মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

মেক্সিকোর গল্প : এ ভগবানের দ্বারাই হবে হয়ত, এমন আরো হতে পারে

¡ Sea por Dios y Venga más! 
মূল গল্প - লাউরা এসকিভেল 
অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

আমার সব দুর্ভাগ্যের জন্য চোলে বেটি ই দায়ী। আপোলোনিও নিষ্পাপ। লোকে যাই বলুক । হল কি বিষয়টা কেউই বুঝছে না। হ্যাঁ ক্বচিৎ কখনো ও আমায় মারত, কিন্তু সেটা পরিস্থিতির ফলে মরীয়া হয়েই করত, ও বাজে লোক বলে নয়।
আমাকে ও বরাবর ভালবাসতো। ওর মত করেই সই, তবু বাসত। আমায় কেউ বোঝাতে পারবে না যে ও আমায় ভালবাসত না। এতটাই সে ভালবাসা যে তার জন্য ওর প্রেমিকাকেও সে মেনে নিতে পারত, কেননা আমি তাইই চেয়েছিলাম।

ওর কোন প্রয়োজনই ছিল না আমাকে সেকথা বলার। আমার কাছে ও সহজেই লুকিয়ে রাখতে পারত, তবে কি না ও বলে যে তাহলে আমি সেকথা জানতে পেরে যেতাম আর ওকে ত্যাগ করে চলে যেতাম। আমার ছেড়ে যাওয়ার ভাবনাটা পর্যন্ত ও সহ্য করতে পারত না কারণ আমি একমাত্র মানুষ যে ওকে বুঝত। আমার প্রতিবেশীরা প্রার্থনা করতে পারে, তবে কি না তাদের কজনের স্বামীরা তাদের কাছে নিজের প্রেমিকার কথা বলে যাদের তারা প্রশ্রয় দেয়। একজনও না! একমাত্র সৎ মানুষটা হল আমার আপোলোনিও। একমাত্র মানুষ যে আমার খেয়াল রাখে। একমাত্র মানুষ যে আমার জন্য উদ্বেগ করে। এইডস এর মত অসুখটা নিয়ে থাকার চেয়ে স্বামীদের কুজকো পাহাড় দিয়ে হাঁটা ঢের বেশী বিপজ্জনক। (কুজকো পাহাড় হল ইনকা সভ্যতার সময় আন্দিজ পাহাড়ের পূর্ব শ্রেণীর গায়ে একটা শহর) অনেকের সঙ্গে সেখান দিয়ে হাঁটার চেয়ে সে ঠিক করেছিল আত্মত্যাগ করবে আর একমাত্র একজনকেই রাখবে। ব্যস এভাবে আমার আর বিপদ রইল না এইডস রোগ সংক্রামিত হবার। এর নাম প্রেম, এ কোন নোংরা আবোলতাবোল ব্যাপার নয়। তবে ওরা কীই বা জানবে এসবের!

বেশ, তবে আমাকে স্বীকার করতে হবে যে প্রথম প্রথম আমারও কষ্ট হয়েছিল ব্যাপারটা বুঝতে। যার জন্য প্রথমে শুনেই আমি নাকচ করে দিয়েছিলাম। আদেলা, আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর মেয়ে আমার চেয়ে ঢের ছোট ছিল। আমার খুব ভয় হয়েছিল যে আপোলোনিও ওকে আমার চেয়ে বেশি পছন্দ করে ফেলবে। কিন্তু আমার আপোই আমায় বোঝাল যে এরকম কখনও হবে না। সত্যি বলতে কি আদেলা ওর কাছে কোন বিষয় নয়। ব্যাপারটা হয়েছিল কি ওর কর্মক্ষম পৌরুষের শেষ বছরগুলোর যতটা সম্ভব সদব্যাবহার করে নিতে হত , কারণ পরে আর কোন সুযোগ থাকবে না ওর। আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে সুযোগের সদব্যাবহার আমার সঙ্গে করবে না কেন। ও আমায় বোঝাল। আমি যতটা বুঝতে পেরেছি তা হল এই যে এসব পুরুষদের সমস্যা যা আমাদের মহিলাদের দ্বারা বোঝার ধারকাছে যাওয়াও সম্ভব নয়। আমার সঙ্গে ঘুমাতে যাওয়া কোন রসিকতা নয়। আমি ওর বৌ। আমি যখন চাইতাম তখন ওকে আমার পাশে পেতাম। 

ওর যেটা দরকার ছিল সেটা হলো অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে ও সহবাসে সক্ষম কি না সে বিষয়ে স্থির নিশ্চিত হওয়া। যদি সেটা না পারত ওর কাছে সেটা ধাক্কা হত একটা। বিষয়টা জটিল হয়ে যেত আর তখন ও সেটা আমার সঙ্গেও পুরোপুরি পেরে উঠতে পারত না। আর সেটাই আমার খুব ভয় লাগত।

আমি ওকে বললাম ঠিক আছে। আমি ওর প্রেমিকাকে মেনে নেব। তখন ও আদেলা কে আমার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এল যাতে আমি তার সঙ্গে কথা বলি। কেননা আদেলা সোনা আমাকে ছোট্টবেলা থেকে চেনে। ওর খুব দুঃখ হবে, ও আমার নিজের মুখ থেকে শুনতে চাইবে যে ওকে আপোলোনিওর প্রেমিকা হিসাবে মেনে নিতে আমি অনুমতি দেব। আমায় আপোলোনিও বলল যে ও আদেলার সঙ্গে বসবাস করবে না। একমাত্র সে আমাদের বিয়েতে সাহায্য করবে। আর এটাই কাম্য যে আপোলোনিও ওকে নিয়েই বেড়াতে যাবে , অন্য কারোকে নিয়ে নয় কারণ আমাকে ওর পরিত্যাগ করার সত্যি তো কোন আগ্রহ নেই। ওর ভাবনাচিন্তার জন্য ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞ মনে হতে লাগল। মনে হতে লাগল সত্যি কথাটা বলার জন্য আমি ওকে আশীর্বাদই করে ফেলি। আর আমি আদেলার কাছেও কৃতজ্ঞ রইলাম কেননা সে আমার জন্যে আরও বেশি স্বার্থ ত্যাগ করছে।

আদেলার যা কচি বয়স, তাতে সে ভালোই বিয়ে করে ছেলেপুলের মা হয়ে থাকতে পারত। তার বদলে সে কি না আপোলোনিওর বাড়ির প্রেমিকা হয়ে থাকা বেছে নিল। 

যাই হোক ঘটনাটা হল যে দিনটায় ও এল আমরা বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। সব কিছু পরিষ্কার করেই বললাম। রোজকার রুটিন, কত ঘন্টা , কোন কোন দিন, ইত্যাদি। মনে হচ্ছিল এইসব বলে আমি বেশ শান্ত অনুভব করছিলাম। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে ছিল। আপোলোনিও কে বেশ তৃপ্ত, সুখী, বেশ খানিকটা প্রশমিত মনে হচ্ছিল, তবে কেন জানি না আমি দিন দিন দুঃখী হয়ে পড়ছিলাম। 

যখন জানতাম আপোলোনিও আদেলার সঙ্গে আছে আমি ঘুমাতে পারতাম না। পুরো রাতটাই ওসব ভেবে ঘুমাতে পারতাম না যে এখন ওরা কী করছে তখন ওরা কী করছে। ইয়ে আমার কল্পনা করার কোন প্রয়োজন ছিল না যে ওরা কী করতে পারে। আমি তো জানতাম সেকথা আর ব্যাস এখানেই শেষ। আমি তো নিজেকে বিধ্বস্ত করে ফেলে রাখতে পারি না। আরো বাজে ব্যাপার যে আমার নিজেকে ঘুমন্ত রাখতে হত কেননা আমার আপোলোর সঙ্গে আমি রাগারাগি করতে চাইতাম না। 

ওর এটা প্রাপ্য নয়। এমনি করেই সেই দিনটা উপস্থিত হল যেদিন ও এসে দেখল আমি জেগে আছি। ও ভীষণ রেগে গেল। আমায় বলল আমি ব্ল্যাকমেইলার। আমি ওকে শান্তিতে আনন্দ করতে দেব না। আমায় আর ভালবাসার কোন প্রমাণ ও দিতে পারবে না। আর আমি তার মূল্য হিসাবে প্রাণপণে ওর চাওয়ার কাছে সঁপে দিলাম, তবে গোয়েন্দা গিরি করতে লাগলাম। জল ভরা চোখে ওর সঙ্গে রাগারাগি করছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার ভয়গুলো আমায় ঘিরে ধরল যে আর কখনো ও ফিরে আসবে না। আমার কী কখনো ভুল হয়েছিল ? এটা তো নিশ্চিত যে ও ফিরে আসত, ভোর পাঁচটা হোক ছটা হোক ও ফিরে আসত বাড়িতে। 

উদ্বিগ্ন হবার কোনই কারণ ছিল না আমার। বরং দারুণ সুখী হওয়া উচিৎ ছিল। ভগবানই জানেন কেন হচ্ছিলাম না! গোদের ওপর বিষফোঁড়া আমার কলেরা হল, যেটা দুর্বল আপোলোনিও আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এটা বেশ সাহসের ব্যাপার ছিল আমার পক্ষে দেখা যে আপোলোনিও আদেলাকে সেইসব জিনিষ কিনে দিত আমাকে যা কখনো দেয় নি। ওকে নাচতে নিয়ে যেত যা আমাকে নিয়ে কখনো যায় নি। ইয়ে, এমনকী আমার জন্মদিনের দিনও নয় যেদিন গায়িকা সেলিয়া ক্রুস গান গেয়েছিল আমি ওর হাতে পায়ে ধরেছিলাম আমাকে নিয়ে যাবার জন্য! বিশুদ্ধ রাগে আমার চোখদুটো হলুদ হয়ে গিয়েছিল, লিভার ফুলে উঠেছিল, আর মুখের শ্বাসের বিষ আমাকে পুড়িয়ে দিত, আমার চোখগুলো আমার নিজেরই পছন্দ হত না। আমার ত্বক নোংরা হয়ে গিয়েছিল। আর ঠিক এমন সময়েই চোলে বেটি আমায় বলল যে এইসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ওষুধ হল এক লিটার তেকিলা-র মধ্যে এক মুঠি তীব্র গন্ধওয়ালা বোলদো পাতার মিশ্রণ এক কাপে নিয়ে খালি পেটে খাওয়া। (তেকিলা “আগাভে” কাঁটাঝোপ থেকে বানানো এক ধরনের কড়া মেক্সিকান মদ।) বোলদো দেওয়া তেকিলা পিত্ত ঠিক করে দেয়। আর শরীর থেকে মন্দ জিনিষ বের করে দেয়। আমি দেরী না করে, আলসেমো বাদ দিয়ে পাড়ার দোকানে গেলাম। দোন পেদ্রোর দোকান থেকে এক বোতল তেকিলা কিনলাম। আর বোলদো পাতা মিশিয়ে রেখে দিলাম। পরদিন সকালে ওটা খেলাম। আমার বেশ চাঙ্গা লাগল।

ভেতরে ভেতরে আমার যে শুধু হালকা লাগছিল তা ই নয়, আমার বেশ খুশী খুশীও লাগছিল। বহুদিন আমার এমন লাগে নি। ক্রমশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধটার প্রভাবে আমার শরীর ভালো হতে লাগল। আমাকে হাসি হাসি শান্ত দেখে আপোলোনিও আদেলার সঙ্গে আরও বেশি বেশি করে বেরোতে লাগল। আর যতবার এগুলো হত ততবার আরো বেশি করে পেগ খেতাম আমি যাতে করে পিত্ত আমার কোন ক্ষতি করতে না পারে। পেট খালি থাকুক আর নাই থাকুক। দোন পেদ্রোর দোকানে আমার যাওয়া প্রতিবার আরোও প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছিল। প্রথমে যদি এক বোতল তেকিলা তে আমার এক মাস যেত , এমন দিন এল যখন দিনে এক বোতল তেকিলা লাগত আমার। তবে এটা ঘটনা যে আমার শরীরে তখন এক ফোঁটাও পিত্ত ছিল না আর। আমার এত ভাল লাগত যে এমনকী আমি মনে করতে শুরু করেছিলাম যে বোলদো দিয়ে তেকিলা সত্যিই একেবারে ম্যাজিক ওষুধ। আমার গলা দিয়ে যখন ওটা নামে গলাটা পরিষ্কার করতে করতে, আমায় আনন্দ দিতে দিতে, স্বাস্থ্য ভাল করতে করতে, মেজাজ চাঙ্গা করে দিতে দিতে, আমার গোটা শরীর গরম করতে করতে, আমায় অনুভব করাতে করাতে নামত যে আমি বেঁচে আছি, বেঁচে আছি, জীবন্ত!

যে দিন দোন পেদ্রো আমায় বললেন যে আমাকে উনি আর বিশ্বাস করতে পারছেন না, আর এক বোতল তেকিলা দিলেও আমি মরে যাব। তখন আমার আর তেকিলা ছাড়া একটা দিনও বাঁচার ক্ষমতা নেই। আমি ওনাকে কাকুতিমিনতি করলাম। আমাকে এমন মরীয়া দেখে ওনার আমার ওপর করুণা হল আর রাজী হলেন আমি অন্য ভাবে ওনাকে দাম মিটিয়ে দেবো সে শর্তে। শেষমেশ উনি আমায় পাপ করার ইচ্ছা এনে দিয়েছিলেন। আমি, কাঁচা সত্যিটা হল শরীরের ভেতরে এত উষ্ণতা নিয়ে আমার আরো বেশি উত্তেজিত লাগছিল। আর ওখানেই কাউন্টারের ওপরেই আপোলোনিও আমাদের দেখেছিল বাসনা পূর্ণ করতে।

আপোলোনিও আমায় ছেড়ে গিয়েছিল মাতাল আর বেশ্যা বলে। এখন ও আদেলার সঙ্গে থাকে। আমাকে ও ধ্বংসের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছে। এই সব দোষ রাঁধুনি চোলে বেটি আর ওর ওষুধের।


লেখক পরিচিতিঃ
লাউরা এস্কিভেল
ম্যাজিক রিয়ালিজমের ধারার সাহিত্যিক লাউরা এস্কিভেল জন্মেছেন ১৯৫০ সালে মেক্সিকো সিটি শহরে। ৩০ টি ভাষায় অনূদিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস “কোমো আগুয়া পারা চোকোলাতে” বা “ চকোলেট খাবার জন্য জল যেমন জরুরী”। সে দেশের অভিনেতা নির্দেশক আলফোনসো আরাউ এর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ। এছাড়াও ঃ লা লেই দে আমোর” বা “ভালোবাসার আইন”, “মালিঞ্চে” বা” “সবচেয়ে ঘৃণিত নারী” ইত্যাদি বিখ্যাত উপন্যাস তাঁর। ২০১৬ সালে সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস “এল দিয়ারিও দে তিতা” বা ”তিতার ডায়রি” । বেশ কটি পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৯৪ সালে ABBY পুরষ্কার পান আমেরিকার বেস্ট বুকসেলার বুক অফ দ্য ইয়ার, তান ভেলোস কোমো দিওস বা ঈশ্বরের মত বিদ্যুৎ গতি উপন্যাসের জন্য ইতালির গিউসেপ্পে আরেবি পুরষ্কার ২০০০ সালে, “মালিঞ্চে”-র জন্য শ্রেষ্ঠ অডিওবুক পুরষ্কার স্পেন, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে মেক্সিকোয় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন