রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

সৈকত আরেফিন'এর গল্প : হারানো বিজ্ঞপ্তির খসড়া

অতটুকু চায় নি বালিকা
চেয়েছিল আরও কিছু কম
... ....
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!
—আবুল হাসান
................................................................................................................................................
৯৯

একজন ডোমের সঙ্গে এই প্রথম আমাদের পরিচয় হবে। যদিও পরিচয় ব্যাপারটি যে ভাব বিস্তার করে সেসব মাত্রিক অভিযোজনার কোনকিছুই লোকটির সঙ্গে আমাদের হবে না—এমনকি কোন কথাও নয়।
বালিকার দেহ দুভাগ করার শ্রম যখন তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম তৈরি করবে, সেই ঘাম একেবারে মিলিয়ে না যেতে যেতেই সে লাশকাটা ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াবে—তখন আমরা তাকে দেখব। তার চেহারার কোনকিছুই আমাদের আকর্ষণ করবে না—না মুখাবয়ব, না শরীরের রঙ। অবশ্য শরীরের রঙ প্রসঙ্গে আমাদের নিগ্রোদের কথা মনে হবে। কিন্তু ডোম কিংবা অন্ত্যজ শ্রেণি সম্পর্কে অজ্ঞানতা অথবা আমাদের শেকড়বিমুখতা অর্থাৎ অনার্যদের শারীরিক অবগঠনের ইতিহাস অজানা থাকে বলে রঙ বা গঠন সব সময়ই আমাদের উপেক্ষা পায়। আমরা তার থ্যাবড়ানো নাক, প্রায় টাক হয়ে যাওয়া মাথা কিংবা শরীরের সঙ্গে বেমানান লম্বা দুটো হাত দেখেও হেসে উঠব না, হাসব না, কারণ বালিকার মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করে রাখবে অথবা দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি থেকে হাসার কথা মনেই হবে না। আমরা কেবল লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইব এই কাজ সে কীভাবে করে! অবশ্য তার চোখ কোন সাহায্যই করবে না তাকে সামান্যতম বুঝতে। কিংবা আমরাই তার চোখের ভাষা বুঝতে পারার মানসিক অবস্থানে থাকব না। হয়তো বালিকার মৃত্যুশোকও মিলিয়ে গিয়ে তখন বিবিধ দুশ্চিন্তা আমাদের ঘিরতে শুরু করবে। তবু লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমাদের অনেক কথাই মনে হবে। যখন বালিকার নগ্নদেহে ছুরি চালায়, তার আগে যৌবনোদ্ধত বালিকার শরীর লোকটির ভেতরে কী প্রকার প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, তার মনে বালিকার মৃতদেহ কিছু যৌন রণন জাগিয়ে তোলে কি না, এইসব মনে হবে। বা মনে হবে বালিকার এই অকাল মৃত্যু তার পিতৃহৃদয়ে কী ধরনের আঁচড় কাটে, না কি নৈর্ব্যক্তিক মানবীয় অনুভবে তার ভ্রাতৃবোধে অনুরণন হয়, অস্ফুটে সে কি কখনো বলে—আহারে বোনটি! কিংবা এইভাবে মরে যাবার জন্য সে বালিকাকে ধিক্কার দেয় বা এসবের কিছুই সে ভাবে না—তার অনুভূতির কোমলতা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যায়। কিংবা ডোমদের মানবিক অনুভূতি কেমন হয় সে সম্পর্কে তখনও অন্ধকারে থাকি বলে আমরা ভাবি—সে শুধুই নীচু শ্রেণির একটা চাকরি করে। সে-ও হোমো সাফিয়ানসের সব আবেগ ধারণ করে কি না আমরা জানি না! তাহলে কী করে সে বালিকার দেহে ছুরি চালায়! দুটো নির্মম হাতের দিকে সে যখন তাকায়, তখন তার কি মনে হয়! হয়তো এই হাত দিয়েই রাত গভীর হলে সে বউকে কাছে টানে, বা কখনো এই হাত দিয়ে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় মমতায়। তখন তার সাহসিকতা আমাদের দ্বিধান্বিত করবে, মনে হবে তা সাহসিকতা নয়, নিষ্ঠুরতা, যা সে বংশ পরম্পরায় বহন করে! কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্ত স্থিরিকৃত হবার আগেই লোকটি কথা বলবে। নিরাবেগ এবং অকম্পভাবে বলবে যে— ‘কাম স্যাছ’। তার এই ‘কাম স্যাছ’ কথাটি আমাদের কানে বাজবে, কিন্তু কথাটি দিয়ে লোকটি আসলেই কী বোঝাবে, তা আমাদের বোধগম্য হবে না। বালিকার পরিণতি আরো আগেই জানা থাকবে বলে শেষপর্যন্ত ‘কাম স্যাছ’ কথাটির যে আমরা বুঝব তা হবে আমাদের জন্যে স্বস্তিকর। কারণ, এতে দ্রুত লাশ প্রাপ্তির সম্ভাবনা জাগবে। তারপর লোকটি আমাদের সঙ্গে আর কোন কথা না বলেই যখন চলে যাবার জন্যে পা বাড়াবে তখন কান্নার শব্দে আমরা সচকিত হব, দেখব পাশের যুবকটি কাঁদছে। এই যুবকটি হবে আমাদের খুব পরিচিত।




ভূমিকাপর্ব


শীতবেলা ক্রমে নামে। শীতের অপসৃয়মান কুয়াশা মেলে থাকে সকালে—আশপাশের বাড়িগুলির ঘুলঘুলিতে, ছাদে, টিভি এ্যান্টেনায়, ইলেকট্রিক পোস্টের মাথায়, দূরবর্তী দিগন্তে আর রানুদের কাঁচামিঠে আমবৃক্ষের ঘনপাতার ফাঁকে ফাঁকে। এই আবছায়া কুয়াশা-পাখি ডাকা ভোরে রানুর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। সে খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটে, হাত বাড়িয়ে কুয়াশাকে ছোঁয়। তার হাতে শাদা একটা ঘুড়ি, গায়ে সবুজ সোয়েটার। এই শীতপোশাকে রানুকে অন্যরকম দেখায়। সবুজ নৈসর্গের অবভূমে শাদাটে সকালবেলায় তার সবুজ সোয়েটার আমাদেরকে একধরনের প্রশান্তি দেয়। এই প্রলেপ সকল কামনাকে ঘিরে রাখে না কি! সোয়েটারের স্থিতিস্থাপকতা রানুর স্ফুটনোন্মুখ শরীরী বিভাঁজকে দৃশ্যমান করে। অথচ তখন ঘুড়ি উড়ানোর ঋতু আর থাকে না এবং কুয়াশা বা সবুজ রঙ বা শাদাটে সকাল যে প্রলেপ দেয়, তার হাতের শাদা ঘুড়িটিই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ঘুড়িটি কোথায় পেয়েছে এ প্রশ্ন করলে সে উত্তর না দিয়ে হাসে। তখন তার চোখমুখের বিভায় কিছু ছেলেমানুষি কিছু ব্রীঢ়া। তারপর সে কুয়াশায় দৌড় দেয়। তার এই দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্য এত মুগ্ধরকম ছিল যে, তা আমাদের চোখে একেবারে গেঁথে থাকে। তখন এই কিছু ম্লান কুয়াশা, কিছু পাখির উড়াউড়ি-বাবুই, চড়–ইয়ের কলমুখরতা, সূর্যোদয়ের অপার্থিব প্রতিবেশ আমাদের তুষ্ট করে গাঢ় প্রপঞ্চ ছড়িয়ে দেয় বোধলুপ্ত অনুভবে বা শূন্যতায়। শূন্যতার আরেক নাম তবে বিস্মরণ! বিস্মরণ পাথর না কি নিস্পৃহতা! আমাদের নিস্পৃহ অক্রিয়তা শূন্যতায় রূপান্তরিত হয়।

এই সময়টাতে, স্বপন, পর্ণারা পাড়ায় নতুন আসে। কোত্থেকে তারা আসে সে সম্পর্কে নানারকম কথা শোনা যায়। রঘুনাথপুর না রাণীনগর না নান্দিয়ারা থেকে তারা আসে তা নিয়ে আমরা ভাবিই না। কিন্তু স্বপন, পর্ণারা সহজেই পাড়ায় জাঁকিয়ে বসে। খুব তাড়াতাড়ি দোতলা বাড়ি ওঠে। আলিশান কলাপসিবল গেটে কলিং বেল। সেই বেল টিপলে ভেতরে যেন একটা পাখি অনেকক্ষণ ধরে ডাকতে থাকে। সেই পাখির ডাক শোনার জন্যে পাড়ার ছেলেরা কখনো অহেতু বেল টিপে দেয়। তখন রিনরিনে গলায় কেউ একজন বলে—কে! কেউ কেউ নিশ্চয়ই এমন থাকে যারা পাখির চেয়ে রিনরিনে গলাটিকেই শুনতে চায়। কয়েকদিনের মধ্যেই বড় করে ‘মেঘছাউনী’ লেখা শ্বেতপাথর বাড়ির গেটে স্থাপিত হয়। পাড়ায় সেই প্রথম আমরা বাড়ির এরকম নাম দেখি—মঞ্জিল বা ভিলা জাতীয় নাম দেখে অভ্যস্ত আমরা বাড়ির এরকম নাম হয় জেনে স্বপ্নকাতর হই। তখন বড়লোক হলে আমরাও বাড়ির দারুণ একটা নাম দেবার কথা ভাবি। 

স্বপনদের বাড়িটা বেশ বড়, বাড়ির সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা। একদিন সেখানে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা হয়। সন্ধ্যাবেলায় প্রচুর আলো জ্বালিয়ে স্বপন, পর্ণারা ব্যাডমিন্টন খেলে। মেয়েরাও যে এই খেলা ভালোই পারে স্বপনের বোনের খেলা দেখে তাই মনে হয়। স্বপনের বোন পর্ণা, পাখির পালকের মতন মেয়েটি, উঁচু হয়ে শট নেয়, উদ্বাহু হবার কারণে তার বুকের উদ্ভাসিত কুঁড়ি আমাদের ভীরু চোখকেও লোভি করে—খেলা দেখা ভুলে আমরা পর্ণাকেই দেখি। দিনে দিনে পর্ণা এইভাবে আমাদের লোভাতুর বানায়— তার কাছে নতজানু করে। তার ফাই ফরমাশ খাটবার জন্যে আমরা নিজেদের উন্মুখ করে রাখি। পর্ণা আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলে, বুকের ভেতর ছলাৎ করে ওঠে। কখনো খেলতে খেলতে তার পিপাসা পেয়ে যায়, কিংবা সত্যি সত্যি শীতসন্ধ্যায় তেমন পিপাসা পায় না। কিন্তু মনে মনে আমরা যে তার ক্রীতদাস হয়ে গেছি কোন না কোনভাবে সে এটা টের পায়। তখন আমাদের কারো নাম ধরে ডাকে, প্রেমিকার মত আদুরে গলায় বলে— এক গ্লাস জল এনে দাও না! এই ফরমাশ যেন বহুদিন পর আসে—এই কথাটা শোনার জন্য আমরা যেন অধীর হয়ে থাকি। পর্ণার জল এনে দেবার সূত্রে তাদের ভেতরবাড়ি যাবার সুযোগ হয়। ভেতরে গিয়ে আমাদের মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। কী ছিমছাম! কী পারিপাট্য চারদিকে! ঘরের সাজ-সজ্জা, আসবাব, শোবার খাট, চেয়ার, দেয়ালের ছবি, এখানে সবকিছুই অন্যরকম। তেমন ভীরু চোখে দিকে তাকাই, যেভাবে আমরা পর্ণাকে দেখি। দেয়ালে টাঙানো সব ছবি—যদিও আমরা সেইসব চিত্রকর্মের কিছুই বুঝি না, তবুও এর অন্তঃস্থ সৌন্দর্য আমাদেরও যেন ছুঁতে পারে। না হলে কেন আমাদের ঘরের সিনেমা, ক্রিকেটের নামী দামী তারকাদের জন্যে মনে মনে লজ্জিত হই! তুচ্ছানুভব যখন আমাদের একেবারে নুইয়ে ফেলে, চশমা পরা এক মহিলা আমাদের ডেকে বসায়। ভয়ে ভয়ে তাকে পর্ণার জলতৃষ্ণার কথা বলি। জল দিতে দিতে তিনি আমাদের নাম ধাম জিজ্ঞেস করেন, প্রত্যাশার চেয়ে তার বলার হৃদ্যতায় আমরা আরও একটু বিনত হই। জল নিতে দেরি হয়ে যায়। দেরি করে জল আনার কারণে পর্ণা আমাদের বকে। এই বকা যেন অনিবার্য ছিল বা যেন আমরা বকা খেতে ভালোবাসি ভেবে মনে মনে বলি—পর্ণা তুমি একটুখানি তো জল/ অথচ ভাসাও স্রোতের কলস্বরে।

একেকটা দিন নুতন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। প্রত্যেকটা দিন আমরা সময়ের চেয়ে বেশি বেড়ে উঠি। কষ্টও বেশি পাই, আনন্দও। আরেকদিন স্বপনের সঙ্গে রানু ব্যাডমিন্টন খেলে, পর্ণা একটা চেয়ারে বসে খেলা দেখে আর রানুকে এই প্রকারের সেই প্রকারের শট নিতে বলে। খেলাধুলার এই দৃশ্য আমাদের আনন্দ-বেদনার কোথায় নিয়ে যায় তা বুঝতে না বুঝতেই দেখি, স্বপনও রানুকে সাহায্য করে। সেদিন আর খেলাটা নিয়মে এগোয় না। হয়তো স্বপন প্রথমবারের মতো এটা বুঝতে পেরে শিহরিত হয় যে, ব্যাডমিন্টন খেলাটা সে শিখেছিল। এই উপলব্ধি তাকে বিহ্বল করে। অথবা সে একা নয়, এই অনুভবে রানুও বিহ্বল হয়। তখন স্বপনদের এ পাড়ায় আসা, রানুর কাছে মনে হয়—তারা অনেক দেরি করে আসে বা তার মনে হয় আরো আগে কেন তারা আসে নি। ব্যাডমিন্টন আসলেই মজার খেলা। স্বপন তাকে শট শেখাতে কাছে আসে, র‌্যাকেট হাতে ধরিয়ে এইভাবে মারতে হবে বলে রানুকে দুহাতে বন্দি করে। রানুরও হয়তো ভালো লাগে সমর্পিতা হতে। অথবা এই ছোয়াছুঁয়ি কাকতাল। সবকিছুই ঘটে অন্যমনস্ক উদাসীনতায়। কেবল আমাদের কেমন যেন লাগে। আমাদের মনোযোগ তখন পর্ণার দিকে। তাকে বলি—তুমি কেন খেলো না, তুমিও খেলো। সে বলে তার শরীর খারাপ। কী অসুখ, চেহারার সামান্য মালিন্য ছাড়া আমরা বুঝি না। পরের সন্ধ্যায় স্বপন রানুকে সঙ্গে নিয়েই খেলে। পর্ণা দর্শক হয়ে চেয়ারে বসে থাকে। তার পরের সন্ধ্যায়ও।



০১


যেরকম জোসনায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হয়েছিল সেরকমই অপার্থিব জোসনা রাত রানুকে বিভ্রান্ত করে। কিংবা বিভ্রান্তি নয়, স্বপনের আহ্বানকেই তার ধ্রুব মনে হয়। এতদিন হয়তো সে এই ডাকের প্রতীক্ষাই করছিল। সাড়া না দিয়ে পারে না। সে রাতে নদীআত্রাই জোসনাপ্লাবিত হয়। এই প্লাবনে রানুকে ডুবিয়ে দেয় স্বপন। স্বপন রানুর হাত ধরে আঙুল ছোঁয়, রানু কেঁপে ওঠে। স্বপন রানুকে বুকে টেনে আলতো ঠোঁট রাখে চোখের পাতায়। রানু ভেসে যায়।

এরপর রানু আর স্বপনকে আমরা হারিয়ে ফেলি। তারা আমাদের পরিধি পেরিয়ে যায়। তারা কী করে, কোথায় যায়, তখন সে সম্পর্কে কিছু গুজব ডালপালা মেলে মোড়ের চা স্টলে। লোকজন চুকচুক করে চা খায়, সিগারেটের ধোঁয়া উড়ায় আর জামানা বদলে যাওয়ার কথা বলে। বলে—রোজ কিয়াতের আর বেশি দেরি নাই, ছাওয়ালপালগুলান টিভি, ভিসিআর, সিডি দেইখা দেইখা এইসব কাজকাম শিখছে। কী সব কাজকাম শিখছে সে সম্পর্কে অনেক অশ্লীল করে তারা অনেক কথা বলে। সব আমরা শুনি। রানুর জন্যে, স্বপনের জন্যে ঘৃণা বা ক্ষোভের পরিবর্তে তবু একধরনের ভালোবাসাই কেন স্ফূরিত হয় ভেতরে ভেতরে, সে ভাবনা আমরা তখনও ভাবি না। আমরা অনুমান করি—হয়তো রানু আর স্বপন অনেক দূরে ঘুরতে যায়। নদীতে গিয়ে নৌকায় বসে থাকে, বা নদী পার হয়ে চরে হাত ধরাধরি করে হাঁটে, জলে নামে, ভেজে, ভেজায় বা স্নান করে, গান গায়। নিভৃতে চুমুও খেতে পারে। তারপর রাতে তারা হয়তো অনেকক্ষণ সেলফোনে কথা বলে। হাসে, কাঁদে, ঝগড়া করে। পরদিন আবার সকালে বা দুপুরে বা বিকেল নামার আগেই রিকশায় পাশাপাশি বসে দুজনে মিলে একা হয়। হয়তো আবারও তাদের ঝগড়া হয়। আমরা এই পর্যন্ত ভাবি। ভাবি, কেন পাড়ায় তাদের দেখি না, রানু কেন সকালবেলা আর খালি পায়ে কুয়াশার ভেতর হাঁটে না! আঁটসাঁট সবুজ সোয়েটারে তাকে বেশ মানায়, এই পোশাকে তাকে আমরা দেখতে চাই, সে কেন সোয়েটারটি পরে আর বেরোয় না! তখন শাদাঘুড়িটির অবস্থান নিয়েও আমরা চিন্তিত হই। শীতঋতু ফুরিয়ে গেলেও প্রকৃতিতে তখনও শীত থেকে যায়। অথচ স্বপনদের ব্যাডমিন্টন কোর্ট সন্ধ্যাবেলাও অন্ধকার! আলো জ্বলে না। খেলা হয় না। সেখানে দুর্বা ঘাস বড় হয়ে ওঠে। সেই ঘাসে, বিকেলে পর্ণা একা একা চুপচাপ বসে থাকে। বাঁ হাত থুতনিতে চেপে তার সেই উদাস বসে থাকা আমাদের দুুঃখতাড়িত করে। তবে এই দুঃখবোধ এত ফিনফিনে ও সংবেদিত, আমাদের মর্মে গিয়ে বেঁধে না। কারণ তখন আমরা জীবনের কিছু রূঢ় বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাই। সম্ভবত ক্ষুধার কাছে সম্ভোগও অবহেলা পায়। পর্ণার জন্যে দুঃখিত হলেও সে দুঃখ ভাসিয়ে নেয় না। কিন্তু রানুর শাদাঘুড়িটির জন্যে মন খারাপ হয়, তীব্ররকম সংবেদনা ভেতরে ভেতরে খচখচ করে। করতেই থাকে।



৫০


রানু আর স্বপনের বিয়েতে খুব ধুমধাম হয়। একই পাড়ার দুটি ছেলেমেয়ের বিয়েতে পাড়াময় আনন্দের উৎসব লাগে। সবাই যেন তাদের বিয়ের অপেক্ষাই করেছিল। আমরাও এই প্রথম ব্যান্ডপার্টির বাজনার তালে তালে উদ্দাম নাচি। রাতে রঙ রেরঙের ঝাড়বাতি, আতশবাজি, বাহারি আলোকসজ্জায় সারা পাড়ায় দিন নেমে আসে। সেই আলোর বন্যার মধ্যে আমরা পর্ণার পেছন পেছন ঘুরঘুর করি। যেন সে একটা চুম্বক। বিয়ের কদিন তার সঙ্গে আমাদের অনেক কথা হয়। তাকে তখন নতুনভাবে চিনি। ছাদে বসে পর্ণা আমাদের সঙ্গে জোসনা দেখে, গান শোনায়, কারো হাতে হাত রেখে গাঢ় চোখে তাকায়। এই সময় সে হয়তো নিজেকে ভুলে যায়, বা নিজেকে ফিরে পায়। বা তখন সে আমাদের সঙ্গে শুধুই সামাজিকতা করে। আমাদের বুকের ভেতর যে কী হয়! তা কি দুঃখ না অনুবেদনা না সুখ তা বুঝতে পারি না। রানুকে দেখে সত্যিকারের ভালো লাগে—তার উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা স্বপনের জন্যে মঙ্গল কামনা করি। রানুর মুখে লেগে থাকা উজ্জ্বলতা আমাদেরও প্রণোদিত করে। বর-বধূ হয়ে রানু আর স্বপন যখন তীব্র রোদের বিপরীতে দাঁড়ায়, তাদের দুজনের মুখেই যে অমলিন হাসিটি উদ্ভাসিত হয়, সেই হাসি এমন স্বপ্নশীল তার প্রেরণায় আমরাও প্রণোদিত হই।

এরপরের অনেকদিন, আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি নিজেদের জন্য। নিজেদের জন্যে ব্যস্ত হয়ে রানুকে, স্বপনকে এমনকি পর্ণাকে পর্যন্ত আমাদের ভাবনজগতের বাইরে রেখে এই কাজ সেই কাজ করি। দেখাও হয় না কারো সঙ্গে। স্বপন ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পর্ণা হয়তো পড়াশুনায় সময় দেয় বা অন্য কোন কাজ করে। রানুকে আমরা দেখিই না। কেন তাকে দেখতে পাই না, রানু তখন কী করে, কোথায় থাকে—এ প্রশ্ন কখনও আমাদের মনে জাগে বটে, তখন নিজেদের ব্যস্ততাকে দায়ী করে তার সুখী সংসারের চালচিত্র কল্পনা করি। এ প্রকল্পনার উল্টো প্রান্তটি কেন আমাদের মনে আসে নি সেই অনুতাপও একদিন আমাদের করতে হয়। রানুর মৃত্যু আমাদের অনুতাপে দগ্ধ করে। রানু মারা যায় হাসপাতালে নেবার পথে। বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে বেরুবার দশ মিনিটের মধ্যে। মাত্র তিন দিন আগে সে মায়ের কাছে এসেছিল। একই পাড়ায় এত কম দূরত্বে থেকেও অনেকদিন পরে সে ফিরেছিল নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে। আসা-যাওয়ার সময় ব্যবধানের মধ্যে হয়তো পরবর্তী ঘটনার কোন ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। হয়তো সেজন্যেই সে বাঁচতে আসে নিজের বাড়িতে। কিন্তু রানু মরে যায়। হয়তো মরে বাঁচতে চায়। তার মা বিলাপ করে আর রানু তখন নিস্পন্দ শুয়ে থাকে তার ঘরে। মা কাঁদে আর বলে—তার মেয়েটা বাড়ি এসে একটা শাদাঘুড়ি খুঁজছিল; তাকে বলেছিল—মা আমার ঘুড়ি কই? শাদা ঘুড়িটা কোথায় মা! আমার ঘুড়ি কে নিছে? মা ভেবেছিল তার মেয়ের এখনো কিশোরীসুলভ চপলতা কাটে নাই। এখনো সে ঘুড়ি খুঁজে বেড়ায়। ঘুড়ি উড়ানোর শখ মেয়ের এখনো আছে দেখে মা মনে মনে হাসে। ভাবে, একটা ছেলেপুলে হোক তারপর মেয়ের ঘুড়ির শখ মিটবে। রানুর মায়ের বিলাপ শুনে আবার আমাদের শাদাঘুড়িটার কথা মনে পড়ে। একথাও মনে পড়ে, একদিন কুয়াশার সকালে, এই ঘুড়িটা সে কোথায় পেয়েছে এ প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তর না দিয়ে কুয়াশার ভেতর দৌড়ে গিয়েছিল। দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি এত মুগ্ধরকম ছিল যে, তা আমাদের চোখ থেকে কখনো মুছে যায় না। আমরা তখন চিৎকার করে কাঁদি। কাঁদি আর তন্নতন্ন করে ঘুড়িটা খুঁজি। পাই না—না ঘুড়ি, না ঘুড়ির কঙ্কাল। 



১০০


ডাক্তারি রিপোর্টে জানা যায়, যে ঘুমকারক ওষুধ বালিকাকে স্থায়ী ঘুম এনে দিয়েছিল, তার কার্যকারিতা পরীক্ষিত। ঐ রিপোর্টে আরো অনেক কিছু লেখা থাকে। যেমন আমরা জানতে পারি—বালিকার অভ্যন্তরে অঙ্কুরিত হচ্ছিল আরো একটি প্রাণ। তখন রানুর সিদ্ধান্ত আমাদের দ্বিবিধ দ্বন্দ্বে দাঁড় করিয়ে দেয়—তাহলে আমরা কার জন্যে বেশি বেদনা বোধ করব! রানুর জন্যে না তার অনাগত সন্তানের জন্যে! এই দ্বিধা থেকে আমরা কয়েকটি অনুমান নির্ভর অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছতে পৌঁছতে অন্তর্গত অস্থিরতাকে উড়িয়ে দিতে চাই। হয়তো বালিকা তুচ্ছতম চাওয়াটিকেও তার জায়গায় অপূরণ দেখে বা ন্যূন অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। তার স্বপ্নগুলো যাকে ঘিরে আবর্তিত, তার সেই পুরুষটির প্রতিদিনের অবহেলা বালিকাকে একটু একটু করে প্ররোচনা দেয়। আরো কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা হয়তো এতে যোগ হয়। হতে পারে সে একদিন বেড়াতে যেতে চায়। একটা শাড়ি চায় বাসন্তি রঙের, বা দুটো বালা, কানের দুল। কিংবা বাইরে এসে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে চায়। রাতে জোসনা হলে জানালা খোলা রাখতে চায়, যাতে জোসনার আলো ঘরে আসে। বালিকার প্রতিটা চাওয়ার বিপরীতে হয়তো উপেক্ষা কিংবা অবহেলা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সে আরও একটু প্রণোদিত হয়। আর তখনো হয়তো বালিকা তার মাতৃত্বের সংবাদ পায় না বা পায়। জেনে বুঝেই সে দীর্ঘঘুমের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে। যদিও তার বয়স বা অভিজ্ঞতা কম। নিজের জীবন থেকেই চারপাশটা উপলব্ধি করে। সন্তানের জন্যেও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন সে দেখতে পারে না। লাশকাটা ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমাদের পা ধরে আসে। অস্থিরতা বাড়ে। তখনই থ্যাবড়ানো নাক, প্রায় টাক হয়ে যাওয়া মাথা কিংবা শরীরের সঙ্গে বেমানান লম্বা দুটো হাত দুলিয়ে ডোম লোকটি বেরিয়ে এসে বলে— ‘কাম স্যাছ’। এই প্রথম একজন ডোমের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। চোখেমুখে কর্মসমাপ্তির শান্তি নিয়ে লোকটি যখন আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন লোকটি, রানু আর যুবকটি আমাদের বিভ্রান্ত করে। মনোযোগিতার মূলকেন্দ্রটি আমরা হারিয়ে ফেলি।

যুবকটি অনেকক্ষণ কাঁদে। 
আমরা তাকে কিছুই বলি না—না একটু সান্ত্বনা দিই, না একটা থাপ্পর মারি।



০০


... আরেকদিন স্বপনদের বাড়িতে উৎসব জমে ওঠে। এবারও আনন্দ কিছু কম হয় না। ঝাড়বাতি, আতশবাজি, আলোকসজ্জা সবই হয়। ফুলে ফুলে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার সাজিয়ে অনেক দূর থেকে বউ নিয়ে ফিরে স্বপন আবার উজ্জ্বল রোদের বিপরীতে দাঁড়ায়। এরকমই এক দুপুরে রানুকে সঙ্গে নিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল। রানুর মুখ খুশিতে ঝলসে উঠলে আমরা স্বপনের জন্যে মঙ্গল কামনা করেছিলাম। একটু ঈর্ষাও কি হয়েছিল না! যে অমলিন হাসিটি লেপ্টে ছিল রানুর মুখে, তখন স্বপনের নুতন বউয়ের মুখে সেই হাসিটি দেখা হলে হয়তো নুতন কেউ স্বপনের জন্যে আবারও মঙ্গল প্রার্থনা করে বা ঈর্ষাকাতর হয়।

আমরা স্কুলমাঠের ঘাসে চিৎ শুয়ে থাকি। শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা গুনি— এক, দুই, তিন...। শালা ডোম! ডোমকে গালি দিয়ে বুঝি এর কোন মানে নেই। তখন আমাদের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে পর্ণার উপর। পর্ণা তুমি থাকতে রানুর এত অবহেলা হল! কী করে পর্ণা! আহারে বোন রানু! হাতে শাদাঘুড়ি, গায়ে সবুজ সোয়েটার রানু কুয়াশায় দৌড়ে যায়, এই দৃশ্য তো আমাদের মনের মধ্যে ছবি হয়ে আছে। রানুর কথা ভেবে পর্ণাকে আমরা ক্ষমা করে দিই। ক্ষমা! বাহ আমরা কত বড় ক্ষমাশীল! কেন! অন্তর্বাসের নীচে টেনে ছিঁড়বার কিছু নেই!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন