রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার : আমার বাবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয়

ললিতা চট্টোপাধ্যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটো মেয়ে। পেশায় চিকিৎসক। তাঁকে লিখতে বলা হল। তাঁর বাবাকে নিয়ে। ললিতা বললেন, কিছু প্রশ্ন সাজিয়ে দিলে তিনি লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন। অতঃপর আমরা ষোলোটি প্রশ্ন তাঁর সামনে রাখলাম। প্রশ্নগুলি, পাঠক দেখলেই বুঝতে পারবেন, আমরা কোনওরকম দ্বিধা বা রেয়াত করে করিনি। যথেষ্ট সরাসরি এবং প্রত্যক্ষ।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের চাকুরিজীবন, পারিবারিক জীবন, লেখকজীবন, তাঁর লেখালেখির মেকানিজম, জীবনবোধ, তাঁকে নিয়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র মিথ, তাঁর নিজস্ব দ্বন্দ্ব এবং সংশয় এই প্রশ্নমালায় ছড়িয়ে। ললিতার ব্যক্তিজীবন নিয়েও আমরা প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখিয়েছি। ললিতার জীবন শুধু নয়, তাঁর উত্তরসূরীদের জীবনেও শ্যামলবাবুর কোনও প্রভাব রয়েছে কিনা--সেসব প্রশ্নও রেখেছি। জানতে চেয়েছি বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ ও দ্রুত বদলে যাওয়া আগামী বিশ্বের আগামী প্রজন্মের কাছে শ্যামলবাবু কতোটা জরুরি থাকতে পারেন সে সম্পর্কে ললিতার মনোভাব। 

ললিতা প্রতিটি জিজ্ঞাসার অকপট উত্তর দিয়েছেন। এতো স্বতঃস্ফূর্ত অথচ এতো যুক্তিনির্ভর যে, পড়তে পড়তে আবিষ্ট হয়ে যেয়ে হয়। একজন নিয়মিত লেখকের মতোই তিনি লিখেছেন। লেখকের কন্যা, যেন প্রমাণ রেখে দিলেন। এই লেখাটি পড়তে পড়তে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অজানা অনেক পরিচয়, জীবনদর্শন, ব্যবহারিকবোধের সঙ্গে পাঠক পরিচিত হবেন। লেখক সম্পর্কে অনেক ভুল তথ্যও শুধরে নিতে পারবেন। জীবনরহস্যে মজে থাকা লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সত্যনিষ্ঠ ছবি এই লেখায় পরিষ্কার ধরা পড়েছে। 

পাঠকের দরবারে রাখা হল সাক্ষাৎকারটি। আপনারাই শেষ সমজদার। ] 
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রশ্ন--
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যখন আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘ আঠারো বছরের সম্পর্ক, নিশ্চিন্ত নিরাপদ কর্মজীবন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ১৯৭৬-র শেষাশেষি, আপনি তখন নেহাতই বালিকা, তবু এমন একটা বয়স, সবই মনে থাকার কথা--কোনও অনিশ্চয়তা ও দুর্ভাবনা কি কাজ করেছিল আপনার বাবার? কোনও প্রভাব কি অনুভব করেছিলেন পরিবারে বা তাঁর লেখক-সত্ত্বায়? সে সময়টা কিভাবে তিনি সামলে উঠেছিলেন। ।

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
আপনি যে সময়টার কথা জানতে চাইছেন সেই সময়টা আমাদের কাটে ৫০/১ প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়িতে। একটু আগে থাকতে বলি। '৭২ সালের মাঝামাঝি আমরা চম্পাহাটি থেকে চলে আসি, লরিতে চড়ে, দুপুরে খেয়ে উঠেই--যে জিনিষটা যেমন পড়ে আছে, সেভাবেই ফেলে রেখে। প্রতাপাদিত্য রোডের একটা দোতলা বাড়ির পিছনের একটা ঘরে। নভেম্বর নাগাদ ৫০/১-এ আসি। '৭২-এর নভেম্বর। এরপর বাবার লেখালেখির সঙ্গে মেশামেশিও বাড়ে। বন্ধুদের যাতায়াত বাড়ে। কৃত্তিবাস'--নতুন পর্যায়ের জন্য টাকা তোলা, বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনা, লেখা--'অগস্ত্যযাত্রা', 'পরীর সঙ্গে প্রেম' ইত্যাদি চলতে থাকে। এই সময় জাপান, ফিলিপিন্স যান। যেখানে যেতেন, সে রাজস্থানই হোক বা জাপানই হোক, রোজ দু'লাইনের চিঠি পিকচার পোস্টকার্ডে---''ললিবাবু এটা একটা আগ্নেয়গিরি। অনেকদিন বাদে বাদে জেগে ওঠে। এখন ঘুমোচ্ছে। চুমু নিও।''--এরকম। কৃত্তিবাস পর্বে বাবার রঙ্গনা, প্রতাপ মঞ্চে যাতায়াত। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীম চক্রবর্তী, কেতকী দত্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব। কখনও পারিবারিক আড্ডা, কখনও একক। তখনও আনন্দবাজারে। লেখা হল ''অদ্য শেষ রজনী'', 'অমৃত'য় ধারাবাহিকভাবে বেরোয়। তখন সম্পাদক কবি মণীন্দ্র রায়। এই উপন্যাসের উপর বিভিন্ন সম্পাদকের কলমের প্রহার--বাবার ভূমিকাতেই আছে। '৭৭ সালে বই হয়ে বেরোয় ''অদ্য শেষ রজনী''। বিশ্ববাণী থেকে। ১৯৭৬-এর মাঝামাঝি বাবা আনন্দবাজার ছাড়েন। বাবার কথায় 'মন ভেঙে গিয়েছিল'। 'চতুরঙ্গ' পত্রিকায় এ নিয়ে বাবার লেখা আছে। কেউ পড়েছেন। কেউ না পড়েই ভেবে নিয়েছেন শ্যামল মারপিটে অভ্যস্ত ছিলেন। আমি একটু অন্য কথা বলি। বাবা নিজেই চাকরি ছেড়ে আসেন। বাড়ি ভাড়া, দুই মেয়ের স্কুল, নাচ, পিয়ানো ক্লাস, কাজের লোক, দাবিহীন সমবয়সী সুন্দরী স্ত্রী এসব নিয়ে। বাবার বয়স তখন ৪৩ বছর। একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি, ড্রাইভারসহ। কাজ করার লোক একজন। যাঁর সামনে কোনও সমবেদনার হাত বা চোখ নেই। পিছনে আলোচনা আনন্দবাজারের চাকরি ছাড়া নিয়ে। এইসময়ে পরপর যে ঘটনাগুলো আমাদের সংসারে ঘটে--দাদুর মৃত্যু, বাবার একটা হার্ট অ্যাটাক, আমাকে একটা কাছের কম খরচের স্কুলে ভর্তি করা যাতে দরকারে পায়ে হেঁটেও চলে যাওয়া যায়। 

বাবা তখন দু'হাতে লিখছেন। আরও লেখার জায়গা খুঁজছেন। মাঝে মাঝে চম্পাহাটির ধান বিক্রির টাকা নিয়ে আসতেন মা। সেদিনটা, বোধধহয় উত্তেজনা চাপা দিতে বাবা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে বাড়ি থাকতেন না। ভবানীপুরের উজ্জ্বলা, ভারতী, বিজলী বা পূর্ণতে পরপর শোতে টিকিট কেটে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। মা ধান বিক্রির টাকার সঙ্গে বড় বড় ক্ষীরকদম কিনে আনতেন, কখনও মধু বা ঘি! ওটাই আনন্দ। 

'সোয়াইন' শব্দটা এবং একটি চড়ের প্রভাব সংসারে পড়েনি? এসব আজ ভেবে কি করব। আমি তো ভাবি এই মানুষটা সেইসময় পিঠের চামড়ায় অপমান মেখে কি কি লেখা লিখেছেন। নবকল্লোলের মধুসূদন মজুমদার (দৃষ্টিহীন) বাবার জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। মনের আর কাগজের। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২-র মধ্যে 'বৃহন্নলা’ নতুনভাবে 'অর্জুনের অজ্ঞাতবাস' নাম নিয়ে বেরোয় মিত্র ও ঘোষ থেকে। এছাড়া 'আবিষ্কার', 'অলীকবাবু', 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা', 'চন্দনেশ্বর জংশন', 'স্বর্গের আগের স্টেশন', 'হিম পড়ে গেল', 'স্বর্গের পাশের বাড়ি', 'পরবর্তী আকর্ষণ', 'জলপাত্র', 'গোলকধাম', 'একদা ঘাতক' ইত্যাদি নবকল্লোল ও যুগান্তর শারদীয়াতে প্রকাশিত হয়। এর একটিও আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কোনও কাগজে বেরোয়নি। তখন সেখানে বাবার প্রবেশ নিষেধ। বাবার লেখা ও নাম ছাপাও বারণ। অর্থাৎ উনি তখনই লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। কোনও বিশেষ বাজারের লেখক নন। কুস্তি করা বুকের ছাতি, কোঁকড়া কালো চুল বাঁ দিকে সিঁথি করে আঁচড়ানো, ভালবাসতে জানা চোখ আর ওজনদার পাঞ্জা, যার চড়ের ভয়ে অনেকেই বাবাকে ঘাঁটাতো না। এই প্রসঙ্গে বলি, এই লেখাগুলো পাঠককে খুশি করার পাশাপাশি আমাদের স্কুলের ফিজ, স্কুলের বই, পুজোর জামা, জুতো, মায়ের শাড়ি এগুলোও দিয়েছে। 

ওঁর লেখালিখির প্রবাহ দেখলে দেখা যায়, 'অমৃত' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পর কি লেখা কি বই প্রকাশ--শ্যামলবাবুর একটি পজিটিভ পরিবর্তন আসে, কোয়ালিটি কোয়ান্‌টিটির একটা বিপুল পরিবর্তন। তরুণ লেখকদের আবিষ্কার, উৎসাহ দেওয়া--যাকে বলে একটা জোয়ার--যা শ্যামলবাবুর জীবনেও নতুন। এ সময়টা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। 

'৭৬-এর শেষ বা '৭৭-এর শুরু--এই সময় বাবা যুগান্তরে যোগ দেন। তার কিছুদিন আগে থাকতেই লেখার জোয়ার আসতে থাকে। 'অমৃত'র সম্পাদক হয়ে চেয়ারে বসে পত্রিকাটিকে গড়ে তোলার জেদটাকেই উস্কে দিয়েছিলেন। নতুন কবি, গদ্যকার, সমালোচক, ইলাস্ট্রেটর, প্রাবন্ধিক-এদের একটা পুল তৈরী করেছিলেন। 

অগ্রজদের মধ্যে মহাশ্বেতা দেবী শারদীয়া সংখ্যায় উপন্যাস লিখেছেন। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ধারাবাহিক লিখেছেন 'আদি আছে অন্ত নেই'। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় 'সোনার হরিণ নেই'। সমসাময়িক বরেন গঙ্গোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখেছেন 'বনবিবির উপাখ্যান'। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় 'ঈশ্বরের বাগান'। শিল্পী পরিতোষ সেন বড় গদ্য অমৃততেই প্রথম লেখেন--বোধহয় আত্মকথা 'জিন্দাবাহার'। 

বাবা নিজেও 'হাওয়াগাড়ি' লেখেন--ধারাবাহিক উপন্যাস। 'হাওয়াগাড়ি' লেখার সময় গাড়ি কেনা, সারানো, বিক্রি, ভিনটেজ কার--তার সংগ্রাহক শ্রীমুরারী সেন ও তাঁর অসামান্য সংগ্রহশালা, কার র‍্যালি, গাড়ির মিস্ত্রির আমাদের পিয়ানোয় বসে বাবার কথায় বাজিয়ে শোনানো--এগুলো শুধু শব্দ বা স্মৃতি নয়, অনুষঙ্গ, জীবনের অনুপান, জীবনযাপন। এই সময় আমাদের বাড়িটা ছিল একটা জ্যান্ত বাড়ি। যেখানে দরজা, জানলা ছিল ঠিকই, তাদের খুব একটি কাজ ছিল না। বাবার লেখার সময় বা অমৃত'য় যাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে বাকি সময়টা ছিল আড্ডার, মেশামেশির বা লাভ, লাভ অ্যান্ড লাভ-এর সময়। কেউ অগ্রজ, কেউ সমবয়সী, কেউ ১৫-২০ বছরের ছোটো। 

এই সময় প্রকাশিত হয় শৈবাল মিত্রর ধারাবাহিক 'তরণী পাহাড়ে বসন্ত', অমর মিত্র-র ধারাবাহিক 'পাহাড়ের মতো মানুষ। জেল থেকে বেরোনোর পর শ্যামল রায় লেখেন 'মিসা ৭৩' । তখনও তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না। 

কবিতায়, গল্পে, ফিচার, গ্রন্থসমালোচনায়, সিনেমা, থিয়েটার নিয়ে আলোচনা--সব দায়িত্ব ছিল অনুজদের। বিভিন্ন বিষয়ে কভার স্টোরির তিনিই প্রবক্তা বাংলা সাপ্তাহিকে। দেশি বিদেশি গল্পের অনুবাদের বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করেছিলেন। যারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, বাড়িতে আসতেন, লিখতেন বা নিছক আড্ডায়--পবিত্র মুখোপাধ্যায়, প্রভাত চৌধুরী, শৈবাল মিত্র, শ্যামল রায়, তুষার চৌধুরী, সমীর চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অনন্য রায়, অমর মিত্র, শচীন দাশ, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, একরাম আলি, সোমক দাস, চণ্ডী মন্ডল, ব্রজমাধব ভট্টাচার্য, অমল মুখোপাধ্যায়, দীপঙ্কর চক্রবর্তী। সবার নাম বলতে পারলাম না। কণ্ঠশিল্পী, পেইন্টার, অভিনেতা, অভিনেত্রী। আড্ডা জমে উঠত তার নিজস্ব মজা নিয়ে। এই সময়টায় বাবার লেখা, সম্পাদনা, নিজেকে উন্মুক্ত করে মেশা, অনুজ বন্ধুদের বলয় তৈরী হওয়া--সত্যিই জোয়ার এসেছিল। উপচানো জোয়ার। আরেকবার নেশায় মেতে ওঠা--তৈরীর নেশা। প্রথমটা ছিল চম্পাহাটি। দ্বিতীয়টা অমৃত পর্ব। 


প্রশ্ন--
: খুবই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, তবু জানতে ইচ্ছে করে। আপনাদের দুই বোনেরই বিবাহ খুবই অল্পবয়সে। যাঁদের সঙ্গে বিবাহ হয় তাঁরা দুজনেই আপনার বাবার লেখালেখির তরুণ বন্ধু। এদের সঙ্গে প্রেম পরে বিবাহে কখনও আনকমফরটেবল মনে হয়নি? এতো অসম বয়সের বিবাহে শ্যামলবাবুর পরিবারের অন্যান্য স্বজনরা প্রশ্ন তোলেননি? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
দেখুন, প্রশ্নটা করছেন ২০১৭-এ দাঁড়িয়ে, যেখানে দিদির বিয়ের বয়স ৩৯ বছর, আমার ৩৫ বছর। বিবাহিত সম্পর্ক তো ব্যক্তিগত বলে লুকিয়ে রাখা যায় না, বড় জোর প্রেমের শুরুটা অবধি লোকানো যায়। আর আমি তো দেখছি বিয়ে নামক ঘটনাটায় ব্যক্তি প্রচুর থাকলেও ব্যক্তিগত কিছু থাকে না। বেশ, দিদির বিয়ে ১৭ বছর ৫ মাসে--৪ মাস প্রেমের পর। আর আমার ১৭ বছর ৪ মাসে, ৪ বছর প্রেমের পর। হ্যাঁ, ওরা বাবার বন্ধু শুধু শেষ দিন অবধিই নয়, আমার অভিজ্ঞতা বলে--এখনও। জীবনের কিছু ঘনিষ্ঠ সময় ছাড়া সব আড্ডাই তো কমন ছিল। এখন বুঝি, সমমানসিকতাটা জরুরি, যেটা আমার ক্ষেত্রে অসচেতনভাবেই ঘটে গেছে। সমমানসিকতা বলতে আমি 'সানন্দার' 'পারফেক্ট কাপ্‌ল'-এর সংজ্ঞা নির্ণায়ক কোনও শর্তের কথা বলছি না। প্রেম, যৌনতা, বাজার, ফার্নিচার, অপত্য স্নেহ এসব মিটিয়েও কিছু সময়, কথা, কাজ থাকে। দু'চারটে মিললেই হল। আর বাবার বন্ধু হলে অসুবিধা কোথায়? যাঁরা বাবার সঙ্গে মিশেছেন তাঁরা এ প্রশ্ন করবেন না। ওভাবে মিশতে তো আর কেউ পারলোই না। 

বাবা মদ্যপানের আড্ডা ছেড়ে আসার সময় সমীরকে (সমীর চট্টোপাধ্যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটো জামাই।) প্রস্তাব দিতেন--ললিকে ভয় পাস? ডিভোর্স দিয়ে আমার কাছে থাক। আর আমাকে বলতেন, দুই বেণী করে ফ্রক পরে ফিরে এসো। অনেক শ্বশুরবাড়ি হয়েছে। আমার মেয়ে আমি ফেরত নিয়ে যাব। এত আদর করে কে ডাকে? আমাদের দুর্ভাগ্য--৬৮ বছরেই বাবা প্রয়াত হন। 

তুষারদা (কবি তুষার চৌধুরী। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বড়ো জামাই।) বয়স হওয়ায় মারা যাননি। সিরোসিসে মারা গেছেন। মন দিয়ে মদ্যপান করায় মৃত্যু এগিয়ে এসেছে। সেটাই সবাই মনে রাখে। ওর কবিতা, পড়াশোনা বা রসবোধ--সেখানে বয়স কোথায়? 

সমীরের সঙ্গেও আমার বয়সের পার্থক্য আছে। এখনও অবধি অসুবিধা হয়নি। হয়তো আরও বুড়ো হলে হবে অথবা হবে না। আসলে ভালো লাগা আর ভালো থাকার বোধটা যার যেমন তৈরি হয়। আমার ওস্তাদজি আমার বাবা। 

তবে বিয়ের সময় পাত্র হিসাবে এরা ছিলেন ক্লার্ক, মদ্যপায়ী, লেখালেখি করে। তুষারদা আবার কায়স্থ। তুষারদার সুন্দর চেহারা দেখে বাবার এক অগ্রজ বলেন--কনস্টেবলও সুন্দর হয়। তাই বলে মেয়ের বিয়ে!! অনেকেই বলেছেন, হাত-পা বেঁধে শ্যামল দুই মেয়েকে জলে ফেলে দিচ্ছে। তবে ওটা পুস্করিণী ছিলো না। দুই জামাই-ই ৬-৭ পেগের কমে থামতো না। আত্মীয়রা বলতেই পারে। 

আমাদের জীবন, স্বাধীনতা, পড়াশোনা, সংসার, বই পড়া, আড্ডা কিছুই থেমে থাকেনি। মনে তো হয়, জলে পড়িনি। 


প্রশ্ন--
: যে সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে মনোমালিন্য শ্যামলবাবুর আনন্দবাজার ছাড়ার প্রধান কারণ, তাঁর সম্পর্কে অগাধ শ্রদ্ধা যে আপনার বাবা লালন করতেন তার প্রমাণ শ্যামলবাবুর 'চতুরঙ্গ' পত্রিকায় লেখা প্রবন্ধটি, যেখানে শ্যামলবাবু সব গুজবের নিরসন ঘটিয়ে আসল ঘটনা তুলে ধরেছেন। পরে সন্তোষবাবু বা আনন্দবাজার বা কৃত্তিবাসের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল শ্যামলবাবুর? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
সন্তোষজেঠুর (সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষ।) সঙ্গে বাবার সম্পর্ক শেষদিন অবধি একই দেখেছি। মালিন্য দেখিনি। বাকি বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ হয়নি। কোনও মান অভিমান যদি কখনও হয়ও সেসব খুব একটা চোখে পড়েনি। তবে বৃত্তগুলোর কেন্দ্র ক্রমশ আলাদা হচ্ছিল। সে তো সব মানুষের জীবনেই হয়। পরস্পরের লেখা পড়ে ফোনে মতামত জানানো, কখনও নিজেদের আড্ডা--কম হলেও সবই ছিল। তবে সন্দীপনকাকু (সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়) শেষ অবধি আসতেন। তাঁর আসা, নীরবতা অনেক অসহায়তা ব্যক্ত করতো। বাবা সুস্থ থাকাকালীন রোজ আমার সঙ্গে কথা হলেও দেখা হতো না। অসুস্থ অবস্থায় বাবা আমার কাছেই ছিলেন। অনেকেই এসেছেন। সেই সময় বা মৃত্যুর পরে স্মরণসভায় অনেকেই বক্তৃতা দিয়েছেন। দেখুন, বাবার বন্ধু এঁরা, স্বনামধন্য সাহিত্যিক একেকজন। যদি সাহিত্য একাডেমি/বাংলা একাডেমিতে বক্তৃতাগুলো সংরক্ষিত থাকে, ভালো। যে কেউ শুনে নিতে পারেন। আছে কিনা তাও জানি না। কেউ বলেছেন--শ্যামল শুরু করত ভালো, শেষটা হতো না। কেউ বলেছেন, শ্যামল ভণ্ড, কেউ বলেছেন শ্যামল নাটুকে। কারুর মতে শ্যামলের লেখায় নারীরা পণ্য। তারা তাদের মতো বলেছেন যা মনে করেছেন। একটা কথাই বলতে পারি, যে পাঠকরা শ্যামলকে মিট করেননি, তাঁরা কি বলেন দেখা যাক। তাঁদের কাছে তো শ্যামল শুধু তাঁর লেখায় উপস্থিত। 


প্রশ্ন--
: শ্যামলবাবুর খামখেয়ালিপনা বা আনপ্রেডিক্টেবল বিহেভিয়ার প্রায় মিথ। অপর দিকে আপনার মা ছিলেন শান্ত ধীরস্থির সর্বংসহা। কিভাবে চলতো সব কিছু? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
শ্যামলবাবু খামখেয়ালি? শ্যামলবাবু আনপ্রেডিক্টেবল? বন্ধু মতি নন্দীর বড়শ্যালিকা অবিবাহিত। তার ১৭-টা সম্বন্ধ এসেও ক্লিক্‌ করেনি। অথচ তিনি সুন্দরী, শান্ত। কোনওটায় দাবী ছিল রিস্টওয়াচ্‌, কোনওটায় গলার চেন বা সাইকেল। শ্যামলবাবুর বউ দরকার ছিল। ইতির দরকার ছিল বিয়ের নিশ্চিন্ততা। বিয়ে হল। টিউশনির টাকায় বানানো সামান্য কিছু গয়না ইতির [শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী ইতি গঙ্গোপাধ্যায়।) গায়ে। বাবা বিয়ের দিন মার খান জেঠুর কাছে। বরকর্তা সন্তোষজেঠু। বৌভাতের ক্যাটারার বিজলী গ্রিল। টাকা শোধ ইনস্টলমেন্টে। পাঁচ বছর যৌথ পরিবারে থেকে চার বছর আর আড়াই মাস বয়সের দুটো মেয়েকে নিয়ে ক্যানিং-এর কাছে চম্পাহাটি পাড়ি দেন এই দম্পতি। বাবার সব পাগলামিতে সঙ্গী এই মহিলা। সেটা খালকাটা, ইটখোলা করা, বাড়ি বানানো বা চাষ করা। মা গম্ভীর থাকতেন বলে চাষীরা বলত মাঠাকরুন 'ময়াটে চটা'। মা নীরব, সর্বংসহা কিন্তু ভীতু নন, তখন তো ছিলেনই না! এবং ন্যাগিংও নন। নন হস্তক্ষেপকারী বা দাবিসর্বস্ব। তবে আমাদের পরিবারে একমাত্র শান্ত ব্যক্তিত্ব মা। 

নীরবে বাজার থেকে ইলেকট্রিক বিল জমা দেওয়া থেকে আমাদের প্রয়োজন মেটানো, রান্না করা--সবই করতেন। 

একটা বয়স পর্যন্ত বা জীবনে বাবা যে পরীক্ষা নিরীক্ষাই শুরু করতেন, সেগুলো চালিয়ে যেতেন মা। এই চরম সহযোগিতা ভাবাই যায় না। চম্পাহাটি পর্বে সব কাজ বাবা শুরু করলেও শো চালু রাখতেন মা। আমাদের দুই বোনের বিয়ে বাবা মার উনপঞ্চাশ বছরের মধ্যে কমপ্লিট। তারও কয়েকবছর পর এই বিপরীতধর্মী দুটি মানুষের সম্পর্কে নির্ভরতা থাকলেও নিবিড়তা কমে যায়। 

প্রেম ও সমান্তরাল দুই নারীকে নিয়ে পরীক্ষামূলক জীবনযাপন করতে চাওয়া-- এতে শেষ হাতুড়ির ঘাটা মারে মা, এই প্রথম বাবার প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেন। মানা যায় না। একজন নিশ্চিন্ততাকে আশ্রয় করতে চেয়ে কষ্ট পেয়েছেন। আরেকজন চরম অবুঝের মত এতবছরের পারিবারিক সব সম্পর্কগুলো পকেটে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছেন। যত সহজে বলছি, এত সহজ ছিল না। আমি চরম বিরোধিতা করি। বাবার মনের জোর, স্বভাবের জোর, লেখার জোর ছিল, ছিল না অর্থের জোর। এই অনিশ্চিত পরীক্ষা নিরীক্ষা--তবে আমার চাওয়ায় এই সম্পর্ক ভাঙ্গেনি, ভাঙ্গার ছিল, তাই ভেঙ্গেছে। প্রেম মানে আকর্ষণ, বিকর্ষণ, মায়া, স্নেহ, আঘাত, প্রতিঘাত সবই। যে মানুষ ইতি, ললি (ছোটো মেয়ে ললিতা চট্টোপাধ্যায়), মলি (বড়ো মেয়ে মল্লিকা চৌধুরী), তাদের ছেলেমেয়ে আর গদা (শ্যামলের ভাই তরুণ গঙ্গোপাধ্যায়), তপা (শ্যামলের ভাই তাপস গঙ্গোপাধ্যায়), রমাকে (শ্যামলের বোন রমা মুখোপাধ্যায়), বাদই দেবে না তার প্রেম টেঁকে নাকি! মা ক্রমশ নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন। বাবা নন। একটু একটু করে অসুস্থতা শরীরটাকে কমজোরি করতে লাগল। আমি বোধহয় প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গেলাম। 

তবে, অসুস্থতার শেষ বছরটায় সামান্য ব্যথা পেলেও বাবা চিৎকার করতেন, 'ও ইতি, বাঁচাও।' 
মা কিন্তু টালিগঞ্জেই থাকতেন। আসতে চাননি। কখনও না। 


প্রশ্ন--
: জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিয়েছেন আজীবন। মাঝে মাঝেই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতেন। অথচ ছিলেন ভীষণ পারিবারিক, দায়িত্বশীল, স্নেহপ্রবণ এবং বন্ধুতার কাঙাল। খুলতে চেয়েছিলেন 'লাভ লাভ এন্ড লাভ কোম্পানি'। সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হয়। সবই তো মেয়ে হয়ে ফেস করেছেন। কি বলেন আপনি। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
বাবার শৈশব--খুলনার বড় পরিবার, ভৈরব রূপসায় ঝাঁপানো, ঠাকুমার কাছে ইংরাজি কবিতা শোনা, গল্প শোনা, অপরিসীম দৌরাত্ম্য, দাদাদের মার খাওয়া, ছোট ভাইবোনদের নিজের টিমমেম্বার করা--এসব নিয়ে। দেশভাগ, নিজের দাদার আত্মহত্যা, ঠাকুমার অসুস্থতা, ভাইদের বড় হওয়া থেকে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা, বেকারত্ব, প্রেম এবং প্রেমহীনতা সবই--বাবার লেখায় সরাসরি জীবন থেকে উঠে এসেছে। নিজেকে বিপন্ন করে যে সংকটকে সামনে পেতেন তার অনায়াস মসৃণ ব্যবহার করতেন লেখায়। 

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বরং বাবাকে তাড়া করেছে। বাবাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, রাজসিক মানুষটার চলত কিভাবে! ভালবাসতেন সবাইকে পুজোয় উপহার দিতে। নিজে হাতে কিনতেন। খাওয়াতে ভালবাসতেন। আদর করতে জানতেন। আমার এই নিরুপায়তা নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না। এই বিষয়টা থাক। 

সমস্ত আড্ডা--তা পারিবারিক হলে বাবা তার মাঝখানে। বাবার গল্প বলার মজাটাই আলাদা। অনেকটা দার্জিলিং চা বা কমলালেবুর মতো। অব্যর্থ ফ্লেভার। মস্তিষ্কে থাবা বসায়। ভুলতে দেয় না। 

দিদি মেয়ে হিসাবে শাসিত হয়েছে। হয়তো প্রথম সন্তান বলে। আমি একটু এলেবেলে। আমাকে বকা বা মার--এসব কমই হতো। বরং বহুক্ষেত্রে আমার রাগ থামাতেন। বাধ্য হতেন। 

বাবার লেখা পড়তে শুরু করে দেখলাম--ক্রমশ আমিও বন্ধু হয়ে যাচ্ছি। আগেও ছিলাম। পরে আরও বেশি। আর রকমটা আলাদা। বাবার অনেক অ-সাধারণ ঘটনা/ তাৎক্ষণিক মজার সাক্ষী বা চরিত্রও আমরা। তবে সত্যি মিথ্যে মিশিয়ে সুস্বাদু গল্পগুলো সাজানো থালায় পরিবেশন করার মতো কিছু ক্যাটারার এখনও জীবিত। এর জন্য আমাকে মুখ খুলতে হবে না। তবে সব গল্প সত্যি নয়--অনেকটা দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরির মতো। আর, সবার বাবা শ্যামল হয় না। সবার বাবা 'নিশীথে সুকুমার' হয়ে নেচে বলতে পারে না--'আমার ধর্ম নেবে?' ছোটবেলার সংকোচ মনে পড়লে হাসি পায়। ভালো লাগে। গর্ব হয়। 

ভিনটেজ কারে বাবা, দিদির সঙ্গে বসে আছি। হুড খোলা। রাস্তায় টিউবের ঝলমলে আলো। গাড়ি ঠেলছেন কয়েকজন মহিলা--নিজে থেকেই--যাঁরা রাস্তার মোড়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়েছিলেন। মনে পড়ে। কি অনুভূতি তখন হয়েছিল মনে নেই। এখন রিপিট টেলিকাস্ট করতে চাই। জানি হবে না। 

এখন এই বয়সে এসে বলতে পারি বাবার সঙ্গে যতটুকু থাকতে পেরেছি, তা অন্তত আমাকে জীবনকে সহজে গ্রহণ করতে সাহায্য করেছে, যখন যেভাবেই থাকি না কেন। 


প্রশ্ন--
: ব্যবহারিক জীবনে শ্যামলবাবু ছিলেন খুবই রসিক। উচ্ছ্বাসপ্রবণ। আগ্রহী--যাকে বলে জোভিয়াল। কিন্তু ওঁর লেখার জগৎ একদম আলাদা। যখন লেখায় বুঁদ হয়ে থাকতেন তখন কি বাবাকে অন্যরকম মনে হতো? মেকানিজম বা রুটিন অফ রাইটিং কেমন ছিল। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
বাবার লেখার বিষয়ে মুখ খুলবো না। পাঠকরা বলুন। রুটিনটা বলি। ছোট ছোট কাগজে, সিগারেটের বাক্সের সাদা অংশে, ছোট ডায়েরিতে নোট করতেন, যার পিছনদিকে পুজোর জামার হিসাবও লেখা থাকত। 

ভোরবেলা, প্রয়োজনে রাতেও লিখতেন, খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে। শীতে প্যান্ট শার্ট পরে, মশা থেকে বাঁচতে মোজা পরেও। ক্লান্ত হলে ঘুমিয়ে নিতেন। ব্রহ্মপুরে বারান্দার সাইজে মশারি বানিয়ে টাঙিয়ে তার মধ্যে টেবিল চেয়ার নিয়ে 'শাহজাদা দারাশুকো' লিখেছেন। আড্ডা মারতে হলে আপনাকেও তাতে ঢুকে পড়তে হবে। মোড়া নিয়ে। বেলায় বেলায় মাকে গরম গরম নতুন নতুন খাবার দিতে হবে। যত রাতেই মদ্যপান করে শুয়ে থাকুন না কেন, লেখা থাকলে ভোরে উঠে লেখা মাস্ট। রিফ্লেক্স দারুণ। একমাত্র ক্লান্ত হলে, মনখারাপ বা অপমানিত হলে অন্যমনস্ক হতেন। লেখা শেষ হওয়ার আগে প্রায়ই অফিসে সমীরের কাছে ফোন যেত, আর কত অফিসের টেবিল চেয়ার চাটবে। এবার এস। আসার সময় বুড়ো শ্বশুরের জন্য একটু গরুর ওষুধ নিয়ে এস। 

কোনও লেখা লেখার আগে প্রায়ই গল্পটা বলতেন। আবার বলতেন। আবার। অনেককিছু না বুঝেই বলতাম, লেখ না! ভালই তো। আমার বাড়িতে ফোন ছিল না। বাবার চেষ্টায় ফোন আসে। রোজ ১৩-১৪ বার ফোন। কি বাজার করলে? কি রাঁধলে? কোথায় গিয়েছিলে? নার্সিংহোম? কারও বাচ্চা হোল? কি হল--ছেলে? তারপরই একটা চিৎকার--'ও ইতি, আমাদের সময় একটাও ছেলে হওয়ার ডাক্তার পাইনি। কোথায় গেলে?' 

আবার কখনও--'ললিবাবু আমি এটা লিখতে চাই। লেখাটা লোকে পড়বে তো? 

এভাবেই বাবার শৈশবের 'সাধু কালাচাঁদ' আমার শৈশবে। কিন্তু সব লেখা পড়ে হাসতে পারিনি। পারি না। চুপ করে গেছি। 


প্রশ্ন--
: বাবা হিসেবে কি বলতেন মন দিয়ে পড়াশুনা করো, ক্যারিয়ার বানাও, নাকি নিজের মতো চলো। মানুষকে বোঝো। জীবনবোধ যা ওঁর সাহিত্য জুড়ে তা কি কখনও জীবনে চর্চা করতে আপনাদের উদ্বুদ্ধ করতেন? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
কিছুই বলতেন না আমাকে। দিদিকে বলতে হত। তবুও অত্যাচার করে পড়ানো--কোনওদিনই মুখোমুখি হইনি। সবসময় সঙ্গে থাকতাম। বাজারের ব্যাগে করে গল্পের বই কিনে দিতেন। নাচ, পিয়ানো, সাঁতার--ভর্তি করে দিয়েছিলেন। বরং পড়া থেকে তুলে লেখা আনতে পাঠিয়েছেন 'অমৃত'-র জন্য। বিশ্বাস করতেন জীবনটা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। জীবন যাপন করে জীবনকে জানতে হয়। ফার্স্ট বা লাস্ট হওয়া নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। 

শেষের দিকে একটা স্কুলের সেক্রেটারি হয়েছিলেন। শিক্ষকরা টেস্টের রেজাল্টের দিন ভয় পেতেন। বাবা গিয়ে সব গুবলেট করে দেবেন। হেডমাস্টারমশাই হয়তো কড়া গলায় অনুত্তীর্ণ ছাত্রের মাকে দুটো কথা বলছেন। বাবা সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। উঠতে উঠতে বাবার বক্তব্য--'সমর, ওনার কি দোষ। ওনাকে বকছ কেন? ছেলেগুলোকে পাশ করিয়ে দাও। কোনও ক্ষতি হবে না। আপনি বাড়ি যান মা। আপনার ছেলে পাশ।' সমস্ত টিচার চুপ। হেডমাস্টার সমর ভট্টাচার্য চাপা গলায় বললেন, 'এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। শ্যামলদা আপনি ঠিক এই সময়েই?' নতুন টিচার জয়েন করলে, তাকে নিজের মায়ের হাতের রান্না সেক্রেটারির জন্য নিয়ে আসতে হতো একদিন। পোস্তর বড়া, মৌরলা বা পুঁটির ঝাল। আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত। 


প্রশ্ন--
: একলব্যের মতো গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আপনাদের বলতেন? সাহিত্য পড়তে উৎসাহ দিতেন? নিজের লেখা পড়তে বলতেন? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সত্যিই গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। আমার অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর ঠাকুমার ঝুলির পাশাপাশি যে বইগুলো হাতের নাগালে চব্বিশ ঘণ্টা পেতাম তা 'পথের পাঁচালি', 'অপরাজিত', 'অনুবর্তন', 'দেবযান'! বলতে চাইছি এই বইগুলোর অস্তিত্ব আমাদের বাড়িতে সর্বকালীন। আস্তে আস্তে পড়ে গেছি, সব তো ওই বয়সে বোঝা যায় না। বার বার গল্প পড়ার তখন থেকেই শুরু। আমার মেয়ে যখন সাত মাস তখন আমি, সুচরিতা (ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সুচরিতা রায়) আর মাকে নিয়ে ব্যারাকপুরে রমা দেবীর (কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী) কাছে নিয়ে গেছেন। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও (কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে) বাবাকে নিজের বড়ভাই বলতেন। আসলে বাবা কোনও ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে কোনও লেখা লেখার কথা ভাবতেন না। চিরকালীন রেলেভেন্সের কথা ভাবতেন, যা বিভূতিভূষণের লেখা জুড়ে। বহুবার বলতেন, 'আমি কি ওনার মতো টিকবো? টিকে যাবো?' সাহিত্য পড়তে উৎসাহ দিতেন? কি ভাবে বলি। বই কিনে দিতেন। বলতেন না, এটা পড়। জিজ্ঞেস করতেন, কি পড়লে? কেমন লাগল? কিছুটা নিজের কথা বলতেন। ক্লাস সেভেন/এইটে 'লোলিটা' পড়তে দেখে বলেছিলেন, 'আর কদিন পরে পড়লে হত না?' 

নিজের লেখা বাড়িতে রাখতেন না। আমি সিক্স বা সেভেন থেকে বাবার লেখা ধরি। বরং বলতেন--'এখনই কেন? এগুলো পড়লে বাবাকে ভুল বুঝবে।' যখন দেখতেন এসব বলে হবে না, ছেড়ে দিলেন। 

ও, একটা কথা বলি। 'অমৃত'য় রিভিউ-এর জন্য অনেক বই আসত। মাঝে মাঝে আমাকেও দু-চারটে দিয়ে বলতেন, পড়ে শর্টে লিখে দাও। পার বই ১০ টাকা। ভাল ইনকাম ছিল। 


প্রশ্ন--
:বাবার লেখা পড়েছেন ধরে নিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আজ থেকে একশো বছর পরের যে পৃথিবী, তার আমূল বদলে যাওয়া চেতনা, তখনও কি পাঠক শ্যামলবাবু পড়বে? প্রাসঙ্গিক, জরুরি থাকবেন? অবশ্য যদি তদ্দিন বাংলা ভাষা টিকে থাকে। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
আপনার এই প্রশ্নটার আমি শেষ থেকে উত্তর দেব। সেটা আমার সুবিধা হবে। 

প্রথম, বাংলা ভাষা টিকে থাকবে কিনা--১০০ বছর। কোন বাংলা? কলকাতার, বীরভূমের, বাঁকুড়ার, উত্তরবঙ্গের, মেদিনীপুরের, নদীয়ার, ঢাকার, চাঁটগাঁয়ের, কুমিল্লার? কোথাকার? 

প্রথম কথা, বাংলা কি ১০০ বছর আগে এরকমই ছিল? না তো। বাংলা পরিবর্তিত হয়েছে। হচ্ছে। হবেও। বাংলা ভারতের প্রাদেশিক ভাষা, বাংলাদেশের প্রধান ভাষা। বাংলা এমন একটা ভাষা যাতে পৃথিবীর বহু ভাষার বহু শব্দ এসে বসে বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। ক'টা শব্দ বিশুদ্ধ বাংলা? ভাষায় যত আদান প্রদান হবে, তত বেশি টিকে থাকবে। 

দ্বিতীয়ত, বাংলা শুধু যারা কবিতা লিখছেন, গদ্য লিখছেন, নাটক লিখছেন, নিজেদের সাংস্কৃতিক ভাবছেন তাঁদের ভাষা নয়। আমরা যারা এগুলো লিখি না, দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে, কাত হয়ে, চিত হয়ে যে কোনওভাবে বাংলা পড়ে ফেলতে পারি, হাস্য, লাস্য, ঝগড়া, কান্না, স্বপ্ন--সব বাংলায় চচা করি, ভাষাটা আমাদেরও। 

আমরা হয় বাংলায় নয় ইংরাজিতে বহির্বিশ্বের টিকে যাওয়া এবং অনুবাদ হওয়া বইগুলো পড়ি। মানে অনুবাদ সাহিত্য। শেকস্‌পীয়র, চার্লস ডিকেন্স থেকে মার্কেজ, কুন্দেরা, পামুক, সারামাগো, মুরাকামি আপনি আপনার জানা দুটি ভাষায় আপনার সামর্থের মধ্যে কিনতে পারছেন। তাই পড়ছেন আর আলোচনা করছেন। 

বাংলা ভাষার সাহিত্য--প্রশংসা বা রিভিউ-যোগ্য কিনা তা ঠিক হয় অগ্রজদের বৈঠকখানায়, পদতলে। সেই ছবি সামাজিক ডিজিটাল মাধ্যমে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, এই অগ্রজ কি বিচারকও? আর ভালো লিখে বেশি সুখ না পদতলে বসে--আমার জানা সম্ভব নয়। 

পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্য পড়ে এটা অন্তত বোঝা যায় বাংলা সাহিত্য কোনও অংশে কম নয়। 

একজন সাহসী প্রকাশক, কয়েকজন দক্ষ সাহিত্য-ভালোবাসা অনুবাদক আর ফাটকা খেলতে পারা আন্ত্রপ্রেনর (বানান ভুল হতে পারে--এই শব্দটি ব্রাত্যর নাটক থেকে নিলাম) বোধহয় ছবিটা পাল্টানোর চেষ্টা করতে পারে। সাইনবোর্ডের ছবি নয় কিন্তু। সাইনবোর্ডের বাংলা হরফ থাকার চমক যে বাংলা ভাষার বা সাহিত্যের অগ্রগতিকে সাহায্য করেনি--এটা বোধহয় প্রমানিত। অনুবাদ চাই সর্বজনগ্রাহ্য ভাষায়। আর অনুবাদের সময় যদি শুধু প্রেম বা ভূত খোঁজেন তাহলে বাংলা সাহিত্যকে অস্বীকার করা হবে। আমাদের ভাষার ক্লাসিকগুলো কেন ইংরাজিতে অনূদিত হবে না নিয়মিতভাবে? কি করে গ্লোবাল নাগরিক জানবে বাংলায় কি লেখা হয়েছে বা হচ্ছে? 

দশ বছর বয়সেও সাহিত্যের আড্ডায় এই এক প্রশ্ন শুনতাম। একশো বছর বাদে কি হবে। পরিবর্তনের সঙ্গে সাজুয্য থাকলে টিকবে। চল্লিশ বছর তো চলে গেল। ঢোঁড়াই, অনুবর্তন, হাঁসুলীবাঁক--সেই যুগ তো নেই। বইগুলো ফেলে দিতে বা বেচে দিতে পেরেছেন? মানুষের সর্বকালীন অনুভূতি, দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক, সংকট কয়েক হাজার বছরের বেশি টিকে আছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি, শেকস্‌পীয়র এগুলো তার উদাহরণ। সবার কাছে পৌঁছনো চাই। বাংলা সাহিত্য টিকলে, বহমান হলে শ্যামলের নাম থাকবে। প্রশ্নটা হল বাংলা সাহিত্য কারা পড়বে? আপনি তাকে মাল্টিকুইজিন রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করবেন না ছুঁতমার্গিতা দেখিয়ে, বিশুদ্ধ বাংলার অভিমান দেখিয়ে শুধু বাংলায় ৩০০ কপি বই ছাপবেন। ভারতের অন্য প্রদেশই জানে না বাংলায় কি লেখা হয়। ভারতের বাইরেও জানতে দিন। তারপর দেখা যাক। 


প্রশ্ন--
: উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে কোন্ অমূল্য জিনিসটি পেয়েছেন বলে মনে হয়। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
এই রে! কি কি পেয়েছি? কি কি? দ
আগে একটু মনের ভিতরে ঢুকি। 
জেদ।
নতুন স্বাদের আকাঙ্ক্ষা--বন্ধুতায়, রান্নায়, গানের সুরে, উল্টোদিকে বসা মানুষের কথায়, দুই মলাটের মধ্যে। 
বহু যন্ত্রণা মেনে নিতে পারা ও ভুলে যেতে পারা। হতাশায় বিশ্বাস না করা। 
এবার বহিরঙ্গ- স্ফীত মধ্যপ্রদেশ, মুখের গঠন ও হাসি (এটা লোকমুখে শোনা)। 

প্রশ্ন--
: চোখ বুজলে বাবার কোন্ উজ্জ্বল ছবি ভেসে ওঠে। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
বাবা ১৬ বছর শারীরিকভাবে বেঁচে নেই। ভুলতে পারলাম কই? আমার তো সব ভঙ্গীই মুখস্থ। ল্যান্ডফোন বাজলে মনে হয়, গলাটা যদি শুনি। ভিড় রাস্তা দেখলে মনে হয়--উল্টো দিক থেকে যদি হেঁটে আসেন হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট পরে। পায়ে কাবলি। হাঁটাটা দেখেছেন কখনও। দেখলে ভুলতেন না। 

এখন এই মৃত্যুটা মেনে নিয়েছি। চাইতে গেলে তো বাবার ক্লোন চাইতে হয়। তাতে আরেকজন করে দাদু, ঠাকুমা, আরেকটা করে ভৈরব, রূপসা, খুলনা--সবই চাইতে হবে। নইলে যে আরেকটা শ্যামল হবে না। যতদিন আমার মস্তিষ্ক সচল থাকবে বাবার কোনও ভঙ্গী মনে করতে আমাকে চোখ বুজতে হবে না। এখন বাবাকে ছুঁতে ইচ্ছে করলে পড়ি, 'ভিক্টোরিয়ার হিরো', 'সেই মাছটা', 'এক কাপ চা বইতো নয়', 'হাওয়া গাড়ি', 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'--আরও সব লেখা। বাবার সব লেখায় বাবা উপস্থিত। জীবনে যখন যে পর্ব গেছে, সেই পর্বের লেখা হাতে নিলেই হয়। 

প্রশ্ন--
: মাতামহ ছাড়া শ্যামলবাবুর অন্য কোনও পরিচয় কি আপনার ছেলে মেয়ে বুঝতে পেরেছে? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
আমার মেয়ে আমার বাবার ছোড়দিভাই, ছোটবৌ। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে চলে আসার সময় মড়াকান্না কাঁদত। ওর ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় দু'জন--ওর দাদামশাই আর ওর ঠাম্মা। বাবা ওকে কাঁধে করে গঙ্গা দেখাতে নিয়ে যেতেন। ঘাঘরা কিনে দিতেন। ঘুঙুর কিনে দিতেন। সেগুলো পরে সে 'গাইড'-এর গানের সঙ্গে বা 'আলিবাবার' গানের সঙ্গে নাচত। অজস্র বই কিনে দিতেন। পড়ার অভ্যেস ছোটবেলা থেকেই। দাদু সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শ্রদ্ধাশীল। সমস্ত বই নিজের দায়িত্বে সংগ্রহ করে। সব খোঁজ তো আমাদের মাধ্যমেই পায়। বাবার শেষ একটা বছর আমার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে দাদুর দেখাশোনা করত। খাইয়ে দিত। ও দাদু সম্পর্কে একটু পজেসিভ। এগুলো কোনও আলোচনার বিষয় হতে পারে না। ছেলের আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। সে বাবা এলে বাবার কাছে, আমার ছোটবেলার মতো শুয়ে থাকত। আমার মেয়েও তাই করত। 

কুন্দনের (ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে।) বই পড়ার অভ্যাস বা অ্যানালিটিকাল চিন্তাভাবনার সঙ্গে কিছুটা বাবার মিল আছে। আছে পাগলামির সঙ্গেও। তবে ও শান্ত। বাবার আশি ভাগ লেখা ওর পড়া। কিছু বই হিসাবে, কিছু প্রুফ ধরে। সমীরের সঙ্গে এই প্রুফ ধরার আনন্দে নিজের পড়া তাড়াতাড়ি শেষ করত। 

ওরা কিন্তু দাদু-দিদিমার সব গল্পই জানে। কোনও লুকোচুরি নেই। ওরা বাবার জীবন, লেখা এনজয় করে। ভবিষ্যত বলবে ওরা কি দায়িত্ব পালন করবে। 


প্রশ্ন--
: আপনিই একদিন কথায় কথায় বলছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় শ্যামলবাবু আপনাকে একাধিকবার বলতেন, 'আমার ভায়েরা ছোট, কিছু বোঝে না, তুই ওদের দেখিস। তা আপনার দুই কাকা এবং পিসি তো এখনও আছেন। যোগাযোগ রাখেন? কেমন আছেন তাঁরা? 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
না। তা বলেননি। সারাজীবনই পারিবারিক কোনও কথা উঠলে বলতেন-গদা, তপা, রমা আমার ছোট ভাইবোন। ওরা আমার আদরের। ওদের নামে কোনও খারাপ কথা আমি শুনব না। আমরাও সেই ভাবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়েছি। 

বাবার অসুস্থতার পুরো সময়টা যে ডাক্তার আমার পাশে থেকে অকুণ্ঠ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি ডা: নারায়ণ ব্যানার্জী। মৃত্যুর দু'দিন আগে যখন দেখতে এসেছেন, ওঁর যাবার সময় বাবা ডেকে বললেন, 'আপনি তরুণ আর তাপসকে চেনেন? একটু খবর দেবেন?' উনি তো সত্যি চেনেন না। ডা: ব্যানার্জী চলে যাবার পর আমি জানতে চাইলাম, 'কি হয়েছে? আমি কি বড়কাকা, তপুকাকাকে ডাকব?' বললেন, 'গদা, তপা, রমা ওদের দেখো। ওরা আমার ছোট ভাই-বোন।' 

আমি একটু হেসেছিলাম। মানুষ ভাইবোনের হাতে ছেলেমেয়ের ভার দিয়ে যায়। 

এতো উল্টো। আর কাকা পিসিরা জীবনে তো প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত। কয়েক ঘণ্টা পরেই বাবার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। 

তবে কাকাদের মুখেই বাবার ছাঁচ দেখি। কাকাদেরও বয়স হচ্ছে। একজন ৮০-র উপর। আরেকজন ৭০ ছাড়িয়েছেন। অসুস্থতা সামলে উঠেছেন। কাজ অব্যাহত। আমার পিসি এখন অনেক কিছু ভুলে গেছেন। গান গাইতে পারেন না। এখনও ভাইয়েরাই তার (পিসির) অ্যাসেট। কিছুক্ষণ এদের সঙ্গে থাকলে মনে হয় সব আগের মতো আছে। বাবার কথাটা আমার জীবনে অন্যভাবে সত্যি হল। 

এদের মুখের দিকে তাকালে মনে হয়--পৃথিবীতে এখনও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কোম্পানির ছাঁচটা আছে। আমার পিসির হাসি এবং দাপট--একই সঙ্গে অতুলনীয়। 


প্রশ্ন--
: জীবনের পথে চলতে চলতে কোন কোন সময়ে কখন বাবার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেন। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
যখন আমার আনন্দের দিনগুলোতে বাবাকে পাই না। যখন নতুন কিছু পাই- কোনও আনন্দ সংবাদ, নতুন কোনও সুখ। 

বাবার ইচ্ছে ছিল দুই নাতনি বড় হলে তাদের বয়ফ্রেন্ডরা আসবে--কোনও অশোক আর বিমল। তাদের সঙ্গে মিশরেন। অশোক আর বিমল এসে গেছে, মানে, সাগর(ললিতার মেয়ে সুচরিতার স্বামী সাগর রায়।) আর সন্দীপ ( মল্লিকার মেয়ে নিশার স্বামী সন্দীপ চক্রবর্তী।) মেশার লোকটাই নেই। এখন আমারও দুই নাতি। দিদির এক নাতনি। 

আমার ছেলের চেয়ে সামান্য বড় এক যুবক-লেখক যখন শ্যামলকে 'গুরু' মানে শুধু লেখা পড়ে--এটা বাবাকে কিভাবে বলতে পারি--এই সবই। 


প্রশ্ন--
: শ্যামলবাবুর বই প্রকাশনার ব্যাপারে আপনি খুব সচেতন এবং সচেষ্ট জানি। সম্প্রতি কি কি প্রকাশিত হল। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি। 

ললিতা চট্টোপাধ্যায়--
আমি তো শুধু মেয়ে নই, পাঠকও। বাবার বই প্রকাশ করার ব্যাপারে সচেতন বা সচেষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে কোনও ক্রেডিট নেওয়া মূর্খামি। কাউকে কিছু কাজ করতে হয়। দে'জ থেকে রচনাবলী ধারাবাহিক ভাবে বেরোচ্ছে। এই ব্যাপারে মূল দেখাশোনা ও গ্রন্থনার কাজটা করছেন সমীর চট্টোপাধ্যায়, আমার স্বামী। দে'জ পাবলিশিং-য়েই বাবার অধিকাংশ মূল্যবান বই আছে। এছাড়া আজকাল, মিত্র ও ঘোষ, করুণা, পরম্পরা, পরশপাথর--এদের ঘরেও বিভিন্ন বই আছে। প্রতি বছরই কিছু কিছু বই বেরোয়। বই প্রকাশের ধারাটা অব্যাহত রাখাটা আমার লক্ষ্য। 

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, ইচ্ছা বলতে পারেন। আমি চাই বাবার লেখা--বিশেষ করে ইংরাজি ও হিন্দিতে অনুবাদ হোক। সুযোগের অপেক্ষায় আছি। 




ঋণ স্বীকার..................................................................................................................
ছোটোকাগজ 'গল্পসরণি'র শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বিশেষ সংখ্যা : দুই, ১৮২৮/২০১৮-এ ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন