রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প ঃঃ অন্ধকারের শাহজাহান


নাম-না-জানা একটি হাওয়া আকাশ থেকে সোজা নেমে এসে মাটির একটা বড়ো অংশ জুড়ে পড়ে থাকা ধুলোকে বল্লমগাঁথা করে নিয়ে স্যাঁত করে তুলে দিয়ে সাংঘাতিকভাবে উপড়ে ফেলে দিল। ধুলোর ভিতরে থাকা একটা কাঠবিড়ালী, দুটো গিরগিটি এবং আরও কয়েকটি কীটপতঙ্গের লেখাপড়া না জানা বেচারা দেহগুলো মাঠি থেকে ফুট চারেক উপরে উঠে বিষেণ সিং বেদির মতো স্পিন দিয়ে আবার মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে পাক্কা ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ।
ধুলোটা অবয়বহীন কালোপাহাড়ের মতো দিগন্তের কাছে উঠে গিযেছিল ঘূর্ণি তুলে। তারপর ধীরে ধীরে প্রথমে বুকের কাছে, তারও পরে ঘরঘর শব্দে মন্থনদণ্ডের মতো নেমে আসে মাটির ওপর। ঘরঘর শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

এই ঘটনাটা আজ থেকে দিন পনেরো আগে মাদপুর স্টেশনে ট্রেন ঢোকার মুখে মুখে দেখে ফেলে তমাল বসু। ব্যাপারটা ও ছাড়া ওই কামরার আর কারও চোখে পড়েছিল কি না, তা ও বলতে পারে না। চোখে না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, হাওড়া থেকে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তখানেক বাদে ও যে কামরায় দৌডে উঠে এসেছিল, সেটি প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত। কামরার আর প্রত্যেকটি মানুষই অন্ধ। দিনটা তখন ঘন্টা চারেকের মতো পুরনো হয়ে গিয়েছে। পৌনে ন'টা বাজে ঘড়িতে। তমাল বসুর বাবা বিজয় বসু ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। এরকম একটা সমযেই বাড়ি থেকে বেরোতেন রোজ। তিন বছর আগে চাকরি থেকে রিটায়ার করেন। বাথরুমে গেলে কথনও ছিটকিনি লাগাতেন না। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে স্নান সেরে প্রত্যেকদিন তাঁর হুইস্কি চাই। দু’পেগের পর শুরু হতো ফক ফক করে হাসি। তখন সে আড়াই বছরের শিশু। তিন পেগ সম্পূর্ণ করার পর একেবারে ভিতর থেকে নিখুঁত টাটকা ঝকঝকে একটা ‘হাম্বা’ ডাক বের করতেন। মিনিট পাঁচেক টানা গম্ভীর ডাকটা চলত একভাবে। পাল খাওয়ানোর সময় এমনধারা ডাক বাতাসে ছড়িয়ে দেয় গরু। তারপর তাঁর জন্য আসত রুটি-তরকারি। ধর্ম-কর্মে কোনও মতি না থাকা সত্বেও তমাল যে কারণে গরুর মাংসটা খেতে পারে না কখনও। খাওয়াদাওয়ার পর বিজয় বসু চিঠি লিখতে বসতেন। চিঠি লিখতেন হিটলারকে। চিঠির শ্রদ্ধেয় হিটলার দত্ত... বিজয় বসুর কী এক ধারণা ছিল, মৃত্যুর পর সব মানুষের পদবিই 'দত্ত' হয়ে যায়। কোনও কোনওদিন 'দত্ত'র বদলে 'বাবু'-ও বসত। সেটা সম্বোধন। ওইদিন তার মতে তার সঙ্গে যে যে অন্যায় ব্যাপারগুলো ঘটেছে, তার লিস্টি তুলে দিযে হিটলারের উদ্দেশে চিঠি লিখতেন। প্রত্যেক চিঠির শেষটা এক। 'ব্যাপারটায় আপনি হস্তক্ষেপ করবেন, এই আশা করি'... 

লিখতে বসে তিনি উল্টোদিকের দেওয়ালে তাকিয়ে থাকতেন শূন্যচোখে। মুখখানা ভরন্ত। গায়ের রং রীতিমতো ফরসা। চোখে চশমা। সেই চোখ মনের একদম গভীরের চিন্তাকে ভেতরে ভেতরে সিগন্যাল দিচ্ছে...

চিঠি সম্পূর্ণ করার পর সেটির স্থান হতো বাডির উঠোনে রাখা ময়লার বালিতে। বিজয় বসু অত্যাচারী হতে চেযেছিলেন। সাহসী এবং অত্যাচারী। চিঠি লেখার পর ঘরে ঢুকে বউ পেটাতেন। ছেয়েছিলেন বড়ো ছেলেটিও তাঁর মতো হোক। কিন্তু, তমাল হয়ে পড়ল একজন ভীরু প্রকৃতির মানুষ। একত্রিশে পড়েছে সবে। লোক বুঝে বয়স কমায় বা বাড়ায়। কখনওই একেবারে ঠাঠা সত্যিটা বলে না। পুরোপুরি সত্যি কথাকে ওর বরাবরই মনে হয়, ছিরিছাঁদহীন এক অন্ধকারতম গর্ত। সেই গর্তের লিকলিকে ছিপছিপে জিভ থেকে যখন তখন নীল বিষ ছিটকে এসে লেগে যেতে পারে গায়ে । তখন বিপদ।

এই বিপদের ভয় ওর সবসময়। বহু আগে একবার পাঁজিতে রাশিফলের জায়গাটায় লেখা থাকতে দেখেছিল- বিপদ আসলে আমাদের মতোই একজন মানুষ। যে, কখন কোথায় কীভাবে হঠাৎ সামনে এসে হাজির হবে, তা কেউ বলতে পারে না। পরে, একই কথা, একটু বেশি কায়দায়, বাংলা সিনেমা দেখতে গিয়ে লুফে নিযেছিল। যদিও, এই ব্যাপারটা প্রথম ওর মধ্যে বিজগুড়ি কাটতে আরম্ভ করে বছর চারেক ব্যস নাগাদ। খেলার সময় ক্যাচ ধরতে গিযে স্লিপ থেযে হুমড়ি খেযে কুয়োতে পড়ে যাচ্ছিল। হাতটা ধরে ফেলে সোনাদা। ওর বাঁ-হাতে বল। ডানহাতটা সোনাদার হাতে। পায়ের তলায় কুয়োর দুর্ভেদ্য শূন্য। কুয়োটা ওর দাদুর তৈরি করা। সোনাদার হাত ধরে ঝুলতে ঝুলতেই বলটা হাত ফসকে জলে চলে গেল। তারপর গেল হাওয়াই চটিটা। পয়লা বৈশাখে মা কিনে দিয়েছিল। কুয়োর জল থেকে পাঁকের গুমোট গন্ধ উঠে আসছে। সোনাদা হাতটা তখনও ছাড়েনি। ওকে ঘুম পাড়ানোর কায়দায় ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল- ভয় পাবি না। ভয় পাবি না... 

কিন্তু, ও ভযটা পেয়ে গেল। তা আর দূর হল না কখনও। কী যে এক ভয়! কীসের যে ভয়! কিছুই বুঝতে পারে না ও। কেবল, ভযের অসহ্য হিমহিম অস্তিত্বটা টের পায় নিজের মধ্যে। সেই হিম ওর খানাখন্দে ভরা মুখটায় লেগে থাকে সবসময়। ছোটোবেলার ইস্কুলের দিদিমণি থেকে শুরু করে পার্টির হোলটাইমার হয়ে কলেজের প্রফেসর- সবাই ওর সেই অল্প মাংস লাগানো দাঁত উঁচু মুখটার দিকে আঙুল ভাগ করে বলেছে- তুমি একটা ভীতু। জবুথবু। কী করবে জীবনে?!... 

মাদপুর স্টেশনে ওই ধুলো ওড়ানো হাওয়া দেখতে পাওয়ার কয়েকদিন আগে তিতলিও বলেছে ওকে প্রায় একইরকম কথা- তুমি একটা এক নম্বরের স্পাইনলেস স্কাউন্ড্রেল। ষোলআনা ইচ্ছে থাকলেও ক্ষমতা নেই কোনও... ও তখন তিতলির ওপর নতুন কেনা কাঁসার থালা হয়ে পড়েছিল। তিতলি ইংরাজিতে ভালো। মাধ্যমিকে নয়ের ঘরে কত একটা যেন নম্বর পেয়েছিল... 

মাদপুরের ধুলো ওড়ানো হাওয়ার ঘটনাটির কয়েক দিন কয়েক মাস বা কয়েক বছর আগে ঘটে গিয়েছিল এইসব। মাদপুর স্টেশনে বহুক্ষণ দাঁড়িযেছিল ট্রেনটি। হকারের কাছ থেকে জানলা দিয়ে হাত বাড়িযে ডিমসেদ্ধ নিল ও। দু'খানা ডিমসেদ্ধ৷ ছ'টাকা করে পিস। ওদের এলাকার থেকে এখানে একটু কমেই। স্টেশনের দু'পাশে অল্প করে জঙ্গল হয়ে রয়েছে। সেটা থেকে একটু চোখটা গভীরে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই জঙ্গলের পিছনের বিশাল মাঠগুলো ড্রপ খেয়ে চোখের সামনে চলে আসবে। এই মাঠের মধ্যে এরকম সময়ে খানিকক্ষণ ধরে আড়াআড়ি দৌড়তে পারলে জ্যান্ত মানুষটিও আকাশের কাছাকাছি খালি হাতেই পৌঁছে যায়। সেই মাঠের পর বিশাল পুকুর। তার ওপর মোষের শিংওলা মেঘ ঝুলে পড়েছে। সেটা মাটির দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমে। ট্রেনের দিকে এগিয়ে আসছে। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে জিনিসটা তমাল দেখতে পাচ্ছিল স্পষ্ট। এমন একটি জিনিসকে এগিয়ে আসতে দেখে ও ভয় পায়। বুকের ভিতর যতগুলো বাথরুম-বেডরুম-খাবার টেবিল রযেছে, একটি হাতুড়ির বাড়িতে সেগুলোর জোরে আওয়াজ করে ভেঙে যাওয়া টের পাচ্ছিল…

পিঠে পনেরো কিলো ওজনের ব্যাগটা নিয়ে এর কিছু সময় পর ও নামল খড়গপুর স্টেশনে। তারপর খড়গপুর থেকে বাসে খড়িকামাখানী। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে সময় লাগল ঘন্টা দুযেক। সেখানেও রয়ে গিযেছে ও, তা হয়ে গেল পনেরো দিন। এখানকার একটি ইস্কুলে পড়াতে এসেছে। কতদিন থাকবে, জানে না। এখনই বাড়ির জন্য মন কেমন করে। পাইলস নামের একটি জঘন্য অসুখে ভুগছে ওর মা। বাবা নেই। ভাইটা গ্র্যাজুয়েট হওয়ার বয়সে ক্লাস টেনে পড়ে। এখনও ফাঁকা পেলে মাঝেমাঝে মাটি তুলে খেয়ে নেয়। মা’কে বলে, দুদু খাব। তিনমাস বয়সে তমালের কোল থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে এরকম হাল। ও ভাবে এভাবেই যে- ভাইটা আমার জন্য পাগল হয়ে গেল। আর ওর মায়ের ভাবনাচিন্তার মধ্যে অন্য একটি হাওয়া আলো থেলে। মা বীরভূমের গ্রামের মেযে। পড়েছে ক্লাস টু অবধি। কিন্তু দেখেছে অনেক। চাল টিপে বলে দিতে পারে কোন ধান থেকে এসেছে। ছোটোবেলায় লম্পের আলোয় বুড়ো আংলা পড়া মানুষটা বহুদিন ধরে এই আনন্দে মত্ত হয়ে ছিল যে, একটি মেয়ে হওয়ার জন্য তার রক্তের ভিতরে যে হা-পিত্যেশ ভেসে বেড়াত, তা অবশেষে এল। তার গ্রামে সে কয়েকজনকে মেয়েকে এভাবেই দেখেছে মাটি খেয়ে নিতে। মাটির জিনিস খেয়ে নিতে। স্থানীয় হাট থেকে মাটির ভাঁড় কিনে নিয়ে যেত তারা। খাবে বলে। মাসিকের দিনগুলোতেই এমনটা বেশি করত তারা। তার মা ওই লাইনেই ভাবছিল, ঘরে একটা মেয়ে এল। সে ভাবছিল, সুকুমার রাযের ছড়া জিজ্ঞাসা করলে তিন ঘরের নামতা কেন বলে?! আর, তার বাবা, কযেকটি 'হাম্বা' ডাকের পর মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করত, সংসারের আসল জিনিসটি কে?... 

এই শেষের ব্যাপারটা ওর নিজের ধারণা। কোনওদিন বলতে শোনেনি। অবশ্য মনে মনে কেউ নিজেকে প্রশ্ন করলে অন্য কেউ তা শুনতে পাবেই বা কী করে! পরে, বাবার মৃত্যুর অনেক পরে ভেবে দেখেছে, ও চাইত বাবা ওরকম ভাবুক। বা, বলুক। ধারণা তো এভাবেই গড়ে ওঠে... 

এখন যেখানে তমাল থাকে, সেটা জঙ্গলমহলের ভিতরে। এখান থেকে অনেকটা আকাশ দেখা যায়। আকাশের একটু তলার দিকে, গোড়ালির কাছাকাছি, অন্ধকার স্তুপ হয়ে থাকে। তাদের চাহিদা খুব কম। সামান্য হাওয়া পেলেই সেই অন্ধকারটি ফড়ফড় করে ওঠে। গাছপালা, ইউক্যালিপটাসের পাতা, মাঠের ঘাস- কচি খুকীটি হয়ে মাথা দোলাতে থাকে মাধ্যমিক পাশ করার আনন্দ নিয়ে। পনেরো দিন হল এখানে এসেছে তমাল। গত পাঁচদিন ধরে এখানে একভাবে বৃষ্টি। অবিরাম। মনোটনাস। দুধের ভিতর ভালো করে পাটালি গুলে দিলে যে রং হয়, তা গায়ে মেখে আকাশটা সকাল থেকে গুমরোচ্ছে। কথা বললে তার ভিতর বৃষ্টির ছাঁট লেগে আপনা থেকেই সুর তৈরি হয়ে যায়। একটু তাড়াতাড়ি কথা বললে মনে হয় মুখ দিয়ে একটা বিঠোফেন বা ওপি নাযার বেরিয়ে গেল ঝট করে। বৃষ্টির পাতা থেকে জল পড়ার কোনও শব্দ হয় না। এমনকি, ব্যাপারটা দেখতেও যে খুব ভালোলাগে, তাও নয়। মনে হয়, হওয়ার ছিল, তাই হচ্ছে। অথচ এ নিয়ে কম তো শোনেনি! তমালের কবিতা লেখার অভ্যাস আছে অল্প। অবসর সময়ে মিল দিয়ে দিয়ে লেখার চেষ্টা করে। বেশ কয়েকজন আত্মীয়স্বজনের অন্নপ্রাশনের কার্ডে কবিতা লিখে ইতিমধ্যেই কিছু প্রশংসা অর্জন করেছে এই বিভাগে। তাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গেলে পাতে একটা মাছ বেশি পড়ে। এখানে বর্ষার মুখেমুখে আসার আগে কলকাতার কাছাকাছি একটি শহরতলীর বসু পরিবারের ছেলেটি ভেবেছিল- সকালে পড়াবে ইস্কুলে আর সন্ধেবেলায় একা একা বৃষ্টি দেখবে। তারপর তা নিয়ে কবিতা লিখবে। কিন্তু, এই পাঁচদিনে জঙ্গলের বৃষ্টির সঙ্গে খানিক পরিচয় হওয়ার পর বুঝতে পারল- এর থেকে বেশি অবসন্ন ও নিষ্ফল স্যাঁতসেঁতে ঘটনা খুব অল্পই আছে। এই পাঁচদিনের বৃষ্টির আগের দশদিনে ওর কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। শুভঙ্কর পয়রা, চন্দন দন্ডপাট, সাগ্নিক মণ্ডল, সন্দীপ ডুয়া, মনোরঞ্জন বারিক- এইরকম কিছু নামের মানুষ তারা। কেউ ইস্কুলে পড়ে। কেউ ইস্কুলে পড়ায়। কেউ স্বপ্ন দেখে কলকাতায় গিয়ে ভিক্টোরিয়ার পরীর পায়ে তাদের জমির ধান একটু ছড়িয়ে দিয়ে আসবে। কেউ রোজ বাইশ কিলোমিটার টানা সাইকেল চালিয়ে এসে মুদির দোকানের জোগাড়ের কাজ করে প্রত্যেকদিন সাড়ে তিনশো টাকা রোজগার করে। না আসতে পারলে, শরীর-টরীর খারাপ হয়ে গেলে আয় নেই।

এরা প্রত্যেকেই ছ’টা ঋতু আলাদা আলাদা করে চিনে ফেলতে পারে। প্রথমে বলতে না চাইলেও, একটু আড় কেটে গেলে অন্তত বত্রিশ রকমের ধানের নাম বলে যেতে পারে গরগর করে। রান্নায় ঝাল খায় খুব। খডিকার মোড়ের একটি হোটেলে থাকে ও। থাকা খাওয়ার খরচা দেয় ইস্কুল কর্তৃপক্ষই। তবে, পছন্দের জিনিসগুলো অনেকদিন খায়নি। যেমন- ইলিশ মাছের কোল, রুই মাছের পেটি, কচুর লতি, ফুলকপি দিয়ে ট্যাংরা মাছের ঝোল... 

রাত দশটার মধ্যেই এখানকার সব রাস্তাঘাট অন্ধকার। গাড়ি নেই। মানুষ নেই। ল্যাম্পপোস্ট নেই। কুকুর-বিড়াল নেই। সামনেই জঙ্গল। সেখান থেকে সব সময় হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে কেবল। এই কুকুর-বিড়ালহীন অন্ধকারের মধ্যেই প্রথমবার চোখে পড়ল জিনিসটা। জিনিস মানে, একটি মানুষের অবয়ব। অন্ধকারের মধ্যে একদম ছোট পেঁপে গাছটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। নড়ে না, চড়ে না। হাওয়া দিলে দোলেও না। একটি নিস্পন্দ দেহকে সটান দাঁড় করিয়ে দিলে সেটা যতটা অন্ধকার খেয়ে নিয়ে স্থির হয়ে থাকতে পারে, এটাও তেমন। খাওয়াদাওয়ার পর হোটেলের ছোট ব্যালকনিতে ও বসে থাকে। রাস্তাটি গোপীবল্লভপুরের দিকে চলে গিয়েছে। হোটেল থেকে যে মোড়ের মাথাটুকু দেখা যায়, তার থেকে গোপীবল্লভপুরে যাওয়ার রাস্তাটি ফুট দশেক মতো বেরিয়ে থাকে। দশ ফুট বাই আট ফুট। এখানে আসার পর থেকেই খুব শুনেছে ওই রাস্তাটি নিযে। “ওখানেই তো ওরা দাঁড়িয়ে থাকত গো, বাবু। ওখান দিয়েই বেশি। আসত। বিপুল ভান্ডার থেকে তেল-মশলাটা নে যেত। পয়সা মোটে দিত না। চাইলে ভয় দেখাত। কেউ চাইতও না যদিও। সবাই ওদের চেনে। চেনতো। এখন আর ওসব ভয় নেই”- এসে থেকে এখানকার অনেকের মুথেই কথাটা শুনেছে ও। শুভঙ্কর পয়রা ওর এক ছাত্র। তার কাকাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ওরা। শুভঙ্কর বলছিল- ভাত খেতে বসেছিল, স্যার। তারপর কাজে যাবে। বেলদার একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। কয়েকজন মুখে গামছা ঢেকে বাইকে করে এলো। তারপর তুলে নিয়ে গেল।

- তোমাদের বাড়িতে কেউ ছিল না ওই সময? কোনও পুরুষ মানুষ? জিজ্ঞাসা করেছিল তমাল। 

- ছিল তো। বাবা ছিল। বড় কাকা ছিল। দাদু ছিল। মাঠ থেকে এসে খেতে বসেছিল সব।

- সে কী! একজনও কেউ বাধা দিল না? বাড়ির ছেলেটাকে বেমালুম ভুলে নিয়ে গেল সবার চোখের সামনে থেকে! 

-কে বাধা দেবে, স্যার! ওদের সবাই ভয় পায়। পাশ থেকে আরেকটি ছেলে ফুট কাটল, ওদের পিঠে রাইফেল ছিল, স্যার! 

- তুমি দেখেছিলে সেদিন? 

- ওই দিন দেখিনি। 

- তাহলে জানলে কী করে?

- তার আগে তো অনেকবার দেখেছি। ওরা সবসময় রাইফেল নিয়ে থাকবে। আমাদের বাড়িতে খেতে এসেছিল একবার।

- ভাই? 

- হ্যাঁ। রাতের দিকে। এই আটটা-সাড়ে আটটা। 

- ওটা আবার রাত কী!

- আমাদের ওখানে ওটা খুব রাত স্যার। তখন ছ'টার পর আলো বন্ধ হয়ে যেত রাস্তার। কেউ বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবে না। 
- কী খেল?

- যা ছিল, ডাল ভাত আলুভাজা পটলভাজা একটা বড়া। সব খেয়ে গেল। বলল, চল্লিশ কিলোমিটার দূর থেকে এসেছে।

- তারপর আর আসেনি?

- ওই একদিনই এসেছিল। 

- তোমার নাম কী? 

- দীপঙ্কর জানা। 

- তোমার কাকা ফিরে এসেছিলেন, শুভঙ্কর? 

- না, স্যার। ওখান থেকে আর ফিরে আসা যায়? 

- কোথা থেকে? এই প্রশ্নে শুভঙ্কর চুপ করে থাকে। 

- বিয়ে করেছিলেন? 

- হ্যাঁ। দেড় বছর হযেছিল। কাকু চলে গেছে সাত বছর। কাকিও বাপের বাড়ি চলে গেছে। আর আসেনি তারপর। ওরা পরের কথা আগে বলে দেয়। আর প্রশ্ন করতে হল না তমালকে। ভালোই হল। ও এবার অন্য প্রশ্ন করল- তোমার বাড়ি কোথায়? 

- এখান থেকে বাইশ কিলোমিটার। 

এখানকার মানুষ সময়ের কথা দূরত্ব দিয়ে বোঝায়। তুমি কোথায় থাকো? - জানতে চাইলে বলে, এই তো সতেরো কিলোমিটার... 

তমাল ওদের নামগুলোও ভুলে যেতে থাকে। তার জায়গায় পড়ে থাকে- বাইশ কিলোমিটার, আঠারো কিলোমিটার, চব্বিশ কিলোমিটার, পাঁচ কিলোমিটার সাইকেলে-দু'কিলোমিটার বাসে-এক কিলোমিটার হাঁটা... প্রত্যেকেই স্কুলের ইউনিফর্ম পরা।

গত কয়েকটি বৃষ্টির রাত ধরেই মোড়ের মাথা থেকে ফুট দশেক মতো বেরিয়ে থাকে। যে রাস্তা, সেখানেই এসে দাঁড়ায় ওই অন্ধকার মূর্তিটি। হোটেলের ব্যালকনিতে বসে তা দেখে তমাল। ওর থেকে মূর্তিটির দূরত্ব বড়োজোর দশ মিটার। সে কোথা থেকে সামনে আসে, তা বুঝে ওঠা দুষ্কর হয়ে ওঠে। আকাশ থেকে বা মাটি খুঁড়ে অথবা বাতাস থেকেই চেহারা নেয় কি না- বলা যায় না। রাত দশটার পর পরই জায়গাটায় এসে দাঁড়ায় ওই মূর্তিটি। অন্ধকারের ভিতর দিয়ে আলাদা করে অন্ধকার দেখা যায় না। অন্ধকারটির প্রস্তুত হতে গেলেও কিছু আলোর প্রয়োজন। আলোর ভিতরের আলো ক্রমশ নিষ্প্রভ হতে হতে যে অজ্ঞাত স্থানটির জন্ম দেয়, তা-ই হল অন্ধকার। সমস্ত আলো তো আগ্রাসী অন্ধকারেই সঙ্গত। 

রাতে সাড়ে ন'টার মধ্যে খেয়ে নিয়ে তমাল হোটেলের বিছানায় শুয়ে মোবাইলে চালিয়ে দেয় রতনমোহন শর্মার বৃষ্টি রাগের বন্দিশ এবং তারানা। কখনও কখনও ভিমসেন জোশি বা আলি আকবর চালিয়ে দিয়েও বসে থাকে চুপ করে। চারপাশের গাছপালার এই আদিম-অফুরন্ত আয়োজনের মাঝে পড়ে তা একটুও হতোমতো না খেযে কোথায় যেন মিশে মিশে যেতে থাকে মুহূর্তের পর মুহূর্ত ধরে। যা শূন্য ছিল এতদিন, তা ভরভরন্ত হয়ে ওঠে। কতদিনের বিশাল এই ঝুলকালিমাখা পৃথিবী। কত শতাব্দীর পুরনো এই শাস্ত্রীয়সঙ্গীত। গরীব, না-খেতে পাওয়া হাভাতে মানুষও এর খাঁজে পড়ে আমির হয়ে ওঠে এক তুড়িতে।

ভীতু মানুষ তমাল বসু৷ কোনওদিন পুরোপুরি সত্যি কথা বলতে পারা মানুষ তমাল বসু। অথচ, একটা সামান্য সত্যি অল্প বৃষ্টির ভিতর এই অন্ধকার দিয়ে বানানো কাঠামোটিকে ব্যালকনি থেকে দেখতে দেখতে আচমকা টের পায় ও। এই কাঠামোটি কে বা কার, তা ও জানে না। এটা কি ওরা? নাকি, শুভঙ্করের কাকার মতো যাদের ওরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ফেরত দিয়ে যায়নি আর কখনও, তাদের মধ্যেই কেউ? ছোটবেলায় কুয়োর জলে ডুবে যেতে যেতে বেঁচে গিযেছিল ও। কুয়োর শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে পাঁকের জমাট গন্ধ জল থেকে উঠে ধক করে নাকে এসে লাগছিল। এই কাঠামোটিকে দেখতে পেলেই মনে হয়, এটি ওই পাঁক লেপে লেপেই তৈরি। গন্ধের চোটে বেশি কাছে যাওয়া যাবে না। প্রথম রাতে দেখে ও চমকে গিয়েছিল। তারপর ভয়। দ্বিতীয় রাতে ভয়টি বাড়ে। ব্যালকনির কালো রঙের দেওয়ালে ও টুথপেস্ট দিয়ে বড়ো বড়ো করে লেখে- আপনি কে? কোনও উত্তর পায় না। তৃতীয় রাত থেকেই ওর ধারণা হতে থাকে, এই বৃষ্টির মধ্যে কাঠামোটি মোড়ের মাথায় আসে মোবাইলে ওর চালানো গান শোনার জন্য। একটি ধারণা একবার তৈরি হয়ে গেলে যতক্ষণ না মনের নরম মাটিতে সম্পূর্ণ গিঁথে নিজেকে বিছিয়ে ফেলছে, ততক্ষণ মানুষের মুক্তি নেই। ধারণার স্বভাবই ওই। সে নিজেকে ছাড়াতে সময় নেয়। তমাল গান চালিযে ব্যালকনিতে বসে থাকে। অন্ধকার মূর্তিটিও দাঁড়িয়ে থাকে একভাবে।

শাস্ত্রীয়সঙ্গীত অনুরাগী তমাল বসু এটা ভেবে আনন্দ পায় যে, তার মতোই আরও একজন রয়েছে। মাস দুয়েক আগেও তাদের মধ্যে ব্যবধান ছিল হয়তো কয়েকশো কিলোমিটারের। এখন যা এসে দাঁড়িয়েছে বড়োজোর দশ মিটারে। হাওয়ার তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে একজনের অনুরাগ পৌঁছে যাচ্ছে অপরজনের কাছে। কেউ কাউকে চেনে না। এইভাবেই কেটে গেল আরও দুটো দিন। তখনই ওই সামান্য সত্যির ব্যাপারটা টের পেল তমাল। সেটি আসলে একটি প্রশ্ন। ওরা দুজনেই একই বিষয়ের অনুরাগী হলেও, তমাল যদি ওই মানুষটি হতো, তাহলেও কি রাতের পর রাত এভাবে বৃষ্টি মাথায় করে নিজেকে এতটা পিপাসার্ত রেখে অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত সে? প্রশ্নটি ওকে ভিতর থেকে চিড়ে ফেলল আড়াআড়ি। ও ফোনটা বন্ধ করে দিল। সঙ্গীতটি চলতে চলতে মৃত্যুর মতো স্তব্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। ও আর অন্ধকারটির দিকে চেয়ে দেখতে পারল না। ও আর প্রশ্নটির দিকে চেয়ে দেখতে পারল না...

বৃষ্টি কমে গেল শেষ রাতে। অবশেষে কমল। আস্তে আস্তে মাথা নামিযে গম্ভীর নির্দয় রাজকীয় শালীনতার সঙ্গে চষা জমির ওপর দিয়ে আলের কোল ঘেঁষে শূন্যের ভিতর দিয়ে পশ্চিমদিকে চলে গেল এতদিনের মেঘটি। কী নিদারুণ স্তব্ধ প্রশান্তি তারপর! আকাশজোড়া বিশালতা থেকে নেমে আসছে ঝিঝির ডাক। এই মুখ থুবড়ানো নিষ্কম্প আঁধারের কাছাকাছির মধ্যেই রয়েছে সূর্য। একটু পরেই আকাশের একটা ভালো কোণ দেখে কায়দা করে ঝুলে পড়বে...

সকালবেলায় এক কাপ ঠাণ্ডা চা তিন চুমুকে গিলে নিতে নিতে তমাল বসু লক্ষ করল, গোপীবল্লভপুর যাওয়ার রাস্তাটিতে আর কোনও অন্ধকার নেই...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন