মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

অস্ট্রেলিয়ান গল্প : সীমান্ত জেলা

জেরাল্ড মার্নেন 
অনুবাদ – কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

[যদিও তাঁর অস্ট্রেলিয়ার পুরনো জায়গাগুলোর বাইরে তেমন পরিচিত নেই, জেরাল্ড মার্নেন চার দশক আর কয়েক ডজন বইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে তিনি দেশের অন্যতম একজন অরিজিনাল আর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত লেখক। মার্নেনের বক্তব্য অনুসারে তার সাম্প্রতিক কাহিনি ‘সীমান্ত জেলা’ হবে তাঁর শেষ কাজ। তার শুরুর পাতাগুলো এইরকম।]
দুমাস আগে যখন আমি সীমান্তের কাছে এই ছোট্ট শহরে এসেছিলাম, তখন আমি আমার চোখ আড়াল করার ব্যবস্থা করেছিলাম আর এই লেখা নিয়ে ভাবারই অবকাশ ছিল না যতক্ষণ না আমি সেই অস্বস্তিকর অভিব্যক্তিটা ব্যাখ্যা করতে পারি। 

ধর্মীয় উপযাজকদের থেকে একটা নির্দিষ্ট ধরণের লেখাপড়ার শিক্ষা আমি খানিকটা পেয়েছিলাম, একদল পুরুষ যারা প্রত্যেকে কালো সিটান পরা আর সঙ্গে গলায় একটা করে সাদা সেলুলয়েডের নালপোশ। গতবছর ঘটনাক্রমে আমি জানলাম সেই নালপোশকে বলে র‍্যাবাট্যান্ড, সেটা এক সতীত্বের প্রতীক। রাজধানী শহর থেকে যে অল্পকটা বই আমি এখানে এনেছি তার একটা হল বিরাট অভিধান, কিন্তু তাতে র‍্যাবাট শব্দটা নেই। শব্দটা ফরাসি হতে পারে, ফ্রান্সে যেমন দেখা যায় তেমনই উপযাজকদের জন্য কোনও পদ্ধতি হতে পারে। এই দূরের জেলায়, আমার সেই রাজধানী শহরের প্রান্তে বাস করার সময়ের গুহ্য-গোপন ব্যাপার খুঁজে বের করার আগ্রহ ঢের কমে গেছে, আসলে, এই সীমান্তের কাছে, আমার বরং আগ্রহ পুরনো জিনিসকে যথেষ্ট খোঁজা হয়েছে বলে মেনে নিয়ে, আমার মনে তার একটা গোটা বিন্যাস গড়ে লিখে যাওয়া যতক্ষণ না আমি সেই ছবিটার অর্থ নিজের মধ্যে বুঝে নিই, যেটার সাদা দাগ এখনই তার পিছনের কালো পটভূমিকায় ফুটে উঠল আমার মনের প্রান্তে, আর যেটা সহজে মুছে যাবে না। 

যেখানে সেই উপযাজকরা পড়াতেন সেই স্কুলটা ছিল রাজধানী শহরের পূর্ব প্রান্তে সরলবর্গীয় গাছ লাগানো একটা রাস্তার ধারে হলুদ বেলে পাথরে গড়া একটা দোতলা বাড়ি। সেখানেই সেই উপযাজকেরা বাস করত। একতলায় বারান্দার পাশের একটা ঘর ছিল উপাসনাকক্ষ, ওখানেই উপযাজকদের দৈনন্দিন সমবেত প্রার্থনা হত, সেখানে আমরা ছাত্ররাও যেতাম। 

সেখানকার সেকালের ভাষায়, একজন ছাত্রকে কিছুক্ষণের জন্যে উপাসনাকক্ষে ডাকা হলে বলা হত, দেখা করতে। যার সঙ্গে সেই দেখা করা তা হল যিশুর রক্তমাংসের পবিত্র সংস্কার, যাকে ব্লেসড স্যাক্রামেন্ট বলে। আমরা ছেলেরা শিক্ষক আর যাজকদের চাপে প্রায়শই সেই ব্লেসড স্যাক্রামেন্ট দেখতে যেতাম। দর্শনার্থী কম হলে সেই মহান ব্যক্তিদের প্রবাদ প্রবচনেই তাদের রাগদুঃখ বোঝা যেত। আমার ক্লাসের ছেলেরা একবার এক উপযাজকের কাছে একটা গল্পের মতো শুনেছিল যেটা প্রায়শই বলা হত আমাদের ধর্মীয় আগ্রহ বাড়ানোর জন্যে। একবার এক অ-ক্যাথলিক এক যাজককে ব্লেসড স্যাক্রামেন্ট বিষয়ে চার্চের শিক্ষাকে ব্যাখ্যা করতে বলেছিল। সেই যাজক তখন ব্যাখ্যা করে, কীভাবে প্রতিটি পবিত্র রুটির টুকরো প্রতিটি ক্যাথলিক চার্চ বা চ্যাপেলে আছে তা দেখতে সাধারণ রুটির মতো হলেও আসলে তা ঈশ্বরের পুত্র জিশু খ্রিস্টের দেহ। জিজ্ঞাসু তখন ঘোষণা করলেন যে, তিনি যদি তা বিশ্বাস করতে পারেন তাহলে তিনি সময় পেলেই কোনও না কোনও চার্চ বা চ্যাপেলে পবিত্র মূর্তির সামনে উপস্থিত হবেন। 

প্রতিবছর আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনে আমাদের প্রিন্সিপাল অভিভাবকদের জন্যে তাঁর বার্ষিক বিবরণীতে আমাদের, ছেলেদের ধার্মিক গড়ন সম্পর্কে পাতা জুড়ে লিখতেন। প্রতিটি ক্লাসরুমে প্রতিদিন ফার্স্ট পিরিয়ড হত খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অথবা খ্রিস্ট ধর্মের বিষয়ে, আমরা তাই বলতাম। ছাত্ররা একসঙ্গে প্রতিটা ক্লাসের শুরুতে রুটিনমাফিক চিৎকার করে প্রার্থনা করত। আমি ভাবতাম আমার সহপাঠীরা তাদের ধর্ম ব্যাপারটাকে বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিল, কিন্তু আমি ক্লাসের বাইরে তাদের এইসব ধর্মচর্চা নিয়ে কোনও কথা বলতে শুনতাম না। খেলার মাঠ থেকে চ্যাপেল দেখা যেত না, ফলে আমি জানতাম না যে আমার ক্লাসের কতজন সেখানে যেত। যাইহোক আমি অসংখ্য পিরিয়ড সেই ধর্মীয় আবেগের মধ্যে দিয়ে গেছি আমার স্কুলের আমলে, আর সেই পিরিয়ডগুলোর মধ্যে আমি রোজ অনেকবার সেই ব্লেসড স্যাক্রামেন্টে গেছি। কখনও আমি আমার ক্লাসের কোনও না কোনও সহপাঠীকে চ্যাপেলে দেখেছি। হাঁটু মুড়ে বসে আছে আমারই মতো, মাথা নিচু চোখ সেই বন্ধ ট্যাবার্নিক্যালে স্থির, যার মধ্যে আমাদের দৃষ্টির বাইরে সোনার পাতে মোড়া সিবোরিয়াম ছিল হোয়াইট ওয়েফার দিয়ে ভরা, ওটাকেও আমরা পবিত্র স্যাক্রামেন্ট বলে জানতাম। আমি নিজে কখনও আমার নিজের প্রার্থনায় বা ওই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকায় সন্তুষ্ট হতাম না, আর প্রায়শই অবাক হতাম যে আমার সেই ভক্তভাবের সহপাঠীদের মাথায় ঠিক কী চলত তাদের সেই প্রার্থনার সময়। আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করত যে প্রার্থনা করার সময় তাঁরা ঠিক কী দেখত, কী করে সেই দৈব সন্ন্যাসীকে আহ্বান করত মনে মনে। কখনও হঠাৎ আমার সহপাঠী আর আমি একই সঙ্গে চ্যাপেল থেকে বেরোতাম আর একসঙ্গে হেঁটে বারান্দায় ফিরতাম আর তারপর ব্রাদারদের বাগানের মধ্যে দিয়ে মাঠের দিকে যেতাম, কিন্তু সেই ছেলেটাকে তার ভক্তির কথা জিজ্ঞেস করা প্রায় কুপ্রস্থাব দেওয়ার সমান ছিল। 

এই স্তব্ধ পথে, যেখানে আমি এখন থাকি, সেখানে একটা ছোট্ট চার্চ আছে যেটার পাশ দিয়ে আমি গোটা সপ্তাহ সকালে হেঁটে দোকানে কিংবা পোস্ট অফিসে যাই। ওই চার্চটা প্রোটেস্টানদের, যাদের জন্যে আমার স্কুল জীবনে একটা কষ্ট ছিল কারণ তাদের সেবা সম্পর্কে অনাগ্রহ। আমার মনে হয় এই মন্ত্রপড়া, নির্দেশ শোনা, অদ্ভুত প্রথাপালন আমাদের এই চার্চেও হত। যখনই আমি আমার প্রতিবেশী চার্চটির ঘাসজমির পাশদিয়ে যাই তখনই দেখি সেটা নিখুঁত ভাবে ছাঁটা আছে কিন্তু চার্চটা বন্ধ, পরিত্যক্ত। আমি অবশ্যই এই শহরতলীতে বা গ্রামে অসংখ্য প্রোটেস্টান চার্চের পাশ দিয়ে গেছি কিন্তু তাকিয়ে প্রায় দেখিইনি, যদিও কাছের চার্চটার পাশ দিয়ে কখনও এমন ভাবনা ছাড়া যাইনি যেটা আমাকে কোনও অবাক করা দিক নির্দেশ দেয়নি। 

স্থাপত্য সম্পর্কে আমার কোনও আগ্রহ আছে বলে আমি বিশ্বাস করতাম না। আমি জানিই না গ্যাবেল কী বা নেভ কী কিংবা ভল্ট বা ভেস্ট্রি কাকে বলে, আমি আমার পাশের চার্চটাকে একটা চক মেলানো বাড়ি বলেই বর্ণনা করব, যার তিনটি অংশ একটা পোর্চ, একটা প্রধান অংশ আরেকটা রাস্তা থেকে শেষ প্রান্ত – যেটা মন্ত্রীদের জন্যে সংরক্ষিত থাকত যে কোনও অনুষ্ঠানের আগে ও পরে। দেওয়ালে পাথুরে রঙের ছাপা – অথবা ঠিক করে বলতে গেলে রেন্ডার্ড – এক সমান দুধসাদা। আমি দেখার ব্যাপারে এত অমনোযোগী ছিলাম যে ঠিক করে মনে করতে পারি না , এখানে আমার ডেস্কে বসে আমার আর তা মনে নেই যে পোর্চের ছাদ পিচ রঙের, প্রধান অংশের ছাদ স্লেট না স্টিল রঙের। পিছনের অংশে ছিল সমান স্টিল রঙের ছাদ। জানলায় আমার তেমন আগ্রহ নেই কেবল দুটো আয়তাকার জানলায় ছিল স্বচ্ছ কাচ তার পিছনে ব্লাইন্ড টানা পিছনের দেওয়ালে ছিল মন্ত্রীর ঘর। চার্চের প্রধান অংশে দুদিকে তিনটে করে মোট ছটা ছোটো জানলা ছিল। তার কাচ ছিল অর্ধস্বচ্ছ। যদি সেটার কাছে গিয়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে পারতাম তবে তাহলে এটাকে বাথরুমের কাচের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই বলা যেত। সেই কাচ কোনও অর্থেই বর্ণহীন নয় তবে তাকে ঠিক কী রঙ বলা যায় তা আমি চিনতে পারিনি। কখনও কখনও সকালে আমি যখন ওর সামনে দিয়ে যেতাম তখন ওটা ধূসর সবুজ মনে হত অথবা ধূসর নীল। একবার যখন আমি সন্ধেবেলা চার্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দেখলাম একদম দক্ষিণ দিকের ছায়ায় থাকা কাচটা দেখলাম। সেই কাচে রঙ সরাসরি অস্তগামী সূর্য থেকে নয় বরং যে আলোটা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না সেই উজ্জ্বলতা বন্ধ চার্চের ভিতর থেকে আসছিল, যেখানে পশ্চিমের রশ্মি তিনটে জানলার কাচে পরিবর্তিত হয়ে গেছে সেই কাচগুলো আমার থেকে অনেক দূরে এমনকি যদি আমি সেই আন্দোলিত উজ্জলতার একটা নামও ভাবি, যেটা ওই একটা সাধারণ কাচে দেখা গেল তাহলে তার পাশের দুটো কাচের জন্যে আবার আলাদা রঙের নাম ভাবতে হবে। যেখানে অনেক মূক আলো সেই একই সূর্যাস্ত থেকে এসে পড়েছে আলাদা ভাবে প্রতিফলিত হয়ে। পোর্চে একটা জানলা, রাস্তার দিকে মুখ করা। এটাই বারবার যাতায়াতের পথে আমার চোখে পড়ে সেটাই হয়ত আমার এই ক’পাতা লিখতে বসার কারণ। সেই জানলার কাচকে আমরা স্টেইনড গ্লাস বলি এবং নিশ্চিত ভাবে তাতে কিছু না কিছু থাকে – যেমন পাতা, গাছের ডাল কিংবা ফুলের পাপড়ি। টাউনশিপে যাওয়ার সময় আমি তাতে আগ্রহ দেখাই না আর দাঁড়িয়ে পড়ে পোর্চের জানলার দিকে তাকিয়ে থাকার মতো শক্তপোক্ত আমি নই। ওতে কী দেখানো হচ্ছে সেই সম্পর্কেও আমি নিশ্চিত আর বিভিন্ন জানলার কাচের রঙ নিয়েও আমার আগ্রহ নেই। আমি ধরে নিই সেগুলোর বেশিরভাগই লাল, সবুজ, হলদে আর নীল। আমি যখন পাশ দিয়ে যাই সেই সময় চার্চের বাইরের দরজা বন্ধ থাকে। পোর্চ থেকে চার্চের ভিতরে ঢুকবার দরজাও অবশ্যই বন্ধ করা থাকে। যদিও রঙিন জানলাগুলো উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করা, কাচের কাছের দিক সেটা সবসময় উজ্জ্বল রোদ্দুরে থাকে দূরের দিকটা পোর্চের ঘেরায় প্রতিফলিত আলো পায়। যে কেউ আমার আলোকিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে দেখলেই কেবল অনুমান করতে পারবে সেই কাচের রঙ আর তাতে কী আঁকা আছে। 

প্রায় তিরিশ বছর আগে, আমি একটা প্রতিবেদন পড়েছিলাম একটা গবেষণা মূলক বইতে যার একটা অংশে একদল মানুষের ডায়েরির অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা গোটা ইংল্যান্ড ঘুরেছিল কমনওয়েলথের বছরগুলোতে কাজকরা জানলার কাচ ভেঙে। লোকগুলো মইতে দাঁড়িয়ে লাঠি অথবা কুঠার দিয়ে কাচ ভাঙত। তাঁরা তাদের ডায়েরিতে তাঁরা যে কটা চার্চে গেছিল সবকটার নাম লিখেছিল আর লিখেছিল তাদের ভাঙা জানলার সংখ্যা। তাঁরা তাদের ডায়েরিতে প্রায়শই ঘোষণা করেছে যে তাঁরা সদাপ্রভুর কাজ করছে অথবা তাঁর মহিমা ব্যক্ত করছে। আমি কখনও আমার জন্মস্থান থেকে সড়ক পথে বা রেল পথে একদিনের দূরত্বও ভ্রমণ করিনি। বিদেশ আমার কাছে কেবল মানসিক ছবি হয়ে আছে, সেগুলির কিছু নিখুঁত অনুপুঙ্খ আর তাঁর অনেকগুলো তৈরি হয়েছে আমার নানা কাহিনি পড়ার সময়ে। আমার কাছে ইংল্যান্ডের ছবি অনেকটাই সবুজ টোপোগ্রাফিকাল ম্যাপের, খুব অনুপুঙ্খ বর্ণনা কিন্তু একটা দেশের তুলনায় খুবই ছোটো। আমি যে বইটার কথা উল্লেখ করলাম তাতে যখন সেই প্রতিবেদন পড়ছিলাম, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে কী করে একটা জানলার কাচও বাঁচল সে দেশে, সেই লোকগুলোর বিস্তৃত কাজের পরে, আরও অবাক করার মতো বিষয় যে ওই অত ভাঙা কাচেরই বা কী হল। আমার মনে হয় লোকগুলো জানলাগুলোকে বাইরে থেকে আঘাত করেছিল – লাঠি বা ওদের কুঠার দিয়ে পিটিয়েছিল কাচগুলোর কাজ না করা দিক থেকে, কাচে কী কারুকাজ করা আছে বা তার কী রঙ ওই পাশ থেকে দেখা যায় তা না জেনে। কতদিন সেই রঙিন কাচ ভাঙা পড়েছিল চার্চের সরু পথে বা বেঞ্চিতে? হতাশ ধর্মসভা সেই কাচের টুকরোগুলোকে কোথায় জড়ো করেছিল যতদিন না সেগুলোকে আবার গলিয়ে বা অন্য কোনও ভাবে আবার সেই পবিত্র মানবের দৈবী ছবি তৈরি করা হয়? বাচ্চারা কি মুঠো ভরে অনেক রঙিন কাচের টুকরো নিয়ে গিয়েছিল আর তাঁর মধ্যে দিয়ে কটাক্ষে তাকিয়েছিল গাছের দিকে আকাশের দিকে, সেগুলো আগে যেমন ছিল তেমন ভাবে তাদের সাজিয়ে নিতে অথবা অনুমান করতে যে এটা সেই ছবির পোশাকের পিছনের অংশ নাকি মাথার জ্যোতিঃবলয় অথবা ফেঁসে যাওয়া মুখাবয়ব? 

আমাকে ছোটবেলায় যে ইতিহাস পরানো হয়েছিল সেই অনুয়ারে, ভাঙা জানলার কাচের চিত্র ইংল্যান্ডে এক প্রাচীন বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। কাচের শিল্প বিন্যাস এক শতাব্দী ধরে চলেছিল, প্রার্থনা উৎসব আনুষ্ঠানিক পোশাক এসব প্রটেস্টান্ট বিপ্লবের সময় ঘুচে গিয়েছিল, আমাদের এমনই পড়ানো হয়েছিল। যদি আমি আমার স্কুলজীবনে এই কাচ ভাঙার বিষয়ে পড়তাম, আমার অবশ্যই দুঃখ থাকত এই এত সংখ্যায় সুন্দর চিত্রের ধ্বংসের জন্যে, আমি মনে করতাম যে কাচহীন জানলা সেই বিশ্বাসঘাতক প্রটেস্টান্টদের প্রাপ্য। জানলার ফাঁকা জায়গাটা আমার কাছে দৃষ্টিহীন মানুষের চোখের মতো, যে সত্যের প্রতি অন্ধ। তাঁরা রঙিন হাতা ছাড়া আংরাখা, সোনার মনস্ট্রান্স, ব্লেসড স্যাক্রামেন্ট অবধি নষ্ট করে। এখন ওদের সাদাকালো পোশাকেই গান গাইতে আর বাণী দিতে দিন – দিনের সাধারণ আলোয়, যেখানে পুরনো দিনের কোনও রঙিন কাচের আলো পড়ে না। আমি ভাবিই না যে, আমি যে বড়ো বয়েসে এসে যখন সেই জানলা ভাঙার বিষয়ে পড়লাম, কিন্তু প্রথম দর্শনেই পাশের চার্চের পোর্চের জানলা দেখে আমার প্রথমেই খানিক বিরক্ত লাগল যে প্রটেস্টান্ট অংশ যারা কেবল তিন শতাব্দী আগে তৈরি হয়েছে তাদের নিজেদের প্রার্থনার জায়গা সেভাবে সাজানো উচিত যেভাবেছিল তাদের ধ্বংসের আগে চার্চ প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে ছিল। এমনকি ছোটো সেই পাথরের বাড়ির চারপাশটাও আমার বিরক্তির কারণ। চার্চের দিকে যাওয়ার কোনও ফুটপাথও নেই। রাস্তার বাঁক আর চার্চের সীমানার মধ্যে ছাঁটা ঘাসের নিচের জমিটাও অসমান। আমি ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে কি থামতে চাইও না, বরং ভয় লাগে আমার গোড়ালি মুচড়ে যায় কিনা। 

মাস খানেক আগে চার্চটাকে প্রথম দেখে আমি প্রথম যা বুঝেছিলাম সেটা আগের একটা অনুচ্ছেদে লিখেছি। আজ সকাল পর্যন্ত, আমি আর নতুন কিছু বুঝিনি। এমনকি আমি জানি না যে যে চার্চে সেবাকাজ এখনও হয় কি না। (অ্যাংলিকান আর লুথেরান চার্চে, ছোটো ওয়েদারবোর্ড বিল্ডিংয়েও প্রত্যেকটার বাইরে একটা নোটিশ বোর্ড থাকে তাতে পরবর্তী সেবাকাজের তারিখ আর সময় দেওয়া থাকে। সেই ওয়েদার বোর্ড ক্যাথলিক চার্চ আমি এখানে আসার কয়েকমাস আগে ভেঙে ফেলা হয়, তাতে উই ধরায় সেটা আর নিরাপদ ছিল না।) এই সকালে আমি প্রথমবার সীমান্তে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলাম। আমি বেরোচ্ছিলাম এক ঘোড়দৌড়ে, সীমান্তের কাছাকাছি বলে তেমনই নামের এক ছোটো শহরে। আমার গাড়ির ইঞ্জিন তখন স্টার্ট দেওয়া হয়ে গেছে, আমি সামনের দরজা খুলে ফেলেছি। একসার গাড়ি চার্চের সামনে পার্ক করা আছে। এমনিতে মনে হচ্ছে সেদিন একটা প্রার্থনার দিন। আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না এখনও যে, আমি কেন এমন করলাম, কিন্তু আমি ইঞ্জিন্টা বন্ধ করলাম নেমে ধীরে ধীরে হেঁটে চার্চের দিকে গেলাম যেন আমি সকালের প্রার্থনার জন্যে যাচ্ছি। আমি চার্চ-যাত্রীদের গাড়ি সহজেই গুণে ফেললাম। মোট সাতটা ছিল। সেগুলো সবকটাই বড়ো, নতুন মডেলের গাড়ি মনে হয় টাউনশিপের আসেপাশের জেলার বড়ো চাষিদের। আমার অনুমান প্রত্যেকটা গাড়ি একজোড়া করে মধ্যবয়স্ক দম্পতিকে চার্চে নিয়ে এসেছে। হয়ত টাউনশিপের কিছু লোক বাড়ি থেকে হেঁটে চার্চে এসেছে, কিন্তু প্রার্থনাকারীরা সব মিলিয়ে হয়ত কুড়িজন হবে। আমি যখন ধীরেসুস্থে হেঁটে চার্চটা পার হলাম তখন আমি কোনও শব্দ শুনিনি কিন্তু ফেরার সময় আমি শুনতে পেলাম গান হচ্ছে তার সঙ্গে বাজনাও বাজছে। আমি সবসময় ভাবতাম যে ওটা কাদের চার্চ যারা আনন্দের সঙ্গে, পূর্ণহৃদয়ে গান করে। আমি অবশ্য পোর্চের দিকে যেতে চাইছিলাম না কিন্তু চার্চের পিছনের দরজা আর পোর্চের বাইরে বেরোবার দরজা গরমের জন্যে খোলা ছিল, আর যদিও গান এখনও শোনা যাচ্ছিল ধীরে প্রায় শান্ত ভাবে। প্রার্থনাকারীদের গলা অর্গানের শব্দের থেকে সামান্য ওপরে, অথবা সেই বাজনাটার যাই নাম হোক না কেন। আমি এক্ষুনি লিখলাম প্রার্থনাকারীদের গলা, কিন্তু আমি শুনতে পেয়েছিলাম কেবল মহিলাদের গলাই। যদি পুরুষেরা গাইত, তাহলে সেটা বাড়ির দেওয়ালের বাইরে আসত না। 

আমি এই সীমান্তের কাছের জেলাতে এসেছিলাম যাতে আমি বেশিরভাগ সময়ে একা থাকতে পারি, ফলে আমি কতগুলো নিয়মের মধ্যে বাঁচতে পারি যে নিয়মগুলতে আমি দীর্ঘকাল বাঁচতে চাইতাম। আমি আগেই বলেছি যে আমি চোখ আড়াল করেছি। দেখেছি যাতে আমি আরও বেশি সজাগ থাকতে পারি, আমার দৃষ্টির প্রান্তসীমায় কে আসছে সেই বিষয়ে; যাতে আমি একবারেই আমার অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণের জন্যে প্রয়োজনে আরও বেশি নজর করতে পারি, অথবা যতক্ষণ না সেটা আমাকে কোনও সংকেত দেয় অথবা চোখ মারে। আরেকটা নিয়ম আমার দরকার যে, আমি আমার মনোযোগ সেই সংকেত বা চোখ মারার সঙ্গে সঙ্গেই সজাগ করে সামনে ঘটা চিত্রগুলোকে পারম্পর্যে লক্ষ করতে পারি। আমি আজ সকালে সীমান্তের দিকে যাওয়ার তোড়জোড় করছিলাম কিন্তু আমি বেরনো বাতিল করে ভিতরে ঢুকে আমার ডেস্কের সামনে বসে নোট নিলাম যেটা এই অনুচ্ছেদের দৈর্ঘ্য বাড়াল। 

১৯৪০ এর দশকের শেষের দিকে, আমার বাবা-মা আমাকে প্রায় রবিবারেই এই রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব জেলায় একটা কাঠের ছোট্ট চার্চে নিয়ে যেত। চার্চের দুদিকেই দুটো লম্বা কাঠের খুঁটি ছিল। সেগুলোর একদিক মাটিতে পোঁতা; আরেক দিক চার্চের ওপরের দেয়ালে শক্ত করে আটকানো। আমার ধারণা খুঁটি দুটো চার্চটাকে হেলে পড়া বা উলটে পড়ার থেকে আটকাতে। বাড়িটা তাই দাঁড়িয়ে ছিল একটা ছোট্ট পোর্চ; একটা প্রধান অংশ একটা হাতল দেওয়া আশ্রয়স্থল গোটা বারো ঘেরা আসন দুদিকে ভাগ করা, আর একটা ছোটো ঘর প্রিস্টের জন্যে। চার্চের ধর্মসভায় কৃষকেরা আর তাদের পরিবার প্রধানত যুক্ত। ওই চার্চের আমি একটা প্রথা পালন করতে দেখেছি যেটা আর কোথাও হয় না। কাঠের চার্চে চারটে খুঁটিসহ ঘেরা আসন বা বাঁদিকে গস্পেলের দিকে কেবল পুরুষেরা আছে যেখানে ডান দিকের ঘেরা আসনে এপিস্টেলের দিকে কেবল মহিলারা আছে। আমি কখনও দেখিনি যে কেউ এই কঠোর বিভেদকে অতিক্রম করেছে বলে। একবার দুই নবাগত, এক তরুণ দম্পতি তাড়াতাড়ি এসে পুরুষদের দিকে একসঙ্গে বসে। চার্চ অর্ধেক ভরার আগেই সেই স্ত্রী ভুলটা বুঝতে পারল। সে তাড়াতাড়ি লজ্জা পেয়ে ওপর দিকে গিয়ে অন্যান্য মহিলা আর মেয়েদের সঙ্গে বসল। 

অনেক বছর বাদে, আমি যখন একটা পত্রিকায় শেকার নামে খ্রিস্টানদের একটা অংশের ওপরে একটা প্রতিবেদন পড়ছিলাম, তখন একটা মাথায় একটা ছবি তৈরি হল, একটা ছোটো কাঠের বাড়িতে একদল প্রাপ্তবয়স্ক উপাসনাকারীর, আগের অনুচ্ছেদে যে চার্চের কথা লেখা হয়েছে তার থেকে সামান্যই পার্থক্য তার। এটা প্রায় একটা বেমানান ছবি, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মের ভোরের রোদে আলোকিত। পুরুষ উপাসনাকারীরা কালো স্যুট পরা সঙ্গে চওড়া নেকটাই, তাদের মুখ আর কাঁধ আর কব্জি লালচে বাদামি। মহিলারা পরেছে ফুলছাপ পোশাক আর বার্নিশ করা খড়ের লম্বা টুপি। পুরুষ ও মহিলারা পরস্পরের দিকে মুখোমুখি দাঁড়ানো, কিন্তু ঘেরা আসনে নয় বরং গায়কদের জায়গায়। সেই গায়কদের জায়গায় দাঁড়ানোর কারণে শেকারদের প্রতিবেদনটিতে যেমন পড়েছিলাম তাঁরা তেমন নাচতে পারছিল না। তাতে যারা নাচবে তাদের দুটো লাইন থাকার কথা যাতে তাঁরা পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাবে আর তারপরে একটু পিছিয়ে আসবে, আবার এগিয়ে যায় আবার পিছিয়ে আসে। একটা লাইন পুরুষদের আরেকটা অবশ্যই মহিলাদের। যখন তাঁরা নাচে তখন তার সঙ্গে মন্ত্র আওড়ায় বা গানই করে। পত্রিকার প্রতিবেদনে তাদের সবচেয়ে চেনা গানের দুটো লাইন দেওয়া ছিল – হয়তো বা সেটাই একমাত্র গান? 

শেক শেক শেক অ্যালং ডার্নাল! 
শেক আউট অব মি অল থিংস কার্নাল! 

শেকারদের এই গান আন্তরিকভাবে গাইতে হয়, তাদের কৌমার্যের আকুল প্রার্থনা থাকে। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা থাকা প্রয়োজন। 

আমার কল্পনার ছবিতে অনেক পুরুষ মহিলা ছিল স্বামী-স্ত্রী, কিন্তু তারাও আস্তে আস্তে সেই পুরনো শেকারদের গানের দুটো লাইন গাইত। বরং মহিলারা গাইত আর পুরুষেরা প্রায় উচ্চারণই করত না। এটা প্রায় সবাই জানে যে, ক্যাথলিক পুরুষ যারা চার্চে যায় তাঁরা প্রায় গানে যোগই দেয় না। আমার ছবিতে পুরুষেরা নাচের জন্যে শরীরও নাড়ায় না, যদিও মহিলারা মন্ত্রোচ্চারণে প্রভাবিত হন, এমনকি তাদের কেউ কেউ ঝুঁকে পড়েন বা এগিয়ে আসে, সেই বুক সমান উঁচু কাঠের দেয়াল পর্যন্ত যেটা তাদের পথ আটকেছে। 

অনেক বছর আগে সেই ছোট্ট চার্চটাও মানসিক বিষয়ের জন্যে তৈরি হয়েছিল যখন আমি একটা ছোটোগল্পের সংকলন পড়ছিলাম একটা বই থেকে যেটা আমি অনেকদিন আগে নষ্ট করে ফেলেছি। আমি বইটার নাম ভুলে গেছি আর আমার সেটা পড়ার সময় কী মনে হয়েছিল সেই দু-একটা মানসিক দৃশ্য ছাড়া, সেটাকে কী বলে সেই সবই ভুলে গেছি। আমি বইটা কিনেছিলাম আর পড়েছিলাম কারণ তার লেখক একসময়ে এক সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদূর ক্যাম্পাসে এক অস্পষ্ট বিভাগে আমার সহকর্মী ছিল। বিশ শতকের শেষ দশকে দেখা হওয়া লোকের মধ্যে সে একেবারেই উল্লেখযোগ্য নয় যারা জানলে খুশি হত যে তাঁরা আগে ক্যাথলিক প্রিস্ট কিংবা ব্রাদার ছিল। কেউ ছিল শিক্ষক কিংবা লাইব্রেরিয়ান বা সরকারি কর্মী, কেউ কেউ সাংবাদিক হিসেবে কাজ করত বা রেডিও বা টেলিভিশনের প্রযোজক ছিল আর খুব অল্প ছিল পাবলিশ হওয়া লেখক। এই শেষে উল্লিখিতদের বেশিরভাগ বই ছিল জ্ঞান দেওয়ার ঢঙের, তার লেখকেরা এখনও সংশোধন করে যায়, অথবা অন্তত বিলাপ করে আপাত দৃষ্টিতে সমাজের ভুলগুলো নিয়ে, যেটা ওদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা শব্দ। 

অকল্পনীয় অবস্থায় যখন আমি একটা গল্প লিখছিলাম, আমার এক সময়ের সহকর্মীকে তার একটা চরিত্র করে, তখন আমি আমার অবৈধ পাঠকদের কাছে কৃতজ্ঞ চিত্তে জানাই যে তার জীবনে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল বলে সে সব ডাক উপেক্ষা করত। বিবেকের কোনও সংকটে আমি চরিত্রদের হয়তো বিশেষিত করব তার অতিরঞ্জিত ভাবনা আর অনুভূতি দিয়ে আর তাতে আমার বক্তব্য যতই অনুপুঙ্খ হোক না কেন, আমি লিখব আমার বর্ণনার কোথাও যে লোকটা যা করার তাই করেছে কারণ সে জেনেছে যে, সে সেটাই করতে পারে। 

আমার প্রজন্মের বহু প্রিস্টের বা ধার্মিকের সংঘ ত্যাগ করার সাধারণ কোনও কারণ ব্যাখ্যাকে আমি দীর্ঘদিনই সমর্থন করি। আমি স্বীকার করি যে, প্রথম যে সাহসী লোকেরা তা করেছিল তাঁরা পথপ্রদর্শক ধরণের ছিলেন, তাদের কোনও মৌলিক নৈতিক কারণ ছিল, কিন্তু তাদের পরে যারা এসেছে তাঁরা নিতান্তই ফ্যাশানে ছেড়েছে। একবার তাদের দুঃসাহসী লোকদের উদাহরণ থেকে শিখে সেই তথাকথিত পবিত্র শপথ তারা প্রায় মূল্যহীন ভাবে সরিয়ে রাখতে পারে বা ভঙ্গ করতে পারে, যারা একবার পবিত্রতার আর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিল তাদের অস্থিরতা ঔৎসুক্য বিষয়ে ক্ষমাশীল হওয়া নির্ধারিত ছিল। 

আমার মনে পড়ছে যে, আমার আগের সহকর্মীদের অনেকের ছোটোগল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে একজন প্রিস্ট ছিল। একমাত্র যে গল্পটা আমার মনে আছে, তাতে যখন গল্পটা বলা হয় সেই ১৯৬০এর দশকে প্রিস্টদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের অদ্ভুত ভয়টা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো ছাড়া আর কোনও অর্থ ছিল না। সেই প্রিস্ট সেখানে উত্তম পুরুষ কথক ছিল বোধহয়, আমি ভুলে গেছি। সে-ই ছিল প্রধান চরিত্র আর প্রায় একমাত্র চরিত্র ক্যাথলিক পাড়ার চেনা-চরিত্র সেই মধ্যবয়স্কা মহিলা ছাড়া। তাদের হোলি ওয়াটার হেনস বলে তাঁরা। আমার যতদূর মনে পড়ে, প্রিস্ট সানডে মাস এর জন্যে একটা ছোটো চার্চে প্রথমবারের জন্যে এসেছেন। যখন তিনি এলেন তখনই তার মুত্রথলি অস্বস্তিকর রকমের ভর্তি। গ্রামের সমস্ত চার্চের প্রান্তে দুই কোনায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্যে দুটো আলাদা টয়লেট থাকে। কিন্তু কেন সেই গল্পের প্রিস্ট পৌঁছেই সেই পুরুষদের টয়লেটে গেলেন না? আমি জানি না, কিন্তু যদি তিনি তা করতেন, আমার আগের সহকর্মী তাহলে লেখার মতো কোনও গল্প পেতো না। কী হল, তা বলতে, তো সেই হোলি ওয়াটার হেন অর্থাৎ সেই মধ্য বয়স্কার সঙ্গে প্রিস্টের চার্চের দরজায় দেখা হল আর তিনি তাকে নিয়ে চার্চের যে ঘরে প্রার্থনার জিনিসপত্র রাখা হয় সেখানে নিয়ে গেলেন যাতে তিনি প্রিস্টকে দেখাতে পারেন যে কোথায় জিনিস রাখা আছে। তার ওপর তখন বুদ্ধি করে বেরিয়ে না গিয়ে, মহিলা প্রিস্টের কাছে বকে চললেন পাড়ার কথা নিয়ে হয়তো বা নিজের কথা নিয়ে। আবার প্রশ্ন ওঠে, কেন প্রিস্ট নিজেই বিনয় সহকারে মহিলাকে যেতে বললেন না? কেন তিনি ক্ষমা চেয়ে নিজেই বেরিয়ে টয়লেটে গেলেন না? গল্পটা সম্ভবত নির্ভর করছিল যুবক প্রিস্টের বয়স্কা মহিলার কথাকে খারিজ না করতে পারার স্নায়বিক দুর্বলতার ওপরে বা সেই মহিলাকে এটা মনে করাতে তিনি নিজে ঈশ্বরে অভিষিক্ত হলেও তার অন্যান্য মানুষের মতো কাজ করা শরীর আছে। মহিলা কথা বলে চলল, প্রিস্ট সবিনয়ে শুনে চললেন আর তার মুত্রথলিতে ব্যথা হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত কোনও ভাবে সেই মহিলার কাছ থেকে ছাড়া পেল। হয়তো সে নিজেই তার কাজে চলে গেল। এমনকি তখনও যদিও প্রিস্টের কষ্ট ফুরোয়নি। তিনি একটার পর একটা কাবার্ড খুলে খুঁজে দেখতে লাগলেন এমন কিছু পান কিনা যাতে তিনি পেচ্ছাপ করতে পারেন। গল্পের শেষ বাক্যে জানা গেল তাঁর অসীম তৃপ্তির কথা যে তিনি তাঁর পেচ্ছাপ দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছেন সেদিনের প্রার্থনায় কাজে লাগবে এমন একটা বোতল যাতে অল্প পরিমাণ অল্‌টার ওয়াইন ছিল। 

এই বোকা গল্পটা প্রায় বিগত তিরিশ বছর পরে আজকে প্রথম মনে করে আমি কোনও কল্পিত প্রিস্টকে নয় বরং আমার সহকর্মীর কথা মনে করলাম অনেক আগের সেই কালো স্যুট আর গলায় সাদা সেলুলয়েড কলার লাগানো অবস্থায়, মাথার ওপর সেভেনহিলের লেবেল লাগানো একটা পবিত্র ওয়াইনের বোতল তুলে ধরা অবস্থায়। তিনি বোতলটা ধরে ছিলেন নিজের আর একটা পুবমুখী জানলার মাঝে সে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল আলোকিত লাল-খয়েরি কাচের মধ্যে দিয়ে। দেয়ালের মধ্যে দিয়ে তিনি শোনেন চার্চের ভিতরে লাইন করে দাঁড়াবার সময় কৃষক আর তাদের স্ত্রী-সন্তানদের গলা খাকারির শব্দ, কৃষকেরা তাদের ছেলেদের নিয়ে গসপেলের দিকে মহিলা আর তাদের মেয়েরা এপিস্টেলের দিকে। অন্য দেয়ালের দিকে তিনি শুনলেন গাম গাছের মধ্যে দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চার্চের ঘাসে ভরা সীমানা ছুঁয়ে বা রোসেলাস পাখির ডাক। 

আমি কেন এমন একটা লেখার টুকরোকে মনে করলাম যেটাকে আমি প্রথমবার পড়ার পরেই বাতিল করেছিলাম, যখন সে প্রিস্ট ছিল তখনকার কোনও কিছু সম্পর্কে একটা ঘুরিয়ে বলা সাজানো কথা যেটা হয়ত এসে পড়েছে লেখকের ওপরে? আমি কেন এই প্রতিবেদনে সেই ক্লান্তিকর বিষয়টা যোগ করলাম আগের অনুচ্ছেদে? এর একটা উত্তর এটা হতে পারে যে আমি আমার মনের প্ররোচনাকে বিশ্বাস করতে শিখে গেছি, যেটা আমাকে মাঝেমধ্যেই তাড়িত করে সেই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানতে যেটা অন্যেরা গুরুত্বহীন, তুচ্ছ বলে, ছেলেমানুষি বলে বাতিল করবে। কাহিনির প্রিস্টের অস্বস্তি জ্বালাতন করা মহিলার প্রত্যাশিত উদ্দেশ্য আমার মনে নিজেরই আগ্রহের কারণে অনেক দিন ধরে ছিল, যাকে মানসিক সত্তার জীবন মৃত্যু বলে ভাবা যায়। ছোটোগল্পের লেখক হয়তো অনেক ছোটো চার্চের জিনিস রাখার ঘরে একা দাঁড়িয়ে থেকেছে, যেখানে চার্চ ঘেরা গাছে অনেক টিয়াপাখি ছিল আর সে হয়ত মাথা ঝুঁকিয়ে প্রার্থনা করেছে চার্চের অনুষ্ঠানে আর বাণী শুনিয়েছে সেই মানুষদের ঘেরা জায়গার কাছে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে যারা কাশছিল আর নড়াচড়া করছিল তাদের ঈশ্বরের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলে। তাঁর হাতা ছাড়া সাদা কি লাল কি সবুজ আংরাখায় সাদা রোব চাপানো, সেই তরুণ হয়তো বুঝতে পারে সেই সব মানুষদের উপস্থিতি যাদের সে জগতের স্রষ্টা হিসেবে ধরে নেবে আর একই সঙ্গে বন্ধু হিসেবেও আর অগণিত জীবের মধ্যে যারা তাঁর কাছে আসবে তাদের কাছে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে প্রতিপন্ন হবে কিন্তু বিশেষ ভাবে তাদের কাছে যারা আগে এই চার্চের প্রিস্ট ছিল যারা ঈশ্বরের পুত্রের চার্চ স্থাপন করেছিল। এই প্রতিবেদনের আগের অনুচ্ছেদগুলো থেকে এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, আমি ভীষণ ভাবেই জানতে চাই সেই তরুণ সে মুহূর্তে কী ভাবছিল। আমি পরে উল্লেখ করতে চাইব যে, সেই প্রাক্তন প্রিস্ট ও ছোটোগল্পকারের একটা আত্মজীবনী তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছিল। মৃত্যুর পরে প্রকাশিত সেই বইটি অনেক খোলাখুলি সহজাত ভাবে লেখা, কিন্তু তাঁর কোথাও লেখক তাঁর ধর্মীয় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখেননি, যেটাতে তাঁর মতো লোকের ক্ষেত্রে আমার সর্বাধিক আগ্রহ। 

আমি আগের দুটো বাক্যে খানিক বিচ্যুত হয়েছি। আমি সেই তরুণ প্রিস্ট আর সেই ছোটোগল্পকারের আগ্রহের বিরাট পার্থক্য নিয়ে মন্তব্য করতে চেয়েছি, একজন সর্বক্ষণ সচেতন ঈশ্বরের উপস্থিতি আর আরেকজন তাঁর তারুণ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে অদ্ভুত হাস্যরস সৃষ্টি করতে চেয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, সেই কল্পিত অস্তিত্ব বা উপস্থিত লোকদের কথা, তাদের কী হল যারা সেই তরুণের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। আমি ঠিক লেখককে বিচার করতে চাইছি না বরং অবাক হচ্ছি যে সেই শক্তিশালী কল্পনাটা এইভাবে কেমন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। 

এমনকি আমার এক সময়ের সহকর্মী, সেই প্রাক্তন প্রিস্ট, তাঁর কাহিনি লিখছিল, একজন লোক যে তাকে আগে খুব সম্মান করত বা বা তাকে ভয় পেত সে হয়ত খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে প্রথমেই পড়ল যে একজন প্রিস্টকে অপরাধী বলে শনাক্ত করা হয়েছে চার্চের জিনিস রাখার ঘরে পবিত্র অল্টার ওয়াইন বোতলে পেচ্ছাপ করার থেকেও গুরুতর অপরাধে। যারা এই খবর পড়বে তাদের মধ্যে কতজন এক মুহূর্তেই বা কিছুক্ষণ পরে সিদ্ধান্ত নেবে যে তাঁরা আর বেশ কিছু মানুষ বা স্থান বা জিনিসকে আগে যেমন পবিত্র বলে মনে করত তেমন আর কখনও করবে না। আমি একবার এমন একজনের থেকে শুনেছিলাম, এক মহিলা যিনি প্রতি রবিবার চার্চে যেতেন যতদিন না এমন কাণ্ড শুনেছিলেন – সে কথা নিচে বলছি। 

সে মহিলা এক মনোরোগ চিকিৎসকের সেক্রেটারি আর রিসেপশনিস্টের কাজ করতেন। একদিন তার নিয়োগকর্তা তাকে নিজের কম্পিউটারে এক তরুণীর একটি বিস্তৃত বক্তব্য টাইপ করতে বললেন স্থানীয় বিশপের থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি করেন। আমার কাছে যা খবর তাতে সেই মহিলা মধ্যবয়স্কা, বিবাহিতা, এবং সন্তানের মা, কিন্তু তার নিয়োগকর্তা তাকে বলেছে যে যদি সে মনে করে বিষয়টা খুব পীড়াদায়ক তাহলে সে টাইপ নাও করতে পারে। মহিলা আমায় বলেছেন সে সেটা খুবই কষ্টদায়ক তবু তিনি পুরোটাই টাইপ করেছেন। তিনি আমাকে ওই বিবৃতি সম্পর্কে যা বলেছেন – তাতে ওই মহিলার শৈশবে দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রিস্টের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। মহিলা আমাকে এটা বলেছেন একটা ঘোড়দৌড়ের মিটে, অনেক রাতে একটা হোটেলের ভরা লাউঞ্জ বারে মদ খেতে খেতে, যেখানে সে আর তার স্বামী ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমি এবং আরও অনেক দম্পতি ছিল। আমি ঠিক নিশ্চিত নই, যে সেই মহিলার বোনকেও যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল বা সেখানে একাধিক প্রিস্ট জড়িত ছিল, আমি ঠিক শুনিনি। যদিও মহিলাটি বিষয়টি সম্পর্কে টাইপ করার সময়ে বা তার পরেও অনেক মাস ধরে ভেবেছেন, তবু তিনি নিয়ম করে আগের মতো প্রতি রবিবার চার্চে যেতেন। তিনি তাদের পারিবারিক বন্ধু এক প্রবীণার পারলৌকিক কাজেও চার্চে গেছিলেন। সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছিল যাকে বলে কন্সেলেব্রেটেড মাস, তাতে তিনজন প্রিস্ট একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। এই ধরণের অনুষ্ঠান প্রিস্টদের জন্যেও সম্মানের, তাদের নিকটাত্মীয়দের জন্যে, বা একজন সাধারম মানুষ যিনি এমন একটি অনুষ্ঠানে বা অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন সেবা করে আসছেন, যেমন আমাকে যে খবর দিয়েছে তার এক বয়স্ক বন্ধু করেছেন। এই ধরনের অনুষ্ঠানের সময়ে অনেক বার প্রিস্টেরা একসঙ্গে ঈশ্বরের বেদীকে বাও করে বা নিজেদের বাও করে। অনুষ্ঠানের এক সময়ে, তাঁরা কখনও বেদীর দিকে কখনও নিজেদের দিকে পিতলের ধুনুচি দোলায় আর তার থেকে ধূপের ধোঁয়া ওঠে। মহিলা আমায় শান্ত ভাবে সেই হই হট্টগোলে ভরা লাউঞ্জ বারে বলেছিলেন সেই কন্সেলেব্রেটেড সার্ভিস যত এগচ্ছিল তিনি ক্রমাগত তত কষ্ট পাচ্ছিলেন, তারপর একটা সময় এল যখন তিনি তার আসন থেকে উঠে চার্চ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে প্রধান সেলিব্রেন্ট বেদীতে বাও করছিল। তার সহযোগীরা যারা তার দুদিকে তাদের মালার মধ্যে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিল তারাও সামান্য নিচু হয়ে বাও করছিল আর কৌতূহলী দেখছিল যে মূল সেলিব্রেন্ট প্রিস্ট বেদীর সাদা কাপড়ে চুমু করছেন। এই কন্সেলেব্রেটেড মাস হয়েছিল বেশ কয়েকমাস আগে, মহিলা আমায় বলেছিলেন। তিনি তারপর থেকে আর কোনও চার্চে পা রাখেননি, আর কখনও রাখতেও চান না। 

আমি প্রথম এই কাহিনিটা শোনার পর থেকে কতবার তার সেই লক্ষণীয় মানসিক অবস্থাকে প্রশংসা করতে চেয়েছি যেটা তার প্রিস্টের আনুষ্ঠানিক অঙ্গভঙ্গি চলে আসার সময়ে তাকে অনুসরণ করছিল? কেবল আমার যদি সেই রসবোধ থাকত, যে ওই মহিলাকে সেইদিন সন্ধেবেলা লাউঞ্জ বারে জিজ্ঞেস করতাম, নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আজীবন এক কল্পিত যোগে তাঁর ঠিক কী হল, কী পেলেন তিনি, তখন কি আমি নিজেই একটা আভাস পেতাম ওই চার্চের লম্বা জানলার কাচগুলো থেকে রঙ গড়িয়ে যাওয়ার, যেখানে তিনি ছোটবেলায় প্রার্থনা করতেন? যারা পবিত্র হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল সেই পুরুষদের গা থেকে কি সেই পোশাক খুলে নেওয়া হল? তার মনের যে অঞ্চলে থেকে তার প্রিয় ভালোবাসার পরিত্রাতার মূর্তি সরিয়ে দেওয়ার হল সেখানে কি পৌরাণিক কাহিনি বা কিংবদন্তিগুলো ফুটে উঠেছে? 

-----------------------------------------------------------
Gerald Murnane was born in Melbourne in 1939. He has been a primary teacher, an editor and a university lecturer. His debut novel, Tamarisk Row (1974), was followed by nine other works of fiction, including The Plains now available as a Text Classic, and most recently A Million Windows. In 1999 Murnane won the Patrick White Award and in 2009 he won the Melbourne Prize for Literature. His 'Memoir of the Turf', Something for the Pain, was published to great acclaim in 2016. Gerald Murnane lives in western Victoria.
---------------------------------------------------------
দ্যা প্যারিস রিভিউ।। সংখ্যা ২১৭। গ্রীষ্ম, ২০১৬। 
অনুবাদ – কণিষ্ক ভট্টাচার্য 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন