মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

শাহাব আহমেদ'এর গল্প : ঝড়

দক্ষিণে লোকজন, শহর ও অপরাধ বেশী। উত্তরে গরু ঘোড়া গাছ-পালা হাঁস আর সারস। দক্ষিণে কৃষ্ণচুড়া, আম -জাম, লিচু হয় । উত্তরে ওরা বাঁচতেই চায় না। 

ড. সৈকত আহসান ত্রিশ বছর ধরে বিবাহিত । বৌ খুব ঠান্ডা কাতর।

সব কিছুতেই তার ভয় ও অস্বস্তি, কিছুটা ছুঁতিবাই গ্রস্ত, নিরীহ, বোবা না হয়েও প্রায় বোবা। 

দেখতে সুন্দর কিন্তু সোনা নয়, চাঁদের মত রূপালী ও শীতল। বেশী লোকের ভীড়ে ঘেমে কেঁপে ওঠে। কোন বন্ধু বান্ধব নেই।

কাজ করে ঘরে ফিরে আসে। ফুলের যত্ন করে, কাকাতুয়াকে খেতে দেয়, বিড়ালকে আদর করে, কুকুর নিয়ে হাঁটে। ছোট্ট শহরে বাঙ্গালীবিহীন নির্বান্ধব ডাক্তারের কফিনে মোড়া জীবন। হাসফাস লাগে বলেই সে একটু আধটু লেখালেখি করে। যৌবনে অভ্যাস ছিল কিন্তু জীবন চুল্লির ছাই-ঢাকা ছিল এত কাল। টুকটাক লেখে অতীত অভিজ্ঞতা ও জীবন দর্শন নিয়ে। ফেইসবুকে কিছু পাঠক গড়ে উঠেছে যারা প্রশংসা করে করে তাকে লেখক বানানোর সার্বক্ষণিক তৎপরতায় ব্যস্ত। ডাক্তারেরও পেশার চেয়ে লেখার নেশায় পেয়ে বসে। মানুষের কেউ বাঁচে কড়ি গুনে, আর কেউ গুনে কড়িকাঠ। না- কড়ি, না- কড়িকাঠ, কোনটাই তাকে এখন আর বিশেষ টানে না। ইচ্ছে হয় না এই ভাবে জীবন কাটিয়ে চলে যেতে। লিখতে ইচ্ছে করে। অনেক অনেক লেখা । জীবনের, ভালোবাসার, ভালোলাগার, অনুভূতি ও অপ্রাপ্তির গল্প। ফলে স্ত্রীর পাশে থেকেও সে নেই, অনবরত কেমন এক ট্রান্সের মধ্যে। 

মাঠে গরুগুলো যেমন, বা বন জঙল পীচ পথে কাঠবিড়ালীগুলো, সে তেমন বোবা ও বোকার মত গাছের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়। মেঘের সাথে চিল হয়ে উড়ে যায় তার মন । রৌদ্র চিকচিক করে, কালো মেঘ ঘনতর কালো হয় এবং যে ভালোবাসা ছিল এক কালে অতি তীব্র এবং উত্থিত কামানের মত তা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। থাকে শুধু অভ্যাস ও আলসেমী। যা ছিল সামনে চিরকাল তাই কবে পেছনে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছে সে বুঝে উঠতে পারে নি। 

প্লেন ছেড়ে ছিল ঠিক সময়েই । ট্রানজিট থাকার কারণে এসে থামলো মাঝ পথে ছোট্ট কোন এক এয়ারপোর্টে। এখানে আসতে অসুবিধা হয়নি কিন্তু যেতে ঘাপলা বাঁধল । ঝড় উঠলো। তীব্র ঝড়। প্রথমে দেরী ঘোষণা করা হলো এক ঘন্টা। তার পরে বেশ ক'বার পিছিয়ে দেয়া হল সময় । এখন অনির্দিষ্ট কালের জন্য কোন ফ্লাইট নেই । ঝড় থামার লক্ষণ নেই। ডাক্তার বই খুলে বসে। ঝড় চলছেই, জানালার বাইরে হুলুস্থুল ব্যাপার। 

দূরে দুই রো সামনে এক নারী, মুখামুখি বসে। যুবতী নয় পরিণত, যৌবন এখনও সব ধান কেটে নিয়ে মাঠ শূন্য করে চলে যায় নি । শাড়ী ঢাকা নির্মেদ শরীর । উপমহাদেশের নারী । ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশের হয়তো। মুখের গড়নে বাঙালিয়ানা আছে যদিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। লক্ষ করেছে তার মুখে কসমেটিকস খুব সামান্য । মুখে কী একটা সৌষ্ঠবের ত্বিষা। চেহারাতে কিছু একটা আছে যা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তারও হাতে বই। 

সে তাকিয়েছে ডাক্তারের দিকে কয়েকবার । কোন একটা তন্ময়তার ইলেক্ট্রো- ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরী হয়েছে। বাইরে ঝড় বইছে। ঝড়ের আগে ও ঝড়ের পরে পৃথিবীটা এক থাকে না। অনেক কিছু বদলে যায়। অনেক গাছ উপড়ে পড়ে, অনেক ডালপালা ভাঙে, সুদর্শন রাজপথ ঝরা পাতা ও ঝরা কান্নায় নোংরা হয়ে থাকে। মানুষের জীবনে যেমন। আবার কিছু জিনিস বদলায় না, কিছু মানুষ আগের মতই রয়ে যায়। যদিও ডাক্তার জীবন্ত মানুষ নিয়ে কাজ করে, তার ভেতরটা শুকনো বা মরা বৃক্ষের মত। প্রেসক্রিপশন লিখে রোগীর কথা শেষ হবার আগেই। রোগীদের সে বন্ধু হিসেবে কাছাকাছি নিতে ভয় পায়। 

সে এদেশে বড় হয় নি। ভাষা, সংস্কৃতি, এক্সেন্ট সব মিলিয়ে এমনিতেই বেশ কিছু বাঁধা আছে। 

আর আছে মামলার ভয়। রোগী হল সম্ভাব্য মামলার পক্ষ। যে কোন দেশের মত আমেরিকায়ও অর্থবানরাই শো চালায়। বাকী যারা, হয় মামলা করে, নয় মামলার ভুক্ত ভোগী হয়। মামলার ‘ডিফেন্স কস্ট্’ আকাশচুম্বী । যে কেউ ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকতে পারে, জেনুইন কেইস না হলেও টাকা দিয়ে তা মিটমাট করা হয়, কারণ ইনসিওরেন্স কোম্পানী বছরের পর বছর উকিলের ফি গোনার চেয়ে মিটমাট করে টাকা বাঁচায়। কিন্তু তাতে মানুষের মামলা করার স্পৃহা আরো বাড়ে । যে কোন মামলার দু দিকেই উকিলদের রাজত্ব। যতবেশী মামলা, উকিলের পকেটে মাল ততবেশী। কংগ্রেস সিনেটে তারাই। চোর ক্ষমতায় থাকলে চোরের স্বার্থ রক্ষা করে আইন পাশ করে, ডাকাত ডাকাতের । এটাই গনতন্ত্র। উকিল কেন নিজেকে বঞ্চিত করবে? 

ড. হাসান বুঝতে পেরেছে যে উটপাখীর জীবন সবচেয়ে নিরাপদ জীবন। সে বইয়ে মনোযোগ দেয়। পড়ছে আন্তন চেখভের গল্প "ভালোবাসা সম্পর্কে"। ঠিক মনোযোগ দিতে পারে না, তারপরেও পড়ে: "পাশা পাশি আমরা চুপ করে থাকতাম এক সীমাহীন নৈশ:ব্দে। অন্য লোকের সামনে তার মধ্যে কী একটা দুর্বোধ্য খিটখিটে রাগ কাজ করতো আমার বিরুদ্ধে ; আমি যাই বলি না কেন, সে আমার বিরোধিতা করতো এবং আমি কোন বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হলে সে আমার বিপরীত পক্ষের হয়ে কথা বলতো। " 

মগজের খুব গভীরে কোথাও কিছু একটা নড়া চড়া করে পিঁপড়ের মত। পিঁপড়ে ঢিবির কখনও গহীনে চলে যায় আবার উপরে উঠে আসে। তাদের এ কর্মব্যস্ততার কী প্রয়োজন কেউ জানে না। অর্থও উদ্দেশ্যহীন নড়াচড়া মনে হয়, যেমন জল নড়ে নদীতে, মেঘ উড়ে আকাশে আর নড়ে গাছে গাছে পাতা । চেখভের গল্পের এই পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকার ব্যপারটা ড. হাসানের খুব পরিচিত। কথায় কথায় যেখানে কান ঝালাপালা করে দেবার কথা, একজন মানুষের কাছে গেলে তারও মুখে তালা চাবি পড়তো। সেটা যৌবনে।এখন অবশ্য এমনিই কথার টানাটানি। আগে মগজে শব্দগুলো পুঁটি মাছের মত লাফাতো, এখন ওরা শিং মাছের মত গভীরে ডুব দিয়ে নির্বাক চোয়াল নাড়ায়। 

ইংরেজীতে প্রশ্ন : "আপনি কি মি: সৈকত আহসান ?" 

"জ্বী, আমি ড. আহসান, কেন বলুন তো? আমি কি আপনাকে চিনি?" 

"রাতগাঁও গ্রামে আপনার বাড়ী?" 

ওর মুখে বিস্ময়! চেহারাটি খুব চেনা কিন্তু চিনতে পারছে না। 

"আমাকে সত্যিই চিনতে পারছো না ড. সৈকত?" 

একেবারে নাড়ি ধরে টান, অদ্ভুত সুন্দর নারীটি ফর্মালিটি ছুড়ে ফেলে। তার ডক্টর কথাটি উচ্চারণের মধ্যে কেমন একটা শ্লেষ। "এনাটমী, ফিজিওলজী, ফার্মাকোলজী এই সব সত্যি কি তোমার স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, কিচ্ছু মনে নেই?" 

ওর চেহারায় কাঠিন্যের কুঞ্চন দেখা দেয়। 

সৈকত আহসান তখনও চেখভের গল্পের ঘোরের তলানীতে তোলপার হচ্ছিল : "আমি ছিলাম অসুখী। বাসায় বা মাঠে বা গোয়াল ঘরে বসে আমি শুধু তার কথা ভাবতাম। যে নারী ব্যক্তিত্বহীন বা প্রায় বৃদ্ধ কোন পুরুষকে বিয়ে করে, আমি সেই নারীর মনের গহিনের রহস্য অনুধাবন করার চেষ্টা করতাম। আমার প্রায়ই মনে হতো কেন, কেন তার দেখা হয়েছিল এমন একটি মানুষের সাথে ? কেন আমার সাথে নয়? এবং কী করে আমাদের জীবনে এমন সাংঘাতিক একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারলো?" 
ডাক্তার মন্ত্র মুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকে মুখটির দিকে। কেমন যেন মগ্ন চৈতন্যে, রৌদ্র ঝলকের মত খুব চেনা ও প্রিয় মুখটি, সে কিছু বলতে পারে না। 

"দেখো একটু মনযোগ দিয়ে, চোখ নামানোর দরকার নেই, সরাসরি আমার চোখে তাকাও, কোনদিনই তো সেই সাহস তোমার হয় নি।" 

"দিতি?" 

বুক কেঁপে উঠে। 

উঠে দাঁড়ায় সৈকত আহসান, বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত। 

"চিনলে তাহলে ?" 

অপ্রত্যাশিত ও নাট্যময় এই সাক্ষাৎ। এমন সাক্ষাৎ শুধু গল্পেই হয়। জীবনে কোনদিন নয়। অসম্ভব, অবিশ্বাস্য। মানুষের মনোগহীনের তিমি শুধু গভীরেই সাঁতরায়। তা কখনও পিঠ দেখায় না । চেহারায় মিল আছে, তবে আগের মত নেই। কন্ঠস্বর বদলায় নি । বুকের ভেতরে কাঁপুনীটা বাড়ছে। মৃগী রোগ নয়, বিশাল উচু পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকালে যে কাঁপুনী ধরে, ঠিক তেমন। অনেকটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে হাতটা বাড়িয়ে দেয় দিতির দিকে, যেমন সে দেয় তার রোগীদের দিকে। 

আশ্চর্য্য ওর শরীরের কাঁপুনিটা দিতিও অনুভব করে। 

সেই প্রথম যৌবনের মত। 

গলার কাছে একটা দলা আটকে আছে, কোন মতেই সে গিলতে বা উগরে দিতে পারছে না। 

ওদের দুজনের মধ্যেই তৃষ্ণা ছিল হাজার বছরের । এখনও যেন দুজন প্রায় মধ্য বয়সী নারী পুরুষ নয়, বরং কিশোর কিশোরী । 

"আমি তোমাকে যে কত খুঁজেছি", দিতি বলে। 

"তুমি কোথায় আছো? কি করো? যাচ্ছো কোথায়?" 

সৈকত আহসান অনেকগুলো প্রশ্ন করে। 

" মিড-ওয়েষ্টে থাকি, একটি ইউনিভার্সিটিতে লিটারেচার পড়াই, লেখালেখি করি। এল.এ. যাচ্ছি। ট্রানজিটে এখানে এসে আটকা পড়েছি। প্লেন উড়ছে না।" 

"তুমি?" 

"আমি যাচ্ছি নিউ ইয়র্ক", অপরাধীর মত হাসে। বিপরীতমুখি যাত্রা যেন চিরকালের প্রি - প্রোগ্রামড । কাকতালীয় সাক্ষাৎ, প্রায় ৩৫ বছর পরে। দিতির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে ইন্টারমিডিয়েটে ঢোকার সাথে সাথেই । সৈকত সেদিন প্রথম বুঝতে পেরেছিল আদমের পাঁজর ভেঙে ইভ সৃষ্টি করার গল্পটির সত্যতা। ওর আর দেশে থাকার কোন আকর্ষণ ছিলো না। 

কলেজ শেষ করে চলে গিয়েছিল বৃত্তি নিয়ে বিদেশে। আর ফিরে নি । 

বাইরে কালো গাভীর চেয়েও কালো রাত, কালো মনের চেয়েও কালো। ঝড় হচ্ছে খুব । তুমুল ভাবে ওলট পালট করে দিচ্ছে বিশ্ব-সংসার । ঝড়ের জন্য এটা অসময়। কিন্তু মানুষের জীবনে ঝড় আসে নিয়ম না মেনে । প্রকৃতিরও নিয়ম মানতে হবেই এমন কোন নিয়ম নেই। ওদের সারাদিন চলে যায় সেই এয়ারপোর্টে বসে। ধীর পায়ে খোড়াতে খোড়াতে নেমে আসে রাত। ওরা পাশাপাশি বসে রাত কাটায় । কত গল্প, সারা জীবনের জমে থাকা কথা। এক সময় দিতি হাই তুলতে শুরু করলে সৈকতের প্রস্তাবে সহজ সায় দিয়ে ওরই কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে কাঠের বেঞ্চে। বাস্তবতার জগত কখনও কখনও স্বপ্নের জগতের চেয়েও সত্য। এই যেমন ওদের দেখা হয়ে যাওয়া। 

সৈকত বসে থাকে, ওর চোখে ঘুম নেই । তাকিয়ে থাকে দিতির মুখের দিকে। 

কমনীয় একটি মুখ, যৌবন প্রায় যাই যাই করেও চলে যায় নি। যদিও চামড়ায় শিথিলতা এসেছে , বয়েসের তুলি এঁকে গেছে সরু সরু রেখা। নিজের গাল দিয়ে ওই গাল দুটি ঘষে দেয়ার একটা উদগ্র ইচ্ছা ছিল ওর একদিন। আশ্চর্য সেই কথাটা ওর মনে পড়লো । 

খুব কাছাকাছি হবার কামনা ছিল তীব্র, কিন্তু.... 

"স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে দীর্ঘদিন, সম্ভবত বছর ২০ হবে। মেয়ের তখন ৫ বছর। ওর কথা ভেবে আর বিয়ে করি নি । হয়তো ভুল করেছি। মেয়ে বড় হয়ে গেছে, ওর নিজস্ব জীবন। জীবনের কাছে আমি অপ্রয়োজনীয় । অ্যামেরিকায় আছি ১৫ বছর হলো। দেশে ইংরেজীতে মাস্টার্স করেছিলাম, এখানে এসে পিএইচডি করেছি, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি । ছোট শহর। নির্জন। কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনটি উপন্যাস, দুটো ছোটগল্প আর কয়েকটি প্রবন্ধের। জানো আমার প্রথম উপন্যাসে তুমি আছো।” দিতি বলেছিল, ঘুমিয়ে পড়ার আগে। 

সৈকত আহসান চলে গিয়েছিল অনেক পিছনে: দেশ যখন স্বাধীন হয় সেই সময়ে। ওর বয়স তখন তেরো। কী একটা উৎফুল্লতা ছিল । সোনার বাংলা কথাটির মধ্যে কেমন একটা যাদু যেন। যদিও তখনও সোনার বাংলার মানে সে বুঝতো না। একটা এবস্ট্রাকট কিন্তু সুন্দর কিছু। তারপরে ১৯৭৩ সালে হাতে এল বইটা। সাদা, ঝকঝকে গ্লসি সফট কভার। প্রচ্ছদে মেরুন কালারের একটা গাছ। অমন গাছ দেশে দেখা যায় না। "ইস্পাত" বইটির নাম । লেখক নিকোলাই অস্ত্রোভস্কী। সৈকতের উচ্চারণে ভুল হতো, বলতো অস্ত্রো-ভস্কী। পাভেল কারচাগিন আর তানিয়ার ভালোবাসার স্থানে এসে পাগল হয়ে গেলো যেন। তারপরে শত্রুর জেলে বন্দি বিপ্লবী খৃস্তিনার হায়েনাদের হাতে অপবিত্র হবার আগে পাভেলের কাছে সমর্পনের ইচ্ছার দৃঢ়তা! 

বিপ্লব, যুদ্ধ, দেশ-প্রেম, ত্যাগ .... 

"জীবন মানুষকে একবারই দেয়া হয়, সেই জীবনটা বাস করা উচিত এমনভাবে, যেন জীবন-শেষে মনে না হয় বৃথাই বেঁচে ছিলাম।" 

উফ্! 

সেই থেকেই কেমন ওলট পালট হয়ে গেল বুকের ভেতরে। তাই তো, এমন ভাবেই বাঁচতে হবে যেন মনে না হয় বৃথা বেঁচে ছিলাম.... 

তার পর পরই দিতির সাথে দেখা । 

পদ্মার ঘুর্নি স্রোতের মধ্যে দুর্বা ঘাস বা ঘাসফুল যেমন, ঠিক তেমন।মঠের পাশে বরুন গাছে একটা বক বসে ছিল একদিন। সাদা বক। মাকালের মত অনেক গুলো ফল ঝুলে ছিল সেই গাছে। দিতি ছিল পাশে, কি করে যেন লুকিয়ে সেই দেখা। অদ্ভুত লাগছিল সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা দিতিকে।বরুন ফলের মত ভরাট ও সুন্দর।কৈশোর পেরিয়ে আসা সাদা বক সৈকত, পাভেল করচাগিনের মত। ভিতরে বাইরে সাদা, সাদা কাগজের মত। সেই দিতির বিয়ে হয়ে গেল। আশ্চর্য, এত তীব্র গতি, ঘুর্ণন ও অনুভূতি অতিক্রম করে পৃথিবীতে মানুষ বাঁচে কি করে? সেই ঘুর্ণন থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি সৈকত । 

সে যেন মরে গেছে। 

সেই পুড়ে পুড়ে নিভে যাওয়া কয়লার মধ্যেই স্ফুলিঙ্গ জেগেছিল আবার, অনেকদিন পর । সে বিয়ে করেছিল বিদেশে । একটা মেয়ে, ২৮ বছর, মানসিকভাবে অসুস্থ। নিরাময়হীন ওর রোগ। কখনও ভালো, কখনও উন্মাদের মত। ওর কথা ভাবতে গিয়ে সব কেমন ধূসর মনে হয়। ছেলেটা মানুষ হয় নি। ড্রাগস ড্রাগনের মত গিলে খেয়েছে। দুই সন্তান, বস্তুত একজনও নেই। সব পেয়েছির দেশে প্রাপ্তির ক্লান্তি ভরা জীবন। দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বের হয়ে আসে। 

মেঝেতে বিজলী চমকানো রাত হাঁটছে, শেফালী ফুলের রং সেই বিজলীর। ফুল নয়। শব্দহীন বিজলী। চমকাচ্ছে ঘন ঘন। অনেক দূর থেকে জানালা চুইয়ে আসচে তার ঝিলিক। রুশীতে একে বলে 'জারনিৎসা', বজ্রহীন নিঃশব্দ বিজলী, যা চমকায় আকাশের বুক চিড়ে অনেক দূরের কোথাও কিন্তু গর্জায় না। আর যে বিজলী চোখ ঝলসে দেয় এবং সাথে বজ্র গম গম করে রাগে বুক থাপড়ায়, সেই বিদ্যুৎকে বলে মোলনিয়া। 

‘জারনিৎসা’ আর ‘মোলনিয়ার’ মাঝামাঝি দুই জন মধ্য বয়সী মানুষ । দিতি ও সৈকত। দিতি শুয়ে আছে। ওর পিঠের দুই স্ক্যাপুলার ঠিক মাঝখানে সৈকত আহসানের দুই ঠোঁট উজার করে দিতে ইচ্ছে হয় শেফালী জারনিৎসার বিজলী দিয়ে আঁকা ভালোবাসার এই রাতে। কিন্তু কত বছর কেটে গেছে। অনুভূতি মানুষের মত, জন্ম হয়, জ্বলে, তারপরে মরে যায়। কখনও কখনও জীবন্ত অনুভূতিকে মাটি চাপা দেয়া হয় আনার কলির মত। ভোরে ঝড় শেষ হয়। ঝড়ের সাথে আসে যে, ঝড়ের সাথেই চলে যায়। 

সৈকত আহসান বিশাল দীর্ঘশ্বাস বুকে ধরে রেখে নিউইয়র্কে কাজ সেরে বাড়ী ফিরে আসে ২ দিন পরে। কাজ, রোগী, স্ত্রী, সংসার। অসুস্থ মেয়ে। অপদার্থ ছেলে। 

একই স্তন মুঠো ভরা, নরম ও সুন্দর! একই উত্তাপ, ঘ্রাণ, ভালোবাসা ......... প্রাপ্তির অপ্রাপ্তি ভরা জীবন। ‘ক'য়ের পরে ‘খ’, ‘খ'য়ের পরে ‘গ’। ব্যতিক্রমহীন, নতুনত্বহীন। জীবন কি শেষ তাহলে? সামনে তাকানোর আর কিছু নেই? আর কোন বিস্ফোরণ কি লন্ডভন্ড করে দেবে না এই মাপা সীমিত জীবন? 

কোন স্বপ্ন? কোন নতুন প্রেম? 

ছাড়া ছাড়া, ছেড়া ছেড়া চিন্তারা দ্রুত-গতি মেঘের মত ছুটে যায় মনের এক আকাশ থেকে অন্য আকাশে। অসম্ভব অস্থির ও বিক্ষিপ্ত লাগে। কাঁচের গ্লাস হাত থেকে পড়ে যেমন চুর্ন বিচুর্ণ হয়ে যায় তেমন। বেশীর ভাগ কালজয়ী কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী বার বার প্রজ্বলিত হয়েছে ভালোবাসার আগুনে । ভালোবেসেও তারা দৈনন্দিনতার খাঁচায় বন্দী থাকতে পারে নি । কিন্তু তারা সৃষ্টি করেছে, অমর সব সৃষ্টি। একজন স্রস্টার জন্য কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ? এক নারীর প্রতি প্রেমের বিশ্বস্ততা? না অমর সৃষ্টি? 

কি একটা আচ্ছন্নকারী obsessive চিন্তা ঘুরে ফিরে আসে । সৃষ্টির জন্য চাই অন্য আগুন, লেলিহান অনুভূতির আগুন যা ছারখার ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে দৈনন্দিনতার শৃঙ্খল। "মসৃন দিনরাত্রি সৃষ্টির প্রতিবন্ধী" - সৈকত আহসান ভাবে। তার মগজের বসত ঘরে আগুন লেগে যায়। কিন্তু গা শিউরে ওঠে পর মুহূর্তেই: 

না না না, সাজানো বাগান। সব কিছু স্ব স্ব স্থানে, থরে বিথরে সাজানো ঘর সংসার । ইস্ত্রি করা শার্ট, সকালের নাস্তা, বক্সে সযত্নে তৈরী লাঞ্চ, বাহুবদ্ধ বিশ্বস্ত বিশ্রাম। অভ্যাসের ছাই ঢাকা নিরাপত্তা। 

আমি কী করে তার চোখে তাকিয়ে বলবো, “জীবনের অন্য অধ্যায় দেখতে চাই, আমাকে চলে যেতে দাও।” 

চাইলেই কি যাওয়া যায়? 

সংসারী ছোট্ট মানুষের ভাবনার মেঠো পথ। ছোট্ট মানুষ আসলেই কি বড় কিছু সৃষ্টি করতে পারে? 


জুলাই ১০, ২০১৭

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন