মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

হারুকি মুরাকামি'র গল্প : মানুষখেকো বেড়াল

অনুবাদ - সাগুফতা শারমীন তানিয়া

অদ্ভুত একটা খবর ছাপা হয়েছে কাগজে, সমুদ্রসৈকতের কাছের একটা কাগজের স্টল থেকে খবরের কাগজটা কিনেছিলাম। খবরে লেখা এক বুড়িকে কয়েকটা বেড়াল মিলে খেয়ে ফেলেছে। এথেন্সের উপকন্ঠে ছোট্ট একটা এক বেড়রুমের ফ্ল্যাটে সত্তরোর্ধ এই বুড়ি একা থাকতো। নিরিবিলি জীবন, বুড়ি আর তার পোষা তিনখানা বেড়াল। সম্ভবতঃ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বিকল হয়ে একদিন সোফায় মুখ থুবড়ে বুড়ি মরে রইলো, পড়ে যাবার কতক্ষণ পরে বুড়ি মরেছে তা কেউ বলতে পারেনা- বুড়ির তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবও ছিলনা যারা তার কাছে বেড়াতে আসতো, ফলে সপ্তাহখানেক যাবত বুড়ির এই মৃত্যু অনাবিষ্কৃত রইলো।
ঘরের জানালা-দরজা ভেতর থেকে আটকানো, ফলে বেড়ালগুলিও গৃহবন্দী হয়ে রইলো। ফ্ল্যাটে কোনো খাবারদাবার ছিলনা, ফ্রিজে হয়তো কিছু না কিছু পড়ে থাকবে, কিন্তু বেড়ালের বিবর্তন এমন জায়গায় পৌঁছায়নি যাতে তারা ফ্রিজ খুলে খাবার বের করতে পারে। এক পর্যায়ে অসহনীয় ক্ষুধার জ্বালায় বেড়ালগুলি মনিবের মাংস খেতে বাধ্য হয়। 

ইজুমি আমার মুখোমুখি বসে ছিল, ওকে এই খবরটা পড়ে শোনালাম। রৌদ্রের দিনে আমরা দু’জন হেঁটে হেঁটে সৈকতে যেতাম, এথেন্সের এক কপি ইংরেজী খবরের কাগজ কিনতাম, করবিভাগের অফিসের পাশের ক্যাফেতে বসে এক কাপ কফির অর্ডার দিতাম, আর কাগজটা থেকে কৌতূহলোদ্দীপক খবরগুলি জাপানীতে তাকে শোনাতাম। এই ছিল দ্বীপটায় আসবার পরে আমাদের রুটিন। কাগজের কোনো খবর যদি আমাদের টানতো, দু’জন তা নিয়ে মতামত দিতাম কিছুক্ষণ। ইজুমির ইংরেজি কিন্তু বেশ ভাল, চাইলে সে নিজেই আর্টিক্যালগুলি পড়ে নিতে পারে। কিন্তু একবারের জন্যেও কখনো আমি তাকে খবরের কাগজটা স্পর্শ করতে দেখিনি। 

“কেউ আমাকে পড়ে শোনালে আমার ভাললাগে” বলতো সে “আমার ছোট্টবেলার স্বপ্ন হচ্ছে রোদেলা একটা জায়গায় বসে থাকবো- আকাশের দিকে বা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে- আর কেউ আমাকে জোরে জোরে পড়ে শোনাবে। কী পড়বে তাতে কিছু যায়-আসেনা, খবরের কাগজ, পাঠ্যপুস্তক, উপন্যাস, যা খুশি। অথচ এর আগে কেউ আমাকে পড়ে শোনায়নি জানো। অতএব, ধরেই নাও যে তুমি আমায় সেই সমস্ত হারানো মুহূর্তের জন্যে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছ। আর, জানোই তো তোমার গলার আওয়াজ আমার ভাললাগে।” 

আমাদের সামনে ছিল আকাশ এবং অবশ্যই সমুদ্র। আর জোরে জোরে পড়তে আমার ভালই লাগত। যখন জাপানে ছিলাম, আমার ছেলেকে ছবির বই থেকে পড়ে শোনাতাম। নিঃসাড়ে চোখ দিয়ে কেবলি বাক্যানুসরণের চেয়ে জোরে পড়ার ব্যাপারটা কতই না আলাদা, কী একটা অপ্রত্যাশিত বস্তু এসে তোমার মনকে ভরে ফেলে, ভাষায় বর্ণনার অযোগ্য একরকমের অনুরণন তৈরি হয় যার টানকে যোঝা মুশকিল। 

তেতো কফিতে মাঝে মাঝে চুমুক দিতে দিতে ধীরে ধীরে আমি ওকে পুরো খবরটা পড়ে শোনালাম। প্রথমে আমি নিজে ক’লাইন পড়তাম, মাথার ভেতর সেটাকে জাপানীজে ছকে নিতাম, তারপর ওকে অনুবাদটুকু শোনাতাম। টেবিলের ওপর আগের খদ্দেরের ফেলে যাওয়া জ্যাম চাটবার জন্যে ক’টা মৌমাছি ভনভন করছিল। জ্যাম চেটে নেবার জন্যে কয়েকমুহূর্ত- তারপর কী একটা মনে পড়েছে এমনি ভাব করে বাতাসে ভোঁকাট্টা হয়ে গেল তারা, চলে যাবার আগে অবশ্য টেবিলটা কয়েক চক্কর দিয়ে গেল। তারপর কী মনে করে আবার টেবিলের ওপর এসে বসলো। আমি পুরোটা খবর পড়ে শেষ করবার পর ইজুমি সেভাবেই বসে রইলো। অনড়। টেবিলে দুই-কনুইয়ে ভর দিয়ে, ডান হাতের আঙুলের ডগাগুলি দিয়ে বাঁহাতের আঙুলের ডগা ছুঁয়ে একরকম তাম্বু রচনা করে। কাগজটা কোলের ওপর রেখে আমি ওর সরু সরু আঙুল দেখছিলাম। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ইজুমি আমার দিকে তাকালো। 

-“তারপর কি হলো?” সে জিজ্ঞেস করে। 

-“ঐ অতটুকুই” আমি কাগজটা ভাঁজ করতে করতে জবাব করি। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের চারপাশের কফির গুঁড়ো মুছি, “অন্ততঃ খবরে ঐটুকুই দিয়েছে।” 

-“কিন্তু ঐ বেড়ালগুলির কি হলো?” 

আমি রুমালটা পকেটে পুরি, “জানিনা, কিছু তো বলেনি।” 

ইজুমি ঠোঁটের কোণ টেনে কামড়ালো, ওর অভ্যাসমতো। যখনি ছোটখাট একখানা ঘোষণার মতন করে ও ওর মতামত জানাতে চায়- ও ঐরকম ঠোঁট কামড়ায়। যেন বিছানার চাদরের ওপর থেকে একটা কুঁচিকে টান করছে- প্রথম প্রথম আমার ওর এই অভ্যাসটা চমৎকার লেগেছিল। 

-“পত্রিকাগুলি বুঝলে, যেখানেই যাও সব জায়গায় সবসময় একইরকম,” সে অবশেষে ঘোষণা দেয়- “এরা কখনো তোমাকে যা জানতে চাও তা জানাবে না।” 

প্যাকেট থেকে একটা সালেম বের করে সে, ঠোঁটে চেপে ধরে আর দেয়াশলাই জ্বালায়। প্রতিদিন সে এক প্যাকেট সালেম শেষ করে, বেশিও না, কমও না। সকালবেলা সে একটা নতুন প্যাকেট খুলবে, আর সারাদিনে সেটা শেষ করবে। আমি ধুমপান করি না। পাঁচবছর আগে আমার স্ত্রী তার গর্ভাবস্থায় আমার তামাকসেবন বন্ধ করেছিল। 

ইজুমি বাতাসে ধোঁয়ার কুন্ডলী নিঃশব্দে ছেড়ে দিয়ে বলে- “আমি আসলে যা জানতে চাই, তা হচ্ছে, বেড়ালগুলির এরপর কি হলো। কর্তৃপক্ষ কি মানুষের মাংস খেয়েছে বলে বেড়ালগুলিকে মেরে ফেলল? নাকি তারা বেড়ালগুলির মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে বলল তোরা বড় কষ্টের সময় পার করেছিস সোনামনিরা…তোমার কি মনে হয়?” 

আমি টেবিলে হুমড়ি খেয়ে পড়া মৌমাছিগুলিকে দেখতে দেখতে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি। অল্প কিছু সময়ের জন্যে আমার মাথার ভেতরে ঐ বুড়ির মাংস খাওয়া বিড়ালগুলি আর চঞ্চল মাছিগুলি এক হয়ে যায়। একটা দূরবর্তী গাঙচিলের তীক্ষ্ণ চিৎকার মৌমাছিগুলির গুনগুন ঢেকে দেয়, দুয়েক সেকেন্ডের জন্যে আমার চেতনা স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে কোনো এক স্থানে বিক্ষিপ্ত থাকে- আমি কোথায়? এখানে কি করছি আমি? ধাতস্থ হতে পারছিলাম না। একটা বড় শ্বাস টানলাম, আকাশে তাকালাম আর ইজুমির দিকে ফিরলাম এরপর। 

-“জানিনা তো।” 

-“ভেবে দ্যাখো, তুমি যদি ঐ শহরের মেয়র হতে বা পুলিশের বড়কর্তা, কি করতে তুমি বেড়ালগুলিকে দিয়ে?” 

-“ওগুলিকে সংশোধনাগারে দিলে কেমন হয়, ধরো শুধু নিরামিষভোজী বানিয়ে ফেলা হলো বেড়ালগুলিকে?” 

ইজুমি হাসলো না। তার সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে খুব ধীরে একটা ধোঁয়ার স্রোত গলগলিয়ে বের করে দিল। 

-“গল্পটা আমাকে একটা লেকচারের কথা মনে পড়িয়ে দিল, তখন আমি কেবল ক্যাথলিক হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি। তোমাকে কি বলেছি যে আমি একটা ক্যাথলিক স্কুলে গেছিলাম? খুব কড়াকড়ি, নবীনবরণের পরপরই আমাদের লেকচার থিয়েটারে একত্র করে হেড নানদের একজন স্টেজে উঠে ক্যাথলিক বিধিমালা নিয়ে কিছু কথা বললেন। অনেক কিছুই তিনি বলেছিলেন সেদিন, কিন্তু আমার যেটা সবচেয়ে বেশি মনে আছে বা বলতে গেলে একমাত্র যেটা মনে আছে সেটা হলো তাঁর বলা জাহাজডুবির পরে একটা জনমানবশূন্য দ্বীপে একটা বেড়ালের সাথে থাকার গল্প।” 

-“হুম, ইন্টারেস্টিং।” 

-“ বুঝলে, ঐ নান বলছিলেন তুমি একটা জাহাজডুবির পরে বেঁচে আছ- তুমি আর একটা বেড়াল শুধু লাইফবোটে করে একটা নামহীন জনমানবহীন দ্বীপে এসে পৌঁছেছ। খাওয়ার মতো কিছুই নাই সেখানে, তোমার কাছে সাকুল্যে যা আছে তা হচ্ছে খানিকটা খাওয়ার পানি আর শুকনো বিস্কুট, একটা মানুষের দশদিন যায়মতো। এরপর উনি বললেন- তোমরা সব্বাই ধরে নাও তোমরা প্রত্যেকে ঐ অবস্থায় পড়েছ। চোখ বন্ধ করো আর ভাবো। তুমি একদম একলা একটা দ্বীপে, তুমি আর একটা বেড়াল। তেমন কোনো খাদ্যই নেই তোমার সাথে, বুঝলে? তুমি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং একসময় তুমি মরবে। কি করবে তুমি? তুমি কি তোমার ঐ-অতটুকুন খাবার বেড়ালটার সাথে ভাগাভাগি করবে? না সেটা ঠিক হবে না। সেটা ভুল হবে। তোমরা ঈশ্বরের মনোনীত, তোমাদের প্রত্যেকে মূল্যবান, বেড়ালটা তা নয়। সেইজন্যেই তোমার খাদ্যের সরবরাহ যা আছে, সেটা তোমারই খেতে হবে, পুরোটা। এই গল্প বলে নান আমাদের একটা ভয়ানক সিরিয়াস চাউনি দিলেন, আমি একটু ধাক্কা খেলাম। এই গল্প মাত্র হাইস্কুল শুরু করা বাচ্চাদের শোনানোর মানে কি? ভাবছিলাম কিসের মধ্যে এসে পড়লাম!” 

ইজুমি আর আমি একটা ছোট্ট গ্রীক দ্বীপে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। পর্যটনের মৌসুম ছিল না তখন, এম্নিতেও দ্বীপটা পর্যটকদের কাছে তেমন আকর্ষণীয় নয়, সেজন্যে ভাড়াটা কমই। এখানে আসবার আগ অব্দি আমরা এই দ্বীপের নাম পর্যন্ত শুনিনি। দ্বীপটা তুরস্কের সীমানার কাছাকাছি, রৌদ্রের দিনে ঠাহর করে দেখলে দিগন্তে তুর্কি পর্বতমালার সবুজ রেখা দেখা যায় । এলাকার স্থানীয়রা ঠাট্টা করে বলে, বাতাসের দিনে তুমি শিশ-কাবাবের গন্ধ পাবে! সে যাই হোক, দ্বীপটা অন্য গ্রীক দ্বীপের চেয়ে বরং তুর্কি উপকূলের কাছে ছিল, দৃষ্টিসীমার ডানে নিবিড় করে ঘনিয়ে ছিল এশিয়া মাইনর। 

টাউন স্কোয়ারে গ্রীক স্বাধীনতাযুদ্ধের এক বীরের মূর্তি, ইনি গ্রীক মূল ভূখন্ডে তুর্কিদের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তুর্কিরা তখন শাসন করছিল দ্বীপটা। ইনি তুর্কিদের হাতে ধরা পড়েন, এঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। সৈকতের কাছে একখানা কাঠের শূলে নগ্ন করে তাঁকে চড়ানো হয়, শরীরের ওজনের চাপে শূল তাঁর পশ্চাদ্দেশ ভেদ করে সারা শরীর ফুঁড়ে মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে- একটা অবিশ্বাস্য যন্ত্রণাদায়ক এবং ধীর মারন-প্রক্রিয়া। সম্ভবতঃ মূর্তিটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই এই ঘটনা ঘটে। প্রথম যখন এটা দাঁড় করানো হয়, নিশ্চয়ই বেশ দেখবার মতো ছিল সেটা, এখন নোনা বাতাস-ধুলা-গাঙচিলের গু মিলে বীরের চেহারাই বদলে ফেলেছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় পথিকরা কেউ পারতপক্ষে নোংরা মূর্তিটার দিকে ফিরে তাকায় না, বীরকেও মনে হয় যেন এই জনতা- এই দ্বীপ- এই পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে। 

আমি আর ইজুমি যখন খোলা ক্যাফেতে বসে কফি আর বীয়র খাচ্ছিলাম, আর বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে দেখছিলাম কূলের নৌকোগুলি, গাঙচিলগুলি আর দূরের তুর্কি পর্বতমালা- তখন আমরা আসলে ইউরোপের এক-কিনারায় বসে ছিলাম। বাতাসটা ছিল পৃথিবীর কিনারার বাতাস। একরকমের বিগতদিনের রঙে সমস্তটা ঢেকে ফেলা, মাঝে মাঝে আমার মনে হতো একটা আজব বাস্তবতা আমাকে একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে, অচেনা বিচিত্র কিছু, অধরা, অস্পষ্ট কিন্তু আশ্চর্য কোমল। সেটারই ছায়া মুখগুলিতে, চোখগুলিতে, কূলে জটলা করে থাকা মানুষগুলির চামড়ায়। 

মাঝে মাঝে আমার নিজেরই বিশ্বাস হোত না যে আমিও এই দৃশ্যের অন্তর্গত। যতই আমি আশপাশের দৃশ্যাবলী শুষে নিতাম- যতই আমি প্রাণ ভরে এই বাতাসে শ্বাস নিতাম, ততই মনে হতো এসবের সাথে আমার কোনো শরীরি যোগাযোগ নেই। 

দু’মাস আগে আমি আমার স্ত্রী আর চার বছর বয়সী ছেলের সাথে টোকিওর উনোকিতে একটা তিনকামরার অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। খুব আহামরি কিছু না, নেহাত মাথা গুঁজবার একটা জায়গা। আমার আর আমার স্ত্রীর শোবার ঘর ছিল, আলাদা শোবার ঘর ছিল ছেলেটার আর অন্য ঘরটা ছিল আমার স্টাডি। শান্ত একটা অ্যাপার্টমেন্ট, সামনে সুন্দর জায়গা। ছুটির দিনে আমরা তিনজন তামা নদীর পাড়ে হাঁটতে যেতাম। বসন্তকালে তামা নদীর দুই তীরের চেরিফুলগুলিতে বিস্তর ফুল আসতো, ছেলেকে আমার বাইকের পিছে বসিয়ে আমরা ‘জায়েন্ট ট্রিপল এ’টিমের বসন্তকালীন কসরত দেখতে যেতাম। 

একটা মাঝারি মানের ডিজাইন কম্পানিতে আমি চাকরি করতাম, কম্পানিটার কাজ ছিল বই-ম্যাগাজিন এসবের লে-আউট ডিজাইন করা। আমাকে ‘ডিজাইনার’ বললে একটু বেশিই বলা হবে, কাজটাতে তেমন মাথা খেলানোর সুযোগ ছিল না। অভিনব কিছু না, স্বাপ্নিক কিছু না। বেশিরভাগ সময় আমাদের শিডিউলে কাজের সময়টা খুব ধরাবাঁধা ছিল, মাসের বেশ কিছু দিন আমাকে সারা রাত অফিসে কাজ করতে হতো। কাজ করতে গিয়ে ক্লান্তিতে-বিরক্তিতে রীতিমত কান্না পেত আমার। যা হোক, কাজটা করতাম, কোম্পানিটার পরিবেশ একটু ঢিমে-তেতালা, আমার সিনিয়রিটি ছিল বলে আমি আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলি বাছাই করতে পারতাম, প্রায়সময়েই আমি কী করতে চাই সেটা নির্ধারণ করে নিতে পারতাম। আমার বস খারাপ ছিল না, সহকর্মীদের সাথে বাধতো না আমার। বেতনও খারাপ না কোনোভাবেই। তেমন কিছু না হলে এই কম্পানিতেই আমি ভবিষ্যতেও রয়ে যেতাম- আর আমার জীবন মলদ্যু নদীর মতো বা বলা ভাল মলদ্যু নদীর প্রবহমান জলের মতন বইতেই থাকত, ঝরঝরিয়ে, সমুদ্রের দিকে। 

কিন্তু এর ভিতরে একদিন ইজুমির সাথে দেখা হয়ে গেল আমার। 

.................................................................................................................................

ইজুমি আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় একটা বিজনেস মিটিংএ, প্রথম দৃষ্টিবিনিময়ের পর থেকেই আমাদের ভিতরে কি যেন একটা কাজ করতে থাকে, এমনটা সচরাচর ঘটে না। আমাদের জয়েন্ট প্রজেক্ট নিয়ে আলাপ করবার জন্যে আমরা আরো দুয়েকবার মিলিত হই। আমি ওর অফিসে যেতাম অথবা ও আমার অফিসে। আমাদের মিটিংগুলি যথারীতি অল্পসময়ের জন্যে হতো, অন্য লোক উপস্থিত থাকতো এবং পুরোটাই ছিল ব্যবসায়-সংক্রান্ত। অথচ আমাদের প্রজেক্ট শেষ হবার পর অদ্ভূত একরকমের শূন্যতা আমাকে ভরে দিল- যেন আমার জন্যে অসম্ভব আবশ্যক কিছু আমার থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে কেউ। বহু বহু বছর আমি এইরকম বোধ করিনি। আর আমার ধারনা, ইজুমিও না। 

একসপ্তাহ পর ইজুমি আমার অফিসে ফোন দিল, টুকটাক কাজের কথা সেরে আমরা কিছুক্ষণ গল্প করলাম। আমি একটা জোক বললাম, ও হাসলো, বললাম- “চলো ড্রিংক হয়ে যাক।” আমরা একটা ছোট্ট বারে গেলাম, কয়েকদফা পান করলাম। আমার ঠিক মনে নেই কী নিয়ে কথা বলেছিলাম, কিন্তু মনে আছে লক্ষ লক্ষ বিষয় জুটে গেল কথা বলবার মতো, মনে হলো অনন্তকাল কথা বলে যেতে পারি আমরা। ও যা বলতে চায় সেটা আমি লেজাররশ্মির মতন পষ্ট করে বুঝতে পারি, আর যেটা আমি অন্যলোককে বোঝাতে জেরবার হই, সেটা সে এমন নিখুঁত করে বুঝতে পারে যে আমি চমকে যাই। আমরা দু’জনই বিবাহিত, বিবাহিত জীবন নিয়ে তেমন বড়সড় অভিযোগও করবার কিছু ছিল না আমাদের। যার যার স্বামী-স্ত্রীকে আমরা ভালই বাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তারপরেও এ দৈবের নির্দেশ ছিল- এমন কাউকে পাওয়া যার কাছে এমন করে নিজেকে মেলে ধরা যায়, এমন সম্পূর্নতায়। অনেক লোক সারাজীবন কাটিয়ে দেয় এমন মানুষের খোঁজে। এটা ঠিক ‘ভালবাসা’র লেবেল দেয়া ঠিক হবে না। এটা বরং পরিপূর্ন সহমর্মিতা। 

আমরা মদ্যপান করবার জন্যে প্রায়ই দেখা করতে লাগলাম। ইজুমির স্বামী অনেক রাত অব্দি কাজ করতো, ফলে ওর যাওয়া-আসার স্বাধীনতা ছিল। যখন আমরা দেখা করতাম, সময় যেন উড়ে যেত। হাতঘড়ির দিকে একসময় চোখ যেত, আবিষ্কার করতাম কোনোমতে এখন শেষ ট্রেনটা ধরতে পারি আমরা। ওকে বিদায় দেয়াটা আমার জন্যে দুর্বিষহ ছিল, কত কী যে বলবার বাকি থাকতো আমাদের, প্রতিবার। 

দু’জনের কেউই আমরা একে অপরকে বিছানায় হাতছানি দিইনি, কিন্তু আমরা শারীরিকভাবে মিলিত হতে শুরু করেছিলাম। দু’জনেই তার আগ পর্যন্ত যে যার সংসারে বিশ্বস্ত ছিলাম।, অথচ আমাদের একটুও গ্লানি হতো না, মনে হতো এ যেন চিরনির্ধারিত। ইজুমিকে কাপড়চোপড়ের আবরণ থেকে বের করে আনা- তার শরীরে আদরের হাত রাখা- তাকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরা- তার ভিতরে পিছলে ঢুকে যাওয়া- বের হয়ে আসা... এর সবটুকুই ছিল আমাদের কথোপকথনের প্রাকৃতিক বিস্তারমাত্র। এত সহজতায় যে, আমাদের ভালবাসাবাসিটায় হৃদয় নিঙড়ানো শরীরি উত্তেজনা ছিল না- ছিল একরকমের শান্ত-সমাহিত-প্রসন্ন মুদ্রা, নির্ভান। শরীরের খেলা ফুরালে বিছানায় শুয়ে আমাদের নিঃশব্দে বলা কথাগুলি ছিল সবচেয়ে মধুর, ওর নিরাবরণ শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে থাকতাম আমি, ও আমার দু’হাতের মাঝখানে কুন্ডুলি পাকিয়ে থাকত, আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষাসংকেতে যার যার গোপন কথা বলে যেতাম। 

যখনই ফুরসত পেতাম, আমরা দেখা করতাম। কী অদ্ভূত ভাবেই (অথবা স্বাভাবিকভাবেই) না আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে এই সম্পর্ক চিরকাল চলতে পারে, ইকোয়েশনের একদিকে আমাদের বিবাহিত জীবন অপর দিকে আমরা দু’জন, কোনো গোলোযোগবিহীন। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের প্রেম কখনো প্রকাশ হয়ে পড়বে না। হ্যাঁ, আমরা শারীরিকভাবে মিলিত হতাম, কিন্তু সেটাই বা কাকে আঘাত করছিল? যেসব রাতে আমি ইজুমির সাথে মিলিত হতাম, সেসব রাতে দেরীতে বাড়ি ফিরে বৌকে কিছু না কিছু অজুহাত দিতাম, আমার বিবেকে একটু বিঁধতো, কিন্তু কেন জানি নিজেকে ঠিক প্রবঞ্চক মনে হতো না। ইজুমি আর আমার সম্পর্কটা একেবারে বাক্সবন্দী বস্তু ছিল, যদিও গভীর অন্তরঙ্গতার, তবু। 

হয়তো যদি কিছু না ঘটতো, আমরা এভাবেই চিরকাল কাটিয়ে দিতাম, ভদকা আর টনিক খেয়ে, চাদরের ভিতরে দু’জন ঢুকে গিয়ে, দিনের পর দিন। অথবা হয়তো আমাদের সঙ্গীদের কাছে মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, সিদ্ধান্ত নিতাম এ সম্পর্কের প্রাকৃতিক মৃত্যু হোক- যেন ফিরে যেতে পারি যার যার ছোট্ট-সুনিবিড় জীবনযাত্রায়। যাই হোক, মনে হয় সেটা খারাপ হতো না। এখন সেটা আর বলা যায় না, খালি মনে হয়। কিন্তু ভাগ্যদেবীর মোচড় (এখন পিছু ফিরে দেখলে সেটা অবশ্যম্ভাবী মনে হয়) এলো, ইজুমির স্বামী আমাদের সম্পর্কের কথা টের পেয়ে গেল। ইজুমিকে আচ্ছামতো জেরা করে সব বের করে সেই লোকটা ঝড়ের মতন আমার ঘরে এলো। ভাগ্যের লিখন এই, আমার স্ত্রী তখন একলা ছিল বাড়িতে, ফলে ব্যাপারটা একটা জঘন্য মাত্রা নিল। যতক্ষণে আমি ফিরেছি, ততক্ষণে আমার স্ত্রী তৈরি হয়ে আছে আমাকে প্রশ্ন করবার জন্যে। ইজুমি সবকিছু স্বীকার করে নিয়েছিল, ফলে আমার পক্ষে নতুন কোনো গল্প ফাঁদা সম্ভব ছিল না। আমি আমার স্ত্রীর কাছে সব স্বীকার করে নিলাম, শুধু বললাম- “এটা ঠিক প্রেম না, একটা বিশেষ সম্পর্ক, তোমার সাথে আমার যা সম্পর্ক তার থেকে সম্পূর্ন আলাদা একটা জিনিস। একদম দিবারাত্রির মতো আলাদা। তুমি কিছু টের পাওনি এতোদিনে, পেয়েছ? তাহলেই বোঝো এটা ঠিক তুমি যা ভাবছ তা নয়।” 

আমার স্ত্রী কিছুই শুনতে নারাজ, অসম্ভব আঘাতে সে হিম হয়ে গেছিল, আক্ষরিক অর্থেই আর কোনো শব্দ সে উচ্চারণ করেনি। পরদিন সে তার সবকিছু বাঁধাছাঁদা করে গাড়িতে তুললো এবং গাড়ি চালিয়ে চিগাসাকিতে বাপের বাড়ি চলে গেল, সঙ্গে নিয়ে গেল আমাদের ছেলেকে। আমি কয়েকবার ফোন করলাম, সে ফোন ধরলো না। তার বাবা ফোন ধরলেন- বল্লেন, “তোমার খোঁড়া অজুহাতগুলি আমি শুনতে চাই না। আমি আমার মেয়েকে তোমার মতো বেজন্মার সাথে সংসার করতে দিতে পারি না।” উনি শুরু থেকেই বিয়েটার বিপক্ষে ছিলেন, ফোনে ওঁর গলা শোনালো সত্যদ্রষ্টার মতো ভারিক্কি। 

হতবুদ্ধি হয়ে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বাসায় বসে রইলাম, একলা শুয়ে রইলাম বিছানায়। ইজুমি ফোন দিল আমাকে। সেও একাকী, স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, যাবার আগে দু’চার ঘা চড়চাপড় দিয়ে যেতে ভোলেনি। আর একটা কাঁচি নিয়ে ইজুমির সমস্ত কাপড় টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেছে সে, ইজুমির ওভারকোট থেকে শুরু করে তার অন্তর্বাস অব্দি সব। ইজুমির ধারনা নেই সে কোথায় গেছে, সে বল্লো- “আমার খুব ক্লান্ত লাগছে, সব কিছু ভেঙেচুরে গেল, আর কিছুই আগের মতো থাকবে না- ও আর আসবে না”, ফুঁপিয়ে উঠলো সে ফোনের ভিতরে। সেই হাইস্কুল থেকে ওদের প্রেম, আমার ওকে সান্তনা দিতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু আমিই বা কী বলতে পারি? 

ইজুমি কান্না থামলে বল্লো- “চলো কোথাও যাই, গিয়ে খুব মদ খাই”। আমরা শিবায়াতে একটা নৈশ বারে গিয়ে সারারাত খুব টানলাম। আমি ভদকা গিমলেট খেলাম, ও খেল ডেকারি। কতটা খেলাম তার হিসেব রাখতে পারিনি আমি। এই প্রথম আমরা যখন দেখা করছি, তখন আমাদের পরস্পরকে কিছু বলার নেই। সকালে হারাজুকু পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে আমরা মদের ঘোরটা কাটালাম, ডেনিজে গিয়ে কফি খেলাম আর প্রাতরাশ সারলাম। তখনি সে গ্রীস যাবার কথাটা পাড়লো। 

-“গ্রীস?” আমি প্রশ্ন করি। 

-“জাপানে আমরা থাকতে পারি না, কি বলো!” ইজুমি গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। 

আমি গ্রীস নিয়ে মাথার ভিতরে নাড়াচাড়া করতে থাকি, আমার অ্যালকোহল-স্নাত মস্তিষ্ক গ্রীস যাওয়ার লজিকটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। 

-“আমি সবসময়ই গ্রীস যেতে চেয়েছি” ইজুমি বলে, “এটা আমার স্বপ্ন বলতে পারো। আমাদের মধুচন্দ্রিমাতে আমি গ্রীস যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের যথেষ্ট পয়সা ছিল না। তো এখন চলো দু’জন গ্রীস যাই আর ধরো, ঐখানেই থাকি, কোনোকিছু নিয়ে কোনো চিন্তা নাই। জাপানে থাকলে তিলে তিলে শুধুই বিমর্ষ হতে থাকব, আর কিছু হবে না।” 

গ্রীস নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ইজুমির সাথে সম্মত হতে হলো। আমরা দু’জন বসে হিসাব করলাম কার কাছে কত আছে। ইজুমির সেভিংসে আছে আড়াই মিলিয়ন ইয়েন আর আমার কুড়িয়ে বাড়িয়ে হবে দেড় মিলিয়ন। চার মিলিয়ন ইয়েন মানে প্রায় পঁচিশ হাজার পাউন্ড। 

-“পঁচিশ হাজার পাউন্ড দিয়ে গ্রীসের কোনো গাঁওগেরামে কয়েক বছর দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারা যায় নিশ্চয়ই” ইজুমি বলে, “সস্তা ফ্লাইটে আমাদের আড়াই হাজার যাবে। তো সেটা বাদ দিলে ধরো গে তেইশ হাজার। ধরো যদি মাসে আমরা ছ’শো পঞ্চাশ খরচ করি, আমাদের তিন বছর চলে যাবে। না হলেও আড়াই বছর? কি বলো তুমি? যাই চলো, তারপর আমরা আস্তে আস্তে সবকিছু সামলে উঠব’খন।” 

আমি আমার চারদিকে তাকাই। সাতসকালের ডেনিজ গমগম করছে কমবয়স্ক যূগলে- আমরাই কেবল ত্রিশোর্ধ। এবং হয়তো কেবল আমরাই সেই যূগল যারা একটা ঝোড়ো সম্পর্কের পরে নিজেদের সব টাকা নিয়ে গ্রীস পালাবার কথা ভাবছি। কি কেলো! নিজের হাতের তালুর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি আমি। এই অব্দি তাহলে আমার জীবন এসে পৌঁছেছে? 

-“আচ্ছা চলো তবে তাই হোক।” বলি আমি। 

.................................................................................................................................
পরদিন কাজে ইস্তফা দিলাম, আমার ওপরওয়ালা কিছু কানাঘুষো শুনে থাকবে- সেও ধরে নিল আপাততঃ একটা লম্বা ছুটিতে যাওয়াই আমার জন্যে মঙ্গল। আমি চলে যাচ্ছি শুনে সহকর্মীরা অনেকেই ভীষণ অবাক হলো, কিন্তু কেউই আমার সিদ্ধান্ত বদলাবার জন্যে তেমন চাপ দিল না। দেখলাম, চাকরি ছাড়া খুব কঠিন কিছু নয়। একবার কিছু ছাড়বার সংকল্প করলে ছাড়া যায় না এমন খুব কমই জিনিস আছে। একবার হাঁটকানো শুরু করলে হেন বস্তু নেই যা ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। যেন বাজিতে হেরে প্রায় সর্বস্ব হারাবার পরে ভাবছি টাকাকড়ি আর যাকিছু বাকি আছে, তাও হারি, চুলোয় যাক কৌপিনখানাও। শেষটুকু আঁকড়ে রাখা কঠিন। 

একটা মাঝারি-গোছের নীল স্যামসোনাইট স্যুটকেসে আমার যা কিছু লাগতে পারে তার সব গুছিয়ে তুললাম। ইজুমিও সমানমাপেরই লাগেজ নিল। 

মিশরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় একরকম প্রচন্ড ভয় আর আশঙ্কা আমায় গ্রাস করলো যে অন্য কেউ আমার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যাবে। এরকম কত হাজার হাজার নীল স্যামসোনাইট স্যুটকেস আছে দুনিয়ায়। হয়তো গ্রীসে গিয়ে স্যুটকেস খুলে দেখবো সেটা অন্য কারো জিনিসপত্রে ঠাসা। রীতিমতো প্যানিক অ্যাটাক হতে লাগলো আমার। স্যুটকেসটা হারালে এক ইজুমি ছাড়া বিগতজীবনের সাথে আমার সকল সূত্র ছিন্ন হয়ে যাবে। হঠাৎ কেমন মনে হতে লাগলো দুনিয়ার সামনে থেকে যেন হাওয়া হয়ে গেছি আমি, একেবারে অদৃশ্য। অদ্ভুত একটা অনুভূতি। যেন এই যে প্লেনে বসে আছি, এটা আর আমি নই। যেন ভুলক্রমে আমার মস্তিষ্ক হুবহু আমার মতন দেখতে আরেকটা প্যাকেজে সুবিধেমতন ঢুকে গেছে। মাথার ভিতরটা চরম বিশৃঙ্খল। যেন আমার এখুনি জাপানে ফিরে যাওয়া চাই, তবেই আমার নিজের শরীরের ভেতর আবার ঢুকে যেতে পারব। কিন্তু এই তো আমি জেটপ্লেনে সওয়ার হয়ে মিশরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি, এ তো পালটানো যাবে না। যেন একটা নতুন শরীরের প্লাস্টারকাস্টে সাময়িকভাবে ঢুকে গেছি, চুলকোলে প্লাস্টারের খড়ি উড়বে। প্রচন্ড কাঁপুনি হতে লাগলো আমার। মনে হতে লাগলো, এভাবে যদি আরো কিছুক্ষণ কাঁপতে থাকি তবে এই শরীর নামক আধারখানা ভেঙে খানখান হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে। প্লেনের বাতানুকূল আবহাওয়ার ভেতরই আমি কুলকুল করে ঘামছি। আমার শার্ট ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে আমার গায়ে, বিচ্ছিরি গন্ধ উঠছে আমার গা থেকে। পুরো সময়টা ধরে অবশ্য ইজুমি আমার হাত শক্ত করে ধরে ছিল, মাঝে মাঝে জড়িয়েও ধরছিল একটাও কথা না বলে, সে জানতো আমার কেমন লাগছিল। এই কাঁপুনিগুলো আসছে আর প্রায় আধঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে, মনে হচ্ছে মরে যাই, কানে রিভলভারের নল সেঁধিয়ে দিয়ে ট্রিগার চেপে দিই যেন আমার দেহ আর মন একসাথে ধুলোয় মিশে যায়। 

কাঁপুনিগুলো থামবার পরে অবশ্য আমার হালকা লাগতে লাগলো হঠাৎ করেই, উদ্গ্রীব হয়ে থাকা কাঁধগুলো একটু ভারমুক্ত হয়ে উঠলো, স্রোতের সাথে ভাসিয়ে দিলাম নিজেকে। কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। যখন চোখ খুললাম, নীচে তাকিয়ে দেখি ইজিয়ান সাগরের ফিরোজা জলবিথার ছড়িয়ে আছে। 

.................................................................................................................................

দ্বীপটায় আমাদের জন্যে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা অপেক্ষা করে ছিল তা হচ্ছে কোনো কিছুই করার নেই এখানে। আমাদের কোনো চাকরি নেই, আমাদের বন্ধুও নেই এখানে। দ্বীপটায় কোনো সিনেমা হল নেই, টেনিস কোর্ট নেই, কোনো বই পড়বার নেই। এত তাড়াহুড়ো করে আমরা জাপান ছেড়েছি যে সঙ্গে করে বই আনবার কথা মনেও ছিল না। এয়ারপোর্ট থেকে দু’খানা উপন্যাস কিনেছিলাম সেগুলি, আর ইজুমির কাছে ছিল এককপি ইসকাইলাসের ট্র্যাজেডি। এর সবক’টা আমার দু’বার করে পড়া শেষ। সৈকতের ম্যাগাজিনের দোকানে কয়েকটা ইংরেজি পেপারব্যাক আছে, কিন্তু চোখে পড়ার মতো কিছু নেই। পড়াটা আমার নেশার মতো ছিল, সবসময় ভাবতাম কখনো খুব খানিকটা ফুরসত পেলে আচ্ছামতো বইয়ে ডুব দেব, আর নিয়তির খেল এমনই- এখন সারাদুনিয়ার সবটুকু সময় আমার হাতে অথচ পড়বার কিছু নেই। 

ইজুমি গ্রীক শিখতে শুরু করেছিল, জাপান থেকে সঙ্গে করে একটা গ্রীক ভাষা শিক্ষার বই এনেছিল সে, ক্রিয়াপদগুলির একটা চার্ট সাথে করে নিয়ে ঘুরতো আর সেগুলো সে বানান করার মতো চেঁচিয়ে পড়তো। একপর্যায়ে দেখা গেল সে দোকানীদের সাথে আর ক্যাফের ওয়েটারদের সাথে ভাঙা ভাঙা গ্রীকভাষায় কাজ চালিয়ে নিতে পারছে। এভাবে সামান্য কিছু লোকের সাথে আমাদের খানিকটা পরিচয় হলো। আমিও দে হাওয়া চাগিয়ে কাপড় ফ্রেঞ্চটা আবার সড়গড় করে নিলাম, বলা যায় না কাজেও তো আসতে পারে, কিন্তু এই মরার দ্বীপে আমার একটা আদমের সাথে দেখা হলো না যে ফ্রেঞ্চ বলে। টাউনে অবশ্য আমরা ইংরেজিতেই চালিয়ে নিতে পারতাম। কোনো কোনো বয়স্ক লোক ইটালিয়ান বা জার্মান বলতে পারতো। তবে, ফ্রেঞ্চ সেখানেও অচল। 

তেমন কিছু করার ছিল না বলে, সর্বত্রই আমরা হেঁটে বেড়াতাম। সৈকতের দিকটায় ক’দিন মাছ ধরার চেষ্টা করে একেবারে বিফল হলাম। মাছের অভাব ছিল না সেখানে, তবে জল অতিরিক্ত স্বচ্ছ বলে মাছগুলো বড়শির ডগা থেকে শুরু করে কে বড়শি ফেলে তাদের ধরবার চেষ্টা করছে তাদের চেহারা অব্দি দেখে ফেলতো। একেবারে মহামূর্খ মাছ না হলে এভাবে কেউ ধরা পড়ে না। স্থানীয় দোকানগুলোর একটা থেকে একখানা স্কেচবুক আর কিছু জলরং কিনলাম একদিন, তারপর দ্বীপের নানান জায়গার দৃশ্য আর মানুষের মুখ স্কেচ করে বেড়ালাম। ইজুমি আমার পাশেই বসে বসে দেখতো আর নিজের গ্রীক মুখস্ত করতো। স্থানীয় মানুষরাও আমার আঁকা দেখতে ভিড় জমাতো, সময়ক্ষেপণের আশায় এদের কারো কারো পোর্ট্রেটও আমি করতে শুরু করলাম, এরা তাতে ভারী আমোদ পেল। কাউকে তার ছবি এঁকে দিলে সে হয়তো আমাদের বিয়র কিনে দিত। একবার এক জেলে তার পোর্ট্রেট পেয়ে আমাদের আস্ত একটা অক্টোপাস উপহার দিয়েছিল। 

ইজুমি একদিন বল্লো, “পোর্ট্রেট এঁকেই রোজগার করতে পারতে কিন্তু! বেশ ভাল আঁকো তুমি, ভালই ব্যবসা করে ফেলতে। এই ধরো ভেক ধরলে যে তুমি একজন জাপানী শিল্পী। এখানে তেমন কাউকে তো এরা দ্যাখেনি। ভালই হতো!” 

আমি হেসে ফেললাম, যদিও ইজুমির মুখ বলছে ও পরিহাসচ্ছলে বলেনি। মনে মনে দেখলাম গ্রীক এক দ্বীপের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে পোর্ট্রেট করছি আর মাঝে মধ্যে বিয়র উপহার পাচ্ছি। খারাপ না! 

-“আর আমি ধরো জাপানী ট্যুরিস্টদের ট্যুর কনডাক্টর হয়ে গেলাম। সময়ের সাথে সাথে এখানে জাপানী ট্যুরিস্ট বাড়বে নিশ্চয়ই, আর আমাদেরও অর্থসাশ্রয় হবে। অবশ্য এর মানে হচ্ছে আমায় আরো অনেক ভাল করে গ্রীক শিখতে হবে।” 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ইজুমি তুমি কি সত্যি মনে করো আমরা এই দ্বীপে এভাবে কিছুই না করে আড়াই বছর কাটিয়ে দিতে পারব?” 

ইজুমি বল্লো, “যতক্ষণ না আমাদের টাকা কেউ ডাকাতি করে নিয়ে যাচ্ছে, বা শক্ত কোনো অসুখবিসুখ করছে, ভবিষ্যতে কখন কি হয় তা তো বলা যায় না... ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে পারবো তো। তারপরেও আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, ঐ যে, কখন কী হয়!” 

তখন পর্যন্ত আমি কখনো ডাক্তারের কাছে যাইনি সে কথা আমি ইজুমিকে মনে করিয়ে দিলাম। মুখ একদিকে বাঁকিয়ে আর ঠোঁট চেপে ধরে ইজুমি আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইলো, বল্লো, “এই ধরো আমার পেটে বাচ্চা এলো, তখন কী করবে? আমি জানি তুমি সবসময় যথেষ্ট প্রটেকশন নাও, তারপরেও তো ভুলচুক হতেই পারে, আর যদি সেটা হয় তাহলে আমাদের পয়সাকড়ি কিন্তু দ্রুত ফুরিয়ে আসবে।” 

-“তাই যদি হয়, আমরা তখুনি জাপান ফিরে যাব বলেই আমার ধারণা।” বল্লাম আমি। 

ইজুমি মৃদু গলায় বল্লো, “তুমি আসলে বুঝতে পারছো না তাই না? জাপান আমরা আর কখনোই ফিরে যাচ্ছি না?” 

.................................................................................................................................

ইজুমি তার গ্রীক ভাষাশিক্ষা চালিয়ে গেল। আমি আমার আঁকাআঁকি। আমার সারা জীবনের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সময় সেটা। আমরা সাধারণ খাওয়াদাওয়াই করতাম, ওয়াইনও খেতাম রয়েসয়ে এবং সবচেয়ে সস্তাটা। প্রতিদিন কাছের একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠতাম গিয়ে। সেখানে একটা ছোট্ট গ্রাম ছিল, সেখান থেকে দূরের দ্বীপপুঞ্জগুলিকে দেখা যেত। তাজা বাতাসে আর এমন কায়িক শ্রমে স্বাস্থ্য খুব ভাল হয়েছিল আমার। সূর্যাস্তের পর সারা দ্বীপে কোনো শব্দ পাওয়া যেত না। সেই নৈঃশব্দ্যে আমি আর ইজুমি শরীর মেলাতাম আর কত রকম কথাই যে বলতাম। আর আমাদের শেষ ট্রেন ধরবার তাড়া ছিল না, ছিল না নিজ নিজ জীবনসঙ্গীকে মিথ্যে বলবার দায়। অবিশ্বাস্য রকমের আনন্দদায়ক একটা সময়। বাইরে শরতকালের রঙ পর্দা চড়াচ্ছিল ধীরে ধীরে, নতুন শীত পড়ে গেছে। বাতাসে শীতের ছোঁয়া লাগছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ে জমছিল শাদা ফেনা। 

এইরকম একটা সময়ে আসলে আমরা সমুদ্রের ধারে বসে সেই মানুষখেকো বেড়ালদের গল্পটা কাগজে পড়লাম। সেই একই খবরের কাগজে জাপানের সম্রাটের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হবার খবরও ছিল, তবে কাগজটা আমরা কিনেছিলাম এক্সচেঞ্জ রেট দেখবার জন্য। ইয়েন ড্রাকমার বিপরীতে কতটা বাড়ছিল, আমাদের জন্যে সেটা গুরুত্বপূর্ণ, ইয়েন শক্ত হবার মানে আমাদের জমানো অর্থের অংকটা বেশি। বেড়ালগুলির খবর পড়বার পরের একদিন আমি ইজুমিকে বললাম, “বেড়ালের কথায় মনে পড়ে গেল, আমার ছোট্টবেলায় একটা বেড়াল ছিল, বেড়ালটা ভীষণ অদ্ভূতভাবে হারিয়ে গেছিল।” 

ইজুমি তার ক্রিয়াপদর চার্ট থেকে উৎসুক মুখ তুলে তাকালো, “কীভাবে হারালো?” 

-“আমার বয়েস তখন সাত, বা বড়জোর আট। আমরা কোম্পানির দেয়া একটা বাড়িতে থাকতাম, বাড়িটার লাগোয়া একটা বিরাট বাগান ছিল, বাগানে একটা বহু পুরনো পাইনগাছ। গাছটা এত উঁচু যে তুমি তার চূড়া দেখতে পাবে না। একদিন পেছনের পর্চে বসে আমি বই পড়ছি, আমাদের টরটয়েজ শেল বেড়ালটা বাগানে খেলছে। বেড়ালটা আপনা থেকেই লাফ দিয়ে দিয়ে উঠছিল, সব বেড়ালই যেমন করে মাঝে মাঝে। কী কারণে যেন সে খুব বিপর্যস্ত, টেরই পায়নি যে আমি তাকে দেখছি। যত দেখছিলাম তত ভয় পাচ্ছিলাম আমি, বেড়ালটাকে মনে হচ্ছিল যেন ভূতে ধরেছে, লাফিয়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে, লোমগুলো খাড়া, যেন সে এমনকিছু দেখতে পাচ্ছে যেটা আমি পাচ্ছি না। শেষে সে পাইনগাছটার গুঁড়িটার চারদিকে প্রচন্ডবেগে দৌড়োতে শুরু করলো, ঐ ‘লিটল ব্ল্যাক সাম্বো’তে বাঘটা যেমন করে দৌড়োচ্ছিল। তারপর আচমকা সে থেমে গিয়ে গাছটা বেয়ে তরতর করে উঠে গেল একেবারে মগডাল অব্দি। আমি কেবল সবচেয়ে উঁচু ডালগুলির ফাঁকে তার ছোট্ট মুখটা দেখতে পেলাম, তখনো সেই মুখ উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত। ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে একদৃষ্টে একদিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি তার নাম ধরে কত ডাকলাম, মনে হলো সে কিছু শুনতেই পেল না।” 

-“বেড়ালটার নাম কী ছিল?” ইজুমি জিজ্ঞেস করলো। 

-“ভুলে গেছি। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা হলো, অন্ধকার হয়ে এলো। আমি দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছি কখন সে গাছ থেকে নামবে। একসময় সব ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। বেড়ালটাকে আমি আর দেখিনি এরপর।” 

- “খুব অস্বাভাবিক নয়। বেড়ালরা অনেকসময় এভাবে উধাও হয়ে যায়, বিশেষ করে যে ঋতুতে তাদের শরীর গরম হয় তখন তারা খুব উত্তেজিত থাকে, বেরিয়ে পড়ে আর তারপর বাড়ির রাস্তা ভুলে যায়। রাতের বেলা তুমি যখন দেখছিলে না তখন তোমার বেড়াল নির্ঘাত পাইনগাছটা থেকে নেমে এসেছিল আর তেমনি করে বেরিয়ে পড়েছিল।” 

-“হয়তো তাই হবে। আমি তো তখন ছোট, ভেবেছিলাম বেড়ালটা হয়তো গাছেই বাসা করে ফেল্লো এখন থেকে। হয়তো এমন কোনো কারণ আছে যেজন্য সে নামতে পারছে না। প্রতিদিন আমি পর্চে বসে অপেক্ষা করতাম, পাইনগাছের মগডালের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, ডালগুলির আড়াল থেকে বেড়ালটার মুখ উঁকি দিচ্ছে কি না দেখতাম।” 

ইজুমিকে দেখে মনে হলো ওর ঔৎসুক্যটুকু আর অবশিষ্ট নেই। সে তার দিনের দ্বিতীয় সালেম ধরালো, তারপর মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো। 

-“তুমি কি তোমার বাচ্চার কথা ভাবো প্রায়ই?” সে জিজ্ঞেস করলো। 

আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না কীভাবে এর উত্তর দেয়া সম্ভব, সত্যিটাই বললাম, “মাঝে মাঝে করি। সবসময় না। প্রায়ই কিছু না কিছু আমাকে ওর কথা মনে করিয়ে দেয়।” 

-“তুমি ওকে দেখতে চাও না?” 

-“হ্যাঁ মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে।” মিথ্যে বললাম এবার, যেমন করে আমার বোধ করা উচিত, সেভাবেই যেন হয় উত্তরটা। 

যখন ছেলেটার সাথে একসাথে ছিলাম, তখন ভাবতাম জগতে আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর বস্তু হচ্ছে আমার এই ছেলেটা। বাড়িতে দেরীতে ফিরলেও প্রথম আমি ওর ঘরে ঢুকতাম, ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখতাম। প্রায়ই একেবারে হাড় গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো করে ওকে আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হতো। আমার এখনকার জীবনে ওর মুখ, ওর গলার আওয়াজ, ওর কাজকর্ম সবই অনেক দূরের কোনো দেশের বিষয় বলে মনে হয়। সবচেয়ে স্পষ্ট করে আমার মনে আছে ওর সাবানের গন্ধ। আমি ওর সাথে গোসল করতে ভালবাসতাম, খুব ঘষেমেজে ওকে গোসল করিয়ে দিতাম আমি। ওর চামড়া একটু স্পর্শকাতর ছিল, ওর জন্যে আমার স্ত্রী আলাদা সাবান রাখতো। নিজের ছেলেটার আর সব স্মৃতি ছাপিয়ে আমার সবচেয়ে তীব্রভাবে মনে আছে সেই সাবানের গন্ধটা। 

-“তুমি যদি জাপান ফিরে যেতে চাও, আমার জন্যে যেন আটকে থেক না। আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি ম্যানেজ করে নেব কোনোভাবে।” 

মাথা নেড়ে সায় দিলাম, তবে মনে মনে জানতাম তেমনটা কখনোই হবে না। 

-“আচ্ছা তোমার কি মনে হয় তোমার ছেলে বড় হলে তোমাকে নিয়ে তার স্মৃতি হবে সেই বেড়ালটার মতো? যেন তুমি সেই বেড়ালটা যেটা একদিন ভূতগ্রস্তের মতো পাইনগাছের মগডালে গিয়ে উবে গেল।” 

হেসে ফেললাম আমি, বললাম, “হয়তো তাই।” 

ইজুমি ছাইদানিতে সিগ্রেটটা চেপে নেভালো আর দীর্ঘশ্বাস ফেল্লো, বল্লো, “চলো বাড়ি ফিরে যাই, আর তারপর খুব সেক্স করি?” 

-“এখন? এখনো তো সকাল।” 

-“কেন তাতে কি হয়েছে?” 

-“নাহ, কিছু হয়নি।” বললাম আমি। 

.................................................................................................................................
মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল, ইজুমি নেই। বিছানার পাশের ঘড়িটায় সময় দেখলাম। সাড়ে বারটা। বাতিটা জ্বালবার জন্যে হাতড়ালাম, জ্বালালাম, ঘরের চারদিকে খুঁজলাম। চারদিক এত নিঃসাড় যেন কেউ এসে নৈঃশব্দের ভস্ম ছিটিয়ে দিয়ে গেছে। ছাইদানিতে দুখানা সালেম নিভানো। পাশে সালেমের শূণ্য প্যাকেট মোচড়ানো। বিছানা থেকে নেমে বসার ঘরে গেলাম। ইজুমি সেখানে নেই। দরজা খুলে উঠানে এলাম, এক জোড়া ভিনাইল লাউঞ্জচেয়ার জোছনায় চকচক করছে। ইজুমির নাম ধরে খাটো গলায় ডাকলাম। কেউ সাড়া দিল না। আবার ডাকলাম। এবার আমার বুক ধকধক করছে, এটা কি আমার নিজের গলা? কেমন ভারী আর অস্বাভাবিক শোনালো না? কোনো সাড়া নেই এবারও। সমুদ্রের দিক থেকে আসা মিহি বাতাসে কাশগাছগুলির ডগা দুলছে। আমি দরজা বন্ধ করে দিয়ে রান্নাঘরে এলাম, স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্যে আধগ্লাস ওয়াইন ঢাললাম। 

রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাঁধভাঙা জোছনা এসে পড়েছে, বিচিত্র সব ছায়াসম্পাত করেছে দেয়ালে আর মেঝেয়। যেন কোনো এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের জন্যে সাংকেতিক মঞ্চসজ্জা করেছে কেউ। আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, যে রাতে আমার বেড়ালটা পাইনগাছে উঠে গেছিল, সেই রাতটা ছিল অবিকল এমনি, নির্মেঘ আকাশে পূর্ন চাঁদ... রাতের খাবারের পরে আমি বেড়াল খুঁজতে আবার পর্চে গেছিলাম সে’রাতে। যত রাত বাড়ছিল তত জোছনা গাঢ়তর হচ্ছিল, চোখ সরাচ্ছিলাম না পাইনগাছটা থেকে, প্রায়ই মনে হচ্ছিল বুঝি বেড়ালটার চকচকে চোখের সাথে চোখাচোখি হচ্ছিল আমার, অবশ্য এ বিভ্রম বই কিছু নয়। 

একটা মোটা সোয়েটার পরলাম, জিন্স পরলাম। টেবিল থেকে কয়েনগুলো নিয়ে পকেটে পুরে বের হলাম। ইজুমির হয়তো ঘুম আসছিল না, বাইরে বের হয়েছে হাঁটতে। এ ছাড়া আর কী হবে। বাতাস নেই আর। আমার নিজের টেনিস শু নুড়িপাথর মাড়িয়ে যাওয়ার শব্দই কেবল কানে আসছিল আমার, অতিনাটকীয় কোনো ফিল্মি আবহসংগীতের মতো। ভাবলাম ইজুমি হয়তো সৈকতের দিকে গেছে, আর কোথায় যাবে। একটাই পথ সৈকতের দিকে, অতএব এ পথেই তার খোঁজ মিলবে। পথের দু’ধারের বাড়িগুলির আলো নেভানো, চাঁদের আলোয় পায়ের তলার জমিন এমন রূপালি হয়ে আছে যে মনে হচ্ছে এ সমুদ্রের তলদেশের দৃশ্য। 

সৈকতের দিকের রাস্তাটায় যেতে যেতে মাঝপথে আমি একটা আবছা গানের আওয়াজ পেয়ে থমকে গেলাম। প্রথম মনে হলো হ্যালুসিনেশন, বায়ূচাপ কমলে কানে যেমন শব্দ হয় তেমন। কিন্তু কান পাতবার পর আমি সুরটা টের পেলাম। দমবন্ধ করে উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম, মনটাকে দেহগহ্বরের দারুণ অন্ধকারে একেবারে ডুবিয়ে দিয়ে চিনতে চেষ্টা করলাম, এ কীসের সুর। কেউ কোনো একটা যন্ত্র বাজাচ্ছে, বাজনাটা নিচু আওয়াজে বাজছে। কী যন্ত্র এটা? ম্যান্ডোলিন? ‘জোর্বা দ্য গ্রীক’এ অ্যান্থনি কুইন যেমন বাজিয়েছিল? বাজুকি? কিন্তু এত রাতে বাজুকি বাজাবে কে? কোথায়ই বা? 

.................................................................................................................................

সুরটা আসছে পাহাড়ের ওপরের সেই গ্রামটা থেকে, ব্যায়াম করার জন্যে যে গ্রামটায় আমরা প্রতিদিন পাহাড় ডিঙিয়ে যাই। মোড়ের কাছে এসে ভাবছিলাম কোন দিকে যাব, কী করবো। ইজুমি হয়তো এই সুরটাই শুনেছে। সুর শুনলে সে সেইদিকে যাবেই। 

মোড়ের ডানদিকে রওনা হলাম, চড়াইয়ের দিকে চললাম, যে চড়াইটুকু আমি তন্নতন্ন করে চিনি। এ পথে কোনো গাছ নেই। পাহাড়ের ছায়ায় হাঁটু অব্দি কাঁটাঝোপ। যতই আগাই, সুরটা তত স্পষ্ট হয়। সুরটা যেন একটু চেনা চেনা লাগে, উৎসবের সুর যেন, পাহাড়ী গ্রামটার কোনো ভোজসভায় শুনেছিলাম এমনি সুর। মাত্র সেদিন সৈকতে বসে আমরা একটা বিয়ের শোভাযাত্রা দেখেছিলাম। নিশ্চয়ই বিয়ে উপলক্ষ্যে ভোজ চলছে এত রাত অব্দি। 

ঠিক তক্ষুনি অদৃশ্য হয়ে গেলাম আমি। হয়তো এই জোছনায় কিংবা এই মাঝরাত্রির বাজনায় ভূতগ্রস্ত হয়ে প্রতি পদক্ষেপে যেন চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছি। আমার পরিচয় হারিয়ে যাচ্ছে। সেই প্লেনে করে মিশরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময়কার অনুভূতি। এই জোছনায় হেঁটে যাওয়া লোকটা যেন আমি নই, আমার আদলে গড়া একটা প্লাস্টারের মূর্তি। আমার হাতটা মুখে বোলালাম, মুখটা আমার বলে মনে হলো না। হাতটাও আমার মনে হলো না। আমার বুকের রক্ত তীব্রবেগে আছড়ে পড়ছে সারা শরীরে। এ শরীর প্লাস্টারের পাপেট যেন, বা একটা ভুডু করার পুতুল যাতে কোনো যাদুকর সামান্য সময়ের জন্য জীবন ফুঁকে দিয়েছে, স্বাভাবিক সত্যিকার জীবনের উজ্জ্বল আভা সেখানে অনুপস্থিত। এই আমার আপাত-শরীর, এই আমার নকল পেশী কেবল মুদ্রাগুলি পালন করে যাচ্ছে। কোনো এক বলির কাজে উৎসর্গীকৃত পুতুল বই আমি কিছু নই। 

তাহলে আমার আসল আমি কোথায়? 

হঠাৎ কোত্থেকে ইজুমির গলার আওয়াজ ভেসে এলো। সে বল্লো, “তোমার আসল আমিকে বেড়ালে খেয়ে ফেলেছে। এই যতক্ষণ তুমি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলে, ততক্ষণে বুভুক্ষু বেড়ালেরা তোমাকে চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে। বাকি রয়েছে শুধু হাড় ক’খানা।” 

আমি চারদিকে তাকাই, এও বিভ্রম, অবশ্যই। 

আমার চারদিকে পাথর ছড়ানো জমিন, ছোট ছোট কাঁটাঝোপ আর সেগুলোর ক্ষুদে ক্ষুদে ছায়া। ইজুমির স্বরটা এসেছে আমার মাথার ভেতর থেকে। 

নিজেকে বললাম, এইসব বাজে চিন্তা বাদ দিতে হবে। যেন বিশাল একটা ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া ঠেকাতে সমুদ্রতলের একটা পাথর আঁকড়ে দমবন্ধ করে আছি। ঢেউটা তো একসময় আমায় পেরিয়ে যাবে। এ নিশ্চয় ঘোর, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে বিকল হওয়া মনের কারসাজি। যা কিছু সত্যিকারের, যা কিছু বাস্তব, তা আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে আমায়। আমি পকেট হাতড়ে কয়েনগুলি হাতে নিই, আমার হাতের ঘামে ভিজে ওঠে সেগুলি। 

আমি প্রাণপণে অন্যকিছু ভাববার চেষ্টা করি। উনোকিতে আমার রৌদ্রঢালা অ্যাপার্টমেন্টটার কথা ভাবি। রেকর্ডের সংগ্রহটার কথা ভাবি, আমার ছোট্ট নিজস্ব জ্যাজ কালেকশন, পঞ্চাশের আর ষাটের দশকের শাদা জ্যাজ পিয়ানিস্টদের কথা ভাবি, লেনি ত্রিস্তানো, আল হেগ, ক্লদ উইলিয়ামসন, লু লেভি, রাস ফ্রিম্যান। বেশিরভাগ অ্যালবামই আর বাজারে নেই, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে আর পয়সা ঢেলে এই সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলাম আমি। রেকর্ডশপগুলিতে সারাবেলা ঘুরে ঘুরে, অন্যান্য কালেক্টরদের কাছ থেকে অন্য জিনিসের বিনিময়ে, ধীরে ধীরে আমার আর্কাইভ গড়ে তুলেছিলাম আমি। বাজনাগুলো একেবারে সেরা পারফরমেন্স বলা যাবে না, কিন্তু পুরনো রেকর্ডের বাজনায় ঐ অনন্য অন্তরঙ্গতার আবহ আমার খুব ভাললাগতো। জগতটা যদি শুধুই সেরা পারফরমেন্স দিয়ে তৈরি হতো তাহলে তা বড্ড একঘেঁয়ে জায়গা হতো, তাই না? সেই রেকর্ডের জ্যাকেটগুলোর প্রতিটা খুঁটিনাটি মনে পড়ছে আমার, মনে পড়ছে আমার হাতে তাদের ভার। 

কিন্তু এই সবই তো চিরতরে হারিয়ে গেছে, আমিই আপন হাতে বিলোপ করেছি তাদের। ইহজীবনে আর কখনো সেই রেকর্ডগুলি শুনব না আমি। 

আমার মনে পড়ছে ইজুমিকে চুমু খাবার সময় পাওয়া তামাকের গন্ধ, তার ঠোঁট আর জিভের স্পর্শ। আমি আমার দু’চোখ বন্ধ করলাম। আমার তাকে পাশে চাই, তার হাতখানা আমার হাতের মুঠোয় চাই, যেমন করে সে মিশরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় ধরে রেখেছিল তেমন করে, আর কখনো ছেড়ে দেব না তাকে। 

ঢেউটা মস্ত হতে হতে অবশেষে আমাকে পার হয়ে গেল, সুরটুকুও। 

ভোজসভার লোকগুলো কি বাজনা থামিয়ে দিল? নিশ্চয়ই তাই। রাত প্রায় একটা বাজে। কিংবা হয়তো এই বাজনাটা আসলে বাজেইনি কখনো, সেটাও তো সম্ভব। আমি আর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আবার চোখ মুদলাম, নিজের সচেতনতার ভেতর ডুব দিলাম, একটা ওজনদার সরু রেখা টেনে দিলাম সেই অন্ধকারের ভেতর। কিন্তু তবু কিছুই শুনতে পেলাম না। একটা প্রতিধ্বনি অব্দি নয়। 

হাতঘড়ি দেখতে গেলাম, এতক্ষণে টের পেলাম হাতঘড়ি পরিনি। শ্বাস ফেলে পকেটে হাত পুরলাম। সময়ে কী দরকার। আকাশে তাকালাম, ঠান্ডা হিম একখন্ড পাথরের মতো জেগে আছে চাঁদ- তার ত্বক সময়ের অত্যাচারে ক্ষয়ীভূত। ক্যান্সারের মতো জেগে আছে চাঁদের পৃষ্ঠের তাবত ক্ষত। চাঁদের আলো কত বিচিত্র খেলা খেলায় মানুষের মনে। কত বেড়ালকে অদৃশ্য করে দেয়। ইজুমিকেও অদৃশ্য করে দেয়। হয়তো এইসবই খুব যত্ন করে করা কোরিওগ্রাফি, সেই সে’রাত থেকে প্রতিটি মুদ্রা সযত্নে ভেবে নেয়া। 

আমি দু’হাত ছড়িয়ে টানটান করলাম শরীর, আড়মোড়া ভাঙলাম, আঙুল অব্দি টানলাম। আরেকটু যাব নাকি ফিরে যাব? ইজুমি কোথায় গেছে? ওকে ছাড়া কেমন হবে আমার এই বেঁচে থাকাটা? এই জলাবদ্ধ দ্বীপে কেমন করে বেঁচে থাকব? এই অস্থায়ী- ভঙ্গুর- সাময়িক আমিটুকুকে সে-ই তো আগলে রেখেছিল। 

আরো চড়াই টপকাতে থাকি আমি। এতটুকু এসেছি যখন, এইটুকু পার হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠি তবে। খতিয়ে দেখি সত্যিই বাজনা বাজছিল কি না? আমার নিজের চোখে দেখা চাই সেটা, সামান্য নিশানাও যদি থাকে সেই বাজনাটার। পাঁচ মিনিটে চূড়ায় উঠে গেলাম আমি। দক্ষিণে পাহাড়টা ঢালু হতে হতে মিশেছে সমুদ্রে, ঐ যে সৈকত আর ঘুমঘুম এই শহর। সৈকতের রাস্তায় ইতিউতি রাস্তার আলো। পাহাড়ের উলটো দিকটা অন্ধকার। একটু আগেই যে এখানে একটা জলজ্যান্ত ভোজসভায় বাজনা বাজছিল তেমন মোটেই মনে হচ্ছে না। 

বাড়ি ফিরে এসে এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খেলাম। ঘুমোতে চেষ্টা করলাম কিন্তু ঘুম এলো না। পূব আকাশে ঊষার আভাস দেখা দেবার আগ অব্দি চাঁদের হাতে বাঁধা রইলাম আমি। হঠাৎ বেড়ালগুলোকে মনে পড়লো আমার, একটা তালাবদ্ধ অ্যাপার্টমেন্টে আটকা পড়ে ক্ষুধায় মৃতপ্রায়। আমি – আসল আমি তো কবেই মরে গেছি, কিন্তু ওরা জীবন্ত, খুবলে খাচ্ছে আমার মাংস, আমার কলজেয় কামড় দিচ্ছে, আমার রক্ত চুষছে, গিলে খাচ্ছে আমার পুরুষাঙ্গ। বহু দূর থেকে যেন আমি শুনতে পেলাম আমার মগজ হুশহাশ করে চেটেপুটে খাওয়ার শব্দ। ম্যাকবেথের ডাইনিদের মতো তিনখানা চঞ্চল বেড়াল আমার ভাঙা করোটি ঘিরে ধরে আছে, ভেতরের ঘন ক্বাথ চুমুক মেরে খাচ্ছে। তাদের খসখসে জিভের ডগার ছোঁয়াচ লাগছে আমার চৈতন্যের প্রতিটি নরম ভাঁজে, প্রতিবার চেটে নেবার সময় ঘষা খেয়ে ফুলকি জ্বলছে আর নিভছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন