রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

রঞ্জনা ব্যানার্জী'র গল্প: গাছ



ছাদে উঠলেই একধরনের অস্বস্তি হয় মায়ার। পারতপক্ষে ছাদে ওঠে না সে। আজ বুয়া আসে নি তাই উঠতেই হল; তাও আবার দু’বার। একবার কাপড় মেলতে আরেকবার কাপড় তুলতে। দুপুরে যখন কাপড় মেলতে এ’ল তখন দেখেছে লিয়াকত কাকুকে। নামাজ পড়ে ফিরছেন সম্ভবত। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়েছিল ও।
এক ঝলক দেখা তাও মনে হল কাকু বুড়ো হয়ে গেছেন; বাবার চেয়েও বুড়ো। চার বছর! সময় আসলেই বানজারান। বুকের ভেতর কোথাও ডাহুক কাঁদে, স্মৃতির ডাহুক; অজান্তে হাত চলে যায় চোখের কোণে। আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে অমসৃণ সেই দাগ। কাকুর কান্না ভেজা আওয়াজ বাতাসে ভাসে,

-মা’রে মনে করে দ্যাখ চেনা কেউ নয়তো? 

ও বলে নি।বলতে পারেনি। কচি গলায় স্মৃতির অতল থেকে কেউ ডেকে উঠেছিল,

-মায়া দি ভোকাট্টা! 

কাকুরা যে ফিরেছেন তা জানা গেছে নতুন বুয়ার বয়ানে। এই বুয়া ও বাড়িতে সিঁড়ি ধোয়। নতুন বাড়িটার যাওয়া আসার রাস্তা এখন উল্টো দিকে। বিশাল ব্যাপার। আন্ডার গ্রাউন্ড গ্যারেজ, সিকিউরিটি। রাস্তা থেকে এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের অবয়ব দেখে যেটুকু বোঝা যায় ভেতরের শান নাকি তারচে’ বেশি। কুড়িটা ফ্ল্যাটের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী ছ’টা কাকুদের। কেবল দুটো রেখে বাকিগুলি রিয়েল্টারকেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেই ফ্ল্যাট দু’টোতে এতদিন ভাড়াটে ছিল। গত মাসেই বাবার মুখে শুনেছিল কাকুরা ফিরবেন। 

পাড়ার দোকানে কেউ একজন বলেছিল বাবাকে। সেদিন মায়া বাথরুমে কল ছেড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব বড়ই অচেনা ঠেকছিল। ডান গালে চোখের কোণে আড়াআড়ি ছুরির টান, ইঞ্চি খানেক। কায়দা করে চুল কেটে ঢেকে রেখেছে। ডাক্তার বলেছিল দৈবক্রমে চোখটা বেঁচেছে। আধা সেন্টিমিটার এদিক ওদিক হলেই চিরকালের জন্যে অন্ধ হয়ে যেত ওর চোখ। নিজের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল মায়া। জল গড়ায়নি এক ফোটাও। 

ছাদে যখনই ওঠে মন না চাইলেও চোখটা ঝাঁপায় নিচে।’পষ্ট বোঝা যায় মাটিটা টোল খেয়ে আছে। মা বলে ওর মনের ভুল! মাটি ঢালা হয়েছে বিস্তর তাও সমান হয়নি। কত বছরের পুরোনো শেকড়! মাটি যেন গর্ভচিহ্ন ধরে রেখেছে! 

বাড়িটার মাথার ওপর এখন এই একটুকরো আকাশ। ছাদে না এলে তা দেখারও জো নেই। ভেতরের
ঘরগুলোতে দিনের বেলায়ও আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে উঁচু উঁচু সব বাড়ি। শুরুতে
রিয়েল্টাররা যখন খাঁ সাহেবের বাড়ি ভাঙতে শুরু করল তখন বাবা আর লিয়াকত কাকু কী বিরক্তই না

হতেন! সিমেন্টের গাড়ি, ইটের গাড়ি, সকাল নেই বিকেল নেই সারাক্ষণ হইচই। মিস্ত্রিদের ভিড়। বাতাসে কিড়মিড় বালির আঁচল উড়ছে সদাই। আর কেমন একটা গুমগুম ধাতব আওয়াজ। সেই সময় সন্ধের আগে ছাদে ওঠা বারণ ছিল মায়া আর ফাহমিদার। এরা দুজনই তখন বড়; ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার। ডালিয়া আপার বিয়ে হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগেই। 

মায়া আর ফাহমিদার স্কুল একই হলেও কলেজ গিয়েছিল পাল্টে। দুই কলেজ। মায়া সাইন্স আর ফাহমিদা আর্টস। সারাদিনের সব কথা জমে প্রাণ আইঢাই। কত কী ঘটে কলেজে! বাড়িতে মা কিংবা চাচি-আম্মার

কান এড়িয়ে সব বলার জো আছে? মাঝে মাঝে রাতে পাড়া নিঝুম হলে মায়াদের ছাদের সিঁড়িতে বসে
দু’জনের ফিসফিস - কত গল্প! নিম গাছটার মাথার আগায় চাঁদটা উবু হয়ে পাহাড়া দিত ওদের। এ ছাদ
থেকে ও ছাদে যাওয়ার জন্যে মইটা ফিট করাই থাকত। 

আহা সেই সব বুক ঢিপঢিপ দিন! দুপুরে কাক ডাকলেও মন উড়ু উড়ু! আর এখন দুপুর কিংবা রাত
কোনটাই সুনসান নয়। শব্দের ভিড়ে শব্দ মরছে যেন। আলাদা করতে হ’লে খুউব করে কান পাততে
হয়। অথচ একসময় দুপুরে কারো বাড়িতে সদর দরজা খোলার আওয়াজও পৌঁছে যেত অন্য সব বাড়িতে।

পুরোনো এই এলাকার বেশির ভাগ জায়গারই মালিক খাঁ সাহেব। তবে তিনি বা তাঁর পরিবার এ বাড়িতে
থাকতেন না, এমনকি এ শহরেও নয়। খাঁ সাহেব চাকরিসূত্রে দীর্ঘদিন লাহোরে ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর চাটগাঁয় নয় ঢাকায় থিতু হন। বাড়িটায় থাকত ষণ্ডা মত একজন কেয়ার টেকার। খুব সম্ভব খাঁ সাহেবের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। কালেভদ্রে ঢাকা থেকে গাড়ির বহর নিয়ে আসতেন খাঁ সাহেব। পাড়ার লোকেরা আগাম বুঝতে পারতো কারণ মেরাপ বেঁধে বাড়ি রঙ করা হ’ত তখন। তাঁর ছেলেমেয়েদের প্রায় সবাই বিদেশে, শোনা কথা। পাড়ার কারো সাথেই এদের মেলামেশা ছিলনা। হঠাৎ জানা গেল খাঁ সাহেবের ক্যান্সার। কী এক এলেবেলে রোগের চিকিৎসার জন্যে লন্ডন গিয়েছিলেন ছেলের কাছে। সেখানেই ধরা পড়ল কাল ব্যাধি বসত গেড়েছে শরীরে। খবরটা ফিকে হওয়ার আগেই একদিন জানা গেল খাঁ সাহেবের জমি সব বিক্রি হয়ে গেছে।

বাড়িটা আর থাকবে না, বিশাল হাউজিং কমপ্লেক্স হবে। লিয়াকত কাকুই খবরটা দিয়েছিলেন।

-সুধাংশু আর শান্তিতে থাকা যাবে না।

সত্যি সত্যিই মজা পুকুরটা চোখের সামনেই ভরাট হয়ে গেল। রিয়াল্টরের হাত খাঁ সাহেবের এলাকা ছেড়ে যায়নি তখনও।এইচ,এস,সি’র পর মায়া রংপুর মেডিকেলে চান্স পেল আর ফাহমিদা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, আইন বিভাগে। ফাহমিদার সাথে প্রতিদিন মেসেজ চালাচালি তো হতোই মাঝে মাঝে ফোনেও কথা হতো। ওদের নিজেদের কথার ভিড়ে পাড়ার খবর নেয়ার ফুরসত কোথায়? মাঝে ছুটিতে মায়া বাড়ি এসেছিল। সপ্তাহ খানেক ছিল। মাঠটাকে ঘিরে খাঁ সাহেবের বাড়ি ভাঙার কর্মযজ্ঞ চলছে তখনও। তিনমাস পরে ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল শেষে মায়া যখন আবার বাড়ি ফিরল তখন পাড়াটা আমূল পালটে গেছে। রাস্তা বড় হয়েছে। আগের বার সাহা বাবুর বাড়িটা আস্ত দেখে গিয়েছিল এবার সেটা বেমালুম গায়েব! ওখানে ছাতার নিচে মহিলা পুরুষ দিনভর ঘাড় গুঁজে ইট ভাঙছে। পাথরে হাতুড়ির ঠংঠং ঘাই মগজে গিয়ে লাগছে সটান। হোঁচট খেল পিয়ালকে দেখেও। এক্কেবারে অন্য মানুষ। এসএসসি পরীক্ষা শেষ করলো সবে। সেই ছোট বেলার আদুরে পিয়াল নেই আর! মাথায় বেড়েছে অনেকটাই। সিগারেট পোড়ানো কাল ঠোঁট, কথার ঝাঁঝ।

মা বললেন আজকাল বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের ছেলেদের সাথে ওঠাবসা ওর। লিয়াকত কাকু খুব
টেনশনে থাকেন কখন কী হয়! কাজের বুয়া আর মা’র টুকরো কথায় অনেক কিছু জানা হয় মায়ার।সাহা বাবুর বাড়িটা বিক্রির পেছনে নাকি সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের পান্ডাদের হাত আছে। সাহা বাবুর পনের বছরের মেয়েটাকে উঠিয়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল। এক রাতের সিদ্ধান্তে সাহা বাবু ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন। সেকি? হ্যাঁ, মায়ার বাবাকেও চাপ দিচ্ছে। বাবা চিরকালের একরোখা ঘাড় ত্যাড়া মানুষ। 

-বাড়ি দিচ্ছি না আমি। লাশের ওপর হেঁটে নেবে নিতে হ’লে। একাত্তরে পালাই নি দেশ ছেড়ে। এখন
পালাবো? দেশ স্বাধীন করেছি প্রাণ বাজি রেখে, রিয়েল্টরের বাপ যুদ্ধ করেনি। মজা লোটার দল এরা।
তখনও লুটেছে এখনো লুটছে।

মা রুমকীকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে সারাক্ষণ। বুক কাঁপে মায়ারও। রুমকী বড় হয়েছে। সাহা বাবুর মেয়ের কাছাকাছিই বয়েস। কী সুন্দর দেখতে! মায়ার চেয়ে ঢের সুন্দর।

পরের সপ্তায় লিয়াকত কাকু হঠাৎ জানালেন তিনি ভাবছেন রিয়েল্টরের প্রস্তাব নিয়ে। বাবা রেগে কাই।

-বাপদাদার ভিটে, কী আক্কেল লিয়াকতের? 

মা কিন্তু কাকুর পক্ষে,

-না ভেবে কী করবে? ছেলেটাকে তো বাঁচাতে হবে!

ক’দিন পরে রাস্তার মোড়ে রুমকীকে নিয়ে রিকশায় ওঠার সময় কেউ একজন জোরে শিস দেয় । রিকশা থামিয়ে মায়া এগিয়ে যায় রুমকীর হাতের টান ছাড়িয়ে।

- কে দিল? 

মায়ার কান দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে রীতিমত। সব নতুন চেহারা। পাড়ায় দেখেনি আগে। চোখে আমোদ নিয়ে তাকিয়ে থাকে ওরা মায়ার দিকে। ঠিক তখনই পিয়াল হেঁটে আসছিল গলি দিয়ে। রুমকীর ডাকে থমকায়।

মায়াকে দেখে। চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করে,

-কী সমস্যা?

জটলা থেকে কেউ একজন চেঁচায়,

-ম্যাডাম ফুলি! 

সবাই হো হো হেসে উঠে। 

মায়া ভেবে পায় না কী করা উচিত; ঘুরিয়ে চড় দেবে না হার মানবে? পিয়াল বলে ওঠে,

-যেখানে যাচ্ছ যাও না!

মায়া অবাক হয়ে দেখে রাজ্যের বিরক্তি ওর চোখে মুখে। অভিমানে ওর চোখ ফেটে জল আসে। যাওয়া হয় না কোথাও। বাড়ির দিকেই হাঁটতে থাকে ঘুরে। রুমকীও রিকশা থেকে নেমে পিছু নেয়।

বাড়ি ফিরে মায়া বুক ভাসিয়ে কাঁদে। ছোট বোনটার সামনে অপমান! রুমকীর মুখে সব শুনে ফেলেছিলেন বাবা। ব্যস নিয়ম-জারি হয়ে গেল! 

-ছুটিতে যে ক’দিন আছ যখন তখন বেরিও না আর। 

একদিন বিকেলে বাবার চেম্বারে হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি! ঘটনা কী? এলাকার মেম্বর সাহেব এসেছেন
রিয়েল্টরের লোকজন নিয়ে। বাবা যদি বাড়ি বেচতে নাও চান নিম গাছটার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
এর ডালপালা তো বটেই শেকড়ও দেয়ালের ওই প্রান্তে ছড়িয়েছে। কমপ্লেক্সের প্ল্যান ঠিক রাখার জন্যে এই গাছ কাটতে হবেই। আশপাশের সব বাড়ি ‘টাওয়ার অফ হেভেন’ এর আওতায় চলে এসেছে কেবল এই বামন বাড়িটা স্বর্গের নান্দনিকতায় চোখের অসুখের মত রয়ে গেছে। ওপরতলায় কারা কারা এই রিয়েল্টরের পরিচিত তারও একটা ছোটখাটো ফিরিস্তি দিলেন মেম্বর সাহেব। বাবা বুঝে গেলেন সংখ্যালঘু লেবেলের জুজুটা নাড়ানো হচ্ছে শেষ অস্ত্র হিসেবে। 

এই নিম গাছটা কেবল ঔষধি নয় একে নিয়ে অনেক গল্প আছে দুই পরিবারে। মায়াদের কাছে সবচে’ প্রিয় ছিল, লিয়াকত কাকুকে নিয়ে সেই গল্পটা। কত বার যে শুনেছে! আম্বিয়া দাদি বেঁচে থাকতে পানের বাটা থেকে পান সাজাতে সাজাতে বেশ সময় নিয়ে কাকুর পালানোটা হাইলাইট করতেন আর ঠাকুরমা যখন বলতেন তখন পাকসেনারা কীভাবে গৃহলক্ষ্মীর দোলা লাথি মেরে উলটে দিয়েছিল সেই ঘটনার সুতো টানতেন অনেকক্ষণ। দু’জনের মুখেই একই ঘটনা ভিন্ন প্রাণ পেত। গল্পটা ওদের চার জনের ঝাড়া মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। মায়ার বাবা আর লিয়াকত কাকু একাত্তরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। একসাথে। বাবা বা কাকুর সরাসরি রণাঙ্গনের অপারেশনের চাইতে এই গল্পটাই বেশি মন কাড়তো ওদের। নিম গাছটাই ওদের কাছে ‘একাত্তর’ হয়ে গিয়েছিল।

ঘটনাটা ছিল এমন- শহরে কোন এক অপারেশনের আগে লিয়াকত কাকু লুকিয়ে এসেছিলেন বাবা মাকে কদমবুসি করতে। পাড়ার একমাত্র বিহারী রহমান সাহেবের কনিষ্ঠ পুত্র সুলায়মান, লিয়াকত কাকুকে কীভাবে যেন দেখে ফেলে এবং পনের মিনিটের মাথায় পাক আর্মির গাড়ি চলে আসে পাড়াতে। লিয়াকত কাকু এই নিম গাছটা বেয়েই ছাদ থেকে মায়াদের বাড়িতে নেমে যান এবং পেছনের দেয়াল টপকে নিরাপদে অন্য গলি ধরে পালিয়ে যান। দিনে দুপুরে মুক্তিকে ধরতে না পেরে দু’বাড়ির বাবা মাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়েছিল পাকিরা। ঠাকুরমার লক্ষ্মীর দোলা লাথি দিয়ে ভেঙে দিয়ে গিয়েছিল। আসমা ফুফু আর আমেনা ফুফু তখন বালিকা। খাটের নিচে দাদির ট্রাঙ্কের পেছনে গুটিসুটি লুকিয়ে ছিল। দু’দিন পরেই লিয়াকত কাকুর বাবা দুই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ড্যাঙ্গাপাড়ায় তাঁদের গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের সেই শেষ পাঁচ মাস দাদু ঠাকুরমা লিয়াকত কাকুদের বাড়িতেই ছিলেন। 

অথচ মায়ার সেবারের ছুটিতেই দু’বাড়ীর সম্পর্কের অদৃশ্য দেয়ালটা তৈরি হয়। বাড়ি ভাঙবে তাই ভাড়া
বাড়িতে লিয়াকত কাকুদের মালসামাল পারাপার শুরু হয়ে গিয়েছিল। বখাটেদের সামনে পিয়ালের সেই অভব্যতা ভোলেনি মায়া,তাই ওমুখো হয়নি। কেন যেন সেবার ফাহমিদাও খুব একটা খোঁজ করেনি।এক দুপুরে হঠাৎ রিয়েল্টর কোম্পানির লোকেরা বলা নেই কওয়া নেই সটান ঢুকে গেল বাড়িতে। গেটটা কেউ খোলা রেখেছিল। বাবা তখনও কোর্ট থেকে ফেরেননি। গজ ফিতে নিয়ে কী সব মাপামাপি! বাবাকে মোবাইলে জানাল মা। তার আগেই মা’র সাথে ওদের এক দফা কথা কাটিকাটি হয়ে গিয়েছিল। গাছটা নাকি কাটতেই হবে। সুয়ারেজ পাইপে শেকড় চলে গেছে। 

-কে বলল?

-মিউনিসিপ্যালটির লোকজন। 

গেটটা তখনও হাট করে খোলা। লিয়াকত কাকুও হয়তো খবর পেয়েছিলেন কোনভাবে; তিনিও ঢুকলেন বাবার পিছু পিছু। বাবা কাকুকে দেখেই রেগে গেলেন হঠাৎ। সব দোষ যেন লিয়াকত কাকুর! 

-তুমি এখানে কী? তামাশা দেখতে এসেছ? 

কাকু কিছু বলবার আগেই হঠাৎ পিয়াল চেঁচিয়ে উঠল

-মুখ সামলে কথা বলবেন কাকা!

মায়া অবাক। পিয়াল কোত্থেকে এল?

বাবার মুখের কথা যেন মুখেই রয়ে গেল। কাকু সামলে উঠেই ডাক দিলেন। পিয়াল কিন্তু থামল না। চোখ লাল করে উত্তর দিল, 

-আপনে থামেন আব্বা। উনি আপনার সাথে এভাবে কথা বলেন কোন সাহসে?উনার গাছ বেশি না বাড়ির

ড্যামেজ বেশি? 

মায়ার মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল! বারান্দা থেকে ছুটে গিয়ে ঠাস্‌ করে ওর গালে চড় বসিয়ে দিল।

পিয়াল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ তারপর ছুটে বেরিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় মায়া নিজেও ভড়কে গেছে। এটা কী করল! বাবাও অবাক প্রথমে তারপরেই প্রচন্ড ধমকে উঠলেন,

-যাও ভেতরে!

প্রায় সাথে সাথেই হুঁশ ফিরল মায়ার। হাতটা টনটন করছিল। কী জোরে চড়টা লাগিয়েছে! আহা পিয়াল। মায়ার মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে ধরে নিয়ে আসে, আদর করে মাথার চুল ঘেঁটে দেয় ঠিক ছেলেবেলার মত। 

-কেন বড়দের সাথে মুখ করতে গেলি?

সেদিন গভীর রাতে বিকট আওয়াজে পরপর দু’টো পটকা ফুটলো মায়াদের গেটে। সকালে উঠেই বাবা থানায় গিয়েছিলেন ডায়েরি করতে। অফিসার চেনা লোক। বাবাকে উপদেশ দিলেন,

-চাচা বাড়ি রিয়েল্টরকে দিলে ক্ষতি কি? আপনি তো ফ্ল্যাট পাবেন। দুই মেয়েরেই দুই ফ্ল্যাট আর আরেকটাতে আপনি থাকেন। দরকার হলে আরও একটা ভাড়া দেন। সমস্যাতো দেখি না।

বাবা বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে বসে ছিলেন অনেকক্ষণ। সেই রাতেই বাবা সিদ্ধান্ত নেন রুমকীকে পাঠিয়ে দেবেন শান্তিনিকেতনে। মায়ার ছুটি তখন প্রায় শেষ। শহরটা ছাড়তে পারলেই বাঁচে ও। কিছু জামা কাপড় সেলাতে দেয়া হয়েছিল। এইসব উটকো ঝামেলায় দর্জির দোকান থেকে আনা হয়নি আর। বাবা বাড়ি ছিল না সেই সন্ধ্যায়। মায়া এই সু্যোগে মাকে রাজি করিয়ে বাড়ি থেকে বেরুলো। দর্জির সাথে আগেই মোবাইলে কথা হয়েছে। গলির মুখেই রিকশা পেয়ে গেল। দর্জির দোকানটা কাছেই। সন্ধে বসেনি ভাল করে তখনও। জামার প্যাকেটটা রেডি করে রেখেছে দোকানদার। রিসিট মিলিয়ে গুনে নেয়া আর দাম দেয়া, সব মিলিয়ে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। রিকশাওয়ালাকে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াতে বলেই দোকানে ঢুকেছিল মায়া। বেরিয়ে দেখে রিকশাওয়ালা মোবাইলে কারো সাথে কথা বলছে। মায়াকে দেখে কথা না থামিয়েই জিজ্ঞেস করল’

-‘কাম হয়ে গেসে আপা?’ 

মায়া বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না। চুপচাপ রিকশায় উঠে বসল। রিকশাওয়ালাও মোবাইল শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। কিছুদূর যেতেই রিকশার চেইন পড়ে গেল। রিক্সা থামিয়ে উবু হয়ে চেইন তুলছিল রিকশাওয়ালা। জায়গাটা যে খুব সুনসান তাও নয়। মায়া কি অন্যমনস্ক ছিল? কখন যে তিনজন ঘিরে দাঁড়িয়েছে দেখতে পায়নি ও। ছুরিটা চকচক করছিল ল্যাম্প পোস্টের আলোয়। সব কটার মাথায় বানরটুপি।

- বেশি বাড়াবাড়ি করতেস কিন্তু তুমি, আপামনি। 

মায়া কিছু বোঝার আগেই একজন ঠাস্‌ করে চড় লাগিয়ে দিল ওর গালে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিল না মায়া। হাত পা জমে শক্ত। চেঁচাতে ভুলে গেছে। একটু দূরে কেউ একজন দোকানের দড়ির আগুন থেকে বিড়ি জ্বালাচ্ছে, মায়া দেখতে পাচ্ছে কিন্তু ওর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছিল না।

ছুরি হাতে ছেলেটা চোখের সামনে ছুরি নাচিয়ে বলল,

-তর বাপেরে বলবি এই দেশে থাইকতে হলে আমাগোর কথা শুনা লাগব। বাড়ি এখন দাম দিইয়া কিনতে চাইতাসে এরপর কিন্তু এমনি এমনিই হাতায়া নিমু। আর তখুনি মায়ার চোখ আটকালো রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়ানো ছেলেটার হাতে। ছেলেটার কব্জির ওপর

কুচকুচে কালো জরুল! ভয় ডর সাথে সাথে উধাও মায়ার। 

-পিয়াল! 

ছুরি নাচাচ্ছিল যে ছেলেটা সে ভড়কে গিয়ে হাত চালাল। মায়া মাথা সরাতে গিয়েও পারল না চোখের কোণে চিড়িক করে টান খেল ছুরির ফলাটায়। হাত তুলে ধাক্কা দিতে গিয়ে লাগল’ হাতে। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল ও রিক্সা থেকে। জ্ঞান হারাবার আগে মায়ার মনে হ’ল ঝলমলে একটা ঘুড়ি গোত্তা খেয়ে নামছে নিচে আর ফর্সা সরু দু’হাত খুশিতে চমকাচ্ছে! 

-ভোকাট্টা মায়াদি! 

আহা সেবার সুতোয় কাচের গুড়ো আর গদ মিশিয়ে জটিল মাঞ্জা দিয়েছিল মায়া। জেতাতেই হবে পিচ্চিকে।একটাই ভাই দুই বাড়ি মিলিয়ে। সারোয়ার হোসেন পিয়াল! ডান কব্জিতে কুচকুচে কালো জরুলের মিষ্টি পিয়াল। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরেও ঘোর কাটছিল না মায়ার। জড়ুলওয়ালা হাতটা মগজে হাততালি দিয়ে চেঁচাচ্ছে অবিরাম,

-মায়াদি’ ভোকাট্টা! 

হাসপাতালে অনেকে এসেছিল। এসেছিলেন লিয়াকত কাকুও। রিকশাওয়ালার খোঁজ পাওয়া যায় নি। সেই ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করছিল

-চিনতে পেরেছিলেন কাউকে?

লিয়াকত কাকু বলছিলেন 

- মা’ রে মনে করে দ্যাখ চেনা কেউ নয়তো! 

মাথা নেড়েছিল মায়া। চেনেনি কাউকে। চাচি-আম্মা পরেরদিন মায়াকে হাসপাতালের বেডে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন দীর্ঘক্ষণ। মায়া চিনেছিল মায়ের কৃতজ্ঞতা আর লজ্জা মেশানো সেই কান্না! 

পাঁচদিন পরে গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল ফাঁকা জায়গাটা। নিম গাছটা নেই! বুকের ভেতরটা মনে
হয়েছিল কেউ খুবলে তুলে নিয়েছে। বাবা নিজেই লোক ডেকে কাটিয়েছেন। আরও পরে বিনা বাক্যে দু’হাত জায়গাও ছেড়ে দিয়েছিলেন নামমাত্র মূল্যে; কমপ্লেক্সের গ্যারাজের জন্যে। ও হাসপাতাল থেকে ফেরার আগেই লিয়াকত কাকুরা চলে গিয়েছিলেন বাড়ি ফাঁকা করে। পিয়ালকে দেখে নি কেউ আর। পরে শুনেছে ও আমেরিকায়। কাকু আরেকদিন এসেছিলেন ওকে দেখতে। বাবা কথা বলেননি। চাচি-আম্মা বা ফাহমিদা আসেনি। মা অবাক হয়েছিল, মায়া নয়। 

সময় থেমে থাকেনি। কেবল দিনগুলি আর এখন আগের মত নয়। মায়ার মেডিক্যাল ফাইনাল ইয়ার প্রায় শেষ। রুমকী শান্তিনিকেতনে। বাড়িটা বাবা বিক্রি করে দেবেন ক্রেতা খুঁজছেন। রিয়েল্টর নয় অন্য ক্রেতা। মায়ার জন্যে ছেলে খোঁজা হচ্ছে; প্রবাসী পাত্র অগ্রাধিকার। মায়ার এতদিনের লেখাপড়ার কী হবে? বাবাকে বোঝানো মুশকিল। বাবা বলে,

-একদিন এই দেশকে আমার নিজের ভেবেছিলাম। বোকা ছিলাম। জান বাজি রেখে পাকিস্তানী
তাড়িয়েছি। কখনও ভাবিনি আমাকে নিজের দেশের মানুষকেই ভয় পেতে হবে। 

উঁচু বাড়িটার দিকে তাকায় ও। ছাদটা ইচ্ছে হলেও আর পার হওয়া যাবে না। উচ্চতার তফাৎ অনেক।দশ তলার বিশাল ছাদ। মাটি নেই ওখানে; গাছেরা টবে বাঁচে। আকাশ নয় ব্যালকনির ছাদের তলায় বসত ওদের। কতদিন ফাহমিদাকে দেখেনি! চাচি আম্মার চোখের জলের ওম এখনও কাঁধে জমে আছে। চোখে ভাসে বানর টুপির ভেতর থেকে তাকিয়ে থাকা অবাক দু’চোখ। কেমন আছে সে?

মা ডাকছে মায়াকে, নামতে হবে এবার। কাপড় গুলো ভাঁজ করে তুলে নেয় মায়া। হঠাৎ তিরতির হাওয়া ছুঁয়ে যায় ওকে। আরামে চোখ বুজে আসে যেন! মনের পর্দায় চিরল পাতার সবুজ সেই ডাল দোলে। চোখ জ্বলে মায়ার। সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে চোখ চলে যায় আবার সেই টোল খাওয়া মাটির খাদে। এই বাড়ি, এইসব মানুষ, এই আকাশ, এই সবকিছু কি ওর গত জীবনের কথা হয়ে থাকবে? মাটি তো ভোলেনি গাছটার উন্মুল চিহ্ন তবে ও কীভাবে ভুলবে? মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় মায়া, ও কক্ষনো যাবে না এ দেশ ছেড়ে; জীবন থাকতে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন