রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

নাসরীন জাহানের গল্প : এলেনপোর বিড়াল

বিড়ালটা ডেকে উঠতেই জ্বরগ্রস্ত রাত্রি ঘাম ছেড়ে নড়ে ওঠে। 

মেয়েটি চোখ খোলে। 

রাত্তির রাত্তির মেয়েটির কাটে চাদর খামচে, তুলোয় আঙুল আঁকড়ে, ছায়াছাদে নির্নিমেষ চোখ মেলে মেলে। মেয়েটি দেখে রাত বাড়তে থাকলে দেয়ালে যে কত ছায়া পড়ে, সেই ছায়ায় মূর্ত হয় কখনো মানুষ, কখনো জন্তু, কখনো গাছপালা--দেখতে দেখতে সে দু’ চোখের দুই পাপড়ি, যে একে অন্যের শত্রু, কষে বেঁধে এক করতে চায়, ঘণ্টা ঘণ্টা পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাসের তলায় তার ছায়া শরীর ঢেউ খায়। ঘুম আসে না।

বিড়ালটা শীতে ভিজে ডাকতে থাকে। তন্দ্রার ঘোর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে মেয়েটি মেঝেতে দাঁড়ায়। আধো বাতির তলায় দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে ছিটকিনিতে হাত রাখতেই হুঁশ হয়, দরজা খোলার শব্দে যদি কারও ঘুম ভেঙে যায় ? 

এ নিয়ে রাত রাত ভোগে সে। যেহেতু নিদ্রাহীনতার রোগ, হা হা রাত্তির খামচে খামচে রক্ত ভেঙে ঢোকে, সেই যন্ত্রণায় কত যে কাণ্ড হয়, বেশি বেশি পা চুলকাতে থাকে, বেশি বেশি পিপাসা হয়, বেশি বেশি বাথরুম পায়, বেশি বেশি কাশি ওঠে, সবকিছুই এত বেশি বেশি, নিজেকে চাপতে গিয়ে টের পায়, বুকের মধ্যে, জমাট রক্তের মধ্যে ব্যথা জমে যাচ্ছে। ফলে দিনের বেলা প্রায়ই তার দম আটকে আসে। মাথা কেমন টলতে শুরু করে, ধরাস ধরাস হাতুড়ির শব্দ পড়তে থাকে সর্ব স্নায়ুতে। নিজের বিপন্নতা নিয়ে যে কাউকে ভোগানোর বিষয়টি মেয়েটির কাছে এমনই মর্মান্তিক এক অস্বস্তির, সে রাতের অবদমনের ভারে দিনে ভুগতে থাকে, দিনের ভোগান্তি তরঙ্গিত হাসির তলায় লুকিয়ে যখন দম টানতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়--বাতাস আসে না। 

দিনের এত আপন মানুষগুলো, রাতে অচেনা হয়ে যায়। প্রতিটি ঘুম মানুষকে বিচ্ছিন্ন, রূঢ় স্বার্থপর করে তোলে। যন্ত্রণায় প্রাণে রক্ত উঠে গেলেও পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে জাগাতে কী ভয়! কী ভয়! 

মেয়েটিকে রাত্রি বাঁচার শক্তি দিয়েছে। রাতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মেয়েটি এই কঠিন জীবনের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে হাসতে হাসতে চলার যুদ্ধটা রপ্ত করতে শিখেছে। 

কিন্তু এরমধ্যেও যখন প্রাণের সঙ্গে একদম পেরে ওঠা যায় না, মেয়েটি ভেঙে পড়তে থাকে তখন তার স্বামী অবাক চোখে প্রশ্ন করে, কী হয়েছে তোমার ? 

মেয়েটি অস্ফুট ঠোঁট কামড়ে ধরে ছাইছাই কণ্ঠে বলে, কেমন জানি অসুস্থ বোধ করছি। 

কী অসুখ ? 

জানি না। 

আশ্চর্য! না জানার কী আছে ? মাথাব্যথা ? জ্বর ? বুকে ব্যথা ? 

এই রকম বিভিন্ন রোগের নির্ধারিত নাম নিয়ে যখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসতে থাকে মেয়েটি অসহায় হয়ে কেবল না... না... করে যায়, তখন স্বভাবতই ভয়ানক বিরক্ত হয়ে স্বামীটি টিভির চ্যানেল ঘোরাতে শুরু করে। আর, মেয়েটি ভীষণ অপরাধ হয়ে গেছে, এই ভেবে নিজের অসুস্থতার একটি নাম খুঁজে বের করতে চায়। বুকে প্রচণ্ড চাপ, কিন্তু ব্যথা নেই, চোখের সামনেটা ছায়া হয়ে আসে, প্রায়ই এমন বোধ হয় কলজে ফুঁড়ে রক্ত উঠছে... না না মেয়েটি ছটফট করে এসব একজন মানুষের অনুভব হতে পারে, রোগের নামে বিলাস হতে পারে, আসলে এসব কোনো রোগ নয়। এরপর শুরু হয় নিত্যকার খেলা, অসুখটাকে গিলে ফেলে অবসন্ন মাথা স্বামীর ঘাড়ে রেখে সে বাতাস ছেড়ে দেওয়া স্বরে বলে--জানো এখন ভীষণ ভালো বোধ করছি! 

মেয়েটি কোনোদিন পাহাড় দেখেনি, সমুদ্র দেখে নি--না দেখলে যা হয়, যা সমুদ্র যা পাহাড় তা মেয়েটির কল্পনায় এমনই অনির্বচনীয়, এমনই অতিকায় রহস্য রোমাঞ্চময়, তা পাহাড় এবং সমুদ্র এই সীমাবদ্ধ শব্দের বাইরে গিয়ে আরও ব্যাপক বহুবর্ণ রূপে তার মনের মধ্যে ঢেউ খেতে থাকে। অন্ধ যেরকম, চক্ষুষ্মান মানুষের চেয়েও ঘরের গলি ঘুপচি অন্ধি সন্ধি সব ছেনে ছেনে দেখতে পায়, এই বাড়িতে মেয়েটি নিজেকে তেমন প্রখর কল্পনা সম্পন্ন বোধ করে। এবং আশ্চর্য, কেউ যদি ওকে প্রশ্ন করে, মৃত্যুর পরে তুমি কী চাও ? 

শিশু যেমন সজ্জিত দোকানে গিয়ে খেই হারিয়ে দেখা গেল শেভিংক্রিমটাই আঁকড়ে ধরে অর্থহীন আবদার করে, মেয়েটি অনেকটা সেরকম, অলৌকিক বাগান, পাহাড়, সমুদ্র, সৌরজগতের ধারে কাছে না গিয়ে এক খুদে স্বপ্নের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে--আমি একটা সন্ধ্যা এই শহরে একা একা ঘুরতে চাই, সেই সন্ধ্যায় আমি হব ঘুমন্ত মানুষের মতো বিচ্ছিন্ন, কেউ আমার খোঁজ নেবে না। 

হেই ছুট ছুট ঘুড্ডি, হেই ছুট ছুট ঘুড্ডি... মেয়েটি চোখে ঘুম নামাতে এইরকম কত কী মনে মনে বলে, এক শ’ থেকে এক পর্যন্ত উল্টো করে সে বাতাসের আগে গুনতে পারে, আর কিছু কিছু কবিতার মুখস্থ পঙ্ক্তি--অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়--আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে, আমাদের ক্লান্ত করে--এইসব পড়তে পড়তে... পড়তে পড়তে... যখন ঘণ্টা ঘণ্টা পেরিয়ে যায়, ঘুমটা নামছি নামছি করতে থাকে তখনই পেটের মধ্যে রাক্ষসের মতো খিদেটা ঘাই দিয়ে ওঠে, তখনই খুব বাথরুম পায়, নয়তো বাতাসের শব্দে পর্দাটা কেঁপে ওঠে। প্রতিরাতেই ঝাড়বাতি আছড়ে পড়ার মতোন মেয়েটা তার এই বাবুই পাখির মতো বুনে ফেলা ঘুমটাকে ভেঙে পড়তে দেখে। আর ভয়ে ভয়ে যাতে বিচ্ছিন্ন লোকটির ঘুম না ভাঙে তাকে বাঁচিয়ে, পায়ের তলায় তুলো গুঁজে হাঁটে... হায়রে বৈরী রাত্তির, হাজার সাবধানতায়ও গ্লাসে জল ঢালার বেশি শব্দ হয়, পা-টা টাল খেয়ে যায় সামনে পড়ে থাকা জুতোটার সঙ্গে, এমনকি সুইচ চাপতেই বাথরুমের বাতিটা এমন সশব্দে জেগে ওঠে, মেয়েটার প্রাণের মধ্যে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে--সে দাঁতে দাঁত চেপে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে, আধো ঘুমে নড়ে ওঠা লোকটি ফের তলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত মেয়েটি এইরকম মূর্তি হয়ে থাকে। এবং বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে অনুভব করে এলেনপোকে, তার ফাঁকা মাথায় এলেনপোর কালো বিড়াল হাঁটে। সেই বিড়াল ওর মগজে রক্তাক্ত শরীর বিছিয়ে শুয়ে থাকলে মেয়েটির নিজেকেও সেই বিড়াল মনে হয়। 

বিয়ের পর এক বছর গেছে। 

এই পুরো বছরটাই মেয়েটির গেছে জ্বরতপ্তের মতো, চেতনারহিতের মতো স্বামীটিকে ভালোবাসতে বাসতে। বিয়ের কিছুদিন আগে তাকে দেখেই মেয়েটির মধ্যে এমন প্রগাঢ় মোহ, এমন প্রচণ্ড রোমাঞ্চ... এইসব এইসব অনুভব করেছিল, এরপরে ওর সঙ্গে চলার লোভে মেয়েটি একবছর এক মুহূর্তের জন্যও নিজের দিকে তাকায় নি, সন্ধ্যা সন্ধ্যা অপেক্ষার পর, যখন স্বামী আসে, মেয়েটি ধূমায়িত কাপ নিয়ে এগিয়ে যায়, নিজের মধ্যে নিমগ্ন স্বামী সেই চা নিয়ে স্টাডিরুমে ঢুকতে ঢুকতে রোজই এক কথা বলে--তুমি তো বাসাতেই আছ, নাকি ? 

আশ্চর্য! আমি আর কোথায় যাব ? মেয়েটিও রোজ অবাক হয়, আমি কোথাও বেরোই নাকি ? কাজ থেকে ফেরার পর, স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে গভীর রাতে স্বামীটির বিছানায় আসার পর মেয়েটি তার সমস্ত স্নায়ু জাগিয়ে রেখে শুধু স্বামীর চোখ লক্ষ করে গেছে, কয়টা শব্দ বেশি বললে সে বিরক্ত হয়, কোন প্রসঙ্গগুলো ওঠামাত্র তার ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে ওঠে, ঘর থেকে সে কখন বেরিয়ে গেলে স্বামীটি অসহিষ্ণু বোধ করে... এইসব করে সে মুহূর্তের পর মুহূর্ত স্বামীর কাছে একটি বিষয়ই চেয়ে এসেছে-- মাঝখানে টেবিল, আমরা দুজন মুখোমুখি বসে কিছু নিশ্চিন্ত সময় কাটাব, আমাদের সামনে থাকবে ধূমায়িত চায়ের কাপ--বিয়ের পর পর সে স্বামীকে বলেছে এই কথা, স্বামী বলেছে, এ আর এমন কী, একদিন সময় সুযোগ বুঝে হবে...। 

সে অপেক্ষা করেছে। 

বিশ্বাস করেছে। 

কিন্তু ছ’ মাস পেরিয়ে গেলে এক ঘোর অতৃপ্ত আত্মা তাকে ফের সেই কথা বলায়। 

স্বামী ফের বলে--হবে। 

এই একবছরে অন্তত এই বিষয়ে সে প্রত্যাশাটাকে গহিন গোপন বাক্সে লুকিয়ে ফেলার পর আজ সন্ধ্যায় কী এক বিষয়ে কথা উঠায় স্বামী যখন প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে--বিয়ের পর থেকে তুমি শুধু নিজের মধ্যেই চক্কর খেয়েছ, নিজেকে নিয়েই পড়ে থেকেছ, আমাকে কিচ্ছু দাও নি--সে একদম ধপাস করে মহাশূন্য থেকে মাটিতে পড়ে যায়। 

নিজেকে সে আয়নায় কখনই দেখে নি। যখন দেখেছে, তখন অন্যদের চোখ মুগ্ধ করা সাজে নিজেকে কীভাবে সাজানো যায়, এ নিয়ে ভেবেছে। তাতে অন্যের পছন্দের দুল-মালা চুলের গাঁথুনি, এইসব ঢুকে গেছে, এ নিয়ে কখনো তার গভীর কোনো ভাবনা হয় নি। আজ রাত্তিরে বেড়ালটা ডেকে ওঠার পর তার নিজেকে নিয়ে বড় ভাবনা হয়। তাই তো, কাউকে তো সে কিচ্ছু দেয় নি, দিনের পর দিন সে নিজের হৃৎপিণ্ড কেটে কেটে অন্যকে সুখী করতে চেয়েছে। সে নিজের রক্ত খুলে দেয় নি, মাংস কাটে নি--হৃৎপিণ্ডের মৃত্যুতে কার এমন কী প্রাপ্তি হয় ? কার কী জাগতিক চাহিদা মেটে ? বরং এই করে করে সে নিজেকে ভয়ানক বিপন্ন আর শূন্য করে ফেলতে ফেলতে অনুভব করছে, সবচেয়ে বড় অপরাধ যা সে করেছে, সে নিজেকেও ঠকিয়েছে। 

বিড়ালটা ডেকে ওঠার আগে সে স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন যদি দেখতেই হয়, তবে মেয়েটির দুঃস্বপ্ন ভীষণ প্রিয়। প্রায় রাতেই লোডশেডিং প্রিয়। মেয়েটি যখন অপূর্ব স্বপ্ন দেখে, ধরা যাক, ধূমায়িত কাপ মাঝখানে, দুজন দুদিকে বসে আছে, অথবা সন্ধ্যার রাস্তায় কারও সাথে বেড়াতে বেরিয়েছে... এরকম স্বপ্ন, স্বপ্নে বিষয়গুলোকে তার এত জীবন্ত বোধ হয়, সে ঘুম ভাঙার পরই মর্মান্তিক যন্ত্রণার নিচে তলিয়ে যেতে থাকে। হায়! এ স্বপ্ন! সত্যি নয় ? কিন্তু দুঃস্বপ্ন, ধরা যাক, সে বিশাল অট্টালিকার ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছে, তার স্বামীর লাশ কবরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে... এরকম স্বপ্ন, এইসব দেখতে দেখতে বুকে অপরিসীম ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙতেই আহ্! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম অপরিসীম শান্তি! বিষয়টা স্বপ্ন! বাস্তব নয়! কী সুখ! কী স্বস্তি! ঘুমিয়ে তলিয়ে যেতে যেতে মেয়েটি ভেবেছে, আমি ভাগ্যবান, সত্যি তেমন কিছু ঘটে নি। 

বাতি চলে গেলেও তার বোধটা প্রায় ওরকমই। সব সময় আলো থাকলে আলো না থাকার শান্তিটা অনুভব করা যায় না। মেয়েটি জীবনের গলি ঘুপচি ছেনে ছেনে এইভাবে শান্তিকে বের করে নিয়েছে। 

মেয়েটির তন্দ্রা ভেঙে যায়, অথবা সে জেগেই ছিল, এর মধ্যেই বিড়ালের ডাক তাকে আজ প্রায় অবশ, নেশাতুর করে তোলে। আজ তো সিদ্ধান্ত হয়েই গেছে, সে কাউকে কিচ্ছু দেয় নি, ফলে দেওয়া নিয়ে ভোগান্তির চাপটা সরে যাওয়ায় সে খুব সাবলীল পায়ে বিছানা ছাড়তে পারে। এবং বিছানা ছাড়তেই মেয়েটি অবাক হয়ে দেখে, দেয়ালের ছায়ায় এক শ’ বছর আগের এ্যালেনপো পাইপ টানছেন! 

তাই তো বলি, বিড়াল কাঁদছে কেন ? মেয়েটি বিচলিত বোধ করে এ্যালেনপোর পাইপের ধোঁয়া ছুঁতে চায়... সঙ্গে সঙ্গেই বিমূর্ত, ক্ষণ ঝলক দেখা দিয়েই তিনি মিশে যান টিমটিমে রাত্তিরের নিঃসীমের মাঝে। 

কোথায়রে হুলো বেড়াল ? 

মেয়েটি সাহসী হাতে ছিটকিনিতে রেখে টের পায়, আজ কোনো শব্দ হচ্ছে না, সে ভীষণ ফিনফিনে বোধ করে। হালকা পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখে, সামনে অন্ধকারের ঠান্ডা উল্লাস। আকাশ ছাপিয়ে যেন শিশির নয়, জিভ ঝাল রাত্তিরের লালা পড়ছে। 

না তো! কোনো বিড়াল ডাকছে না তো ? তবে স্নায়ুর মধ্যে কেন এত ঘুম ? কেন রক্ত অবশ করা নেশাতুর গন্ধ ? 

মেয়েটি ঘরে ফেরার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই, ফের বিড়ালের কান্না। আহা, কান্না তো নয়, যেন সহস্র ঘুমের ঔষধ, সেই ডাকের শব্দে নেশাতুর মেয়েটি বারান্দায় উপুড় হয়ে বসে পড়ে। 

চেতনা ফিরলে দেখে, রাত্তির গভীর--কাউকে কিচ্ছু দাও নি মেয়ে, বিড়ালটিকে বাঁচাও... মেয়েটি নিজেকে শোনায়, জীবন তোমার পুরোটা ব্যর্থ হয় নি, আজ তোমার শূন্য স্থানে এ্যালেনপো এসে বসেছিলেন-- এরকম বলতে বলতে মেয়েটি খাম্বা হাতড়ে হাতড়ে, দেয়াল ঘষটে ঘষটে বিড়ালটিকে খোঁজে। 

সে তো জানেই, দেয়ালের ইটের গাঁথুনির নিচে বিড়ালটির রক্তাক্ত শরীর গেঁথে দেওয়া আছে, শুধু এই বাড়ির বিশাল শাদা শূন্য দেয়ালের কোনখানে তার অবস্থান, এইটুকু খুঁজে বের করার অপেক্ষা। 

মেয়েটি শীত নাক উঁচু করে দেয়াল শুঁকে শুঁকে বিড়ালে কান্না ধরে হাঁটতে থাকে। কখনো শ্রবণ বধির মানুষের মতো, কখনো তীক্ষ্ণ কর্ণ সম্পন্ন মানুষের মতো দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিস্তৃত মেঝেতে যখন সে ধপাস বসে পড়ছে, কনকনে হিম রাত্তিরের শরীর বেয়ে ফের টানাটানা মিউ শব্দ ভেসে আসে। মেয়েটি সেই শব্দের সূত্র ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো বারান্দার দেয়ালের দিকে ছুটে যায়... এই তো স্পষ্ট হচ্ছে শব্দ... এই তো, কালো কুয়াশা ঢেকে দিচ্ছে দেয়ালের শরীর... মেয়েটি তার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে ইট খোলার জন্য তীব্রভাবে দেয়ালের মধ্যে আঁচড় কাটতে থাকে, এতে করে তার রক্তের মধ্যে শীত বাড়ে, প্রেতরাত হি হি শব্দে হাসতে থাকে, এতে করে তার ভেঙে পড়তে থাকা নখ বেয়ে রক্ত ঝরতে থাকে, হায়! রক্তাক্ত বিড়ালটি মরে যাচ্ছে, আর তাকে এই নির্জন বাড়িতে তার স্বামীই খুন করে প্লাস্টারের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। মেয়েটি কাঁপতে থাকে--আমার হৃৎপিণ্ডের শেষ ফালির উত্তাপ দিয়ে যদি ওকে বাঁচানো যায় ? মেয়েটি বিড়ালের শেষ শীততম মুমূর্ষু আর্তনাদ শুনতে শুনতে টের পায়, 

আজ স্বামীর পাশে শুয়ে সে সশব্দে চিৎকার করে উঠতে পারছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন