মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অমর মিত্র'এর গল্প : প্রাণবায়ু

অভয়ের সঙ্গে তার একটি বছর আগে যদি বিয়ে হতো, তাহলে হয়তো ক্যানিং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু রামশঙ্কর মুখার্জীর ছেলেটিকে বাঁচিয়ে রাখা যেত। সহচরীর এরকমই মনে হয়েছিল বিয়ের পর। কী সুন্দর ছিল ছেলেটি। সবে ইস্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ঢুকেছিল। তার চেয়ে বছর তিনেকের ছোটই হবে, তার সঙ্গে ভাব ছিল খুব। কোনও খোঁজই পাওয়া গেল না।
পুলিশে তুলে নিয়ে গেল রাত্তিরে, তারপর নিখোঁজ। এ থানা, ও থানা, আলিপুর জেল, বহরমপুর, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া কত জায়গায় খোঁজ করলেন ডাক্তারবাবু। 

কী নাম? 

শুভশঙ্কর। 

পার্টি করতো তো? 

জানি না। 

পার্টিই করতো, সাফ হয়ে গেছে। অভয় পান চিবোতে চিবোতে বলেছিল, নামটা শোনা, বাসন্তীতে ঢুকে পড়েছিল ক’দিন। 

বিয়ের পরে কথা হচ্ছিল স্বামী-স্ত্রীতে। কত বছর! অভয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় যখন সহচরীর, তখন এমার্জেন্সি আসেনি, তার প্রস্তুতি চলছিল। হেলথ সেন্টারের দেওয়ালে পরিবারের সন্তান সংখ্যা তিন থেকে নেমে দুই, হাম দো হামারা দো পোস্টার, নিরোধের বিজ্ঞাপনে দেওয়াল ভর্তি, পুরুষকে ডাক দেওয়া হচ্ছে নির্বীজ হতে। অভয় আটটি মেয়ে দেখে, নবমে তাকে পছন্দ করে ফেলেছিল। বাসন্তী থানার মেজ-দারোগা, দীঘার কাছে ধান জমি, কাজুবাদামের বন, তরমুজ খেত আর পানবরজের উত্তরাধিকারী, এ ব্যতীত চাকরিতে প্রচুর টাকা, এমন সুপাত্র জোটাবে কী করে ক্যানিং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নন-মেডিকেল স্টাফ কুণ্ডবাবু, সকলের কুণ্ডুদা। প্রায় নিখরচায় বিয়ে করেছিল অভয় পাত্র। দাবী করেনি কিছু, ফলে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছিল সহচরীর বাবা কুণ্ডুদা। বিয়ের অনুষ্ঠানেই একবার ‘দারোগাবাবু’ বলে ডেকে উঠেছিল নতুন জামাইকে। কৃতজ্ঞতায় চোখ ছলোছলো মানুষটি তখন যেন পাগল হয়ে ছুটোছুটি করছিল। 

সহচরী বলেছিল, খোঁজ করলে পাওয়া যাবে না? 

না, ওসব ছেলে বাপ মাকে কষ্ট দিতে জন্মায়। 

বিড়বিড় করেছিল সহচরী, সেদিন কী বৃষ্টিই না ছিল, মাঝে মাঝে ওর মন খারাপ হত মায়ের জন্য, বাড়ি ফিরেছিল, শ্রাবণমাস, মাঝরাত্তিরে পুলিশ এসে ধাক্কা মারল দরজায়। 

থাক, ওসব কথা, আচ্ছা তুমি পুলিশকে ভয় কর? 

কোনও জবাবই দিতে পারেনি সহচরী। পুলিশকে সে ভয় করে। পুলিশকে তার মন্দ মনে হত না, ভালও না। সে জানত, পুলিশকে ভয় করতে হয়। বাবা বলত এই কথা। বিশেষত সম্বন্ধটা ঠিক হওয়ার পরে। পুলিশকে ভয় না করলে শাসন থাকবে? পুলিশের হাতে মানুষ মরে? মরে তো মরে। মানুষের হাতেও তো মানুষ মরে। মরে না? ক্যানিং এর বড় জোতজমির মালিক নিরাপদ সাঁপুই কার হাতে মরল? পুলিশ তো তাকে মারেনি। এই খুনোখুনি বন্ধ হওয়া দরকার। পুলিশকে আরো ক্ষমতা দেওয়া দরকার। সম্বন্ধ ঠিক হয়ে গেলে বাবা পুলিশের বড় সমর্থক হয়ে উঠেছিল। 

অভয় জিজ্ঞাসা করেছিল, পুলিশকে তোমার কেমন মনে হয়? 

বলতে পারেনি সে কিছুই। তার স্বামী পুরুষটা স্বাস্থ্যবান, দীর্ঘদেহী, সুপুরুষ। স্বামীকে তার পছন্দ হয়েছিল। অভয়ের প্রতি তীব্র জৈবিক টানই পুলিশ সম্পর্কে তার পুরনো আন্দাজ মিথ্যে করে দিচ্ছিল। অভয় তাকে বোঝাচ্ছিল স্ত্রী এবং স্বামীর সম্পর্ক কেমন হবে। কীভাবে স্ত্রী হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের সহধর্মিণী, একান্ত বিশ্বস্ত। অভয় তাকে ধীরে ধীরে বলেছিল তার পুলিশের চাকরি, দুনিয়ার ছেলেমেয়েদের গুপ্তকথা ইচ্ছে করলেই সে জানতে পারে, তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুব কঠিন, হনিমুনে এসে এই নকশাল ছেলেটির কথা তোলার মানে কী? 

ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল সহচারীর মুখ, এমনি, আমার ছোট ভাই এর মতো। 

ভাই-এর মতো, ভাই তো নয়। 

আমার চেয়ে অনেক ছোট। 

তাতে কী হয়েছে, ছোট বড়র কথা কে জিজ্ঞেস করছে? 

সহচরী তখন স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করেছিল, তুমি কী সব কথা বলছ, তাকে এইটুকু বয়স থেকে দেখছি, দু বছর আমি তাকে পড়িয়েছিলামও। 

অভয় পাত্র হে হে করে হেসে উঠেছিল, ওতে কী প্রমাণ হয়, ছেলেটা ভালো, তাকে তুলে ঠিক করেনি পুলিশ, নাকি ছেলেটা তোমার সঙ্গে কোনোরকম...? 

কথা শেষ করতে দেয়নি সহচরী, অভয়ের মুখ চেপে ধরেছিল একহাতে। অভয় আচমকা নরম হয়ে তার গলা জড়িয়ে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করেছিল, সত্যি করে বলো দেখি, পুলিশকে তুমি কী চোখে দ্যাখ? 

পুলিশ আর দেখলাম কই, দেখছি তো এই লোকটাকে, খুব পাজি। গলায় ফুটিয়ে তুলেছিল সে আবেশ, নিখুঁত যৌনতা, বাব্বা কী পুরুষ সে! 

অভয় এতে টলেনি, বলেছিল, ভয় করো পুলিশকে? সরে বসেছিল অভয়। 

করি। 

খুশি হয়েছিল অভয়, তারপর বলেছিল, পুলিশকে সবাই যদি ভয় করে তো সমাজটা ঠিক থাকে, শাসন ঠিক থাকে, তুমি পুলিশের বউ, মেজ-দারোগার ওয়াইফ, তুমি থার্ড ডিগ্রি জান না, কীভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করি আমরা? 

সমুদ্র ভাঙছিল অন্ধকারে। সবচেয়ে দামী হোটেলের দামী ঘরে দু’জন উঠেছিল। অভয় অল্প পান করেছিল শরীরের ম্যাজম্যাজানি ঝেড়ে ফেলার জন্য। অভয় বলেছিল, সব জেনে রাখা প্রয়োজন সহচরীর, পার্টিওয়ালাদের সম্পর্কে, পুলিশের কাজ-কম্মো সম্পর্কে। থার্ড ডিগ্রির মেথড বর্ণনা করেছিল অভয়। শুনতে শুনতে সহচরীর মুখে আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। অভয় পরিষ্কার বলছিল পার্টিওয়ালাদের নিয়েই ঝামেলা বেশি, সে পুরুষ হোক, মেয়েমানুষ হোক, চোর ডাকাতের পেটের কথা আদায়ে দু চারটে রুলের গুঁতোই যথেষ্ট, লাঠি তুললেই সব হড় হড় করে বলে দেবে। কিন্তু পার্টিওয়ালারা যেন আলাদা ধাতু দিয়ে তৈরি, ফলে বেটাছেলেদের ওইটা কেটে নেবার ভয় দেখাতে হয়, পিছনে রুল ঢুকোতে হয়, আর মেয়েছেলেকে চোর ডাকাত দিয়ে খাওয়াতে হয়, গপ গপ করে যেন গিলে ফেলে তারা বড় মাছের মতো, সে একটা দৃশ্য বটে। একটা মেয়ের উপর পাঁচটা আসামী হামলে পড়েছে, তবে অ্যাতত দরকারও হয় না; মেয়েছেলের কাপড় খুলে দিলেই...। অভয় খ্যা খ্যা করে হাসছিল, তুমি আমার বউ হয়েছ, তোমার সব জানা দরকার। 

দরকার তো বটেই, সহচরী যেন অন্ধকারে ফণা তুলছিল, তুমি মানুষ মেরেছ? 

কী হবে জেনে? 

স্বামীর কথা তো স্ত্রীর জানা উচিত। 

মাথা নেড়েছিল মেজ-দারোগা, কী হবে জেনে, যেটা জানাবার, আমিই জানাব, একটা কথা শুনে রাখো, থানায় আসামী মরে, একটা মরলে বাকি দশটা শান্ত হয়, নকশাল পার্টিওয়ালা না মরলে, লালপার্টিওয়ালাদের না মারলে দেশে বিপ্লব চলতই, কলকাতার বরানগরে ঠেলা গাড়ি করে লাশ ফেলা হয়েছিল, ওই যে ফেলা হল, তারপর সব গত্তে ঢুকে গেল, কলে পড়া ইঁদুরের মতো হয়ে গেছে সব, আর একটা কথা জেনে রাখো, তোমার স্বামীর খুব নাম জেলা পুলিশে, কেন তা বুঝে নাও। 

সহচরী চুপ করে শুনেছিল অভয়ের কথা। অঘ্রানের সন্ধ্যা, অভয় কিন্তু খালি গায়ে পেশী ফুলিয়ে পায়চারি করছিল। জানালা খুলে দিয়েছিল অভয়। অভয়ের দিকে তাকাতে পারছিল না সে। জানালার বাইরে অন্ধকারে মুখ ফিরিয়ে শুনছিল তার কথা। আচমকা কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল অভয়, তুমি কি জান না বিয়ের পর মেয়েদের সাহস বাড়ে? 

চমকে ঘুরে তাকিয়ে ছিল সহচরী, কী সাহস! 

সবদিকে সাহস, বিয়েওলা যতগুলো মেয়েছেলে ধরা পড়েছে পার্টিবাজিতে, সব ক'টা খুব হারামি, কিছুতেই যেন কিছু হয় না ওদের, বিয়ের পর মেয়েদের ছেনালি বাড়ে। 

মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সহচরী। আবার অন্ধকারে তাকিয়েছিল। শুভঙ্করকে তুলে নিয়ে যাবার পর পরপর কয়েক রাত সে ঘুমোতে পারেনি। পুলিশ যে কমবয়সী যুবকদের ধরে ধরে মেরে ফেলেছে এ খবর কানে আসছিল তার, বেলেঘাটা, বারাসতে একসঙ্গে অনেক যুবকের লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, ওসব যে পুলিশের কাজ এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না তার, কিন্তু ওই লাশগুলিতে কোনও পরিচিত মুখ ছিল না, শুভঙ্করই তার চেনা যুবক যে চলে গেল পুলিশের হাতে মধ্যরাতে। শুভর মা তাকে বলেছিল সেই রাতের কথা, জানালা দরজায় আচমকা বুটের লাথি, কত রাত তখন! অত রাতে ডাকাত ছাড়া বাড়িতে কেউ চড়াও হয় না। অন্ধকারে শুভঙ্করের মুখের ছবি দেখতে পাচ্ছিল সহচরী। তার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল অভয়ের কথাগুলি। 

অভয় বলেছিল, কথাটা বুঝলে? 

না তো। 

স্বামী যদি পছন্দ না হয়, আর একজনের সাথে লটঘট বাধিয়ে দেয়। 

এসব কথা আমাকে বলার মানে? 

হে হে হেসেছিল মেজ-দারোগা অভয় পাত্র, তোমার তো সব জানা উচিত, পুলিশ যা জানে তা আর কেউ জানে না, স্বামী স্ত্রী কখন কী করে, দিনে ক’বার জোড় বাঁধে তাও ইচ্ছে করলে জানতে পারি আমরা, তুমি আমাকে পছন্দ করেছ কি না তা আমার চেয়ে বেশি তুমিও জানবে না, তবে শোন না, হরিশ মিদ্যে ছিল বাসন্তী থানার হেড কনেস্টেবল, তার বউ থানার বড়বাবুর সঙ্গে শুতো, তো হরিশ জানতে পেরে পিটিয়েই মেরে দিল বউকে, শেষে বড়বাবুই আবার বাঁচালেন হরিশকে, এ গল্প জানো? 

গল্প! গায়ে রোঁয়া কাটে সহচরীর। গা ছমছম করছিল। 

অভয় হেসে বলে, থাক এসব কথা, সব জানবে ধীরে ধীরে, আজ কী তিথি? 

চমকে উঠেছিল সহচরী, জানিনে তো, তবে চাঁদ আছে বেশ বড়। 

সামনে পূর্ণিমা? 

বোধহয়। 

অমাবস্যাও হতে পারে, চাঁদ হয়তো ছোট হতে আরম্ভ করেছে, কবে পূর্ণিমা ছিল জানো না? 

মাথা নেড়েছিল সহচরী। তার গায়ের ছমছমানি ভাবটি কাটছিল না। 

তুমি কি গান জানো? 

জানি। 

ঠিক আছে, গান পরে হবে, তুমি কতটা সুন্দর, তা জানো কি? 

মাথা নেড়েছিল সহচরী, তারপর চাপা গলায় বলেছিল, তুমিই সবচেয়ে সুন্দর! কথাটা বলতে পেরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়নি, কী সুন্দর তোমার চেহারা। 

হে হে করে হেসেছিল অভয়, বেটাছেলের আবার সুন্দর কী, টাকা, সম্পত্তি, স্বাস্থ্য থাকলেই হল, কিন্তু তুমি তো সত্যিই সুন্দর, চাঁদের মতন, চলো সমুদ্রের ধারে যাবে। 

এখন, খুব ঠাণ্ডা যে। 

হোক না, জোছনায় তোমাকে দেখি, এত সুন্দর বউ পুলিশে নেই, হবেও না। 

যাঃ, তুমি যে কী বলো। 

তখন অভয় তাকে চুম্বন করেছিল। সমুদ্রের ধারে গেল না বটে, ব্যালকনিতে দাঁড়াল গভীর অন্ধকারে। ব্যালকনি খুব ভালো, তাই খুব ঠাণ্ডা, শিশিরে ভিজে। সমুদ্র যেন ব্যালকনির গা থেকে তার বিপুল অন্ধকারে ঢাকা অনন্ত গর্ভ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। গর্জন কানে আসছিল সহচরীর। অনন্ত অন্ধকারের ভিতরে, অসীম জলরাশির ভিতরে কী যে আছে! কান পেতে ছিল সহচরী। তখন অভয়, নগ্ন গাত্র অভয় তার গায়ের আবরণ ঘুচিয়ে দিতে লেগেছিল। সহচরী চাপা গলায় অভয়কে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিল, কী যে করছ, তোমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে, গায়ে কিছু দাও। 

হেসেছিল অভয়, তোমার ওম তো কম নয়। 

নতুন হিম। 

হোক। অভয় তার কাঁধে দাঁত বসাতে আরম্ভ করেছিল, তুমি কী সুন্দর, তুমি জানো না কিন্তু এই মেজ দারোগা জানে, জহুরির চোখ আমার, এস এখানে, এই ব্যালকনিতে। 

না, এখন থাক, সমুদ্র দেখি। 

সমুদ্র মানে অন্ধকার, আমার কাছে তুমিই সমুদ্র। 

না, এখন নয়। 

এখন, এখনই। অভয় তার বউকে শক্ত মেঝেতে শোয়াতে শোয়াতে বলে, তুমি বরং চাঁদ দ্যাখো। আমি সমুদ্রে … হে হে হে, তুমি সত্যিই সমুদ্র, তোমার ভিতরে যে কী আছে, মেয়েছেলের শরীরটা অদ্ভুত, কীভাবে বাচ্চা পেটে নেয়, এইটুকু পেটে মানুষ, আশ্চর্য! 

সহচরী চোখ বন্ধ করে নিজের শরীরকে নিজে অনুভব করতে চাইছিল। পাচ্ছিল না। সে ঘুমিয়ে পড়ছিল ধীরে যেমন সমুদ্র সরে যায় জোয়ারের পরে যায় নিদ্রাকাতর বউ এর ঠাণ্ডা শরীরটা ঝাকিয়ে দিয়ে তাকে জাগাতে চাইছিল অভয়। 

কদিন ধরে হিস হিস করছিল অভয়। তেমনই মনে হচ্ছিল সহচরীর। উদ্বেগে ছিল সে। থানা বাড়ি থেকে কোয়ার্টার্স আর কতটুকু, কিন্তু কোয়ার্টার্সে থাকছিলই না। রাত্তিরে সহচরী একা। একা কোয়ার্টার্সে বসে থানাবাড়িতে অভয়ের হাঁকডাক শুনছিল সে। রাত্তিরে বেশ শোনা যায়। চাদ্দিক নিঃঝুম হয়ে আসে তো। 

চৈত্র চলছিল। নোনা দেশে গরম বাতাস ঢুকে পড়েছিল পশ্চিম থেকে। অভয় বিড়বিড় করছিল, হারামিগুলো সাপের কামড়েও মরে না। 

কার কথা বলছ? সহচরী কৌতুহল প্রকাশ করলে অভয় বিরক্ত হয়, বলে, সব জেনে তোমার লাভ কী, সব রক্তবীজের বংশ, এত মরছে, তবু শেষ হচ্ছে না। 

কারা? 

শুয়োরের বাচ্চারা। কলকাতায় তাড়া খেয়ে এখানে এসে ঢুকেছে। 

অভয় দুপুরে ঘুমিয়ে ছিল। সহচরীও। সেই চৈত্র দুপুরের রৌদ্রময়তা কখন মুছে দিয়েছে একখণ্ড মেঘ তা টেরও পায়নি দুজনে। বিকেলে আকাশ অন্ধকার। ঘুম থেকে উঠে শার্ট প্যান্ট পরে তৈরি হচ্ছিল অভয়, থানায় গিয়ে বসবে। আকাশ শুরু গুরু ডাকে ভারী হয়ে উঠছিল। এদিকের মেঘ অন্যদিকে ছুটতে আরম্ভ করেছিল। অভয় বেরিয়ে গেল। 

কোথায় গেল অভয়? ভয় হচ্ছিল সহচরীর। কে এল শহর থেকে তাড়া খেয়ে? টের পাচ্ছিল সহচরী। কোয়ার্টার্সের সামনের খালি জমিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখল সে। মেঘ যেন ক্রমশ নেমে আসছে নিচে। হাওয়া উঠল। ছুটে এল ভিজে মাটির গন্ধ আর বীজের প্রাণবায়ু বাহিত হয়ে। সে ঘরে ঢুকে দরজা দিল, যখন তাণ্ডব আরম্ভ হয়ে গেছে। কী বৃষ্টি আর বাতাস! নদীর পাড় ভাঙার শব্দও কানে আসছিল যেন। চিৎকার শুনতে পাচ্ছিল বিপন্ন মানুষের। কী ভীষণ ঝড়! দরজা ভেঙে ফেলে ভিতরে ঢুকে আসতে চাইছিল ঝড়ো বাতাস আর জল। মনে হচ্ছিল পুরনো কোয়াটার্সই ভেঙে পড়বে। অন্ধকারে একা দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল মেজ দারোগার বউ। তার মনে হচ্ছিল দরজায় লাথি পড়ছে বুটের। দরজা জানালা ভেঙে যেন ঢুকে পড়তে চাইছে পুলিশবাহিনী। শুভঙ্করের মা যেমন বলেছিল। ঠিক সেইরকম, সেইরকম! 

সেই ঝড় বৃষ্টি থামতে কত রাত্তির! তারপরেও সে একা। অভয় ফিরেছিল রাত দশটা নাগাদ। কাদা মেখে, বুটের আওয়াজ তুলতে তুলতে। বুটের ডগা দিয়েই দরজায় টোকা দিয়েছিল অভয়। দু’ব্যাটারীর টর্চের আলো ফেলে দেখছিল দরজার ফাক ফোকর, উল্লাসে ডাকছিল অভয়, কী হল, ঘুমোলে? 

অভয় ঢুকতে ঢুকতে বলেছিল, শেষ করে দেওয়াই ভালো, যত রেখে দেবে তত বিপদ, তোলো আর মারো। 

কী হয়েছে? 

কী আবার হবে? এনকাউন্টারে মরেছে, পাঁচটা একসঙ্গে, পরপর শুয়ে আছে। নদীবাঁধে, তার ভিতরে সেই হারামিটা আছে। 

কে, কার কথা বলছ? 

অভয় বলল, তিমির বোস, ও নাকি এইচ-এস-এ ফিফথ হয়েছিল, বাপ মার এক ছেলে, বাপ মাকে কাঁদাতেই জন্মায় এরা, নিকেশ হয়ে গেল, শুয়ারটা ডিক্লাসড হচ্ছিল, চাষা, জেলে হবে বলে ঝড়খালিতে এসে উঠেছিল, জমির মালিকরা জমি ফেলে পালাচ্ছে ওদের ভয়ে। 

মরে গেছে? 

ইয়েস, এনকাউন্টারে মরেছে, পাইপগান নিয়ে অ্যাটাক করেছিল ফোর্সকে। 

তারপর? সহচরী আর একটা হেরিকেনে দেশলাই কাঠি ঠুকতে ঠুকতে জিজ্ঞেস করছিল। ঘর আলো হয়ে যাচ্ছিল। ছায়া মস্ত হয়ে দেওয়ালে চলাফেরা করছিল। অভয় তার সমস্ত পোশাক খুলে ফেলে সম্পূর্ণ নগ্ন, টর্চ নিয়ে বাথরুমে গিয়ে স্নান করে এসে গা মুছতে মুছতে বলল, ভেবেছিল এখেনে রাজত্ব করবে, অভয় পাত্র থাকতে তুই লুকোবি কোথায়, ইদুরের গত্ত থেকে সাপ টেনে বের করতে পারি আমি। আমি খাব না, থানায় মাংস রুটি খেয়েছি। 

সহচরী বলল, এই অবস্থায় খেয়ে এলে? 

ইয়েস, তুমি খেয়ে নাও। 

আমি খেয়েছি। মিথ্যে বলল সহচরী। 

অভয় বলল, তাহলে শুয়ে পড়ি, আজ খুব তেতে আছি, আবহাওয়াটাও খুব ভালো, বেশ ঠাণ্ডা হয়েছে, গরম হয়ে আছি দেখতে পাচ্ছ তো, শক্ত হয়ে আছে এনকাউন্টার থেকেই। 

সহচরী অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, বিড়বিড় করেছিল, মরে গেছে সত্যি? 

হ্যাঁ, এ ফোড় ও ফোড় হয়ে গেছে, তারপর সেপাই-এর লাঠি, ইদুরের মতো মরেছে তিমির, ইটস্ আ গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট। 

তুমি মারলে? সহচরীর গলা ভার, চোখ অন্ধকারে গলে পড়ছিল যেন। 

হ্যাঁ আমি, ন্যাকামি করো না তো। নগ্ন অভয় দারোগা তার বউ এর কাঁধে থাবা দিল, আজ নিশ্চিন্ত, আহা! খবরটা জেলায় পৌঁছলে যা হবে! 

তুমিই সত্যি ? 

আমি কেন, অর্ডার তো জেলা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের, থামো তো, তুমি তো দেখছি আচ্ছা আরম্ভ করেছে, এখন ওসব কথা নয়। বউকে টেনে বিছানায় চিৎ করে শুইয়ে দিয়েছিল অভয়, গায়ের আবরণ সরাতে সরাতে, শাড়ি ব্লাউজ টেনে প্রায় ছিড়তে ছিড়তে অভয় হাসছিল, মাইরি, সেই সাতটার সময় কেস ফিনিশ হল, তারপর থেকে শুধু ভাবছি কখন ঘরে ফিরব, শরীর আগুন হয়ে গেল হঠাৎ, খাড়া হয়ে ফুঁসছে, কী হল কথা বলছো না কেন? তুমি যে দেখছি হরিশের বউ-এর মতো—বউটার পেটে আমাদের বড়-বাবু বাচ্চা দিয়েছিল বটে, বউটা নিয়ে ফুর্তি করত বটে, কিন্তু প্রথমটায় নাকি সে এমনিই থাকত, ঠাণ্ডা, বরফ। 

থামো এসব কথা শুনতে চাই না। 

সে তো আর বেঁচে নেই, তুমি তাকে দ্যাখোওনি, খুব সেক্সি ছিল মেয়েছেলেটা, মরার আগে নাকি জল চেয়েছিল হরিশের কাছে, শরীরটা হাল্কা করো, তুমি তার চেয়েও সেক্সি, এমন শক্ত হয়ে আছ কেন? 

সহচরী যেন ঘুমিয়েই থাকে। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, দেখতে কেমন ছিল ছেলেটাকে? 

শুনতে পায়নি অভয়। সে তখন কনস্টেবল হরিশের বিবরণ দিচ্ছিল। হরিশ এখন মুর্শিদাবাদে, আবার বিয়ে করেছে, বড়বাবু এখন বাঁকুড়ায়, সার্কেল ইনসপেকটার, হরিশ কিন্তু ঘটনাটা জানত, মানে এসবে অনেক জটিলতা আছে, হরিশ পাঠাচ্ছিল তার বউকে, না বউ যাচ্ছিল নিজে, মনে তো হয় নিজেই যেত সে, তাই তো রটেছিল, বউটা প্রথমে নাকি অভয়কে টার্গেট করেছিল, আবার হতে পারে হরিশই জোর করে পাঠাত, সার্ভিসে লাভ হবে, হাল্কা করো শরীর, পাদুটো ছড়িয়ে দাও...। 

সহচরী পা ছড়িয়ে দিয়েছিল। নিজেকে মিলনের উপযোগী না করে তুলতে পারলেও, অভয়ের অসুবিধে দূর করে দিচ্ছিল। কিন্তু অভয় পারছিল না। স্ত্রীর অঙ্গে আঘাত করতে করতে অভয় বিড়বিড় করছিল, শুয়ারকি বাচ্চার খুব সাহস ছিল, শালা এখানে এসে পার্টি অর্গানাইজ করছিল, এবার চাষ বন্ধ করে দিত, এভাবে চলে। সাপ ফোঁস করলে তাকে লাঠি মারতেই হবে, আরো হাল্কা হও, হরিশের বউও নাকি প্রথমে এরকম গুটিয়ে থাকত, কিন্তু মেয়েছেলে জানে না এতে পুরুষের রোখ চেপে যায় বেশি, মেয়েছেলে যদি কো-অপারেট না করে তো পুলিশ তখন কী করবে, মানে আসামী যদি সত্যি কথা না বলে, মেয়েছেলে হোক আর পুরুষ হোক, কথামতো না চললে...। অভয় গোঙাতে থাকে। 

অভয়ের গোঙানির ভিতরেই জেগে উঠতে থাকে সহচরী। তিমির নামটি কী সুন্দর! তিমির, শুভশঙ্কর! শুভশঙ্কর কি তিমির? শুভশঙ্কর তো বলত তার গোটা কয়েক নাম আছে। দুটি হাত বাড়িয়ে অন্ধকারকে শরীরে গ্রহন করতে থাকে সহচরী। তার দু চোখে ফোটা ফোটা জল, আবার অভয় বলছে তিমিরকে ফাঁদে ফেলার ইতিবৃত্ত। তার হাত, পা চোখ ধ্বংস করার কাহিনি। 

এর দুমাসের মাথায় সহচরী জানায় সে বোধহয় পেটে ধরেছে, সে টেরও পায়নি তার শরীরে কে এসে লুকিয়েছে কোন অন্ধকারে। শুনে অভয় বলে, জমি ভালো, চাষাও ভালো, হা হা হা, কিন্তু রাখবে, না সাফ করবে? 

আঁতকে ওঠে সহচরী, রাখব না কেন, যে এল সে তো আমার। 

থাকুক, তুমি অদ্ভুত মেয়েমানুষ, বছর কাটল না, ক'মাস হল বলো, এর ভিতরেই পেটে ধরে ফেললে। 

ভ্রূণ পেটে নিয়ে সে বাপের বাড়ি গেল। জনে জনে তাকে দেখতে এল, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, সবাই। এল ফকির মিসকিন, সাধু সন্ন্যাসী, হা-ঘরে, ভবঘুরে ভিখিরির দল, চাষা মজুর, খাটতে খাটতে জিভ বের করা মানুষজন। সবাই বলল, শুভ হোক, জননী হও তুমি। তাদের কথায় ভ্রূণ ক্রমশ শরীর পেল, সহচরী দশমাস ধরে গর্ভের অন্ধকারে তাকে হাত দিল, পা দিল, মাথা দিল, বুক দিল, প্রাণ দিল নিজের শরীর থেকে কেড়ে, প্রাণবায়ু দিল মেঘ বৃষ্টির আকাশ থেকে নিয়ে। বাচ্চা জন্মাল। তাকে নিয়ে সে ফিরল পতিগৃহে, থানা কোয়ার্টার্সে। পৌষের আরম্ভে চারদিক এখন ভরভরন্ত। যখন ভ্রূণ নিয়ে সে ছেড়েছিল এই দ্বীপভূমি, সবদিকে রিক্ততা, শুধু প্রাণ দপদপ করছিল। জননী এখন দ্যাখে আকাশ থেকে টিয়ার ঝাক নামছে পাকা ধানের উপর। বাচ্চাকে নিয়ে উঠোনের আলোয় দাঁড়িয়ে সে পাখির উড়াল দেখায়, ছায়া দেখায়, অন্ধকার দেখায়। স্তন্যপান করাতে করাতে ঘুমপাড়ানি গান গায়। 

অভয় পাত্র অবাক হয়ে দ্যাখে তার স্তন্যদায়িনী বধূকে। আচমকা সে মায়ের বুক থেকে শিশুর মুখ সরিয়ে দিয়ে হা হা করে হাসতে থাকে, আর একটা বেটাছেলে তোমার বুকে মুখ দিয়ে আছে, একি সহ্য করতে পারবে মেজ-দারোগা? 

তুমি না বদলি হবে বলেছিলে? 

দেরি আছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার কাজে খুব খুশি, এম.পি. তার বাঙলোয় ডেকে ডিনার খাইয়েছে, সব পার্টিওয়ালা তো এখনো সিধে হয়নি, দ্যাখো না ধান কাটা নিয়ে কী হুজ্জতি লাগবে আজ কালের ভিতরে, আমি বলেছি মালিকের ধান, জোতদারের ধান তার খামারে উঠবে, কোনও চাষার বাচ্চা যদি অন্যথা করে তো মেরে হোগল নদীর জলে ফেলে দেব, কুমীরে খাবে, মন্ত্রীর অর্ডারও এইরকম। 

কিন্তু তা কী হল? জননী তার বুকে বাচ্চা চেপে রেখে শোনে ধানকাটা নিয়ে রক্তারক্তি শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ, মালিক, জোতদার একদিকে, অন্যদিকে চাষার দল। ক্ষেপা ষাঁড় হয়ে ঘুরছে মেজ-বাবু। কে এক হারু মণ্ডল নাকি এসবের মূলে। তিমিরের সঙ্গে সেইরাতে তাকেও গুলি করা হয়েছিল, বেঁচে গিয়ে এখন ঝড়ের মতো হয়ে উঠেছে। 

গর্জন করতে থাকে মেজ-বাবু। বাঘ দিয়ে খাওয়াবে এবার লিডারগুলোকে। হারু মণ্ডল তিমিরের পার্টির। যোগেন দাস আর এক লাল পার্টি, দুটো পার্টিকে লড়িয়ে দিতে পারলেই ঠিক হতো, কিন্তু ধান কাটায় সব এক কাট্টা, সব নাকি খাস জমি, আটষট্টি সালে খাস হয়েছিল, বললেই হবে, আইন কানুন নেই দেশে? 

দারোগাবাবু আবার স্ত্রী শরীরে শরীরে যোগ আরম্ভ করেছেন। এক দুপুরে শোনা গেল লাশ পড়েছে। লাশ নাকি সকাল থেকে পড়ে আছে নদী বাঁধে, হারু আর যোগেনের। শোনা গেল দুজনকেই আগের রাতে পুলিশ তুলে এনেছিল। 

অভয় বলল, দুটি পার্টি মারামারি করে মরেছে, মারামারি তো হচ্ছেই। 

সহচরী বলল, নাকি তুমি? 

এসব জেনে কী হবে? খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল অভয়, দুই লালপার্টি লড়ে মরেছে, এবার সব ঠাণ্ডা হবে, জমির মালিকরা চেয়ে আছে থানার দিকে, জমির মায়া তুমি বুঝবে না, এই বাণ্ডিলটা রাখো, আমিও জোতের মালিক, হারামিগুলোকে নিব্বংশ না করতে পারলে মাথা ঠাণ্ডা হবে না, কী বুঝলে? 

সহচরী নিঃঝুম হয়ে থাকল। তার চোখ ভারি হচ্ছিল, বিড়বিড় করল সে, দুজনকেই একসঙ্গে, যোগেন ক'দিন আগে তোমার কাছে এসেছিল? 

হাসে মেজ-দারোগা, এসেছিল ফয়সলার জন্য, ফয়সলা তো একটাই, যার জমি, ধান তার খামারে উঠবে, হারুটার জন্য যোগেনও মরল, এত খতরনাক ছিল ও। 

তুমি সত্যি! 

জবাব দেয় না অভয়। ধান উঠে গেল নির্বিঘ্নে। মাঠ শূন্য হয়ে গেল। মাস চারেকের মাথায়, চৈত্রের প্রথমে সহচরী জানায় তার পেটে আবার এসেছে। আবার সে গর্ভবতী। শুনে অভয় গালে হাত দেয়, কী রকম খোল তোমার, ছুঁয়ে দিলেই গর্ভবতী, খালাস করে আসবে, চল। 

না ঘুরে দাঁড়িয়েছে সহচরী। তোমার খাওয়ানোর ক্ষমতা হবে না? 

অহং এ লাগে অভয় পাত্রর। গর্ভবতী জননী এবার যায় সমুদ্রতীরে। 

কাজুবাদাম বনের ধারে, ফসলের ক্ষেতের কোলে অভয়ের দেশের বাড়ি। কোলের শিশুটিকে স্তন্য দিতে দিতে সে আকাশে তাকায়। আষাঢ়ে মেঘ এল। মেঘ গ্রহণ করে জননী। দূরে তাকায়, সহস্র ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ তুলে বৃষ্টি এল। বৃষ্টি গ্রহণ করে জননী। বীজ বোনা শুরু হয়, বীজ নেয় সে। মাটির মতো বীজকে ধারণ করে সে। ধান রোয়া হয়। কচি ধানের রঙ নেয় সে। বৃষ্টির মেঘের ছায়া নেয় সে। সমুদ্রে প্রবল জোয়ার আসে। জোয়ারের শব্দ, সমুদ্রের পাড় ভেঙে নেয় সে। নিতে থাকে। বীজ, ধান, মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা, জোয়ার ভাটা, চাঁদের কলা, পূর্ণিমা, অমাবস্যা, জ্যোৎস্না, অন্ধকার, দিন, রাত্রি, পক্ষ, মাস, কাল নেয় জননী। নেয়। সকাল, সন্ধ্যা, মধ্যাহ্ন, তাপ উত্তাপ। ধীরে ধীরে পাকা ধানের রঙ নেয় সে। এই সব নিতে নিতে সে গর্ভের অতুল অন্ধকারে হাত গড়ে, পা গড়ে, চোখ ফোটায় সমুদ্রের তীরে বসে। 

যমজ হল সহচরীর। তিন সন্তান নিয়ে সে দ্বীপভূমিতে ফেরে পরের বৈশাখে। দুই সন্তান বুকের দুধ খায়, একটি ঘুমায় কোলে। বাসন্তীতে ফিরে সে বলল, এবার অন্য জায়গায় চল, তোমার না বদলি হওয়ার কথা ছিল? 

অভয় হাসে, এমার্জেন্সি চালু হল। হাতে অনেক ক্ষমতা, যত মানুষ জেলে আছে তার চেয়ে বেশি বাইরে, ঠাণ্ডা হয়নি বাসন্তী থানা, হারু মণ্ডলের বউটাকে চালান করতে পারলে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, বিধবা মেয়েছেলেটা পাগলা করে ছেড়ে দিচ্ছে, শালা পুরো দেশটা যদি জেলখানা হয়ে যেত, বাঁচা যেত। 

ছ'মাস বাদে, পুজোর পরপর হারু মণ্ডলের বউ পার্বতী মরল। লোকে বলল, থানা হাজতে মরেছে, পরে বডি জঙ্গলে ফেলে আসে পুলিশ। থানা বলল, যোগেন দাসের লোকে মেরেছে। দশ রকম কথা উড়তে লাগল বাতাসে। 

তুমি? 

না, যোগেনের পার্টি, কীভাবে মেরেছে দ্যাখো, মারার আগে রেপ করেছে। 

থানা হাজতে? 

না, পুলিশ জানে না, তবে ধরপাকড় হচ্ছে এই মার্ডারের জন্য। 

তিন সন্তানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে আরো ছ'মাস বাদে বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে সহচরী ডাকল স্বামীকে, আবার বোধহয়। 

আবার! বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে অভয়ের দুচোখ, খুব সাবধান হয়েছিলাম তো। 

আবার এসেছে। বিড়বিড় করে সহচরী। 

জোছনা এসে পড়েছিল জানালা দিয়ে বিছানার উপর। দখিনা বাতাস উত্তাল ঢেউ হয়ে ঢুকে পড়ছিল ঘরের ভিতর। হাওয়ায় তার খোলা চুল উড়ছিল, খোলা বুক দিয়ে দুধের ধারা বয়ে যাচ্ছিল। ঘুমন্ত শিশুর মুখ বুকে নিতে নিতে সহচরী বলে, বাচ্চা হওয়া খুব আনন্দের, তিনটে বাচ্চা, আমার মনে হয় অনেক হোক। 

পারবে? 

পারব। কী সুন্দর কাটে যখন বাচ্চাটা পেটের ভিতরে জন্মাতে থাকে, হাত জন্মায়, পা জন্মায়, সে যখন পা ছেড়ে, পাশ ফিরে শোয়, আমি যেন আর আমার মধ্যে থাকি না, আমার পেটটা কত বড়, কত বিরাট হয়ে যায়, সমুদ্রের মতো ...। 

অভয় বলে তোমার খোল খুব বড়, আড়াই বছরে তিনটে বাচ্চা! 

সহচরী বলে, বাচ্চা যেন নেশা, ওই কটা মাস যে কীরকমভাবে কাটে। 

অভয় বলে, যত ইচ্ছে পয়দা করো, আমার তো মনে হয় গরিব লোকের কম বাচ্চা ভালো, ওসব নিরোধ-পিল এর বিজ্ঞাপন ওই জন্য, কিন্তু তুমি কি পারবে এতগুলোর ধকল নিতে? 

পারব। আমার বুকে কত দুধ! 

অভয় পাত্র বউ-এর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, এই মেয়েমানুষটা কোথা থেকে জোগাড় করল সে, বাচ্চার পর বাচ্চা পেটে ধরছে! ছুঁয়ে দিলেই সন্তান, এ যেন রামায়ণ মহাভারতের যুগের কেউ। দেখলে কে বলবে তিন সন্তানের মা? শরীর দ্যাখো, লাবণ্য দ্যাখো। অভয় তো দেখলেই তেতে ওঠে। কী সর্বনেশে মেয়েমানুষ! যদি পেটে না ধরে তাকে ঘরে বাঁধতে চাইত, অভয় ওর বাঁধা পুরুষ হয়ে থাকত। জড়িয়ে ধরে বউকে মেজ-দারোগা। পেটে হাত দেয়। চোখ দুটি বন্ধ করে। থরথর করে কেঁপে উঠছে অভয়। ঢেউ দিচ্ছে যেন। সে যেন ঢেউ-এ হাত রেখেছে। আশ্চর্য! এ যেন সত্যিই সমুদ্র। তল খোঁজে অভয়। ভিতরে ডুব দেয় সহচরীর শরীরে। অদ্ভুত এক স্বপ্ন দ্যাখে। স্বপ্নটা ভুলেও যায় ঘুম ভাঙলে। 

চতুর্থ সন্তান পেটে নিয়ে জননী দ্বীপভূমি ছাড়ল না, নদীঘেরা সেই ভূখণ্ডে বসে চতুর্থ জনের অপেক্ষায় থাকল। স্ফীত হতে লাগল গর্ভ। রক্তমাংসে চাঞ্চল্য এল, শরীর তৃষিত হতে লাগল বারবার। বৈশাখী পূর্ণিমাতেই ফাল্গুনে উদিত অগস্ত্য নক্ষত্র অস্ত গিয়েছিল প্রায়। অস্ত গেল সেই তারা। বৈশাখী পূর্ণিমা, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা, আষাঢ়ের পূর্ণিমা, শ্রাবণের, ভাদ্রের যেতে লাগল। অমাবস্যাও যেতে লাগল। প্রতিটি তিথি ঘুরে ঘুরে আসতে লাগল, চলেও গেল। আকাশের নক্ষত্র দিক বদল করতে লাগল। পশ্চিম আকাশে লুব্ধক নক্ষত্রটি জ্যৈষ্ঠে দিগন্তে সরে গেল, আষাঢ়ে হারিয়েই গেল আকাশ থেকে। বৈশাখী পূর্ণিমায় যে চাঁদ ছিল বিশাখা নক্ষত্রের কাছে, জ্যৈষ্ঠের এই তিথিতে তা গেল জেষ্ঠা নক্ষত্রের কোলে। উত্তর-পূর্ব আকাশে অভিজিৎ নক্ষত্র জেগে উঠল জ্যৈষ্টের রাতে। হারানো তারারা ফিরে আসতে লাগল, পুরনো তারারা হারিয়ে যেতে লাগল। কত সব তারা, কত না তাদের নাম। উত্তর-ফাল্গুনী, পূর্ব ফাল্গুনী, প্রথম পুনর্বসু, দ্বিতীয় পুনর্বসু, পুষ্যা, মঘা, আদ্রা, স্বাতী, অনুরাধা, চিত্রা, অরুন্ধতী, অভিজিৎ-আকাশময় ছড়িয়ে থাকা তারারা কেউ পশ্চিমে সরতে লাগল, পশ্চিম দিগন্তে অদৃশ্য হল, কেউ পূর্ব-দিগন্তে মুখ দেখাল। তারা দেখতে দেখতে, অন্ধকারে শত শত নক্ষত্রের আলোর জল গ্রহণ করতে করতে জননী শুনতে লাগল দ্বীপ ঘেরা নদীগুলির কথা। নোনা মাটির ভিতরে কষ্ট করে বেঁচে থাকার কথা, মানুষ কী ভাবে বেঁচে আছে, সেই কথা। আষাঢ় গেল। মেঘে ঢাকল স্বাতী নক্ষত্র, ধ্রুবতারা, সপ্তর্ষিমণ্ডল। বৃষ্টির সঙ্গে নেমে আসতে লাগল মেঘের আড়ালে থাকা তারার আলো। আলোর জল গ্রহণ করতে লাগল জননী। শ্রাবণে, ভাদ্রে ভরা জোয়ারে নদী বাঁধ ভাঙার শব্দ শুনতে পেল জননী। সেই ভাঙা বাঁধ রক্ষা করতে লাগল যে মানুষের যুথ তাদের কণ্ঠস্বর শুনল জননী। শুনতে শুনতে তার চোখে জল এল। পৌষে যখন সন্তান ভূমিষ্ট হল আকাশে সপ্তর্ষিরা নেই, নেই অরুন্ধতী, আছে শতভিষা, রেবতী, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিণীরা। 

চতুর্থটি জন্ম নেবার ক'মাস বাদে এমার্জেন্সি উঠে যায়, ভোটের বাদ্যি বাজে। দুজনকে ঘুম পাড়িয়ে দু'জনকে বুকের দুধ দিতে দিতে একদিন জননী সহচরী শুনল সরকার বদল হয়ে গেছে। অভয় পাত্র এই সময় বদলি হল পুলিশ লাইনে, জেলা সদরে। 

সহচরী বলে, এই ভালো। 

ভালো কী, এ তো পানিশমেন্ট। 

তাই-ই ভালো। 

না ভালো নয়, ছ'টা মাস যাক, তারপর আবার নিজের জায়গায় ফিরে যাব। 

ছ'মাস নয়, দেড়বছর গেল থানায় ফিরতে। চার সন্তান নিয়ে সহচরী চলল স্বামীর পিছনে পিছনে। চার সন্তানের জননী হয়েও সহচরীর শরীর ভাঙেনি এতটুকুও। লাবণ্য বেড়েছে। অভয়ের কাজ এখন অন্য। চাষার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। অভয় বাড়িতে বসে খিস্তি করল, শালা, অপারেশন বর্গা আরম্ভ হয়েছে। সব জমি দখলের ফন্দী, পুলিশ এবার ল্যাংটো চাষার পিছনে ছাতা ধরবে। 

দেড় বছরের মাথায় অভয় মারল একটাকে। অহেতুক মারা গেল লোকটা, পকেটমার। বুকে অভয়ের লাথি পড়তেই তার চোখ উল্টে গেলে হৈ হৈ হল। অভয় বলল, রুগ্ন ছিল, রোগে মরেছে। 

না তুমি? 

আমি নই, একটা লাথি সহ্য না করতে পারে যদি পকেট মারতে গিয়েছিল কেন? 

তুমি মারলে! 

না। 

অভয় বদলি হল আর এক থানায়, সেখানে আবার মরল আর একজন, রিকশাওয়ালা। 

সহচরী বলল, তুমি? 

না, লোকটা অ্যান্টিসোশ্যাল, মরেছে না লোকে বেঁচেছে। 

সহচরী আবার সন্তান ধারণ করল। ছয়-সাত সন্তানের জননী হয়ে সহচরী অভয়ের সঙ্গে চলল নতুন থানায়। অভয় এখন বারবার বদলি হয়। যত মৃত্যু, তত সন্তান, তত বদলি। বদলি, প্রমোশন সব হয় অভয়ের। থানার বড়-বাবু হয়ে শিল্পাঞ্চল গেল। 

এ থানা অনেক বড়, বড়বাবুর সাতটি বাচ্চা দেখে মেজ-বাবু, ছোট-বাবু কনেস্টেবল, সিপাইদের বউরা অবাক। সাতটি বাচ্চা নিয়ে মা বসে আছে। মেজদারোগা, ছোটদারোগা, কনেস্টেবলের বউরা ঘিরে ধরল তাকে, সব তোমার? 

হ্যাঁ আমার। 

এই পেটের? 

হ্যাঁ এই পেটের। 

বুকে কী দুধ! বিস্ময় প্রকাশ করে মেজ-দারোগার বউ বিষন্ন হয়ে বলে, একটার বেশি হলই না আমার। 

আমাদের কারোর হল না, ভুলেই গেলাম পেটে ধরতে। ছোট-দারোগার বউ বলে। 

‘যতবার পেটে ধরি, খালাস করে নিয়ে আসে’ বলল কনস্টেবলের বউ, সন্দেহ করে পেটেরটা বোধ হয় ওর নয়। 

মেজ-দারোগার বউ বলে, দুটো চেয়েছিলাম, দেয়নি। 

সহচরী হাসে দুটি বাচ্চাকে দুই বুকে চেপে, এসব আমার, ও দেয়নি। 

দেয়নি, কী বলছ তুমি? 

আমি নিজেই পেটে ধরেছি সব, ও শুধু ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি আমাকে, যতবার চেয়েছি ততবার এরা পেটে এসে গেছে। 

তাই কি কখনো হয়? বলল কনস্টেবলের বউ, একথা শুনলে আমাকে পিটিয়েই মেরে ফেলবে ও, এসব শুনতে নেই। 

সহচরী বলে, এসবই সত্যি। 

যদি সত্যি হতো, আমার ইচ্ছেয় আমিই পেটে ধরতাম, পুরুষমানুষ যদি না লাগত আমাদের! 

সহচরী বলে, ওটাও সত্যি। আমি যদি আবার ইচ্ছে করি, পোয়াতি হবো। 

আবার! 

হ্যাঁ আবার। 

তিনটি বউ গালে হাত দেয়, কী আশ্চৰ্য্য কথা তুমি শোনাও গো, তাও কি কখনো হয়, কোকিল কখনো কথা কয়? 

কয়। 

দুই বুকে এত বাচ্চা দুধ খায়, পারো কী করে? 

সহচরী বলে, আমার গা চেটেই ওরা দুধের গন্ধ পায়। 

কী আশ্চর্য! 

আমার সমস্ত গায়েই দুধ। 

তিনটি বউ এ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সাত সন্তানের জননীর দিকে, একজন বিড়বিড় করে, কী করে হল সাতটা, বড়-বাবু বারণ করেনি? 

করতে পারেনি? 

কেন? 

মনে ভয় ছিল। 

কিসের ভয়? 

শোনো তবে...। সহচরী বলতে আরম্ভ করে। তার কথা শুনতে শুনতে তিনটি বউ কাঁপতে থাকে, এসব কী বলছ তুমি, এতো আমরাও জানি, আমাদের স্বামীরাও...। 

শুনতে শুনতে তিনটি বউ-এর চোখ ভারি হয়। চোখ ছলছলে হয়ে যায়। জল ঝরতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে তারা বলে, সব আমাদের জানা, জানি জানি, তুমি ওদের দাও, বাচ্চাদের দাও, আমরাও দুধ দিই, এ কী বুক টানটান করে কেন, দাও, দাও। 

তিনটি-বউ এ ছটি বাচ্চাকে টেনে তাদের শুকনো বুকে চেপে ধরতেই দুধ গড়াতে লাগল বুক দিয়ে। তাদের শুকনো স্তনে দুধ এসে গেল। বড়-বাবু, মেজো-বাবু, ছোট-বাবু, কনস্টেবল এক সঙ্গে দেখল এই দৃশ্য। আটটি স্তনে আটটি শিশু। চারটি জননী দুলে দুলে গাইছে ঘুমপাড়ানি গান, ‘ঘুমাও তিমির, ঘুমাও যোগেন, ঘুমাও পার্বতী…। 

কাদের নাম করছ? বড়-দারোগা অভয় পাত্র ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করে। 

যাদের পেটে ধরেছি। 

বড় দারোগার দুটি চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। আটটি শিশুর মুখের দিকে তাকায় অভয় পাত্র। চেনা মনে হয় কি? নাকি এ হলো আট সন্তানের জননীর মনের মায়া। বড়-দারোগা, মেজ-দারোগা, ছোট-দারোগা, কনস্টেবলের বউগুলির মনেরকথা। বড়-দারোগা বিড়বিড় করে, তারাই যদি হবে মরল কারা এতদিনে? 

আট সন্তানের জননী বলে, কেউ মরেনি, এই দ্যাখো। 

বড়দারোগা শুনল, কেউ মরিনি, এই দ্যাখো। আটটি শিশু খলবল করে ওঠে, যোলটি হাত, ষোলটি পা, ষোলটি চোখ বড় দারোগার সামনে পুষ্ট হতে থাকে। পুষ্ট হয় শরীর। জননীরা বুক এলিয়ে শুয়ে আছে। বড় দারোগা টের পায় যত মানুষ শ্মশানে, কবরে যায় প্রতিদিন, যত মানুষ বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মর্গে পচে, ইদুরের খাদ্য হয়, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি মানুষ মা জননীর কোলে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমায়, বেড়ে ওঠে, উঠতে থাকে। কতজনকে নিশ্চিহ্ন করবে সে? এর চেয়ে হরিশ মিদ্যের বউ এর মতো এই মেয়েমানুষটাকেই যদি নিকেশ করে ফেলা হত সময়ে, যে প্রাণবায়ু ছেড়ে গিয়েছিল মৃতের শরীর, সেই প্রাণবায়ু আকাশ থেকে আহরণ করতে পারত না সহচরী। 

জননীরা ঘুমপাড়ানি গান গাইছিল। সেই গানে শিশুরা জেগে উঠেছিল, ঘুমিয়ে পড়ছিল বড়-দারোগা, মেজ-দারোগারা। বাইরের আকাশে মেঘ এসেছে বৃষ্টির। এ মেঘ তাপ হরণের, বীজ বপণের, ফসলের। এই মেঘ বহন করে আনে মৃত মানুষের প্রাণবায়ু। জননীরা মৃত্তিকার মতো গর্ভবতী হয়ে উঠেছিল আবার। মৃত্তিকার স্বভাব ও প্রকৃতি পেয়ে গেছে তারা এতদিনে। শুভশঙ্কর, তিমির, যোগেন, পার্বতীর মায়েরা। 

৬টি মন্তব্য: