মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা সাগুফতা শারমীন তানিয়া'র সেরা গল্প : গোল্লাছুট


এই গল্পটি নিয়ে আলাপ--

গল্পপাঠ-

গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন—

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

এ বছর মে মাসের শেষদিকে লেখা গল্প এটা। লন্ডনে বসেই লেখা।
গল্পপাঠ-

 গল্পটি লেখার সময়ে  কী কাজ করছিলেন, কী পড়াশুনা করছিলেন বা কী লিখছিলেন?

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--
গল্পটি লিখবার সময় আমি কাজ করছিলাম শিক্ষক হিসেবে, এডুকেশনে পোস্টগ্র্যাড সার্টিফিকেটের জন্যে পড়ছিলাম, ম্যাক্সিমা-মিনিমার অংক করছিলাম মনে আছে। 

গল্পপাঠ- 
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন—

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

গণিত ক্লাসে পেয়েছিলাম। বহুদিন পর আবার উচ্চতর গণিত করছিলাম, তখন অদ্ভূত সব চিন্তা মাথায় আসতো। কোনো একটি অধ্যায় সমাপ্ত করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, মানুষ কখনোই একবারমাত্র বিশ্বাসভঙ্গ করে না এই সংকল্পটি গাণিতিক সূত্র আরোপ করে সমাধা করা যায়। কিন্তু গণিত একটি জায়গায় এসে অসাড় হয়ে যেতে বাধ্য, সেটি হচ্ছে মানবচরিত্রের হুইমসিক্যল দিকটির কাছে সে পরাজিত হবে। 

গল্পপাঠ-

এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন?

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

আগ্রহী হয়ে উঠলাম কেন এর ব্যাখ্যা দেবার মতো স্থিতি আসলে সাহিত্য দেয় বলে আমি মনে করি না, খতিয়ে দেখবার অবকাশ দেয় না, লিখিয়ে নেয়। শুধুই গল্প না বলে একটি গল্প বলা যায় কি না তা হয়তো ভাবছিলাম। 
গল্পপাঠ-
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন?— 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

এই গল্পটা এক বসায় লেখা। খুব বড় লেখা না হলে আমি সাধারণত দু’বারের বেশি বসি না একটি গল্পে। যখন হাতে লিখতাম, তখন একবারও কাটাকুটি না করে লিখতাম পাতার পর পাতা, সেটাই ছিল আমার জেদ...যে বাক্য মন থেকে আসবে তা একেবারে পেকে টুপ করে পড়বে হাতে। কম্পিউটারে লিখবার সময় থেকে এডিট করবার অভ্যাস হয়েছে। এডিট করার অভ্যাস লেখকের জন্য জরুরি অভ্যাস। 

গল্পপাঠ-
লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে?

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

পুরোটা ভেবে লেখেন যারা, ছকে নিয়ে লেখেন সেইসব ভাগ্যবানদের দলে আমি পড়িনি। আমার শুরু হয় সামান্য ইন্ধন থেকে, একটি মেটাফোর বা ‘অনিলের প্রায়’ চলে যাওয়া চলমান কোনো চিন্তা থেকে। মূল ভাবনা পালটায় কিংবা গড়ে ওঠে এই প্রক্রিয়ায়। 

গল্পপাঠ-
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন?

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

আমার গল্পের প্রথম পাঠক সাধারণতঃ আমি নিজে। অথবা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। এখানেও আমি ভাগ্যবিড়ম্বিত, পড়ে শোনাবার বা পড়িয়ে নেবার কেউ নেই। এ পরবাসে সকলেরই বড় তাড়া... যাঁদের তাড়া নেই, তাঁদের আবার সাহিত্যরুচি নেই। যাঁদের সে রুচি আছে, তাঁরা ষষ্ঠরিপুতাড়িত। তবে এ বছরের শেষ দিকে এসে আমার এই দুর্ভাগ্য ঘুচেছে, সাহিত্যরুচিসম্পন্ন দোসর জুটেছে কপালে। তিনি পাপড়িন নাহার আপা। 

গল্পপাঠ-
 লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন।

সাগুফতা শারমীন তানিয়া--

এ প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজি না, এক্ষেত্রে নিরুদ্বিগ্ন থাকতে ভালবাসি। ক’দিন পর ফিরে আসি, জোরে জোরে পড়ে কিছুটা বদলাই হয়তো। চাইলে আবার একটু বদলাই, খুচরো বদল।



সাগুফতা শারমীন তানিয়া'র গল্প : 
গোল্লাছুট


অনেকদিন ধরেই এক মুষ্টিযোদ্ধা আরেক মুষ্টিযোদ্ধাকে যেমন কেবল মার না খাওয়ার জন্যেই জড়িয়ে ধরে, যে আলিঙ্গনে সামান্য সময়ের যতিপ্রার্থনা ছাড়া আর কিছু নেই, তেমন করেই তারা হয়তো জড়িয়ে ধরছিল একে অপরকে। শরীরে, শরীরের বাইরে সংসারের কর্মযজ্ঞে। এইসব সময়ে লোকে পরনারী বা পরপুরুষের কাছে গিয়ে মৃদু বিষন্ন স্বরে বলে, “সে আমাকে একদম বোঝে না।” একেবারে শৈশবের ‘চয়নিকা’ বইটার মতো পাঠ্য হয়ে গেছে তারা, বড় বেশি বোধ্য একে অপরের কাছে, বড় বেশি বুঝতে পারলে আর ভাললাগে না, এমন কথা সবাই লুকোতে চায়। লুকোতে চায় এতদিনের দীর্ঘ সহবাসে অর্জিত অভ্যাসগুলিকে কুমোরের আঙুলের মতন একঠাঁই রেখে তাদের সঙ্গীরাই আকার দিয়েছে, লুকোতে চায় এই জীর্ণ- ছিন্নপ্রায় সম্বন্ধের আড়ালে চাপা পড়ে আছে কতদিনের প্রীতি, কত সান্নিধ্য আর বোঝাপড়া। শুধু রৌদ্রসমক্ষে মেলে দিতে চায় জীর্ণ যা কিছু কাঁথাকানি, মনে সাধ দমকা কোনো বাতাস উড়িয়ে নেবে এই ছেঁড়া টুকরোটুকু। 

প্রথম প্রথম তারা খুব ঝগড়া করতো, ঝগড়া কাজ করতো আরকের মতো। তারপর সেই টনিকের ক্ষমতা কমতে লাগলো। ঝগড়ার পরে আর কেউ কাউকে খুঁজতো না আড়ি ভাঙবে বলে। নৈঃশব্দ্য দীর্ঘ হতে লাগলো, বিস্তৃত হতে লাগলো। স্তব্ধতা মানেই অন্য কোথাও কাকলী শোনা যাবে, অন্য কোনো ভোরের। এই সন্দেহ তাদের কুরে কুরে খেতে থাকলো। একে অন্যের দেরী করে ফেরা, চেনা মানুষের সাথে আদিম সখ্যতা আর অচেনা মানুষের সাথে নতুন সখ্যতা এইসব খতিয়ে দেখতে লাগলো তারা। খতিয়ে দেখতে তারা এত সঞ্চয় ভাঙতে থাকলো যে তারা ভালবাসাবাসিতে নিস্পৃহ আর অক্ষম হয়ে যেতে থাকলো। তারপর একদিন সচকিত হয়ে তারা আবিষ্কার করলো, তারা একই প্রতীক্ষায় অপেক্ষমান। কেউ এসে তাদের একজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাক। অন্য কোনো দিকে। 

গল্পটা এত কমন যে এটা মুনা আর মাহবুবের হতে পারে। হতে পারে শ্রীজিত আর দেবলীনার। হতে পারে মুনা আর শ্রীজিতেরও। অতএব এইটুকু বেনামীতে লেখাই যেতে পারে। এইরকম করে সর্বনাম-যোগে। এভাবে লিখবার অসুবিধা হচ্ছে, শব্দগুলি ব্যাকুল হতে থাকলে মনে হতে পারে এ আমারই গল্প। কিন্তু এটা আমার গল্প নয়। এটা তোমাদের গল্প। তীর্থ আর সুরাইয়া। তোমরা এমন একটা সমাজে বাস করো, যেখানে বিবাহবিচ্ছেদ আবিষ্কৃত হয়েছে বহুকাল হয়। এইসব বৈকল্য যেন আস্ত জীবনটাকেই খেয়ে নিতে না পারে, সেজন্য। যেন বৈকল্য মানে একটা পৌরাণিক মাছ নয়, যে পয়গম্বর অব্দি খেয়ে ফেলতে পারে, আর জীবন! উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার সুবাদে রক্ত দেয়া যায় আরেক দেহে, ডিম্ব ধার দেয়া যায় আরেক জরায়ূতে, দেয়া যায় চোখ, দেয়া যায় যকৃত, দেয়া যায় অস্থিমজ্জা, একদিন নিশ্চয়ই জীবনও অদলবদল করা যাবে। এই ধরো তীর্থ গিয়ে মাহবুবের সাথে জীবন বদলাবদলি করে ফেলতে পারবে, মানে শুধুই একরাত্রির স্ত্রী অদলবদল করা টাইপ ব্যাপার না। আমূল জীবন। জিভের লক্ষ লক্ষ স্বাদকোরকে তীর্থ যে স্বাদ নিতে থাকবে সেটা মাহবুবের, মাহবুব আড্ডায় মার্কেজ কপচাতে কপচাতে হঠাৎ এক রকমের নিরর্থকতার সামনাসামনি হতে থাকবে সেটা তীর্থর। মুনার মাথার ভিতরে যা ড্রাগনফ্রুট রঙের জর্জেট শাড়ির সাথে একচিলতে শাদা-কালো বলপ্রিন্টের ব্লাউজ পরতে বলবে সেটা দেবলীনার মাথার প্ররোচনা। দেবলীনা যে স্মৃতি ভেবে রাতে ঘুম ভেঙে কেঁদে জেগে উঠবে সেটা মুনার। দাসের হাটের মতো করে আবার জীবন বিকিকিনি হবে ধরো, এইবার শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, দাস বেচবে তার আশীরপদনখ জীবন, ধরা-অধরা সব। এইসব ভবিষ্যদ্বাণী করতে থাকলেই তীর্থ আমাকে অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নটা করবে, আমি কার সাথে আমার জীবন অদলবদল করতে চাই, এ প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই, থাকলেও দেব না, অতএব আমি এখন প্রসঙ্গ বদলাব। 

আচ্ছা, আমি মানছি, মানুষ মানুষকে অনেক অধরা এখনো সংক্রমণ করে দেয়। এই ধরো তীর্থর বাবা-মায়ের সাথে তীর্থর ছোটখালা থাকতো। এই বিধবা ছোটখালা রাতের বেলা তীর্থর বাবা-মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমোতে যেত, কখনো যেতে না চাইলে তীর্থর বাবা জোর করে এসে নিয়ে যেত। তীর্থরা চার ভাইবোনই আশৈশব এ কথা জানে। এখন, তীর্থ যে অসম্ভব হৃদয়হীন ব্যবহার মাঝে মাঝে মুনার সাথে, সরি সুরাইয়ার সাথে করে ফেলতো, সেটা শিশুবেলায় সংক্রমিত নয়? তখনকার অসহ স্মৃতির তাড়না নয়? হৃদয়হীনতার এই ম্যাগনিচ্যুডের সাথে শৈশবস্মৃতির সম্বন্ধ তো আছে। তীর্থর বাবার এমন ব্যবহারের সাথেও হয়তো এইভাবে আর কারো দেয়া দুঃসহ স্মৃতি আছে। এইসব একটা তীব্রতায় পৌঁছে গেলেই মানুষ অপর মানুষের সাথে জীবন বদলে ফেলতে পারবে, তারপর আরেকজনের সাথে, তারপর আরেকজন, জীবন একটা মাপসই জুতোর মতো হয়ে উঠবে, পায়ে গলিয়ে নিলেই হলো, পা বের করে অন্য জুতোয় পা গলালেই হলো। 

আমার এই চিন্তাটা তীর্থকে বলতেই সে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো একদিন। একদিন ধরো আমার মনে হলো, তীর্থকে আমি জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইছি এই প্ররোচনাটা সুরাইয়ার। কিন্তু এই বিষয়টা তাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলতে বলতেই আমার মনে হলো, ধরো আমি মুনার সাথে জীবন বদলাতে যাচ্ছি, মনেই হচ্ছে মুনার মাথার ভিতরে ড্রাগনফ্রুটরঙা জর্জেটগুলির সাথে (ওহো, এটা না দেবলীনার মাথাতে ছিল?) আমি ভাল থাকবো, কিন্তু মুনার জীবনে প্রবেশ করেই দেখলাম, আমি লোহার বাসরঘরে ঢুকেছি, ফোঁস ফোঁস করে অজস্র সুতাশঙ্খ সাপ ঢুকছে শুধু... প্রথম মানুষের শরীরে রুহ ঢুকবার পরেই যেমন দপ করে নিবে গেছিল রুহের স্পৃহা, ভয়ে বলে ফেলেছিল ‘আমিই স্বয়ম’... (ঠিক বলছি কি না সেটা তীর্থর বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে, ওঁর এইসব খুব জানা।) তেমন একটা ভয় আমাকে ধরো বিহ্বল করে দিল। আমি ভুলে গেলাম এ’কথা যে— জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠলেই আমি ফের জীবন পাল্টাতে পারবো, ভুলেই গেলাম আরেকবার খুশিয়াল রঙে আঁকা আরেকটা জীবনে ঢুকে গেলেই হবে। এভাবে ভুলে গেলে তখন আমার কী হবে? মুনার ঐ জর্জেটগুলির ভিতরে ফাঁস লেগে আটকা পড়ে থাকবো? 

তারপর ধরো, মাহবুব খুব আগ্রহ করে চিত্রনায়ক তমালের জীবনে ঢুকে গেল, এন্তার মেয়েমানুষ নাড়াচাড়া করবে বলে। অথচ গিয়ে দেখলো, তমালের নিরুদ্যম জীবনে সে আর মাহবুবের স্পৃহা খুঁজে পাচ্ছে না, সব আলুনি লাগছে, মানে অবশ্যই মাহবুব তীর্থর কাছে বা এমনকি দেবলীনার কাছেও গিয়ে জীবন বদল করতে পারবে, করতেই থাকবে। কিন্তু যখন ইচ্ছা তখনই জীবন বদলাতে পারলে মাহবুব-শ্রীজিত বা তীর্থ এই জীবনের দুরূহ দিকগুলি সামাল দিতে চাইবে তো? বোধ করি চাইবে না। জীবন দুর্বিষহ হওয়ামাত্র তারা জীবন পাল্টাবে। তাহলে এইসব ‘উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ’ মার্কা কবিতার লাইনের কী হবে তখন! তার চেয়ে বড় কথা, মুনা বাড়ি ফিরে এসে দেখবে মাহবুব নেই, আছে শ্রীজিত। শ্রীজিত ছুটিতে বালি যাওয়ার আগাম টিকেট করবে দেবলীনার সাথে যাওয়ার জন্য অথচ যাবে সুরাইয়ার সাথে। আচ্ছা, একটা কথা তো ভাবতে ভুলেই গেছিলাম, জীবন বদলাতে জানলে এবং ক্রমাগত জীবন পাল্টাতে পারলে কার অপরাধে কার কারাদন্ড হবে, কার মৃত্যুদন্ড বিধান করা হবে? অবশ্য তদ্দিনে মৃত্যুদন্ডের মতো ব্যাপারগুলি থাকবে বলে মনে হয় না। 

এইসব নিয়ে মাথা ঘামাই বলেই তুমুল বৃষ্টির রাতে ভালবাসাবাসির সময় আমিই তীর্থকে জিজ্ঞেস করে ফেলি, আমি কে? সুরাইয়া না চামেলীখালা? আমি তীর্থকে বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হই যে, এটা আমার নিতান্ত ভালমানুষি জিজ্ঞাসা, আমি তো জানতে চাইতেই পারি- তীর্থ এই যে আমাকে সজল চোখে তার শৈশবে তাকে মরা-তেলাপোকা দেখিয়ে ভয় ধরানোর গল্পটা বল্লো সেটা আমাকে কে ভেবে বল্লো। আমি তো জানতে চাইতেই পারি, এই যে আমার বুক হাতে নিয়ে তীর্থ ফোঁসফোঁস করে উঠছে, সেটা আমার জন্যে কি না। মানে, আমি চাইতে পারি না, যে শৈশবের গল্পভাগাভাগির বা বুকে হাত দেবার এইসব নিবিড় সখ্য যেন গরঠিকানায় না যায়? এ’সব প্রশ্নের ফলাফল ভাল হয় না। তীর্থ তার জীবন বদলাতে চায়, আমিও আমার, কিন্তু এখনো বিজ্ঞান অদ্দূর গেল না বলে আমাদের থেতো মুখে যার যার জীবনে বসে থাকতে হয়। 

পাশ ফিরতে ফিরতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, সেটা এখনো আমার। অন্ধকারে ঝুপঝুপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আমার মনে হয়, তীর্থ যার কথা ভেবে আমার ওপর সহিংস হয়, তার জীবনটা আমার নয় (আঘাত সইতে হয় তাতে কী! তীর্থ আমাকে যে-ই ভাবুক, তাতে কী!)। ভাগ্যিস। অন্ধকারে সুজনিতে মেলে রাখা শরীর খাতার মতো টানটান মেলে আমি আয়েস করে ভাববো, এই যে আমি, আকাঁড়া, নির্জলা, শুধুই নিজেকে দিয়ে বিভাজ্য। এই যে মাথার ভিতরে দমবন্ধ উত্তেজনায় ‘হুজ অ্যাফ্রেইড অভ ভার্জিনিয়া উলফ’ দেখার স্মৃতি, শৈশবে চকা নিকোবর হাঁস আমাকে শিখিয়েছিল ‘সমস্যা’ শব্দটা সংস্কৃত মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করতে হয় এমনি তার ওজন, একদম প্রথমদিন তীর্থকে দেখে মনে মনে বলা ‘বাহ!’... এইসব আমার যুধিষ্ঠীরের কুকুর, এদের ছেড়ে আমি অন্য দেহে কী করে যেতে পারি! স্থানান্তরযোগ্য নয় এরা, এরা স্থাবর। কাল আমি অনলাইনে খুঁজব ড্রাগনফ্রুটরঙা জর্জেট শাড়ি সত্যি পাওয়া যায় কি না। ড্রাগনফ্রুট কাটলেই যেমন শাদাকালো বীজের ম্যাট্রিক্স থাকে, মানে যেটা আসলেই ফলটুকু, ব্লাউজের জন্য তেমন একটা ছিটের কাপড় পাওয়া কোনো ব্যাপারই না। মুনা বা দেবলীনা এই কম্বিনেশন ভাবতে পারবে না, মানে আমার সাথে জীবন না বদলালে। যতক্ষণ আমি জীবন অদল-বদল করতে চাইবো না, ততক্ষণ আমি এই গন্ডিকাটা গোল ঘরটায় গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবো, উৎখাত না হওয়া অ-জনপ্রিয় সরকারের মতো। 
রচনাকাল।
২৬/০৫/২০১৮ 




লেখক পরিচিতি

সাগুফতা শারমীন তানিয়া 
জন্মস্থান : ঢাকা
পড়াশুনা : স্নাতক বুয়েট, স্নাতকোত্তর যুক্তরাজ্য। 
বর্তমানে পূর্ব লন্ডনে থাকেন। 

প্রকাশিত বইয়ের নাম—

১. 'কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম দিনের গান'--(নভেলা ),  প্রথম বই, ভাষাচিত্র প্রকাশনী। 
২. 'ভরযুবতী, বেড়াল ও বাকিরা'--(গল্পগ্রন্থ)। শুদ্ধস্বর প্রকাশনী।  
 ৩. 'অলস দিন-খয়েরি পাতা-বাওকুড়ানি'---(উপন্যাস)। শুদ্ধস্বর প্রকাশনী।
 ৪. 'আনবাড়ি'-- (লুনা রুশদীর সঙ্গে লেখা যৌথ গল্পগ্রন্থ)। শুদ্ধস্বর প্রকাশনী। 
 ৫. ইভ গ্রীন--(অনুবাদ)। আদর্শ প্রকাশনী। 
৬. 'উত্তর- দক্ষিণা'--(রূপকথার গল্পগ্রন্থ)।  প্রথমা প্রকাশনী। 




৮টি মন্তব্য:

  1. আজকাল গল্প পড়ার ধৈর্য্য থাকে না। শুরু করার পর এই গল্পটি কখন শেষ হয়ে গেলো!আর আমি গল্পটির ভেতরে রয়ে গেলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. এই অনবদ্য বয়ন, তার প্রতিটি বাঁকে ও স্তর বিন্যাসে, মানুষের সম্পর্কের যে আশ্চর্য গভীরতার অনির্ণেয় কেন্দ্রের দিকে টানতে থাকে, তাকে এই সামান্য মন্তব্যে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি, এককথায়, অভিভূত!

    উত্তরমুছুন
  3. আশ্চর্য! আমি নিজেই বিভ্রাটে পড়ে গেছি,কার জীবন যাপন করছি আমি!!
    লেখককে অভিবাদন

    উত্তরমুছুন
  4. চালিত যাপন খুঁড়ে চলা এ অনন্য বয়ানে কীই বা বলার থাকতে পারে! কেবলই ছোট বড় মাঝারি জানালা খুলতে থাকা অন্যতর এক আখ্যানে। বেশ।

    উত্তরমুছুন
  5. গল্পটি পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে বসে আছি।

    উত্তরমুছুন
  6. সমস্ত রহস্য আমার মধ্যে । একান্ত নিজস্ব চেনা/অচেনা এক আচরণবিধি দ্বারা আমি তাড়িত

    উত্তরমুছুন