রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

আফসানা বেগম 'এর গল্প : কোথায় পাব তারে

প্রায়ই কালনি নদীর আশেপাশে চক্কর দিয়ে আসতাম। বহুবার যাওয়াতে নদীর তীরের গ্রামগুলো মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। অলিগলি, চালাঘর, ঘরের সামনের সাদা থোকার গন্ধরাজ, ঘাস-ঝোঁপঝাড়ের রাস্তা, সব। চোখ আটকে যেত ছিটেফোঁটা সবুজে, অথচ সেই প্রথম দিনের চোখেই জায়গাগুলোকে দেখতে পেতাম। কোথায় ঘাসগুলো জমাট রক্তে আঁঠালো হয়ে আছে, কোথায় ধুলোর মধ্যে আধাখাওয়া একটা লাশ পড়ে আছে- কাক কিংবা শকুনের কালচে ধূসর পালকে লাশের ক্ষয়গুলো ঢেকে আছে, না-চাইতেও সেভাবেই তারা চোখে ধরা দিত। সমস্ত কিছু স্পষ্ট সামনে আসত কেবল সেই মেয়েটি ছাড়া, যাকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজতাম।

লালের সঙ্গে নীল মেশালে বেগুনি, আবার নীলের মধ্যে হলুদ দিলে সবুজ, অথচ অন্ধকারের সঙ্গে মেশালে প্রত্যেকটা রঙ হয়ে যায় কালো। কুয়াশাঘেরা মধ্যরাতে মেয়েটির শাড়ির রঙ, গায়ের রঙ, সবকিছুই বিস্তীর্ণ অন্ধকারের সঙ্গে মিশে ছিল। পরে তার কথা ভেবে চোখ বুজলে তাকে সাদাকালো ছবির মতো দেখতাম। বিন্দুমাত্র আলোর প্রতিফলন ছাড়াই মেয়েটির গালের উপরে চকচকে আভা ছিল, নাকের ডগায় আর খুতনিতে ঘামের কয়েকটি স্বচ্ছ ফোঁটা তার মতোই ভয়ে-আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপছিল। পরে বুঝেছিলাম, নভেম্বরের শুরুতে সিলেট অঞ্চলের ওই তুমুল শীতেও কতটা তীব্র উত্তেজনা হলে ওভাবে কেউ ঘামতে পারে। 

যে রাতে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম, কেবল প্রথম নয়- প্রথম এবং শেষ, তারপর আর কখনোই আমি তাকে দেখিনি, সেই রাতের আগের দিনের কথা বলছি। কালনি নদীর পাড়ের দিরাই গ্রামে ছিল এক বিশাল বাঁশবাগান। বাঁশের পাতাগুলো দিকে তাকালে কানের মধ্যে ঝিরিঝিরি শব্দ হতো। ওই শীতেও পাতাগুলো তেলতেলে। ওই অঞ্চলের মতো সরু বাঁশের পাতা দেখে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। বাঁশবাগানের পাশে পাতার ছাউনি দেয়া এক কৃষকের বাড়ির জানালা দিয়ে তাই পাতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দিরাই গ্রামের কৃষকের বাড়িটিতে আমরা পনেরোজন আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের ক্যাম্প ছিল দূরে। রাতের অন্ধকারে ক্যাম্প থেকে অল্পস্বল্প গোলাবারুদ আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একদিন সেই বাড়িটাতে উপস্থিত হয়েছিলাম। নদীর উল্টোদিকে শাল্লা অঞ্চলে পাক সেনাদের আস্তানাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। ক্যাম্প থেকে এতটা দূরত্ব পেরিয়ে এসে এক রাতের মধ্যে নদী পার হয়ে সেখানে হামলা করা কোনো কাজের কথা হতো না। তাই হামলার পাঁচ দিন আগে আমরা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ওখানে থাকা শুরু করলাম। রাতের অন্ধকারে অস্ত্র আর খাবারের ব্যগগুলো কৌশলে কয়েক মাইল দূরত্ব পার করে সেই বাড়িতে এনে জমা করতে লাগলাম। আমাদের জন্য পাশের দেশ হয়ে কিছু খাবার আসত। বেশিরভাগ আসত টিনে অথবা প্যাকেটে ভরা সামুদ্রিক মাছ। সেসব কবে নদী কিংবা স্থলপথে আমাদের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দিত কে জানে। হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে টিনের কোথাও ফেটে, প্যাকেট ছিঁড়ে মাছগুলোতে ছোটো ছোটো পোকা হয়ে যেত। ক্যাম্প থেকে কয়েক মাইল দূরত্বে সেই টিন আর প্যাকেটগুলো ঘাড়ে করে নিয়ে যেদিন আমাদের গোপন আস্তানা, কৃষকের ওই বাড়িটিতে পৌঁছেছিলাম, দেখলাম ঘাড় বেয়ে পোকাগুলো আমার শরীরে নেমে এসেছে, সারা গায়ে সাদা সাদা পোকারা কিলবিল করছে। হয়ত শীতে, কিংবা আতঙ্কে তাদের উপস্থিতি আমি টের পাইনি। পৌঁছানোর লক্ষ্য যখন দৃঢ় হয়ে ওঠে তখন ছোটোখাটো অস্বস্তি জানান দেয় না। টিনগুলো জায়গামতো রেখে নির্বিকার পায়ে বাইরের অন্ধকারে গিয়ে গায়ের কাপড় খুলে ঝেড়ে নিয়েছিলাম। তা ছাড়া, পৌঁছানোর প্রথম শর্ত তো বেঁচে থাকা, তাই পোকা বেছে নিয়ে শুকনো রুটি পেঁচিয়ে মাছগুলো খেতে আমাদের কখনো খারাপ লাগেনি। মাসখানেক আগে ছাতকের বিজয়ের পরে মনোবল এত বেড়ে গিয়েছিল যে আমরা তখন উড়ন্ত জাহাজে ঢিল ছুঁড়তে পারি, সামান্য অস্ত্রসহ বুক পেতে এক প্লাটুন মিলিটারির মোকাবেলা করতে পারি। 

ওই বাড়ির জানালার পাশে, ওটা ঠিক জানালা নয়- বেড়াটা চৌকো করে কিছু অংশ কেটে রাখা, সেই চৌকো ফাঁকের পাশে ঘরটির কঙ্কালের পাঁজরের হাড়ের মতো একটা বাঁশে হেলান দিয়ে আমি বাঁশবাগানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ঘরের খুঁটি সেই বাঁশটির দুটো গিঁটের মাঝামাঝি পয়সা জমানোর জন্য দেড় ইঞ্চিমতো কাটা। ওই কাটা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতাম, যে মিশনে যাচ্ছি সেটাই জীবনের শেষ মিশন হতে পারে, জীবনের শেষ রাতগুলোর কথা লিখে এখানে একটা চিঠি ফেলে রেখে যাব কি? কেউ কোনোদিন পাবে, কোনাদিন কেউ তো অন্তত জানবে যে এই ধূসর আকাশ, এলোমেলো বাঁশের বাগান, ওই লাল পাথুরে মাটি, এইসমস্তকিছুর জন্য একজন মানুষ নিজের অস্তিত্ব বাজি রেখেছিল! বাজিই বটে, কারণ তখন বুঝতে পারতাম, স্বাধীনতাই একমাত্র ধারণা যার প্রভাবে মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাড়নায় আস্ত অস্তিত্বটাই বাজি রাখে। 

একটা নির্দিষ্ট রাতের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমরা। বাঁশগাছগুলোর সবচেয়ে উঁচু হেলে পড়া ডগাটাকে অতিক্রম করে আমার দৃষ্টি উপরে চলে যেত; কিছুই পেত না অবশ্য। উপুড় করা ঘোলা কুয়াশার ঢাকনা কেবল ঘিরে রাখত বাড়িটাকে। সমস্ত আকাশ আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের কথা বলত তখন- বলত কেবল একটিই শব্দ, অনিশ্চয়তা। জানালা গলে দিন গড়িয়ে যাওয়া দেখতাম, দেখতাম কী করে সামান্য রোদের ঝিলিক এসে রাতকে দখল করে আর বিকেলের আবছায়া এসে হটিয়ে দেয় উজ্জ্বল আলোকে; মন বলত, আমাদের অনিশ্চয়তাও একদিন থাকবে না। 

কথা ছিল পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে চাঁদের আলোর সম্ভাবনা একেবারে অনুপস্থিত হয়ে এলে আমরা নদীর অন্য তীরের শাল্লা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই যে রাতে আমরা যাব সেদিন সকালে সেখান থেকে পাক আর্মি ধিরাই গ্রামে এসে উপস্থিত। তারা কি ওই গ্রামে আমাদের অস্তিত্বের কথা জেনে ফেলেছিল? এটা এখনো আমার কাছে ধাধাঁ হয়ে আছে। যেদিন রাতে আমরা তাদের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেব বলে ঠিক করেছিলাম, তারা এসেছিল সেদিন সকাল দশটায়। থমথমে পরিস্থিতিতেও ওরকম সময়ে গ্রামের লোকেরা ঘর থেকে বেরোত, জীবনের আরেকটি নতুন দিনে পা রাখায় অবিশ্বাসের চোখে পৃথিবীর দিকে তাকাত। কেউ জীবনের প্রয়োজনে পসরা নিয়ে বাজারের দিকে হাঁটা দিত আর কেউ জীবনের প্রয়োজনেই যেত সেসব কিনতে। যার বাড়িতে আমরা ছিলাম, তার বারো বছর বয়সি ছেলে সকাল সকাল কচি বাঁশের কঞ্চি হাতে ছুটে এল, ‘মিলিটারই আইছে মিলিটারই আইছে।’ শেষ হেমন্তের ধান মাড়াই ফেলে রেখে উঠোনের মাঝখান থেকে ছেলেটির বাবা ছুটে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। ধানের তুষ লেগে থাকা ঘন ভুরু কুঁচকে বাচ্চাটার দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে থাকল। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের ব্যবহারের সমস্তকিছু খড়ের গাদায় ঢোকানো হয়ে গেল। সামান্য কিছু অস্ত্রসহ আমরা আশ্রয় নিলাম বাড়ির পেছনের ডোবায়। শীতে শুকোতে শুকোতে সেখানে পানি কম আর জোঁকে পূর্ণ। অথচ কী অদ্ভুত কারণে পাক বাহিনী গ্রামের শেষ প্রান্তের বাঁশবাগান পেরিয়ে ওই বাড়িটাতে এল না। শীতল পানিতে ডুবে ডুবে রুদ্ধশ্বাস দুপুর পার করলাম আমরা। একসময় সেই ছেলেটিসহ তার বাবা এসে মিলিটারি ফিরে যাবার কথা জানাল। ডোবার পানিতে ডুবে থাকার সময়ে আমাদের মধ্যে একজনের পায়ুপথে একটা জোঁক সোজা ঢুকে গেল তার পেটে। মিলিটারি চলে যাওয়ার কথা শুনতেই সে পড়ি কি মরি করে উঠে এল পানি থেকে। এতক্ষণ যে চিৎকার সে গোপন করে রেখেছিল, মিলিটারি চলে যাবার খবরে লাল উঠোনের এমাথা ওমাথা গড়াগড়ির সঙ্গে সঙ্গে সেসব চিৎকার তারস্বরে তার গলা দিয়ে আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে এল। পানিতে এক পোয়া লবণ গুলিয়ে চেপে ধরে তাকে খাইয়ে দেয়া হলো। বিকেলের পড়ে যাওয়া আলোর সঙ্গে সঙ্গে তার আর্তনাদও দমে এল। কুয়াশার মধ্যে চাদরে গা-মাথা পেঁচিয়ে আমরা গ্রামের পরিস্থিতি দেখতে বেরোলাম তার পরপর। চোখে কিছু দেখার আগেই রক্তের গন্ধে নিশ্বাস নেয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। বাড়ি আছে, দেয়াল নেই; ঘর আছে, মানুষ নেই। যেন ভয়ার্ত কোনো জনগোষ্ঠী রাতারাতি জায়গাবদল করেছে। কোনো চুলায় তখনো ধোঁয়া উঠছে, পাশে রক্তের সরু ধারা এসে থমকে আছে। কোথাও ধুলোর মধ্যে পড়ে আছে দুতিনটে লাশ, লেপ্টালেপ্টি করে, যেন আজন্মের বন্ধুত্ব ছিল তাদের। কোথাও উঠোনের ধারের উঁচু বারান্দায় নিষ্প্রাণ উলঙ্গ নারী উন্মুক্ত চোখে গভীর অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে। কোথাও দুটো শিশু দুদিক থেকে তাদের মায়ের লাশ ধরে টানাটানি করছে, ক্ষিদে পেয়েছে নিশ্চয়। 

আমাদের উপস্থিতিতে গ্রামে এমন অনাচার ঘটে গেল, এ যেন আমাদেরই অপারগতা। ফিরে গিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। রাত দশটা বাজতেই রওনা। নদী পেরিয়ে পাক বাহিনীর উপরে অতর্কিতে হামলা করা আমাদের উদ্দেশ্য। অস্ত্রসহ গুটি গুটি হেঁটে কালনি নদী পর্যন্ত পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। দিনের বেলা দেখা জায়গাগুলো অন্ধকারে অপরিচিত, কেবল বাতাসে ভেসে বেড়ানো রক্তের গন্ধটা চেনা। দুদিন আগে নৌকোবাঁধা যে ঘাট হয়ে দ্রুত অন্য পারে চলে যাবো বলে ঠিক করা হয়েছিল, সেখানে এসে দেখলাম কেবলই স্থির কালো পানি, নৌকোর কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের দলের কারো কারো নিশ্চিত জানা ছিল যে কালনির ঠিক ওই ঘাটটাতে বাঁশের সঙ্গে কয়েকটা নৌকো বাঁধা থাকে। ভাবলাম, অন্ধকারে দিকনিশানা ভুল হলো না তো? আমাদের চামড়ায় ততদিনে কালশিটে ধরে গেছে, সামান্য ছড়িয়ে গিয়ে নৌকো খুঁজতে গেলে মনে হলো প্রত্যেকে একা, অন্ধকারে সামান্য দূরত্বে উধাও। পায়ের নীচে ধারাল কাঁকর আর বালুর অস্তিত্বই কেবল পরিচিত যেন। ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি অথচ নৌকোগুলো হারিয়ে ফেলেছি ভেবে অসহায় লাগল। কিন্তু ছোট্ট একটা খালের মতো নদীর কাছে হেরে যাব? ওই গোলাবারুদ নিয়ে সাঁতরে গেলে সেসব আর কোনো কাজে আসবে না। এতদিনের প্রস্তুতি নেয়া মিশনটা ভেস্তে যাচ্ছে ভেবে বালুর উপরে আছড়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। কিন্তু কী যেন এক অদম্য ঘৃণা বা ক্রোধ সারা শরীরে তুমুল ছোটাছুটি করছিল। কালো কুচকুচে পানির দিকে তাকিয়ে বিকেলে দেখা ক্ষতবিক্ষত লাশগুলোর মরীচিকা দেখতে লাগলাম। উদ্ভ্রান্তের মতো আশেপাশের বেশ খানিকটা এলাকা খুঁজে এসে অথর্ব আমরা সেই ঘাটে স্তব্ধ হয়ে থাকলাম। কোনো কথা নেই তখন আমাদের মুখে, হাতের ভারী অস্ত্রগুলো মাটিতে রাখতেও ভুলে গেলাম। তারপর হঠাৎ কেঁপে উঠলাম একটা কিছুর ধেয়ে আসা দেখে। বালুর শেষ প্রান্তের ঝোঁপঝাড়ে আলোড়ন তুলে কিছু যেন একটা বেরিয়ে আসছে, কোনো জন্তু কি? আসছে ঠিক আমাদের দিকেই। রাইফেল তাক করলাম। দৃষ্টিসীমার মধ্যে এলে দেখি মানুষ! একটা মেয়ে। ওই শীতে ফিনফিনে শাড়ি তার গায়ে কোনোরকমে জড়ানো। শাড়িটা হাঁটুর সামান্য নীচে নেমেই চওড়া পাড়ের বৃত্তে শেষ হয়ে গেছে, গায়ে ব্লাউজ নেই। কোমর ছাপানো কোঁকড়ানো অবিন্যস্ত চুলে ঘাড়-গলা ঢেকে আছে। আমাদের স্থির নির্লিপ্ত মুখের বিপরীতে তার মুখে উৎকণ্ঠা। 

‘মুক্তি? মুক্তি নি?’ কাছে আসার সামান্য আগেই চিৎকার করছিল সে। কাছে এসে নিশ্চিত হয়ে নিল আমাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দ্রুত বারকয়েক চোখ বুলিয়ে। তারপর আঙুল উঁচু করে একদিকে হাত বিস্তৃত করল, ‘ওবায়দি আও, আমি দেখছি। সব নাও ডুবাইয়া রাখছে। আমি জানতাম আফনারা আইবা।’ স্থবির হয়ে যাওয়া আমাদের শরীরে হঠাৎ বিদ্যুৎ সঞ্চার হলো তখন। মেয়েটির দেখিয়ে দেয়া দিকে ছুটে যেতে লাগলাম। সে এগোল আমাদের আগে আগে; যেতে যেতে একই উত্তেজনায় বলে গেল, ‘​সারা গাওঅর​ মানুশ্রে মারিয়া জাওয়ার শময় নাও অখল্ রে ডুবাইয়া রাখিয়া গেলও । আমি দেখছি। আমি হেতুকুই জানতাম আফনারা আইবা।’ 

আমরা তাকে কোনো প্রশ্ন করিনি। তার কথায় বা উত্তেজনায় আমাদের মধ্যে কোনো ভাবাবেগও আসেনি। নদী পেরোনোর জন্য কোনো একটা উপায়ের তখন এত দরকার আমাদের যে সৌজন্য বলে কিছু ছিল না। সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা-ও ঘুণাক্ষরে ভাবিনি, জানতে চাইনি। উড়তে থাকা ফিনফিনে শাড়ির পিছনে অন্ধকারে অন্ধের মতো ছুটছিলাম শুধু। সব জায়গা একইরকম কালো, এর মধ্যে সে কী করে নির্দিষ্ট জায়গাটা বের করে ফেলেছিল, আমার জানা নেই। মনে হচ্ছিল কুয়াশার পরদা ছিঁড়েখুঁড়ে কেবল অনন্ত রহস্যের দিকে ছুটছি। রহস্যের শেষ হলো একখানে গিয়ে। 

‘অউজে অখানও। ডুব দিয়া নাও উটাইতে অইবও,’বলে সে পানিতে হাঁটু পর্যন্ত নেমে গেল, দেরি যেন না হয়, তাই নিজেই ডুব দিয়ে সে নৌকোগুলো ভাসিয়ে দেবে। আমি পিছন থেকে তার হাত টেনে ধরলাম। সে থামল আর হাঁফাতে শুরু করল শেষ পর্যন্ত। আমাদের দলের দুজন ডুবে গিয়ে একটা একটা করে তিনটা নৌকো ওঠালে আমরা তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র নৌকায় রাখলাম। মেয়েটি ততক্ষণে ছুটে গিয়ে কোথা থেকে তিনটা লগি হাতে নিয়ে হাজির। খানিকটা পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলেও নৌকো ছাড়ার আগমুহূর্তে আবারও হাঁটুপানি পর্যন্ত এগিয়ে এল, ‘জাউক্কা সবগুলারে মারিয়া আইঞ্জাইন।​ ​এখটাও জেনো বাছতে না ফারে।’ পিছনে অন্ধকারের দিকে অর্থহীনভাবে ইশারা করে বলল, ‘আমি হউ জুফর মাজখানে থাখমু । খেউ জেনো বাছতে না ফারে।​’ 

নৌকো সামান্য এগোতেই উত্তেজিত মেয়েটি তো বটেই লম্বালম্বি তীরটাও হাওয়া হয়ে গেল। একইরকমের অন্ধকার কেটে কেটে অন্য পারে গিয়ে নৌকো ঠেকল একসময়। পনেরোজন তিন ভাগে ভাগ হয়ে সামান্য আগে পরে চলতে লাগলাম আমরা। আসন্ন মুখোমুখি যুদ্ধের সংকল্পের কাছে মেয়েটিসহ জীবনের পিছনের বাকি সমস্ত স্মৃতি তখন উবে গেছে। ঘাঁটিটাতে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম পূর্ব পরিকল্পনামতো। মাঝরাতে গোলাগুলির শব্দে শাল্লা আর মিলনবাজার এলাকার মানুষেরা ছুটে এল খানিক পরে। শত মানুষ এক হয়ে শত্রুদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারলাম সত্যি, ঠিক ওই মেয়েটির ইচ্ছের মতো। 

ফিরে আসতে আসতে পরদিন বিকেল গড়িয়ে গিয়েছিল। কমবেশি সবাই খোঁড়াচ্ছিলাম। গিয়েছিলাম পনেরোজন, ফিরেছি এগারো। মুখে কোনো কথা ছিল না, চোখেও কোনো পানি ছিল না আমাদের। ধুলো-রক্ত-ঘামে মিশে শরীরে কেবল একটা বাড়তি চামড়া বসে গিয়েছিল। কয়েক মাস ধরে দুতিনটে গ্রামের লোকদের উপরে চালানো অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে। তবু আমরা জানতাম যে ফূর্তি করার সময় হয়নি তখনো, আরো অনেক বাকি। ফেরার সময়ে নৌকো ঠিক সেখানেই স্থির ছিল যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা। গ্রামের মানুষেরা আমাদের ধরাধরি করে নৌকোয় উঠিয়েছিল, বেয়ে নদী পার করিয়েছিল। তীরে পৌঁছে ওই মেয়েটির কথা বা তার প্রতিশ্রুত অপেক্ষা করার কথা আমার একবারও মনে পড়েনি। 

তাকে আমার মনে পড়ল তিনদিন পরে। কৃষকের বাড়িতে শুয়ে জানালা দিয়ে যে সন্ধ্যায় বাইরের অন্ধকারকে অনায়াসে বাঁশঝাড়সমেত বাড়িটাকে গ্রাস করতে দেখছিলাম, সেই সন্ধ্যায় অন্ধকারের কালোর মধ্যে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো তার মুখ ভেসে উঠল। উরুতে গুলি লেগেছিল, খুঁড়িয়ে কোনোরকমে নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছলাম তখনই। কিন্তু তারপর? কোথায় খুঁজব তাকে? তিনদিন ধরে সে ওই ঝোঁপে অপেক্ষা করছে, এ তো অসম্ভব। ঝোঁপের পাশে গিয়ে ভাবলাম চিৎকার করে ডাকি তাকে, কিন্তু কী বলে ডাকব? আমি কি তার নাম জানতাম! ওই তুমুল শীত আর কুয়াশার মধ্যে মধ্যরাতে কোথা থেকে সে উদয় হয়েছিল আর কোথায়ইবা মিলিয়ে গেছে, কিছু নিয়েই বেশিদূর ভাবতে পারলাম না। বালুর মধ্যে ধপ করে বসে পড়ে মনে হলো জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল করা হয়ে গেছে, কেন তার পরিচয় জানতে চাইনি? সবাইকে যে মারা হয়েছে, এই খবরটা তাকে জানানোও তো জরুরি ছিল! 

দুঃশ্চিন্তায় ডুবে সে রাতটা পার করে সকাল হতেই ধিরাই গ্রামের যাকে সামনে পেলাম তাকেই মেয়েটির কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম। একেকটা বাড়িতে ঢুকে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে শুরু করলাম একসময়। কারো মুখের সঙ্গে মিলল না। কেউ বলতে পারল না। কেউ মানতেও পারল না যে ওই গ্রামে এমন কোনো মেয়ে আছে যে ওরকম সময়ে মধ্যরাতে নদীর তীরে ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে মুক্তিবাহিনীর অপেক্ষা করতে পারে। তাকে যে হারিয়ে ফেলেছি তা আমার জন্যও মানা কষ্টকর ছিল। গ্রামের মানুষজনের তখন একটাই মত, জানতে চাইলেই ঠোঁট উলটে জানায়, এই সময়ে কে কোথা থেকে আসে আর রাতারাতি কে কোথায় চলে যায় তার কি কোনো ঠিক আছে? ওই গ্রাম ছাড়িয়ে আশেপাশের গ্রামেও খুঁজতে লাগলাম আমি; সেদিন, পরদিন, তারও পরদিন... 

যুদ্ধ শেষ হলো। নিজের জায়গায় ফিরলাম। তৃপ্তির তুলনায় অতৃপ্তি বড়ো হতে লাগল। বারেবারে দিরাই গ্রামে গিয়ে হাজির হলাম, যেতে থাকলাম কদিন বাদেবাদেই। অভিন্ন প্রশ্নসহ আমাকে গ্রামের মানুষদের মুখস্ত হয়ে গেল। মেয়েটির কোনো বর্ণনা দিতে পারি না। তার মুখের উপরে একে তো ছিল অন্ধকার, তার চেয়ে বড়ো হয়ে উঠল ধুলো, ধীরে ধীরে স্মৃতির উপরে যা জমতে লাগল। প্রায়ই ভাবতাম, তার নাম কী হতে পারে, অঞ্জনা নদীর পাশে যদি রঞ্জনা থেকে থাকে, তবে কালনির পাশে সে কি শালনি হতে পারে না? মনে মনে তাকে শালনি বলেই ভাবতাম। কিন্তু শালনিকে খুঁজে পেলে কী করব বা কী বলব সে পর্যন্ত ভাবনা এগোত না। 

মনে নেই কবে দিরাই যাওয়া বন্ধ করেছিলাম। শুধু মনে আছে, শালনিকে আমি আর কখনো খুঁজে পাইনি। সবাইকে মারা হয়েছিল, জরুরি এ খবরটা তাকে আর কখনো জানানো হয়নি। 

...........................................

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন