মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা শিমুল মাহমুদের সেরা গল্প : শত্রু সম্পত্তি

‘শত্রুসম্পত্তি’ গল্প প্রসঙ্গে লেখকের বয়ান

কেন যে এমন হয়, শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক তা জানা হয়ে ওঠে না। কলুদা রায় আমাকে বন্ধুজ্ঞানে ভালোবাসেন। আমার প্রতি তার কিি ত পক্ষপাত রয়েছে। এ বিষটা আমি অনুভব করে চলেছি বহু বছর ধরে। আর সে অনুভব থেকে যখন কলুদা আমার কাছে ‘গল্পপাঠ’ ডিসেম্বর সংখ্যার জন্য আমার লেখা শ্রেষ্ঠ গল্পটির প্রেক্ষাপটসহ চেয়ে বসলেন তখন আমার কেনো যেনো মাথায় ক্লিক করলো কলুদার জন্য আমাকে দেশেভাগনির্ভর গল্পটিকেই নির্বাচন করতে হবে। কলুদা রায় সাক্ষাৎকার গ্রহণের মতো করে বেশ কিছু প্রশ্ন পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এ মুহূর্তে প্রশ্নগুলো আমার হাতের কাছে নেই। তিনি ৪/৫ বছর আগেও সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অনেক অনেক প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন। আমি শেষ পর্যন্ত সেগুলোর উত্তর তৈরি করে দিতে পারিনি। কিন্ত সেই প্রশ্নগুলোর আশ্রয়ে আমি আমার গল্পভাবনা অনেক দেরিতে হলেও লিখে পাঠিয়েছিলাম। এ জন্য আমি কলুদার নিকট কৃতজ্ঞ। কেননা তিনি এভাবে আমার খোঁজখবর না রাখলে শেষ পর্যন্ত কথাসাহিত্য বিষয়ক ভাবনাগুলো আমি কোনদিনই লিখে উঠতে পারতাম না।

সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। তখন আমার কৈশোরকাল। সেই তখন, আলমডাঙার বটতলার মোড় পার হয়ে আমাদের সরকারি প্রাইমারি স্কুল। টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্কুলটার মাঠ ছিল বিশাল। স্কুলের একটা টানা পুরোন দালান ঘরও ছিল। সেই স্কুলে, তখন টিফিনে বিলেতি দুধ বিলি শুরু হয়েছে। এক দিন আমি কাগজের ঠোঙায়, যে ঠোঙা অংক খাতার পাতা ছিড়ে তৈরি করা হয়েছিল; সেই ঠোঙায় বিলেতি দুধ নিয়ে বাসায় ফিরছি। আমরা তখন আলমডাঙা থানা কাউন্সিলের দোতালা সরকারি বাসভবনে থাকতাম।

আমি বন্ধুদের সাথে হাতের ঠোঙায় বিলেতি দুধসহ ফিরছি বাসার দিকে। অথচ সেদিন বাসায় না ফিরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মিশে গিয়েছিলাম পাখি শিকারিদের সাথে। আদিবাসী ওরা। ওদেরকে বলা হত কলু। আসলে শব্দটি ছিল কোল; যে যার মতো করে বলতো কলু, কুলু, কোল। মু-াদের থেকে পৃথক ছিল ওদের স্থিতিহীন জীবন। ওদের হাতে থাকত লম্বা লম্বা চিকন বাঁশ। প্রতিটি আলোকিত সেই বাঁশ লম্বায় পাঁচ ছ হাত। একটির মাথা আরেকটির ভেতর ঢুকিয়ে তিন চারটি বাঁশ জোড়া দিয়ে, এভাবে সকলের উঁচুতে যে বাঁশটি থাকত তার মাথায় এক ধরনের আঠা লাগান থাকত।

খুব সন্তর্পণে জোড়া দেওয়া প্রায় পঁচিশ ত্রিশ হাত বাঁশ ঝাঁকড়া কোন বট, পাকুড় অথবা দেবদারু, গাব অথবা পুরোন কোন ছফেদা গাছ, আর আমি তখন সেই পুরোন গন্ধে কাঁপতে থাকা সব রকম বৃক্ষরাজির নামও যে ঠিকঠাক জানতাম তেমন নয়; যাই হোক সেই পুরোন আকাশ-প্রবণ বৃক্ষের ঝাঁক ঝাঁক শাখায় লুকিয়ে থাকা, নিরাপদে থাকা, বিশ্রামে থাকা, আনন্দে থাকা পাখির ঝাঁকের দিকে খুব ধীরে ধীরে ওরা ঠেলে দিত সেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর বাঁশ-শলাকা; সুদৃশ জাদুর লাঠি। দীর্ঘ বাঁশের মাথায় আঠার সাথে লেগে যেত সবুজ পাখি, কাল পাখি, লাল পাখি, ধূসর পাখি অথবা মেহগনি রঙের পাখি। আমি অবাক আনন্দে আর আশ্চর্য উত্তেজনায় তাকিয়ে থাকতাম সেই আঠায় আটকে যাওয়া পাখির দিকে; কী আশ্চর্য জান্তব জীবন; পাখা ঝাপটে উড়তে চাইছে শূন্যে!

তারপর সেই পাখি কাঁচা বাঁশের খাঁচায় বন্দী হলে আমার উত্তেজনা, আমার আনন্দ বন্দী হয়ে যেত সেই খাঁচাবন্দী পাখির সাথে; আমি ক্রমাগত আটকে যেতে থাকতাম রহস্যের খাঁচায়। আমি ওদের সাথে সেই যারা বাঁশ চিরে চিরে কতো রকম গৃহস্থালি তৈজস ধামা, কুলা অথবা মাছ ধরার সরঞ্জাম বানাতে বানাতে লাল কাঁচা রঙে ওগুলোকে রাঙিয়ে দিয়ে ওদের ভাষায় গান আওড়াতে আওড়াতে বিড়িতে আগুন ধরাত; আমি সেই তাদের সাথে আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিচ্ছিল তাজা দুপুরকে এলোমেলো ছড়িয়ে ফেলতাম।

ওদেরকে কখনো হুক্কা খেতে দেখিনি আমি। ওরা বাস করতো খালের ধারে। কখনো বা আমাদের স্কুলের পাশের খোলা জায়গায় অথবা ওদের আমি দেখতাম রাস্তার ধারে খালের পাশে উদোম রোদের নিচে শুয়ে আছে মহানির্বিকার। একদিন হাঁটের ভেতর সঙ্গন কাকাকে দেখে চিনে ফেলেছিলাম আমি। সঙ্গন কাকা আমাকে বাতাসা খাইয়েছিল। সঙ্গন কাকার ছেলের নাম ছিল পেঙ্গা। পেঙ্গার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল বেশ আঠাল ভাবে। অথচ তখনো আমি জানতাম না এই আঠাল বন্ধনের জন্য আমাকে কাঁদতে হবে একদিন।

ডানামেলা রোদের ভেতর, হাজার রঙের রাস্তার ভিড়ে আমরা দু’বন্ধু কাগজের ঠোঙার ভেতরে আমাদের নিরিবিলি স্পর্শকাতর আঙুল ঢুকিয়ে বিলেতি দুধ তুলে নিয়ে আমাদের জিহ্বা ঠোঁট সাদা করে নিতাম; দাঁতের সাথে দুধের মিহিগুড়া লেগে থাকতো; শুভ্র আঠাল; মিষ্টি তার অনুভব। এই অনুভবের ছোঁয়ায় পেঙ্গা হেসে উঠলে, বটতলার বিল্লু পাগলার সাথে ওর এক ধরনের মিল খুঁজে পেতাম। ওকে কখনো কাপড় পড়তে দেখিনি। নুনুর সাথে বাঁধা ছিল এক জোড়া ঝুনঝুনি। সেই শব্দকাতর ঝুনঝুনি ছিল ওর লজ্জাছোঁয়া পোশাক। স্পর্শকাতর ঝুনঝুনি বেজে উঠত কাল চামড়ার স্পর্শে। সেই বেজে ওঠা ধ্বনির সাথে কেঁপে কেঁপে উঠত ওর কাল ত্বক। আমার বন্ধুর নির্বোধ কাল মাজার সাথে লেপটে থাকত মোটা কাল সুতো। সেই অলৌকিক সুতোর সাথে বাঁধা ছিল তিনটি মাদুলি; একটি রূপোরঙা আয়তাকার চ্যাপ্টা; দ্বিতীয়টি কালচে, লোহার পাত কেটে তৈরি গোলাকার মার্বেলের মতো; আর আরেকটি ছিল বন্দুকের গুলির মতো সিসারঙ লম্বাটে গোল। গলায় প্যাঁচান ছিল কাপড়ের পাড় দিয়ে হাতে কাটা ফিতা। ফিতায় বাঁধা জোড়বাঁধা জাদুর দোলক; একটি পিতলরঙ অপরটি রূপোর পানিতে ধোয়া রূপোরঙ জাদুর তাবিজ।

সেই তখন, আমি ছিলাম উঠতি এক সাহেব-পুত্র। যে সাহেব দেশ স্বাধীন হবার আগেই গ্রাম্য টানাপোড়েন থেকে সাহেব হতে গিয়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না যে তিনি আসলে বাঙালি নাকি অন্য কিছু। আসলে সাহেব কাকে বলে তখন আমার বাবা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। তবে তাকে ইংরেজি আউড়াতে দেখতাম বিস্তর। আরো দেখতাম সাধারণ মানুষের সাথে তিনি মিশে গেলেও তার চারপাশে কেমন এক ধরনের ভয় জড়িয়ে থাকত। অথচ আমার বাবার কাজ ছিল কৃষকদের সাথে। তিনি ছিলেন বিএডিসি-র কৃষি কর্মকর্তা। অথচ কৃষকরা তাকে, তার পুত্রকে যেন বা রাজাজ্ঞানে পুজো দিত। তখনকার সময়টাই ছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অপার বিস্ময়ের সময়। তখন তাদের কাছে এক একজন শিক্ষিত আধা শিক্ষিত মানুষ মানে এক একজন রাষ্ট্রনায়ক; যাবতীয় সম্মানের একক অধিকারী। আর ওরা শিক্ষিত মানুষগুলোকে, সরকারের লোকগুলোকে ভক্তি করতে পারলে যেন বা বেহশত কিনে ফেলত, এমন একটা ভাব-পরিবেশ।

এমন একটা সময়ের ভেতর দিয়ে আমি চলতে চলতে কখন কীভাবে জান্তব জীবনের হাত ধরে একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি আমাদের ভেতর ভদ্রলোক হিসেবে দাবিকৃত অনেকেই, পাশ্চাত্য ধারায় সভ্য হয়ে উঠতে পারেনি এমন সাধারণ মানুষকে নিচু শ্রেণির মানুষ বলে খারিজ করে দিচ্ছে। অথচ পাঠক, আমি আপনাদের বিশ্বাস করাতে চাইছি পেঙ্গাকে আমি ভালবাসতাম। তারপর আজকে এই বয়সে এসে আমি নিজেকে প্রশ্ন করছি, আসলে কি তাই? আমি তা বিশ্বাস করি না। আমরা লেখকেরা যখন নিজে যা বিশ্বাস করি না অথচ আপনাকে আমরা ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করিয়ে তা বিশ্বাস করাবার চেষ্টা করি তখন আমার নিজের চেহারাটা কেমন দেখায় তা ভেবে চমকে উঠি। লেখক জীবনের প্রকৃত যন্ত্রণা এখানেই; আমার ভালবাসাকে, আমার বিশ্বাসকে আমি মিলিয়ে নিতে পারি না আমার রিয়েলিটির নিত্তিতে।

এখন আমি বুঝতে পারছি লেখকের অথবা একজন শিল্পীর নান্দনিক আবেগ রাজনীতিকদের কাছে যতটা অর্থহীন তার চেয়েও বেশি অর্থহীন আমার সেই প্রাথমিক জীবনের বন্ধু পেঙ্গাদের কাছে; যারা বেছে নিয়েছিল পাখি শিকারি জীবন; প্রাকৃত নিরাভরণ জীবন। এতটা জীবন পিছে ফেলে এসে আজ তাদের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারছি মানুষ হিসেবে আমি কতটা স্বার্থপর! যারা সুখের পেছনে ছোটে তারা স্বার্থপর। সেই পাখি শিকারির দল, তারা কি প্রতিনিয়ত সুখের পেছনে ছুটেছে? তারা কি স্বার্থপর? কেমন তাদের সুখ? তারা বসবাস করত অনিশ্চয়তার ভেতর খাদ্যহীন উলঙ্গ। অথচ আমি নান্দনিক আকাক্সক্ষায় আমার লেখায় নান্দনিক আবেগে বলতে চেষ্টা করি, এই যে অনিশ্চয়তার ভেতর বসবাস, এই যে স্বপ্ন, এই যে পরাজয় এগুলো ভয়ানক কষ্টের হলেও এর ভেতর এক ধরনের আনন্দ আছে; আছে স্বাধীনতা আর দিগন্তহীন উলঙ্গ জীবন। এই ভাবে আমি জীবনকে সহনীয় আর রোমান্টিক চাদরে জড়িয়ে প্রকৃত বাস্তবতা থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসি; তৈরি করে দেই এমন এক মিথ্যার জগৎ যেটা এক ধরনের নেশার জগৎ। প্রকৃত প্রস্তাবে এই নেশার জগৎই গল্পের জগৎ।

এই নেশা থেকেই সমস্ত জীবন ধরে আমি আসলে একটি গল্পই লিখছি। হয়তো প্রতিদিন গল্পগুলো নিয়ে বসতে পারি না অথচ গল্পের ভেতরেই আছি প্রতিনিয়ত আমার ভেতরে একটি গল্পই এডিট হচ্ছে। এভাবে চব্বিশ ঘণ্টা অনুভবে, এই যে লেখা নিয়ে সাধনা, এই সাধনা আসলে প্রতিটি মানুষকে বুঝে ওঠার সাধনা, যে মানুষ আজ তার সভ্যতাকে আদিম জীবন থেকে বর্বর জীবন থেকে সভ্যতা নামক আলোক ধাঁধায় নিয়ে এসেছে। এ এক ভয়ানক রহস্যের খেলা। সৃষ্টিজীবনের এই জান্তব-রহস্য পর্যবেক্ষণ করার জন্য দরকার এক হাজার বছরের জীবন; আর মানব সভ্যতার রহস্য বুঝতে হলে প্রয়োজন লক্ষ জীবন। এই লক্ষ জীবন প্রাপ্তির সাধনাই জীবনকে প্রতিনিয়ত লিখে ফেলার ভেতর দিয়ে বিনির্মাণ করে অগ্রসর হওয়া। মাস্টারপিসগুলো আসলে এ রকমই এক চিরন্তন সাধনা; যা উঠে আসে ব্যক্তিজীবন নয় বরং বহুজীবনের অভিজ্ঞতায় বিনির্মাণের পথ বেয়ে।

‘শত্রুসম্পত্তি’ গল্পটি আমি ২০০৫ সালে লিখেছি। গল্পটির প্রেক্ষাপট স্বাধীনতা-উত্তর আলমডাঙ্গায় ফেলে আসা আমার শৈশব, আমার কৈশোর। আমার বেশ কয়েকটি প্রিয় গল্পের মধ্যে এটিও একটি। এই গল্পটি আমি আমার নিকটজনদের নিয়ে অবলেহন করেছি ফকফকে ফাঁকা মাঠভর্তি চাঁদের পাথারে ডুবে থেকে। সেই চাঁদের পাথারে ডুবে থাকা রাতগুলোকে আমি বারবার ফিরে পেতে চাই। কলুদা আমাকে সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমাকে আবারো এলোমেলো করে দিলেন।

আমার লেখা মাত্র ২৬ খানা গল্পের মধ্যে ‘শত্রুসম্পত্তি’ শ্রেষ্ঠ কিনা বলা সম্ভব নয়। কেননা এক একটি গল্প এক এক প্লটে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে পৃথক আখ্যানে লেখার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি মনে করি আমার ভাষাজগতের সহজাত প্ররোচনা যতটা-না টেকনিক নির্ভর ততোধিক বাচ্যবিষয়-আশ্রয়ী। সেইসাথে আমার গল্পের ভাষা কবিতা-আশ্রয়ীও বটে। ফলে ভাষা বহুমাত্রিক লব্ধতায় ক্রমশ আপাত অর্থমাত্রাতে অতিক্রমের চেষ্টায় সর্বদা লড়াই করতে থাতে ভাষাজাদুর প্রকৌশলে। শত্রুসম্পত্তিতে আখ্যান থাকলেও তা শেষাবধি মননকুশলতায় দীর্ঘশ^াসের পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে।

আমি তখন ভারতভাগের ওপর বিস্তর পড়ছি যা আমাকে আক্রান্ত করেছিল বিরামহীন অনুসন্ধান ও এক ধরনের যন্ত্রণাবোধের ক্যানভাসে। দেশভাগের যন্ত্রণা ও বাস্তবতা সেইসাথে দেশভাগ আজও আমি মেনে নিতে অপরাগ। আমি বিলঙ করি আমি মহাভারতের নাগরিক; ভারত উপমহাদেশের নাগরিক; শেষাবধি বৈশি^ক নাগরিক। তারপরও প্রকৃত সত্য হল, আমার দেশই আমার পরিচয়। আর আমি এও জানি অন্য কোন দেশ আমাকে মেনে নেবে না; আমি আর কোনো দেশের নাগরিক নই। কিন্তু আমার দেশের ভেতরও কি সবাই আমাকে অথবা আমার মতো প্রতিজন মানুষকে মেনে নিয়েছে? বা মেনে নিচ্ছে? আমারা কি এখনও ধর্ম, বর্ণ, বিত্ত-বৈভব, বংশীয় অহম বিবিধ বিষয়াদির দাসত্ব করছি না? এই দাসত্ব কি আমাকে আমার পরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে দিচ্ছে? আমরা কি শেষাবধি অসাম্প্রদায়িক জাতি হিশেবে নিজেদের পরিচয় বহন করতে সক্ষম?

তারপরও বলছি আমার ভাবতে ভালো লাগে, আমি ভারত উপমহাদেশের বহুবিচিত্র সংস্কৃতি ও ঐহিত্য-আশ্রয়ী নাগরিক। অথচ বাস্তবে তা নয়। এই যে না পাওয়া, অথচ পাওয়ার জন্য কী দুঃসহ আকাক্সক্ষা; এই দুয়ের ভেতর যে মনননির্ভর লড়াই, সেই লড়াই থেকেই আমি লিখেছি ‘শত্রুসম্পত্তি’। যে গল্পটি আমাকে লিখতে গিয়ে আমাদের ঐতিহ্যনির্ভর বিবিধ পূজাপার্বনের আচারনিষ্ঠ বিষয়াদি পাঠ করতে হয়েছিল; পাঠ করতে হয়েছিল বিবিধ পাঁচালি ও পাঁচালিনির্ভর জীবন-আচার। আমাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল আমার শিশুকালের। শৈশবকালের অনিবার্য নস্টালজিয়া আমাকে আক্রান্ত করেছে গল্পটি লেখার সময়।

আর মজার বিষয়টি হল আমার শৈশবকালের সেই সত্তরের দশকের ওপর দাঁড়িয়ে আমি পক্ষান্তরে পর্যবেক্ষণ করেছি সাতচল্লিশের দুর্বিসহ দেশভাগের শেকড়ছেড়া যন্ত্রণাকে; বাপদাদার ভিটেবি ত মানুষগুলোর দীর্ঘশ^াসকে; আর এই দীর্ঘশ^াস আর যন্ত্রণাকে ছুঁয়ে দিতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি এপার বাংলার মানুষ ওপারে যেতে বাধ্য হলেও অথবা ওপার বাংলার মানুষ এপারে চলে আসতে বাধ্য হলেও তাদের হৃয়েরর প্রায় সবকুটুই ফেলে রেখে এসেছে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির শ্মশানে, তাদের বাপদাদার মাটির কবরের তলদেশে। পক্ষান্তরে এই দুর্বিসহ আসা-যাওয়া দুর্বিসহ দেশভাগ আমাদের পায়ুপথে যে ক্ষত সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে, আজ সময়ের এতটা পথ অতিক্রম করে এসে আমি দেখতে পাচ্ছি আমাদের পায়ুপথে এখনও থকথকে বিষ্ঠা মিশ্রিত রক্ত গড়িয়ে নামছে চুইয়ে চুইয়ে; গড়িয়ে নামছে পাইলসের যন্ত্রণা; যা শক্রসম্পত্তির শেষ বাক্যে এসে বিস্ফোরিত হয়েছে।
গল্প
শত্রু সম্পত্তি
শিমুল মাহমুদ

বাবলা গাছের সরু কাঁটার আড়ালে আলো। এনামেল আলো। চাঁদজোছনার শরীরী আবেদন। একটা ঘঁষা খাওয়া চাঁদ ভাসতে থাকে নিথর নীরব। রাতের গন্ধগুলো কেবলই ডাকতে থাকে, শিশুকালকে ডাকে। চালের ওপর শিশির পড়ার একটা মিহি শব্দ মাথার গভীরে জেগে থাকে। কেউ সেই পার্থিব মিহি শব্দের সুর শুনতে পায় না। আশেপাশে কোথাও জোনাকির আলো নেই। অন্ধকারের শরীরে আঁধারকালো বাতাস ঝুলতেই থাকে নিরিবিলি। একটা সন্ধ্যাতারা এক আকাশ সমান শূন্যতা বুকে নিয়ে মাথাভাঙা নদীর ওপারে খসে পড়তেই সাতটা সাদা ঘোড়া ভীষণ হ্রেষারবে উড়াল দেয়। পরীরাণীর পাখায় ভাসতে থাকি। চারিধার মেঘ। পরিচিত মেঘেদের দেশ। পরীরাণী আমাকে ছায়াপথের ওপর বসিয়ে একটা এক চোখওয়ালা তারা খসিয়ে আনতে সেই যে গেল, আর ফিরে এলো না।

মৃদুল ঘুমের ভেতর কাঁদছে। ফেলে আসা কৈশোরে শুকতারা হাতে পরীকন্যা চেয়েছিলো মৃদুল। অথচ এখন মথুরাপুরের আকাশে আর কোনো পরীকে উড়তে দেখা যায় না। একদিন হাত বাড়ালেই ওদের ফিসফিসে কথার ভাপ মৃদুলের চিবুকে ঠান্ডা ছিটিয়ে দিত। কেমন এক সম্মোহনী মায়ায় মৃদুল তাকিয়ে থাকে ঝাঁকঝাঁক মায়াপরীর দিকে। লাইটপোস্টটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, পাহারা দেয়, যাতে দিনের আলো এসে রাতের মায়াকে তাড়িয়ে না দেয়। গঙ্গাদের বাড়ির লজ্জা পাওয়া ছোট্ট প্রদীপটা অধৈর্য বুকে চেপে নিবে যায় এক সময়।

অনেকদিন আগে। তখন আলমডাঙ্গার একমাত্র রাস্তাটা পাকা হয়নি। খোয়া বিছানো। বটতলাকে ঘিরে প্রতি বিকেলেই মেলা বসতো। বুড়ো পাকন গাছটার গুড়িতে প্রতি সকালে মথুরাপুরের বউয়েরা সবাই খালি পায়ে হেঁটে এসে সিঁদুর দিয়ে যেতো। রায়বাড়ির বৃদ্ধা নর্তকী তখনো বেঁচে ছিলো। মাথাভাঙার ওপর কেবলই ব্রিজ বাঁধবার আয়োজন চলছে। মৃদুল মাথাভাঙার সবচেয়ে উঁচু পাড়টাতে বসে রাতবাস্তবে পরীর সাথে প্রণয় সম্ভব কিনা তা পরখ করে দেখতে ভেতরে ভেতরে সাহস স য় করতে শুরু করেছে। গাছ ফুল আর পাতারা নিরিবিলি দোল খায়। একটা দুটো করে আকাশের তারা খসে পড়ে। আকাশ ফিকে হয়ে আসে। কুয়াশারা ঝাঁক বেঁধে উড়ে এসে সব কিছু ভিজিয়ে দেয়। চাঁদটা ঝাপসা হয়ে আড়াল নিতে থাকে। চোখের পাপড়িতে বাতাস এসে চুমু খায়। পায়ের পাতায় ভেজা ঘাসেরা কেঁপে কেঁপে ওঠে।

দূরতম মেঘের দেশ থেকে একদিন একটা চিঠি ভেসে আসে। চিঠির অক্ষরগুলো শরীরী চিৎকারে কেবলই আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর জেনেছিলাম কান্নার সৌন্দর্য তুলনাহীন। গোপনচারি কান্নাগুলো যদি দেখে ফেলে কেউ, মনে হয় ছুঁয়ে দেবো অথচ অক্ষম মস্তিষ্ক, ভাষা দেবার কী দুর্মর আকাক্সক্ষা। জানিনা আবারো কেনো ফিরে আসি সেই পুরোনো জায়গায়। একটা রাতজাগা পোকা কেবলই ঘুরে ফিরে আগুনের উষ্ণতায় ফিরে আসে। হয়তো পুড়ে যেতে চায়। আগুনের আলোয় আলোকিত হতে চায়।

গঙ্গার কেবলই মনে হতে থাকে জীবনটা ভীষণ ভালোলাগার। দরজার সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, হাঁটবে। তারপর গঙ্গা হাঁটতে থাকে। বাবলা গাছের নিচে, ভেজা ঘাস আর হলুদ নিম পাতার শরীরের ওপর মেয়েটি হাঁটছে। চারিধার ভালোলাগার ইমেজ। সব কেমন যেন একেবারে নির্জন। একটা ঘুম ঘুম আমেজ। অথচ কড়কড়ে রোদ, তবুও মনে হয় পেলব পিচ্ছিল। চকচকে তরতাজা আকাশ। মৃদুলের ঘরের সিলিঙে ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের চারিধার হু হু আবেগ। মাথার গভীরে পুরোনো ছবিগুলো কেবলই নড়েচড়ে ওঠে। কৈশোরের পায়রা ডাকছে কোথাও।

একটা যুবক বয়সের নদীর ধারে বসে থাকে মৃদুল। বিশাল গাঢ় একটা আকাশ। আকাশের শরীরী শরীরে মেঘেদের গায়ে লেখা আছে, নিজেকে অন্যের ভেতর বিম্বিত দেখার আনন্দ ভিন্ন রকম। মৃদুল পড়তে থাকে মেঘেদের শরীরে ভেসে ওঠা সেই মায়াবি অক্ষর। তারপর আকাশের মেঘগুলো ক্রমাগত একটা সাদা হাতির দেহে পাল্টে যেতে থাকলে মৃদুল মেঘেদের গতিশীল দেহের ভেতর মাথাভাঙা নদীটাকে দেখতে পায়। নদীটাকে ঘিরে অনেকগুলো মাটির ঢিপি। ঢিপিগুলোকে মনে হচ্ছে যেন এক একটা চলমান পাহাড়। পাহাড়ের পেছনে একজোড়া সার্কাসের ক্লাউন কেবলই নাচতে থাকে। মৃদুল আকাশের পর্দায় সাদাকালো সিনেমা দেখতে থাকে। গতকাল তারাপিসির সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো। তখন সিনেমা বলতে সাদাকালো সিনেমাই ছিলো। মৃদুল আকাশের পর্দায় মেঘেদের শরীরে নিজেই একটা সাদাকালো সিনেমার গল্প বুনে চলে। সিনেমার গল্পে গঙ্গা মৃদুলকে পিছে ফেলে চলে যায়। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকে মৃদুল, একা। গঙ্গা নিজেকে ছুঁয়ে দেখে। সেই পার্থিব ছুঁয়ে দেখার ভাষা খুব গোপনে মৃদুলের ভেতরও বেড়ে উঠতে থাকে। গোপনচারীতায় সবুজ পাতার মানবীয় নিঃশ্বাস; একঝাঁক বাতাস ঢুকে পড়ে সমস্ত জানালায়; জানালার কপাট কাঁপিয়ে দিয়ে মেঘেরা কেবলই ছিঁড়ে যেতে থাকে। অনেকটা দূর এগিয়ে এসে মুখ বাড়িয়ে গঙ্গা দেখতে পায় মৃদুল নেই। সন্ধ্যা আকাশের তলায় মনটা বিষণœ হয়ে আসে। বাড়িতে ফিরে বিরক্তিতে বিষিয়ে যায় সমস্ত শরীর। আকারহীন অবয়বহীন সেই বিষাদ। গঙ্গার কেবলই মনে হতে থাকলো, সবকিছু অস্বীকার করে ফেলবে, ছড়িয়ে টুকরো টুকরো করে নষ্ট করে দেবে এই চড়–ইভাতির সমস্ত আয়োজন।

অথচ আজ কেবলই মনে হয় কোথায় সেই কষ্টে তেতো অনুভূতি। সেই পরিচিত অনুভূতি। সারাটা দুপুর যে আমি পিঠ পুড়িয়ে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়ালাম ওসব কিছু নয়। বরং সন্ধ্যার দেহে চুরি করে চুইয়ে নামা চাঁদের আলোগুলো ডাকছে কেবলই। আমড়া গাছের ফাঁকে ওরা লুটোপুটি খায় সবুজ মাটিতে। মাঝে মাঝে মনে হয় গঙ্গা এক দূরতম দেশের বাসিন্দা। কিছুতেই মনে করতে পারি না ওর মুখ। ছাড়াছাড়া ভাবে শুধু ওর চোখ অথবা ভুরুর রেখা ভেসে ওঠে। নিজেকে বুঝতে পারি না ভালো। অথচ লুকিয়ে কী লাভ। আর লুকানোরই বা কী আছে। নিজের অবস্থানটা সর্বদা নেচে বেড়াতে চায় বুকের ভেতর; তাই ভুলে থাকার কতো টালবাহানা। নিজেরই চোখ বেঁধে কানামাছি ভো ভো। আগে বুঝতাম না ভালো। তারপর দেখি ভয়ানক তৃষিত আমি। ভেতরটা বারবার ভবঘুরে হয়ে যায়। গঙ্গাদি, তুমি কী কষ্ট পাও আজো? পরবাসী হতে চায় ভেতরের সবকিছু। জলের ভেতর হাঁটছি। অনেকক্ষণ। এলোমেলো। উঠে আসি কাঁচা ঘাসে। ওভাবে এলোমেলো হেঁটে কিছু হয় না। পিছিয়ে পড়লে পথ আর তুলে নেয় না কাউকে।

দুপুরের চাঁদ। নিষ্প্রভ। সূর্যের আলোর আড়ালে রঙহীন। মেঘ কেটে রোদ উঠেছে। অনেকদিন পর আশ্বিনের আকাশ ঝলমল। মাঠ পাড়ি দিয়ে রাস্তায় উঠতে গিয়ে দেখি দূরের পোড়ো বাড়িটার পাঁচিল ঘেঁষে ছড়িয়ে আছে আকাশ। ঝকঝকে। ফুলকপির মতো একগোছা সাদা বিষণœতা যেনো গাঢ় নীলের পটভূমিতে সাদা মেঘ, শান্ত ধীর মঠের চূড়ার মতো তাকিয়ে আছে। কেবলই তাকায়। পা আটকে গেছে ঘাসের নিঃশ্বাসে। মৃদুল কেমন যেনো হয়ে যায়। অকস্মাৎ মনে উঁকি দেয় সেই পরিচিত অনুভূতি। বন বাদাড় মাঠ ডোবা, কোথায় সে! কতো পথ চলে গেছে কতো দেশ দেশান্তর। মৃদুল শুধুই তাকিয়ে থাকে।

মাথাভাঙার তীর ধরে মৃদুল হাঁটতে থাকে। একটা কানাবক ওকে দেখতে পায় না। একটা ভীষণ উঁচু দেবদারু গাছ শুধু দাঁড়িয়েই থাকে। মৃদুলের দিকে ভুলেও তাকায় না। যেন নিষেধ আছে দেবতার। মৃদুল রাগী চেহারার গাছটার দিকে তাকায়। আবারো হাঁটতে থাকে। একটা শানবাঁধানো ভাঙা ঘাট। ভীষণ পুরাতন ওর পাথরগুলো। চ-ী দেউলের দরজার কাছে এসে মৃদুল দাঁড়িয়ে পড়ে। দেউলের দুয়ার খোলা। জনহীন মাথাভাঙার পুরোনো, ভীষণ পুরোনো বাঁকে এই নীরব মন্দির। সেই মন্দিরের ভেতর পাথরে খোদাই দেবী মূর্তি। প্রাচীন মূর্তিকে ঘিরে কেবলই রহস্য দুলে ওঠে। কোনো এক অমাবস্যার রাত। মৃদুলদের বাড়ির সবাই পূজো দিতে এসেছে। টিপটিপ প্রদীপের আলোয় দেবীর মুখ জ্বলছে। হঠাৎই সবাই দেখতে পায়, রক্ত লেগে আছে দেবীর মুখে। মুহূর্তেই দেবী চ-ী হেসে ওঠে।

মৃদুল ভয় পায় না। দিনের আলোয় খেলা করছে মাথাভাঙার জল। মাথাভাঙার বুকের ওপর দিয়ে ছুটে আসছে বাতাস। সেই বাতাসে দেউল দ্বারের শিকল বেজে ওঠে টুং টাং মিষ্টি শব্দে। মৃদুলের ঠাকুরমার কাছে শোনা সেই গল্পের মতো কেবলই মনে হতে থাকে দেবী হাসছে। এখনই হয়তো মুখ দিয়ে গলগল রক্ত বের হয়ে আসবে। কেনো যেনো মৃদুলের মনটা নিথর হয়ে আসে। গঙ্গা থাকলে ভালো হতো। দুপুরের রোদে শালবনের ছায়া গরম হয়ে ওঠে। শুধু চন্ডী দেউলের দরজার ছায়া নীরব শীতল। মৃদুল চুপচাপ বসে থাকে। বসেই থাকে। মাথাভাঙার বাতাসে ঘুম আসে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গঙ্গার সাথে কথা বলে। ছুঁয়ে দেয় গঙ্গার চোখ। গঙ্গা মৃদুলকে খুব জোরে বুকের সাথে ঠেসে ধরে তারপর হঠাৎই ছেড়ে দেয়। গঙ্গার ধাক্কায় মৃদুলের ঘুম ভেঙে যায়। মৃদুল ঘুমভাঙা চোখে সন্ধ্যাকাতর মাথাভাঙার জলে তাকিয়ে থাকে। একটা বাস্তুসাপ মন্দিরের ভিটে ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। মৃদুল তাকায়। ওর কোনো ভাবাবেগ হয় না। সাপটা হারিয়ে গেলে মৃদুল ফিরতে শুরু করে গঙ্গাদের গাঁয়ে। ঠাকুরদার গাঁয়ে।

ঠাকুরদার গদিঘরে একদিন এক সাধুবাবা এসে হাজির। বাবাজি একখানা তালাআঁটা ছোট্ট টিনের তোরঙ ঠাকুরদার কাছে গচ্ছিত রেখে বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগ দিয়ে ঠাকুরদার কানে কানে বলে গিয়েছিলেন, বাক্সটা যেন সিন্ধুকের ভেতর তুলে রাখা হয়। বাক্সের ভেতর তার জীবনের সমস্ত স য় লুকানো আছে। সাধুবাবা গেলেন। তারপর আর ফিরলেন না। মৃদুলের ভেতর কেবলই সাধুবাবার চোখ ভেসে ওঠে। লাল ফোলা ফোলা চোখ। কী তার চাহনি আর কী তার গমগমে কণ্ঠ। একদিন বাবাজি ফিরে এলেন। আবার চলেও গেলেন। যাওয়ার সময় মৃদুলকে সাথে নিয়ে মাথাভাঙা বরাবর হাঁটলেন অনেকক্ষণ। মৃদুলকে তিনবার একই কথা বললেন, হাম জান দে দেংগে, লেকিন ইমান কা সাওদা নেহি করেংগে। তারপর সাধুবাবার রহস্য আর উদ্ধার হয়নি। সেই রহস্যে ঘেরা বাক্সটার জন্যই এতগুলো বছর পর মথুরাপুরে ফিরে এসেছে হয়তো; মৃদুল ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। পাঁজরের কোথায় কোথায় যেনো একটা দমচাপা বাতাস কেবলই অস্থির আলোড়ন তোলে। চব্বিশ পরগণাতে ঘুমিয়েও মৃদুল সাধুবাবার স্বপ্ন দেখেছে। ঠাকুরদা আর সাধুবাবা চ-ী দেউলের ভেতর বসে আছেন। সাধুবাবার শরীরের আলোতে দেউলের চত্ত্বরটা আলোকিত। সেই আলোর সামনে ঠাকুরদা যেন কেমন মিইয়ে যাচ্ছেন। ঠাকুরদা সাধুবাবাকে নিয়ে পাঁচালী গাইছেন।

জ্যৈষ্ঠের মঙ্গলবার। মৃদুলের পাশে সেদিন গঙ্গাদি ছিলো। গঙ্গার গায়ের গন্ধ আরেকটু ঘন করে পাবার জন্য মৃদুল গঙ্গার আরো একটু পিঠ ঘেঁষে বসলো। দূর্গাপিসি ষোলটি কাঁঠাল পাতা, ষোলটি সুপারি, আম, আতপ, ত-ুল, দূর্বা, আম্রপল্লব, শিকডাব সমস্ত কিছু ঘটের পাশে সাজিয়ে রেখেছে। ঠাকুরদা শুদ্ধাসনে উত্তরমুখে বসে আচমন শেষে বিষ্ণুস্মরণে মন দিলেন। এরপর ডান হাতের আকৃতিকে গরুর কানের আকৃতিতে তুলে ধরে মাষমগ্ন পরিমাণ জল পান করলেন। হাত ধোয়ার পর শুরু হলো মন্ত্রপাঠ, ওঁ তদ্বিষ্ণো পরমং পদম্ যদা পশ্যন্তি সূরয়, দিবীব চক্ষুরাততম্।। ওঁ মাধবো মাধবো বাচি মাধবো মাধবো হৃদি।।

ঠাকুরদা ইতিমধ্যেই সঙ্কল্পসূক্ত পাঠ শেষে সামান্যার্ঘ স্থাপন কাজে মন দিয়েছেন। এরপর শুরু করলেন দ্বারপূজা। গঙ্গাদি মৃদুলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। এরমধ্যে দূর্গাপিসি কখন যে মৃদুলের কোল ঘেঁষে বসেছে মৃদুল বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পারলো তখন চোখ উঁচিয়ে দূর্গার চিবুকের নিচে ভেসে থাকা ছোট্ট তিলটাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখা শুরু করলো। চিবুক থেকে চোখ আরো নিচে একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়ানো উঁচু বুকের ভাঁজে এসে থেমে থাকলো। মৃদুল দূর্গাপিসিকে খুব আস্তে করে একটা চিমটি কাটলো। কীর্তন শুরু হয়ে গিয়েছে। ধুপের গন্ধে মৃদুলের গলা জড়িয়ে আসছে। রাতে চ-ী মন্দির থেকে ফেরার সময় মৃদুল ভয়ের ভান করে কেবলই দূর্গার শাড়ির সাথে সেঁটে যেতে থাকে। সেই রাতেই দূর্গাপিসির কাছে ঘুমিয়ে মৃদুল স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নের ভেতর চেঁচিয়ে উঠলে বিধবা দূর্গাপিসি মৃদুলকে বুকের সাথে আকড়ে ধরে। মৃদুল স্বপ্নে পাওয়া পরীকন্যাকে কেবলই জড়িয়ে ধরতে থাকে আর তারপরই দূর্গাপিসির ওপর সমস্ত শরীরটা তুলে ঘুম থেকে জেগে ওঠা উনিশ বছরের পিসির মুখ চুমুতে চুমুতে ভিজিয়ে দেয়।

সেদ্ধ ধানের ভাপ উঠছে উঠান জুড়ে। গরুর গোবর আর চোনার গন্ধ ভারি করে রেখেছে পরিবেশটা। রজবালির তিনমাসের বিয়ে করা বউ শেফালীকে পাগলা কুকুরে কামড়েছে। মৃদুল দূর্গার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেফালীর ভয়কাতর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একজন বৃদ্ধা বেদেনী শঙ্খ মাছের কাঁটা দিয়ে বিষ ঝাড়তে ঝাড়তে মুখে খিস্তি উগলাচ্ছে। মৃদুল বহু চেষ্টায় লিঙ্গ শব্দটা উদ্ধার করতে পেরে মুখ টিপে হাসতে থাকে। বেদেনী একটা গরম পিতলের বদনা শেফালীর কুকুরে কামড়ানো ঘায়ের ওপর ঠেসে ধরতেই নাকিকণ্ঠের তীব্র চিৎকারে ভিড়টা একটু দূরে সরে এলো। ভয়ে মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করছে শেফালীর। একটা দাড়কাক কাঁঠাল গাছটার ডাল থেকে হঠাৎই উড়ে এসে একেবারে শেফালীর সামনে কাপড় মেলা তারে গিয়ে কা কা চিৎকারে ভিড়টাকে কাঁপিয়ে দিলো। মৃদুলের শ্বাস প্রশ্বাসে অস্থিরতা।

চারিধার সন্ধ্যা। চারিধার তরতাজা মাটির গন্ধ। বেদেনীর চারিধার ছিটিয়ে থাকা পান-তামাকের গন্ধ মৃদুলের নাক থেকে কিছুতেই মুছতে চায় না। সারসার শেখপাড়ার উঠোন ধরে মৃদুল আর দূর্গা হাঁটছে। একটা ঠান্ডা বাতাস ওদের ঝাপটা মারতেই চারিধার খড়কুটো উড়ে উঠলো। গাছের ডালে বসা পায়রাগুলো খানিকটা যেন ভয় পেলো। শেষ দুপুরে বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখনো খড়ের পালা থেকে সাদা ধোঁয়ার মতো ভাপ উঠছে। একটা লাল বেয়ারা রকমের মোরগ এই হুটোপুটি বাতাসের মধ্যে একটা ডেকি মুরগীর টুটি চেপে ধরে পিঠের ওপর চড়ে বসলো। দূর্গার চোখে বৃষ্টির একটা ছোট্ট ছিটে এসে লাগলো। শেখ বাড়ির মেয়েরা মেতে উঠলো উঠোনে ছড়িয়ে থাকা সিদ্ধ ধান তোলার আয়োজনে।

আজ কার্তিকসংক্রান্তি। গঙ্গাদের বাড়িতে ইতু পূজা হচ্ছে। মৃদুল আসতে চায়নি; দূর্গা ওকে জোর করে নিয়ে এসেছে। ইতু পূজায় পুরুষ মানুষের থাকার কথা না থাকলেও মৃদুল দূর্গার সাথে কুমারী, সধবা, পুত্রবতী আর বিধবাদের সারিতে মিশে গেল। গঙ্গার দিদিঠাকুরণ গুণগুণ স্বরে গাইতে শুরু করলে নবারুণের মা আর উত্তমের বোন যোগ দিলো,

অষ্ট চাল, অষ্ট দূর্বা কলস মধ্যে থুইয়া
ইতু কথা শুন সবে পূজা ঘরে যাইয়া।।
ইতু দানে বর, ধন ধান্যে পূর্ণ হবে ঘর।
পুনঃ দেয় বর, পুত্র পৌত্রে গৃহ ভরিবে সত্বর।।

গঙ্গা হাত জোড়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। ওকে বেশ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে যেন একটা পবিত্র গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে ওর শরীর থেকে। মৃদুলের কিছুই ভালো লাগছে না। গঙ্গাদের বাড়িতে আসার পর থেকে সবার মুখে একই কথা কীভাবে রজবের বউ পাগল হয়েছে। বৃদ্ধা বেদেনীকে মনে পড়লো মৃদুলের। মাথার ভেতর ছড়িয়ে পড়লো সেই বৃদ্ধা বেদেনীর শরীরে পান তামাকের গন্ধে মেশা একটা ময়লা বাতাসের অনুভূতি। গতরাতে একটা বাচ্চা নষ্ট হয়েছে শেফালী মাসির। বাচ্চাটা নাকি কুকুরের ছিলো। মৃদুলের কাছে সবকিছু কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়। কেবলি মনে হতে থাকে শেফালী মাসিদের পাড়ায় অনেকদিন যাওয়া হয়নি। শেখপাড়ার লোকগুলো চাষবাস করে খায়। মৃদুল শেখপাড়ার দিকে এগুতে থাকে। শেফালীদের উঠোনটা ঠিক চেনা যায় না। তারপর আকাশটা কেন যেন কেবলই ফুঁসতে শুরু করলো। শেখপাড়াটা কী উঠে গেলো! দূর্গাপিসি এখন কী করছে। গঙ্গার বিয়েটা শেষ পর্যন্ত কেন যে হলো না, মৃদুল আজো ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শেফালী মাসি কী পাগল জীবনেই থেমে আছে? মৃদুল চোখ বন্ধ করে। তারপর অনেকক্ষণ চোখ দুটো বন্ধ করেই শুয়ে থাকে।

দরিদ্র ব্রাহ্মণ। অবন্তী ধামে তার বাস। প্রতিদিন ভিক্ষে করে যা পায়, তা দিয়ে তার সংসার চলে। ব্রাহ্মণের দুই কন্যা। অনাহারে বৃদ্ধি পায় তাদের লতার মতো ক্ষীণ দেহ। একদিন ব্রাহ্মণ ভিক্ষে করতে করতে অনেক দূর পলীতে চলে গেল। এক কায়স্থের ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ব্রাহ্মণের নাকে ভেসে এলো পিঠা ভাজার গন্ধ। কায়স্থ বাড়ির গিন্নীমা পিঠা ভাজছে। ব্রাহ্মণের ইন্দ্রিয় তাতিয়ে উঠতে থাকে। এরপর ব্রাহ্মণ আরো দুদিন ঘুরে ঘুরে পিঠা বানাবার সাজ সরঞ্জাম সংগ্রহ করে অবন্তী ধামের দিকে যাত্রা শুরু করলো। মৃদুল চট করে প্রশ্ন করে, অবন্তী ধাম কোথায়? দূর্গা কোনো জবাব দিতে পারে না। মৃদুলের কানে চিমটি কেটে হেসে ফেলে। এবারে মৃদুল ব্রাহ্মণ কন্যাদের নাম জানতে চায়। দূর্গা মনে মনে নাম খুঁজতে শুরু করে। পরিচিত অপরিচিত কোনো নামই তার ভালো লাগে না। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে বড়টার নাম দূর্গা আর ছোটটার নাম গঙ্গা। মৃদুল চেচিয়ে ওঠে, সব মিথ্যে কথা। দূর্গা মৃদুলকে ঠেলে বারান্দায় চলে যায়। মৃদুল সেই দুপুরটা দূর্গার পিছে পিছে ঘুরঘুর করে কাটালো। তারপর রোদ মিলিয়ে আসতেই ওরা গঙ্গাদের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

জানালার পাশে বসে আছে গঙ্গা। গায়ের হলুদ ওড়নাটা জানালার গরাদে ঝুলানো। একটা কাসার বাটিতে গঙ্গা কী যেন চটকাচ্ছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলো কাচা আম আর তেঁতুল। দূর্গার জিহ্বায় পানি আসতে শুরু করেছে। মৃদুলের মাথায় তখন ব্রাহ্মণের মেয়ে দুটোর ফর্সা মুখ কেবলই ঘুরে ফিরে উঁকি দিচ্ছে। ওদের মাথার চুল লম্বা, বেশ লম্বা, একেবারে মাজার কাছে এসে এলিয়ে পড়েছে। চোখগুলো কেমন ছলছল। ওরা মৃদুলের দিকে তাকিয়ে আছে। দূর্গা আঙুলের চিমটিতে তেঁতুল চটকানো মুখে দিয়ে মৃদুলের দিকে তাকায়। তারপর মৃদুলের কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিসিয়ে ওঠে, মৃদুল দেখ, খুব মজা। মৃদুল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঠোঁটের ওপর দূর্গা নিজের ঠোঁট ঠেসে ধরে জিহ্বায় ঠেলে দেয় তেঁতুল চটকানো। মৃদুল দূর্গার চোখ নাক আর নাকের নিঃশ্বাসের আলাদা একটা স্বাদ পেতে থাকে। তারপর দূর্গার ঠোঁটের ওপর কামড়ে দেয়। দূর্গা চেঁচিয়ে উঠে মৃদুলকে ঝাপটে ধরে। গঙ্গা দূর্গার দিকে বিদ্যুৎচোখে তাকায়, দূর্গাপিসি কী করছিস এসব? দূর্গা হেসে ফেলে। গঙ্গার মুখের কাছে মুখ এনে বলে ওঠে, মৃদুলকে তুই ইতুদেবীর গল্পটা বল। মৃদুল গঙ্গার আরো কাছে সরে আসে। গঙ্গা গরাদ থেকে ওড়নাটা তুলে নিয়ে গলায় জড়াতে থাকে।

ব্রাহ্মণ পিঠা তৈরির জন্য খেঁজুরের গুড়, চাউলের গুড়ো আর সরের ঘি নিয়ে তিনদিন পর গৃহে ফিরে গিন্নীকে পিঠা বানাতে বলে পাশের ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে পিঠা ভাজার শব্দগুলো গুনতে শুরু করে। একটা করে পিঠা ভাজা হয় আর একবার করে ছ্যাঁক শব্দ হয়। অমনি ব্রাহ্মণ দড়িতে একটা গিঁট দিয়ে রাখে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণের দুই কন্যা এসে মায়ের কাছে পিঠা খাবার জন্য বায়না ধরে। ব্রাহ্মণ গিন্নীর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে আসে। মেয়েদের পরীর মতো মুখের দিকে তাকিয়ে ব্রাহ্মণ গিন্নীর বুকটা একেবারে হু হু করে উঠলো। ব্রাহ্মণগিন্নী কন্যাদুটোকে পিঠা খাওয়ায়, জল খাওয়ায়। তারপর আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে বাগানে পাঠিয়ে দেয়। আর ব্রাহ্মণ পিঠা খাওয়ার সময় যখন পিঠা কম হবার কারণ জানতে চাইলো তখন সতী ব্রাহ্মণগিন্নী ভয়ে ভয়ে সত্যি কথাটাই বলে ফেললো। ব্রাহ্মণের ভেতরটা রাগে কেবলই ফুঁসছে। মনে মনে বুদ্ধি আঁটে এর প্রতিশোধ নেবে। তারপর একদিন ব্রাহ্মণ মেয়ে দুটোকে সাজিয়ে দিতে বললো। ওদেরকে পিসির বাড়িতে নিয়ে যাবে। সেখানে ওরা সুখে থাকবে। অন্ন-ভোগ-অলঙ্কার-কলাপেড়ে শাড়ি কিছুরই কষ্ট থাকবে না ওদের। ওরা ময়ূরের গানে ঘুমাবে আর ডাহুকের ডাকে ঘুম থেকে জেগে উঠে কাননে মালা গাঁথবে। তারপর একদিন কোনো সদ্বংশজাত কুমার এসে ওদের রথে করে নিয়ে যাবে। ব্রাহ্মণী বিশ্বাস করে না স্বামীর কথা। কন্যাদ্বয়ের কচি বুকে আনন্দ। কচি বুকে স্বপ্ন। বুকজোড়া কেবলই ঢিপঢিপ করতে থাকে।

স্বামীর আদেশ বলে কথা। ব্রাহ্মণী সাজাতে থাকে মেয়েদের। তোরঙ্গ খুলে একে একে বের করে নিজের বিয়ের সময় মায়ের দেওয়া গয়না-ওড়না-হাওয়াই লাল চপ্পল। ব্রাহ্মণ দিনক্ষণ দেখে কন্যাদের নিয়ে যাত্রা করে। তারপর হাঁটছে তো হাঁটছেই। একদিন ওরা ক্লান্ত হয়। তারপর, বটবৃক্ষের তলে পিতা-কন্যায় বসিল। মৃদু বাতাসে নিদ্রাদেবী চোখে আসিল।।

বাবার পায়ে মাথা রেখে গঙ্গা আর দূর্গা ঘুম যায়। ঘুমের ভেতর মৃদুলের মতো একজন রাজকুমার এসে ওদের ডাকতে থাকে। রাজকুমারের পঙ্খিরাজ কেবলি উড়াল দিতে চায়। আর পাষ- পিতা এই ফাঁকে ওদেরকে রেখে পালিয়ে আসে। ব্রাহ্মণ ফিরে আসে নিজ নিলয়ে। গঙ্গা-দূর্গার মাথা বাবার চরণ থেকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে। রাত গভীরে সিংহ ডেকে উঠলে ওদের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে দেখে রাজকুমার নেই, রাজকুমারের পঙ্খিরাজ নেই। ওদের কান্নায় বটগাছের ঘুম ভাঙে। গঙ্গা-দূর্গা বটবৃক্ষের দিকে তাকায়। বাবার কথা জিঙ্গাসা করে। বটবৃক্ষ নির্বাক। মৃদুল নির্বাক। মৃদুলের চোখ কেবলই ঝাপসা হতে থাকে। গঙ্গা মৃদুলের চোখের দিকে তাকায়, ইশারায় দূর্গাকে দেখায়। তারপর গঙ্গা-দূর্গা শব্দ করে হেসে উঠলে মৃদুল ভীষণ লজ্জা পেয়ে কেবলই সরে যেতে থাকে। সরতে সরতে আজকে কত শতাব্দী পথ দূরে সরে এসেছে তা মৃদুল আর মেলাতে পারে না।

মরা মাথাভাঙার ভাঙা পাড়ে বসে মৃদুলের চোখ শুধুই ঝাপসা হতে চায়। মাথার ভেতর গঙ্গা আর দূর্গার ছবিটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। খানিকপর যেন গঙ্গাকে ছুঁয়ে দেয় মৃদুল। মৃদুল বুঝতে পারে না কত যুগ ধরে সে এখানে বসে আছে। বসেই থাকে। আরো দূরে মাথাভাঙার ওপারে বাবলা বন। শৈশবের সেই বাবলা বনের সবটুকুই এখন ইটের ভাটা। অনেক উঁচু লম্বা চিমনিটা দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরুচ্ছে। অন্ধকার আকাশটা আরো গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। মৃদুলের বুকের ভেতরটাতে যেন আকাশের সবগুলো অন্ধকার আর সবগুলো কালোধোঁয়া ঢুকতে শুরু করেছে। মৃদুলের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। উঠে দাঁড়ায়। তারপর উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে থাকে।

সামনেই স্লুইস গেইট। দুটো বিশাল শকুনরূপী হেলিকপ্টার যখন নেমে এসেছিলো এখানটায় তখন মানুষের ঢেউ কেবলই গর্জন করে উঠেছিলো আর হেলিকপ্টার দুটো ফিরে যাবার সময় চারিধারের সবুজ বাবলা বন যেন প্রতিবাদে দুলে উঠে কেবলি মাটির সাথে মিশে যেতে চেয়েছিলো। বিশাল জনসভা। শুভ্র উলের শাল শরীরে জড়িয়ে ওরা দেবলোক থেকে নেমে এসে চিৎকারে চিৎকারে জনস্রোতে ঢেউ জাগিয়ে দিয়ে আবার ফিরে গিয়েছিলো স্বর্গে। মৃদুল সেই স্রোতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলো। মথুরাপুরের পথ খুজতে খুজতে প্রতীমা বিসর্জনের ঘাটে গিয়ে বেশ খানিকটা রাত শুধু বসেই থাকলো। মৃদুল আজ আবারো সেই প্রতীমা বিসর্জনের ঘাটপাড়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। খানিকটা বসতে ইচ্ছে হয়। তারপর বসেই থাকে। ওপাড়ে শ্মশান। অন্ধকার। একটা কবরখেকো শেয়াল ডেকে ওঠে।

মড়ার হাড় সংগ্রহের জন্য সত্যিই একদিন মৃদুল শ্মশানে গেলো। সেটা ছিলো ঘোর অমাবস্যার রাত। কোনো অপদেবতা ওর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তখন ওর শরীরখানা ছিলো জাদুশক্তিতে টইটম্বুর। শিবু ডোমের কাছে ধরা পড়ে গিয়ে সব কিছু একেবারে প- হয়ে গেলো। শিবু ডোম ওকে চিনতে পেরে হা হা গলায় চিৎকার করে উঠলো। অথচ মৃদুলের একটা জাদুর হাড় অবশ্যই দরকার। এরপর শ্মশান ঘাটের সবগুলো হাড় হাড্ডি যাদুমন্ত্রে পাল্টে গেলো। সুযোগ সন্ধানী মানুষেরা এসে জাদুর হাড় হাড্ডিগুলো চুরি করলো। তারপর মথুরাপুরটাকে হাড়ের ছোঁয়ায় পাল্টে দিলো। মৃদুলের একটাও জাদুর হাড় নেই। ছিলো না কোনোদিন। মৃদুল সেই অমাবস্যাতে একটা বিশাল আক্রোশ নিয়ে ফিরে এসেছিলো দূর্গার কাছে। তারপর থেকে চারিধার শুধু জাদুকরেরা হাড় হাড্ডি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলো। জাদুর কাঠির ভয়ে মৃদুলের ঠাকুরদা ভেতরে ভেতরে দর্শনার রেলস্টেশন অতিক্রম করে ২৪ পরগণাতে পালিয়ে যাবার আয়োজন করতে থাকে। মৃদুল কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বিহারীপাড়ার ছেলেগুলো একদিন সন্ধ্যাপূজার সময় মৃদুলদের বাগানের সারসার একতলা দোতলা তিনতলা চারতলা পাঁচতলা এমনকি ছয়তলা কবুতরের বাসাগুলো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। নয়শত কবুতর ওদের বাপদাদার ভিটে ছেড়ে উড়াল দেয়। ওরা উড়তেই থাকে। তারপর থেকে আর একটাও সবুজ বৃক্ষ পেলো না দু’দ- বিশ্রাম নেবার জন্য।

তখনও স্কুল খোলা আছে। গলার ভেতর একটা আতঙ্ক নিয়ে স্কুলটা কেবলই ঝিম মেরে বসে থাকে। দুপুরের পর পরই স্কুল ছুটি হয়ে গেলে মৃদুল একদিন রেললাইনটা ধরে চলে গেলো সেই উড়ে যাওয়া ঝাঁকঝাঁক পায়রার খোঁজে। রেললাইন শেষ হয় না। মৃদুল কেবলই হাঁটতে থাকে। অনেক উঁচু রেললাইনটা থেকে মৃদুল এবারে নামতে শুরু করে। পাথর বাঁচিয়ে নামে। নেমে এসে রেললাইনের নিচ দিয়ে যে খোয়া বিছানো রাস্তাটা চলে গেছে, সেই টানেলের ভেতর ঢুকে গুমগুম শব্দে শিহরিত হয়। টানেলের ওপর রেলপথ। টানেলের ওপর একটা তরতাজা লোহালক্করের লালরেলগাড়ি ছুটে যাচ্ছে। মৃদুল চোখ বন্ধ করে। মাথার ভেতর রেলগাড়িটা একটা যান্ত্রিক ঝড় তুলে কেবলই ধেয়ে আসতে থাকে। মৃদুল যেন বা খানিকটা ভয় পায়। রেললাইনের সুরঙ্গটা হয়তো এখনই মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। মৃদুল দ্রুত টানেলের নিচ থেকে আকাশের নিচে বের হয়ে আসে।

ঘোষপাড়ার কাছাকাছি আসার পর ক্যানেলের পাড় ঘেঁষে হাঁটতে থাকে মৃদুল। ভেসে আসে ঝাঁকঝাঁক নূপুরের শব্দ। মাথার ওপর, অনেক ওপরে হালকা নীল আকাশে মৃদুলদের নয়শ কবুতর ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। ওদের কারো কারো পায়ে মৃদুল নূপুর বেঁধে ছেড়ে দিয়েছে। মৃদুলের কেনো যেনো মনে হলো, পায়রাগুলোকে এখন আর শিকল দিয়েও কাছে রাখা সম্ভব না। মৃদুল আকাশের শূন্যতায় ভাসতে থাকা কবুতরের ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা চলে যাচ্ছে। সীমানা পাড়ি দিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ভাসতে থাকা রিফিউজির মতো। মৃদুল জানে না কী সেই সীমানা আর কতদূরই বা সেই সীমানা। মৃদুলের চোখে চন্দ্রবিন্দু ফোটায় জল ভেসে ওঠে। তারপর খুব সংগোপনে সেই জল গড়িয়ে নামে। মথুরাপুরের কেউ সেদিন সেই জল দেখতে পায়নি।

কুমারপাড়াটা উঠে গেছে। এখন মাত্র দুঘর আছে ওরা। মৃদুল কুমার পাড়াটাকে প্রথমে চিনতে পারলো না। তারপর ননী খুড়োকে দেখে বুকের ভেতরটায় কেমন যেন হা হা করে উঠলো। ননী খুড়ো মৃদুলকে চিনলো না। মাটির দলা মাখাচ্ছে দুহাতে। মৃদুল পাড়াময় সারিসারি শুকোতে দেওয়া ফুলের টব, কলস, হাড়ি, সানকি, পয়সা রাখার ব্যাংক দেখার জন্য কেবলি ঘুরে ঘুরে তাকাতে থাকে। না সব কিছু কী এক অদৃশ্য মায়াবলে উবে গেছে। শিবানীর কথা মনে পড়লো। মেয়েটা প্রায়ই ওদের বাড়িতে যেত। মৃদুলের মার সাথে সারাদিন টুকিটাকি কাজ শেষে আবার কুমারপাড়ায় ফিরে আসতো শিবানী। শিবানীদের ঘরদুটো ঠিক কোন জায়গায় ছিলো মৃদুল বুঝে উঠতে পারে না। মৃদুল ধীরে ধীরে ননী খুড়োর কাছে গিয়ে বসলো। ননী খুড়োর ঘষা খাওয়া ঝাপসা চোখ একবার মৃদুলের দিকে তাকিয়ে আবার মাটি ছেনার কাজে মন দেয়। ননী খুড়ো সত্যি সত্যি মৃদুলকে চিনতে পারলো না।

মৃদুল কেবলই ফিরে যেতে থাকে। ফিরতে ফিরতে একেবারে ননী খুড়োর সাথে আরো কতটা বছর পিছে ফিরে গেল সে হিসেব আজ অর্থহীন। ননী খুড়োর সাথে হাঁটছে মৃদুল। খুড়োর দুটো ভার ভর্তি মাটির পুতুল, পয়সা রাখার ব্যাংক, ছোটবড় ঠাকুরমূর্তি, গণেশ, গরুর পাখির ডানামেলা ভীষণ চেহারা। ননী খুড়োর সাথে মৃদুল বসে আছে রথের মেলায়। ননী খুড়ো মৃদুলকে বসিয়ে রেখে মেলার ভেতরে হারিয়ে গেল। মৃদুলকে সবাই পুতুলের দাম জিঙ্গেস করছে। মৃদুল লজ্জায় কথা বলতে পারে না। কীভাবে যেনো দশ পয়সায় একটা মাটির দোয়েল বিক্রি করে ননী খুড়োর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে মৃদুল। মেজো কাকা ওকে দেখে ফেলে। ওকে টানতে টানতে মেলার দক্ষিণ মাথায় নিয়ে নাগরদোলাতে বসিয়ে দেয়। নাগরদোলা ঘুরছে আর ক্রমাগত পৃথিবীটা ওলটপালট হচ্ছে। ক্রমশ সবকিছু অপরিচিত। তলপেটের নিচে সুরসুরি। পেশাবের বেগ পাচ্ছে। চরকিটা ক্রমাগত ঘুড়েই চলেছে। চরকির প্রতিটি বাক্সে বসা ছেলেমেয়েরা সবাই চিৎকার করে হাসছে। মৃদুল যেনো বা খানিকটা কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছে। এবারের চক্করে মৃদুল আর পেশাব ধরে রাখতে পারলো না। এখনি কেঁদে ফেলবে। ধীরে ধীরে নাগরদোলার গতি কমে আসছে। মৃদুল ননী খুড়োর পাখি বেঁচা দশটা পয়সা চরকির চক্করে হাড়িয়ে ফেললো। ভেজা প্যান্ট নিয়ে নেমে এসে মৃদুল দৌড়াতে থাকলো। কেবলই দৌড়াতে থাকলো। সবাই বুঝে ওঠার আগেই ওকে সবার চোখের আড়ালে চলে যেতে হবে। সেই থেকে মৃদুল যেনো সারাটা জীবন কেবলই আড়াল হতে থাকে।

মৃদুল আর কোনোদিনই ননী খুড়োকে সেই হারিয়ে ফেলা পয়সার কথা বলতে পারেনি। আজ এতদিন পর মৃদুলের ভেতর সেই পয়সা হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা যেন নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করেছে। একটা অপরাধবোধ, এত বছর পর আবারো যেনো সেই অপরাধবোধ ওর সমস্ত দেহজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। মৃদুলের দেহের সমস্ত আলো যেনো কেবলই ম্লান হতে থাকে। ননী খুড়োকে একবার ডাকলো। খুড়ো শুনতে পেলো না। একটা কুকুর ননী খুড়োর দিকে মুখ করে লেজ গুটিয়ে বসে আছে। কেন যেন মৃদুলের নিজেকে ওই ময়লা নেরিকুত্তাটার মতো মনে হলো। এই ঠাকুরদার মাটি, এই গোটা মথুরাপুরের ওপর মৃদুলের কোনো অধিকার নেই। মাথাভাঙার মরা জলে শামুকেরা পিঠ শুকোয়, মৃদুলের কোনো অধিকার নেই সেদিকে তাকানোর।

ঘা পচা কুত্তাটার মতো মৃদুল আস্তে আস্তে উঠে আসে। তারপর ফিরতে থাকে ফিরোজের বড়খালার বাসায়। অথচ ফিরোজরা মৃদুলের কেউ না। মথুরাপুরের কেউ না। তারপরও মুদুল ফিরোজকে পছন্দ করে। মৃদুলের সাথে ফিরোজের চেহারার কেমন যেনো একটা মিল আছে। তবে মৃদুলের মতো লম্বা নয়। চিকন নাকের সাথে গায়ের রঙ আর চোখের আবেদনটা কীভাবে যেনো বেশ মিলে যায় ওদের। ফিরোজের সাথে পরিচয় কলকাতায়। রিপন স্ট্রিটে থাকে ওরা। চার বন্ধু মিলে একটা দেড়খোপের ঘর নিয়েছে। ওখানে মুসলমানই বেশি। ফিরোজ নাটক নিয়ে পড়তে এসেছে। সিরাজ ফোকগান নিয়ে কাজ করছে। প্রণব ফাইন আর্টে তিনটা বছর পার করে দিয়েছে। আর ভবঘুরে কাজল সল্টলেকে ধরা খেয়েছে। বিয়ে করে ফেলেছে। তমা দাসকে অবশ্য দেখেছে মৃদুল; ভালো লাগেনি। বর্ধমানের অ-ালে ওদের আদি বাস। তমালিকা দাসকে ভালো না লাগলেও ওদেরকে মৃদুল অস্বীকার করতে পারে না। অথচ ওরা একজনও মৃদুলের স্কুল জীবনের কেউ না। মথুরাপুরের কেউ না। সেই ফেলে আসা বালকবেলায়, আলমডাঙ্গার আকাশ ওরা দেখেনি। যদিও ফিরোজের দাদার বাড়ি কুষ্টিয়ার দামুরহুদায়। আলমডাঙ্গায় ওর বড় খালা চাকরি করে। ফিরোজ আলমডাঙ্গাতে অনেকবার গিয়েছে। মথুরাপুরের কথা সে শোনেনি। থানা থেকে যার দূরত্ব মাত্র আড়াই কি তিন মাইল হবে। তারপরও ভূতগ্রস্তের মতো ফিরোজের সাথে লেগে থাকে মৃদুল। কেবলই মনে হতে থাকে ওর শরীরে আলমডাঙ্গার গন্ধ লেগে আছে। মাথাভাঙার জলে ফিরোজ স্নান করেছে। ফিরোজের ভেতরে যেনো কেবলই সেই সোনাপট্টি, রাণীর গলি, কেশবপুর, কেষ্টপুর, মথুরাপুর অথবা রায়বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবি দেখতে পায় মৃদুল। ছবি দেখতে দেখতে তারপর মথুরাপুরের সেই ভয়ানক ঘটনাটা, যা ভুলবার জন্য ঠাকুরদাকে স্বর্গে যেতে হয়েছিলো, সেই ঘটনারও দশটা বছর পর আবার আলমডাঙ্গার মাটিতে পা রাখলো মৃদুল।

আলমডাঙ্গার বটতলাটাকে প্রথমে চিনতে পারলো না মৃদুল। এখন আর বটতলাকে ঘিরে বাজার বসে না। বাঁশের কাজ করতো যারা তাদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেলো না। বাঁশের কুলো, ডালা, ঝাকা, চাটাই আর পাখি রাখা খাঁচা, না কিছুই দরকার হয় না এখনকার মানুষের। ওরা থাকতো চাটাইয়ের নিচে ছোটছোট খুপড়ির ভেতর। লাল রঙে ওদের মুখ হাত যেন সব সময় কথা বলতো। সেই রঙ দিয়ে ওরা সাজাতো ওদের হাতের তৈরি বাঁশের তৈজসপত্র। কাঁচা বাঁশের চিকন চিকন ছিলানো বাতার ওপর থাকতো লাল টকটকে রঙ আর গভীর সবুজ রঙ। ওদের মধ্যে সাত আট জনের একটা দল ছিলো। ওরা সরু সরু বাঁশের আগায় একের পর এক বাঁশ লাগিয়ে, সেই প্রায় বিশ ত্রিশ হাত লম্বা জোড়া দেওয়া বাঁশের আগায় যে আঠা লেগে থাকতো তা দিয়ে টিয়ে পাখি ধরতো। রঙহীন কাঁচা বাঁশের খাঁচায় সবুজ পাখিগুলো কেবলি চেঁচাতো। ওদের সাথে একবার সারাদিন মৃদুল টিয়ে ধরার নেশায় হারিয়েছিলো। ওকে একটা খাঁচাসহ টিয়ে দিয়েছিলো ওরা। আজ এত বছর পর যেনো সেই সবুজ টিয়ে খুঁজতে শুরু করেছে মৃদুল। কেবলই খুঁজতে থাকে। কোথাও টিয়ে নেই, চারিধার শুধুই মানুষ।

ঝাঁকড়া বট গাছটা হালকা আর ধূসর হয়ে এসেছে। মৃদুলের বুকে কারা যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। এখনই হয়তো খুব পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে যাবে। পাবে, পরিচিত কাউকে পাবে এখনই। একটা লক্করমার্কা বাস এসে থামলো। বাসটা চুয়াডাঙ্গার দিকে যাবে। মৃদুল কিছুই মেলাতে পারছে না। একটু পর বুঝতে পারলো ওর ঠাকুরদার আমলে এই রাস্তায় মটর চলতো না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো, খোয়া বিছানো রাস্তাটা এখন খানিকটা পাকা হয়েছে। কোথাও কোনো গরুর গাড়ি অথবা ঘোড়ার গাড়ির বিশাল বিশাল চাকার দাগ নেই। মুদুলের ভেতরটা সেই পুরোনো দাগগুলো ফিরে পাবার জন্য কেবলই শুকিয়ে যেতে থাকলো।

রায়বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়টাকে খুঁজে পাচ্ছে না মৃদুল। টিনের ঘরের চালগুলো খুলে নিয়ে গিয়েছে। মেঝেটা জুড়ে উঁয়ের ঢিবি। সামনের হলুদ দালানটা মৃদুলের প্রাথমিক বিদ্যালয়টাকে আড়াল করেছে। কেনো যেনো ওরা সব কিছু¦ই ঢাকতে চায়। কোনো চিহ্নই রাখতে চায় না। ফিরোজের হাত চেপে ধরে মৃদুল। ভেতরটা ভারি হয়ে আসে। জল খেতে চায়। সোনাপট্টির পেছনের সারিতে যেখানে মারোয়াড়ি পট্টি ছিলো সে জায়গাটা তেমনি আছে। পুরোনো বিশাল বিশাল দালানের কুঠুরিতে এখনো বেচাকেনা চলছে। মানুষের শোরগোল সবই আছে অথচ প্রতিটা মানুষ অচেনা। প্যাঙ্গাদের তিনতলা মন্দিরের মতো বাড়িটা চিনতে কষ্ট হলো না। প্যাঙ্গাকে বেশ কয়েকবার মৃদুল নিজেদের খোপ থেকে পাহাড়ি কবুতর চুরি করে এনে দিয়েছে। প্রতিবারই কবুতরগুলো উড়ে উড়ে মৃদুলদের বাড়ি চলে যেতো।

মৃদুল স্টেশনের পেছনে মেথর পট্টিটাকে ঠিকই চিনতে পারলো। সব ঠিক আছে। মেথরপট্টিগুলো সহসা বদলায় না। মেথরপট্টির পর শুরু হয়েছে রেলওয়ে কলোনি। কলোনিটা ডানে রেখে মৃদুল বিহারীপাড়াতে ঢুকলো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কোনোকিছু না ভেবেই নুসরাতদের বাড়িটা খুঁজে বের করলো। নুসরাতের মামা সাইকেল নিয়ে স্টেশনের দিকে চলে গেলো। বিহারীপট্টির প্রায় সবাই রেলওয়েতে চাকরি করে। দেলোয়ার মামা তখন লাইনম্যান ছিলো। এখন কী অবস্থা মৃদুল জানে না। শুধু জানে দেলোয়ার মামাকে সে ভয় পায়। দেলোয়ার মামা হয়তো ওকে চিনে ফেলবে। বুকের ভেতর একটা ধক্ধক্ শব্দ হচ্ছে। মাথার মধ্যে সেই শালা মালাউনের বাচ্চা আওয়াজটা এত বছর পরও আবার কামড়াতে শুরু করেছে। মৃদুল দ্রুত ফিরে আসতে থাকে পেছনে। আরো পেছনে, যেখানে ভিটে হারানোর শব্দ কেবলই গর্জে ওঠে। মৃদুল কি সবকিছু মুছে ফেলতে চায়!

আলমডাঙ্গা গার্লস হাইস্কুল। পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত ছেলেমেয়ে একসাথে। নুসরাতের সাথে পাঁচ ক্লাশ পর্যন্ত মৃদুলও একসাথেই পড়েছে। নুসরাতের খালা মৃদুলকে নিজের ছেলে বানিয়েছিলো। মৃদুলের শৈশব বেড়ে ওঠে পাখিদের ভালোবাসায়। পাখিরা গান গায়। মৃদুলের গলায় গান ফুটতে চায় না। কোনো এক হেমন্তের রাতে নুসরাতদের দালানবাড়ির উঠোনে কাওয়ালির আসর বসে। মৃদুল প্রথমে দূর্গাপিসির কোল ঘেঁষে বসলেও কোনো এক ফাঁকে ফিরে গিয়েছিলো নুসরাতের খালার কাছে, নুসরাতের কাছে। একদিন স্কুলে নুসরাত টিফিনে ছুটি নেয়। উর্মিলা আপা মৃদুলের সাথে নুসরাতকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো। মৃদুল বুঝতে পারে না নুসরাত কেনো ছুটি নিলো। ওর নাকি তলপেটে ব্যথা। নুসরাত মুখ টিপে হাসছে। মৃদুল বেটাছেলে। বেটাছেলেদের নাকি ওসব পেটব্যথার কথা শুনতে নেই। মৃদুল মনে মনে ঠিক করে, রাতে দূর্গাপিসির কাছে সে ঠিকই শুনে নেবে, মেয়েদের তলপেটে ব্যথা হলে ছেলেদের তা শোনা নিষেধ কেন।

নুসরাত মৃদুলের হাতটা ঠেসে ধরে, মৃদুল হেসে ফেলে। অনেক জল্পনা কল্পনার পর দুপুরে যখন ওরা প্যাঙ্গাদের বাড়ি পৌঁছলো তখনও প্যাঙ্গা স্কুল থেকে ফেরেনি। প্যাঙ্গা ওদের থেকে দুই ক্লাশ ওপরে, গোপালকৃষ্ণ হাইস্কুলে পড়ে। প্যাঙ্গার দিদি ওদেরকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘটি ভরে জল এনে দেয়। প্যাঙ্গারা মারোয়াড়িদের মধ্যে নামকরা কাপড়ের ব্যবসায়ি। প্যাঙ্গা স্কুল থেকে ফিরে এলে বারান্দায় মাদুর পেতে ওরা খেতে বসলো। খাওয়া শেষে চিলেকোঠায় গিয়ে সাপলুডু খেলার আয়োজনে মেতে ওঠে। প্যাঙ্গাকে বারবার সাপে কাটতে থাকলে প্যাঙ্গা বিরক্ত হয়ে সব গুটি এলোমেলো করে দেয়। তারপর মৃদুলদেরকে ওর পায়রাগুলোকে দেখাতে থাকে। প্যাঙ্গার খুব দুঃখ, ওর মাত্র পাঁচ জোড়া কবুতর। তবে একজোড়া চোখ নাফোটা বাচ্চাও আছে। বাচ্চা জোড়া চিঁ চিঁ শব্দে ছোট ছোট পশম না ওঠা ডানাজোড়া নাড়াচ্ছে। ওর মা এসে বাচ্চাটার ঠোঁটের মধ্যে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়ে দানা উগলে দিলো। বাবা পায়রাটা দুহাত দূরে কেবলি বাকবাকুম ডাকে পড়ন্ত দুপুরকে কাঁপাতে থাকলো। নিচ থেকে ভেসে আসছে তবলা হারমনিয়াম আর নুপূরের ঝাঁকবাঁধা আওয়াজ। পড়ন্ত দুপুরটা যেনো একটা জীবন্ত স্টিমারের মতো কেবলই দুলে দুলে ওঠে।

দলটার মধ্যে বেটাছেলের মতো দুজন তবলায় তাল দিচ্ছে আর ঘাগড়া পড়া শ্যামলা মেয়েটা হারমনিয়ামের সামনে বসে কেবলই দুলে দুলে হারমনিয়ামের বাজনার চেয়ে আরো খানিকটা উচ্চস্বরে হিন্দি গান গাইছে। মৃদুল বুঝে উঠতে পারে না, হয়তো বা এই ধরনের গানকেই কাওয়ালি বলে, গজলও হতে পারে। মৃদুলকে ওরা যেনো জাদু করতে শুরু করেছে। ওদের বিচিত্র পোশাক দেখে মৃদুলের কেবলই মনে হতে থাকলো এরা ঠিক ছিনেমা থেকে এসেছে। যে মেয়ে দুটি নাচছে ওদের বুকের বাউজ সোনালি আর রূপালি রঙে জ্বলে জ্বলে উঠছে। মেয়েটা কোমর বাঁকাতে বাঁকাতে মেঝেতে শুয়ে মাজা দোলাতে লাগলো। মৃদুলের চোখ লজ্জায় লাল হয়ে এলো। তারপর গানের সুরটা আরেকটু চড়ে যেতেই মৃদুলের একেবারে সামনে এসে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ে বুকজোড়াকে দ্রুত উঠানামা করাতে শুরু করলো। নুসরাত লজ্জায় মৃদুলের হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গিয়ে প্যাঙ্গার ছোটবোন বীণার আড়াল নিলো।

বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। হিজরাদের নাচ গান যেনো আরো ঘন আরো জোরালো হয়ে উঠতে থাকলো। মৃদুলের পিঠে নুসরাত প্রথমে ধাক্কা দিলো, তারপর জামা ধরে একটা টান দিতেই মৃদুল চোখ ভর্তি হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকালো। মৃদুলের একটা হাত ধরে কাউকে কিছু না বলেই নুসরাত রাস্তায় এসে রিক্সায় চেপে বসলো। দেরি হওয়ার জন্য ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেছে মেয়েটা। ওর হাত ঘামছে। নুসরাতের হাতটা আমি আমার মুঠোয় নিয়ে বসে থাকলাম। রিক্সাটা খুব আস্তে আস্তে যাচ্ছে। নুসরাত ফিসফিস করে বললো, রিক্সাআলাটাও বিহারীপাড়ায় থাকে। আমি চমকে উঠলাম। ওর মামাকে যদি বলে দেয়, স্কুল পালিয়ে নুসরাত সারাদিন আমার সাথে ছিলো। আমার ভেতরটা কেবলই মোচরাতে থাকলো। নুসরাত আমার জন্য আজ বকা খাবে। ওর মা বেশ বদমেজাজি। গায়েও হাত তুলতে পারে। মৃদুল আরো জোরে নুসরাতের হাত চেপে ধরতেই নুসরাত স্টেশনের মোড়ে মৃদুলকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। মৃদুল অনেকটা সময় ওর চলে যাওয়ার দিকে, ওর রিক্সার পেছনটায় তাকিয়ে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে কদম গাছটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বানর খেলা দেখতে শুরু করলো।

বড় বানরটা জামাই সেজেছে। রাগ করে শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছে। ওর বউ গালে হাত দিয়ে কেবলি কাঁদছে। মৃদুল ঠাই তাকিয়ে থাকলেও ওর মনটা আর ভালো হলো না। আজকে স্কুলে বিলাতি দুধ দেওয়ার কথা ছিলো। শেষ পিরিয়ড পর্যন্ত স্কুলে থাকলে পাওয়া যেতো। বানর খেলা দেখাচ্ছে যে বুড়োটা ওকে বিলেতি দুধগুলো দেওয়া যেতো। বানরকে খাওয়াতে পারতো। পরমুহূর্তেই মৃদুলের সন্দেহ হলো, বানর কি বিলেতি দুধ খায়? তারপর চারিদিকে তাকিয়ে প্রতিটি মানুষকে মৃদুলের কাছে কেবলই বানরের মতো বলে মনে হতে লাগলো। হঠাৎই বড় বানরটা ওর লাল টকটকে পাছাটা নাচিয়ে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে একটা ভেংচি কাটলো। মৃদুলের দিকে তাকিয়ে ভিড়ের সমস্ত বানরমুখি মানুষগুলো উচ্চস্বরে হেসে উঠলে মৃদুল লজ্জায় ভিড় ঠেলে বাইরে চলে এলো। ওর কেবলি মনে হতে লাগলো ওকে কেউ পছন্দ করে না। পৃথিবীর সবাই ওকে নিয়ে কেবলই হাসাহাসি করছে। মৃদুলের নিজেকে ভয়ানক একা মনে হয়।

কালিমন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় মৃদুল মেজোকাকার কাছে ধরা পড়ে গেলো। মেজোকাকা ওর হাতের বই খাতার দিকে তাকিয়ে কিছু বললো না; ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা; মৃদুলকে শিগ্রি বাড়ি যেতে বলে বাজারের দিকে চলে গেলো। মৃদুল দেখলো বড় রাস্তার ওপর মানুষের ঢেউ এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারে না মৃদুল। তাকিয়ে থাকে। তারপর লম্বা মাঝারি তলোয়ার আর তেল চকচকে লাঠি হাতে জিন্নাহ টুপি মাথায় ২০/২৫ জনের একটা দলকে উত্তমদের দোকানের গলিটার মধ্যে ঢুকে যেতে দেখলো। ওদের মধ্যে মনে হলো দেলোয়ার মামাও আছে। নুসরাতের মামার হাতে ন্যাংটা একটা লম্বা রামদা কেবলই আকাশের শূন্যতায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।

বাজারের দিক থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। ভয়ানক শোরগোল। রাম মন্দিরটা থেকে অনেকগুলো ঘণ্টা একত্রে একটা আতঙ্ক নিয়ে বেজে উঠলো। গঙ্গাদের পাড়া থেকে শঙ্খধ্বনির আওয়াজগুলো ভয়ে ভয়ে দু’একবার বেজে আবার একটানা চিৎকার করে উঠতে লাগলো। মৃদুল প্রথমে বাজারের দিকে হাঁটা শুরু করলেও কী একটা ভয়ানক আতঙ্কে দ্রুত বাড়িতে ফিরে এলো। বাড়ি ফিরে দেখলো দূর্গাপিসি ঠাকুরদার মাথায় জল ঢালছে। ঠাকুরদাকে ঘিরে ভিড়। তারাপিসির সাথে কাকিমাও কি সব বকে যাচ্ছে আর সুর করে কেঁদে উঠছে। দিদিমা গবর লেপা তুলসি গাছটার নিচে উপুড় হয়ে রামনাম জপতে জপতে ভগবানের কাছে কেবলই নালিশ জানাতে থাকে। দূর্গার মুখটা থমথমে। উঠোন জুড়ে ভিড়। মৃদুলের শরীরে একটা অপরিচিত ভয়ের শিহরণ বয়ে যায়।

অনেক রাতে যখন গোটা মথুরাপুর একটা আতঙ্কে কেবলি ঝিমোচ্ছে তখন মৃদুল দূর্গার কোলের মধ্যে কেবলি গুটিয়ে যেতে থাকে। মৃদুলের কাছে মনে হলো ওর দূর্গাপিসি যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মৃদুল ওর দূর্গাপিসিকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো। মৃদুল বুঝতে পারলো ওর ঠাকুরদার গদিঘর লুট হওয়ার ঘটনাটার সাথে একটা ভয়ানক কিছু জড়িয়ে আছে; সেই ভয়ানক কিছুর জন্যই ওদের বাড়িতে আজ রাতে রান্না হয়নি। ওরা কেউ যেনো আর কোনোদিন ঘুমোবে না; সবাই কী এক আতঙ্কে চুপচাপ শুধু শুয়েই থাকবে। মৃদুল দূর্গাপিসির চোখের নিচে জমে ওঠা জল মুছিয়ে দিতে গিয়ে নিজেও ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো। দূর্গা মৃদুলকে বুকের আরো গভীরে টেনে নিলো।

পরদিন সকালে মৃদুল নুসরাতের খবর নিতে গেলো। মৃদুলের কেবলই মনে হতে থাকে, ডাকাতগুলো নিশ্চয়ই নুসরাতদের বাড়িতেও হামলা করেছিলো। রাতে কী এক গোপন লজ্জায় মৃদুল দূর্গাপিসিকে তা বলতে পারেনি। বিহারীপাড়াতে ঢুকতেই তিন চারজনের একটা দল এগিয়ে এসে ওর পথ আগলে দাঁড়ালো। ছেলেগুলোর কেবলই গোফ উঠতে শুরু করেছে। ওদের মধ্যে একজনকে মৃদুল চিনতে পারলো। ফরহাদ ভাই। নুসরাতের মেজো ভাই। ওরা প্রথমে গলা ফাটিয়ে মালাউনের বাচ্চা বলে গালি দিলো। তারপর মৃদুলের কলার চেপে ধরে খুব জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিলো। আশেপাশের সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলে মৃদুল ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে বেকুব বনে যায়। ফরহাদের দিকে তাকিয়ে মৃদুলের চোখে অবিশ্বাস, তারপর ফরহাদের চেহারাটা ক্রমশ ওর কাছে অপরিচিত হতে থাকলে মৃদুল আর বিহারীপাড়ায় ঢুকতে সাহস পায় না। দ্রুত স্টেশনের দিকে ফিরে যায়। একটা লাল মেল ট্রেন ভয়ানক শোরগোল তুলে স্টেশনের ভেতর ঢুকে পড়লো। মৃদুলের মনে হলো গোটা ট্রেনটা যেনো ওর বুকের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে।

সমস্ত স্টেশন জুড়ে মানুষের হলা। মৃদুল এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানুষ দেখছে; মানুষের ভিড় দেখছে, ট্রেন দেখছে। মানুষগুলোকে আবারো গতকালের সেই বানরের মতো মনে হলো ওর কাছে। প্রতিটি বানর কুতকুতে চোখে কেবল ওকেই দেখছে। মৃদুলের চোখের নিচটা ভয়ে কালো হতে শুরু করেছে। মৃদুল দ্রুত সরে যেতে যেতে সারসার ঘোড়ার গাড়ির কাছে এসে অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর অনেকগুলো রেললাইন যেখানে জোড়ায় জোড়ায় এসে মিলেমিশে এলোমেলো চলে গেছে আরো খানিকটা দূরে রেলস্টেশনের গোডাউন বরাবর, সেই গোডাউন বরাবর হাঁটতে হাঁটতে একেবারে গোডাউনের গোড়াতে চলে এসে অনেক অনেক উঁচুতে গোডাউনের চালের দিকে তাকালো। চালের নিচে অনেকগুলো বাঁশের ঝাকা সারসার বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেখানে জালালি কবুতরেরা বাস করে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। মৃদুল তাকিয়ে থাকে। জালালি কবুতরেরা ওর দিকে তাকিয়ে শুধুই ডাকতে থাকে। মৃদুলের কাছে মনে হলো কবুতরগুলো বেশ নিরাপদে আছে। অথচ নিজেকে আজ এই বালক বয়সেই ভীষণ অরক্ষিত বলে বোধ হলো মৃদুলের। হঠাৎই টর্চ হাতে একটা খাকি হাফপ্যান্ট পড়া লোক মৃদুলকে সতর্ক করে দিয়ে আরো খানিকটা ভয় পাইয়ে দিলো।

মৃদুলের ভেতর আতঙ্ক। মৃদুল উত্তমদের দোকানে গিয়ে অযথাই বসে থাকে। উত্তমের কাছে জানতে পারে রেলকলোনির পাশের বস্তিতে নোটন ঘোষের মেয়েকে স্টেশনের গোডাউনের ভেতর ন্যাংটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তখনো নাকি ওর দেহে কাঁপুনি ছিলো। উত্তম ধর্ষণ শব্দটার অর্থ বোঝানোর জন্য নানা তালবাহানা শুরু করলেও মৃদুলের কাছে কিছুই পরিষ্কার হলো না। বরং মৃদুল কল্পনায় দেখতে পেলো নুসরাত সেই বিশাল গোডাউনের ভেতর দিয়ে কেবলই ছুটছে আর চিৎকার করে মৃদুলকে ডাকছে। পরমুহূর্তে নুসরাতের মামার ছবিটা ভেসে উঠতেই নুসরাতের ছবিটা হারিয়ে ফেললো মৃদুল। রাতে যখন মৃদুল দূর্গার সাথে ঘুমাতে গেলো তখন জানতে চাইলো ধর্ষণ কথাটার মানে কী। দূর্গা ভয় চোখে তাকায়, তারপর মৃদুলের মুখ চেপে ধরে বলে ওঠে, আর কক্ষোনো এমন কথা বলবি না। কক্ষেনো না, কোনোদিন না।

মৃদুলের সাত দিনের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। ওর ঠাকুরদার দেশে আর মাত্র তিনদিন থাকতে পারবে। মথুরাপুর যাবার জন্য ওরা রিক্সার খোঁজ করলো। আশ্চর্য একজনও মথুরাপুর চিনতে পারলো না। মৃদুল উত্তেজিত কণ্ঠে বোঝাতে থাকে, কাশিয়াডাঙ্গা পাবার আগে শেখপাড়া তারই আগের পাড়াটার নাম মথুরাপুর। রিক্সাআলা জানালো, ওখানে কোনো মথুরাপুর নাই। জায়গাটার নাম হজরতপুর। ফিরোজ শেষ পর্যন্ত হজরতপুরেই নিয়ে যেতে বললো। মৃদুলের মেজাজটা প্রথমে খারাপ হলেও রিক্সায় ওঠার পর থেকে ভেতরে ভেতরে কেমন যেনো একটা কাঁপুনি বোধ করছে। শরীরটা একটু যেন গরম গরম লাগছে। দুদিন আলমডাঙ্গাতে কাটলো। আলমডাঙ্গার কেউ ওকে চিনতে পারেনি। ওর কাছে কিছু কিছু মুখকে পরিচিত মনে হলেও শেষ পর্যন্ত কিছুই আর মিলিয়ে নিতে পারেনি মৃদুল। রায়বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নরেন স্যারকে ওর বাবার নাম বলার পরও যখন তিনি মৃদুলকে চিনতে পারলেন না তখন ফিরোজ ওর ঠাকুরদার নাম বলাতে চিনলেন। অথচ কোথায় সেই আবেগ, কেমন যেনো পুরোনো মানুষগুলোও সব বদলে গিয়েছে। মৃদুলের কেবলই মনে হতে থাকলো নরেন স্যারকে জড়িয়ে ধরবে। উপুড় হয়ে পায়ের ধুলো নেবে কিন্তু না শেষ পর্যন্ত কিছুই করে উঠতে পারে না মৃদুল। বরং হঠাৎই স্যারকে কেমন যেনো অপরিচিত বলে মনে হয়। নরেন স্যারও কেমন অচেনা গলায় পান চিবুতে চিবুতে চশমা চোখে শেষ্মা গলায় বলতে শুরু করলেন, আজ সাত দিন হলো ব্লাড যাচ্ছে, পাইলসের ব্যথাটা আবার চাগা দিয়ে উঠেছে।

মৃদুলের কাছে কেন যেনো মনে হলো পুরো আলমডাঙ্গার পায়ুপথ দিয়েই যেন ব্লাড যাচ্ছে, দুর্গন্ধ, রক্ত পুঁজে মাখামাখি একাকার।

মৃদুল গার্লস স্কুলে ঢুকতে পারেনি। কেননা মৃদুল এখন যুবক হয়েছে। কাবেরী আপার কথা কেউ বলতে পারলো না। মোসলেহউদ্দিন স্যার রিটায়ার করেছেন। যিনি তার বউকে ঘরে তালা দিয়ে স্কুলে আসতেন। তারপর ক্লাস নাইনের রিতাদিকে ছুটির শেষে প্রাইভেট পড়াবার সময় কী একটা গোলযোগ হয়েছিলো। মৃদুল তখন বুঝতে না পারলেও এত বছর পর ঠিকই বুঝতে পারলো, আসলে সমস্যাটা কী ছিলো। স্যারের বাড়ি তখন ছিলো বারাদি ফার্মের পিছে।

রিক্সা স্টেশনের মোড় পার হতেই একটা ফ্রক পড়া মেয়েকে দেখে চমকে উঠলো মৃদুল। মাথার ভেতর ঘুমিয়ে পড়া ছবিগুলোর যেনো ঘুম ভাঙে। হ্যাঁ একটা মেয়ে ছিলো। চোখ জোড়া বড় বড়। চোখে সব সময় পানি জমে থাকতো। মৃদুল মেয়েটার জন্য একটা কিছু করতে চেয়েছিলো। মেয়েটা কথা দিয়েছিলো আর ভিক্ষে করবে না। প্রতিদিনই মৃদুলদের বাড়িতে আসতে শুরু করেছিলো। তারপর আসা বাদ দিলো। মৃদুল অনেক দিন মনে মনে বাজারে রাস্তাঘাটে বস্তিতে রেলস্টেশনে ওকে খুঁজেছে। পায়নি। ফিরোজের কাছে মেয়েটির কথা, নিজের অনুভূতির কথা খুটিয়ে খুটিয়ে বলার পর ফিরোজ ফ্রয়েডের তত্ত্ব দিয়ে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করাতে মৃদুল ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলো। আসলে ওকে কেউ সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারে না। আশেপাশের প্রতিটি প্রিয়জনই খুব বেশি মাত্রায় প্র্যাকটিক্যাল। মৃদুল এতদিন পর বুঝতে পারে, মেয়েটিকে ভালোলাগার কোনো একটা কারণ হয়তো ছিলো। মেয়েটার ভেতর কী একটা মায়া জড়ানো বিষয় ছিলো। মৃদুল চোখ বুজে থাকে। এরপর একসময় চোখ খুলতেই রিক্সার ওপর থেকে দেখতে পায়, চোখের সামনে তাকিয়ে আছে একটা মাঝারি গোছের সাইনবোর্ড। হজরতপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসার পাশে শুয়ে আছে একটা মরা নদী। নদীর নাম মাথাভাঙা।

ফিরোজ পুকুরঘাটে গিয়ে ওজু বানায়। পুকুরটা ঠাকুদার আমলে ছিলো না। মৃদুল চ-ী মন্দিরটা খুঁজতে থাকে। হ্যাঁ এইতো শালবনের সারি। মাথাভাঙার তীর ঘেঁষে শালগাছগুলো যেন কেমন নিঃসঙ্গ। সবকিছু ফাঁকা ফাঁকা। মৃদুলের ভেতরে একটা বাস্তুসাপ কেবলই নড়েচড়ে ওঠে। মৃদুল ছোটকালে শুনেছিলো বাস্তুসাপেরা তাদের ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে পাহারা দেয়। মৃদুল যেন সেই বাস্তুসাপ খুঁজতে থাকে। মাদ্রাসার পাশে মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো। মাদ্রাসার বারান্দায় সার বেঁধে বালকেরা সুর করে পাকে কোরআন পাঠ করছে। তাবলিগ জামাতের একটা দল পাশের খোলা চত্বরে রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত।

মৃদুল মসজিদ পিছে ফেলে এগুতে থাকে। ভীষণ পুরোনো আর পুড়ে যাওয়া উঁচু সেকেলে মোটা মোটা পিলারের দালানগুলো চোখে পড়লো। একটা সাইনবোর্ড দেখা যাছে। হয়তো কোনো সরকারি অফিসের হবে। দূর থেকে মৃদুল পড়তে পারে না। সেই ভীষণ পুরোনো গাব গাছটা যেখানে ছিলো সেখানে শুধুই ঝোপঝাড়। রাধা-কৃষ্ণ আমলের সেই পাকন গাছটা এখনও আছে। মৃদুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাকন গাছটার দিকে এগিয়ে যায়। কোথাও কোনো সিঁদুরের চিহ্নমাত্র নেই। পাকন গাছের মোটা সেকেলে গোড়াটা, যেখানে মৃদুলের পিসিমারা প্রতিদিন সকালে সিঁদুর মাখিয়ে দিতো, সেই গোড়াটা কালো আলকাতরার রঙে কেবলই জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে যেতে চাইছে। আর পাকন গাছটার পেটের ওপর একটা জংধরা ছোট্ট টিনের গায়ে লেখা আছে, সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। এবং নিচের লাইনে মোটা কালো কালিতে লেখা, হজরতপুর এনিমি প্রপার্টি।

মৃদুলের চোখ কেবলই মথুরাপুর নামটা খুঁজতে থাকে; তারপর নামটাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে গঙ্গাদের আড়াইতলা দালান ঘরটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মন্দিরের মতো আড়াইতলাটাকে দেখে মনে হচ্ছে এখনি হাঁটুমুড়ে মাটিতে বসে পড়বে। আড়াইতলার মাজার সাথে একটা সাইনবোর্ড ঝুলানো। কী একটা ক্লাব ঘরের সাইনবোর্ড। মৃদুল প্রথমে সাইনবোর্ডটা পড়ার চেষ্টা করলেও কী ভেবে গঙ্গাদের বাড়ি থেকে চোখ নামিয়ে নিলো। একটা কালো কুকুর মৃদুলের দিকে তেড়ে এসে ঘেউ ঘেউ করতে থাকলো। মৃদুল পিছাচ্ছে। পিছুতে পিছুতে ফিরে আসে মসজিদ চত্বরে।

ফিরোজ মৃদুলকে রেখে মসজিদে ঢুকে যায়। মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুলের ভেতর চ-ী দেউলের ছবি ভেসে ওঠে। মৃদুল ফিরোজের পিছু পিছু মসজিদের মধ্যে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই মসজিদের ভেতরের ছবিগুলো পাল্টে যায়। মা চ-ী হাসছে। মৃদুলের দিকে তাকিয়ে একটা মায়া মায়া পরিচিত ঠোঁটে কী যেন বলছে। চারিধার ফুল। ঠাকুরদাকে খুঁজতে থাকে মৃদুল। ঘাড়ের ওপর দূর্গাপিসির ঘন নিঃশ্বাস মৃদুলকে যেনো কেবলই জাগিয়ে দিতে থাকে। মৃদুল খানিকটা অস্থির হয়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কিশোর মৃদুলকে কাতার সোজা করে দাঁড়াতে বলে। মৃদুল জানে না তাবলিগ জামাতের সাথে আসা এই কিশোরটি গতরাতে যখন ঘুমিয়ে ছিলো এই মসজিদের ভেতর, তখন তার জীবনের প্রথম রেতঃপাত ঘটে গেছে এই মসজিদেরই মেঝেতে।

মৃদুলের মাথার ভেতরে জেগে ওঠা চ-ী দেউলটা কেবলই ঝাপসা হতে থাকে। রেতঃপাত ঘটানো কিশোরটি আবারো কাতার সোজা করে দাঁড়াবার আহ্বান জানাতেই মৃদুল ধীরে ধীরে ওর ঠকুরদার চ-ী দেউল থেকে বের হয়ে এসে মরা মাথাভাঙার উঁচু ঢিবিটার ওপর গিয়ে বসে। সবকিছুই যেন মুহূর্তে পরিচিত হয়ে এলো। মৃদুল ওর ঠাকুরদার মথুরাপুরটাকে চিনতে পারলো। চিনতে পারলো বাস্তুসাপের পাহারায় থাকা সেই চ-ী দেউল। মনে হলো অনেক অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে উলুধ্বনি। মৃদুল দূর্গাপিসির কণ্ঠটাকে চেনার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। গলার ভেতরটা শুকিয়ে আসছে। মৃদুলের চোখের সামনেই যেন দেবী চ-ীর মুখ থেকে শুধুই রক্ত ঝরছে। থামতে চায় না সেই রক্তের প্লাবন। দেবীর হাতের ত্রিশুলটা ভীষণ রবে নড়ে উঠতেই মৃদুল উঠে দাঁড়ালো, আর তখন নরেন স্যারের মতো কেবলই মৃদুলের মনে হতে থাকলো ওর পায়ুপথেও ব্লাড যাচ্ছে। রক্ত পুঁজ দুর্গন্ধময় পুরোনো দলাপাকানো থকথকে মলমিশ্রিত ব্লাড।

লেখক পরিচিতি
শিমুল মাহমুদ 

শিমুল মাহমুদের প্রথম গল্পের বই ‘ইলিশখাঁড়ি ও অন্যান্য গল্প’ প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯৯ সালে। এরপর ২০০৩-এ ‘মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব’, ২০০৮-এ ‘হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী’ এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৭টি গল্পের আশ্রয়ে জয়কলি প্রকাশনা থেকে শেষ গল্পের বইটি ‘মনোবিকলনগল্প’ শিরোনামে এ বছরই প্রকাশ পেয়েছে।

সব মিলিয়ে গল্পসংখ্যা ২৬।

কবিতার মতো তাঁর গল্পসমূহ ক্রমশ এমন এক মিথ্যার জগৎ সৃজন করে চলে যা পক্ষান্তরে সত্যের ইশারাকে জাগিয়ে তুলতে প্ররোচিত করে। এগুলো এমনই এক জাদুবিদ্যা, যা পক্ষান্তরে মগজের কিয়দংশের ভেতর সৃষ্টি করে হাজার ঝালর বিশিষ্ট জানালা; যে জানালা দিয়ে কোটি বছর ধরে কোটি সৌরবছর অতিক্রম করে আসা মহাজাগতিক রশ্মি প্রবেশের সুযোগ লাভ করে; আর এভাবেই আপনার মগজ যখন আলোকপ্রাপ্ত হয়ে উঠতে থাকে তখন আপনি হয়ে ওঠেন ত্রিকালদ্রষ্টা; স্বয়ং টিরোসিয়াস।

শিমুল মাহমুদ তথাকথিত পণ্ডিতগণের একাডেমিক ট্র্যাশ থেকে ঘোষণা দিয়েই দূরে সরিয়ে রেখেছেন নিজেকে; সেই সাথে অস্বীকার করেছেন যাবতীয় লিঁয়াজো-নির্ভর পুরস্কার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পিঠচাপড়ানো অসভ্যতা। কবিতার সাথে তাঁর সখ্য স্বৈরশাসনের দুঃসহকাল গত শতাব্দীর নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে। সমান্তরালে কথাসাহিত্যে রেখেছেন নির্মোহ ছাপ; সেই সাথে সক্ষম হয়েছেন নিজেকে একজন সিদ্ধহস্ত সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। সহজাত বৈশিষ্ট্যে শিমুল মাহমুদের গদ্যমাত্রই হয়ে ওঠে মুক্তচিন্তার বাহন; যা অবশ্যই সিরিয়াস পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত।

শিমুল মাহমুদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাঠগ্রহণ শেষে ইউজিসি-র ফেলো হিসেবে পৌরাণিক বিষয়াদির ওপর গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। তিনি আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে তিন দশক যাবৎ সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের কাগজ কারুজ। জন্ম ১৯৬৭ সালের ৩ মে। পেশা এবং নেশা: অধ্যাপনা। কর্মস্থল: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। পছন্দ: পাঠগ্রহণ, ভ্রমণ ও একাকিত্ব। অপছন্দ: ম লোলুপ আঁতলামো।
প্রকাশিত গ্রন্থ

কবিতা
মস্তিষ্কে দিনরাত্রি   [কারুজ, ঢাকা: ১৯৯০]
সাদাঘোড়ার ¯্রােত   [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৮]
প্রাকৃত ঈশ্বর   [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০০]
জীবাতবে ন মৃত্যবে   [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০১]
কন্যাকমলসংহিতা   [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
অধিবিদ্যাকে না বলুন   [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৯]
আবহাওয়াবিদগণ জানেন   [চিহ্ন, রাজশাহী: ২০১২]
কবিতাসংগ্রহ : সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ   [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৪]
বস্তুজৈবনিক   [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]
কাব্যকথা কাকবিদ্যা   [অনুপ্রাণন, ঢাকা: ২০১৬]
সমূহ দৃশ্যের জাদু     [চৈতন্য, সিলেট: ২০১৮]
ঠড়রপব ড়ভ ঘধঃঁৎব   [নাগরী, সিলেট: ২০১৯]
ভাষাদের শস্যদানা    [জয়কলি, ঢাকা: ২০১৯]

গল্প

ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প 
[নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৯, নাগরী সংস্করণ ২০১৭]
মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব 
[পুন্ড্র প্রকাশন, বগুড়া: ২০০৩, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৮]
হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী   [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৮]
নির্বাচিত গল্প   [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]
মনোবিকলনগল্প    [জয়কলি, ঢাকা: ২০১৯]

উপন্যাস

শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি 
[ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭, কলকাতা সংস্করণ ২০১৪, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৬]
সুইসাইড নোট     [নাগরী, সিলেট: ২০১৯]

প্রবন্ধ

কবিতাশিল্পের জটিলতা 
[গতিধারা, ঢাকা: ২০০৭, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৭]
নজরুলসাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ   [বাংলা একাডেমি, ঢাকা: ২০০৯]
জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল   [গতিধারা, ঢাকা: ২০১০]
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা   [গতিধারা, ঢাকা: ২০১২]
মিথ-পুরাণের পরিচয়   [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৬]
মিথ-ঐতিহ্য সমাজ ও সাহিত্য   [নাগরী, সিলেট: ২০১৭]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন