মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

ফুটপাত

মূল: গুলজার 
অনুবাদ: ফজল হাসান 

দাগরুকে আবার সেই একই কুকুর কামড় দিয়েছে – এই নিয়ে তিন বার । কিছুতেই সে বুঝতে পারে না তার শরীর থেকে কিসের এমন বিদঘুটে গন্ধ আসে, যা শ্যান্ডিকে উন্মাদ করে তোলে । শ্যান্ডি হলো কুকুরের নাম ।

বেরহাম বললো, ‘এটা একটা দূর্গন্ধ, যা তোর শরীর থেকে আসে না । আসলে হতভাগা কুকুর গন্ধটা সহ্য করতে পারে না ।’ 

‘তাহলে প্রতি রাতে সে কেন আমার পাশে শুয়ে ঘুমায় ?’ দাগরু প্রতিবাদ করে । ‘অনেকবার আমি ওকে তাড়াতে চেয়েছি । কিন্তু রাতের কোন এক সময়ে বদমাশটা ফিরে আসে এবং আমার গোটানো শরীরের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ।’ 

কখনো দাগরু ব্যাপারটা এমন ভাবে বলে যে তা হিরাকে কাতুকুতু দেয় এবং সে হাসতে শুরু করে । জায়গাটা বসবাস করার জন্য অযোগ্য । হিরা বললো, ‘তিন বার । ঢের হয়েছে । পরের বার তুমি কামড়ে দিও ।’ 

বান্দ্রার ফুটপাতের সেই এলাকায় হিরা ছিল আলাদা । সূর্য উঠার আগেই সে ঘুম থেকে জেগে উঠতো এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই খার ও বান্দ্রা এলাকার অর্ধেকের বেশি আবর্জনা ঘুটে বিক্রি করার মতো জিনিসপাতি কুড়িয়ে আনতো । পরিত্যাক্ত টিনের পাত্র, বোতলের ছিপি, যেকোন কিছু – কুড়িয়ে নিয়ে সে তার পিঠে ঝোলানো বস্তার মধ্যে ঢুকাতো । যদি সে বিয়ারের কয়েকটি খালি বোতল পেত, তাহলে সেগুলো বিক্রি করে ভালোই উপার্জন করতে পারতো । তখন সে নিজেকে রীতিমত ভাগ্যবতী মনে করতো । আজকাল সেই ধরনের সৌভাগ্যের আগমন সত্যি বিরল । কেননা বিত্তশালীরা খালি বোতল এবং পুরনো কাগজপত্র নিজেরাই বিক্রি করে । কিন্তু এক রুপি উপার্জনের আশায় অভিনব উপায়ে হিরা প্রায় সারাদিন কুড়ানোর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতো । একসময় সে আবিস্কার করে যে ফেলে দেয়া ব্যবহৃত সিরিঞ্জও বিক্রি করা যায় । রাস্তায় যখন যানজট থাকতো, তখন সে মাতাল লোকটির খোস-পাঁচড়া আক্রান্ত মাতৃহীন নোংরা শিশুটিকে কোলে নিয়ে থেমে থাকা গাড়ির ভেতর পুরুষ ও মহিলাদের কাছে কয়েক রুপি ভিক্ষা চাইতো । শিশুটির জন্য সে অবশ্য মাতাল লোকটিকে ভাড়া হিসাবে কিছু দিত । 

বলু যখন হিরার সঙ্গে থাকতো, তখন হিরা প্রতি রাতে গাছের নিচে রান্নাঘর বানিয়ে আগুন জ্বালাত । দুটি ইট দিয়ে চুলা বানাতো । পুরনো টিনের পাত্র এবং কয়েকটি খুন্তি ছিল তার রান্নার সরঞ্জাম । এগুলো সে সগরের লোনা পানিতে পরিস্কার করতো এবং রোদে শুকানোর জন্য গাছে ঝুলিয়ে রাখতো । কখনো সে হাত গরম করতো এবং কাছাকাছি বেকারী থেকে রুটি কিনে আনতো । কিন্তু বলু যখন অন্য মেয়ের সঙ্গে থাকার জন্য তাকে পরিত্যাগ করে, তখন থেকে সে রান্না করা বন্ধ করে দেয় । আপন কে আছে যে, তার জন্য সে রান্না করবে ? একসময় ভিকু হিরার মানসিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করে এবং সেই থেকে সে হিরার পেছনে লাগে । তার ‘আপনজন’ কদাচিৎ হাঁটতে পারে – শয্যাশায়ী, যেন সে খাঁচাবন্দি । 

মনের দিক থেকে ভিকু মোটেও খারাপ ছিল না, কিন্তু সে ছিল বাঁকা ধরনের মানুষ – অনেকটা শ্যান্ডির লেজের মতো । কুকুরের মতো সে নিজের শরীরে এলোপাথারি আঁচড় কাটতো এবং চুপিচুপি একদিন পর পর হিরার কাছে যেত । সে মহিম এলাকার ফুটপাতে থাকতো । একবার প্রচন্ড বৃষ্টিতে যখন মুম্বাইয়ের সমস্ত ফুটপাত ডুবে গিয়েছিল, তখন প্রত্যেকেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছিল । সেই সময় ভিকু ছিল রীতিমতো ত্রাণকর্তা । হিরার জন্য সে তিলক পুলের নিচে এক খন্ড জায়গা খুঁজে পেয়েছিল । তার বাসস্থান থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না । সেই বৃষ্টির দিনগুলোতে সে হিরাকে দুবার উপভোগ করেছিল । সৌভাগ্যবশত হিরার গর্ভধারণের আট সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সে বান্দ্রার পুরনো জায়গায় ফিরে গিয়েছিল, যেখানে ছিল দাগরু, শ্যান্ডি এবং মাতাল লোকটি । ওরা সবাই এক এবং অভিন্ন । দাগরু সবসময় হিরাকে বলতো যে, তার একজন উত্তরাধিকার দরকার । থাকার মধ্যে তার ছিল জরাজীর্ণ ঝুপড়ি এবং ভাঙাচোরা আলনা । এই সম্পত্তি নিয়ে সে উত্তরাধিকারীর আশা করতো । 

বেহরাম অন্যদের মতো ছিল না । সে ছিল আলাদা মানুষ । সে কথা বলতো কম, কিন্তু তার অন্তরে ছিল ঘোরপ্যাঁচ । সে গাড়িওয়ালাদের ফাঁদে ফেলতে পছন্দ করতো । ইচ্ছে করে সে গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেত এবং শারীরিক জখমের ভাণ করতো । মুহূর্তেই সেখানে লোকজন জড়ো হতো । ঝুট-ঝামেলা এড়ানোর জন্য গাড়িওয়ালারা হাত জোড় করে দুঃখ প্রকাশ করে এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার অঙ্গীকার করতো । বেশির ভাগ সময় সে রাতের বেলা হোটেলের সামনে মক্কেলদের বেছে নিত, বিশেষ করে যারা মদ্যপ কিংবা যাদের সঙ্গে রমণী থাকে । ‘এ ধরণের লোকজন খুব সহজেই পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে । মানিব্যাগের সাইজ দেখে নির্ধারণ করা যায় কি পরিমাণ অর্থকড়ি খসানো যাবে,’ সে পর্যবেক্ষণ করে । যদি সে বড় ধরণের শিকার ধরতে পারে, তাহলে পরবর্তী বেশ কিছু দিন তাকে ফুটপাতে দেখা যাবে না । তখন মধুভরা মৌমাছির মতো সে সোজা সিয়নের বস্তিতে ঢুকবে এবং সেখানেই দিনরাত থাকবে । আচার-আচরণে সে রীতিমত উচ্ছ্বল । সেই বস্তির একজনের সঙ্গে তার হৃদয় বাঁধা পড়েছিল । কিন্তু সে কখনই সেই নাম প্রকাশ করেনি । শুধু একবার বলেছিল, ‘তার জন্য আমার কাছে রূপার এক জোড়া কানের দুল আছে, মায়ের দিব্যা, তাকে দারুণ লাগবে ।’ 

‘তাহলে ওকে বিয়ে করছো না কেন ?’ হিরা বলল । 

‘ওকে বিয়ে করবো?’ বেহরামের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠে । ‘প্রতি রাতে ওর কাছে নতুন অতিথির আগমন ঘটে ।’ 

সেসব দিনের একদিন হিরার কানে আসে যে, বলু ‘অন্য একজন’-এর মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে । কেউ তার হদিশ জানে না । তবে সেই ‘অন্য একজন’ অগ্নিমূর্তি ধারন করে একসময় ধারালো কাটারি নিয়ে তার কাছে হানা দেয়, এবং বলে: ‘কোথায় তোর নিষ্কর্মা সোয়ামী ? ছিনাল মাগী ! সে কী ঈশ্বরকে ভয় করে না ? তার কী কোন লজ্জাশরম নাই ... সে কেমন করে মা ও মেয়ের সঙ্গে একই কাজ করতে পারলো ...’ হিরা কিছু বলে না । একথা সত্যি যে, যখন সে কথা বলা শুরু করে, তখন তার সুন্দর ঝকঝকে দাঁত বিকশিত হয় । যাহোক, তার চোঁয়াল শক্ত হয়েছে, ঠিক শ্যান্ডির মতো । যদিও সে হৃদয়ের গোপন গভীরে একধরনের আনন্দ অনুভব করে, কিন্তু তারপরেও নিশ্চুপ থাকে । একসময় হঠাৎ সে মহিলার চুলের গোছা চেপে ধরে এবং সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় । হিরা চটজলদি মহিলার হাত থেকে কাটারি ছিনিয়ে নিয়ে তার গলার কাছে উঁচিয়ে চিৎকার করে: ‘হারামজাদী ... আবার যদি এই ফুটপাত দিয়ে এখানে আসিস, তাহলে তোরে জ্যান্ত শেষ করবো । তারপর কেটে টুকরো করে শ্যান্ডিরে খাওয়াবো ।’ ঘটনা তখনই শেষ হয় । মহিলা আর কোনদিন আসেনি । বলুর সেই মাগী ... ওর নাম কী ... হ্যাঁ, ‘অন্য একজন’ । 

ঘটনার দিনই ভিকু আসে । হিরা বিন্দুমাত্র দূর্ব্যবহার করেনি । তার মন খারাপ ছিল । কেননা বলু তার কাছে ফিরে আসেনি । এখন বলুর কাছে দুইজন মেয়েমানুষ । হিরার জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে ভিকু বললো, ‘ঘটনার নতুনত্ব কী ... বদমাশটা সবসময় একই কাজ করে । মনে আছে, এই ফুটপাতে থাকার জন্য যেদিন কেরালা থেকে মেয়েটি এসেছিল, সেদিন থেকে বলু দিনমজুরের সঙ্গে থাকা শুরু করেছিল ।’ হিরা কোন কথাই বললো না । নিশ্চুপ থেকে সে সব কথা শুনছিল এবং ভিকু অনর্গল বলে যাচ্ছিল, ‘যখন সে নতুন কোন মেয়েমানুষের গন্ধ পায়, তখন সে তার লেজ নাড়াতে থাকে । তুই কী ভাবছিস, মেয়েটিকে নিয়ে হতচ্ছারা মন্দিরে যাবে ? 

‘কোন মন্দির ?’ 

‘যে-টা কল্যানে । সাঈ-এর মন্দির ।‘ 

সেই সময় কিছু একটা হিরার মনে পড়ে । সে একদিন ভিকুকে সঙ্গে করে মন্দিরের পথে যাত্রা করে । সে মন্দিরের দুই শ’ পঞ্চাশটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে এবং গিয়ে দেখে যে, সেখানে বলুর কোন চিহ্ন নেই । সে তন্নতন্ন করে খোঁজে, এমনকি নিচের সব জায়গাও বাদ দেয়নি । মন্দিরে সে পুরো নয় দিন ছিল । কিন্তু সেখানে সে ঈশ্বর বা বলুকে খুঁজে পায়নি । বরং ভিকু তৃতীয় বারের মতো তাকে মেরেছে এবং প্রথমবার তার দেহের স্বাদ উপভোগ করেছে । অগ্নিপাড়া থেকে ধাত্রী এসে তার জরায়ু পরিস্কার করে । দেড় মাসের বেশি সময় হিরা ভিক্ষা বা অন্য কোন কাজ করতে পারেনি । তখন সে ভিকুর সামনে থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল – যদিও সে মনে ক্ষ্ট পেয়েছিল এবং সুখস্বপ্নে সামান্য ব্যাঘাত ঘটেছিল, এমনকি ভিকুর প্রতি খানিকটা অভিমানও জমেছিল । 

ভিকু যতবার ঘেষাঘেষি করে হিরাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে, ততবারই হিরা পাখি তাড়ানোর মতো দূর দূর করে তাকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু হাঁটুতে লাথি মেরে তাড়ায়নি । এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র ভিকু নয় । একদিন পর পর সে রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি হিরার উপর চড়াও হয় এবং সারা রাত হিরার দেহের স্বাদ নেয় । ভিকুর শরীর থেকে দূর্গন্ধ বেরোয় এবং সেই বিশ্রী গন্ধ হিরার নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়ে – যেভাবে দাগরুর শরীরের গন্ধ শ্যান্ডির নাকে প্রবেশ করে । 

তারপর একদিন বলা নেই, কওয়া নেই ভিকুর ‘নিজের মহিলা’ মারা যায় । মহিলার মৃত্যুর কয়েকদিন পর ভিকু হিরাকে বলেছে, তার নাম ছিল সীতা । সীতা দেখতে যেমনই ছিল না কেন, ভিকু তার পাশেই ছিল এবং যা করার তাই করেছে । নিয়ম অনুযায়ী মৃতদেহের সৎকার করেছে । সেই থেকে হিরার মন গলতে শুরু করে । কয়েকদিনের জন্য সে মহিম এলাকায় ভিকুর বস্তিতে চলে যায় । সে একবার ভেবেছিল, ভিকুর সঙ্গেই থিতু হবে । বর্তমান যা হোক না কেন, তার কাছে মনে হয়েছে, সে-টা হবে সম্মানজনক । কিন্তু ভিকু সেই স্বভাবের মানুষ নয় – সীতার মৃত্যুতে সে রীতিমত মুষরে পড়েছে এবং তার মন ভেঙে গেছে । আগে সে হিরার পেছনে ঘুরঘুর করতো, সারা রাত জড়িয়ে ধরে থাকতো । অথচ এখন সে রাতের পর রাত লাপাত্তা থাকে । সে হয়তো নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায় । হিরা জানতে পারে যে, ভিকু একদল বদলোকের পাল্লায় পড়েছে – যারা যাদুটোনা করে । হিরার কোন ধারনা নেই, ভিকু কিসের খোঁজে গেছে । সে শুধু জানে, ভিকু মাঝেমাঝে সীতার কথা মনে করে । 

হিরা বারো মাস পরে বান্দ্রার পুরনো বস্তিতে ফিরে যায় । ফিরে আসার কোন কারণ সে বলেনি । দাগরুর পায়ে পচন ধরেছে । তার পায়ের পুরোটা জুড়ে ঘায়ের বিশাল ক্ষত । 

বেহরাম বললো, ‘আবে যা ... পৌরসভার হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আয় । দরকার হলে কয়েকটা ইঞ্জেকশন নিবি, কিংবা যা করতে হয়, তাই করবি । নইলে একদিন কিন্তু পস্তাতে হবে ।’ 

কিন্তু দাগরু হাসপাতালে যায়নি । 

হিরাও বলেছে, ‘যাও না, হাসপাতালে যাও । তা নাহলে একদিন পুরো পা-ই কেটে ফেলতে হবে ।’ 

এবং অবশেষে তাই হয়েছে । 

যেদিন ডাক্তার দাগরুর পা কেটেছে, সেদিন হিরা হাসপাতালে ছিল । প্রথমে দাগরুকে অজ্ঞান করেছিল এবং পুরো একদিন লেগেছে তার জ্ঞান ফিরে আসতে । জ্ঞান ফেরার পর দাগরু ভীষণ কান্নাকাটি করেছে । ডাক্তার তাকে পঁচিশ দিন হাসপাতালে রেখেছিল । হিরা তাকে বলেছে, ‘বিশ্বাস করো বা না-করো, শ্যান্ডি কিন্তু পুরো পঁচিশ দিন হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করেছে ।’ 

হাসপাতাল থেকে দাগরুর ফিরে আসার পর হিরা দাগরু এবং শ্যান্ডির সমস্যার সমাধান করেছে । হিরা আবারো কয়েকটি কালিমাখা ট্যাপ পড়া হাড়ি-পাতিল সংগ্রহ করে এবং এক কোণে ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে রান্নার আয়োজন করে । দাগরুর জন্য পুনরায় সে খাবার রান্না শুরু করে এবং সূর্য উঠার আগেই সে জেগে উঠা আরম্ভ করে । আগের মতো সে খার এবং বান্দ্রা এলাকার অর্ধেকের বেশি জায়গা ঘুরে পরিত্যাক্ত ক্যান সংগ্রহ করে । 

তারপর একদিন হঠাৎ করে শ্যান্ডি একটা চলন্ত গাড়ির নিচে চাপা পড়ে । অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনা দুজনকে দারুণ ভাবে মর্মাহত করে । হিরা চিৎকার করে বলে, ‘ভিকুও ... একই ভাবে মারা গেছে ।’ 

দাগরু জিজ্ঞাসা করে, ‘কী হয়েছিল ?’ 

‘মাঝ রাতে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য ভিকু জেগে উঠে উল্টোপাশের রেললাইনের দিকে যাচ্ছিল । হঠাৎ করে রাস্তার অপর দিক থেকে একটা গাড়ি আসে । ভীষণ জোরে ... তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় এবং তার উপর দিয়ে চলে যায় । বদমাশটা থামেনি, বরং দ্রুত পালিয়ে গেছে । পরদিন সকালে পৌরসভার গাড়ি আসে ... চারপাশে তদন্ত করে ... আমি কিছু বলিনি ... আমার কি-ই বা বলার ছিল ... পুলিশের সঙ্গে অযথা কে জড়াতে চায় ... কে মৃতদেহের সৎকার করতে করতে যাবে ... অবশেষে পৌরসভার গাড়ি মৃতদেহ তুলে নিয়ে যায় ... যেভাবে শ্যান্ডিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ... এই হলো ফুটপাতের অভিশপ্ত জীবন । 


লেখক পরিচিতি: 
গুলজার
ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গণে পরিচিত, সমাদৃত এবং স্বনামধন্য বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী গুলজার । তাঁর আসল নাম সাম্পুরাণ সিং কালরা । তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অঙ্কন শিল্পী এবং অধ্যাপক গুলজার । তৎকালীন অখন্ড ভারতের পাঞ্জাব (বর্তমানে পাকিস্তানে) প্রদেশের ঝিলাম জেলার দিনা শহরে তিনি ১৯৩৪ সালের ১৮ আগষ্ট জন্ম গ্রহণ করেন । মূলত: হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি করেন । ‘টু’ তাঁর একমাত্র উপন্যাস, যা ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে শরণার্থীদের করুণ কাহিনী নিয়ে রচিত । তিনি তিনটি কাব্যগ্রন্থ এবং দুটি ছোটগল্প সংকলন রচনা করেন । গুলজারের কর্মজীবন শুরু হয়েছে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে । পরবর্তীতে তিনি গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে সুপরিচিতি লাভ করেন । গীতিকার হিসাবে তিনি ২০০৪ সালে ‘পদ্ম ভূষণ’ এবং ২০০২ সালে ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার অর্জণ করেন । এছাড়া তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারসহ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন । ‘স্লামডগ মিলিনিয়র’ চলচ্চিত্রের গান ‘জয় হো’ সঙ্গীত রচনার জন্য তিনি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডও অর্জণ করেছেন । 
গল্পসূত্র: 
‘ফুটপাত’ গল্পটি গুলজারের ইংরেজিতে ‘ফ্রম দ্য ফুটপাত’ গল্পের অনুবাদ । হিন্দী থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় শেখর । গল্পটি লেখকের ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ গল্পগ্রন্থে সংকলিত এবং সেখান থেকে নেয়া ।



অনুবাদক
ফজল হাসান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন