রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

রাজেস কুমারের গল্প : বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে

(১) 
তানিয়া সারা দুপুর অপেক্ষা করেছিল। মনে মনে কল্পনা করছিল ব্রতীনের চেহারাটা। ছেলেটার ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর করলে হত। নিদেন পক্ষে দু-এক জনের সঙ্গে কথা বললেও কিছুটা আইডিয়া করা যেতে পারত। কিন্তু অতীনের ব্যবহারটাই যে সাসপিসিয়াস।
বরাবরই সে তানিয়াকে অন্ধকারে রেখেছে এই ব্যাপারে। বলেছে ব্রতীন বাউন্ডুলে। ওর আসা যাওয়ার কোনও ঠিক নেই। তাছাড়া ও খুব ইনট্রোভার্ট। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে না। তানিয়া বোঝেনি কেন। সে জো্র করেছে। এমন কী না বলে কয়ে হঠাৎ মাঠে পর্যন্ত চলে গেছে। লাভ হয়নি। ব্রতীন কেমন করে জানি খবর পেয়ে যেত। ছেলেটা সত্যিই মিসট্রিয়াস। ও হঠাৎ হাজির হয়। অতীনের সঙ্গে গল্প করে। তারপর নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় কিম্বা মিশে যায় মানুষের ভিড়ে। ছেলেটার চেহারাটাও নাকি খুব সাধারণ। অতীন ছাড়া ভিড়ের মধ্যে আর কারও চোখে পড়ে না। 

মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছিল না অতীনকে। তানিয়া বার বার ট্রাই করছিল। কিম্বা প্রার্থনা করছিল সেল ফোনের স্ক্রিনে এক টুকরো খবর যেন ভেসে ওঠে। কিন্তু বিকেল গড়ালেও সেরকম কিছুই ঘটল না। শেষমেশ এক রাশ উৎকন্ঠা নিয়ে নিজেই বেরিয়ে গেল সে। গাড়িটা ড্রাইভ করে। 


(২) 

বলটা মিডিল অফে পরে সামান্য টার্ন করেছিল। ফ্লাইটটা মিস করার কথা ছিল না অতীনের। কিন্তু ক্রিজ ছেড়ে বেরতেই হঠাৎ ভেসে উঠল মাঠের বাইরে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ব্রতীনের চেহারাটা। সেই একই জিনস, গায়ে ক্যাটক্যাটে সবুজ জামা, গালে দু-এক দিনের পুরনো দাড়ি। ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। যখন থেকে ব্যাট হাতে নেমেছে অতীন। 

আজকের ম্যাচটা অতীনের কাছে খুবই ভাইটাল। সামনেই রঞ্জি। এবারে তার একটা প্রবল চান্স আছে দলে ঢোকার। কিন্তু ব্রতীনটাই ওলোট পালোট করে দিল সবকিছু। মাত্র ফ্র্যাকসান অফ আ সেকেন্ড। তার চেহারাটা চোখে পড়তেই হঠাৎ কোথায় মিলিয়ে গেল লাল বলটা। অতীন ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে ক্রিজ ছেড়ে। ফেরার আর কোনো পথ নেই। 

ব্রতীনের ওপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল তার। সকালে কো-অপারেটিভের লঞ্চ ঘাটে ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখেই অতীন বলেছিল, আজ আর মাঠে আসিস না প্লিজ। সাইড লাইনের বাইরে তোকে দেখলেই আমার সবকিছু কেমন উলটো পালটা হয়ে যায়। সবসময় অমন ছটফট করিস কেন এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসতে পারিস না! ব্রতীন মুচকি হেসেছিল। 

_ তুই তো এত সহজে ডিসট্র্যাকটেড হওয়ার ছেলে নয়। ছোটো থেকে দেখছি। বোলারের হাত ছাড়া আর কোথাও তোর নজর থাকে না। তা আমায় দেখলে এমন কী হয় শুনি! 

_ বলতে পারব না। তোকে দেখলেই সবকিছু কেমন গুবলেট পাকিয়ে যায়। মনটা এক ছুটে বেরিয়ে যায় বাইশ গজের বাইরে। 

অতীন জানত ব্রতীন কথা শুনবে না। সে কারও কথা শোনে না। নিজের খেয়াল খুশি মত চলে। আর এই কয়েকদিনে অতীন বুঝেছে সে এখন পুরোপুরি বেহিসাবি। জীবনে রুটিন শব্দটাই নেই। চুপচাপ বসহে থাকতে পারে না। এখন মাঠে তো একটু বাদেই ফুচকার ষ্টলে। তারপরই হয়ত মাল্টিপ্লেক্সে। জিগ্যেস করলেই বলে, স্বাধীন জীবন ভাই। তোর মতো গন্ডিতে বাধা নয়। 
এ হেন ব্রতীনের সঙ্গে একদিন হঠাৎই দেখা হয়ে গেছিল অতীনের। মোহনবাগান মাঠের ঠিক সামনেটায়। এক গাদা ভিড়ের মাঝে। 

--আরে ব্রতীন না! চেহারার কী দশা করেছিস রে! 

ব্রতীনের পরনে সেদিনও এই একই ড্রেস। গালে একই রকম দাড়ি। সে কোনও কথা বলেনি। মুচকি হেসেছিল মাত্র। অতীনই বলেছিল। 

হাতে টাইম আছে? তালতলা মাঠে টু-ডেস ম্যাচ চলছে। আমার ব্যটিং হয়ে গেছে। চল সাইড লাইনে বসে গ্যাঁজ়ানো যাবে। অনেকদিন পর দেখা। আজ আর ছাড়ছি না। 

--অতীন, কালও তুই সেঞ্চুরি করলি! 

প্রথম কথা বলেছিল ব্রতীন। যেন বিষ্ময়ের ঘোর কাটেনি এখনও। কথাগুলো বলার সময় দু-চোখে একরাশ তিরস্কার। ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি অতীনের। সে অবাক হয়েছিল। 

--হ্যাঁ। কেন বলত? 

--না। এমনি। আজকাল তো রোজই একশো করছিস! 

অতীন মাথা চুলকে বলে, রোজ নয় তবে প্রায়ই। এ বছর রান আসছে ভালো। আগের বার তো শেষ মুহূর্তে বাদ গেলাম। এবার মনে হয় ডাক পাবো। আসলে খিদেটাই শেষ কথা জানিস। 

ব্রতীন কাঁধ ঝাঁকায়। 

জানি। একদিন আমিও তো খেলতাম। 

ব্রতীনের কথায় হঠাৎই থমথমে হয়ে যায় অতীনের মুখ। সে জানে ব্রতীন ছোটো থেকেই খুব ট্যালেন্টেড। ছোটবেলায় দুজনে একই কোচিংক্যাম্পে ছিল। তারপর এক সঙ্গে কলকাতা সেকেন্ড ডিভিসন। প্রথম বছরেই নজর কেড়েছিল ওর অলরাউন্ড পারফর্ম্যান্স। কোচ বীজু মুখার্জী বলেছিল, চিঠি লিখে দিচ্ছি। মুম্বই চলে যাও। আচারেকার স্যারের কাছে। থাকবে আর প্র্যাকটিস করবে। খাওয়া দাওয়া সব ফ্রি। 

কিন্তু বাস্তবে সেসব কিছুই হয়নি। কৈশোরের ব্রতীন একদিন হঠাৎই হারিয়ে গেছিল। চলে গেছিল সবার অলক্ষে। সে নিয়মিত মাঠে আসত না। এলেও নেট প্র্যাকটিসে মন থাকত না। নিজে নিজেই ব্যাট বল নিয়ে কী সব করত। হাঁ করে তাকিয়ে থাকত বাইরের দিকে। জিগ্যেস করলে বলত, এই সব লোকগুলো আমাদের চোখে কেমন ঠুলি পরিয়ে দিচ্ছে বল। সারাক্ষণ শুধু ফ্রন্টফুট আর ব্যাকফুট। আজ পঞ্চাশ কর কাল একশো। ক্যাচ ফসকালে চলবে না। থ্রো ডাইরেক্টলি উইকেটে লাগা চাই। সবসময় যেন টার্গেট। অ্যাচিভ করতে হবে একটা কিছু। অথচ বাইরে কত লোক বলত। উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজের ইচ্ছা মত ঘুমোচ্ছে, রোদ পোয়াচ্ছে, তাস খেলছে, খাওয়া দাওয়া করছে। সাদা বকগুলোকে দেখ কেমন উড়ছে আর বসছে। গরুটার গা থেকে এঁটুলি ঠোকরাচ্ছে। ওটাই তো আসল মাঠ। প্রকৃতির নিয়মে খেলা চলছে। 

অতীন এসব বুঝত না। সে দেখত ইডেন গার্ডেন্স। কানায় কানায় ভরা গ্যালারি। উত্তাল জনতা। তাদের কান ফাটানো চিৎকার। সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাই সে কোচের কথা শুনেই চলত। তার রান চাই। বড় ক্লাব চাই। 

ব্রতীন ছিল অতীনের ওপেনিং পার্টনার। দুজনে এক সঙ্গে ব্যাট হাতে মাঠে নামত। প্রথম প্রথম তার অভাব খুব অনুভব করত অতীন। ওই পাগল পাগল চেহারা, ভাসা ভাসা চোখের দৃষ্টি। এলোমেলো কথা-বার্তা। দেখলেই কেমন একটা মায়া লাগত। তারপর সেও একদিন ভুলে গেল ব্রতীনকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাটাই হয়ে উঠল প্রধান। তখন তার রান চাই আরও রান। 

অতীন জিগ্যেস করল, খেলা ছাড়ার পর আর মাঠে আসিসনি, না। 

কেন এসেছি তো! দিনের পর দিন খেলা দেখেছি। ঠিক এই ভাবে। টেন্টে তোদের পাশে বসেই হাততালি দিয়েছি। তোরাই কখনও খেয়াল করিসনি আমায়। 

আমাদের টেন্টে! খেলা দেখেছিস! 

হ্যাঁ, দেখেছি তো। এই যে তোরা সব চার ছক্কা মারছিস। দৌড়চ্ছিস বলের পেছনে। রোজই জিতছিস। আনন্দ উল্লাস করছিস। আচ্ছা, তোদের কখনও ক্লান্ত লাগে না! মনে হয় না প্রতিদিন জেতার চেষ্টা একদিন তোদের ঠিক মেরে ফেলবে! 

অতীন হাসে। আরে ভাই জেতাটাই তো জীবন। ব্যাটসম্যানের কাছে রানটাই শেষ কথা। বো্লারের কাছে উইকেট। রান করব বলেই তো সেই কোন ছোটবেলা থেকে বাস ট্রেন ঠেঙিয়ে এতদূর কলকাতায় আসা। ভিড় বাসে লম্বা কিট-ব্যাগ নিয়ে পাবলিকের খিস্তি খাওয়া। আজকাল অবশ্য আর এসব করতে হয় না। যাদবপুর এলাকায় অফিস একটা ফ্ল্যাট দিয়েছে। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন ওখানেই কাটে। সকালে ফিজিক্যাল, তারপর নেট প্র্যাকটিস। মাঠ থেকে ফিরে দুপুরে লম্বা একটা ঘুম। বিকেলে জিমে হালকা ওয়েট ট্রেনিং। মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলা গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটিং। মাঠের বাইরের সময় বলতে ওইটুকুই। তারপর এখন তো শুধু রাজ্য স্তরে ডাক পাওয়ার অপেক্ষা। যতক্ষণ না পাচ্ছি ততক্ষণ শান্তি নেই। 

--বাঃ, খুব ভাল। চাকরি তো অনেক দিন করছিস। এখনও বিয়ে করিসনি কেন? 

--করব। তবে এই মুহূ্র্তে খেলা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না। বাই দ্য ওয়ে তোর খবর কী? মন দিয়ে খেললি না কেন? তুই কিন্তু অনেক দূর যেতিস। 

কথাটা বোধহয় মন পসন্দ হয় না ব্রতীনের। একই ভঙ্গিমায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে বলে, এই মাঠ কখনও নিজের হয় না রে। জীবনের সবটুকু নিঙড়ে দে তাও একদিন মুখ ফিরিয়ে নেবে। বড় বড় রথী মহারথী কাউকে ছাড়েনি। সবাইকে ছুঁড়ে ফেলেছে একদিন। এই যে বাউন্ডারি লাইন দেখছিস, জীবনটা শুরু হয় এর ওপার থেকে। একদিন বাড়ি ফিরে দেখলাম দরজার সামনে গাদা ভিড়। থিক থিক করছে মানুষ। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি সাদা কাপড়ে মোড়া বাবার দেহ। মাঝে মাঝে রক্তের ছিটে। উর্দি পরা অবস্থায় এক দুষ্কৃতির গাড়ি চেজ করতে গেছিল। দুটো বুলেট বেড়িয়ে গেছে হৃৎপিন্ড ভেদ করে। বাবা মাঝে মাঝেই এমনটা করত জানিস। কোনো একটা ছুতো পেলেই ক্রিমিনালদের পেছনে ছুটত। অনেককটাকে মেরেওছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। নির্ভীকতার জন্য মেডেল পেয়েছিল দু-বার। শেষের দিকটায় কেমন একটা নেশার মত হয়ে গেছিল। অচেনা মানুষ দেখলেই ক্রিমিনাল সাসপেক্ট করত। প্রায় দিনই বাড়ি ফিরত না। রাতে থানায় থেকে যেত। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে শুনেছি মা রাগারাগি করছে। ফোনে বাবাকে বলছে, চাকরি ছেড়ে দাও। তুমি আর মানুষ নেই। পুলিশ হয়ে গেছো। জানিস অতীন, মা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। বাবাকে যখন গার্ড অব অনার দেওয়া হয় তখন নাকি মা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারপর থেকে ভেবে দেখেছি। চেজ় করলে অনেক কিছু হারাতে হয়। 

--তা বলে সব ছেড়ে ছুড়ে পালাবি? একবার লড়ে দেখবি না! 

--পালানো বলছিস কেন! আমি তো ভালই আছি। রোজ সকালে উঠে রান করার টেনসন নেই। উইকেট নেওয়ার চাপ নেই। দল থেকে বাদ পড়ার ভয় নেই। একদম নিশ্চিন্ত জীবন। 

ব্রতীন হাসছিল। অতীন কী বলবে বুঝতে পারছিল না। সে হাঁ করে তাকিয়েছিল ব্রতীনের মুখের দিকে। তার মনে অজান্তেই একটা প্রশ্ন ভেসে উঠেছিল, কিন্তু তারপর! অতীনের চোখেই প্রশ্নটা বোধহয় পড়ে ফেলে ব্রতীন। খানিক থেমে সে বলে, একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম। রান নিতে নিতে আমি হাঁপিয়ে গেছি। শ্বাস ছাড়ছি জোরে জোরে। তাও দৌড়চ্ছি। আরও রান নিতে হবে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। তারপর হঠাৎ খুব জল তেষ্টা পেল। মনে হল বুকের ছাতি ফেটে যাবে। দুহাত তুলে ড্রিংকস্ ডাকলাম। কিন্তু টুয়েলভ্ ম্যান জল নিয়ে এল না। মাঠের বাইরে গিজগিজ করছে লোক। তারা সবাই চেঁচাচ্ছে। রান, রান। মেক ইট থ্রী, ফোর………ফাইভ………। আমি প্রাণপন চিৎকার করলাম। কিন্তু ওদের আওয়াজকে ছাপিয়ে যেতে পারলাম না। তারপর একে একে সবাই ফিরে গেল। ধু ধু প্রান্তর জুড়ে শুধু আমার শুকিয়ে যাওয়া বুকের নিঃশ্বাস। তখন অনেক দূর থেকে ভেসে এল কান ফাটানো অট্টহাসি। দেখলাম আমার কোচ সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে হাসছে। ছিপি খুলে এক বোতল জল ঢেলে দিচ্ছে উত্তপ্ত বালির ওপর। মাঠের সবুজ ঘাস কখন শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে আমি খেয়ালও করিনি। ছুটে যেতে চাইছি ওই জলের কাছে। কিন্তু কিছুতেই পারছি না। পায়ের তলায় সরে সরে যাচ্ছে বালি। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ ভেঙে গেল ঘুমটা। সেদিনই ঠিক করলাম আর নয়। 

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ব্রতীন। জিগ্যেস করে, আচ্ছা অতীন তোর কখনও মনে হয় না আস্তে আস্তে তুইও মরুভূমির দিকে চলেছিস। যেখানে এক বিন্দু জলের জন্য প্রচন্ড কষ্ট পেতে হবে তোকে। 


(৩) 

ব্রতীনের স্বপ্নটা কিছুতেই ভুলতে পারে না অতীন। ভাসা ভাসা দুটো চোখের তারায় যে এরকম ভয়ানক একটা স্বপ্ন লুকিয়ে থাকতে পারে তা তার ধারণাতেই ছিল না। সে চাইছিল ওই ছেলেটার সঙ্গে আর যেন দেখা না হয়। না জানে আরও কত ভয়ঙ্কর স্বপ্ন ওর ঝাঁপিতে আছে। একটা একটা করে সেগুলো খুলে বসলে অতীন পাগল হয়ে যাবে। 

কিন্তু কেন জানি না খেলা থাকলেই হল। কোথা থেকে খবর পেয়ে ঠিক হাজির হয়ে যায় ব্রতীন। বারণ করলেও শোনে না। সাইড লাইনের বাইরে পায়চারি করে আপন মনে। যতক্ষণ না নিজের উইকেটটা বিপক্ষকে উপহার দিয়ে আসছে অতীন। 

ব্রতীনকে দেখলেই আজকাল ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হয় তার। ব্রতীন বলে, কেন ফালতু চেষ্টা করছিস। যত কাছাকাছি যাবি, লক্ষ্য ততই পিছবে। মনে করবি ধরে ফেলেছিস। মুঠো খুলবি, সব ফাঁকা। একদিন হারতেই হবে। শুধু শুধু নিজেকে এভাবে ফুরিয়ে ফেলছিস কেন? মাঠের বাইরে একটা গোটা দুনিয়া পড়ে। সেদিকে তাকা। তুই সেই দুনিয়ার একজন। 

মাঠ, মাঠ ছাড়িয়ে ফ্ল্যাট তারপর আস্তে আস্তে তার ব্যাক্তিগত জীবনেও ঢুকে পরছে ব্রতীন। সারাক্ষণই যেন সে গায়ে গায়ে লেগে আছে। অতীনকে দেখছে আর তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। 

অতীন বুঝতে পারে ছেলেটা তাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মাঠ থেকে, তার স্বপ্ন থেকে। আজকাল প্রায়ই তার মনে হয় বুকটা শুকিয়ে গেছে। প্রচন্ড তেষ্টা লেগেছে। ইচ্ছা করে ছুটে পালায় বাউন্ডারির বাইরে। যেখানে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় ব্রতীন জলের বোতল হাতে অপেক্ষা করে আছে তার জন্য। অতীন আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু ব্রতীনের অবাঞ্ছিত উপস্থিতিটা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারে না। 

বাইরে কলিংবেল বাজে। অতীনের মনে হয় ব্রতীন। সে চুপ করে পরে থাকে বিছানায়। কলিংবেল বেজেই চলে। অতীন বালিশটা কানের ওপর চেপে ধরে পাশ ফিরে শোয়। কিন্তু বেলের আওয়াজটা তার মাথার মধ্যে ঘুরতেই থাকে। শেষমেশ অস্থির হয়ে দরজা খুলতেই সামনে তানিয়া। 

তানিয়া শান্ত ভাবে ঘরে ঢোকে। এমনটাই যে হবে তার যেন আগে থেকেই জানা। ঘরে ঢুকেই সে জিগ্যেস করে, ‘আজও ভুলে গেছিলে নিশ্চয়? আমি কিন্তু সারা দুপুর অপেক্ষা করে ছিলাম’। অতীন কথা বলে না। আস্তে আস্তে সিঁটিয়ে যায় ডিভানের পাশে। তানিয়া তাকিয়ে দেখে অতীনের অগোছালো কিট-ব্যাগ। সাদা ট্রাউজার, টি-শার্ট, হেলমেট, থাইগার্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে ঘরের মেঝেয়। সে জিগ্যেস করে, খাওনি নিশ্চয়? অতীন ঘাড় নাড়ে, ‘না। খিদে নেই’। 

তানিয়া চোখ রাখে অতীনের চোখে। 

--ভালো পারফর্ম করতে পারছ না বলে না খেয়ে থাকলে হবে। চোখ মুখের কি দশা! মোবাইলটাও তো সুইচ অফ। ফোনে পাচ্ছি না। তোমাদের টেন্টে গেছিলাম। কিনুদা বলল দু-দিন নাকি প্র্যাকটিসে যাওনি। 

--আমার পেট খারাপ করেছিল। 

--ও তাই নাকি! কখন? কাল দুপুরেই তো কথা হল। তখনও তো কিছু বললে না। 

--পরশু সকালে। বলা হয়নি। 

মিথ্যে রাগ দেখায় তানিয়া। 

--আজকাল আমাকেও অ্যাভয়েড করছ! শরীর খারাপ বলছ না। মোবাইল বন্ধ রাখছ। রেষ্টুরেন্টে যাব বলে আসছ না। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় অপেক্ষা করছি। কতদিন হয়ে গেল বলত আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাওনি। ওদিকে বন্ধুর বেলায় তো সব ঠিক। 

অতীন সাড়া দেয় না। বাচ্চা ছেলের মত অপরাধী মুখ করে তাকিয়ে থাকে। 

তানিয়া বলে, অথচ একদিনও তো তোমার বন্ধুকে দেখলাম না। ভেবেছিলাম আজও বোধহয় দরজায় খিল আটকে দুজনে গল্প করছ। আমার জায়গা হবে না।

অতীন কী বলবে বুঝতে পারে না। সে হাঁ করেই তাকিয়ে থাকে। 

তানিয়া বলে, তোমার বন্ধুর নাম ব্রতীন! কিনুদা তো বলছিল ওই নামের কোনও ছেলে তোমাদের টেন্টে আসে না। 

--কিনুদা চিনবে না। ও আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমরা মাঠের ধারে বসে গল্প করি। এক সঙ্গে বেড়াতে যাই। 

হেসে ওঠে তানিয়া। 

--ব্রতীন না ভবা পাগলা! কিনুদা বলছিল, সবুজ জামা পরে ভবা মাঠের চারপাশে চক্কর কাটে, নানা রকম তামাশা দেখায়। আর বক বক করে মাথা খারাপ করে দেয়। লোকে ওকে দেখলেই উলটো দিকে পালায়। আর তুমি নাকি ইদানিং খেলা ছেড়ে ওকে নিয়ে পড়েছ! 

অতীন বলে, বিশ্বাস কর, ও ব্রতীন। আমার ছোটবেলার বন্ধু। ভবা পাগলা নয়। তারপর হঠাৎই চাপা নিশ্বাসের সঙ্গে ফুঁপিয়ে ওঠে। বলে, আমায় বাঁচাও তানি। রাতে ঘুমতে পারি না। চোখ বুজলেই মরুভূমি দেখি। তানিয়া অতীনের মাথায় বিলি কাটতে থাকে। বলে, বেশি ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। 

হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যায়। মুহূর্তে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। তানিয়া মোমবাতি জ্বালে। বলে, চল অনেক দূর কোথাও চলে যাই। অতীন অবাক হয়। দূরে! এখন! তানিয়া তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় জানলার দিকে। একটা একটা করে পার করে মেঝেয় পরে থাকা অতীনের অগোছালো কিট-ব্যাগ, সাদা ট্রাউজার, টি-শার্ট, হেলমেট, থাইগার্ড। 

দুজনে এসে পৌঁছয় পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের ফাঁকা জানলায়। যতদূর চোখ যায় শুধুই কালোর সমুদ্র। অতী্ন পেছন ফিরে তাকাতে চায়। তানিয়া ভালবেসে ঘুরিয়ে দেয় তার ঘাড়। অতীন চোখ তুলে অবাক। হাজার হাজার তারা অন্ধকার আকাশে ঝিকমিক করছে বড়দিনের আলোর মত। লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে তাকিয়ে আছে যেন তারই দিকে। ঠিক যেমনটা থাকত ছেলেবেলায় দেশের বাড়ির আকাশে। তার মনে পড়ে কত দিন এভাবে অন্ধকার রাতে তারাদের দিকে তাকানো হয়নি। দিনের আলোয় দেখা হয়নি মুখার্জীদের বাগান, পুকুরের বাঁধানো ঘাট, ছটুদের দেওয়াল না ওঠা বাড়ির ভিত। সে চেপে ধরে তানিয়ার হাত। বলে, এখন আমরা অনেক দূর এসে গেছি না গো! তানিয়া অস্ফুটে বলে হ্যাঁ। দু-জনে নিবিড় হয়ে দাঁড়ায়। একের পর এক বলে চলে কথা। অগোছালো কিট-ব্যাগ, সাদা ট্রাউজার, টি-শার্ট, হেলমেট, থাইগার্ড যেন পরে থাকে অনেক দূরে। অত অব্দি পৌঁছয় না ওদের গল্প-গাছা।

………………………..


লেখক পরিচিতি
রাজেশ কুমার

বেশোহাটা, বাদামতলা,
চন্দননগর
পোষ্টঃ গোন্দলপাড়া,
জেলাঃ হুগলী,

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন