রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

২০১৮ সালে মাসুদা ভাট্টি'র লেখা সেরা গল্প : মানুষ মারার বিল

গল্পপাঠ--
গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন: 
মাসুদা ভাট্টি--
২০১৮ সালের মে মাসে, যুক্তরাজ্যের কেন্ট-এ বসে লিখেছি।
সাধারণত কোনো ক্যাফেতে বসে লিখি, এই গল্পটি লিখছিলাম চ্যাটহ্যাম ডক-এর একটি ক্যাফেতে বসে।


গল্পপাঠ--
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন? 
মাসুদা ভাট্টি--
এই গল্পের বীজ আমার শেকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, আমার জন্মস্থান বিলমগ্ন এক গ্রাম, গ্রামের মানুষেরা, তাদের জীবন, ঋতুবদল – আমাকে এতোটাই জড়িয়ে আছে যে, আমি আমার ‘আর্বান’ জীবনের গল্প নিয়ে তেমন কিছুই লিখিনি এখনও, এখনও আমি সেই গ্রামেই পড়ে আছি, আমার ফেলে আসা গ্রাম, নতুন ‘উন্নত’ গ্রাম নয়।

গল্পপাঠ-- 
এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন?
মাসুদা ভাট্টি--
কারণ এই বীজ এখনও পুরোপুরি ফলেনি আমার লেখায়, মনে হচ্ছে এখনও ধনিয়ার মতো ভেজানো হয়েছে মাত্র, দু’এক দিনের মধ্যেই বোনা হবে, কিংবা ইরি ধানের মতো, মাটির ‘ছাবনায়’ খেঁজুর গাছের ‘ছোবা’ দিয়ে ‘জাঁক’ দেওয়া হয়েছে, শেকড় গজালেই বীজতলায় ছড়ানো হবে; যে বীজ এখনও শেকড় ছাড়েনি, তাকে নিয়ে না লিখলে কী করে বেঁচে থাকবো, বলুন?

গল্পপাঠ--
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন?
মাসুদা ভাট্টি--
আমি গল্প একটানেই লিখি সাধারণতঃ। ফেলে রাখা গল্পে ফিরে গিয়ে খুব কমই শেষ করা হয়েছে, পড়ে আছে সেগুলো, বহু পাতা জুড়ে, শেষ কবে হবে জানা নেই। কাটাকুটিও করি না, আসলে পড়া হয় না ফের। লিখে ফেলা গল্পের প্রতি মায়া নেই বলেই এরকম অবহেলা।

গল্পপাঠ--
 লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে?
মাসুদা ভাট্টি--
গল্পটিতো ভেতরেই তৈরি হয়ে ছিল, শব্দ সাজিয়ে বাক্য হয়ে বেরিয়েছে মাত্র, এর বেশি কিছু নয়, তাই মূল পাল্টায়নি।

গল্পপাঠ--
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন?
মাসুদা ভাট্টি--
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেমনটি হয়, লেখার পর গল্পের প্রথম পাঠক হন আমার সঙ্গী/স্বামী ভদ্রলোক, ইসমেত মোর্শেদ। এই গল্পটিও তিনিই প্রথম পাঠ করেন, তারপর বন্ধু শুচি করিম, কখনও প্রিয়জন নবনীতা চৌধুরী।

গল্পপাঠ--
লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন?
মাসুদা ভাট্টি--
লেখার পর পর পড়িনি, প্রকাশিত হওয়ার পর পড়েছি, তখন আর মনে ছিল না যে, এর বেশি কিছু লিখতে চেয়েছিলাম কি না, আসলে রাহেলা, ইদ্রিস, আলেকজান সবই জীবিত ও জীবন্ত চরিত্র, আমার চারপাশে সারাক্ষণ তাদের আনাগোনা, তাদের নিয়ে আরো বহু গল্প বলা বাকি। তাই গল্পের শেষ নেই, শেষ হবেও না।

মানুষমরার বিল 
মাসুদা ভাট্টি 

পুরুষ মানুষের কান্না দেখা যায় না, তাও আবার হামলে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে একটা শক্ত-সমর্থ যুবা পুরুষ যখন কাঁদে তখন গ্রাম্য নারীদের বুকটা ভেঙে যেতে থাকে আর গ্রামের পুরুষদের কেউ কেউ এগিয়ে এসে ইদ্রিসকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

ঃ ও ইদ্রিস কী হইছে বাজান? কওদি কী হইছে তুমার? কানবার লাগছো ক্যান এইরম আছাড়ি-পিছাড়ি দিয়া?

ইদ্রিস কথা বলে না। হাহাকার করে কাঁদে। গোবর লেপা উঠোন কিন্তু তারপরও বালি-মাটি উঠে আছে জায়গায় জায়গায়, ইদ্রিসের গড়াগড়িতে শরীরে মাটি-ধুলো মেখে যাচ্ছে, সেদিকে তার হুঁশ নেই বোঝা যায়। উপস্থিত নারীগণ ফিসফাস করে কথা বলে, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। পোয়াতি না হয়েও কেউ কেউ ইদ্রিসের কান্নার জায়গা থেকে হাত খানেক দূরে এক দলা থুতু ফেলে, যেনো অনেকক্ষণ এই থুতু তার মুখেই জমানো ছিল।

গরুর ঘরটা উঠোনের এক কোণায়। সারাদিন ইদ্রিস ওই ঘরেই কাটায়। ছয়টি গরুর দেখভাল করতে হয় ওকে। এর মধ্যে তিনটি আবার হালের বলদ। বিঘা চল্লিশেক জমির মালিক এই গৃহস্থ। ইদ্রিস এই বাড়ির গরুর রাখাল। তখনও এদেশে পাওয়ার ট্রিলার আসেনি, গরুই একমাত্র ভরসা। ইদ্রিসের হাতে গরুগুলো যতœ-আত্তিতে একেবারে ফুলবাবু সেজে থাকে সব সময়। সবাই ইদ্রিসের এই গো-সেবায় মুগ্ধ। ইদ্রিসের চাহিদা কম। সারাদিন গরুগুলি নিয়ে পড়ে থাকে। যেদিন বড় দু’টি চাষে যায় বাকিগুলোকে নিয়ে বিলে চলে যায় ঘাস খাওয়াতে। তখনও ফাঁকা জায়গা ছিল গরু চরানোর। এখন আর নেই। ইদ্রিস গরু ছেড়ে দিয়ে খেতের আল থেকে বাক্্সা ঘাস কাটে, লকলকিয়ে ওঠা মালঞ্চ কাটে, তারপর কষে আঁটি বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসে। দু’টো গাই, পালা করে গৃহস্থকে দুধ দেয়। এখন একটি গাভীন, আরেকটি দুধ দিচ্ছে, বাছুরটা এখনও দুধ ছাড়েনি, তাই তাকে বাড়িতেই রেখে আসে ইদ্রিস।

চারদিকে ইদ্রিসের কোমর সমান লম্বা পাট। ইদ্রিস সাধারণ যুবকের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা। চকচকে পাটের চারাগুলি কী সুন্দর বাতাসে দোলে। পাট আরেকটু বড় হলেই আর কাউকে তার ভেতর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইদ্রিস যে উঠোনে এখন গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে সেই উঠোন থেকে যে কোনো দিকেই তাকানো যাক না কেন, মানুষের মাথা ছাড়ানো পাট ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। এই পাটক্ষেতকে কেন্দ্র করে ইদ্রিসের জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। তার সঙ্গে এই কান্নার সম্পর্ক আছে কিনা সেটা আমরা এখনও জানি না।

প্রত্যেকেই ইদ্রিসকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে কিন্তু কেউই ইদ্রিসের কান্নার কোনো উত্তর পাচ্ছে না। মানুষ বেশিক্ষণ প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ইদ্রিসকে ওরকম কান্নারত অবস্থায় ফেলে কেউ কেউ উঠোন ত্যাগ করে। ইদ্রিস তখনও ওর চোখে পড়ার মতো সুঠাম শরীরটা নিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি করে। এরমধ্যে একজন এসে জিজ্ঞেস করে, “কী রে তোর কেউ মরছে টরছেনি? এমুন কইরা কানবার লাগছিস ক্যান?”

ঃ মরবি আবার কিডা? কেউ আছেনি ওর? -- উপস্থিত অন্য একজন ভিড়ের ভেতর থেকেই উত্তর দেয়।

ঃ ক্যান, সৎ মাডা তো আছে। বাপ-ভাই নয় মরছে, মারেতো সেই গ্যাদাকালেই খাইছে, সৎ মাডা আছে কি মরছে কেউ কবার পারো তুমরা?

এরপর উপস্থিত সকলেই ইদ্রিসের সৎ মা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। পাশের গ্রামেই ইদ্রিসের বাড়ি, তাই তার ইতিহাস কারো কাছে খুউব অজানা নয়। কিন্তু ইদ্রিসের সৎ মা চলে গিয়েছিলেন ওর বাবার মৃত্যু পরেই। ইদ্রিসকে জন্ম দেওয়ার কিছুদিন পরেই ওর মা কলেরা হয়ে মারা যায়। সে সময় গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো কলেরায়। ইদ্রিসের মা-ও এরকমই এক কলেরার সময়ে চলে যায়। ইতিহাস ইদ্রিসের মা সম্পর্কে এর বেশি কিছু আমাদের জানায় না। ইদ্রিসের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আনে দূরের কোনো গ্রাম থেকে। ইদ্রিস তার বাপের বিয়ে খেয়েছে বলে ছোটবেলায় মানুষ ওকে খেপাতো। বাপের কাঁধে চড়েই গিয়েছিল ইদ্রিস বিয়েতে। ফিরে আসার সময় ওর বাবা হেঁটে এসে ছেলেকে নতুন বউয়ের সঙ্গে পাল্কিতে চড়িয়ে এনেছিলেন। বাড়িতে নতুন বউ এনে সবার সামনেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ইদ্রিস তার একমাত্র ছেলে, চোখের মণি। ওর যদি কোনো রকম কষ্ট হয়, অযতœ হয় তাহলে নতুন বউয়ের এ বাড়িতে ভাত জুটবে না। ছেলের জন্যই যখন বিয়ে করা তখন ছেলেকে না দেখলে বিয়ের আর কোনো প্রয়োজনই থাকে না। নতুন বউ দেখতে আসা সকলেই একথা জেনে গিয়েছিল যে, ইদ্রিসের বাবা বিয়ে করে অন্ততঃ ভেড়া হয়ে যাবে না। আসলেও নতুন বউটি এসে ইদ্রিসকে একেবারে নিজের মায়ের মতোই ভালোবাসতে শুরু করেছিল। বছর না ঘুরতেই তারও যখন সন্তান হলো তখনও ইদ্রিসের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। ইদ্রিস বাড়ির বড় ছেলে, এই সত্য জেনেই ইদ্রিস বড় হচ্ছিলো। কিন্তু ছোট ছেলের হলো উদুরি, লোকে বলে উকুন খেয়ে ফেললে নাকি উদুরি হয়। কে জানে, তখন কি আর এতোসব মানুষ জানতো? এতো ডাক্তারওতো ছিল না সে সময়। ইদ্রিসের বাবা নানা জায়গায় ঘুরেও যখন ছেলেকে ভালো করতে পারছিলো না তখন একদিন ভোর রাতে উঠে ছেলেকে নিয়ে রওয়ানা দিলো থানা-শহরের দিকে। ওইখানে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই উদ্দেশ্য।

ঘোর বর্ষাকাল। বাড়ির সামনের বিল থেকে বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে গ্রামের জঙ্ঘা বরাবর। আরেকটু হলেও উঠোন পেরিয়ে ঘরের দোরে পানি চলে আসবে। এখানকার মানুষ এতে অভ্যস্ত। চারদিকে পানি থৈ থৈ না করলে তাকে এখানকার মানুষ বর্ষা বলেই মানে না। বিল থেকে ঢেউ এসে কত্্কত্্ করে গ্রামের জঙ্ঘায় লাগবে, মাটি খসে খসে পড়বে, দূর দূর থেকে ঘাসি-নাও, এক-মাল্লায়া দো-মাল্লায়া নাও যাত্রী সহ আশ্রয়ের জন্য গ্রামের কোনো বাড়িতে এসে উঠবে বাতাসের বেগ না থামা পর্যন্ত পান-তামাক খাবে, দূর-দূরান্তের কিছু খবরাখবর জানা না গেলে সেই বর্ষা আবার বর্ষা নাকি? ছেলের অসুখ নাহলে এরকম পাহাড়ের মতোন ঢেউ ওঠার দিনে কেউ নৌকা ছাড়ে না। মাঝিকে খুউব বুঝিয়ে বলে দিয়েছিল ইদ্রিসের বাবা যেনো গ্রামের কিনার ধরে ধরে নদীর দিকে আগায়। যাতে বিপদ-আপদ হলে গ্রামের কোনো বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া যায়। কিন্তু এই ঢেউ ডিঙিয়ে নৌকো খুউব সহজে কিনার ধরে এগুনো সম্ভব নয়। ছেলে কোলে নিয়ে ছইয়ের ভেতর বসা ইদ্রিসের বাবা বুঝতেই পারেনি কখন তারা বিলের ঠিক মাঝ বরাবর চলে এসেছে, নৌকোটা তখন নদীর মুখে, দু’পাশে গ্রাম বেশ দূরে দূরে। এদিক দিয়েই যেতে হতো, যাওয়ার আর কোনো পথও নেই। মাঝিও কাঁচা ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের ফেরই হবে নাহলে এই পথ দিয়ে হাজার বার যাওয়ার পরও কী করে মাঝির হাত থেকে বৈঠা পড়ে যাবে আর পানির পাকের ভেতর নৌকো পড়ে সোজা ঢুকে যাবে গহীন জলে? খালেক মাঝি কোনো মতে প্রাণ নিয়ে পাশের গ্রামে উঠতে পেরেছিল কিন্তু ইদ্রিসের বাবা আর সৎ ভাই’র কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তিন দিন পর্যন্ত। ঢেউ থামার পর কুবেরখালি গ্রামের পাশে বাপ আর ছেলের জড়াজড়ি করা লাশ এসে ঠেকেছিল, ফুলে ওঠা বিকৃত লাশ। এরকমতো প্রায়ই এই অঞ্চলের মানুষ দেখে, বর্ষাকালে। তাই সে গ্রামের মানুষ আশ্চর্য হয়নি খুউব আর সেটাতো জানাই ছিল যে, ইদ্রিসের বাবা তার অসুস্থ ছেলেটা সহ নিখোঁজ ছিল। বাপ-ছেলের লাশ এনে মাটি দেওয়ার মতো জায়গা ছিল না। গোরস্তানেও একটু মাটি খুঁদলেই পানি উঠে যাচ্ছিলো। তাই অল্প-মাটি খুঁড়েই বাপ-বেটাকে এক কবরে রাখা হয়েছিল। এও এখানকার মানুষের বর্ষাকালের দস্তুর।

ইদ্রিসের সৎ মা একই সঙ্গে স্বামী আর সন্তানকে হারিয়ে মাথাটা ঠিক রাখতে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যেই তার ভেতর চরম পাগলামি দেখা দিলে তার ভাই-বেরাদরদের খবর দেওয়া হয়। তারাই এসে তাকে নিয়ে যায়। ইদ্রিস তখনও মাত্র বছর চারেকের ছেলেমানুষ, তাকে দেখবে-শুনবে কে? এই গৃহস্থ বাড়িতেই ইদ্রিসকে নিয়ে আসে এই বাড়ির মেজ বউ। তার তখনও সন্তানাদি নেই, পরে অবশ্য হয়েছে। ইদ্রিস তখন থেকেই এ বাড়িতে বড় হয়ে এখন পরিপূর্ণ যুবক। একটাই সমস্যা, ইদ্রিস কারো সঙ্গেই কথা বলে না। ও কথা বলতে পারে কিনা সেটাই জানা যায় না। প্রায়ই নানা জনে ইদ্রিসকে দিয়ে কথা বলানোর চেষ্টা করে। তারা ব্যর্থ হয়, বড় জোর ইদ্রিস এক চিলতে হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে, সামনের ব্যক্তি যা বলেছে সেটা সে বুঝতে পেরেছে। এই যে ইদ্রিসকে হাহাকার করে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে, তাতে অনেকেই একথা ভাবছেন যে, ইদ্রিস হয়তো এবার কথা বলবে। শব্দ করে কাঁদতে পারলে কথা কেন বলতে পারবে না? কিন্তু কেউই ইদ্রিসের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করতে পারলেন না। ইদ্রিস অনেক্ষণ গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলো, তারপর এই বাড়ির মেজ বউ খবর পেয়ে বেরিয়ে এসে ইদ্রিসকে তুলে নিয়ে গেল। তারও বয়স হয়েছে, কিন্তু ইদ্রিসকে এমন ভাবে সে তুলে নিয়ে গেলো যেনো, এই যে পেটানো স্বাস্থ্যবান যুবক ইদ্রিস একটি শিশু মাত্র। সেদিনের মতো ইদ্রিসের কান্না থেমেছিল।


দুই.

রাহেলা নামে যে মেয়েটির কথা গ্রামের সকলে এরকরম জানে, আমরা তাকে একটু ভিন্নভাবে চিনি। গ্রামের সকলেই জানে যে, বিধবা ময়না বুড়ির তিন মেয়ে এক ছেলের মধ্যে রাহেলা মেজ। দেখতে রাহেলা কালো, কঠিন মুখশ্রীর একটি মেয়ে। ময়না বুড়ির বড় মেয়ে সাকেলা আর ছোট মেয়ে রুইতনের বিয়ে হয়ে গেলেও রাহেলার বিয়ে হলো না। কেন হলো না সে কারণ গ্রামের মানুষ জানে, তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে রাহেলাকে দেখতে আসা কোনো পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দেয়। গ্রামে একবার আমিনক্যাম্প বসেছিল। সরকারী আমিন এসে গ্রামের জমি মাপজোক করেছিল। শীতকাল ছিল সেটা। গ্রামের পাশেই ক্যাম্প, রাহেলাও তখন ছোট। গল্পের অনেক ডালাপালা থেকে এখনও কানাঘুষায় যেটুকু বোঝা যায় তাহলো রাহেলাকে সেই ক্যাম্পের কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করেছিল। শিশু রাহেলার নিম্নাঙ্গ দিয়ে ঝোলার মতো কিছু একটা বেরিয়ে এসেছিল বলেও কেউ কেউ দেখেছে বলে দাবী করে। রাতারাতি সে আমিনক্যাম্প গায়েব হয়ে গিয়েছিল আর গ্রামের লোকজন রাহেলাকে জেলা শহরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে রাহেলা বেঁচে ফিরে আসলেও ‘ফলের থইল্যা’ অর্থাৎ রাহেলার ওভারি নাকি ডাক্তার ফেলে দিয়েছিল। এই তথ্য গ্রামের সকলেই জানে, সুতরাং আশেপাশের গ্রামের কেউ তো রাহেলাকে বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না, আর কেউ যদি দূরের কোনো গ্রাম থেকে বিয়ে করতেও আসতো, গ্রামের লোকেরাই তাকে বাড়িতে ডেকে এনে পান-তামাক খাইয়ে খবরটা দিয়ে দিতো। এমন নয় যে, রাহেলারা তাদের শত্রু কিন্তু গ্রামের নিয়মই এরকম। কোনো খবর জানা থাকলে সেটা পেটের ভেতর চেপে রাখার নিয়ম নেই, সেটা ছড়াতেই হবে, তাতে যদি কারো উপকার হয়তো ভালো কথা, নাহলেও ব্যাপার না।

রাহেলা এখন বয়স্থা নারী। কিন্তু তার প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। সে সকলের অগোচরে গ্রামময় ঘুরে বেড়ায়। পাটের দিনে বস্তা ভরে পাটের পাতা তোলে ওর পোষ্য তিন/চারটি ছাগলের জন্য। আর বছরের অন্য সময় ঘাস কাটে, কচু-ঘেুচু খুঁজে বেড়ায় আর মানুষের ক্ষেত্রে শর্ষে-ধনে-কালোজিরে-রান্ধুনি-তিল পাকলে সেগুলি তুলে দিয়ে তিনভাগের এক ভাগ বুঝে নেয়। যতোটুকু ফসল ও তুলতে পারবে সেটা তিনভাগ করে এক ভাবে যতোটুকু পাওয়া যায় তা দিয়ে ওর আর ময়না বুড়ির ভালোই চলে যায়। ভাইটা বড় হয়ে বিয়ে করেছে কিন্তু মা-বোনকে ভিন্ন করে দিয়েছে, এদিকে তাকায়ও না তারা। রাহেলারও তা নিয়ে আপত্তি নেই কোনো। “যার যার জেবন তার তার” -- রাহেলা কথায় কথায় এই বাক্যটি বলে। শিশুকালে ওর সঙ্গে কী ঘটনা ঘটেছিল তা মাথায় রেখে ওর কোনো লাভ নেই, বেঁচে থাকতে হলে ওকে ওর জীবনটা নিজেকেই চালাতে হবে সে সত্য রাহেলা একটু বড় হতেই বুঝেছিল। ভাগ্যিস ওর কারণে ওর বোন দু’টোর বিয়ে বন্ধ হয়নি সেটা ওকে বেশ আনন্দ দেয়। অবশ্য তারা দেখতে-শুনতে খুউব সুন্দর। ময়না বুড়ি এই বৃদ্ধকালেও দেখতে ঋজু আর কাটা কাটা চেহারার। রাহেলা ময়না বুড়ির একহাড়া ঋজু গঠন পেয়েছে ঠিকই কিন্তু গায়ের রঙটা ওর ঘোর কালো। আর সারাদিন আদারে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে রাহেলার চেহারায় একটা কাঠিন্য এসেছে, যা ওকে এখন আর সোমত্থ যুবতী বলে প্রমাণ করে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাহেলার আয়না নেই। ও নিজের চেহারা কেমন সেটা জানে না। সে সময় গ্রাম থেকে একে একে নিজের চেহারা নারীরা বিদায় নিচ্ছিলো। ময়না বুড়িও হয়তো কোনোদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখেনি, কিন্তু রাহেলার সমবয়েসীরা আয়না দেখতে শিখেছিল বটে, রাহেলার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি, কেন হয়নি সেটা ইতিহাস নয়, ঘোর বাস্তবতা।

ময়না বুড়ি মারা যাওয়ার পর, রাহেলা যখন একেবারে একা হয়ে পড়লো তখন রাহেলার প্রতি কারো আগ্রহ না থাকাটা এক ধরনের শাপেবর হয়েছিল ওর জন্য। কোনো রকম ভয়-ভীতি ছাড়াই রাহেলা দিন নেই রাত নেই গ্রামের আশপাশ দিয়ে চলাফেরা করতে পারতো। “ফলের থইল্যা” না থাকাটা নারীকে নিরাপদ করে কিনা সে প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞজনেরা ভাববেন, আমরা দেখতে পাই যে, রাহেলার সম্পর্কে গ্রামের কোনো পুরুষই আগ্রহ দেখায়নি। বরং, বতরের সময় দিনচুক্তি কামলা পাওয়া না গেলে রাহেলাকেও তারা কাজ দিয়েছে গম তোলার জন্য, ধান বা পাট কাটার জন্য, জাগ দেওয়া পাট তুলে আঁশ ছাড়ানো ধোয়া বা শুকোনোর কাজও রাহেলা হাতে হাতে করে ফেলতে পারে। এই ভয়ঙ্কর ঢেউ ওঠা মানুষ মারার বিলেও রাহেলা নৌকো সোজা রাখতে পারে, তাতে রাহেলার “ফলের থইল্যা” না থাকাটা বরং কাজেই এসেছিল। এ কারণেই হয়তো কেউ কোনোদিন রাহেলার বুকের দিকেও তাকাতো না।

সেই রাহেলাই কী করে যেনো ঘাস বা কচুরি কাটতে কাটতে ইদ্রিসের সঙ্গে ভাব করে ফেললো। ইদ্রিস কথা বলতো না, রাহেলাই শুধু কথা বলতো। কেউ ওদের কখনও একসঙ্গে দেখেনি। কারণ ওদের দ্যাখাই হতো শুকনোর দিনে বিলের একেবারে মাঝখানে যেখানে ঘাস কাটতেও কেউ যেতোটেতো না বড়বেশি, সেখানে। কিংবা বর্ষাকালে বিলের মাঝে নাগ জাগিয়ে থাকা ডাকাতের ভিটেতে। শোনা যায় ওই সব ভিটেতে ডাকাতরা বর্ষাকালে এসে ডেরা বাঁধতো আর আশেপাশের গ্রামে গিয়ে ডাকাতি করতো। সেই সব ভিটে থেকে লতা ছিঁড়তে যেতো ইদ্রিস নৌকো নিয়ে আর রাহেলা যেতো তালগাছ মাঝামাঝি ফেড়ে বানানো ডোঙ্গা নিয়ে। নৌকো নিয়েই যে বিলে কেউ নামার সাহস করে না সেখানে একটা ডোঙা বেয়ে বিলের মাঝে ডাকাতের ভিটেতে লতা কাটতে যাওয়ার কথা রাহেলা ছাড়া আর কেউ ভাবতেও পারতো না। এরকমই কোনো এক বর্ষায় রাহেলা আর ইদ্রিস এক ডাকাতের ভিটেতে রহস্যময় সময় পার করেছিল এক দুপুরে। বৃষ্টি পড়ছিলো ঝমঝমিয়ে বিলের জলের ওপর। জলের ভেতর পোতা বাঁশের যেটুকু বেরিয়ে ছিল সেটুকুতে একাধিক পানকৌড়ি চোখ বন্ধ করে বসেছিল। বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিলো কয়েকদিন ধরে। গরু-ছাগলের জন্য ঘাসতো প্রয়োজন। ওরা সে কারণেই এই ভিটেতে এসেছিল। কিন্তু ভিটেয় এসে মনে হয়েছিল এখান থেকে বেঁচে ফিরে যাওয়া যাবে তো? সাপে কিলবিল করছিলো ভিটে। চারদিকে পানি, সাপগুলোই বা কী করবে? তবুও ওরা সাহস করে নৌকো আর ডোঙা থেকে নেমে লতা কাটছিলো। পায়ের কাছ দিয়ে সাপ চলে গিয়েছিল রাহেলার। ভয় পাওয়ার মানুষ নয় সে। তবুও সিরসির করে উঠেছিল গা। সাপেদেরও ভয় আছে, তারাও মানুষের সাড়া পেয়ে সরে গিয়েছিল সেখান থেকে।

ইদ্রিস কথা বলে না, সেটা সবাই জানে। রাহেলাও জানতো। কিন্তু ইদ্রিস কথা বোঝে। সেকথাও সবাই জানে। রাহেলা ইদ্রিসকে কাছে পেয়ে বলছিলো, “ইদ্রিস ভাই বিয়া টিয়া করবা না?”

ইদ্রিস হাসে। উত্তর দেয় না, হয়তো দিতেও পারে না। রাহেলা বলে, “হাসো ক্যান? তোমার বিয়ার হলদি আমি কুটবানে, ধান-দুবলাও জুগাড় কইরা দিবানে”। বোঝাই যায়, ওদের মধ্যে ধানক্ষেতে, পাটক্ষেতে আলোচনা হয়, দু’জনেই বেশ স্বচ্ছন্দ আলোচনায়। ইদ্রিস আবারও হাসে।

এইবার রাহেলা ইদ্রিসের হাতের ফুলে ওঠা শক্ত পেশীটায় হাত রেখে বলে, “হাইসো নাতো খালি। এতো হাসো ক্যান? কিছু কবার পারো না?”

ইদ্রিস তবু কথা বলে না, কিন্তু রাহেলা ওর শরীরে হাত রাখার পর ইদ্রিসের ভেতর অদ্ভ’ত এক পরিবর্তন দেখা যায়। দু’জনেই দেখতে পায় সেটা, ইদ্রিস নিজেও। রাহেলা দেখে ইদ্রিসের পেশীগুলি আরো শক্ত হয়ে গেলো চোখের পলকে। যেনো ইদ্রিস নিমিষে টান করে ফেললো পেশীগুলি। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি তখনও পড়ছে। কিন্তু গুমোটও আছে। ঘাম চকচক করছে ইদ্রিসের উদোম শরীর। রাহেলার পরনে পুরোনো কাপড়। বুকের কাছে জড়ো করা কাপড়। গ্রামের মেয়েরা জানে, ব্লাউজ ছাড়া থেকেও তারা বুক ঢেকে রাখতে অভ্যস্ত। ইদ্রিস সেদিকে তাকিয়ে আছে দেখে রাহেলা হঠাৎই বুক থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলে। ইদ্রিস দেখতে পায় রাহেলার দড়া পাকানো কালো শরীরটার তুলনায় বুকটা একটু আলাদা। একটু ফোলানো মাংসের ওপর দু’টো বড় বড় শুকনো বরইয়ের মতো বোঁটা। ইদ্রিসের হাত নেমে আসে সহসা সেই বোঁটার ওপর। ইদ্রিসের হাতের পেশীর মতো রাহেলার বোঁটা দুটোও মুহূর্তে শক্ত হয়ে যায়। এর পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ সম্পর্কে ওদের জানা ছিল না, তবুও পৃথিবীর আদিম নরনারীর মতো ওরাও নিজেদেও মতো পথ করে নেয়। সে পথ যে এতো আনন্দের দু’জনের কারোরই জানা ছিল না। কিন্তু সেই আনন্দ দু’জনের কেউই আর কোনোদিন পায়নি এরপর। কারণ, তার পরদিন থেকে রাহেলাকে আর কেউ কোথাও দেখেনি। কেন দেখেনি সে রহস্য শুধু রাহেলাই জানে। আর কেউ জানে না। কিন্তু যেদিন পাড়ার সকলেই বলতে শুরু করলো যে, রাহেলা নাকি গ্রামে গরুর ওষুধ বিক্রি করতে আসা মোশাররফ গোয়ালের সঙ্গে পালিয়ে গেছে, সেদিনই আমরা ইদ্রিসকে দেখতে পেলাম উঠোনের মাটিতে ওরকম গগনবিদারি চিৎকার দিয়ে কাঁদতে। কেউই জানে না ইদ্রিস কেন এমন করে কাঁদলো। ইদ্রিস একাই জানে কী তার কারণ।

তিন.

ইদ্রিসের বয়স এখন পঞ্চাশ বা তার ওপরেই হবে, গ্রামের কে কার বয়সের হিসেব রাখে। গত ত্রিশ বছরে গ্রাম আর গ্রাম নেই। রাস্তা এসেছে বিলের মধ্য দিয়ে। যে বিলে ইদ্রিসের বাবা আর সৎ ভাই নৌকো ডুবে মারা গিয়েছিল সেই বিলে আর পানি হবে না নৌকো চলার মতো সেকথা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না তখন। কিন্তু এখনতো এটাই বাস্তবতা। বাড়ি পর্যন্ত ভ্যান আসে। ইদ্রিসের সংসার হয়েছে। ছেলেদের একজন থাকে মালয়েশিয়া, একজন বাড়িঘর দেখে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে ইদ্রিস। খেয়েপরে ভালোই আছে। বাপের ভিটেটা ছিল। আর যে বাড়ির মেজ বউ ওকে চার কি সাড়ে চার বছর বয়সে নিয়ে গিয়েছিল তারা তাকে জমিজমা দিয়েছে, গরুও দিয়েছিল দু’টো, যখন তারা হাল-হালটি ভেঙে দেয় তখন। ইদ্রিস সেই গরু থেকেই কয়েকটা গরু বানিয়েছিল। তার থেকে দু’টো বিক্রি করে এলাকায় প্রথম পাওয়ার ট্রিলার ইদ্রিসই কেনে, কিনে মানুষের ক্ষেত চষে বেড়াতো। তাতে আয় মোটামুটি মন্দ ছিল না। রাহেলার চলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইদ্রিসের বিয়ে দিয়েছিল সেই মেজ বউই উদ্যোগ নিয়ে। পাশের গ্রাম থেকে আলেকজান এসে ইদ্রিসের জীবনে নতুন বদল এনেছিল। কিন্তু ইদ্রিস নিজে থেকে এখনও পর্যন্ত কারো সঙ্গে কথা বলে না। ওর নিজেরই জানা নেই, ও কথা বলতে পারে কি পারে না। কিন্তু তাতে ওর কোনো অসুবিধে হয়নি, জীবনটাতো পারই করে দিয়েছে বলতে গেলে। আর বাকিই বা কতোটুকু? এইবার ছেলে ফিরে এলে ছেলেকে বিয়ে করাবে, আলেকজান বার বার তাগাদা দিচ্ছে ইদ্রিসকে।

মেজ ছেলে বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ইদ্রিসের বিশ্বাস হয় না এসব, কী করে কী হলো? এতো দ্রুত এই ভয়ঙ্কর বিল শুকিয়ে গেলো? এমন অনেক পরিবার ছিল যারা কেবল দিনের আলোতেই সব কাজ শেষ করতো, রাতে জ্বালানোর মতো কেরসিন কেনারও সামর্থ ছিল না, তারা এখন বিদ্যুতের বাত্তি ব্যবহার করবে। ইদ্রিস অবাক হয়, কিন্তু ওর চেহারায় সেই অবাক হওয়ার কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। এমনকি আলেকজানও ইদ্রিসের এসব অবাক হওয়া কিংবা দুঃখ পাওয়া, কোনোটিই ঠিক বুঝতে পারে বলে মনে হয় না। কিন্তু তাতে সন্তান উৎপাদন কিংবা তাদের বড় করে সংসার করে যাওয়ায় ওদের কোনো সমস্যা হয়নি। বরং আলেকজান মনে করে ভালোই হয়েছে, ওকে তো আর সব নারীর মতো গালাগাল কখনও শুনতে হয়নি স্বামীর কাছ থেকে।

এবার শীত পড়েছে জাঁকিয়ে। বিদেশ থেকে ছেলে কম্বল নিয়ে এসেছে, তাতে আরাম করে ঘুমোনো যায়। সকাল বেলা উঠোনের পাশে পাতা বাঁশের মাচায় বসে থাকে ইদ্রিস কাঁথা মুড়ি দিয়ে। রোদ না পড়লে মাচা থেকে নামে না সে। সেখানে বসেই পান্তা ভাত খায় পেঁয়াজ-মরিচ ডলে, একটু শর্ষের তেল ফেলে দিয়ে, কিংবা আগের দিনের বাসি তরকারি দিয়ে। ছেলেটা এসে কখনও বসে, কখনও চা থেকে হাটখোলার বাজারে চলে যায়। জীবন এখন ভিন্নরকম, ওদের সঙ্গে মেলে না। বাজার থেকে চা-নাস্তা খেয়ে ফিরে এসে ছেলে এটাসেটা গল্প করে। কোন্্ ক্ষেত্রে কতোটুকু কী বোনা হবে সেসব জানতে চায়। ইদ্রিসের এখন বেশ কয়েক বিঘা জমি, ছেলেরাই কিনেছে। পেঁয়াজের দানা দিয়েছে বিঘা খানেক জমিতে, শীত বেশি পড়ায় ছেলে ভয় পাচ্ছে চারা না ‘ডরাইয়া’ যায়? শীত বেশি পড়লে বেলা ওঠার আগ পর্যন্ত শিশির কখনও কখনও জমে বরফের মতো হয়ে যায়, তাতে পেঁয়াজের চারা আর বাড়ে না, একেই গ্রামে বলে ‘ডরাইয়া’ যাওয়া। এরকম পেঁয়াজের দানার ‘ডরাইয়া’ যাওয়া নিয়ে আলাপের ফাঁকে ইদ্রিসের ছেলে জানালো যে, “ইমারত কাকার বুইন ছিল একজন রাহেলা চিনতেননি আব্বা?”

ইদ্রিস প্রশ্ন নিয়ে তাকায় ছেলের দিকে। ছেলেরা অভ্যস্ত, ওরা জানে ইদ্রিস কথা বলবে না। কিন্তু সব কথা বুঝবে। ছেলে বলে, “ঢাকায় থাকতো বোলে। হে মইরা গ্যাছে। তার ছাওয়াল আইছে কাইল রাইতি। বড় বাইর সুমান বয়স প্রায়। গার্মেন্সে কাম করে। বাজারে আইছিলো”।

ঠিক সেই সময় সেখানে আলেকজানও উপস্থিত ছিল, বলে, “কী কইস তুই? রাহেলার ছাওয়াল কেমনে অবে, ওর তো” -- এটুকু বলেই থেমে যায় আলেকজান। ছেলের সামনে রাহেলা সম্পর্কে এর বেশি বলাটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারে না। ঠিক তখনই ইদ্রিস স্পষ্ট গলায় বলে, “একদিন আসফার কইসতো আমাগো বাড়ি, রাহেলার ছাওয়ালডারে”। ইদ্রিসের মুখ থেকে এরকম স্পষ্ট একটি বাক্য বের হওয়ায় মা-ছেলে দু’জনেই চমকে যায়। কিন্তু আনন্দও হয় ওদের, যদিও সেটা প্রকাশ করার আগেই ইদ্রিস মাচা থেকে নেমে যায়। যে কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে বসেছিল ইদ্রিস, সেটা রেখে যায় মাচার ওপর। বাড়ির সামনে তখনও জমি, গম আর শর্ষে বুনেছে লোকে। হনহন করে সেদিকে হাঁটতে থাকে। পায়ের তলায় শিশির মেশানো কেঁচোর তোলা মাটি চটকে যায়। ইদ্রিস হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। ইদ্রিসের মনে হয়, চারদিকের মাটি অনেক উঁচু হয়ে উঠেছে, একসময় এই বিল খুউব গভীর ছিল, ও তল পেতো না এখানকার জলের, এখন ওর কোমর সমান জলও হয় না এই বিলে। বাড়ির সামনে বিল থাকা খারাপ কি ভালো সে প্রশ্ন ওর মাথায় আসে, কিন্তু তার আগে ডাকাতের ভিটের দিকে চোখ যায়, দূরে দেখা যায়। সেই ভিটায় এখন জিন্নাত আলীরা বাড়ি বানিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন