চার বাড়ির বাল্লা আর উঠানে ছড়িয়ে দিয়েছে তার ডালপালা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সুবলদের বাড়ির পানে। ঠেলতে ঠেলতে সুবলদের রসুইঘরের চাল দাবিয়ে দিয়েছিলো, সুবলরা ঘরের অন্যপাশে নতুন রান্নাঘর বানিয়ে নিয়েছে। মূল ঘর যাতে হেলিয়ে না দেয়, কয় মাস পরপর গাছের গোড়ায় ভোগ দিয়ে মাফটাফ চেয়ে নিয়ে আন্দাজ মতো ডাল ছেঁটে নেয় তারা। তারপর মাঘাই ভিটাতে ফিরে আসার পর তাকেও বলে যায় মাকে বলতে। বউ বাচ্চা নিয়ে সংসার সবার, যেনো কোনো অমঙ্গল না হয়। তার উপর আশপাশের বাড়িতে বারমাসই ভালমন্দ রান্না হলে কলাপাতায় সে খাবার রেখে যায় গাছের গুড়ায়। 

তারা সংসার পাতার পর দুইবেলা মাকে খাবার দিয়ে যায় মাঘাই। আগেও দিতো। গ্রাম ছাড়ার দিনও গুড় নারকেলের ক্ষির রেঁধে দিয়ে গিয়েছিলো মাকে। 

শরশর শব্দ পেলো মাঘাই। মায়েরইতো শব্দ। তবু রাতের বেলা বুক ধ্বক করে উঠে তার। দুপুরে যেমন দুদন্ড বেশি বসে যায়, রাতে পাত পেতেই নেমে আসে ঢিবি থেকে, তখন যেনো একটা দীর্ঘশ্বাস শুনে সে প্রতিদিন, প্রতিদিনই ইচ্ছা করে এখান থেকে এক দৌড়ে দেশ মহাদেশ পেরিয়ে আরো দূর কোথাও চলে যায়... 

মধুমতি খুব মৌজের নারী। একখানা পান খায় তো তিনখানা বিলায়, দিনভর বাড়িতে সে আর কানা ননদ। ননদ বড় মায়ায় গড়। নারী। বাড়িতে পড়শিনীদের গপের আখড়া। চাল থেকে ধান বাছতে বাছতে, কচুর লতি, ডেঙ্গার ছিলকা খুলতে খুলতে বউ ঝিদের গপ শুনে সে হাসে আর উসকে দেয় ননদ। মধুমতি রূপেরও রানী। পড়শীনিরা হা করে তার চোখ দেখে, মুখের অদল দেখে, বুকের নিখাঁজ গড়ন মাপে। কতো দেশের কতো কিচ্ছা জানে মধুমতি! 

দু’চারদিনের পথ পাড়ি দিলেই নাকি আসল রাজা রানী দেখতে পাওয়া যায়! মধুমতি নিজ চক্ষে এক রানীকে দেখেছিলো স্নান করতে। সেই রানীর বাড়ি ফুল বেচতে যেতো মধুর মাসী! সেদিন মধুকেও সাথে নিয়েছিলো সে। কাছে ঘেঁষতে পারেনি কিন্তু দূর থেকেই যে রূপ দেখেছিলো সে... 

মধুমতি যাদুও জানে। কথাটা দাবানলের আগে আগে চলে। মধুমতি পুরুষকে ভেড়া বানিয়ে বনে চরতে পাঠাতে পারে, গাছের পক্ষি হাতের গাতায় এসে বসে...সে কামরূপ কামাক্ষ্যার কোন নারী না জানে, মধুর দাদুর বাড়িইতো সেই দেশে, সেই নেংটা হয়ে স্নান করা রানীর দেশে। তাই বলে বাঘ বানিয়ে দেয়া? 

পাড়ার নারীদের ঘুম আসে না। তাদের এতো বড় সংবাদে তাদের পুরুষদের হেলদোল হয় না দেখে ক্ষেপতে থাকে তারা। কেবল পুরুষেরাই বড় বড় কান্ড ঘটায়! তারাই কেবল চোখ কপালে তোলা সংবাদ বয়ে আনে? 

মধুমতির পায়ে পড়ে তারা, কানা ননদ জাপটে ধরে বউকে। এমন সব্বোনাশ করিছ না গো বউ...মাটির দেয়ালে কপাল ঠুকে কাঁদে। আসামে রেললাইনের কাজ নিয়ে গেছে তার দাদা। আর আসবে বারিষার মুখে। কেউ যদি একটা সংবাদ দিতো দাদারে... 

সেদিন বাজার বার। গ্রাম শূন্য করে পুরুষেরা সব হাটে চলে গেছে, সাথে গেছে বাড়ন্ত কিশোররা পর্যন্ত। নারীরা উপুড় হয়ে পড়ে মধুর উঠানে। না বললেও তেমনই ঈঙ্গিত দিয়েছিলো মধুমতি। সবাই ভিড় জমালে আজ আর না আসে না মুখে। ছেলেটা বিকেলের ঘুমে কাতর ঘরের ভেতর, ননদ খিস্তি শুরু করে বউ ঝিদের দিকে, তবু পিড়ি থেকে কোমর তুলে না কেউ। যেনো আজ যদি খেল না দেখায়, মধুমতির মতো দ্বিতীয় বেঈমান আর নেই জগতে, এরপরে আর তারা তার বাড়ির দিকে মুখ করে মুততেও বসবে না। 

ঘরে ঢুকে ছেলের গায়ে কাঁথা ঠিক করে দেয় মধু, তারপর রসুইঘরে ঢুকে তাকিয়ার উপর থেকে পিতলের বাটি নামিয়ে কলসি থেকে পানি ভরে উঠানে আসে। প্রথমবার করতে যাচ্ছে এই মরন খেলা, কাজ হবে কীনা কে জানে, তবু বুকের ভেতর ধুকপুক করছে তার। ছেলেকে কি আরেকবার আদর খেয়ে আসবে! উঠানের হল্লার জন্য ঘরে আর ঢুকে না। হল্লার শব্দে ছেলের ঘুম ভেঙ্গে গেলে আজ আর শুরু করা যাবে না। মধু জনে জনে তোতা পাখির মতো পড়ায় যে, সে যখন বাঘ হয়ে যাবে, ভয়ের কিছু নেই, সে কাউকে খাবে না, ভয় না পেয়ে কেউ একজন যেনো তার গায়ে বাটির পানি ছিটিয়ে দেয়, তাহলেই সে মধুমতি হয়ে ফিরে আসবে। সকলেই মাথা নাড়ে, এ আর এমন কি, তারা কি জানে না এ তাদের মধুবউ! ঠিকই তারা পানি ছিটিয়ে দেবে... 

মন্ত্র পড়ে পানিতে ফুঁ দেয় মধুমতি, আসামে থাকা স্বামীর মুখ মনে করেও করে না, অল্প সময়ইতো। আঙ্গুল ডুবিয়ে পানির ছিঁটা দেয় শরীরে... 

এ্যা ভগবান...তারপরই দিকবেদিক ছুটোছুটির শব্দ, চিৎকার, ভয়ার্ত কান্না...কার পায়ে লেগে পানির বাটি উঠানে উল্টে পড়ে আর হাশরের মাঠের মতো হা করে থাকা উঠানের শুকনো বালু মুহূর্তে শুষে নেয় সব পানি, কানা ননদ আর্তনাদ করে জ্ঞান হারায় বারান্দায়। তখুনি ঘুম থেকে কেঁদে উঠে মাঘাই। 

ভেজা ভেজা দাগ লাগা বালুতে গড়াগাড় দিয়ে বিলাপ করতে থাকে মধুমতি, একবার অজ্ঞান ননদের গায়ে হাত বুলায়, একবার দোরে গিয়ে ঘরের ভেতর মাথা ঢুকায়, ঘুম থেকে উঠলেই মায়ের স্তন খুঁজে ছেলেটি, এখনো খুঁজছে, সদ্য হামাগুডড়ি দিতে শিখেছে, যে কোনো সময় মাচা থেকে শক্ত মেঝেতে পড়ে যাবে তার বাছা... 

তিনদিন তিনরাত বাড়িময় ঘুরে বেড়ায় মধু। ননদ হাত মুখ পুড়িয়ে দুটো ফুটিয়ে খেতে ডাকে, ছেলেকে পাশে রেখে সেই ভাত খায় মধু, ঘো ঘো করে কাঁদে, তারচে জোরে কাঁদে মাঘাই আর ননদ। একসময় মানুষের মনের মতলব টের পায় মধু, বনের ভেতর ঢুকে পড়ে, অন্তত রাতে তো নিরাপদ থাকবে সে। 

ভয়ে নয়, বেদনাতেই একদিন মরে যায় ননদ, খবর গিয়েছিলো আসামেও, তারপর আর কোথাও দেখা যায় নি মাঘাইর বাপকে, 

মধুমতি লাল করে পান খেতো দিনভর, সেই পানের লোভে বাড়ি বাড়ি উঁকি দিতে লাগলো, তার সেই পড়শীনিরা গরম ভাতের মাড় ছুঁড়ে মারতে লাগলো তার উপর, তাদের বরেরা সাবল আর বর্শায় শান দিতে লাগলো নিয়মিত... 

মায়ের বয়স হচ্ছিলো, ঘোর মাঘে আর ঝড় বাদলার রাতে ঘরের বেড়ায় আঁচড়াতে লাগলো মা, বিছানায় বসে রাতজাগা অভ্যাস হয়ে গেলো মাঘাইর। বাড়ি না ছেড়ে সে বাঁচছিলো না আর...

২টি মন্তব্য: