রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

সাগরিকা রায়ের গল্প : মথুরাপুরের গনা সর্দার

লোকটা সঙ্গী হল লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল থেকে । ভীড় ঘিজঘিজ গাড়িতে দাঁড়াবার জায়গা পাওয়াই দুষ্কর , বসার ভাবনা মাথাতেও নেই । তো সেই মহাক্ষণে পেছনের দিক থেকে ধ্বনিল আহ্বান – এহেনে বস এসে। আমার পাশে টু জাইগা হই যাবেনে ।

আমি তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । লোকটা এত লোক থাকতে আমাকেই কেন ? সত্যি কি আমাকেই ডাকছে ? 

আমার মন বুঝেই হাসল বোধহয় লোকটা –চলি আসেন দিকি । আম্মো মথুরাপুরে যাতিচি । লতুন জাইগায় আপনার কষ্ট হবি । আসে বসি পড় । 

বসলাম গিয়ে ঠেসেঠুসে । ব্যাগটা পিঠ থেকে খুলে কোলের উপর রেখেছি । এখন শরীরটা স্বস্তি পেয়েছে খানিকটা । যাব মথুরাপুর হয়ে রায়দিঘি । সেখান থেকে পঁচিশার লাট । এই লোকটা কী করে জানল আমি মথুরাপুরে যাচ্ছি ?মানে টিকিট কাউন্টারে আমার আগে পিছে ছিল । আমি পাশে বসাতে সে খুশি বোঝা যাচ্ছে । লোকটাকে কী সম্মোধন করবো বুঝতে পারছিনা । আপনি বলতে বাধে , আবার তুমি বলতেও পারছিনা । কিছু বলারই বা দরকার কী ? বসতে দিয়েছে তো কী এমন করেছে ? জানালার দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকি একটা করে স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে । দূরে দূরে গ্রামের আভাস । ধানখেত…। লোকটা উসখুস করে যাচ্ছে । কিছু বলতে চায় মনে হচ্ছে । ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই লোকটা হাসল । এতক্ষণে খেয়াল করলাম লোকটার বড্ড ছিরকুটে চেহারা । নেশা টেশা করে খুব । লক্ষ্য করে দেখেছি যারা বেশ নেশাগ্রস্ত ,তারা খুব দিলখোলা হয় । অফিসের নিরঞ্জনদা যেমন । সবসময়েই‘লে লে কি চাস লিয়ে লে ‘ টাইপ । মে মাসের গরমে নিরঞ্জনদার কাছে গিয়ে রিমা যেই না বলেছে –ইস , কি ইচ্ছে করছে আইসক্রিম খেতে ! বলার অপেক্ষাতেই ছিল যেন নিরঞ্জনদা । টাকা বের দিল । অফিসশুদ্ধ সবাই সেদিন আইসক্রিম খেল । পরে যারা খেয়েছে , তারাই বলেছে –শালা বোতল খেয়ে খেয়ে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে । এমনকি স্বাতীও হাসছিল নিরঞ্জনদাকে ‘মুর্গি’বানাতে পেরে । 

-আমার নাম গনা সর্দার । বলে লাজুক হাসে লোকটা –নকুল সর্দাররে চিনো ? সে আমার...

-বাবা বাবা !যাত্রীদের একাংশ চেঁচিয়ে উঠল । আমি চমকে উঠলাম । গনা সর্দার অপ্রস্তুত চোখে সেই যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল – বাবা তো কী ? সবার ব্যাপারে কথা বলতি নেই সেটা মাতায় নেই ! যত্তসব ! যাক বাদ দেন , আমার বাবা নকুল সর্দাররে চিনোনা ? ভোঁদা সর্দাররে চিনো ? সে হল গে আমার ...

-ঠাকুদ্দা ঠাকুদ্দা ! সেই ভীড় ফের সরব । 

-দেখিছেন কান্ডখানা ? একজনায় কথা কতিছে , তোরা কেন এর মধ্যি আসতিছিস ?

আমার খুব হাসি পাচ্ছিল । এই লোকটা নিয়মিত যাতায়াত করে ট্রেনে । কাউকে না কাউকে ধরে একই গল্প শোনায় । যাত্রীদের একাংশের মুখস্থ হয়ে গেছে লোকটার গপ্পোসপ্পো । আমার বেশ লাগছিল লোকটাকে । এমন টাইপের লোক সহজে মেলেনা !

-আর আপনার নাম ?

- আমার নাম পরথমেই বলিচি । মনে লাই ? গনা সর্দার। ইদিকেরে যারে জিজ্ঞাস করপা , সেই চিনপে আমারে । ইদিকের লোক কিনা !রোজি আসাযাত করি এই লাইনে। তুমি ইদিকেরে কারুরি চিনোনা দেকতিচি । ঝিকরহাটির মোল্লারে চিনো ? তাইতো । তুমি কারে চিনো বলেন দিখি । 

আমি ফাঁপরে পড়া কাকে বলে বুঝতে পারলাম এতদিনে । সত্যি কথাটা আমার বুকে তীরের ফলার মতো বিঁধল । আমি কাকে চিনি ? সত্যিই কি আমি কাউকে চিনেছি আজ অব্দি ? চেনা যে এত সহজ নয় সেটা এই লোকাল ট্রেনে গনা সর্দারের পাশে বসে বুঝতে পারলাম । গনা আমাকে বুঝিয়ে দিল ! একসময় ট্রেন থামল এসে মথুরাপুরে । ঠেলাঠেলি করে নেমে পড়লাম । এখান থেকে অটো বা ভ্যান ভাড়া করে যাব সেই রায়দিঘি । বাসও আছে । এগোচ্ছি , পেছন থেকে ফের সেই আহবান – যাতিচেন কোতা ? ভ্যানে উটে পড়ুন দিকি । খোলা বাতাসের মধ্যি দে যাওয়ার মজাই আলেদা । বর্ষা নেই । আকাশ পোষ্কার পয়িচ্ছন্ন । জাইগা করি একবার যদি শুয়ি পড়তি পারেন , উনি যে উপরে আছে ভারি আরাম পাবিন । ওনার বসি বসি আমাগের কম্মো দেখতি দেখতি পিটে ব্যতা হয় কিনা ? আমাগের সুখে তার সুখ । 

তাকিয়ে দেখি কোত্থেকে এক ভ্যান ধরে এনেছে । তাতে ছ সাত জন লোক ভারি নিশ্চিন্ত মনে পা দোলাচ্ছে ভ্যানে বসে । লম্বা লম্বা ঠ্যাঙ ভুতের মতো ! এই সঙ্গীদের মোটে পছন্দ হল না । আমি কেন যে লোকটার কথা ফেলতে পারলাম না কে জানে ! ব্যাগ সামলে ভ্যানে উঠে বসলাম । আমার পা দুটো ঝুলতে থাকল অন্যদের মতোই । লোকটা ঝেড়েঝুড়ে ভ্যানের মাঝখানে একটু জায়গা করে ডাকল – আসেন দিকি , শুয়ে পড়ুন । দেখপেন , কেমন মজায় মজায় যাতিছেন । 

এবারে আর না থামালেই নয় । আমি হাসলাম- না না , শোব কেন ? বসে বসে দেখতে দেখতে যাই । এদিকটা আসিনি আগে কখনো । গ্রামের শোভা শহরে দেখিনা বলেই এদিকে আসা । আপনি বসুন ভাল করে । 

লোকটা অবাক হয়ে রাস্তার দু পাশ দেখল – এহেনে এমন কী আছে ? যা আছে সব আমাগের চিনা জিনিস। কী দেখপেন বসি বসি ? 

-আপনার চেনা , আমার চেনা নয় । 

-নয় ? আপনে কিছুই চিনেন না ! নতুন জম্মো হইছে বটে । বলে হাসতে শুরু করেছে গনা সর্দার । হাসি সামলে বলল – আপনে নকুল সর্দাররে চিনোনা , ভোঁদা সর্দাররেও চিনোনা ! ওরা কে ছিল জানো ? ওরা আমার বাপ আর ঠাকুদ্দা । বুঝ ?

লোকটা হয় পাগল , নয় পাতাখোর । সারাক্ষণ উল্টোপাল্টা বকে যাচ্ছে । ট্রেনে বসার জায়গা করে দিয়ে যেন মাথায় চড়ে বসেছে । আমার নিজের উপর রাগ হচ্ছিল । বেশি পাত্তা দিয়ে ফেলে নিজেই জালে আটকে গিয়েছি । মুখ গম্ভীর করে রইলাম । আমার বন্ধু বিশ্বজিতের পৈত্রিক বাড়ি পঁচিশার লাট পেরিয়ে সেই শীতল মাইতিতে । ওখানে নাকি সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে বাঘ বেরিয়ে আসে । আর পঁচিশার লাটের সবজির ক্ষেত নাকি দেখার মতো । লাট অঞ্চল দেখারও ইচ্ছে । সব মিলিয়ে ছুটিটা এদিকেই কাটাবো । বিশ্বজিত কল্যাণী থেকে এসেছে । এসেই ফোন করে আমন্ত্রন জানিয়েছে । এসেই পড়েছি গনা সর্দারের হাতে। এর হাত এড়িয়ে পালানো ছাড়া উপায় নেই । 

ভ্যান একটা নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে । মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে নদীকে দেখা যাচ্ছিল । বাতাস ভেসে এল নদীর ওপাড় থেকে । এই সময় ভ্যান থামল । জনা দুই লোক নেমে গেল । এবারে খানিকটা হাত পা ছড়িয়ে বসলাম । আড়ে তাকিয়ে দেখি গনা নিজের হাতের পাতা মেলে কী দেখছে । পাগল একটা ! কথা বলছেনা মানে ও হয়তো ভয় পেয়েছে আমার গাম্ভীর্য দেখে । লোকটা থাকে কোথায় ? এই অঞ্চলেরই লোক মানে …ও বলেছিল মথুরাপুরে থাকে । কিন্তু মথুরাপুরে তো নামল না ! জিজ্ঞাসা করবো ? না , থাক। পাগলকে সাঁকো নাড়াতে বলা উচিত হবেনা । ফের শুরু করবে বাকতাল্লা !

ভ্যান খানিক রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আর যাবেনা । এদিকে বাস আসে । আমি ব্যাগ পিঠে নিয়ে নেমে পড়লাম । চারপাশে ঘন সবুজ ঝোপঝাড় । এই ঘাস আর কুচো পাথরে ভরা রাস্তাটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কে জানে !এই সব রাস্তা কখনও শেষ হয়না । কোথায় যে চলে চলে যায় ! কোথায় যে যায় ! মনে হয় সোজা নদীতে নেমে নদীর ভেতরে পথ করে করে চলে যায় । সে যাওয়া আর থামেনা । চলতেই থাকে !

সন্ধ্যে নেমে গেল নদী পেরিয়ে পঁচিশার লাটে পৌঁছতে পৌঁছতে । সেখান থেকে শীতল মাইতি যেতে যেতে রাত। ভারি সুনসান সুনসান চারপাশ । বিশ্বজিত ছিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে । আমাকে পেয়ে বেজায় খুশি । পিঠে বেড় দিয়ে চলতে থাকে । মাঝে মাঝে বলে দেয় কোথায় গর্ত , কোথায় ডেবে আছে রাস্তা ... এইসব । ওর কথামতো আমিও কখনও লাফিয়ে , কখনও পা লম্বা বাড়িয়ে সেসব জায়গা পার হয়ে যাই । ওদের বাড়ি অনেকটা জায়গা নিয়ে । ফসলি জমি আছে । ওর বাবা ,কাকা সেসব যাকে দেখাশোনা করে । বিশ্বজিত আমাকে ক্লান্ত দেখে বলল- খেয়েদেয়ে শুয়ে পড় । কাল কথা সব । 

উঠোনের একপাশের স্নানঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে স্বস্তি এল । বিশ্বজিৎ আমার জন্য নতুন সাবান তোয়ালে রেখেছে বাথরুমে । একটু পরেই খেতে ডাকল বিশ্বজিতের মা । ‘রান্নাঘরে’খাবার ব্যবস্থা । খেতের চালের ভাত , সবজির ঘ্যাঁট , পুকুরের মাছ । খেয়েই ঘুম পাচ্ছিল । বাইরে কারা এসেছে । কথা হচ্ছে । একটু পরে আমি যে ঘরে শুয়ে আছি , সে ঘরে বিশ্বজিতের কাকার ছেলে এসে খাটের নীচে থেকে ভারী মতো কী টেনে বের করছিল ।

বিশ্বজিত জিজ্ঞাসা করল – কি রে ? ভাড়া চায় ? 

ভাই –হ্যাঁ,বলে ভারী কী একটা নিয়ে যেতে যেতে কোলকুঁজো হয়ে গেল । আমি জানতে চাইনি ,কিন্তু বিশ্বজিত জানে আমার কৌতূহল হচ্ছে । ও হাত দুই দূরের খাট থেকে কথা ছুঁড়ে দিল –জেগে ?

-হ্যাঁ

-ওটা কী বলতো ? পাম্পসেট আছে আমাদের । ভাড়া নেয় অনেকে । ঘন্টায় পঞ্চাশ টাকা । ভাল ব্যবসা না ? বলে হাসল ও । অন্ধকারে ওর হাসির শব্দ টুকরো টুকরো হয়ে জলের শব্দের মতো হয়ে গেল । এই জল নদী থেকে পাম্পের মধ্য দিয়ে এসে সবজির খেতে খলখল করে হাসে । সেই শব্দ বিশ্বজিতের হাসি হয়ে এল এই ঘরে । সবজির খেতও এল পাশাপাশি যেন । কার খেত , কার সবজি ,কার জল…!

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । অনেক রাতে , হয়তো শেষ রাতে কেউ ঢুকেছিল আমাদের শোবার ঘরে । আবছা আবছা মনে পড়ে যেন । হয়তো আরও পাম্পসেট আছে বিশ্বজিতদের । আরও কাস্টমার এসেছে । এত রাতেও কাস্টমার আসে !

বিশ্বজিত দাঁত ব্রাশ করছিল । ইশারায় ডাকল – আয় । আমিও ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে ওর পেছন পেছন রওনা হলাম । বাড়ির পেছনে পুকুর আছে দুটো । পুকুরের চারধারে লম্বা লম্বা ঘাস চিকন সবুজ , ফড়িং, প্রজাপতি, ব্যাং !সকালের রোদ পড়ে পুকুরের জল হির হির কাঁপে । বিশ্বজিত আরও এগিয়ে যেতে যেতে ওদের খেতএর সীমানার শুরু দেখাতে থাকে । আমার একটা বিদেশী গল্পের কথা মনে হয় । কোন দেশের গল্প ? রাশিয়ান কি …? সেই চাষী শর্তানুযায়ী জমি কিনতে এসেছিল । সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যদ্দূর হাঁটতে পারো , সব তোমার জমি । কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই যেখান থেকে রওনা হয়েছিলে , সেখানে ফিরে আসতে হবে । বিশ্বজিতদের জমির শুরুটা দেখতে গিয়ে গল্পটা মনে পড়ল । ফিরে আসতে গিয়ে পুকুরের জলে মুখ হাত ধুয়ে নিলাম । ওর আরেক ভাই কল্যাণীতে এগ্রিকালচার নিয়ে পড়ছে । মূল ধনাগার এখানে । ওদের জমির ফসল কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে । গ্রামে অনেকেরই জমিজিরেত আছে । গ্রামে বিশ্বজিতদের বেশ সম্ভ্রম করে লোকে । একটা লোক নারকেল পাড়া হবে কিনা জানতে এসেছে । সম্মতি পেলে সে লোক নিয়ে আসবে । প্রচুর গাছ বিশ্বজিতদের। নারকেল চলে যাবে কলকাতার বাজারে। 

পরের দিন পঁচিশার লাটে গেলাম । ওখানে বিশ্বজিতের এক ছেলেবেলার বন্ধু থাকে । সাইটসিয়িং বলতে শিবমন্দির । ভোলানাথের জাগ্রত মন্দির দেখাতে নিয়ে গেল । সেখানে দেখি মন্দিরের পেছন দিকে লোকজনের জটলা । একটা গাছ কাটা হবে । তো কে একজন সেই গাছ কাটতে দিচ্ছেনা । বাদা অঞ্চলের লোকেরা অভাবী । বেশিরভাগ অন্যের জমিতে কামলা খাটে । তাদের মেয়ে বউরাও খাটে । আজ দেখেছি বিশ্বজিতের মা আর কাকি একটি রোগাপানা বউকে খুব ধমকাচ্ছে । পাটকাঠি খরচ হচ্ছে বেশি ধান সেদ্ধ করতে গিয়ে । বাদায় গিয়ে কাঠকুটো নিয়ে আসতে বলা হচ্ছিল তাকে । বউটি দাঁত বের করে সায় দিচ্ছে । একটা গাছ নিয়ে কিসের গন্ডগোল দেখতে গেল বিশ্বজিত । ওকে দেখে সব সরে দাঁড়াল কিন্তু কাঁউমাউ চলতে থাকে । বক্তব্য হল এই লোকটা গাছ কাটতে দিচ্ছেনা । একে টেনে সরিয়ে নেওয়াও যাচ্ছেনা । 

লোক নামক অপরাধীকে দেখা যাচ্ছেনা । হাত ও পায়ের খানিকটামাত্র দেখা যাচ্ছে । বিশ্বজিত হেঁকে ডাক দিতে লোকটা মুখ বাড়াল । আমার এবারে অবাক হওয়ার পালা । লোকটা হল সেই গনা সর্দার । সে গাছ কাটতে বাধা দিচ্ছে ? কেন ? এই গাছটা কি গনার ? বিশ্বজিত সেই প্রশ্নটাই করল –কেন বাধা দিচ্ছ ? তোমার বাড়ি হল মথুরাপুরে । এখানে কী করছো ? এই গাছ তোমার হল কী করে ?

-আমার গাছ । কাটপা না । গলার স্বরে তীব্রতা । ট্রেনের সেই নরম সরম ভগবত লীলাদর্শনে উন্মুখ গনা এ নয় ! বিশ্বজিতকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে থেমে গেলাম । জনতা ক্ষিপ্ত – দেখিছেন , কত বড় কতা কতিছে !

গনাও কম যায়না –কী দ্যাখপেন ? আমার গাছ , আমি কাটপো না । হই গেল কিনা ? বাড়ি যাও দিনি সব । 

আশ্চর্য ঘটনা হল , গনা দিনরাত পাহারা দিয়ে যাচ্ছে গাছটাকে । কেউ ধারে কাছে এলেই হল । এমন চেঁচিয়ে ওঠে যে বলার না । একটি কঙ্কালের মতো অস্থিসার মহিলা আঁচলে বেঁধে কী নিয়ে এসেছিল । গনাকে জোর করে খাইয়ে জল খাওয়াল । আঁচল দিয়ে গনার মুখ মুছিয়ে খর চোখে গাছের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে…কী যে দেখছিল ! কপালের ধেবড়ে যাওয়া সিঁদুর বেঁচে থাকার চিহ্ন হয়ে টিকে আছে ! একসময় সেও চলে গেল ওই দিকে । নদী পেরিয়ে গেল বুঝি ! নাকি নদীতে নেমে গেল অতলের রাস্তা খুঁজতে গনার বউ !

-এদের নানা ঝামেলা । বিশ্বজিত কুপিত –গনা পাগলা জ্বালিয়ে খেল দেখছি । কী যে পাগলামি চেপেছে ওর কাঁধে ! এমনিতে খারাপ না । কিন্তু এই গাছের উপর খুব মায়া । ঝামেলা আজকের নয় । একদিন রাতারাতি গাছ কাটা হয়ে যাবে । সেদিন যে কী হবে ! 

-কেন গাছ কাটতে দিচ্ছেনা ? আর গাছ কাটছেই বা কেন ?

-এই গাছ পড়েছে বিদে মন্ডলের জমিতে । গ্রামের লোক এই গাছে মানতের গিঁট বাঁধে । এখন বিদে গাছ কাটলে বলার কিছু নেই ! এদিকে গনা নাকি দু বছর আগে এই গাছে মানতগিঁট বেঁধেছিল । ওর ছেলের নামে । সে গিঁট এখনও বাঁধা আছে গাছের মগডালে । তাই গনা গাছ কাটতে দেবেনা । সোজা কথা । ওর বউও চায়না গাছ কাটা হোক । সে এসে স্বামীকে খাইয়ে শরীর-মনে জোর দিয়ে গেছে , বুঝলি ? মথুরাপুরে থাকে । মাঝে মাঝে এসে দেখে যায় গাছটাকে । 

গাছটাকে দেখলাম । বড়সড় গাছ । এরকম গাছ আগে দেখিনি । আমি চিনিনা । পাতায় ভরা গাছের কোথায় সে গিঁট , গনা ছাড়া আর কেউ খুঁজেও পাবেনা । গাছে মানতের গিঁট দিতে দেখেছি । বহু জায়গায় দেখেছি মানতের রঙীন গিঁট । অনেক পুজোর থানে গিঁট ঝোলানো সুতো দেখে অভ্যস্ত আছি । গনা সর্দার দু বছর আগে গিঁট দিয়েছিল , ওর মানত এখনও পূরণ করেনি ঈশ্বর ? ছেলে কি অসুস্থ ? কী হয়েছে ? গনা ট্রেনে বাপ ঠাকুদ্দার নাম বলেছে , কিন্তু ছেলের নাম তো বলেনি ! কী হয়েছে গনার ছেলের ? কেন গনা ছেলের জন্য প্রার্থনা করে গাছে মানতের গিঁট ঝোলায় ? বাড়িতে ফিরতে ফিরতে প্রশ্নটা করেছিলাম বিশ্বজিতকে। ও একটু চুপ করে থাকে । 

-আসলে ছেলেটার যাতে ফাঁসি না হয় , তাই গিঁট বেঁধেছে গনা । 

-মানে ?

-ত্রিকোণ প্রেমের গল্প । একটা মেয়েকে নিয়ে দুই বন্ধুর রেষারেষি । দুজনের একজন হল গনার ছেলে । মেয়েটা অন্য প্রেমিককে লাই দিয়ে যাচ্ছে । সে আবার প্রেমিকার আস্কারা পেয়ে প্রেমিকার সামনেই গনার ছেলেকে গালিগালাজ করে । ব্যস , গনার ছেলেটা ছুরি দিয়ে গলার নলি কেটে দিয়েছে নব্য প্রেমিকের । পালিয়েছিল । পুলিশ এসে খুঁজে পায়নি । গনা খুঁজে বের করে ধরে থানায় দিয়ে আসে । এসে কদিন গুম হয়ে পড়েছিল । অর্থবল , লোকবল কিছু নেই । এখন ভগবান ভরসা । তাই গিঁট বেঁধে রেখেছে যেন ছেলেটার ফাঁসি না হয় । 

আমরা কেউ অনেকক্ষণ কথা বলিনা । সব কেমন বিস্বাদ ঠেকছিল । নোনা বাতাস আছে চারপাশে , ঠাহর হয়নি প্রথমে ! এখন একটু একটু করে অনুভব করছি নোনা বাতাসকে !

ভেসেলে চেপে নদী পার হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম দিনচারেক । ফিরে আসার আগের রাতে বিশ্বজিতের সঙ্গে সেই ঘরে শুয়ে আছি । রাতের আকাশ কেমন বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে আছে মাটির পৃথিবীর দিকে । গনা সর্দারের কথা ভুলিনি । কদিন ছিলাম না । কী হল কে জানে । গাছটা কাটা পড়েছে কিনা ,বা পড়লেও গনার অবস্থা কী জানিনা । বিশ্বজিতের মুখে সব শুনে কেমন একধরনের বিমর্ষতা ছেয়ে আছে মনে । গাছটা কি কেটেছে ওরা ? বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম বিশ্বজিতকে । 

-নারে , গনা সেই গাছে চড়ে বসে আছে । কেউ নামাতে পারছে না । যারা চেষ্টা করেছিল নামাতে , গনা ভয় দেখিয়েছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়বে । বোঝ কান্ড !

সকালের আলো ফুটি ফুটি করতেই বেরিয়ে পড়েছি । ফিরে যাওয়ার আগে গনা সর্দারের সঙ্গে দেখা করতে হবে । সেই গাছের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম , নিঝুম হয়ে আছে গাছ । কোথাও কারও নড়াচড়ার চিহ্ন নেই । গনা কোথায় ? চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কেউ নেই । দু চারটে গরু চরছে । দূ রে । দূরে । আমি সন্তর্পনে ডাক দিলাম –গনা সর্দার ! আছেন ? আমাকে চিনতে পারছেন ? সেই যে ট্রেনে …?

দেখা যাচ্ছেনা ওকে , গলা পাওয়া যাচ্ছে গাছের আড়াল থেকে – চিনিছি । আপনে আমারে চিনেন নাই । নকুল সর্দাররে চিনো ? সে আমার…বাপ ।

ভোঁদা সর্দাররে চিনো ? সে আমার ঠাকুদ্দা । আমার নাম গনা সর্দার । 

এসব কথা আমার জানা । ভয় হল , আমি কি সত্যি কি চিনতে পেরেছি গনাকে ? নকুল সর্দারকে ? ভোঁদা সর্দারকে ? এই বাপ ঠাকুর্দার রক্ত গনা্র শরীরে বয়ে যাচ্ছে নদীর মতো । এই রক্ত ধারা চেনার সাহস আমার নেই ! আমি ঝিমঝিমে গাছটাকে ফেলে চলে যাচ্ছি । পেছনে পড়ে থাকল গিঁটবাঁধা একটি মানত- মানুষ । ডালপালা পাতাটাতার আড়ালে । 


৩টি মন্তব্য:

  1. ভালো তবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে দুর্বলতা কাহিনিকে বাধা দিচ্ছে।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো তবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে দুর্বলতা কাহিনিকে বাধা দিচ্ছে।

    উত্তরমুছুন