মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

মিলান কুন্ডেরা'র গল্প : কেউ হাসবে না

Nobody Will Laugh

অনুবাদ : তপতী রাহুত 

“আমাকে আর একটু স্নিভোভিৎজ দাও তো,” ক্লারা বলল আর আমি কোনও আপত্তি করলাম না। একটা বোতল খোলা আমাদের কাছে কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার না, বিশেষ করে আজ যখন তার একটা যথার্থ কারণও রয়েছে। শিল্পের ইতিহাসের পুনর্বীক্ষণ নিয়ে একটা দীর্ঘ ও গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লেখার জন্য সেইদিন আমি বেশ ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম।

প্রবন্ধটি প্রকাশ করা কিন্তু তত সহজসাধ্য ছিল না—যা আমি লিখেছিলাম তা খুব বিতর্কিত এবং বিষয়টি নিয়ে নানাপ্রকার মতবিরোধও আছে; সেইজন্য ভিস্যুয়াল আর্টস, যাদের সম্পাদকরা সব বৃদ্ধ এবং অতি সাবধানী, তারা আমার প্রবন্ধটা এর আগে বাতিল করে দিয়েছিলেন। অবশেষে এক ছোটখাট, কম নামীদামি সাময়িক পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হল, যার সম্পাদকরা সব কমবয়সি এবং অত চিন্তাশীল নন। 

পিয়ন, ইউনিভার্সিটিতে, টাকার সঙ্গে একখানা চিঠিও দিয়ে গিয়েছিলেন, যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আনন্দের প্রথম উচ্ছ্বাসে, সকালবেলায়, চিঠিখানা পড়াই হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তখন, বাড়িতে বসে, মধ্যরাত যখন প্রায় গড়িয়ে আসছে, বোতল যখন প্রায় নিঃশেষ, তখন আমাদের মনোরঞ্জনের জন্য চিঠিখানা টেবিল থেকে তুললাম। 

“মাননীয় কমরেড এবং—আপনি যদি আমাকে এই শব্দটা ব্যবহার করার অনুমতি দেন--আমার সহকর্মী।” ক্লারাকে সজোরে পড়ে শোনালাম। “যার সঙ্গে আপনার কোনওদিন দেখা হয়নি, সে আপনাকে লিখেছে বলে মার্জনা করবেন। এই খামের ভেতর একটি প্রবন্ধ পাঠালাম, সে-টি পড়ার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি। এ কথা সত্যি যে আপনাকে আমি চিনি না কিন্তু আপনাকে আমি এমন একজন মানুষ হিসেবে সম্মান করি যার বিচার-বিশ্লেষণ, চিন্তাভাবনা এবং তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, আমার গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে এমনভাবে মিলে যায় যে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, এতে আমি সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেছি..” তারপর আমার যোগ্যতার আরও গুণগানের পর একটি অনুরোধ, আমি কি ওর একটি প্রবন্ধের সমালোচনা ভিস্যুয়াল আর্টসের জন্য, লিখে দিতে পারি—যাকে বলা যায়, একজন বিশেষজ্ঞর মূল্যায়ন, ছ'মাস ধরে যে পত্রিকা ওর প্রবন্ধের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করেই চলেছে। ওকে সকলে বলেছে, আমার মতামত সবকিছু নিশ্চিতভাবে স্থির করে দেবে, সেইজন্য আমিই হচ্ছি লেখকের একমাত্র আশাভরসা এবং নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে একমাত্র আলোকরশ্মি। 

আমরা মিঃ জাটুরেকি-কে নিয়ে অনেক মজা করলাম, যার আভিজাত্যপূর্ণ নাম-এ আমাদের মোহ ধরে গিয়েছিল, কিন্তু সে শুধু মজাই ছিল, একেবারে নির্ভেজাল মজা। আমাকে যে পরিমাণ প্রশংসায় উনি ভরিয়ে দিয়েছিলেন, তাই নিয়ে মজা করছিলাম এবং তার সঙ্গে, এই অসাধারণ স্লিভোভিৎজ মিলেমিশে আমাকে একেবারে কোমল করে দিয়েছিল। আমাকে এতটাই কোমল করে দিয়েছিল যে সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলোয় আমার গোটা পৃথিবীটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছিল। আর বিশ্বকে পুরস্কৃত করার মতো আমার কাছে সেই মুহূর্তে কিছু ছিল না বলে আমি ক্লারাকে পুরস্কৃত করলাম, অন্তত আমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। 

ক্লারার বয়স কুড়ি, সে একটি ভালো পরিবারের মেয়ে। আমি কি বলছি, ভালো পরিবারের? অসাধারণ পরিবারের! ওর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংকের ম্যানেজার। উচ্চবিত্ত বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব করার অপরাধে ১৯৫০ সাল নাগাদ প্রাগের কিছু দূরে সেলাকোডি গ্রামে নির্বাসিত হন। তার ফলে, তার মেয়ের পার্টির রেকর্ড খারাপ হয়ে পড়ে এবং তাকে সিম্‌স্ট্রেস (অর্থ—মেয়ে দরজি) হিসেবে প্রাগের এক বিশাল ড্রেস মেকিং সংস্থায় কাজ করতে হয়। আমি এখন, আমার এই সুন্দরী সিম্‌স্ট্রেসের মুখোমুখি বসে আছি, যে চাকরিটা আমার চেনাজানার মাধ্যমে তাকে পাইয়ে দেব বলে কথা দিয়েছি, তার সুযোগসুবিধেগুলো হালকাভাবে বলে, তাকে আমার প্রতি আরও বেশিরকম আসক্ত করার চেষ্টা করছি। তাকে এই বলে আশ্বস্ত করছি যে তার মতো একজন সুন্দরীর সেলাই-এর মেশিনের সামনে বসে বসে নিজের সৌন্দর্য খোয়ানোর মতো হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না। আমি স্থির করলাম ওকে মডেল হতে হবে। 


২. 

আমাদের বর্তমান আমরা চোখে কাপড় বেঁধে পার করে দিই। আমাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতাকে আমাদের শুধু তখন বোধ করতে এবং অনুমান করতে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে চোখের কাপড় যখন খুলে দেওয়া হয়, তখন পেছনে ফিরে বিগতদিনের অভিজ্ঞতাগুলো এবং তার অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম হই। 

সেদিন সন্ধেয় আমি ভেবেছিলাম, আমার সাফল্যের উদ্দেশ্যে ড্রিং করছি কিন্তু এ যে আমার সর্বনাশের সূত্রপাত তার ন্যূনতম সন্দেহটুকু সেদিন আমার মনে উঁকি দেয়নি। 

কোনও সন্দেহ আমার মনে উকি দেয়নি বলেই, পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ খোশমেজাজে ছিলাম, আর ক্লারা আমার পাশে শুয়ে স্বস্তির শ্বাস নিচ্ছিল, চিঠির সঙ্গে যেই প্রবন্ধটা সাঁটা ছিল, সেটা তুলে নিয়ে, তার ওপর একটু মজার সঙ্গে চোখ বোলাতে লাগলাম। প্রবন্ধটার নাম ‘নিকোলাস এ্যলেস, মাস্টার অফ চেক ড্রয়িং’, আর সত্যি বলতে কী যে আধঘন্টা সময় না পড়েই বলছি, সেটুকুর যোগ্য-ও নয়। কিছু নীরস মামুলি বক্তব্যকে তালগোল পাকিয়ে একসঙ্গে মেশানো হয়েছে, যার না আছে কোনও অবিচ্ছিন্ন চলৎশক্তি,না 

কোনও মৌলিক চিন্তাভাবনার প্রচেষ্টা। 

এককথায় একেবোরেই অর্থহীন। সেই একই দিনে, ভিস্যুয়াল আর্টসের সম্পাদক ডঃ কালুসেক (অন্যান্য সব অর্থেই খুব বাজে লোক), টেলিফোনে আমাকে সেই একই কথা জানালেন, আমার মতটা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করলেন। ইউনিভার্সিটিতে আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, “বলুন তো, জাটুরেকির কাছ থেকে ট্রিটিস-টা পেয়েছেন কিনা? তবে রিভিউ-টা লিখে ফেলুন, পাঁচজন লেকচারার ইতিমধ্যে ওকে চাঁচাছোলা করে দিয়েছে, কিন্তু তবুও ও আমাকে 

জ্বালিয়ে মারছে। ওর মাথায় ঢুকেছে ওই কাজের জন্য আপনিই হচ্ছেন একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি। মাত্র দু'খানা বাক্যে বলে দিন যে কাজটা একেবারে যাচ্ছেতাই, সেটা কী করে করতে হবে সে তো আপনার ভালো করে জানা আছে, বিষোঙ্গর কী করে করতে হয় তা তো আপনি ভালো করেই জানেন, আর তারপর আমাদের কপালে একটু স্বস্তি জুটবে।” 

কিন্তু আমার ভেতরে কিছু একটা প্রতিবাদ করে উঠল, মিঃ জাটুরেকি-কে বধ্যভূমিতে আমি কেন পাঠাব? এই কাজের জন্য একমাত্র আমি-ই কি সম্পাদকের মাইনে পাচ্ছি? এছাড়া আমার ভালো করে মনে আছে, ভিস্যুয়াল আর্টস বেশিরকম সাবধানতা দেখাতে গিয়ে আমার প্রবন্ধটাই বাতিল করে দিয়েছিল ; তার ওপর মিঃ জাটুরেকির নাম, ক্লারা, স্লিভোভিৎজ্‌ এবং এক সুন্দর সন্ধের সঙ্গে আমার মনের ভেতর সুসংবদ্ধভাবে গাঁথা হয়ে আছে। এবং সর্বশেষ কথাটা হচ্ছে, এ হচ্ছে মনুষ্যধর্ম--ক’জন আমাকে এ ব্যাপারে প্রকৃত পণ্ডিত বলে মনে করে, তা আমি আঙুলে গুনে বলে দিতে পারি”, সেই একখানা সুযোগ-ই বা আমি ছাড়ব কেন? 

কালুসেকের সঙ্গে আমার আলোচনাটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একটু অস্পষ্ট রেখেই আমি শেষ করলাম, ওর ধারণা হল ও-কে আমি কথা দিলাম, আর আমার জন্য, পাশ কাটিয়ে যাওয়া হল। ফোনটা যখন নামিয়ে রাখলাম, তখন আমি রীতিমতো স্থির করেই ফেলেছি জাটুরেকির প্রবন্ধের সমালোচনা আমি কখনওই লিখছি না। 

তার বদলে ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজ বার করে জাটুরেকিকে একখানা চিঠি লিখলাম। ওর কাজের সম্পর্কে কোনওরকম মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর শিল্প সম্পর্কে আমার জ্ঞানগম্যির দীনতা এবং যা সাধারণত পাগলামি এবং ভণ্ডামি বলে বিবেচিত হয়ে থাকে— তা জানালাম। সেই জন্য আমার মধ্যস্থতায়, বিশেষ করে ভিস্যুয়াল আর্টসের সম্পাদকের ক্ষেত্রে, ওর লাভের চাইতে যে ক্ষতি-ই বেশি হবে—তা-ওকে জানালাম। তার সঙ্গে সঙ্গে মিঃ জাটুরেকিকে মিষ্টি কথায় এমন ভরিয়ে দিলাম যে ওর প্রতি আমার প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির আভাস চিহ্নিত করতে না পারা প্রায় দুরূহ হয়ে পড়ল। 

চিঠিটা বাক্সে ফেলা মাত্র মিঃ জাটুরেকিকে ভুলে গেলাম, কিন্তু মিঃ জাটুরেকি আমাকে ভুললেন না। 


৩. 

একদিন আমার লেকচার যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে—আমি ইউনিভার্সিটিতে আর্ট হিস্ট্রি পড়াই—দরজায় খটখটানি শুনে দেখি আমার সেক্রেটারি মারি, উনি একজন দয়ালু, বয়স্কা মহিলা, যিনি মাঝেমধ্যে আমার জন্য কফি তৈরি করেন, এবং অবাঞ্ছিত মহিলাদের ফোন এলেই উনিই জানিয়ে দেন যে আমি বেরিয়ে গেছি ; উনি দরজার ভেতর মাথা গলিয়ে জানালেন যে একজন ভদ্রলোক আমাকে খুঁজছেন। 

ভদ্রলোকদের নিয়ে আমার কোনও ভয় নেই, সেইজন্য আমি ছাত্রছাত্রীদের থেকে ছুটি নিয়ে, দিব্যি খোশমেজাজে করিডোরে গেলাম। এক বিবর্ণ কালো স্যুট আর সাদা শার্ট পরা একজন ছোটখাট ভদ্রলোক আমাকে দেখে আনত হলেন। আমাকে উনি সম্মানের সঙ্গে জানালেন যে উনি জাটুরেকি। 

আগন্তুককে একটা ফাঁকা ঘরে নিয়ে একখানা চেয়ার এগিয়ে দিলাম, এবং ওর সঙ্গে নানা বিষয়ে সুন্দরভাবে আলোচনা শুরু করে দিলাম, যেমন, এইবার কী বিচ্ছিরি গরম পড়েছে, প্রাগে কী কী এগজিবিশন চলছে। আমার এই অনর্থক বকবকানি কিছুক্ষণ নম্রভাবে মেনে নিয়ে মিঃ জাটরেকি খুব অল্পসময়ের ভেতর আমার প্রতিটি মন্তব্যকে ওর প্রবন্ধের সঙ্গে অন্বিত করার জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠলেন, ওর এই প্রবন্ধ এক অপ্রতিরোধ্য চুম্বকের মতো আমাদের দুজনের মাঝখানে অবস্থান করতে শুরু করল। 

“আপনার রিভিউ লেখার চাইতে বেশি আনন্দ আমাকে আর কিছু দেবে না”, সব শেষে বললাম, “কিন্তু চিঠিতে আপনাকে যেমন জানিয়েছিলাম, উনবিংশ শতাব্দীর চেকোশ্লোভাকিয়া সম্পর্কে আমি তেমন পারদর্শী বলে বিবেচিত নই, তার ওপর ভিস্যুয়াল আর্টসের সম্পাদকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো নয়, যাদের ধারণা হচ্ছে আমি একজন কট্টর মডার্নিস্ট, সেই জন্য আপনার প্রবন্ধের সপক্ষে আমার কোনও রিভিউ আপনার ক্ষতিই করবে।” 

“ওঃ আপনি বড় বিনয়ী”, মিঃ জাটুরেকি বললেন, “আপনার মতো এমন একজন পণ্ডিত মানুষ, কী করে নিজের সম্পর্কে এমন হীন মত পোষণ করতে পারেন। সম্পাদকের অফিসে আমাকে সকলে বলেছে যে আপনার মতামতের ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। আপনার সমর্থন পেলে তবেই ওরা আমার লেখাটা ছাপবে। আপনিই আমার একমাত্র আশ্রয়। তিন বছরের লেখাপড়া আর হাড়ভাঙা খাটুনির ফলশ্রুতি আমার এই লেখাটা, এখন সবকিছু আপনার হাতে।” 

কত অসাবধানে একজন তার অজুহাতগুলো তৈরি করে। মিঃ জাটুরেকি-কে কিছু বলার মতো আমি আর খুঁজে পেলাম না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর মুখের দিকে তাকালাম, আর লক্ষ করলাম। শুধুমাত্র যে একখানা ছোট্ট, সেকেলে নিরপরাধ চশমাই আমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে তা নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে ওর কপালের এক প্রবল গভীর খাড়া রেখাও আমার দিকে চেয়ে আছে। এরপর আমি যা বুঝলাম তাতে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে এক কাঁপুনি নেমে এল। কপালের এই গভীর অনমনীয় বলিরেখা, নিকোলাস এলেসের ছবি সংক্রান্ত ব্যাপারে তার লেখকের বুদ্ধিমত্তার পীড়নের স্বরূপ শুধু উন্মোচন করেনি, তার সঙ্গে সঙ্গে তার অস্বাভাবিক কঠিন মনোবলের ক্ষমতাও প্রকাশ করেছে। আমি আমার উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেললাম এবং কোনও চতুর অজুহাত-ও খুঁজে পেলাম না। আমি জানতাম আমি ওর রিভিউ-টা লিখব না, কিন্তু এই করুণ ক্ষুদ্র মানুষটার মুখের ওপর না বলার ক্ষমতাও খুঁজে পেলাম না। 

তারপর আমি হাসলাম এবং এক অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলাম। জাটুরেকি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে গেলেন যে উনি আবার আসবেন। যাবার সময় আমরা দুজনেই হাসলাম। 

কয়েকদিনের ভেতর উনি আবার এলেন। বুদ্ধি করে ওকে এড়িয়ে গেলাম, কিন্তু পরের দিন-ই শুনলাম, উনি আমাকে ইউনিভার্সিটিতে খুঁজছিলেন। দুঃসময় ঘনিয়ে আসছে, বুঝলাম। উপযুক্ত ব্যবস্থার জন্য তাড়াতাড়ি মারির কাছে গেলাম। 

“মারি ডিয়ার, তোমাকে অনুনয় করছি, এই লোকটা যদি আবার আমাকে খুঁজতে আসে, ওকে বলবে, এক মাসের জন্য রিসার্চের ব্যাপারে আমি জার্মানি গেছি, আর তোমার জানা দরকার মঙ্গলবার, বুধবার আমার লেকচার থাকে, গোপনে সেগুলো, বৃহস্পতি আর শুক্রবার করব। কাউকে কিছু বলো না, লেকচারের দিনগুলো যেমন লেখা আছে, তেমন থাকুক, ঠিক করবার দরকার নেই। আমাকে গা-ঢাকা দিতে হবে।” 


৪. 

সত্যি বলতে কী অল্পদিনের ভেতরই মিঃ জাটুরেকি আমাকে খুঁজতে চলে আসেন আমার সেক্রেটারির কাছে। আমি হঠাৎ জার্মানি চলে গেছি শুনে খুব হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু এ হতেই পারে না। লেকচারারের আমার ওপর একা রিভিউ লেখার কথা, এইভাবে কী করে উনি চলে গেলেন?” 

“তা জানি না” মারি বলে। “যাই হোক, এক মাসের ভেতর তো ফিরে আসছেন।” 

“আর এক মাস....”, ককিয়ে উঠলেন জাটুরেকি। 

“আর আপনি ওর জার্মানির ঠিকানা জানেন?” 

“না, জানি না।” মারি প্রস্থান করে। 

তারপর, আমার এক মাসের শাস্তি জুটল। কিন্তু মাসটা যেন যা ভেবেছিলাম, তার চাইতে অনেক তাড়াতাড়ি কেটে গেল, আর মিঃ জাটুরেকি আবার আফিসের সামনে এসে উপস্থিত। 

“নাঃ, উনি এখনও ফেরেননি।” মারি ও-কে বলে। পরে যখন আমার সঙ্গে অন্য ব্যাপারে মারির সঙ্গে দেখা হয়, তখন ও আমাকে অনুনয় করে “আপনার খুদে ভদ্রলোকটি আবার এসেছিল, ওকে, ঈশ্বরের দোহাই, কী বলি বলুন তো?” 

“বলবেন আমার জন্ডিস হয়েছে, আর আমি জেনার হাসপাতালে আছি।” 

“হাসপাতালে!” মারি কয়েকদিন বাদে এই গল্পটা যখন জাটুরেকি-কে শোনায়, তখন উনি আঁতকে ওঠেন, “এ হতেই পারে না, লেকচারারের আমার ওপর একটা রিভিউ লেখার কথা। আপনি কি তা জানেন না?” 

“মিঃ জাটুরেকি", সেক্রেটারি অভিযোগের সুরে বললেন, “লেকচারার, বিদেশে হাসপাতালে অসম্ভব অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন, আর আপনি শুধু আপনার রিভিউ-এর কথাই ভাবছেন?" মিঃ জাটুরেকি একটু থমকে গেলেন বটে কিন্তু দু'সপ্তাহের ভেতর আবার অফিসে এসে উপস্থিত হলেন। “একখানা রেজিস্টার্ড চিঠি জেনার হাসপাতলে আমি পাঠিয়েছিলাম, চিঠিটা ফেরত এসেছে!” 

“খুদে ভদ্রলোকটি কিন্তু আমায় পাগল করে দিচ্ছেন”, পরের দিন মারি বলল, “আপনি রাগ করবেন না, কিন্তু আমি আর কী বলতাম বলুন তো? ওকে আমি বলেছি, আপনি ফিরে এসেছেন। এবার থেকে ওকে আপনি সামলাবেন।” 

আমি মারির ওপর রাগ করিনি। ওর পক্ষে যা সম্ভব ও তাই করেছে। তাছাড়া, আমি তখনও অবধি আমার পরাজয় মেনে নিইনি। এটুকু শুধু জানতাম, যেন ধরা না পড়ি। সবসময় লুকিয়ে থাকতাম। বৃহস্পতি আর শুক্রবার গোপনে লেকচার দিতাম, আর প্রতি মঙ্গল আর বুধবার আর্টহিস্ট্রির ফ্যাকালটির উলটোদিকে, দরজার কাছে নীচু হয়ে বসে থাকতাম ; আমাকে ধরার জন্য মিঃ জাটুরেকি ফ্যাকালটির বিল্ডিং-এর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর ওকে দেখে আমার খুব মজা লাগত। মাথায় একটা বড় টুপি আর নকল গোফ লাগাবার ইচ্ছে হয়েছিল। নিজেকে শার্লক হোমসের মতো মনে হত, যেন মিঃ হাইড, সেই অদৃশ্য মানুষটার মতো, যে শহরে ঘুরপাক খেয়ে বেড়াত। নিজেকে একটা বাচ্চা ছেলের মতো লাগত। 

পাহারা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে একদিন মিঃ জাটুরেকি মারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। “ঠিক কোথায় কমরেড লেকচারার লেকচার দেন।” 

“ওখানে ওর সিডিউল দেওয়া আছে”, আঙুল নেড়ে মারি দেয়ালের দিকে দেখায়, যেখানে বড় বড় করে সব লেকচারারদের লেকচারের সময় লেখা রয়েছে। 

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি,” এসবে উনি দমে যেতে রাজি নন। “শুধু কমরেড লেকচারার এখানে কোনও মঙ্গল, বুধবার লেকচার দেন না। উনি কি অসুস্থ?” 

“না।” দ্বিধাগ্রস্ত মারি বলে। 

এরপর ছোটখাট মানুষটি আবার মারিকে চেপে ধরেন, সিডুইলের গণ্ডগোলের জন্য ওকে দায়ী করেন। 

ওর নামে অভিযোগ করবেন বলে উনি শাসান, চিৎকার করেন। কমরেড লেকচারারের নামেও অভিযোগ করবেন, যার লেকচার দেবার কথা কিন্তু দিচ্ছেন না, বলে জানান, ডিন আছেন কি না জানতে চান। 

দুর্ভাগ্যবশত ডিন ছিলেন। 

মিঃ জাটুরেকি তার দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে গেলেন। দশ মিনিট বাদে মারির অফিসে ফিরে এসে আমার ঠিকানা দাবি করেন। 

“কুড়ি নম্বর স্কালিনোভা স্ট্রিট, লিটোমিস।” মারি বলে। 

“লিটোমিসল?” 

“প্রাগে উনি মাঝেমধ্যে থাকেন, সেই ঠিকানাটা উনি প্রকাশ করতে চান না।” 

“লেকচারারের প্রাগের অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানাটা আমি আপনাকে দিতে বলছি।” কাঁপা কাঁপা গলায় ছোটখাট মানুষটি বলেন। 

যেভাবেই হোক, মারি ওর উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে, এবং আমার চিলেকোঠার, সামান্য ক্ষুদ্র আশ্রয়ের, আমার মধুর ডেরা-র ঠিকানাটা দিয়ে দেয়, যেইখানে আমি ধরা পড়ে যাব। 


৫. 

হ্যাঁ, আমার স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে লিটোমিসল--ওখানে আমার মা আছেন আর আমার বাবার স্মৃতি আছে। প্রাগ থেকে আমি যত ঘনঘন সম্ভব পালিয়ে মায়ের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে, আমার বাড়িতে বসে লিখি। এইভাবে মায়ের ফ্ল্যাটটা আমার স্থায়ী বাসস্থানের ঠিকানা হয়েছে। আর প্রাগে, একটা উপযুক্ত ব্যাচেলার্স ফ্ল্যাট, যা আমার পাবার কথা ছিল, পেলাম না বলে আমাকে অধ্যক্ষদের লজিং-এ থাকতে হল, একখানা চিলেকোঠা, যার অস্তিত্ব আমি গোপন 

রাখতে চেষ্টা করি, যাতে করে আমার অবাঞ্ছিত অতিথিদের সঙ্গে আমার ক্ষণস্থায়ী মহিলাদের অকারণ দেখাসাক্ষাৎ না হয়ে যায়। 

প্রকৃতপক্ষে এইজন্য এই বাড়িতে আমার তেমন সুনাম নেই। এর ওপর যখন লিটোমিসল-এ থেকেছি, সেই সময়, বারকয়েক আমার ওই ছোট্ট ঘরখানা বন্ধুদের ভাড়া দিয়েছি, তারা ওইখানে এত স্ফূর্তি করেছে যে বাড়ির একটি লোককেও রাতে চোখের পাতা এক করতে দেয়নি। কিছু কিছু ভাড়াটে এতে এত চটে গেছেন যে তারা আমার বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। কখনওসখনও লোকাল কমিটিকে দিয়ে আমার সম্পর্কে অপ্রীতিকর মন্তব্যও প্রকাশ করিয়েছেন, এমনকী হাউসিং ডিপার্টমেন্টের কাছে, এরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগও জানিয়েছেন। 

এই একই সময়ে সেলাকোভিস-এর মতো জায়গা থেকে ক্লারার পক্ষে কাজে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ছিল, সেইজন্য আমার খুপরিটাতে ও রাত কাটাতে শুরু করল। প্রথম প্রথম ও একটু সংকুচিত হয়ে থাকত, যেন আর কোনও গত্যন্তর নেই এইভাবে থাকত, তারপর ও একদিন একটা ড্রেস রেখে গেল, তারপর বেশ কয়েকখানা, এবং খুব অল্পসময়ের ভেতর আমার দুখানা মাত্র স্যুট, আলমারির এক কোণে স্থানান্তরিত হয়ে গেল, আমার ছোট্ট ঘরটি একখানা মহিলার (ব্যক্তিগত ঘর) বুদঅ-এ পরিণত হল। 

ক্লারাকে আমার সত্যি সত্যি ভালো লাগত, ক্লারা সুন্দরী, ওকে নিয়ে বের হলে, সকলে যখন মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের দেখত, সেটা আমার ভালো লাগত। ও আমার তেরো বছরের ছোট। সেইজন্য আমার ছাত্রদের আমার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ওকে দেখাশোনা করার, যত্ন করার হাজারটা কারণ ছিল। কিন্তু ও যে আমার সঙ্গে থাকে, সেটা জানাজানি হোক, সে আমি চাইনি। এসব নিয়ে বাড়ির ভেতর নিন্দে এবং কুৎসার ভয় পাচ্ছিলাম। আমার ভয় ছিল আমার ভালো মানুষ বৃদ্ধ বাড়ি-অলা, যিনি খুব বুদ্ধিমানের মতো আমার ব্যাপারে মাথা গলান না, তাকে হয়তো কেউ আক্রমণ শুরু করবে। আমার ভয় ছিল, হয়তো উনি একদিন বুকে গুরুভার নিয়ে বিষণ্নভাবে এসে বলবেন, তার সুনাম রক্ষার জন্য এই তরুণীটিকে সরিয়ে দিতে হবে। 

ক্লারাকে কড়া আদেশ দেওয়া ছিল যেন ও কাউকে দরজা না খোলে। 

একদিন ও বাড়িতে একা ছিল, রোদ ঝলমলে দিনটায়, চিলেকোঠার ঘরখানা গরমে ভেপসে উঠেছিল, সিলিং-এর দিকে চোখ রেখে কোচের ওপর প্রায় নগ্ন অবস্থায় ও আলস্যে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। 

হঠাৎ দরজায় দুমদুম করে আওয়াজ শুরু হল। এতে ভয় পাবার কিছু নেই। আমার কলিং বেল না থাকার দরুন, যে-ই আসত তাকেই দরজা ঠুকতে হত, এই শব্দে ক্লারা কোনওভাবে নিজের কোনও ব্যাঘাত না ঘটিয়ে, সিলিং দেখায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখল। কিন্তু দরজা পিটুনি তো থামলই না বরং একটুও বাধাপ্রাপ্ত না হওয়ার দরুন আরও দ্বিগুণ জোরের সঙ্গে চলতে থাকল। ক্রমশ ক্লারা নার্ভাস হয়ে পড়ল। দরজার ওপারে একজন লোককে ও কল্পনা করে নেয়, যে জ্যাকেটের কলারটা ধীরে ধীরে অর্থপূর্ণভাবে তুলে দেবে এবং যে পরে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দাবি করবে, এতক্ষণ কেন ও দরজা খোলেনি, ওর কী লুকোবার ছিল এবং এই ঠিকানায় ওর নাম রেজিস্টার করা আছে কিনা। এক অপরাধ বোধ ওকে পেয়ে বসে, সিলিং থেকে চোখ নামিয়ে ক্লারা মনে করার চেষ্টা করে কোথায় ও ওর ড্রেসটা রেখেছে। কিন্তু এমন একটানা দরজা পিটুনি চলতে থাকে যে, এইসব গোলমালে ও আর কিছু খুঁজে না পেয়ে, হলে আমার বর্ষাতিটা ঝুলছিল সেটাকেই চাপিয়ে দরজাটা খুলে দিল। কোনও শয়তানের সন্দিহান মুখের বদলে একজন ছোটখাট লোককে ও দেখতে পায়, যিনি ওকে দেখামাত্র আনত হয়ে বললেন, “লেকচারার কি বাড়ি আছেন?” 

“না, উনি নেই।” 

“বড় দুঃখের কথা,” ভদ্রলোক বললেন এবং ওকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইলেন। “ব্যাপারটা হচ্ছে আমার একটা প্রবন্ধের ওপর লেকচারারের একটা রিভিউ লেখার কথা, উনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, এবং এটা খুব জরুরি। যদি আপনি অনুমতি দেন তবে ওর জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে যেতে চাই।” 

ক্লারা ওকে কাগজ আর পেনসিল দেয়, আর সন্ধেবেলা চিঠিটা পড়ে বুঝলাম নিকোলাস এলেসের ওপর প্রবন্ধটার ভবিষ্যৎ আমার ওপরই ঝুলছে, এবং মিঃ জাটুরেকি সসম্মানে আমার রিভিউ-এর অপেক্ষায় আছেন, ইউনিভার্সিটিতে আর একবার উনি আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন। 


৬. 

পরের দিন মারি যখন আমাকে বলল মিঃ জাটুরেকি কীভাবে ওকে ভয় দেখিয়েছেন এবং কীভাবে ওর নামে অভিযোগ করতে গেছেন, তখন ওর গলা কাঁপছিল এবং চোখ জলে ভরে উঠেছিল। আমি রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠলাম। আমি বুঝতে পারলাম আমার সেক্রেটারি যে এতদিন আমার লুকোচুরি খেলায় মজা পাচ্ছিল, এখন সে কষ্ট পাচ্ছে এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাকে তার সব কষ্টের কারণ বলে মনে করছে। তার সঙ্গে যখন আমি আমার চিলেকোঠার গোপনীয়তা ফাঁস হওয়া, দশ মিনিট ধরে দমাদম দরজা পেটানো এবং ক্লারার প্রাণান্তকর ভীতি যোগ করলাম—তখন আমার রাগ উন্মাদনার পরিণত হল। 

মারির অফিসে ঠোঁট কামড়ে, রাগে গর গর করতে করতে আমি যখন ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারী করছি, এবং ভাবছি কী করে প্রতিশোধ নেওয়া যায়, দরজা খুলে তখন মিঃ জাটুরেকির আবির্ভাব হল। 

আমাকে দেখার পর মিঃ জাটুরেকির মুখখানা আনন্দে ভরে উঠল। মাথা নীচু করে উনি আমাকে সম্ভাষণ করলেন। 

উনি একটু আগে এসে পড়েছেন, কীভাবে প্রতিশোধ নেব তা স্থির করার আগেই উনি এসে পড়েছেন। 

আমি ওর চিঠিটা পেয়েছি কিনা উনি জানতে চাইলেন। 

আমি চুপ করে থাকলাম। 

প্রশ্নটা উনি আবার করলেন। 

“পেয়েছি।” আমি জবাব দিলাম। 

“আপনি কি দয়া করে রিভিউটা লিখবেন?” 

চোখের সামনে ওকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম,দুবলা, জেদি, মিনতিপূর্ণ ; দেখতে পাচ্ছিলাম ওর কপালের খোদাই-করা বলিরেখা, একক আবেগের রেখা ; রেখাটাকে একটু যাচাই করে বুঝলাম, এটি একটি সরলরেখা যা দুটি বিন্দুর দ্বারা নির্ধারিত—ওর প্রবন্ধ আর আমার রিভিউ, উন্মাদনার এই খাড়া রেখার কলঙ্কটুকু বাদ দিলে ওর জীবনে আর কোনওকিছুর অস্তিত্ব নেই, আছে শুধু এক সাধুসুলভ কঠোর তপশ্চর্যা। তারপর আমার মাথায় খেলে গেল আক্রোশের এক জঘন্য চাতুরি। 

“আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন, গতকালের ঘটনার পর, আপনার সঙ্গে কথা বলা আর সম্ভব নয়।” 

“আমি বুঝতে পারছি না আপনি কী বলছেন।” 

“না বোঝার ভান করবেন না, ও আমাকে সব বলেছে, আপনি অস্বীকার করতে পারবেন।” 

“আপনার কথা বুঝতে পারছি না”, এইবার আরও জোর দিয়ে বললেন। 

আমি খুব ভদ্র এবং বন্ধুত্বের সুরে বললাম, “দেখুন, মিঃ জাটুরেকি, আপনার কোনও দোষ নেই, আমিও মহিলাবাজ, সেইজন্য আপনাকে বুঝতে পারছি, আপনার জায়গায় আমি হলে, ওইরকম একটি সুন্দরী মেয়েকে আমিও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করতাম, বিশেষ করে তাকে যদি একটা অ্যাপার্টমেন্টে একা পেতাম আর পুরুষের বর্ষাতির নীচে নিরাবরণ দেখতাম। 

“এ সাংঘাতিক অপমানজনক।” ছোটখাট মানুষটি বিবর্ণ হয়ে গেছেন। 

“না, এইটেই সত্যি মিঃ জাটুরেকি।” 

“মহিলা কি আপনাকে তাই বলেছেন?” 

“ও আমার কাছে কিছু লুকোয় না।” 

“কমরেড লেকচারার এ অপমান অসহনীয়, আমি বিবাহিত, আমার স্ত্রী আছেন। ছেলেমেয়ে আছে।” ছোটখাট মানুষটি এক পা এগিয়ে এলেন বলে আমাকে একটু পিছিয়ে যেতে হল। 

“তবে তো আপনার হাল আরও খারাপ।” 

“আমার হাল 'আরও খারাপ মানে?” 

“মহিলাবাজরা বিবাহিত হলে অনেক বেশি খারাপ হয়।” 

“কথাটা ফেরত নিন।” মিঃ জাটুরেকি-কে ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। 

“বেশ, ঠিক আছে”, আমি মেনে নিলাম। “বিবাহিত জীবন যে পরিস্থিতির প্রকোপ বৃদ্ধি করে তা না, মাঝেমধ্যে বরং, তার জন্য ওরা ছাড়ও পেয়ে যায়। কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু পালটায়। আপনাকে তো আমি আগেই বলেছি আমি রাগ করিনি এবং আপনাকে বেশ ভালো করে বুঝতে পারছি, শুধু একটা কথা বুঝতে পারছি না, আপনি এখনও কী করে এমন একজন লোকের রিভিউ আশা করছেন যার মহিলাকে আপনি প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন ?” 

“কমরেড লেকচারার। আকাদেমি অফ সায়েন্সের জার্নাল ভিস্যুয়াল আর্টসের সম্পাদক ডঃ কালসেক আপনাকে এই রিভিউটা লিখতে বলেছেন, এবং আপনাকে সেটা লিখতেই হবে।” 

“রিভিউ চাই না মহিলাকে চাই। দুটোই চাইতে পারেন না।” 

“এটা কী ধরনের ব্যবহার কমরেড ?” রাগে মরিয়া হয়ে মিঃ জাটুরেকি আর্তনাদ করে উঠলেন। 


সব চাইতে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, আমার যেন হঠাৎ মনে হল, জাটুরেকি সত্যি সত্যি ক্লারাকে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন। 

রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমি চিৎকার করে উঠলাম, “আমাকে ধমক দেবার মতো ধৃষ্টতা হল কী করে আপনার? আমার সেক্রেটারি এবং আমার সামনে তো আপনার মাথা হেট করে ক্ষমা চাওয়া উচিত।” 

ওর দিকে আমি পেছন ঘুরে দাঁড়ালাম, আর সব গুলিয়ে ফেলে মিঃ জাটুরেকি টলতে টলতে বেরিয়ে গেলেন। 

“তবে, এরপর”, কঠিন সামরিক অভিযানে জয়লাভ করা সেনাপতির মতো স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললাম “মনে হয় আমার কাছ থেকে আর রিভিউ চাইবেন না।” 

মারি হাসল, একটু পরে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক কেন আপনি এই রিভিউটা লিখতে চাইছেন না?” 

“কারণ মারি, ও যা লিখেছে তা একেবারে যাচ্ছেতাই।” 

“তবে রিভিউতে তাই লিখুন না কেন, যে এটা একেবারে যাচ্ছেতাই।” 

“কেন লিখব? কেন সকলকে চটাব?” 

এক প্রশ্রয়ের হাসি মুখে নিয়ে মারি যখন আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় দরজাটা খুলে গেল, আর দেখি, হাত তুলে মিঃ জাটুরেকি দাঁড়িয়ে আছেন। “আমি নয়, একমাত্র আপনাকেই ক্ষমা চাইতে হবে।” কাঁপা কাঁপা গলায় চিৎকার করে বললেন, তারপর অন্তর্ধান করলেন। 


৭. 

আমরা একটা ঠিকানাহীন খাম আমাদের চিঠির বাক্সে পেয়েছিলাম—হয় সেইদিন-ই, নয়তো দিন কয়েক পরে, তার ভেতর একখানা অতি কাঁচা, যাচ্ছেতাই হাতের লেখায় একখানা চিঠি ছিল, “ডিয়ার ম্যাডাম, আমার স্বামীকে অপমান করার জন্য রবিবার দিন আমার বাড়িতে আসবেন। আমি সারাদিন বাড়িতে থাকব। যদি না আসেন, অন্য ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব। আনা জাটুরেকি, ১৪, ডালিমিনোভা স্ট্রিট, প্রাগ ৩।” 

ক্লারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর আমার অপরাধ সম্বন্ধে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল। আমি হাত নেড়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দ জোগানো, আর জীবন যদি সে ব্যাপারে উৎসাহ না দেখায় তবে তো তাকে কিছুটা সাহায্য করা ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর নেই। প্রতিটি ব্যক্তিকে তার জীবনের সঙ্গে ঘটনার রাশ মুড়তে হবে, ঘটনা--সেই দ্রুতগামী ঘোটকী, যার অনুপস্থিতিতে তাকে ক্লান্ত শ্রান্ত পর্যটকের মতো শুধু ধুলোয় পা হেঁচড়ে বেড়াতে হবে। ক্লারা যখন বলল, তার জীবনের সঙ্গে সে ঘটনার রাশ জুড়তে নারাজ, তখন তাকে আমি অভয় দিলাম যে মিঃ এবং মিসেস জাটুরেকির সঙ্গে কখনওই দেখা করতে হবে না। এই ঘটনাটা, যার পিঠে আমি এক হাত পেছনে বেঁধে চড়েছি, তার দায় আমার।। 

সকালে বাড়ি থেকে বার হবার সময় দারোয়ান আমাদের থামাল। দারোয়ান আমাদের শত্রু নয়। বিচক্ষণের মতো একবার ওকে আমি দশ ক্রাউনের একটা বিল ঘুষ দিয়েছিলাম, আর এতদিন ধরে এই ভেবে নিশ্চিত ছিলাম যে ও জেনেছে আমার সম্পর্কে ওর কিছু জানার কথা নয়, আর বাড়িতে আমার শত্রুরা যে আগুন আমার বিরুদ্ধে সারাক্ষণ জ্বালিয়ে রেখেছে তাতে ইন্ধন জোগাবে না। 

“গতকাল এক জোড়া স্বামী-স্ত্রী আপনার খোঁজ করছিল।” 

“কী ধরনের স্বামী-স্ত্রী?” 

“একজন ছোটখাট ভদ্রলোকের সঙ্গে এক মহিলা ছিলেন।” 

“মহিলাকে কেমন দেখতে?” 

“ভদ্রলোকের চাইতে দুহাত লম্বা, অসম্ভব কড়া আর তেজস্বী। উনি অনেক ব্যাপারে খবর নিচ্ছিলেন”, লোকটি ক্লারার দিকে ঘুরে বলল, “বিশেষ করে আপনার সম্পর্কে, কে আপনি, কী আপনার নাম?” 

“গুড হেভেনস, তুমি কী বললে ওকে?” অবাক হয়ে ক্লারা জিজ্ঞেস করল। 

“কী আর বলব? লেকচারারের কাছে কে আসে কে যায় তার আমি কী জানি? আমি বলেছি ওর কাছে প্রতি সন্ধেয় একজন নতুন নতুন মহিলা আসেন।” 

“অসাধারণ।” আমি হাসলাম পকেট থেকে দশ ক্রাউনের একটা বিল টেনে বার করলাম। “ঠিক এইভাবে বলে যাবে।” 

“কিছু ভয় পেও না,” তারপর ক্লারাকে বললাম। রবিবার তোমাকে কোথাও যেতে হবে না, 

আর কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না। 

রবিবার এল, তারপর আর এক রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, কিচ্ছু হল না। “দেখলে তো?” ক্লারাকে বললাম। 

কিন্তু তারপর বৃহস্পতিবার এল। আমার ছাত্রদের যখন নিয়মিত গোপন লেকচারে বলছিলাম, কত উন্মাদনার এবং কী প্রকার নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের পরিবেশে তরুণ কভিয়ানরা তাদের প্রাক্তন ইমপ্রেসনিস্টিক চরিত্র থেকে রং-কে মুক্ত করতে পেরেছিল, তখন মারি দরজা খুলে ঢুকে ফিসফিস করে বলল, “সেই জাটুরেকির স্ত্রী এসেছেন।” 

“কিন্তু আমি তো এইখানে নেই, ওকে সিডিউলটা দেখিয়ে দাও।” আমি বললাম। 

কিন্তু মারি মাথা নেড়ে বলল, “আমি বলেছি, কিন্তু আপনার অফিসে উঁকি মেরে আপনার বর্ষাতিটা দেখতে পেয়েছেন এবং উনি এখন করিডোরে আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন।” 

আমার অনুপ্রেরণার শ্রেষ্ঠ স্থান হচ্ছে এক অন্ধ গলি। আমার এক প্রিয় ছাত্রকে বললাম, “দয়া করে আমার একটা ছোট্ট উপকার করো। আমার অফিসে গিয়ে আমার বর্ষাতিটা পরে বিল্ডিং থেকে বার হয়ে যাও। একজন মহিলা তোমাকে আমি বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন। তোমার কাজ হবে কোনও অবস্থাতে সেটা স্বীকার না করা।” 

ছাত্রটি বার হয়ে, পনেরো মিনিটের ভেতর ফিরে এল। ও এসে বলল, যে কাজে ওকে পাঠানো হয়েছিল, তা সফল হয়েছে, পথ পরিষ্কার এবং সেই মহিলাটি বিল্ডিং থেকে বার হয়ে গেছেন। এইবারের মতো তবে আমার জিত হল। 

কিন্তু এরপর শুক্রবার এল, দুপুরবেলা ক্লারা প্রায় পাতার মতো কাঁপতে কাঁপতে কাজ থেকে ফিরে এল। ওদের ড্রেস-মেকিং সংস্থার সেই বিনয়ী ভদ্রলোক, যিনি তার পরিচ্ছন্ন অফিসে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন, হঠাৎ, যেই ঘরে ক্লারা আর পনেরো জন মহিলা সেলাই মেশিনের সামনে বসে সেলাই করছিল, সেইখানে এসে জিজ্ঞেস করেছেন, “এইখানে কি কেউ পাঁচ নম্বর জামেক স্ট্রিটে থাকো?” 

ব্যাপারটা যে ওকে জড়িয়ে সে ক্লারা বুঝেছে, কারণ পাঁচ নম্বর জামেক স্ট্রিট হচ্ছে আমার ঠিকানা। ও সতর্ক ছিল, মুখ খোলেনি। ও জানত ও যে আমার সঙ্গে থাকে সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গোপন। 

যখন কোনও সিমস্ট্রেস (অর্থ—মেয়ে দরজি) কোনও কথা বলল না তখন ভদ্রলোক এই বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন, “তখন থেকে মহিলাকে আমি এই বোঝাবার চেষ্টা করছি।” পরে ক্লারা জানতে পারে, একটি কঠিন নারীর কণ্ঠস্বর ফোনের মাধ্যমে এই ভদ্রলোককে বাধ্য করেছেন টেলিফোন ডিরেক্টরি খুঁজতে এবং প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে ওর কর্মচারীদের ভেতর কেউ একজন অবশ্যই পাঁচ নম্বর জামেক স্ট্রিটে থাকে। 

আমাদের সুখের নীড়ে মিসেস জাটুরেকির ছায়া পড়ল। 

“কিন্তু তুমি কোথায় কাজ কর তা উনি জানলেন কী করে? এ বাড়িতে অন্তত তোমার সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।” আমি চিৎকার করে উঠলাম। 

হ্যাঁ, আমি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম, এ বাড়িতে আমাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না, আমি একটা খ্যাপার মতো দিন কাটাচ্ছিলাম, যার ধারণা হয়েছিল এক সুউচ্চ প্রাচীর তাকে সকলের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছে, আসলে তখন প্রতিটি মুহূর্তে তার কিছু না কিছু খবর চুপিসারে পিছলিয়ে বাইরে বার হয়ে যাচ্ছিল। সেই প্রাচীর ছিল স্বচ্ছ কাচের তৈরি। ক্লারা যে আমার সঙ্গে থাকে সেই কথা গোপন রাখার জন্য দারোয়ানকে আমি ঘুষ দিয়েছিলাম। ক্লারাকে আমি বাধ্য করেছি অসম্ভব অসুবিধের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে, কিন্তু ইতিমধ্যে পুরো বাড়ি ওর কথা জেনে গেছে। একবার তিনতলার এক মহিলার সঙ্গে এক অসাবধান আলোচনাই যথেষ্ট ছিল—গোটা বাড়ি জেনে গেছে ক্লারা কোথায় কাজ করে। আমরা বুঝিনি, কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের জীবন অনাবৃত হয়ে পড়েছিল। আমাদের অত্যাচারীদের কাছে অজানা রয়ে গেছে শুধু ক্লারার নাম। আমাদের এই একমাত্র এবং শেষ গোপনীয়তার আড়ালে আমরা মিসেস জাটুরেকিকে কিছু সময়ের জন্য এড়িয়ে যেতে পারব, যিনি এত সুশৃঙ্খলভাবে সঙ্গতি রেখে আক্রমণ চালাতে শুরু করলেন যে আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। 

বুঝলাম ব্যাপারটা খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে। আমার গল্পের ঘোড়া নারকীয়ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। 


৮. 

সে ছিল শুক্রবার। আর শনিবার দিন ও যখন কাজ থেকে ফিরে এল, তখনও ও কাঁপছিল। কী হয়েছিল বলছি : 

মিসেস জাটুরেকি তার স্বামীকে নিয়ে ড্রেস-মেকিং এসটাব্লিশমেন্টের দিকে রওনা দিয়েছেন, রওনা দেবার আগে, ম্যানেজারকে ফোনে, ওর স্বামী এবং ওকে ওয়ার্কশপ আর সিমস্ট্রেসদের মুখগুলো দেখার অনুমতি চেয়ে নিয়েছেন। কমরেড ম্যানেজার এইরকম অনুরোধ শুনে খুবই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মিসেস জাটুরেকির হাবভাব দেখে আর না করতে পারেননি। মিসেস জাটুরেকি অস্পষ্টভাবে কোনও একটা অপমানের কথা, এক ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন-এর কথা এবং কোট সংক্রান্ত কোনও কিছুর কথা বলছিলেন। মিঃ জাটুরেকি, কপালে কুঞ্চন নিয়ে নিঃশব্দে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। 

ওদের ওয়ার্কশপে নিয়ে আসা হল, সিমস্ট্রেসরা নিরুৎসাহভরে মাথা উঁচিয়ে দেখেছিল, আর ক্লারা খুদে ভদ্রলোকটিকে চিনতে পেরে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, নিজেকে যতটা সম্ভব আড়াল করে রাখা যায় অথচ তা যেন বোধগম্য না হয়, এইভাবে সে তার সেলাই নিয়ে তাড়াতাড়ি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

“এই যে এইদিকে”, এই কাটখোট্টা দুজন মানুষকে একটু ব্যঙ্গ করে ম্যানেজার বললেন। মিসেস জাটুরেকি বুঝতে পারলেন যে ওকেই হাল ধরতে হবে, তখন উনি স্বামীকে চালনা করতে শুরু করলেন, “এইবার দেখো!” মিঃ জাটুরেকি চোখ-মুখ কুঁচকে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগলেন। “এদের ভেতর কেউ কি?” ফিসফিস করে মিসেস জাটুরেকি বললেন। চোখের চশমা সত্ত্বেও মিঃ জাটুরেকি পরিষ্কার করে অতবড় ঘরটা দেখতে পাচ্ছিলেন না, দেখাটা খুব সহজ কর্মও ছিল না কারণ ঘরময় কাপড়জামার জঞ্জালের ডাঁই, টানা লম্বা লম্বা রডে অজস্ব ড্রেস ঝুলছে, ব্যস্তসমস্ত মহিলারা কেউ-ই দরজার দিকে মুখ করে একভাবে বসেছিলেন না, ওর উঠছিল, বসছিল, এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল এবং নিজেদের অজান্তেই মুখ সরিয়ে নিচ্ছিল, সেইজন্য মিঃ জাটুরেকিকে কাছে এগিয়ে যেতে হল যাতে করে একখানা মুখও দেখতে ভুল না হয়ে যায়। 

মহিলারা যখন বুঝতে পারল ওদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সে-ও এমন একজন করছে যে কদাকার এবং কুৎসিত, তখন তারা অপমানিত বোধ করে, এবং চারপাশ থেকে তাদের বাঁকা মন্তব্য শোনা যেতে থাকে। একজন মোটা-সোটা তরুণী আর কোনও আব্রু না রেখে বেয়াদপের মতো বলে বসল, “ভদ্রলোক গোট প্রাগ-এ সেই বদখত মহিলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন যিনি ওকে অন্তঃসত্ত্বা করে দিয়েছে।” 

এইরকম চিৎকার চেঁচামেচি কদর্য রসিকতায় মানিকজোড়টি ঘাবড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত অনমনীয় গাম্ভীর্য। 

“মাম্মা”, বেয়াদপ মেয়েটি আবার মিসেস জাটুরেকিকে বলে বসল “আপনার ছোট্ট খোকাটিকে কী করে সামলাতে হয় শেখেননি! আমি হলে কক্ষনো এমন সুন্দর বাচ্চাটাকে বাড়ি থেকে বার হতে দিতাম না!” 

“আরও কয়েকজনকে দেখো না।” মহিলা ফিসফিসিয়ে স্বামীকে বললেন। ভদ্রলোক মুখভার করে ভয়ে ভয়ে, একপা একপা করে এগোতে থাকলেন যেন তাকে কোনও শাস্তি দেওয়া হয়েছে কিন্তু একটি মুখও উনি লক্ষ্য করতে ভুললেন না। 

এই পুরো সময়টা ধরে ম্যানেজারটা আপনমনে হাসছিলেন, উনি ওর মহিলাদের জানেন আর এটাও জানেন যে ওদের কেউ ছুঁতেও পারবে না। সেইজন্য উনি ওদের চেঁচামেচি, হল্লাগুল্লা কানেই তুলছিলেন না। এবার উনি মিঃ জাটুরেকি-কে জিজ্ঞেস করলেন, “এবার বলুন তো, মহিলাটি দেখতে কেমন ছিলেন?” 

মিঃ জাটুরেকি, ম্যানেজারের দিকে ঘুরে গম্ভীরভাবে বললেন, “খুব সুন্দর দেখতে...মেয়েটি খুব সুন্দর দেখতে ছিল।” 

ভেতরের উত্তেজনা এবং আলোড়ন, এইসব দুষ্টু মহিলাদের থেকে ক্লারাকে একটু বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, এককোণে, ও মাথা হেঁট করে, গুটিসুটি মেরে একটানা নিজের কাজ করে চলেছিল। 

নিজেকে অকিঞ্চিৎকর এবং আড়াল করার করুণ প্রচেষ্টায় ক্লারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিঃ জাটুরেকি ওর কাছাকাছি এসে পড়েছেন, মুহূর্তের ভেতর উনি ওর দিকে চাইবেন। 

“মেয়েটি শুধু সুন্দরী ছিল, এইটুকু মনে রাখাই কিন্তু যথেষ্ট নয়।” বিনয়ী ম্যানেজারটি জাটুরেকি-কে বললেন। “এইখানে অনেক সুন্দরী মহিলা আছেন, সে কি বেটে ছিল না লম্বা ছিল?” 

“লম্বা”, জাটুরেকি বললেন। 

“তার চুল কালো ছিল না সোনালি?” 

মিঃ জাটুরেকি একটুখানি ভেবে বললেন, “সোনালি ছিল।” 

গল্পের এই অংশটি সৌন্দর্যের ক্ষমতার ওপর এক নীতিগর্ভ ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে। মিঃ জাটুরেকি যখন ক্লারাকে আমার বাড়িতে দেখেছিলেন, তখন ওর চোখ এত ধাঁধিয়ে গিয়েছিল যে উনি ওকে সত্যি করে দেখেননি। ওর সামনে সৌন্দর্যের এক অস্পষ্ট আবরণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল,এক আলোর আবরণ,তার পেছনে ক্লারা,ওড়নার পেছনে যেমন আড়াল হয়ে গিয়েছিল। 

কারণ ক্লারা লম্বাও না, ওর চুল-ও সোনালি নয়। শুধুমাত্র ওর অন্তলীন সৌন্দর্য, এক বিরাট শারীরিক আকার নিয়ে ওর চোখে ধরা দিয়েছিল। আর সৌন্দর্য যে জ্যোতি প্রকাশ করে, সেই জ্যোতির ছটায় ওর চুলের রং সোনালি মনে হয়েছিল। 

সেইজন্য ছোটখাট মানুষটি যখন এক কোণে একখানা শার্টের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকা খয়েরি রঙের আলখাল্লা পরা ক্লারার কাছে অবশেষে এলেন, উনি ওকে চিনতে পারলেন,কারণ উনি তো ওকে দেখেনইনি। 


৯. 

ক্লারা যখন ওর অসংলগ্ন এবং অবিশ্বাস্য ঘটনাটা শেষ করল, আমি তখন বললাম, “দেখেছে, আমরা কত ভাগ্যবান।” 

কাঁদতে কাঁদতে ক্লারা বলল, “কী ধরনের ভাগ্যবান? আজ যদি ওরা আমাকে না পেয়ে থাকে, কাল ওরা আমাকে খুঁজে বার করবে।” 

“আমি জানতে চাই কী করে?” 

“ওরা এইখানে তোমার বাড়িতে খুঁজতে আসবে।” 

“আমি কাউকে ঢুকতে দেব না।” 

“আর ওরা যদি পুলিশ পাঠায়, তখন কী হবে?” 

“ওঃ আমি মজা করব...আসলে এটা ছিল একটা রসিকতা, মজা।” 

“আজকাল কারুর কোনও রসিকতা করার সময় নেই—এখন সবকিছুই খুবই গুরুগম্ভীর ব্যাপারস্যাপার ওরা বলবে, আমি ওর সুনামে কালি লাগাবার চেষ্টা করেছি। ওর দিকে একবার তাকালেই ওরা বুঝতে পারবে ওর পক্ষে কোনও মহিলাকে প্রলুব্ধ করা সম্ভব নয়।” 

“তুমি ঠিক বলেছ ক্লারা, ওরা হয়তো তোমাকে জেলেও পুরে দিতে পারে” আমি বললাম। 

“রসিকতা বন্ধ কর”, ক্লারা বলল। “এটা আমার জন্য কত খারাপ হল তুমি তা জানো। আমাকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে যেতে হবে, সে-সব আমার রেকর্ডে থাকবে, আর কোনওদিন আমি ওয়ার্কশপ থেকে বার হতে পারব না। সে যাই হোক না কেন, তুমি যে মডেলিং-এর কাজটায় কথা বলেছিলে, তার কদ্দুর কী হল? রাতে, তোমার এখানে আর থাকতে পারব না, ওরা আমাকে ধরতে আসছে। এই ভয়ে ভয়ে সবসময় থাকতে হবে, আজ আমি সেলাকোভিস্ ফিরে যাচ্ছি।” 

সেইদিনের এই হচ্ছে প্রথম বাক্যালাপ। 

সেইদিন দুপুরে একটা ডিপার্টমেন্টাল মিটিং-এর পর হল দ্বিতীয়টা। 

ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান আমাকে ডেকে পাঠালেন। তার মাথাভর্তি সাদা চুল, উনি একজন বিদগ্ধ আর্ট হিস্টোরিয়ান। 

“আপনি জানেন নিশ্চয়, যেই প্রবন্ধটা আপনি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন, যেটি যথেষ্ট যত্ন সহকারে করেননি।” 

“হ্যা,আমি জানি।” আমি জবাব দিলাম। 

“অনেক প্রফেসরদের ধারণা হয়েছে, আপনি ওদের নিয়ে কথা বলেছেন, এবং ডিন মনে করেছেন, ওর ধ্যান-ধারণাকে আপনি আক্রমণ করেছেন।” 

“তা কী করা যাবে।” আমি বললাম। 

“কিছু না”, প্রফেসর জবাব দিলেন,“লেকচারার হিসেবে আপনার তিন বছরের সময় পেরিয়ে গেছে। এখন এই পদটির জন্য অন্যান্য প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা শুরু হবে। প্রথা অনুযায়ী কমিটির এই পদটি তাকেই দেবার কথা যিনি ফ্যাকালটিতে আগে পড়িয়েছেন কিন্তু আপনি কি অতটাই নিশ্চিত যে আপনার ক্ষেত্রে এই নিয়মটি-ই প্রযোজ্য হবে? এই ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইনি। এতদিন ব্যাপারটা আপনার আনুকুল্যে-ই ছিল, কারণ আপনি নিয়মিত লেকচার দেন, ছাত্র-ছাত্রীদের আপনি একজন অতি প্রিয় প্রফেসর, আর আপনি সত্যি সত্যি ওদের কিছু শিখিয়েছেন—কিন্তু এখন এই ব্যাপারটার ওপর আপনি আর ভরসা করতে পারেন না। ডিন আমাকে জানিয়েছেন যে গত তিন মাসে আপনি কোনও লেকচার দেননি এবং তার কোনও সঙ্গত কারণও নেই, আর শুধু এটুকুই আপনাকে ছাটাই করার জন্য যথেষ্ট।” 

আমি প্রফেসরকে বোঝালাম যে আমি একটি লেকচারও বাদ দিইনি, এই সমস্তটাই একটা মজা ছিল। এবং ওকে আমি জাটুরেকি আর ক্লারার কাহিনিটা শোনালাম। 

“ভালো কথা, আমি আপনাকে বিশ্বাস করলাম”, প্রফেসর বললেন, “কিন্তু আমার বিশ্বাস করা না করায় কী হবে, ফ্যাকালটির সকলে বলছে, আপনি কোনও লেকচার দেন না, আপনি কিছু করে না। ইউনিয়নের মিটিং-এ এটি ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে এবং গতকাল ওরা পুরো ব্যাপারটা লেকচার কমিটির কাছে পেশ করেছে।” 

“কিন্তু আমার সঙ্গে ওরা কেন প্রথমে কথা বলল না?” 

“কী নিয়ে বলবে? ওদের কাছে সব কিছুই জলের মতো পরিষ্কার। এখন ওরা আপনার অতীতের সমস্ত আচরণের হিসেব নিচ্ছে, চেষ্টা করছে আপনার অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র খুঁজে বার করার।” 

“কী খারাপ ওরা খুঁজে পাবে আমার অতীতে? আপনি নিজেই জানেন আমার কাজ আমার কত প্রিয়? কোনও কর্তব্য কোনওদিন এড়িয়ে যাইনি, আমার বিবেক পরিষ্কার।” 

“প্রতিটি মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক থাকে”, প্রফেসর বললেন। “আমাদের প্রত্যেকের অতীতকে এমনভাবে অতি সহজে সাজিয়ে নেওয়া যায়, যা দিয়ে এক মহান পুরুষের জীবনী তৈরি করা যেতে পারে, আবার এক ক্রিমিনালের জীবনীও তৈরি করা যেতে পারে। নিজেকে ভালো করে দেখুন, আপনি কাজ পছন্দ করেন না, এমন কথা কেউ বলছে না, কিন্তু এমন যদি হয় এইটেই আপনার পরিত্রাণের সুযোগ করে দিয়েছে। মিটিংগুলোয় আপনাকে বড় একটা দেখা যেত না, যদি বা কখনও উপস্থিত থাকতেন, বেশি সময়টুকুই আপনি নীরব থাকতেন। আপনি কি ভাবছেন তা কেউ বুঝতে পারত না। আমার নিজের মনে আছে, বারকয়েক যখন এক গুরুতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন আপনি হঠাৎ এক রসিকতা করে বসলেন, যাতে সকলে এক অসম্ভব অস্বস্তিতে পড়ল। অস্বস্তিটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সকলে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু এখন, একে অতীত থেকে উদ্ধার করার পর, এ এক বিশেষ রকমের গুরুত্ব অর্জন করেছে। মনে পড়ে, কত রকমের মহিলা ইউনিভার্সিটিতে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত, আর আপনি কীভাবে ওদের ফিরিয়ে দিতেন? অথবা, আপনার সাম্প্রতিককালের রচনাটাই যদি ধরা যায়, ইচ্ছে করলে যে কেউ রচনাটির সুত্র সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। এগুলো অবশ্যই বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু আপনার বর্তমান অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে এদের একবার ভালো করে দেখুন, সব একসঙ্গে যুক্ত হয়ে আপনার চরিত্র এবং আচরণের এক অর্থপূর্ণ প্রামাণিক দলিল হয়ে যাবে।” 

“কিন্তু কোন ধরনের অপরাধ! কী হয়েছিল তা আমি সকলের সামনে বুঝিয়ে দেব। লোকজনের যদি কোনও মনুষ্যত্ব থেকে থাকে তবে তারা হাসবে।” 

“আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। কিন্তু আপনি তখন বুঝতে পারবেন হয় মানুষরা মানুষ নয়, নয়তো, আপনার জানা নেই তারা ঠিক কেমন হয়। ওরা কেউ হাসবে। আপনি যদি ওদের সামনে সবকিছু যেমনভাবে ঘটেছে সেই ভাবেই তুলে ধরেন, তখন বোঝা যাবে আপনি শুধুমাত্র আপনার কর্তব্য থেকেই বিচ্যুত হয়েছেন তা নয়, আপনার সিডিউল অনুযায়ী যা করার কথা ছিল, শুধু যে তা করেনি, তা-ও নয়—তার ওপর আপনি গোপনে লেকচার দিয়েছেন, তার মানে হচ্ছে যা আপনার করার কথা নয় তা-ই আপনি করেছেন। আরও বোঝা যাবে যে, একজন ভদ্রলোক যিনি আপনার সাহায্য চাইছিলেন, তাকে আপনি অপমান করেছেন, বোঝা যাবে যে, আপনার ব্যক্তিগত জীবন ঠিক পথে চলছে না, একটি আনরেজিস্টার্ড-গার্ল আপনার সঙ্গে থাকে, ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের আপনার সম্পর্কে খুব খারাপ ধারণা হবে, ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে উঠবে এবং ঈশ্বর জানেন আর কী কী কেচ্ছা শোনা যাবে—আর সেগুলো আর যাই হোক না কেন সেগুলো তাদের জন্যই সুবিধেজনক হবে, যাদের আপনার ভাবনা-চিন্তা নাড়া দিয়েছিল, আর সেইজন্যই তারা এখন আপনার বিরুদ্ধে যেতে লজ্জা বোধ করছেন। 

প্রফেসর যে আমাকে ভয় দেখাতে বা বোকা বানাতে চাইছিলেন না, তা আমি বুঝেছিলাম। ওকে আমি এক সুচিবায়ুগ্রস্ত, একগুঁয়ে লোক বলে ধরে নিয়েছিলাম আর ওর এই নেতিবাচক মনোভাবের কাছে নিজেকে সপে দিতে চাইনি। মিঃ জাটুরেকিকে জড়িয়ে কুৎসা আমাকে হতোদ্যম করে দিয়েছিল, কিন্তু তা-ও আমার দম পুরো ফুরিয়ে যায়নি। তার কারণ হচ্ছে এই ঘোড়াটাকে আমি-ই এত কিছুর সঙ্গে জড়িয়েছি, তার লাগাম আমি হাতছাড়া করতে পারি না, তবে এ আমাকে যেখানে খুশি টেনে নিয়ে যাবে। 

আর ঘোড়া সেই লড়াই এড়িয়ে যায়নি। বাড়ি পৌঁছাবার পর চিঠির বাক্সে একখানা চিঠি পেলাম। লোকাল কমিটি তাদের মিটিং-এ আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে। 


১০ 

লোকাল কমিটির অধিবেশন চলছিল, এক প্রাক্তন গুদাম ঘরে, এক লম্বা টেবিলের চারপাশে। আমাকে দেখামাত্র সভ্যদের মুখ অন্ধকার হয়ে উঠল। চোখে চশমা, শুটকো গাল, এক প্যানপ্যানে চেহারার ভদ্রলোক আমাকে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বসলাম, এবং উনি শুরু করলেন। উনি আমাকে জানালেন যে বেশ কিছুদিন ধরে লোকাল কমিটি আমার ওপর নজর রাখছে, আমার ব্যক্তিগত জীবন যে সোজা পথে চলছে না, তার সম্পর্কে ওরা খুব ভালোভাবে অবগত আছেন, এইজন্য আমার সম্পর্কে প্রতিবেশীদের ধারণা ভালো না। একবার আমার অ্যাপার্টমেন্টে হুল্লোড়ের জন্য, আমার ভাড়াটেদের ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় তারা ইতিমধ্যে একবার লোকাল কমিটির কাছে নালিশও জানিয়েছে ; এইসব, আমার সম্পর্কে একটা প্রকৃত ধারণা তৈরি করার জন্য ওদের কাছে যথেষ্ট। এর ওপর, মিসেস কমরেড জাটুরেকি, একজন স্কলারের স্ত্রী, তাদের সাহায্যের জন্য দ্বারস্থ হয়েছেন। ছ'মাস আগে তার স্কলারলি কাজের জন্য আমার একটা রিভিউ লেখার কথা ছিল, আমার রিভিউ-এর ওপর তার কাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, জেনেও আমি তা করিনি। 

“স্কলারলি কাজ বলতে আপনি কী বলতে চাইছেন?” শুটকোমুখো ভদ্রলোককে আমি বাধা দিলাম। “এই কাজটা হচ্ছে এক চুরি করা চিন্তাভাবনার জোড়াতালি।” 

“এ তো দেখছি বেশ মজার ব্যাপার কমরেড।” সাজপোশাকে বেশ কেতাদুরস্ত এক মহিলা, বয়স প্রায় তিরিশের কাছাকাছি, চুলের রং সোনালি, মুখের হাসি যেন আঠা দিয়ে সাঁটা। এবার বললেন, “একটা প্রশ্ন করতে পারি কি? আপনার বিষয়টা কী?” 

“আমি একজন আর্ট হিস্টোরিয়ান।” 

“আর কমরেড জাটুরেকি ?” 

“জানি না। হয়তো এইরকম কিছু নিয়েই কাজ করার চেষ্টা করছেন।” 

“দেখেছেন”, সোনালি চুলের মহিলা অন্য সভ্যদের দিকে ঘুরে। উৎসাহের সঙ্গে বললেন। “কমরেড, তার মতো একই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন, এমন একজনকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছেন। আমাদের সমস্ত ইনটেলেকচুয়ালরা আজকাল এইভাবে ভাবতে শুরু করেছেন।” 

“আমি আবার বলছি”, শুটকো গাল-অলা ভদ্রলোক শুরু করলেন, “কমরেড মিসেস জাটুরেকি আমাদের বলেছেন, ওর স্বামী আপনার অ্যাপার্টমেন্টে একজন মহিলার দেখা পেয়েছিলেন ; জানা গেছে এই মহিলা অভিযোগ করেছেন, মিঃ জাটুরেকি ওকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করার চেষ্টা করেছিলেন। কমরেড মিসেস জাটুরেকির হাতে এমন তথ্য আছে যার দ্বারা উনি প্রমাণ করতে পারবেন যে ওর স্বামীর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। যিনি ওর স্বামীর নামে এই মিথ্যে অপবাদ দিয়েছেন উনি তার নাম জানতে চান এবং ব্যাপারটা উনি লোকাল কমিটির শৃঙ্খলা বিভাগে চালান করে দিতে চাইছেন। কারণ উনি অভিযোগ করেছেন যে এই মিথ্যে অপবাদ ওর স্বামীর সুনাম হানি করেছে।” 

এই হাস্যকর ব্যাপারটাকে কেটে ছোট করার আর একবার চেষ্টা করলাম, “শুনুন, কমরেডরা", আমি বললাম, “এই ব্যাপারটায় এত গুরুত্ব দেবার কিছু হয়নি। আজকের আলোচ্য বিষয়টা এতই দুর্বল যে অন্য কেউ এই ব্যাপারটার হয়ে সুপারিশও করবে না, আর যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি মিসেস জাটুরেকি এবং এই মহিলার ভেতর হয়ে থাকে, তার জন্য কোনও মিটিং ডাকার প্রয়োজন ছিল না।” 

“সৌভাগ্যবশত মিটিং হওয়া না হওয়াটা আপনার ওপর নির্ভর করছে না।” শুটকোমূখো লোকটি বললেন। “আর এবার যখন আপনি বলেই দিলেন যে কমরেড জাটুরেকির কাজটা খুবই খারাপ হয়েছে, তখন একে আমরা প্রতিশোধ বলে ধরে নেব। কমরেড মিসেস জাটুরেকি আমাদের একখানা চিঠি পড়তে দিয়েছিলেন, সেই চিঠিটা আপনি ওর স্বামীর প্রবন্ধটা পড়ার পর, ওকে লিখেছিলেন।” 
“হ্যা। শুধু ওই চিঠিতে ওর কাজটা কেমন হয়েছে সে ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি।” 

“তা ঠিক। কিন্তু আপনি ওকে লিখেছিলেন যে, ওকে সাহায্য করতে পারলে আপনি খুশি হতেন; এর দ্বারা এইটুকু বোঝা গেছে যে কমরেড জাটুরেকি-র কাজের প্রতি আপনার সম্মান আছে। আর এখন আপনি ঘোষণা করছেন যে এটা একটা জোড়াতালির কাজ। তখন ওর মুখের ওপর বলেননি কেন?” 

“কমরেড লেকচারার হচ্ছেন দু-মুখো।” সোনালি চুলের মহিলা বললেন। 

এমন সময় একজন বয়স্ক মহিলা আলোচনায় যোগ দিলেন, উনি সোজা ব্যাপারটার মূল জায়গায় আঘাত হানলেন, “আমাদের জানা প্রয়োজন, এই মহিলাটি কে যার সঙ্গে কমরেড জাটুরেকির আপনার বাড়িতে দেখা হয়েছিল?” 

এই পুরো ব্যাপারটার অর্থহীন গুরুত্ব মুছে দেবার ক্ষমতা যে আমার হাতে আর নেই, সে আমি নির্ভুলভাবে বুঝতে পারলাম, একমাত্র একভাবে তাকে সামাল দিতে পারি সে হচ্ছে সমস্ত চিহ্নকে ঝাঁপসা করে দিতে হবে এবং তিতিরের মতো, তিতির যেমন তার শাবকদের বাঁচাবার জন্য, শিকারি কুকুরকে তার বাসা থেকে সরিয়ে নিয়ে, তার কাছে নিজেকে বলি দেয়, সেইভাবে ওদের দৃষ্টি ক্লারার থেকে সরিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। 

“দুর্ভাগ্যবশত, ওর নাম আমার মনে নেই।” আমি বললাম। 

“আপনি যেই মহিলার সঙ্গে বাস করছেন, তার নাম মনে করতে পারছেন না, তা কী করে হয়?” এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন। 

“কমরেড লেকচারার, মহিলাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক রীতিমতো দৃষ্টান্তজনক।” সোনালি চুলের মহিলাটি বললেন। 

“হয়তো আমি মনে করতে পারব, কিন্তু আমাকে একটু ভাবতে হবে। মিঃ জাটুরেকি কখন আমার বাড়িতে এসেছিলেন, তা কি আপনাদের জানা আছে?” 

“সে ছিল..একটু দাঁড়ান।” শুটকোমুখো লোকটি কাগজপত্তর দেখতে থাকলেন, “চোদ্দো তারিখ বুধবার, দুপুরে।” 

“বুধবার...চোদ্দো তারিখ...দাঁড়ান...” হাতের ওপর মাথাটা রেখে আমি একটু চিন্তা করলাম। “ওঃ, মনে পড়েছে, সে ছিল হেলেনা।” ওরা সক্কলে উদগ্রীব হয়ে আমার উত্তরের আশায় রয়েছে দেখলাম। 

“কে হেলেনা?” 

“কে, তা তো জানি না। দুঃখিত। ওকে আমি জিজ্ঞেস করতেও চাইনি। সত্যি কথা বলতে কী, আমি নিজেও ঠিক জানি না, ওর নাম হেলেনা কিনা। ওর স্বামীর মিনোলসের মতো লাল চুল ছিল বলে ওকে আমি হেলেনা বলে ডেকেছিলাম। কিন্তু সে যাই হোক, ওর ওই নামটা খুব পছন্দ হয়েছিল। মঙ্গলবার সন্ধেয় একটা মদের দোকানে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ওর মিনোলস তখন কনিয়া খেতে একটা বার-এ ঢুকেছিল। আমি কোনওরকমে ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে পেরেছিলাম। পরের দিন ও আমার বাড়িতে এসেছিল, সারা দুপুর হিল, সন্ধেবেলায় শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য ওকে একা ছেড়ে একটু বেরিয়েছিলাম। আমি ফিরে আসার পর দেখলাম ও অসম্ভব বিরক্ত। কারণ একজন বেঁটেখাটো লোক ওকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল। আর ওর ধারণা হয়েছে, আমি-ই ওই লোকটাকে ওই কর্ম করতে পাঠিয়েছি। এই ঘটনায় আঘাত পেয়ে ও আমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চায়নি। দেখেছেন তো, ওর আসল নামটাও আমার জানা হয়নি।” 

“কমরেড লেকচারার, আপনি সত্যি বলছেন কি বলছেন না”, সোনালি চুলের মহিলা বলতে থাকেন, “আমার কাছে একেবারে দুর্বোধ্য ঠেকছে, আপনার মতো লোক আমাদের তরুণদের কি শিক্ষা দেবে? হুল্লোড়, মদ্যপান এবং মহিলাদের অপব্যবহার করা ছাড়া, আমাদের জীবন কি আপনাকে আর কোনওভাবে অনুপ্রাণিত করে না? আপনি নিশ্চিন্ত থাকবেন, আমাদের মতামত আমরা সঠিক জায়গায় পৌছে দেব।” 

“দারোয়ান তো কোনও হেলেনার কথা বলেনি”, বয়স্ক মহিলা বলে বসলেন, “কিন্তু ও , আমাদের এইটুকু জানিয়েছে একটি ড্রেস-মেকিং সংস্থার, একজন অরেজিস্টার্ড মেয়ে আপনার সঙ্গে থাকে। ভুলে যাবেন না, কমরেড। আপনি একটি লজিং-এ আছেন, আপনি স্বপ্নেও ভাবলেন কী করে কেউ আপনার সঙ্গে এইভাবে থাকতে পারে? আপনি কি ভেবেছেন আপনার বাড়িটা একটা বেশ্যালয়?” 

আমার চোখের সামনে, দশ ক্রাউনটা, যা দারোয়ানটাকে দিনকয়েক আগে দিয়েছিলাম, চকচক করে উঠল। আমাকে যে চতুর্দিক থেকে বেঁধে ফেলা হচ্ছে, এবং সে কাজটা যে সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে, তা আমি বুঝতে পারলাম। লোকাল কমিটির মহিলাটি বললেন, “মেয়েটির নাম আপনি যদি বলতে না চান, তবে পুলিশ তাকে খুঁজে বার করবে।” 


১১. 

আমার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছিল। প্রফেসর যেমনটি বলেছিলেন। ইউনিভার্সিটিতে এক বিদ্বেষের ভাবসাব অনুভব করছিলাম। কিছু সময়ের জন্য আমাকে কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। কারণ তখনও আমার ডাক আসেনি। কিন্তু এখানে ওখানে, পরোক্ষভাবে উল্লিখিত শ্লেষ, ইঙ্গিত আমি ধরতে পারতাম, এবং মাঝেমধ্যে মারিও কিছু কথা ফাঁস করে দিত, কারণ শিক্ষকরা সব ওর ঘরে কফি খেতে আসতেন এবং তখন তাদের মুখে কোনও লাগাম থাকত না। কয়েকদিনের ভেতর নির্বাচন কমিটির বসার কথা এবং ওরা চতুর্দিক থেকে তথ্য জোগাড় করছিল। আমি ভেবে নিয়েছিলাম এর সভ্যরা লোকাল কমিটির রিপোর্টটা এর ভেতর পড়ে ফেলেছেন, রিপোর্টটা সম্পর্কে আমার এইটুকুই ধারণা ছিল যে এটি গোপনীয় এবং এর বিষয়ে কোথাও কোনও কথা বলা চলবে না। 

জীবনে এমন মুহূর্ত আসে যখন একজনকে আত্মরক্ষার তাগিদে নিজের ভেতর গুটিয়ে যেতে হয়, যখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রক্ষার প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। আমার মনে হয়েছিল আমার জীবনের একমাত্র, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে আমার প্রেম। হ্যা, আমার সেই অতীব কঠিন সময়ে, আমি হঠাৎ বুঝতে শুরু করি যে, আমি আমার দুবলা, দুর্ভাগা সিমস্ট্রেসকে ভালোবাসি, আর সত্যি সত্যি তাকে আমি ভালোবাসি। 

সেই দিন ক্লারার সঙ্গে আমার গির্জয় দেখা হয়। না, বাড়িতে নয়। আপনার কি মনে হয়, বাড়িটা তখনও আর বাড়ি ছিল। বাড়ি কি একটা কাচের দেওয়াল দেওয়া ঘর? একটা ঘর যার ওপর দূরবিন লাগিয়ে নজর রাখা হচ্ছে? একট ঘর যেখানে আপনার প্রেমিকাকে বে-আইনি মালের চাইতেও বেশি সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখতে হবে? 

বাড়ি আর বাড়ি ছিল না। নিজেদের ওখানে সিঁধকাটা চোরের মতো মনে হত, এক্ষুনি বুঝি ধরা পড়ে যাব, করিডোরে পায়ের আওয়াজ শুনলে আমরা ঘাবড়ে যেতাম। সব সময় আশঙ্কায় থাকতাম। এই বুঝি কেউ দরজা পিটতে শুরু করল। ক্লারা সেলাকোভিস্ থেকে যাতায়াত শুরু করেছে, আমাদের আর ওই, পরস্ব করে দেওয়া বাড়িটাতে স্বল্প সময়ের জন্যও দেখা করতে ইচ্ছে করত না। সেইজন্য এক শিল্পী বন্ধুর স্টুডিওটা আমি রাতের জন্য ধার চাইলাম। সেইদিন, প্রথম আমি চাবিটা পেলাম। 

একখানা উচু ছাঁদ-ওলা, মস্ত বড় ঘরে আমাদের দেখা হল, যার বাঁকা জানলা দিয়ে গোটা প্রাগের আলো দেখা যাচ্ছিল। দেয়ালে দাঁড় করানো অসংখ্য ছবি এবং শিল্পীর অগোছালো 

অপরিচ্ছন্নতার ভেতর মুক্তির স্বাদ খুঁজে পেলাম। কোর্টের ওপর নিজেকে আমি ছড়িয়ে দিলাম, কর্ক-টা চেপে একটা ওয়াইনের বোতল খুললাম। এক মধুর সন্ধ্যা এবং রাত্রির প্রতীক্ষায়, আনন্দে, অবাধে বকে যেতে থাকলাম। 

যেই চাপটা আমি আর বোধ করছিলাম না, ক্লারার ওপর তার সম্পূর্ণ ভার বর্তেছিল। 

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ক্লারা একসময় নিঃসংকোচে এবং খুব স্বাভাবিকভাবে আমার সঙ্গে আমার খুপড়িতে বাস করেছে। কিন্তু এখন অল্প সময়ের জন্য অন্য একজনের স্টুডিওতে দেখা হওয়াটা ওর পছন্দ নয়। তার চাইতেও বেশি হচ্ছে। ও বলল, 

“এটা অবমাননাকর।” 

“কী অবমাননাকর?” আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম। 

“আমাদের যে অ্যাপার্টমেন্ট ধার করতে হচ্ছে সেটা।” 

“আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ধার করার ভেতর অবমাননাকর কী আছে?” 

“কারণ তাতে অবমাননাকর কিছু আছে বলে।” 

“কিন্তু আমাদের তো আর কিছু করার নেই।” 

“তা জানি,”ও জবাব দিল, “কিন্তু একটা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে নিজেকে বেশ্যার মতো মনে হচ্ছে।” 

“গুড গড। ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে তোমার নিজেকে কেন বেশ্যার মতো মনে হবে? ওরা নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কাজ চালায়, ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নয়।” 

যুক্তিহীনতার কঠিন প্রাচীরে নারীর অন্তরাত্মা আবদ্ধ, এবং যা সর্বজনবিদিত, সেই প্রাচীরে যুক্তির দ্বারা আঘাত হানা বৃথা। আমাদের আলোচনার শুরু থেকেই ছিল এক অশুভ পূর্বাভাসের ছায়া। 

ক্লারাকে আমি বললাম, প্রফেসর কী বলেছেন, লোকাল কমিটিতে কী হয়েছে এবং ওকে আমি এই বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম যে আমরা দুজন যদি দুজনের পাশে থাকি এবং দুজনকে ভালোবাসি, সবশেষে আমরাই জয়ী হব। 

ক্লারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সব কিছুর জন্য আমি নিজেই দায়ী।” 

“তুমি কি অন্তত আমাকে ওই সিমস্ট্রেসদের হাত থেকে বের হতে সাহায্য করতে পারবে?” 

আমি ওকে বললাম, তখন কিছুদিন, সাময়িকভাবে হলেও, ওকে একটু সহনশীল হতে হবে। 

“দেখলে তো” ক্লারা বলল, “তুমি কথা দিয়েছিলে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু করলে না। যদি আমাকে কেউ সাহায্য করতেও চায়, তবুও আমি এখান থেকে আর বের হতে পারব না, কারণ তোমার জন্য আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেছে।” 

ক্লারাকে আমি কথা দিলাম যে মিঃ জাটুরেকির ব্যাপারেও কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

“আমি এটাও বুঝছি না, কেন তুমি রিভিউটা লিখতে চাইছ না।” ক্লারা বলল, “তুমি লিখলে তো সঙ্গে সঙ্গে শান্তি হত।” 

“বড্ড দেরি হয়ে গেছে ক্লারা”, আমি বললাম, “এই রিভিউটা এখন লিখলে, ওরা বলবে আমি প্রতিশোধ নেবার জন্য লেখাটার বদনাম করছি, আর তখন ওরা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।” 

“লেখাটাকে তোমার খারাপ বলতে হবে কেন? একটা মোটামুটি প্রশংসনীয় রিভিউ লিখছ 

কেন?” 

“পারব না ক্লারা, লেখাটা একেবারেই যাচ্ছেতাই।” 

“তাতে কী হল? হঠাৎ তোমাকে এত সত্যবান হতে হবে কেন? সেইটে কি মিথ্যে ছিল না যখন তুমি ওই ছোট্ট ভদ্রলোককে বলেছিলে যে ভিস্যুয়াল আর্টসের লোকজনদের তোমার সম্পর্কে ধারণা ভালো নয়? আর এটাও কি মিথ্যে ছিল না, যখন তুমি ওকে বলেছিলে যে উনি আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন? আর যখন তুমি হেলেনাকে আবিষ্কার করেছিলে, সেটাও কি মিথ্যে ছিল না? যখন তোমার এতগুলো মিথ্যে বলা হয়ে গেছে, তখন আর একটা মিথ্যে দিয়ে যদি ওর রিভিউটাকে একটু প্রশংসা করে দিতে পার, তাতে কী যাবে আসবে? একমাত্র এইভাবেই তুমি গোটা ব্যাপারটাকে সামাল দিতে পারবে।” 

“দেখো ক্লারা”, আমি বললাম, “তুমি ভাবছ মিথ্যে তো মিথ্যেই—আর তোমার মনে হবে তুমি ঠিকই বলছ। কিন্তু তুমি ঠিক বলছ না। আমি মাথা খাটিয়ে যে কোনও কিছু বার করতে পারি, কাউকে বোকা বানাতে পারি, কারুর নামে মজা করে গুজব রটাতে পারি তাতে আমার বিবেক দংশন হবে না, নিজেকে মিথ্যুক মনে হবে না। এই মিথ্যেগুলো, যদি তুমি ওকে এই নামেই ডাকতে চাও, আমাকে প্রকাশ করে আমার আসল রূপে, আমি যা ঠিক সেইভাবে। এই মিথ্যে দিয়ে নিজেকে আমি অন্য কিছু প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছি না, বরং যা সত্যি তাই বলছি। কিন্তু কিছু জিনিস আছে, যার সম্পর্কে আমি কোনও মিথ্যে বলতে পারব না। কিছু জিনিস আছে যার গভীরে আমি প্রবেশ করেছি, যার অর্থোপলব্ধি করতে পেরেছি, যাদের আমি ভালোবাসি এবং যাদের গুরুত্ব আমার কাছে অনেক বেশি—এদের সম্পর্কে আমি রসিকতা করতে পারব না, কারণ তবে আমি নিজেকেই অবমাননা করব। এটা অসম্ভব, আমাকে এটা করতে বলো না, আমি পারব না।” 

আমরা কেউ কাউকে বুঝলাম না। 

কিন্তু ক্লারাকে আমি সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিলাম। আমার বিরুদ্ধে ওর যাতে কোনও অভিযোগ না থাকে সেই জন্য সবকিছু করতে আমি প্রস্তুত ছিলাম। পরের দিন মিসেস জাটুৱেকি-কে একখানা চিঠি লিখলাম, ওকে জানালাম যে পরশুদিন বেলা দুটোর সময় আমার অফিসে ওর জন্য আমি অপেক্ষা করব। 


১২. 

ওর চরিত্রের ভয়াবহ সঠিকতার সঙ্গে সমতা রেখে মিসেস জাটুরেকি একেবারে নির্দিষ্ট সময়ে আমার দরজায় করাঘাত করলেন। দরজাটা খুলে ওকে আমি ভেতরে আসতে বললাম। 

শেষ পর্যন্ত তবে ওকে আমি দেখলাম। উনি একজন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা, চোখের রং হালকা নীল, মুখ কৃষকের মতো পাতলা সরু। “আপনার সব কিছু খুলে রাখুন।” আমি বললাম, এবং উনি খুব অস্বস্তির সঙ্গে ওর লম্বা, গাঢ় রঙের কোটটা খুললেন, কোমরের দিকটা খুব সরু আর এই বিটকেল ধরনের কোটটাকে দেখে, ঈশ্বর শুধু জানেন কেন আমার পুরনো মিলিটারি কোটের কথা মনে হল। 

আমি ওকে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে চাইনি। আমি চাইছিলাম আমার প্রতিপক্ষ তার পরিকল্পনাটা আগে প্রকাশ করুক। মিসেস জাটুরেকি বসার পর দু'একটা কথা বলে ওর আমি মুখ খোলালাম। 

“লেকচারার”, কোনও আক্রমণের আভাস ছাড়া গম্ভীর স্বরে বললেন, “কেন আপনাকে খুঁজছিলাম জানেন? একজন বিশেষজ্ঞ এবং চরিত্রবান মানুষ হিসেবে আমার স্বামী আপনাকে চিরদিন অসম্ভব সম্মান করে এসেছেন। সব কিছু আপনার ওপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু আপনি কাজটা করতে চাইলেন না। এই প্রবন্ধটা লিখতে আমার স্বামীর তিনটে বছর লেগেছে। ওর জীবন আপনার চাইতে অনেকে বেশি কঠিন। উনি শিক্ষকতা করতেন, প্রতিদিন প্রাগ থেকে ওকে ৬০ কিলোমিটার যেতে হত। গত বছর জোর করে আমি ওটা বন্ধ করিয়েছি আর পুরো সময়টা রিসার্চে ব্যয় করতে বাধ্য করেছি।” 

“মিঃ জাটুরেকির কোনও চাকরি নেই?” 

“না।” 

“উনি কী করে চালান?” 

“আমি কঠোর পরিশ্রম করছি লেকচারার, এই রিসার্চটা আমার স্বামীর প্রাণ। উনি কত পড়াশুনো করেছেন যদি জানতেন। উনি কত পাতা বারবার লিখেছেন যদি জানতেন। উনি সবসময় বলেন, একজন প্রকৃত স্কলারের তিরিশ পাতা টিকিয়ে রাখার জন্য অন্তত তিনশো পাতা লিখতে হয়। আর তার ওপর এই মহিলা। বিশ্বাস করুন লেকচারার আমি ওকে জানি, ভালো করে জানি। এ কাজ ও করেনি সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, কিন্তু তবু কেন এই মহিলা ওর নামে অভিযোগ করছেন? আমি এটা বিশ্বাস করি না। আমার আর আমার স্বামীর সামনে ভদ্রমহিলা বলুক তো দেখি! মেয়েদের আমি জানি, হয়তো ও আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসে। কিন্তু আপনার ওর প্রতি তেমন কোনও আকর্ষণ নেই। হয়তো ও আপনাকে ঈর্ষাকাতর করে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন লেকচারার, আমার স্বামী, তার হিম্মত হবে না এ কাজ করার।” 

আমি মিসেস জাটুরেকির কথা শুনছিলাম, হঠাৎ আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। আমি বিস্মৃত হলাম, এই সেই মহিলা, যার জন্য হয়তো আমার ইউনিভার্সিটি ছাড়তে হতে পারে, এই সেই মহিলা যিনি ক্লারা এবং আমার ভেতর টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছেন এবং যার জন্য রাগে আর অশান্তিতে আমার কত দিন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ওকে জড়িয়ে এত যে ঘটনা, যেখানে আমরা দুজনেই এক করুণ ভূমিকায় অভিনয় করেছি, সে-সব হঠাৎ কেমন আকস্মিক, ইচ্ছাকৃত এবং অস্বচ্ছ মনে হতে লাগল, এবং যে ব্যাপারে আমাদের কারুর কোনও দোষ নেই। সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম আমার এক ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে ঘটনাগুলোকে জীবনের সঙ্গে আমরা জুড়ে নিই এবং আমরাই তাদের চালনা করি, আসল কথাটা হচ্ছে এ গল্পগুলো একেবারেই আমাদের গল্প নয়, আমাদের ওপর এদের চাপানো হয়েছে, বাইরে থেকে, বাইরের কোনও জায়গা থেকে। তারা কোনওভাবেই আমাদের কথা বলে না, তারা যে বিচিত্র পথ অনুসরণ করে, তার জন্য আমরা দায়ী নই, তারা নিজেরাই চালিত হয়, কে জানে কোত্থেকে, আর কে জানে কোন বিচিত্র শক্তি দ্বারা। 

মিসেস জাটুরেকির চোখের দিকে যখন আমি তাকালাম, আমার মনে হল এই চোখ জোড়া আমার কর্মের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাবে না, এই চোখদুটো কিছু দেখতেই পায় না, শুধু যেন সাঁটা রয়েছে, শুধু ওরা ওর মুখের ওপর নড়ছে-চড়ছে। 

“হয়তো আপনি ঠিকই বলেছেন, মিসেস জাটুরেকি।” একটু সমঝোতার সুরে বললাম। “হয়তো আমার মেয়েটি যা বলেছিল, তা সত্যি নয়, কিন্তু আপনি তো জানেন একজন পুরুষমানুষ যখন ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠে, তখন কেমন হয়ে যায়। ওর কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম এবং বিচলিতও হয়েছিলাম। এ তো যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রেই হতে পারে।” 

“ঠিক বলেছেন।” মিসেস জাটুরেকি বললেন। ওর বুকের ওপর থেকে যে এক গুরুভার সরে গিয়েছে, তার বেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। 

“এটা খুব ভালো হল যে আপনি নিজেই বুঝতে পেরেছেন। আমাদের ভয় হচ্ছিল হয়তো আপনি ওর কথা বিশ্বাস করেছেন। আমার স্বামীর গোটা জীবনটাই হয়তো এই মহিলা ধ্বংস করে দিতে পারতেন, এমনকি নৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, এই ব্যাপারটা আমার স্বামীর ওপর যে কালি লেপন করেছে, আমি তার কথাও বলছি না, সে আমরা সামলে নেব, কিন্তু আমার স্বামী আপনার রিভিউ-এর ওপর নির্ভর করে আছেন। সম্পাদকরা ওকে এই বলে আশ্বস্ত করেছেন যে—সব কিছু আপনার ওপর নির্ভর করছে। আমার স্বামীর দৃঢ় বিশ্বাস, ওর আর্টিকলটা প্রকাশিত হলে, তবেই ওকে স্কলারলি কাজ করতে দেওয়া হবে। এখন সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবার পর আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, ওর রিভিউটা কি আপনি এবার লিখবেন? আর একটু কি তাড়াতাড়ি পারবেন?” 

এইবার আমার দুর্বার ক্রোধ প্রশমিত করার এবং সব কিছুর প্রতিশোধ নেবার সময় এসেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কোনও ক্রোধ বা রাগ অনুভব করতে পারছিলাম না, আর যখন আমি মুখ খুললাম, তখন এড়িয়ে যাবার আর কোনও পথ খোলা নেই বলে খুললাম, “মিসেস জাটুরেকি, এই রিভিউ-টা লেখার ব্যাপারে কিছু অসুবিধে আছে, কীভাবে সব কিছু ঘটেছে তা আপনাকে আমি বলব, আমার একটা দুর্বলতা হচ্ছে আমি অপ্রিয় সত্য কারুর মুখের ওপর বলতে পারি না। মিঃ জাটুরেকিকে আমি এড়িয়ে যাচ্ছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম, কেন ওকে এড়িয়ে যাচ্ছি উনি তা বুঝতে পারবেন। ওর কাজটা খুব দুর্বল, এর কোনও স্কলারলি মূল্য নেই। এর ভেতর কোনও পাণ্ডিত্যের ছাপ নেই। আমার কথা কি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে?” 

“আমার পক্ষে এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। আপনার কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।” মিসেস জাটুরেকি বললেন। 

“আসল কথাটা হচ্ছে, এইটা একটা মৌলিক কাজ নয়। আপনি বুঝতে পারলেন তো? আমরা ইতিমধ্যে যা জেনে গেছি, অন্যরা যা লিখে গেছে, একজন স্কলারের তা অনুকরণ করার কথা নয়। একজন স্কলারের কাজ হচ্ছে, কোনও নতুন সত্যে পৌঁছোনো, কোনও নতুন কিছু উদ্ভাবন করা।” 

“আমি খুব ভালো করে জানি, আমার স্বামী অনুকরণ করেননি।” 

“মিসেস জাটুরেকি, আপনি নিশ্চই ওর আর্টিকলটা পড়েছেন—" আমি আরও বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মিসেস জাটুরেকি আমাকে থামিয়ে দিলেন, “না, পড়িনি।” 

আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, “তবে পড়ুন।” 

“আমার চোখের অবস্থা খুব খারাপ।” বললেন মিসেস জাটুরেকি। “পাঁচ বছরের ভেতর আমি একটা লাইন-ও পড়িনি, কিন্তু আমার স্বামীর সততা প্রমাণের জন্য আমার পড়ার প্রয়োজন নেই, সেইসব জানার অন্য পদ্ধতি আছে। মা যেমন তার সন্তানদের চেনে, আমিও আমার স্বামীকে সেইরকমভাবে চিনি, আর উনি যে সেসব ব্যাপারে কতটা সৎ, তা আমি জানি।” 

আমি আরও গভীর সমস্যায় পড়লাম। বিভিন্ন লেখকের লেখা প্যারাগ্রাফগুলো মিসেস জাটুরেকিকে সজোরে পড়ে শোনালাম, যাদের ধ্যানধারণা চিন্তাভাবনা মিঃ জাটুরেকি নিয়েছেন। একে ইচ্ছাকৃত চুরি না বলে বরং বলা যায় যে সব পণ্ডিতদের লেখা ওর ভেতর প্রকৃত শ্রদ্ধা এবং সম্মান জাগিয়েছিল, তাদের প্রতি অজ্ঞাতসারে উনি নতিস্বীকার করেছেন। এটা খুব পরিষ্কার যে কোনও সিরিয়াস স্কলারলি জার্নাল ওর লেখা ছাপবে না। 

আমার কথা মিসেস জাটুরেকি কতটা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন বা বুঝেছিলেন তা জানি না , কিন্তু উনি বিনীতভাবে চেয়ারে বসে থাকলেন, বিনীতভাবে এবং বাধ্য সৈনিকের মতো, যে জানে তার পদত্যাগ করা চলবে না। সব কিছু শেষ করতে আমাদের আধঘণ্টা সময় লেগেছিল। 

মিসেস জাটুরেকি চেয়ার থেকে উঠলেন, আমার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে, নিস্তেজ গলায় আমার কাছে মার্জনা চাইলেন। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, উনি ওর স্বামীর ওপর আস্থা হারাননি, এবং আমার যুক্তিতর্ক, যা ওর কাছে দুর্বোধ্য এবং ধোঁয়াটে মনে হয়েছিল, ঠেকাতে না পারার জন্য উনি একমাত্র নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করছিলেন। উনি ওর বিরাট মিলিটারি কোটটা গায়ে চাপালেন, শরীরে, মনে এই মহিলা যে একজন সৈনিক, তা আমি বুঝতে পারলাম, একজন করুন এবং অনুগত সৈনিক, তার সুদীর্ঘ পথচলার পর একজন ক্লান্ত সৈনিক, এমন একজন সৈনিক যার নিয়মকানুনের বোধ নেই, কিন্তু বিনা প্রতিবাদে তা পালন করে চলেছেন, একজন পরাজিত সৈনিক কিন্তু তিনি তার সম্মান বিসর্জন দেননি। 


১৩. 

“তবে এখন আর তোমার ভয় পাবার কিছু নেই।” আমি ক্লারাকে বললাম। পরে যখন ডালমাসিয়া ট্যভার্নে ওর সঙ্গে দেখা হল, তখন ওকে আর একবার মিসেস জাটুরেকির সঙ্গে আমার কথোপকথনের কথা বললাম। 

“আমার এমনিতেও ভয় পাবার মতো কিছু ছিল না।” ক্লারা এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিল যে আমি অবাক হয়ে গেলাম। 

“কিছু ছিল না মানে, কী বলতে চাও? শুধু তোমার জন্য, না হলে, মিসেস জাটুরেকির সঙ্গে আমি কক্ষনো দেখা করতাম না।” 

“তুমি ওর সঙ্গে দেখা করে ভালো করেছ, কারণ তুমি ওদের সঙ্গে যা করেছ, তার কোনও প্রয়োজন ছিল না। ডঃ কালুসেক বলছিলেন, একজন সৎবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এটা বোঝা দুষ্কর।” 

“ডঃ কালুসেকের সঙ্গে তোমার কখন দেখা হল?” 

“আমি দেখা করেছি ওর সঙ্গে।” 

“আর ওকে কি তুমি সব বলেছ?” 

“কী? এটা কি কিছু গোপনীয়, হয়তো বা। এখন আমি ঠিক বুঝেছি তুমি কী।” 

“সত্যি ?” 

“তুমি কী। তা কি আমি বলতে পারি?” 

“প্লিজ।” 

“একজন একেবারে গতানুগতিক সিনিক।” 

“এটা তোমাকে কালুসেক বলেছে?” 

“কালুসেকের কাছ থেকে কেন, নিজে বুঝতে পারি না, ভেবেছ? তোমার সম্পর্কে কোনও মতামত পোষণ করার আমার কোনও ক্ষমতা নেই, তাই কি তুমি সত্যি সত্যি ভেবেছ নাকি? তুমি লোককে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে ভালোবাস। তুমি জাটুরেকিকে কথা দিয়েছিল ওর রিভিউটা লিখবে।” 

“ওর রিভিউটা লিখব, এমন কথা ওকে আমি দিইনি।” 

“আর আমাকে একটা চাকরি দেবে কথা দিয়েছিলে। মিঃ জাটুরেকির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ, আর আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য তুমি জাটুরেকিকে ব্যবহার করেছ, কিন্তু তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, ওই চাকরিটা আমি পাবই পাব।” 

“কালুসেকের মাধ্যমে?” ঘৃণার সঙ্গে বলার চেষ্টা করলাম। 

“অবশ্যই তোমার মাধ্যমে নয়। জুয়ো খেলতে গিয়ে তুমি এতটাই হারিয়ে ফেললে যে তুমি জান না তুমি কতটা হারালে।” 

“আর তুমি কতটা জানো?” 

“জানি যে তোমার কন্ট্রাক্ট আর রিনিউ করা হবে না। ওরা যদি তোমাকে মফস্সলের কোনও গ্যালারিতে ছোটখাট একটা ক্লার্কের চাকরি দিয়ে পাঠিয়ে দেয় তবে তাতেই তুমি ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু তোমার এইটুকু বুঝতে হবে এসব তোমার নিজের অন্যায়ের ফল। তোমাকে কিছু পরামর্শ দিচ্ছি—এর পরে মিথ্যে কথা বলো না, সৎ থাকার চেষ্টা করো, কারণ যে লোক মিথ্যে বলে তাকে কোনও মেয়ে সম্মান করে না।” 

ও উঠল, ওর হাতটা এগিয়ে দিয়ে (স্পষ্টত শেষবারের মতো) ঘুরে চলে গেল। 

শুধুমাত্র, কিছুক্ষণ পর আমার মনে হল যে (যে শীতল নৈঃশব্দ্য আমাকে ঘিরে ধরেছিল, তা সত্ত্বেও) আমার গল্পটা করুণ ধরনের নয় বরং হাস্যকর ধরনের। 

এতে আমার একটু শান্তি জুটল। 


লেখক পরিচিতি
মিলন কুন্ডেরা
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে চেকোশ্লোভাকিয়ার ব্রুনো শহরে জন্মেছেন। প্রাগের শার্ল বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা বিভাগে সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে পরাশুনা করেন। স্কুলে পড়ার সময়ে কুন্ডেরা কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯৫৩-৫৭ খ্রিস্টাব্দে কাব্যগ্রন্থ বের হওয়ার পরে গল্প ও উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উপন্যাস ' দ্য জোক' বের হয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে একমাত্র গল্পের বই 'লাফেবল লাভস' প্রকাশিত হয় চেক ভাষায়। মোট সাতটি গল্প আছে এই বইয়ে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে চেক দেশে রুশ আগ্রাসনের পরে ৪০০ লেখকের সঙ্গে কুন্ডেরাকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। করা হয় চাকরিচ্যূত। কমিউনিস্ট পার্টি থেকেও হন বহিষ্কৃত। ১৯৭৫ সালে স্ত্রীকে নিয়ে পাকাপাকি ফ্রান্সে  চলে আসেন। নতুন করে লেখালেখি শুরু করেন। সেখানে চেক ও ফরাসী ভাষায় লেখেন। .১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রান্স দেশের নাগরিকত্ব পান। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে চেক দেশে কুন্ডেরার বই নিষিদ্ধ হয়। 
তাঁর বিখ্যাত কথা--The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting. বহু আগে থেকেই তাঁকে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের পাওয়ার আলোচনায় থাকেন। দর্শন, রাজনীতি ও রসিকতার অপূর্ব সমন্বয় পাওয়া যায় কুন্ডেরার গল্প-উপন্যাসে। 

প্রকাশিত উপন্যাস : দ্য জোক, দ্য ফেয়ারওয়েল পার্টি, লাইফ ইজ এলসহোয়ার, দ্য বুক অফ লাফটার এন্ড ফরগেটিং, দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং, ইমমর্টালিটি, স্লোনেস, আইডেন্টিটি, ইগ্নোরেন্স,।
প্রবন্ধের বই : টেস্টামেন্ট, দ্য আর্ট অফ দি নভেল, দ্য কার্টেন।
ফ্রান্স কাফকার উত্তরসূরী মিলন কুন্ডেরা। যৌনতা এবং পরকীয়া সম্পর্কের আপাততুচ্ছ ঘটনাকে কুণদেরা যে দক্ষতায় আমাদের অভিজ্ঞতায় মেলান--তা অভাবনীয়।  

২টি মন্তব্য:

  1. মিলান কুন্দেরার সবকটা ছোটোগল্পই পড়তে চাই। এই গল্পে কী মন্তব্য করব? ছোটোগল্পের সঠিক সংজ্ঞা গল্পটি।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লাগলো
    - অলোকপর্ণা

    উত্তরমুছুন