রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

২০১৮ সালে নাহার মনিকা'র লেখা সেরা গল্প : মেইকআপ আর্টিষ্ট

জিনেত স্ক্যান্দার নামের মহিলার শাদা ত্বক বরফের মত ঠান্ডা। বন্ধ চোখের পাতায় পাপড়ি নেই বললেই হয়, সে তুলনায় বেশ চুল। শ্যাম্পু এবং বেশী করে কন্ডিশনার দেয়া হয়েছে, তা না হলে আঁচড়াতে অসুবিধে হতো। গলার কাছে এম্বামিং এর যে বড় ছিদ্র সেখানে সহকর্মী গিলবার্ট সেলাই করে দিয়েছে! সেলাইয়ের বাদামী সুতোটা প্রকট, পরনের স্যুটের কলারে সবটা ঢাকা পরেনি। পুরু করে ফাউন্ডেশনের রং আর পাউডার দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

রোলিং টেবিলের ওপর সবকিছু সাজিয়ে বসেছে নীপা। ফাউন্ডেশন, পাউডার, ব্লাশ, লিপগ্লস, লিপষ্টিক, নেইলপোলিশ, চিরুনী আর হেয়ার স্প্রে। ত্বক উপযোগী করেএসব প্রসাধনী বিশেষভাবে তৈরী। লিক্যুইড ফাউন্ডেশন আদতে ঠিক ফাউন্ডেশন না, টিণ্টেড একরকমের লোশন। ত্বকের ধরণ অনুযায়ী গোলাপী বা হলদেটে রংয়ের। বেগুনী ঘেষা বাদামী রংও আছে, অশ্বেতাঙ্গদের জন্য। 

বিউটি পার্লারের কাজটা নীপা শুধু শখের বশে যেমন শেখেনি, তেমনি খুব ভেবেচিন্তেও না। তবে সাজগোজের বিষয় হলে কোথায় যেন রক্তের মধ্যে উচাটন হয় তার। দেশের বাইরে আসবার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এটাকে হাতের পাঁচ হিসেবে রেখেছিল। 

পড়ালেখা বা শেখার ক্ষেত্রে ওর নিজের বিচার হচ্ছে- সবতো আর পারা যাবে না, তবে কমপক্ষে 
দু’য়ের অধিক বিকল্প উপায় থাকা হাতে নানা ধরণের অস্ত্র হাতে থাকার মত। কখনো যদি একটা 
বুড়ো আঙ্গুল দেখায় নীপা তখন তর্জনী উঁচিয়ে ধরবে। তর্জনী কাজ না করলে তখন? 
নিজের মধ্যমার দিকে চেয়ে হেসে ফেলে সে। তখন ‘ফাক-ইউ’ বলে মধ্যমা বাগিয়ে রাগ 
বশ মানানোর, প্রকাশের মানুষ সে না। তখনও তো তার অনামিকা, তর্জনী এসব আছে। আছে 
না? 

তো তার তর্জনী, মানে বি এ ডিগ্রী কাজে লাগেনি, কাজে এসেছে দেশ ছাড়ার আগে আগে বিউটি 
পার্লারের কোর্স। সেটি তার অনামিকা, যেখানে একটি হীরার আংটির স্বপ্ন দেখে সে। ওই কোর্সের 
সনদ দেখিয়ে প্রায় বিনা পয়সায় মন্ট্রিয়ালের এডাল্ট এডুকেশনের ইংলিশ স্কুলে একটা এস্থেটিক্স 
এর ডিপ্লোমা শেষ করে আজকে সে করে খাচ্ছে। রীতিমত ফুলটাইম চাকরী।  মুশকিল একটাই, এ চাকরীটার কথা ওর বর নিজের বাড়ির কাউকে বলতে চায় না, সবাই না 
কি আড়ালে কথা বলবে। 

কেন? ডাক্তার, নার্স, পুলিশ আরো কত কত লোকে এ নিয়ে কারবার করে, শুধু নীপার বেলায় 
দোষ? 
সুমন তবু বলবে- ‘ এখন করো, কিন্তু আমাদের একটা বেবী হলে অন্য কোথাও দেখবা। ঠিক 
আছে?’ 

এ নিয়ে কয়েকবার বাকবিতন্ডা হয়ে গেছে। অস্বস্তি না, অবাক লাগে নীপার। কাজতো কাজই, 
টয়লেট সাফাইয়ের কাজও করতে হতে পারতো! করেও তো মানুষ। সুমন থাকুক তার নিজের 
পুরানো সংস্কার আঁকড়ে। টাকা পয়সার কষ্টে পড়লে ওই কথা বলা মানুষেরা হাত  বাড়াবে? তখন আড়ালে আরো বলবে। 

প্রতিদিন ছুটির সময় এগিয়ে এলে নীপার কাজে মনোযোগের কাঁটাও দ্রুতবেগে ঘোরা শুরু করে। বুলভার্ড দ্য সুর্স এর ওপরে তার কাজের জায়গার সামনেই আটাত্তর নম্বর বাস থামে। সাড়ে চারটায় ছুটি হলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল পাঁচটা, তার ঘণ্টাখানেক আগেই সুমন কাজে বেরিয়ে যায়। ফেরে রাত বারোটায়। 

প্রতিদিন নীপার মনে হয় চারটার মধ্যে বাড়ি ফিরলে অন্তত সুমনের সঙ্গে দেখা হতো। তা না হলে সেই শুক্রবার রাতের অপেক্ষা। কিন্তু তার কাজে তাড়াহুড়োর অবকাশ নেই। বাড়তি মনযোগ দিতে হয়। তিন বছর পরেও ডিরেক্টর ক্রিষ্টোফারকে একটু ভয় পায় সে। অথচ তার গিলবার্টের কোন বিকার নেই, মুখের ওপর বাদানুবাদ করে। নীপা’তে আর আইরিশ গিলবার্টে যেমন তফাৎ হওয়ার কথা। তবে সবচে বড় কথা এই কাজ করতে ভালো লাগে তার এবং ক্রিষ্টোফার তার কাজ পছন্দ করে। সকালবেলা কফির চাইতে কাজে আসার উৎসাহটাই তাকে চাঙ্গা রাখে বেশী। 

সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। প্রতি ক্লায়েন্টে একঘণ্টা সময়। সেদিক দিয়ে এখানে শান্তি, কেউ না পারতে তাড়াহুড়ো করে না। এ ধরনের কাজের পরিবেশ এমনই হওয়ার কথা। সবাই ভদ্র আর বিনয়ী। নীচুলয়ে কথা বলবে। চেহারায় শান্তভাব ধরে রাখবে। তার নিজের অবশ্য অনুষ্ঠান হলের ভেতরকার সমাহিত ভাব দেখার সুযোগ কম, নীপা মঞ্চের পেছনের লোক। 

এম্বামিং করে শরীরের বর্জ্য বের করে পচনরোধী তরল ঢুকিয়ে, সেলাই ফোড়াই শেষ করে গা ধোয়া শেষে শাদা চাদর জড়ানো শরীর গিলবার্ট তাকে দিয়ে যায়। তারপর নীপার কাজ শুরু। 

আজকের শেষ ক্লায়েণ্ট মাত্র গতকালই হাসপাতাল থেকে আসা। পরিবারের সবাই প্রস্তুত, তারা দেরী করতে চায় না। এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। বেশীরভাগই সপ্তাখানেক বা তারো বেশী মর্গের ফ্রিজএ রেখে সন্তানাদি, বা আত্মীয়পরিজন, নিমন্ত্রিতদের সমভিব্যাহারে দর্শনপর্ব, স্মৃতি তর্পণ ইত্যাদি সেরে অন্তিমযাত্রা আয়োজন করে। 

হাতবিহীন রিভলভিং চেয়ারটাকে উঁচু করে নিয়ে বসে আঙ্গুলের ডগায় মিনারেল ময়শ্চারাইযার লাগিয়ে জিনেতের জমে যাওয়া ঠান্ডা মুখমন্ডল ম্যাসাজ করে নীপা। দরদ দিয়ে করে, যেন মহিলা ঘুমিয়ে আছে, আবেশে। এ সময়টায় নিজেও চোখ বন্ধ করে নেয় নীপা। এই অঙ্গসংবাহন মিনিট দশেক চলবে। জীবিত আঙ্গুল আর মৃত ত্বকের মধ্যে কোন ভাব বিনিময় সম্ভব? নীপার কেন যেন মনে হয়- সম্ভব। মন্ত্র জপের মত মনে মনে সে বলে-‘যাও হে মানব শরীর আমার স্পর্শ তুমি অনন্তলোকে পৌঁছে দাও’। 

জানালাবিহীন ঘর বরাবরের মত এয়ারকন্ডিশনার দিয়ে শীতল, ম্যাসাজ করতে করতে সে নিজের অন্তর্মুখ ভাবনা ছেড়ে করিৎকর্মা নীপা বনে যায়। এম্বামিং ফ্লুইডগুলোয় সুগন্ধি দেয়া থাকে, দু একটায় কর্পুরের ঘ্রাণ আছে। জানালাবিহীন ঘরে মাস্কমুখেও বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়। 

দরজায় শব্দ হলে তাকাতে হয়। ক্রিষ্টোফারের সঙ্গে কালো স্যুট বয়স্ক ভদ্রলোক এসে ধীরপায়ে দাঁড়ায় টেবিলের কাছে। মাস্ক আর গ্লাভস আর গগলস এর ভেতর থেকে অবাক হয় নীপা। সাধারণত কেউ এভাবে আগবাড়িয়ে প্রস্তুতিপর্বে এখানে ঢোকে না। 

যদিও এর আগের পর্যায়গুলোর পরিচ্ছন্নতা আর বিশুদ্ধিকরণের কড়াকড়ি এ ঘরে তুলনামূলকভাবে কম। ভদ্রলোক কোটের পকেট থেকে ছোট্ট নীল ভেলভেটের থলে বের টেবিলের ওপরে রাখে, সঙ্গে 
একটা মুক্তোর মালা। বুক পকেট থেকে একটা ছবি বের করে, নীপার সামনে শুয়ে থাকা ভদ্রমহিলা পেছনে সূর্য অস্ত যাওয়া সবুজ পাহাড় রেখে স্মিত হাসছে। এই ছবিটা বড় করে হলের  সামনে মেমোরি বোর্ডে সেঁটে দেয়া হয়েছে। বেশী আগেরকার ছবি না। 

-‘ তুমি কি ওর এই সাজটা এনে দিতে পারবে? আমার স্ত্রী এমন করে সাজতে ভালোবাসতো, আর ওর আংটিগুলো খুব প্রিয় ছিল, যদিও শেষদিকে এগুলো সে পরতে পারতো না, আমি চাই আজকে এগুলো তার সঙ্গে থাকুক’, নীল ভেলভেটের দিকে ইঙ্গিত করে ভদ্রলোক চোখ মুছতে শুরু করলে ক্রিষ্টোফার তার হাত ধরে থাকে, তারপর নীপা যে মেইকআপ আর্টিষ্ট হিসেবে অতুলনীয় সে বিষয়ে পরিমিত দু একটা বাক্য বলে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। 

অন্তষ্টিক্রিয়ার আগে ছবি সাধারণত পরিবার থেকে আগাম দিয়ে যায়। জিনেতের পরিবার সবকিছু তাড়াতাড়ি করতে চাইছে, তাই হয়তো ভুলে গিয়েছিল। কতরকম ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যায় এসব সময়, তবু সবাই চায় তাদের প্রিয়জনকে যথাসম্ভব আগের মত দেখাক, সুন্দর দেখাক যাতে শুভার্থীরা অনুমান করতে না পারে যে কী নিদারুণ মৃত্যু যন্ত্রনা তাদের প্রিয়জন ভোগ করেছে, অথবা তাদের প্রিয়জন আগের মতই সুন্দর, স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে। 

এ আর কিছুই না, পরিজনদের জন্য কিছু বানানো সান্তনা সেটা নীপা জানে। তবু ক্রিষ্টোফার যেমন বলে-‘ শেষ সময়টা সুন্দর কাটানো বেঁচে থাকা পরিবারের জন্য খুব দরকারী। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এর ভূমিকা অনেক’। 

তাদের কাজের বড় একটা অংশও তাই। এম্বামিং এর কষ্টসাধ্য আর যত্নশীল প্রক্রিয়ার পরে নীপাও ছবি দেখে দেখে প্রাণপণে চেষ্টা করে। ভুরুতে গাঢ় করে পেন্সিল ছোঁয়ায়। ঠোঁটে লিপষ্টিক দেয়ার আগে ডার্ক আউটলাইনটা এমনভাবে করে যাতে স্মিত হাসির ভাবটাও ফুটে ওঠে। অনুমান করতে চেষ্টা করে তার ক্লায়েন্ট নিজে নিজে ঠিক এভাবেই প্রসাধনী ব্যবহার করতো কি না। পেশাদারিত্বের অতিরিক্ত সম্পর্ক এসব ক্লায়েন্টদের সঙ্গে তৈরী করার কোন উপায় নেই, তারপরও এ নিয়ে নীপার মনে কখনো কখনো সংশয় সৃষ্টি হয়। এ সাজ তো কোন বিয়ে কিংবা জন্মদিনে যাওয়ার জন্য নয়! সে কোথায় যেন পড়েছিল বা শুনেছিল যে মানুষের কন্ঠস্বর মহাশূন্য ধারণ করে রাখে। অবয়ব ধরে রাখে- এমনও কি হতে পারে না? 

ম্যাসাজ করতে আজকে আঙ্গুলের ডগায় ব্যথা করছে নীপার। এম্বামিং এর তরল শরীরে যাওয়ার পরেও মহিলার মুখের পেশী শক্ত হয়ে আছে। চুলের গোড়ায় ঠান্ডা। হ্যান্ডগ্লাভসএর প্লাষ্টিকের স্তর ভেদ করে ঠান্ডা সবদিনই অনুভব করে, কিন্তু আজকে কেন জানি বেশী বোধ হচ্ছে। অবশ্য জিনেতকে নিয়ে আজকে পাঁচজন ক্লায়েণ্ট। 

প্রতিটা কেসই মন দিয়ে দিয়ে করে নীপা। সকালে ডিরেক্টরের অফিসে যে মিটিং বসে দৈনিং ক্লায়েন্ট তালিকা নিয়ে, সে মন দিয়ে শোনে, ফাইলগুলো পড়ে। বৃত্তান্ত জানলে তার সাজাতে সুবিধে হয়, মনে হয় যে ঠিকঠাক সাজাতে পারলে মানুষগুলোর আত্মা আনন্দিত হবে। ক্রমশ বিবর্ণ হতে থাকা শরীরগুলো তাকে আশীর্বাদ করবে শেষ যাত্রায় জরাজীর্ণ মুখায়ববকে যথাসম্ভব প্রদর্শনযোগ্য করে তোলার জন্য। 

তার কোর্স শুরুর আগে দেশের বিদ্যায় দেশী এক পার্লারে কিছুদিন কাজ করেছিল। তখন জ্যান্ত কাষ্টমারের হাসিখুশী মুখ খুব উপভোগ করতো। এখন মৃতলাশ এর ভূমিকায় সত্যি সত্যি মৃতদেহকে সাজিয়ে মঞ্চস্থ করার ভূমিকাকে নায্যতা দিতে ভালো লাগে। 

দেহ নির্লোম করে ফেলার কাজটিও গিলবার্টই করে, তবে মুখের ত্বকে লোম বেশী হলে নীপা নারী পুরুষ নির্বিশেষে শেইভ করে নেয়। তা না হলে এই বিশেষ প্রসাধনীগুলো লোমশ ত্বকে সহজে বসতে চায় না। জিনেতের সে সমস্যা নেই, তবে নীপাকে তার কেশ পরিচর্যার বিদ্যা প্রয়োগ করতে হবে। 

‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা’- তার দাদুভাইয়ের বলা বাক্য এখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজে নিজেকে বলে। এখানে অনেকের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কত ডিগ্রী বেঘোরে মারা যায়। ডাক্তার এসে ডাক্তারী না করে ট্যাক্সি চালায়, ইঞ্জিনিয়ার রেস্তোরায় কাজ করে। কিন্তু নীপার শেখা কোন না কোনভাবে কাজে লেগে গেছে। নিশ্চয়ই বুজুর্গ কারুর আশীর্বাদ আছে তার ওপর। তা নইলে বড় বড় কোম্পানির হর্তাকর্তাদেরও হুটহাট চাকরী চলে যায়। আগে থেকে জানতেও পারে না, কনফিডেন্সিয়ালিটি ইস্যু- বলে পার পেয়ে যায় নিয়োগকর্তারা। সকাল বেলা অফিসে এলে বরখাস্তের চিঠি হাতে ধরিয়ে দেয়। 

ভাবতে ভাবতে ব্লাশ অন এর গোলাপী পাউডার একটু ছড়িয়ে জিনেতের গালে মোটা ব্রাশ দিয়ে থুপ থুপ করে ষ্ট্রোক দেয় যেন বেশী না ছড়িয়ে যায়। 

জিনেত মিশর দেশ থেকে এসেছিল। আহা, কে কোথায় জন্মে কোথায় এসে মরে! অভিবাসীদের দেশে মানুষগুলো স্যামন মাছদের মতও যদি হতো! যেখানে জন্মেছে মরার কালে দলে দলে সেখানে ফিরে যেতো, নিজের জন্মস্থানে! এই মহিলা মিশরে জন্মে পড়াশোনা রানীর রাজত্ব ইংল্যান্ড এর মেডিকেল স্কুলে, আর সেখান থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগে ক্যানাডার মণ্ট্রিয়ালে এলো তো এলো, আর ফিরে গেল না! 

“পুত্র, কন্যা এবং স্বামীকে আকুল শোকের সায়রে ভাসিয়ে অনন্তের পথে প্রস্থান করিলেন ডক্টর জিনেত স্ক্যান্দার”। তার ছবি দিয়ে ছোট, রম্বস আকারের কার্ড ছাপানো হয়েছে অতিথিদের দেয়ার জন্য। সঙ্গে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারের ঠিকানা। সেন্টারের বিজ্ঞাপন। কার্ডে জিনেত স্ক্যান্দারের মুখের ছবির পেছনে দিগন্তে বিলীয়মান নীল আকাশ আর চলিঞ্চু মেঘদল, ‘জিনেতও অনন্ততে মিলাইয়া যাইতেছে’। 

সত্যিই তো! কনসিলার দিয়ে চোখের নীচে আইব্যাগের ওপর আঙ্গুলের মৃদু চাপ দিতে দিতে নীপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনন্ত যাত্রাই তো! মাস্কের ভেতরে তার নিঃশ্বাসের বাস্প এসে চোখের বড় গগলস এ জমা হয়! 

জিনেত স্ক্যান্দার নামটা আরো আরো নামের স্মৃতি টেনে আনছে মাথায়। জ্যানেট থেকে সম্ভবত জিনেত, এরা মিসরীয় ক্রিশ্চান, আর জিনেত দক্ষিণ এশিয়ার দেশে গিয়ে হয়ে গেছে জিনাত, নীপা ভাবতে ভাবতে হাসে। জিনাত নামে নেত্রকোনায় তাদের কলেজের নতুন ফিজিক্স স্যারের মেয়ে ভর্তি হলো। গোলপানা মুখে ঢলঢলে লতার লাবণ্য। মাসখানেকের মধ্যে ওর বিয়ে হলো খুব তড়িঘড়ি করে। সে সময় বাতাসে খুব কানাঘুষা ছিল মফস্বলের ঐ শহরে, মেয়ে বিয়ের আগেই অন্তঃস্বত্তা হয়ে গেছে। নীপার ডাক পড়েছিল কনে সাজাতে, ফুলের গয়না দিয়ে সে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছিল। তবে চোখে কাজল থাকছিল না, জিনাত এত কাঁদছিল! তখনো মফস্বলে ওয়াটারপ্রুফ মাশকারার অস্তিত্ব ছিল না। তখনো, নীপা এস্থেটিক কোর্স কি জিনিস, জানে না। শুধু সাজানোর হাত ছিল, যেমন হাত আর স্পর্শ নিয়ে এ ধরনের কাজের জন্য মানুষ জন্মায়। 

জিনাত কাঁদছিল বলে ধমক দিতে পারেনি নীপা। তখন বিয়ের দিনে কান্নাকাটির রেওয়াজ ছিল। 

তার কলেজের জিনাতের সঙ্গে এই জিনেতের কোথায় যেন মিল! গোলপানা মুখ! কেবল এই শায়িত জনের চোখে অশ্রুধারার কোনও সম্ভাবনা নেই। 

জিনেতের গালের ওপরে খয়েরী ছোপ দাগের ওপরে গোলাপী ফাউন্ডেশন ঢেলে চেপে চেপে ঘষে দেয় নীপা। প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেকে থেকে, কেমোথেরাপী বা রেডিওথেরাপি নিতে নিতে, নাকি বিষণ্ণতায় ভুগতে ভুগতে ত্বকের লাবণ্য ঝরে গেছে, কে জানে। মারণ ব্যাধি। নীপার কবিরাজ দাদা বলতো – কর্কট রোগ, নিরাময় অযোগ্য ব্যাধি। 

জিনেতের বয়স নাকি মাত্র উনষাট, বিশ্বাস হতে চায় না। 

বন্ধ চোখের পাতায় আইলাইনার ছোঁয়াবার আগে ফেসওয়াইপ টিস্যু দিয়ে আরেকবার সাফ করে নেয় নীপা। ছবিতে তেমন সাজগোজ নেই, ক্লায়েন্টপ্রতি একঘন্টার পুরোটা লাগবে না। 

পরিবারের সদস্যরা এর মধ্যেই চলে এসেছে, তাদের অভ্যাগতরা আসার সময় বিকেল পাঁচটা থেকে সাতটা। ফুলের ব্যুকে দিয়ে এর মধ্যেই হল সাজানো শেষ। 

বেগুনী, তার প্রিয় রঙ্এর স্কার্ট আর জ্যাকেট পরিয়ে দেয়া হয়েছে জিনেতকে। 

বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে এখন। গলায় মুক্তার মালা, ডান হাতের পাঁচ আঙ্গুল জড়িয়ে রূপার চেনের সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ যীশু। ঠোঁটে লিপষ্টিক, চোখের পাতায় আইশ্যাডো। 

নীল ভেলভেটের আংটিগুলো বের করে হঠাৎ শরীরে শিহর লাগে নীপার। চারটা, এগুলো আসল হীরার আংটি! ডাক্তারদের আয় কত? তার সারাবছরের আয় কোন কোন ডাক্তার একমাসে উপার্জন করে! একটা চৌকো হীরার চারপাশে ক্ষুদে ক্ষুদে কালো পাথর দিয়ে ঘিরে দেয়া আংটিটা হাতে নিয়ে মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে সে। একবার গয়নার দোকানে ঢুকে এ রকমের একটা আংটি দেখেছিল। দেখাই সার। 

আচ্ছা, সে মরে গেলে তাকে কি কেউ সাজাবে? বৌ সাজ ভারী পছন্দের তার। নিজের বিয়েতে সাজার সুযোগ হয়নি। সুমন যেদিন ক্যানাডা আসার জন্য ঢাকা রওয়ানা দেবে। আদম ব্যবসায়ীর বরাতে একটি বিপদজ্জনক রুট দিয়ে তাকে যেতে হবে। আদৌ আসতে পারবে কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তবু কলেজ ফেরত নীপাকে বিয়ের শর্ত দিয়ে বসেছিল-যদি ভালোবাসে তাহলে বিয়ে করতে হবে। 

খুব যে একান্ত ইচ্ছে হয়েছিল তা না, কিন্তু সুমনকে ভালোবাসায় তার সন্দেহের লেশমাত্র নেই। বিয়ে করতে যে তার ইচ্ছে করছে না, বিয়ে শব্দটাতেই যে নিজেকে বন্দী বন্দী লাগছে, আসন্ন বিরহের অন্ধকার অনুভবের সামনে এ কথাটা বলা যায়নি তখন। 

সুমনের কাছে বিয়ে করার ইচ্ছা বা অনিচ্ছাটা ভালোবাসার মাপার বাটখারা যেন। 

তবু উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে- এভাবে বিয়ে? 

-হ্যা! সুমন একগুয়ে হয়েছে। 

-বাবা মা কাউকে না জানিয়ে? 

-হ্যা! সুমন একরোখা, অভিমানীও। নীপার কাছে সুমনের চেয়ে পৃথিবীর আর সবাই বড় হলো? 

এই অস্ত্রে সুতরাং নীপা ঘায়েল। 

পরীক্ষার প্রস্তুতি ছাড়াই প্রমাণ করতে পেরেছে যে সুমনকেই সে ভালোবাসে। বাপ মা ভাইবোন সব্বার চেয়ে বেশী। 

শুধু শাড়িই কেনা হয়েছিল একটা। আংটি কেনার সময় পায়নি। কিনলে তখন ঝামেলায়ও পড়তো, লুকিয়ে রাখতে হতো, যতদিন না সবাই বিয়ের কথা জেনেছে। 

বিয়ের সাজ তাই সাজা হয়নি। নিজে এত সুন্দর করে সাজাতো অন্যদের বিয়েতে, হলুদে। আর নিজের কি না গায়ে হলুদই হলো না। শাড়ি পরে কোনমতে কাজী অফিসে গিয়ে হাজির হয়েছিল। 

মেইকআপ দেয়া প্রায় শেষ। ঘাড় বাকিয়ে ডক্টর জিনেত স্ক্যান্দার এর ছবি আর মুখ আরেকবার মিলিয়ে নেয় নীপা। নাহ, গলার ক্ষত একদম বোঝার উপায় নেই। 

পছন্দের আংটিটা হাতে ঘুরিয়ে দেখতে নিলে আবারো দরজায় শব্দ। আংটিগুলো একটা ন্যাপকিন দিয়ে ঢেকে দেয় নীপা। এবার ডিরেক্টর এর সংগে জিনেতের মেয়ে। চেহারায় মায়ের আদল। কালো স্কার্ট আর টপ, সিল্কের। কালো স্কার্ফে আলতো ঢাকা মাথার লাল চুল বেরিয়ে আছে। হাতে সাদা লিলির বিশাল একটি তোড়া। 

-‘আমার মায়ের পছন্দের ফুলগুলো আমি চাই ওর হাতে ধরা থাকুক, তাই আগেই নিয়ে এলাম’। 

ক্রিষ্টোফার তখন তার পেশাদারী হাতে কিছু পিন আর স্কচটেপ দিয়ে নীপাকে সাহায্য করে। 

-‘ গোলাপ আমার মায়ের প্রিয় বটে, তবে বেশী প্রিয় ছিল শাদা রঙ্গের লিলি। বাবা ডিমেনশিয়ার কারণে ভুলে গিয়ে গোলাপের অর্ডার করেছিল। তাই আমি আবার গিয়ে এগুলো আনলাম। বেচারা বাবা, কি করে যে তাকে সামলাই!’ 

মৃতা মায়ের কপালে আলতো চুমু খেয়ে মেয়ে জানায় যে তাদের হাতে বেশী সময় নেই। অতিথিরা চলে আসার আগে মা’য়ের দেহটি হলঘরে নিতে হবে। 

মেয়েটি কালো জুতোর টিকটিক শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলে নীপা আংটিতে ফিরে আসে। তিনটি আনায়াসে বিভিন্ন আঙ্গুলে ঢুকে পড়ে। জিনেতের আঙ্গুল শক্ত আর ফোলা ফোলা। শেষেরটি নির্বিবাদে কনিষ্ঠায় প্রবেশ করানো যায়। চারধারে কালো ক্ষুদে পাথর বসানো ঝকঝকে শাদা হীরাটির দিকে তাকিয়ে ‘বাবার ডিমেনশিয়া’ শব্দ দুটো নীপার মগজ কেটে কেটে গেঁথে যায়। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় সে, জিনেতের হাতদুটো আড়াআড়ি বুকের নিচে রেখে বড় লিলির ডাঁটা একটু টেনে ফুলের পাপড়িতে আঙ্গুল ঢেকে দিয়ে সহসা উত্তেজনা বোধ করে নীপা। 

তার ল্যাবকোটের পকেটে টিস্যুপেপার, আংটিটা টুক করে সেই পকেটে চালান করে দেয়। 
ভয়, কিছু আতংক আর উত্তেজনা মিলে হৃদপিণ্ড ধপ ধপ করে, সে শব্দ নিজের কানে শুনতে পায় নীপা। জিনেত কি হঠাৎ তার দিকে চোখ মেলে চেয়ে আছে? 

মেহগনি ক্যাসকেটে সুসজ্জিতা জিনেতকে টেনে হলঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার পর নীপা কিছুক্ষণ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। 

প্রতিদিন ল্যাবকোট খুলে কর্মচারীদের জন্য বরাদ্ধ তার লকারে রেখে যায় নীপা। মাঝে মাঝে ধুয়ে আনতে বাসায় নিয়ে যায়। আজকে নেয়ার প্রশ্ন ওঠে না। আজকে থাক, লকারেই থাকুক। লকারে তালা আটকানোর নিয়ম নেই এখানে। কেউ কারো লকার ধরে না। কিন্তু আংটির যদি খোঁজ পড়ে! 

তাহলে, লকারের মধ্যে ল্যাবকোটের পকেটে পাওয়ার কিছুটা অজুহাত বানানো যায়। মনের ভুলের, তাড়াহুড়োর। দ্রুতগতিতে মাথায় যুক্তি সাজাতে বসে নীপা। 

ভেন্ডিং মেশিন থেকেই এককাপ কফি কেনে। পেছন দরজা দিয়ে বাইরে গেলে বিস্তীর্ণ কবরস্থান। সারি সারি এপিটাফ। যৌবনবতী রোদের বিকেলবেলা, কতগুলো রাজহাঁস সদলে খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেলো, ওদের বুকের সাদা আর ছাই রং ছোপ দেখতে পায় নীপা। ফিউনেরাল হলের ঝাউগাছের বেড়ার ভেতর থেকে দু একটা মরা পাতা উঁকি দিচ্ছে। এরা শীতেও মরে না, শীতের আগে রং ও ধরে না। হয়তো অসুখ করেছে! গাছের অসুখ! মানুষের ভেতরে ঝাউগাছ ভাব আছে, কিন্তু স্বভাব আদৌ আছে কি? তারা তো শীত গ্রীস্ম সব ঋতুতেই মরে! 

মূহূর্তের জন্য আংটিটা কথা ভুলে গিয়েছিল নীপা। আবার মনে পড়তেই নিজেকে সাঁতার না জানা ডুবন্ত মানুষের মত মনে হলো। 

লকার রুমে গিলবার্ট নিজের ল্যাবকোট হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি নিচ্ছে। ধুয়ে আনবে। 

আড়চোখে দেখে নীপা। নিজেরটাও নিয়ে নেবে নাকি? দু’জনে নিয়ে গেলে স্বাভাবিক দেখায়। 

-তোমার কাছে বাড়তি পলিথিনের ব্যাগ হবে? আমার ল্যাবকোটটাও নিতাম, ধুতে। 

- না, নেই। গায়ে চাপিয়ে নিয়ে যাও না, রাস্তাঘাটে শাদা ল্যাবকোট দেখলে লোকে ভক্তি করে’, গিলবার্ট রসিকতা করে। 

নিজেকে চৌকশ আবিস্কার করে মুগ্ধ হয় নীপা। কেমন স্বাভাবিকভাবে ল্যাবকোট হাতে ঝুলিয়ে বের হয়ে এলো! পকেটে টিস্যুপেপারের সঙ্গে হীরার আংটি। এই আংটি কিনতে নীপাকে কম করে হলেও আরো দু’তিন বছর সঞ্চয় করে যেতে হতো। 
... 

সুমন বাসায় না থাকায় অন্যান্য দিনের মত বিষাদ্গ্রস্থ হয় না নীপা। সে ল্যাবকোট সাবানে ভিজিয়ে আংটিটাও সাবান দিয়ে ধোয়। নিজে ভালো করে গোসল সারে। ডাইনিং টেবিলে আংটিটা সামনে রেখে ভাত খায়। যেন আংটিটা জীবিত কেউ, এমনভাবে টুকটাক কথাবার্তা বলে। 

একবারের জন্যও আঙ্গুলে পরেনি সে। আয়ত্বের মধ্যে আছে, যখন খুশী আঙ্গুলে গলিয়ে নিলেই হলো, তবু কেমন অচেনা অনুভূতি হচ্ছে! 

কোথায় যাবে সে এই আংটিটা পরে? আগে দেখুকতো কেমন দেখায়? প্রতিসপ্তাহে নেইলপলিশ রাঙ্গানো আঙ্গুলে এবারের রং রক্ত লাল। নীপার ফর্সা সরু আঙ্গুল। 

খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে আংটিটা টেনে নেয় নীপা। আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছে তার অনামিকা। আরো অবাক কান্ড- একদম ঠিক মাপে হয়েছে। একটুও ঢলঢল করছে না। 

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে কীযে ভালো লাগছে! এতদিনে কেমন আনায়াসে একটা হীরার আংটি হলো তার! 

সারাদিনের উত্তেজনা, ক্লান্তি কাটাতে একটু বিছানায় গড়ানোই যায়। গ্রীস্মকালের দীর্ঘ বিকেলে এই কাজে অনুশোচনা হয় না। আর তাছাড়া আজকে সুমনের ফেরা পর্যন্ত জেগে থাকা দরকার। 

ভাতঘুম ভেঙ্গে কিছুক্ষণ মাথা ফাঁকা লাগে নীপার। তারপর ধা করে আংটির কথা মনে পড়ে। হাত তুলে চোখের সামনে আনে সে। সূর্য ঢুবে গেছে বা যাচ্ছে, তাদের দোতলার এপার্ট্ম্যান্টের বারান্দায় সন্ধ্যা সামান্যক্ষণের জন্য স্থির। আংটির পাথর ঠিক জ্বল জ্বল করছে, কিন্তু তার অনামিকা কেমন বিশ্রীরকম শক্ত আর ভয়ানক ঠান্ডা। ধড়ফড় করে উঠে বসে নীপা। 

আংটি দ্রুত খোলার জন্য আঙ্গুল দিয়ে আঙ্গুল মুচড়ে চলে, কিন্তু এমন আটোসাঁটো হয়ে বসে গেছে, কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। 

দমবন্ধ করা অস্থির লাগে। ডানহাত দিয়ে বাঁহাতের অনামিকা টেনে লাল হয়ে গেছে। চামড়া উঠে আসবে! সাবানের খোঁজে দ্রুত বাথরুমের দিকে দৌড় দেয় নীপা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন