মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা আহমেদ খান হীরকের লেখা সেরা গল্প : সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা

এই গল্পটি লেখার গল্প--

প্রায় তিন বছর আগের কথা—২০১৫। সম্ভবত অগাস্ট মাস। আকাশ একটু বেশিই নীল এবং তাতে সাদা মেঘের পেলবতা। লক্ষ করে বুঝতে পেরেছি অগাস্টে আমি বেশি কাজ করতে পারি। কাজ বলতে ওই লেখাকেই বোঝাচ্ছি—সংসারের অন্য যে কোনো কাজে আমার আলস্য ও পিছুটান বিস্তর!
সম্ভবত অগাস্টের না শীত না উষ্ণতার জলবায়ু, নীল আকাশ আর সাদা মেঘের সৌখিনতা, আমাকে ভাবতে সাহায্য করে। তবে ২০১৫’র অগাস্টে আমি ছিলাম বিপন্ন। আমাকে আবহাওয়াও কোনো সাহায্য করতে পারছিল না ভালো কিছু লেখার জন্য। এবং আমাকে আমিই যেন তাড়া করে ফিরছিলাম—অথচ তখন আমি লিখছিলাম দুহাতে—আক্ষরিক অর্থেই দুই হাতে!

পেশায় লেখক হওয়ায়, টিভির জন্য চিত্রনাট্য লেখায়, দৈনিক লেখার কাজ তখন একেবারে মাথার ওপর চড়ে বসেছে—সাথে ডেডলাইনের ক্লান্তিকর পেষণ রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দৈনিক প্রথম আলোর ফান ম্যাগাজিন রস+আলোর জন্য লেখা যোগান। প্রতি সপ্তাহের লেখা তৈরির যে নিষ্ঠতা তাতেও ক্লান্তি আসতে শুরু করেছে। লিখছি শিশুদের জন্য গল্পও… এমন এক অবস্থায় নিজেকে নিয়ে নিদারুণ সন্দেহ তৈরি হতে শুরু করেছে—আমি কি আমার জন্য আর কিছুই লিখতে পারব না?

এখানে ’আমার জন্য’ লেখাটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। আমি যা লিখি তার সবই আমার নিজের জন্য। কিন্তু সব লেখাকে নিজের বলে দাবি করে উঠতে পারি না। পেশাজীবি লেখক হওয়ার কারণে কখনো কখনো লেখাতে নিজেকে আড়াল করে রাখতে হয়—লিখতে হয় দর্শক এবং পাঠকের কথা ভেবেও। লেখায় সবচেয়ে যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ—তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লেখা—করতে হয় সেটাও। এরই মধ্যে সম্ভবত বোর্হেসের একটি সাক্ষাৎকার পাঠে মনটা আরো কুঁকড়ে যাচ্ছে—তিনি বলেছেন চিত্রনাট্য লিখলে আর কথাসাহিত্য করা সম্ভব নয়!

আমার অস্তিত্বে টান! কী করছি আমি! যাপনকে সহজ করতে কি জীবনকে বাক্সবন্দী করে ফেলছি? সবার জন্য লিখতে লিখতে কি নিজের জন্য লেখা ভুলে যাচ্ছি! অথচ আমি নিজেকে কথা দিয়েছিলাম বছরে অন্তত তিনটা গল্প লিখব শুধুই নিজের জন্য। (আমার সাবকনসাস হয়তো আশা করে এই লেখাগুলি আসলে ভবিষ্যতের জন্য!) কিন্তু কই তেমন লেখা?

অস্তিত্ব বিপর্যয়কর এরকম মুহূর্তে—সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা--আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। বলেছিল তুমি আছো। তুমি ঠিক আছো। তুমি এখনো আছো। ‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’ তাই আমার পছন্দের গল্প তা-ই নয়, আমার অন্তরঙ্গও। অথচ গল্পটির জন্য আমার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা, কিংবা প্রস্তুতি কিছুই ছিল না। বা, হয়তো সারা জীবনের সমান প্রস্তুতি নিয়েই গল্পটি লেখা। লেখা, একটি বসাতে, এবং এখন যেমন আছে—দুয়েকটি শব্দ আগে-পড়ে করা ছাড়া—প্রায় একই অবস্থায়। এক লাঞ্চব্রেকে, অফিসের টেবিলে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়েছিল, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে এখন আমাকে একটা গল্প লিখতে হবে—একেবারে নিজের জন্য—আর আমি তখন গল্পটি লিখতে শুরু করেছিলাম। আমার মাথায়, আমারই নিবাস-অঞ্চল, তার গলি, আমার ঝুলবারান্দার টুকরো টুকরো ছবি তখন ছিল আর ছিল একটি চিন্তা—যা আমাকে অনেক দিন থেকেই তাড়িত করছিল—আর তা হলো গল্পের ভেতর আরো অন্য গল্প পুরে রাখা!

সময় এখন গল্পহীনতার। চারিদিকের সাহিত্যের দিকে তাকালে অন্তত তাই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। আমি নিজেও গল্পহীনতার গল্পেই আস্থা রাখি। কিন্তু যে সময় ‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’ লিখছি তার কিছু দিন আগে থেকেই আমার ভেতর চলছে এক গোপন ইচ্ছা। যেখানে আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি একটি গল্প কাঠামোর ভেতর আমি একাধিক গল্প বলব। এবং যে কোনো একটি গল্প প্রতিভাস হবে, বাকিগুলো থাকবে বীজানুর মতো। গল্পটি ফুরালে অন্য গল্পগুলো কিছু পাঠকের কাছে (সম্ভব হলে প্রত্যেক পাঠকের কাছেই) প্রকাশিত হতে থাকবে, উন্মোচিত হতে থাকবে, এবং পাঠকের সাথে স্থায়ী হতে থাকবে। কেননা আমি বিশ্বাস করি—ভালো গল্প শেষের পর শুরু হয়!

‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’ তীব্র নারীবাদী গল্প। বেলকনিতে একটা উজ্জ্বল সবুজ ব্রা ঝুলে থাকতে দেখেই আমি তার নিয়তি বুঝে উঠতে পারি। কিন্তু ব্রাটি গল্পটিকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। ফলে এ কথা সত্যি যে এ গল্পের প্রথম পাঠকের মতো আমিও জানতাম না আমার জন্য আসলে কী কী অপেক্ষা করছে…কী কী ঘটতে যাচ্ছে চরিত্রগুলোর সাথে। এরকম ভাবে গল্প লেখার এক দুর্দান্ত আনন্দ আছে—নিজেকে তখন নিজের কেরানি মনে হয় না, মনে হয় অসম্ভব শক্তিশালী স্রষ্টা এবং আনন্দমনস্ক পাঠক। তবে ‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’কে শুধু নারীবাদের দৃষ্টিতে দেখলেও সম্পূর্ণ দেখা হয় বলে বিশ্বাস করি না। আনন্দ পাই যখন কেউ কেউ বলেন গল্পটি পড়ার বেশ পর, হয়তো কয়েক দিন পর, তারা গল্পটিকে পুনরাবিষ্কার করেছেন! করে বিস্মিত হয়েছেন।

‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’ ইশারায় ভরা এবং ইঙ্গিতপূর্ণ। এই ইঙ্গিত কোথাও কোথাও খুবই অস্পষ্ট—কিন্তু লেখার পর কখনোই আমার সে-সব ইঙ্গিতকে স্পষ্ট করতে ইচ্ছা করে নি। পাঠক যদি সেই ইঙ্গিতগুলোকে ধরতে নাও পারে; তবু, একটি পূর্ণাঙ্গ গল্পপাঠের স্বাদ ও স্বস্তি তারা পাবে। ইঙ্গিতগুলো না হয় তোলা থাকল অন্য কোনো সময়ের জন্য।

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এক সিটিং-এ ‘সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা’ লিখে শেষ করার পর এক অপার আনন্দে আমি ভরে উঠেছিলাম। এটা ছিল নিজের সাথে নিজের এক অভূতপূর্ব বোঝাপড়ার সময় লেখা আমার প্রিয় এক গল্প। আমার আনন্দে পাঠক, আপনাকে স্বাগত জানাই…

গল্প
সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা 
আহমেদ খান হীরক

রিকশা ঠেলেও এই গলিতে ঢোকা যায় না। দূর থেকে তাই মানুষেরা নামে, হেঁটে হেঁটে তারা ঘরে ফেরে। তাদের হাঁটায় অদ্ভুত চনমনে ভাব। মনেই হয় না অফিস থেকে ফিরছে। এই গলির অফিসফেরত মানুষগুলো বোধহয় অন্যরকম। আর এই গলিতে এলে, গলি ধরে পিঠে পিঠ লাগিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ছোট ছোট ঘরগুলো নিয়ে গড়া এই মহল্লায় এলে, মনে হয় এটা এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। ছিমছাম। আর অন্যরকম।

কিছুদিন আগেও অবশ্য এরকম অবস্থা ছিল না। মানে গলিটা আর দশটা পাঁচটা গলির মতোই সাধারণ ছিল। সকাল হলেই বাড়ির পুরুষেরা আর কিছু কিছু নারীও হন্তদন্ত বেরুত অফিসের দিকে। তাদের হাঁটায় তাড়া থাকত, তাদের চোখে থাকত ভরসাহীনতা। তাদের হাতে দুপুরের খাবারের ব্যাগ বা টিনের টুকরা থাকত। আর তারা রাস্তায় নেমেই রিকশার খোঁজ করত। তখন এ গলি ছিল অবাধ। রিকশা ভেতর পর্যন্ত ঢুকত। রিকশার বেলের টুংটাং শব্দ এ গলির দুপুরের অখণ্ডতাকে ভেঙে ফেলতে পারত। কোনো কোনো রিকশাওয়ালা অন্ধগলির কোণায় গিয়ে গাঁজা খেত। গাঁজার মাদকীয় গন্ধ তখন ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ঢুকত। শাড়ি আর ম্যাক্সি পরা গৃহিণীরা এই গন্ধ ঠিক বুঝে উঠতে পারত না। তবে ছুটির দিনের পুরুষেরা প্রায়শ গন্ধটা ধরতে পারত। তারা তখন বেলকনিতে এসে দাঁড়াত, দেখার চেষ্টা করত। রিকশাওয়ালা থাকলে গালাগালি করত, পাড়ার লাফাঙ্গা থাকলে অবশ্য চুপ করে থাকত।

তবে রিকশাওয়ালারা যত না তারচেয়ে বেশি থাকত পাড়ার লাফাঙ্গারাই। এরা বিনা ডরে হাতের তালুতে কচলে কচলে গাঁজা বানাত, সস্তা সিগারেটের ততধিক সস্তা তামাক ফেলে তাতে গাঁজা ভরত। ধরাত। টানত। বারবার টানত। কষে কষে টানত। তারপর চোখ লাল করে ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে থাকত। ফ্ল্যাটের ভাবীরাই ছিল সম্ভবত তাদের উদ্দেশ্য। বেলকনিতে মেলে দেওয়া মেয়েলী অন্তর্বাসও তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে। অন্তর্বাস দেখলে তারা খ্যাকখ্যাক করে হাসত।

ব্যাপারটা প্রথম খেয়াল করেছিল মিজানুর। সে তখন সিগারেট খেতে তার ভাড়াফ্ল্যাটের তিনতলার বেলকনিতে ছিল। জ্বর জ্বর লাগছিল বলে সেদিন অফিসে যায় নি। সিগারেট ধরিয়ে মুখটা তিতা হয়ে গেলে সে থুতু ফেলতে চেয়েছিল দুপুরের খোলা ও ফাঁকা রাস্তায়। তখন সে খেয়াল করেছিল তিনটা লাফাঙ্গা গোল হয়ে বসে আছে আর তাকিয়ে আছে পাশের একটা ফ্ল্যাটের বেলকনির দিকে। আর তারা হাসছে। তারা কেন হাসছে তা দেখতে মিজানুরও বেলকনির দিকে নজর দিয়েছিল আর তখন দেখেছিল বেলকনিতে একটা সবুজ ব্রা ঝুলছে। বাতাসে মৃদু দুলছে। ব্রায়ের রঙ হিসেবে সবুজ কিছুটা দুর্লভ, মিজানুর আর কারো ফ্ল্যাটে এরকম রঙ ঝুলে থাকতে দেখে নি। তার চল্লিশোর্ধ্ব বউও কখনো কোনোদিন সবুজ ব্রা পরেছে বলে সে স্মরণ করতে পারে না। আসলে তার বউয়ের কোনো ব্রায়ের রঙই সে মনে করতে পারে না। সবুজ ব্রা দেখে মিজানুরও তাই একটু আশ্চর্য হয়। পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয় আর বোঝার চেষ্টা করে লাফাঙ্গাগুলো কেন ওটা দেখে হাসছে। হয়ত তারাও সবুজ রঙের ব্রা কখনো দেখেনি বা হতে পারে ব্রায়ের আকৃতিটা তাদের কাছে হাস্যকর ঠেকেছে। কিন্তু ঘটনা যাই হোক না কেন, মিজানুরের ব্যাপারটা ভালো লাগে না। রিকশাওয়ালারা হলে এতক্ষণ সে ধমক দিত। এদের ধমক দিতে পারছে না দেখে তার বিরক্তি আরো বাড়ে। তার মনে হয় বিরক্তির সাথে সাথে তার জ্বরটাও বেড়ে যাচ্ছে। সে সিগারেট দেয়ালে ঠেসে নিভিয়ে দেয়। খালি প্যাকেটের ভেতর সিগারেটের বাকি অংশটা ফেলে ঘরে ঢুকে যায়।

ঘরে তখন মিজানুরের চল্লিশোর্ধ্ব বউ শুয়ে ছিল। তবে শোয়াটা ছিল অদ্ভুত। এমনভাবে তার বউকে সে রাতেও দেখে না কখনো। সে দেখে তার বউ একটা অফহোয়াইট ব্রা পরে শুয়ে আছে। নিচে পেটিকোট। শাড়ি নেই। মিজানুর অত্যন্ত বিরক্ত হয়। বলে, আরে তুমি এমনে শুয়া আছো ক্যান?
বউ বলে, তো কেমনে শুয়া থাকব?
মিজানুর বলে, কাপড়চোপড় কই তোমার? কাপড় পরো! লজ্জা লাগে না?
বউ বলে, তোমার সামনে কিসের লজ্জা! বাড়িতে তো আর কেউ নাই। যে গরম পড়ছে... আমার খালি হাঁসফাঁস লাগে!
মিজানুর বউয়ের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে।
বউ বলে, তুমরা তো ব্লাউজ পরো না তাই জানো না। ব্লাউজ পরলে বুকের ওপর পাত্থর চাইপা থাকে!
মিজানুর বলে, গরমে তুমি এইরকমই থাকো নাকি আইজকাল?
বউ বলে, তোমরা তো উদাম গায়ে থাকতে পারো, ব্যালকনিতে বুক খুইলা সিগারেট টানতে পারো, আমি কি কখনো তোমারে কিছু বলছি?
মিজানুর বলে, তুমি ব্রা কই শুকাইতে দাও?
বউ বলে, ক্যান?
মিজানুর বলে, যা বলছি কও!
বউ বলে, বাইরে... তারে... ক্যান?
মিজানুর বলে, আর দিবা না। ব্রা বাথরুমে শুকাইবা... ঠিক আছে?

এরপর থেকে অফিস যাতায়াতে মিজানুর প্রথমে নিজের বেলকনির দিকে তাকায়, দেখে ব্রা ঝুলছে কিনা, তারপর দেখে অন্যদের বেলকনি। প্রথম প্রথম মিজানুরের এই দেখা কেউ দেখে না, খেয়াল করে না কেউ। কিন্তু একদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করে রিয়াজ রহিম। সে তখন আরো কয়েকদিন মিজানুরের যাতায়াত দেখে। এবং সপ্তম দিনের দিন সে নিশ্চিত হয় মিজানুর আসলে এ-ফ্ল্যাটে ও-ফ্ল্যাটে মেয়েদের অন্তর্বাস দেখার চেষ্টা করে। আর এটা বুঝতে পেরে মিজানুরের ওপর খুব মেজাজ খারাপ হয় তার, কিন্তু মিজানুরকে সে কিছু বলে না। সে তার ত্রিশোর্ধ্ব বউয়ের কাছে ভাত খেতে খেতে জানতে চায়, তুমি ব্রা মেলো কই?
ত্রিশোর্ধ্ব বউ কথার সূত্র ধরতে পারে না। বলে, কী বললা?
রিয়াজ রহিম মুখের ভাত এলাতে এলাতে বলে, ব্রা পরো না তুমি?
বউ হাসে। রসিয়ে বলে, ক্যান? তুমি য্যান দেখো নাই?
রিয়াজ রহিম রসের ধার দিয়েও যায় না। বলে, দেখি কি দেখি নাই সেইটা কথা না। তুমি ব্রা খাইচা মেলো কই?
বউ তাড়াতাড়ি বলে, ক্যান বাইরে!
রিয়াজ রহিম বলে, ব্যালকনিতে?
বউ মাথা ঝাঁকায়। তারপর বলে, ক্যান কী হইছে?
রিয়াজ রহিম বলে, আর মেলবা না। ব্রা ভিত্রে শুকাবা!
বউ বলে, ক্যান?
রিয়াজ রহিম বলে, মহল্লায় সব বদ লোক তোমাদের ব্রা দেইখা দেইখা চোখের সুখ নেয়!
বউ বলে, কারা?
রিয়াজ রহিম কারো নাম নেয় না। কিন্তু রিয়াজ রহিমের খোঁজ চলতে থাকে। সে খেয়াল করে দেখে তার বউ ব্রা মেলছে কিনা বেলকনিতে। তার সাথে সাথে সে এও দেখে যে অন্য ফ্ল্যাটের আর কে কে ব্রা মেলে বেলকনিতে। আর তার চোখ সবসময় তীরের ফলার মতো বিঁধে থাকে মিজানুরের দিকে। লোকটা বদ। সবসময় বেলকনির দিকে নজর তার। তার দৃষ্টি ধরে রিয়াজ রহিমের নজরও এ-বেলকনি থেকে ও-বেলকনিতে ঘুরঘুর করে।

রিয়াজ রহিমের এহেন তাকানো আমজাদ সাহেবের চোখে পড়ে। তার বউ পঞ্চাশোর্ধ্ব এবং মৃত্যুর সাথে লড়াইরত। তার বউ ব্রা পরার সুযোগ পায় না। তবু আমজাদ সাহেবের মেজাজ খারাপ লাগে। ঘরে তার দুইটা বৌমা। দুইটাই বিশোর্ধ্ব। এরা ঘন ঘন ব্রা পাল্টায় আর মেলে দেয় বেলকনিতে। বাতাসে ব্রাগুলো বেহায়ার মতো ঝুলতে থাকে। আমজাদ সাহেব এতদিন দেখেও কিছু বলেন নি। কিন্তু রিয়াজ রহিম, এমনকি ওই মিজানুরও যেভাবে বেলকনি বেলকনিতে লোলুপ দৃষ্টি হানে তাতে এ মহল্লায় বাস করাই দুরূহ। কিন্তু ফ্ল্যাটটা তার নিজের। চাইলেই মহল্লা চেঞ্জ করা সম্ভব না। তিনি তাই ছেলেদের ডাকেন। বলেন, তোমাদের সাথে কিছু কথা আছে।
ছেলেরা বলে, বলেন আব্বা।
আমজাদ সাহেব বলেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও।
ছেলেরা দরজা বন্ধ করে দেয় দ্বিধার মধ্যে। আমজাদ সাহেব বলেন, মহল্লার অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। আগে এটা ভদ্রলোকের মহল্লা ছিল। সেইটা দেখেই এইখানে ফ্ল্যাট কিনছিলাম। কিন্তু এখন সেই দিন আর নাই।
ছেলেরা বলে, কী হইছে আব্বা? কেউ আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করছে? নাম বলেন খালি!
আমজাদ সাহেব বলেন, দুর্ব্যবহার না। কিন্তু মহল্লায় এখন লম্পটের কোনো অভাব নাই।
ছেলেরা কিছু বলতে পারে না। মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আমজাদ সাহেব আবার শুরু করেন। বলেন, এখন তোমাদের বউরা যে...
বিশোর্ধ্ব বউদের কথা আসতেই সচকিত হয়ে ওঠে ছেলেরা। তাড়াতাড়ি বলে, কী হইছে ওদের? ওদের কেউ কিছু বলছে? স্ল্যাং বলছে? টিজ করছে নাকি? কই ওরা তো কিছু বলে নাই! কে করছে?
আমজাদ সাহেব বলেন, ওইসব না। কিন্তু তবু বউমাদের নিষেধ করিও যে ওই ইয়েগুলো যেন বেলকনিতে না মেলে...
ছেলেরা বলে, কী বাবা? কী মেলে ওরা বেলকনিতে?
আমজাদ সাহেব ইতস্তত করেন। বলেন, ওই যে ব্রাগুলা... ওইগুলা যেন বাথরুমেই শুকায়! মহল্লার লোকেরা খালি বদনজর দেয় ওইগুলাতে!

ছেলেরা তাদের বিশোর্ধ্ব বউদের বলে। বউরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে। তারা কিছুদিন ভুল করে বেলকনিতে ব্রা মেলে দিতে থাকে। আর এই ভুল বারবার করছে কিনা তা জানতে ছেলেরা নিজেদের বেলকনিতে নজর রাখা শুরু করে। নিজেদের বেলকনিতে নজর রাখতে রাখতে তারা অন্যের বেলকনিও দেখতে শুরু করে। অন্যের বেলকনি দেখতে দেখতে তারা মিজানুরকে দেখে, রিয়াজ রহিমকে দেখে, তাদের বাবাকেও দেখে। দেখে যে তারাও অন্যের বেলকনি দেখছে। আর বেলকনিতে তখনো কয়েকটা ব্রা, যারা ভুল করে এখনো মেলে দিচ্ছে, সেগুলো দুলছে। আর তারা ভাবে বাবা ঠিকই বলেছিল যে এই মহল্লাটা আর আগের মতো ভদ্র নাই, এমনকি বাবাও আর ভদ্র নাই। এ নিয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। সেই হতাশা এমনকি তাদের বউদের মধ্যেও ছড়ায়। আর হতাশা খানিকটা আগুনের মতো। ছড়াতেই থাকে। ছড়াতেই থাকে। ফলে প্রতিটি ফ্ল্যাটেই মহল্লার আগের পরিস্থিতি আর এখনের পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলক বিচার হয়। আর বিচার করতে করতে সবাই আরো বেশি করে হতাশ হয়ে পড়ে। তবে এ হতাশা-দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে স্বামীরা। তাদের হতাশা শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো অবারিত হয়ে ওঠে।

পরের সপ্তাহের শেষের দিকে স্বামীরা একটা ব্যাপার একযোগে কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে লক্ষ্য করে। তারা দেখে তাদের বিশোর্ধ্ব, ত্রিশোর্ধ্ব, চল্লিশোর্ধ্ব এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব বউদের বুকের কাছ থেকে কেমন মরা একটা গন্ধ আসছে। যেন তাদের বউদের বুক শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এরকম গন্ধ ভাগাড় থেকে কখনো কখনো পাওয়া যায়। কিন্তু জীবন্ত মানুষ ও ততধিক জ্যান্ত মাংসপিণ্ড থেকে এরকম গন্ধ কেন আসছে তারা বুঝতে পারে না। তারা তখন তাদের বউদের প্রশ্ন করে। জানতে চায় এরকম গন্ধ কেন? তারা কি নতুন কোনো লোশন ব্যবহার করছে, নাকি তাদের বডি স্প্রের ধরন পাল্টে গেছে? এরকম গন্ধ বড়জোর লাশের শরীর থেকে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাদের শরীরে কেন? তারা কি লাশ হয়ে যাচ্ছে?

বউরা কিছুদিন এই গন্ধের উৎস খুঁজে পায় না। বিশোর্ধ্ব বউরা নিজেদের গন্ধ শুঁকে শুঁকে দেখে। তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে একটা চিমসা গন্ধ তাদের বুক অধিগ্রহণ করেছে। তখন এ নিয়ে তারা ত্রিশোর্ধ্ব বউদের কাছে যায়। ত্রিশোর্ধ্বরা জানায় তারাও বিষয়টা জেনেছে তাদের স্বামীদের কাছ থেকে আর তারাও নিজেদের শরীর শুঁকে শুঁকে দেখেছে এবং চামচিকার মতো গন্ধটা তারাও পেয়েছে। এটা কি লাশের গন্ধ? এরকম একটা সন্দেহ তাদের মনেও হয়। বিশোর্ধ্ব তখন ত্রিশোর্ধ্বদের বুকের গন্ধ শুঁকে দেখে এবং নাক কুঁচকে ফেলে। তারা সবাই মিলে তখন চল্লিশোর্ধ্ব বউদের নিকটে যায়। সেখানে আগে থেকেই পঞ্চাশোর্ধ্ব বউয়েরা উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যেও গন্ধ বিষয়ক বিচলন। চল্লিশোর্ধ্ব বউয়েরা জানায় তাদের স্বামীরা জানানোর আগেই তারা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে আর তারা ধারণা করছে এটা ঘটছে এই লম্পটদের মহল্লায় থাকার কারণে। তারা একটা প্রাচীন গল্প তখন বলতে শুরু করে যে একটা দেশে একটা অতিকায় লম্পট ছিল।

কিন্তু অন্যরা তখন বুঝতে পারে না অতিকায় লম্পট বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে। তখন বিশোর্ধ্বরা এক ধরনের কল্পনা করে আর ত্রিশোর্ধ্বরা আরেক ধরনের কল্পনা করে। পঞ্চাশোর্ধ্বরা অবশ্য কোনো কল্পনা করে না। হতে পারে তাদের কল্পনাশক্তি শুকিয়ে গিয়েছে।

আর চল্লিশোর্ধ্বরা গল্প বলেই যায় যে ওই রাজ্যে ওই অতিকায় লম্পট তার বদনজর প্রথমে দেয় কলাগাছের ওপর। আর তাতে তিরিশ দিনের মাথায় কলাগাছের নিচের কাণ্ডটা পচতে শুরু করে। এটা ওই রাজ্যের কেউ বুঝতে পারে না প্রথমে। কিন্তু হঠাৎ তারা খেয়াল করে রাজ্যের সব কলা গাছ ধীরে ধীরে গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। আর পচতে শুরু করেছে। আর মরে যেতে শুরু করেছে।

এরপর ওই অতিকায় লম্পটটা একদিন নদীর মাছের দিকে নজর দেয়। আর একটা মাসের মধ্যে নদীর মাছগুলো পানির ওপরে ভেসে ভেসে ওঠে। প্রথমে মাছেদের লেজের দিকে পচন ধরে, তারপর সারা শরীর পচে যেতে থাকে। নদী হয়ে ওঠে পচা মাছের ভাগাড়। রাজ্যের সবাই তখন হায় হায় করে ওঠে। নদীর তাবৎ মাছ মরে যায় দেখে রাজ্যজুড়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আর তখন ওই অতিকায় লম্পট নজর দেয় গাভীর ওলানের দিকে। আর মাস খানেকও সময় যায় না গাভীর ওলান থেকে দুধের বদলে পচা বাসি গন্ধ আসতে থাকে। আর কিছুদিনের মধ্যেই ওলানগুলো ফেটে যেতে থাকে। ফেটে ফেটে ওলানের ভেতর থেকে পচা মাংস বেরিয়ে আসতে থাকে। আর তখন গাভীগুলো চিৎকার করতে থাকে। হাম্বা হাম্বা করে বলতে থাকে ওলান ফেটে গেলে গাভীদের আর কী থাকে! আর চিৎকার করতে করতে গাভীগুলোও গন্ধভরা লাশ হয়ে যায়।

বিশোর্ধ্ব ত্রিশোর্ধ্ব আর পঞ্চাশোর্ধ্ব বউয়েরা তখন আৎকে ওঠে প্রায়। জিজ্ঞেস করে, এ থেকে রাজ্যটি প্রতিকার পেয়েছিল কিভাবে?

চল্লিশোর্ধ্ব বউয়েরা তখন জানায় ওই রাজ্যের সবাই মিলে তখন ওই অতিকায় লম্পটটাকে আটকায়। তারপর সুঁই দিয়ে প্রথমে তার চোখ গেলে দেয়। লম্পটের চোখ ফেটে গেলে তখন তার শরীরের অন্যান্য প্রত্যঙ্গে সুঁই ফোটাতে থাকে, ফোটাতেই থাকে। সুঁইয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে চালের রুটির মতো শরীর হয়ে গেলে তখন অতিকায় লম্পট লাশ হয়ে যায়। তারা সবাই মিলে তখন লাশটাকে নিয়ে কাক-শকুনের জন্য ভাগাড়ে ফেলে দেয়। আর তখন নাকি রাজ্যজুড়ে আবার সুগন্ধ ছড়াতে শুরু করে। কলাগাছ বেঁচে ওঠে, মাছেরা নদীতে লাফায়, আর গাভীর ওলান ফুলে ওঠে দুধে!

বিশোর্ধ্বরা বলে, কিন্তু এইটা শুধুই রূপকথা! আর আমাদের সাথে তো এইগুলা সত্যি সত্যি ঘটছে। আমার বুকে নাক দিয়া দেখেন কেমন তেলাপোকার গুয়ের মতো গন্ধ, দেখেন!

বিশোর্ধ্বরা নিজেদের বুকের গন্ধ শোঁকানোর জন্য তোলপাড় শুরু করে দেয়। ত্রিশোর্ধ্বরাও। চল্লিশোর্ধ্বরাও। পঞ্চাশোর্ধ্বরা চুপ থাকে অবশ্য। তবে কেউ কারো বুক শুঁকতে আর রাজি হয় না। তারা শুধু এই লাশের গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু তাদের করণীয় তারা কিছুই জানতে পারে না। তারা শুধু গন্ধ গন্ধ করতে থাকে। আর এই গন্ধ যেন বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে।

পরের তিনটা মাসে বউদের বুক থেকে এতটাই গন্ধ বের হতে থাকে যে মহল্লা পুরোটা যেন একটা লাশাগার হয়ে দাঁড়ায়। তখন সেখানে গাঁজা খেতে আর রিকশাওয়ালারা আসে না, এমনকি পাড়ার লাফাঙ্গারাও গলিতে ঢুকতে নাক কুঁচকায়। তাদের কাছে মনে হয় এই মহল্লাটা আগেই ভালো ছিল, বসার পরিবেশ ছিল, আড্ডা দেয়ার জায়গা ছিল, এখন আর সেরকম অবস্থা নাই। এখন এখানে বসলেই নাড়ি ওল্টানো গন্ধ আসে। পেট ঠেলে বমি চলে আসে গলায়। লাফাঙ্গারা তাই দূরে দূরে থাকতে শুরু করে। বড়জোর দূর থেকে এই মহল্লাটার ওপর নজর রাখে। এর মধ্যে ওই মহল্লায় যাতায়াত থাকে শুধু ময়লা নেয়ার ভ্যান আর তার চালকের। ওই মহল্লায় ঢুকলে, ফুড়ড়ড়ড় করে বাঁশিতে ফুঁ দিলে বিশোর্ধ্ব ত্রিশোর্ধ্ব চল্লিশোর্ধ্ব এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব বউরা বেরিয়ে আসে। তাদের হাতে থাকে প্যাকেট প্যাকেট পচা থকথকে কিছু। সেগুলো দিয়ে পচা রস চুইয়ে চুইয়ে পড়ে, আর সেসব থেকে এমন গন্ধ ভেসে আসে যে ময়লার ভ্যানঠেলা চালকটারও পেট উল্টে আসতে চায়। সে বারবার জিজ্ঞেস করে, এগুলার ভিত্রে কী আছে?
বউরা বলে, বুকের ময়লা আছে। বুকে অনেক গন্ধ। বুকের মাংস পইচে গেছে!
ময়লার ভ্যানচালকটা তখন একটু লোভী লোভী দৃষ্টিতে পলিথিনের দিকে তাকাতে চায়, কিন্তু পরক্ষণেই আবারও তার বমি আসে। সে তখন তাড়াতাড়ি বুকের গন্ধওয়ালা মৃত মাংস নিয়ে ভ্যান ঠেলে বেরিয়ে যায়। পরদিন আবার আসে। আবার স্তূপ স্তূপ বুকের মাংস জমা হতে থাকে। গন্ধে বাতাস ভারী হতে হতে নিশ্বাস ফেলার উপায় থাকে না।

তখন এই গন্ধের উৎস খোঁজার জন্য একদিন পুলিশ আসে। পুলিশ জানায় সে লাশের গন্ধ আলাদা করতে পারে। এগুলো তার পচা লাশের গন্ধ বলেই মনে হয়। আর বউরাও বলে যে এগুলো পচা মাংসেরই গন্ধ, এমনকি লাশের গন্ধও ঠিক আছে। পুলিশ ঠিকই বলছে, তবে এগুলো তাদের বুকের পচা মাংসের গন্ধ। তাদের বুকে গন্ধ ধরে গেছে। তাদের বুক এক অদ্ভুত পচা রোগে সংক্রমিত হয়েছে। এই রোগ নিরাময়ের জন্য তারা নানা চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই ভালো হয়ে উঠতে পারছে না।

পুলিশ বউদের কথা বিশ্বাস করে না। সে স্বামীদের খোঁজ করে, কোথাও পায় না। বউয়েরা জানায় এই মহল্লার স্বামীরা সব চলে গেছে। বউদের বুকের এত তীব্র পচা গন্ধ তারা সহ্য করতে পারছে না। তারা সবাই মিলে এখন অন্য জায়গায় থাকে। পুলিশ জানায় এসব অবান্তর কথা সে কোনোমতেই মেনে নেবে না। বউদের সবাইকে তার সাথে থানায় যেতে হবে। কারণ সে তার বাপের জন্মেও এমন বুকের মাংসের লাশ হয়ে যাওয়ার গল্প শোনে নি।

তখন চল্লিশোর্ধ্ব বউরা সেই প্রাচীন গল্পটা আবার শোনাতে থাকে পুলিশকে। জানায় অতিকায় লম্পটের কথা… কিন্তু পুলিশটা অবিশ্বাসী। সে কোনোমতেই বউদের কথা বিশ্বাস করে না। বউরা তখন নিজেদের বুক খুলে পুলিশকে দেখায়। পুলিশ দেখে কোথাও কোনো মাংস পচে নেই, কোথাও কোনো সংক্রামণ নেই। পুলিশ তখন হাতকড়া বের করে। আর অ্যারেস্ট করতে চায় সবগুলো বউকে। বউরা তখন পুলিশকে নিজেদের বুকের গন্ধ শুঁকতে বলে। জানায় এই গন্ধ থেকেই ওই মৃত পচা মাংস বেরিয়ে আসে। পুলিশ তখন গন্ধ শোঁকে। আর শুঁকতে শুঁকতে ভ্যাপসা একটা গন্ধ তার নাকের ভেতর অনুভূত হয়। গন্ধটা প্রথমে তার চামচিকার গন্ধের মতো লাগে, পরক্ষণেই মনে হয় এটা বোধহয় তেলাপোকার গুয়ের গন্ধ, কিন্তু একটু পরেই তার মনে হয় গন্ধটা আসলে পচা মাংসেরই।

পুলিশ তখন খুব দুঃখপ্রকাশ করে। এভাবে বুকের মাংস মরে পচে গেলে কীভাবে রাষ্ট্র বাঁচবে এ বলে বিকার করতে থাকে। রোগটা দ্রুত নিরাময় হওয়া দরকার এরকম ভাবতে ভাবতে পুলিশ এই মহল্লাকে সিলগালার আদলে গেটগালা করে দেয়। যেন মহল্লাটা বিশেষ কিছু। তখন মহল্লার গলির মুখে দুটো দেয়াল তুলে একটা উঁচু লোহার গেট বসিয়ে দেয়। আর গেটের মুখে বড় একটা তালা ঝুলিয়ে দেয়। নির্বিশেষ যাতায়াতের জন্য গেটের সাথে আরেকটা উপগেট থাকে। সেটা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করতে শুরু করে। রিকশাকে দূরে নামিয়ে মানুষেরা খুব শান্তভাবে মহল্লার ভেতর ঢুকে একটা ছিমছাম পরিবেশের ভেতর দিয়ে নিজের নিজের ফ্ল্যাটে যাতায়াত শুরু করে। মহল্লাটা আবার যেন বদলে যেতে থাকে। আর একদিন সকালে অনেক রোদ উঠলে বিশোর্ধ্ব ত্রিশোর্ধ্ব চল্লিশোর্ধ্ব এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব বউরা তাদের ব্রা নিয়ে বেলকনিতে আসে। ব্রাগুলো এতদিন বাথরুমে শুকিয়ে শুকিয়ে ভ্যাপসা আর চিমসা গন্ধের গুদাম হয়ে গেছে। বউরা রোদ ঝলমল বেলকনিতে ব্রাগুলো মেলে খুব আনন্দ পায়। তখন তাদের মনে হয় এমনও হতে পারে যে ব্রায়ের ওই চিমসা গন্ধটাই হয়ত তাদের বুকে প্রসারিত হয়েছিল। আর এটা ভেবে তারা ঠিক করে কয়েকদিন পর তারা আবারো নিজেদের বুক শুঁকে শুঁকে দেখবে। 


লেখক পরিচিতি— 
আহমেদ খান হীরক 

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮১। স্বর্গছেড়া গ্রাম রহনপুরে। রহনপুর, যার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পুনর্ভবা নামের এক অসম্ভব রূপসী নদী। লেখকের শৈশব আর কৈশোর কেটেছে সেই নদীর বুকে ছায়া ফেলে। যৌবনে লেখার টানেই ঢাকায় আসেন লেখক। বিটিভির বিখ্যাত পাপেট অনুষ্ঠান সিসিমপুরের চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে শুরু করেন কর্মজীবন। এরপর অ্যানিমেশন স্টুডিওতে কিছু দিন লেখক হিসেবে কাজ করে প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিনিয়র রাইটার পদে কাজ করছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল দীপ্ত টিভিতে। কর্মজীবনের লেখালেখি ছাড়াও নিয়মিত লেখেন দৈনিক পত্রিকাসহ প্রতিষ্ঠিত ওয়েব ম্যাগাজিনগুলোতে। মূলত গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার হলেও ২০১০ সালে খাতেখড়ি প্রকাশনা থেকে লেখকের প্রকাশিত হয় কবিতার বই ‘আত্মহননের পূর্বপাঠ’। ২০১৬ সালে দেশ পাবলিকেসন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে রম্যগল্পের সংকলন ‘যে কারণে আমি সাকিব আল হাসান হতে পারি নি’। এছাড়া সিসিমপুর প্রকাশনা থেকে ১০টিরও বেশি শিশুতোষ গল্পের বই রয়েছে বাজারে। রম্যগল্প, শিশু সাহিত্য, কিশোর গল্পসহ সাহিত্যের সিরিয়াস ধরনের গল্পেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন নিরন্তর। তাই টিভির জন্য নিয়মিত চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি তাঁর সরব উপস্থিতি বাংলা গল্পের সব ধারায়। 

1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন ভাবে সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। ভালো লাগলো। এ রকম অারো গল্প অাপনার কাছে অাশা করি। যে গুলোর স্বাদ,ভাবনা এবং ভাবনা থেকে উপলব্ধি সারা জীবন সুন্দর পাঠ হয়ে থাকবে।

    উত্তরমুছুন