রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

সান্দ্রা সিসনেরস'এর গল্প : খাঁড়ির ধারে নারীর তীব্র চিৎকার

ভূমিকা ও ভাষান্তর : কাকলী অধিকারী

ভূমিকাঃ 
মেক্সিকান- আমেরিকান লেখিকা সান্দ্রা সিসনেরস এর Woman Hollering Creek ছোট গল্পটি ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় "খাঁড়ির ধারে নারীর তীব্র চিৎকার"। Woman Hollering Creek খাঁড়িটি টেক্সাসএর কেন্দ্রে, সেগুইন, টেক্সাস এবং সান আন্তোনিও, টেক্সাস এর মধ্যে অবস্থিত এবং নামটি সম্ভবত স্প্যানিশ নাম লা লোরঁওনা যার অর্থ 'ক্রন্দনরতা নারী' থেকে নেয়া। প্রচলিত লোককাহিনী অনুসারে, লা লোরঁওনা স্বামীর অত্যাচার সইতে না পেরে নবজাতকে নিয়ে এই খাঁড়িতে ঝাঁপিয়ে পরে আত্মহত্যা করে। কথিত রয়েছে, তার সন্তানকে ডুবে যেতে দেখে সে যন্ত্রনায় চিৎকার করে এবং সেই থেকে তার আত্মা এই খাঁড়ির চারিধারে ঘুরে ফেরে #(Williams, Docia Schultz )। কিন্তু লা লোরঁওনা কি যন্ত্রনায় নাকি রাগে অমন তীব্র চিৎকার করেছিল যার জন্যে এতো সুন্দর খাঁড়ির এমন রহস্যময় নামকরণ করা হয়। এই প্রশ্নটি আমাদের মত সান্দ্রা সিসনেরস এর গল্পের মূল চরিত্র ক্লেওফিলাসএর মনেও জাগে। অথবা এই তীব্র চিৎকার কি শুধু লা লোরঁওনার মধ্যেই আটকে রয়েছে? নাকি দিনের পর দিন স্বামীর অত্যাচারে জর্জরিত ক্লেওফিলাস এর চিৎকারও লা লোরঁওনার চিৎকারের মাঝে মিশে গেছে? যা তার বুকের মধ্যে গুমরে গুমরে মরছিল। অথবা সোলেদাদ বা ডলোরেস এর? যারা স্বামী সন্তান হারিয়ে একেবারে নিঃসঙ্গ? অথবা ফেলিসের পুরুষ সমাজের দাসত্ব মেনে না নেয়ার আনন্দের চিৎকার? নাকি সংসারের সমস্ত নারীর আর্তনাদ পূর্ব থেকে পশ্চিম, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত, এমনকি গভীর রাত্রে। তবে সে খুঁজে বের করার দায়ভারটুকু কষ্ট করে পাঠককেই নিতে হবে। 

#Williams, Docia Schultz "When Darkness Falls: Tales of San Antonio Ghosts and Hauntings"; Taylor Trade Publishing; 4th ptg. edition; June 1, 1997. 

সান্দ্রা সিসনেরস'এর গল্প : 
 খাঁড়ির ধারে নারীর তীব্র চিৎকার

অন্যদিকে। সেই অন্যদিকে, নিজের ঘরে যাবার জন্যে যখন বাবার বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে বের হয়েছিল, যত দূরে দৃষ্টি যাচ্ছিল শুধু ধূলি উড়ানো পথই চোখে পড়েছিল। অবশ্য শহরের সীমানা ঘেঁষে কিছু বাঁধানো পথও ছিল। সকালটা এক অন্যরকম স্বর্গীয় সুখের আবেশ ঘিরে ছিল। বাবা ডন সেরাফিন, ওয়ান পেদ্রো মার্টিনেজ সানচেজ এর সাথে ক্লেওফিলাস এনরিকোয়েটা ডেলিওন হের্নান্দেজ এর বিয়ের কথা ঘোষণা করেছিলেন। তখন সে দক্ষিণ দিকে ফিরে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে রেখেছিল। চোখে তখনো সংসারের অসমাপ্ত কাজের ভাবনা, মাতৃহীন ছয় ভাই আর এক বৃদ্ধের বিলাপ। 

বিদায়ের কোলাহলের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সে বলেছিল, আমি তোমার বাবা, আমি কখনো তোমাকে ত্যাগ করবনা। বলেছিল তো! চলে যাবার আগে, যখন সে জড়িয়ে ধরেছিল সেই মুহূর্তে বলেছিল। কিন্তু তখন ক্লেওফিলাস ফুলের তোড়া নিয়ে আলোচনা করার জন্যে তার সহচরী চেলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। বিদায়ের আগে পর্যন্ত সে তার বাবার কথাগুলি কিছুতেই মনে করতে পারছিল না। "আমি তোমার বাবা। আমি তোমাকে কিছুতেই ত্যাগ করব না।" 

এখন শুধুমাত্র একজন মা হিসেবে সে মনে করতে পারে। এখন, যখন সে ওয়ান পেদ্রোর সাথে খাদের ধরে বসে থাকে তখন মনে করতে পারে--নারী পুরুষ কখন কিভাবে পরস্পরকে ভালবাসে, আবার কখন সে ভালবাসা বিষাদে পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু বাবামায়ের সন্তানের প্রতি ভালবাসা, সন্তানের বাবামায়ের প্রতি ভালবাসা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। 

ক্লেওফিলাস বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবত যখন বিকেলগুলিতে ওয়ান পেদ্রো যখন বাড়ি ফিরত না। ভিতরটা যেন কেমন এক শূন্যতায় হাহাকার করে উঠত। মনে হত দূরে একটি কুকুর ডেকে যাচ্ছে। পিকান গাছগুলির শব্দ অনেকটা মেয়েদের শক্ত পেটিকোটের শব্দের মত মনে হত - শা-শা-শা-, শা-শা-শা-। আবার এই শব্দই তাকে এক সময় ঘুম পাড়িয়ে দিত। 

যে শহরে সে বেড়ে ওঠে সেখানে বয়স্ক মহিলাদের তাস খেলার সঙ্গী হওয়া ছাড়া তেমন কিছু করার ছিল না তার। অথবা সিনেমায় যাওয়া।  সিনেমার পর্দা ছিল নোোংরা দাগে ভর্তি।  ভীষণভাবে তা কাঁপত, আবার সপ্তাহে একই সিনেমা বারবার দেখতে হতো। অথবা মিল্কশেকের অর্ডার দিতে শহরের কেন্দ্র যাওয়া। পিঠের উপরে ছোট্ট ব্রণের মত যা কিনা পাওয়া যেত দেড়দিন পরে। অথবা বান্ধবীর বাসায় টেলিনোভেলার (telenovela) সর্বশেষ পর্ব দেখে সেই মহিলাদের চুলের ফ্যাশন আর সাজসজ্জার অনুকরণ করা --এইসব।

কিন্তু ক্লেওফিলাস অধীর আগ্রহে অন্য কিছুর জন্যে অপেক্ষা করেছিল। যার জন্যে এতো কানাঘুষা, এতো দীর্ঘশ্বাস, মুখ লুকিয়ে হাসা, সে অন্য কিছু। বড় হওয়ার সাথে সাথে সে জেনেছিল, জানালার ধারে বসে সুতা দিয়ে বিভিন্ন লেস বা কভার তৈরী করা হল ধৈর্যের পরিচায়ক। এখা?নে অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন যে এই কভার এলার্মা ম্যাগাজিনের সেই কভার নয় সেখানে প্রেমিকা বিখ্যাত হওয়ার জন্যে ভয়ঙ্কর সব কাঁটাচামচ নিয়ে ছবি ছাপায়। কিন্তু তার একমাত্র নিষ্কর্ষ হল আবেগ যা স্ফটিকএর মত স্বচ্ছ। একজনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ হল ভালবাসা, যার জন্যে সে যে কোন মূল্য দিতে পারে। এই ধরনের বই, গান এবং টেলিনোভেলা সাধারণত সে কথা তুলে ধরে। 

Tú o nadie."তুমি অথবা কেউ নয়" - সাম্প্রতিক কালের জনপ্রিয় টেলিনোভেলার নাম। মিষ্টি লুসিয়া মেন্দেজ হৃদয়ের সমস্ত যন্রণা সহ্য করে - দহ্য করে বিচ্ছেদ, বিশ্বাসঘাতকতা সবকিছু। ভালবাসার জন্যে সব কষ্টই সহ্য সম্ভব কারণ জীবনে ভালবাসাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তুমি কি লুসিয়া মেন্দেজকে বায়ের এসপিরিনের বিজ্ঞাপণে দেখেছো? সত্যিই সে ভারী আকর্ষণীয় নয় কি? সে কি চুলে রং করে বলে মনে হয়? ক্লেওফিলাস ফার্মেসির উদ্দেশ্যে যাচ্ছে চুলের কন্ডিশনার কেনার জন্যে। তার বান্ধবী চেলা এটা দিয়ে দেবে। এটার ব্যবহার তেমন কঠিন কিছু নয়। 

কারণ তুমি কাল রাতের পর্বটি দেখোনি। লুসিয়া কি ভীষণ দৃঢ় ভাবে স্বীকার করল যে, সে তাকে তার জীবনের যে কারো চেয়ে বেশি ভালবাসে। তার জীবনের! এবং সে শুরুতে এবং শেষে "তুমি অথবা কেউ নয়" Tú o nadie গানটি গাইল। যে ভাবেই হোক, এমন করেই জীবন যাপন করা উচিত। তাই নয় কি? তুমি অথবা কেউ নয়। কারণ ভালবাসার জন্যে কষ্টও অনেক বড়ো তৃপ্তি। কোন না কোন ভাবে এ কষ্ট বড় সুখের। শেষ পর্যন্ত ! 

Seguin. এর আওয়াজ সে পছন্দ করেছিল। দূরের এবং স্নিগ্ধ। Monclova এর মত নয়। Coahuia ভারী বিশ্রী। 

Seguin, Tejas. অন্যরকম একটি আংটি। বেশ দামি অবশ্যই। সে লুসিয়া মেন্দেজ এর মত সাজতে ভালবাসে। এবং তেমনি সুন্দর একটি বাড়ি। আচ্ছা, চেলা কি তখন তাকে হিংসা করবে! 

এবং বিয়ের পোশাক কিনতে অবশ্যই তারা লারেডোতে যাবে। তেমনি তো তারা বলেছিল। যেহেতু ওয়ান পেদ্রো খুব একটা সময় পাবে না তাই কোনরকম বাগদান অনুষ্ঠান ছাড়াই সে সরাসরি বিয়ে করতে আগ্রহী। সে সেগুইন উইথ নামের এক বিয়ার কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত। নাকি একটা টায়ারের কোম্পানি? হ্যা, তাকে কাজে যোগ দিতে হবে খুব শীঘ্র। কাজেই বসন্তকালে যখন সে ছুটি পাবে তখনি তারা বিয়ে করবে। তারপরে তারা তাদের নতুন পিকআপ ট্রাক নিয়ে সেগুইনএ তাদের নতুন বাড়ির উদ্দেশে রওনা করবে। হ্যা, যদিও ঠিক নতুন নয়, তবু তারা বাড়িটি আবার রং করে নেবে। নতুন রং এবং নতুন কিছু আসবাব। কেন নয়? অবশ্যই এটুকুর সামর্থ্য তার রয়েছে। পরে হয়ত বাচ্চাদের জন্যে আরো একটি বা দু'টি ঘর তৈরী করে নেবে। অথবা হয়ত তারা অনেক সন্তানের আশীর্বাদে আশীর্বাদিত হবে। 

সে পরে হবে! ক্লেওফিলাস সবসময়ই সেলাই মেশিনের কাজে বেশ ভাল। মেশিনের ররর, ররর, ররর - সাথে সে বেশ অভ্যস্ত। ভারী আশ্চর্য! সে বেশ বুদ্ধিমতী কিন্তু মা ছাড়া বিয়ের মত একটা বিষয়কে পরিচালনা করা খুব কঠিন। ঈশ্বর তাকে সাহায্য করুন! এক নির্বোধ বাবা আর তেমনি অবিবেচক ছয় ভাইয়ের সংসারে তার বেড়ে উঠা। তার পরিস্থিতি আর কেমন হতে পারে! হ্যা, আমি বিয়ের জন্যে যাচ্ছি। অবশ্যই! যে পোশাকটা আমি পরতে চাই সেটা শুধু সামান্য একটু ঠিক করতে হবে। তাহলেই সম্পূর্ণ নতুন হয়ে উঠবে। গত রাতে নতুন এক ডিজাইন দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম সেটাতে আমায় খুব মানাবে। গতরাতের পর্বটি দেখেছো, "ধনীরাও কাঁদে"? মায়ের পোশাকটা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো কি? 

লা গ্রীতনা। এতো অভূতপূর্ব একটি খাঁড়ির কি হাস্যকর নাম। কিন্তু তারা তো ঘরের পিছনের খাঁড়িটিকে ওই নামেই ডেকে থাকে। যদিও কেউ বলতে পারে না মহিলা কি রাগে না কষ্টে অমন তীব্র চিৎকার করেছিল। এখানকার মানুষ শুধু জানে খাঁড়িটি সান এন্তোনিও অতিক্রম করে আবার ফিরে আসে এবং নারীর আর্তচিৎকার নাম ধারণ করে। এমনি এক নাম যা কেউ কখনই প্রশ্ন করেনি বা তেমন বোঝেও না। এখানকার লোকদের বাইরে কে জানে? শহরবাসীদের তেমন নাড়া দেয় না এই নাম। এমন এক সরু ধারার খাঁড়ির কি করে এমন এক অদ্ভুত নাম তার কি করে হল তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথাও ছিল না। 

"তুমি কী জন্যে জানতে চাও?" ত্রিনি, কয়েন লন্ড্রির পরিচারক অশ্রদ্ধার সাথে জানতে চাইল। সে সেই একই ধরনের স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহার করে যখন সে ক্লেওফিলাসকে পয়সা ফেরত দেয় বা কোন কিছুর জন্যে চিৎকার করে। প্রথমে চিৎকার করত মেশিনে অতিরিক্ত সাবান দেবার জন্যে। পরে একটি ওয়াশিং মেশিনের উপরে বসার জন্যে। আর এখন, ওয়ান পেদ্রিতর জন্মের পরে কেন সে বাচ্চাকে ডায়াপার না পরিয়ে ঘুরে বেড়ায় তার জন্যে। সে একই রকম বিস্বাদময় চিৎকারে বলতে থাকে, ডায়াপার ছাড়া যেখানে সেখানে বাচ্চার প্রস্রাব করা এদেশে মোটেই শোভনীয় নয়। 

ক্লেওফিলাস কিভাবে এমন এক মহিলাকে বুঝায় যে আর খাঁড়ির নাম 'নারীর আর্তচিৎকার' কি প্রবলভাবে তাকে আকর্ষণ করে। যাক, এ নিয়ে ত্রিনির সাথে কথা বলার কোন অর্থই হয় না। 

ওদিকে খাঁড়ির ধরে যেখানে তারা বেড়ি ভাড়া নিয়েছিল সেখানে দুপাশে দুজন প্রতিবেশী মহিলা ছিল। তাদের মধ্যে শ্রীমতি সোলেদাদ ছিলেন বাঁদিকে এবং শ্রীমতি ডলোরেস ছিলেন ডানদিকে। প্রতিবেশীদের মধ্যে শ্রীমতি সোলেদাদ নিজেকে বিধবা বলে পরিচয় দিতেই ভালবাসতেন। তার বিধবা হওয়ার কাহিনীটা রহস্যাবৃত। তার স্বামী হয়ত মারা গেছেন অথবা কোন সুন্দরী মহিলার সঙ্গে উত্তরে চলে গেছেন অথবা কোন এক দুপুরে ধূমপান করতে বাহিরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। এটা বলা অবশ্য সত্যি কঠিন কারণ শ্রীমতি সোলেদাদ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তার স্বামীর কথা কিছুতেই উচ্চারণ করবেন না। 

অন্য পাশের বাড়িতে শ্রীমতি ডলোরেস বাস করতেন, তিনি ছিলেন ভীষণ দয়ালু এবং ভারী চমৎকার মহিলা।কিন্তু তার ঘর থেকে সবসময় ধূপকাঠি আর মোমবাতি পোড়ার গন্ধ আসতো। তার দুই ছেলে যারা শেষবারের যুদ্ধে মারা যায় আর সেই পুত্রশোকে স্বল্প সময়ের মধ্যে তার স্বামীও মৃত্যু বরণ করেন। তাদের স্মরণ করে তিনি পূজা বেদিতে সবসময় ধূপকাঠি আর মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতেন। তার বাগানও বিখ্যাত ছিল এর সূর্যমুখী ফুলের জন্যে। এগুলি এত লম্বা হত যে মাচার সহায়তা ছাড়া দাঁড়াতে পারত না; আরো ছিল লাল লাল মোরগচুড়া ফুল - গাঢ় রজঃস্রাবের মত রক্তলাল রঙের, স্তরে স্তরে ঝালর লাগানো। আর অবশ্যই এর গোলাপের বিমর্ষ গন্ধ ক্লেওফিলাসকে মৃত মানুষের কথা মনে করিয়ে দিত। প্রতি রবিবার শ্রীমতি ডলোরেস বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুল দিয়ে সুন্দর ভাবে সেগুইন কবরস্থানের তিনটি কবরের সমাধিপ্রস্তর সাজাতেন। 

তার প্রতিবেশী সোলেদাদ এবং ডলোরেস, হয়তবা ইংরেজিতে বদলে যাওয়ার আগে খাঁড়ির নামটা জানত
কিন্তু তারা এখন আর কিছু জানে না। ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা পরিস্থিতির চাপে যে সব পুরুষরা তাদের ছেড়ে চলে গেছে এবং কোনদিন ফিরে আসবে না, তাদের নিয়েই তারা এখন ভীষণ ব্যস্ত। 

রাগ নাকি ক্রোধ - ক্লেওফিলাস অবাক হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরে প্রথম যখন এখানে গাড়ি চালিয়ে এসেছিল তখন বিষয়টা ওয়ান পেদ্রো ইঙ্গিত করেছিল। লা গ্রীতনা, ওয়ান পেদ্রো বলেছিল এবং ক্লেওফিলাস এই ভেবে হেসেছিল যে এতো সুন্দর একটি খাড়ি যে নিজেই কিনা সারাক্ষণ আনন্দে স্বয়ংসম্পূর্ণ তার কেন এমন একটা উদ্ভট নাম হবে। 

প্রথমবার সে এতোই অবাক হয়ে গিয়েছিল যে সে একটুও কাঁদে নি বা নিজেকে বাঁচানোর করারও চেষ্টা করেনি। সে সবসময়ই বলত যদি কখনো কোন পুরুষ বা যে কোন পুরুষ তাকে আঘাত করলে সে অবশ্যই পাল্টা গত করবে। 

কিন্তু যখন সেই সময়ের সে সম্মুখীন হল, প্রথম সে একটা চড় মারল, তারপর আর একটা, তারপর আর একটা যতক্ষণ না তার ঠোঁট কেটে গেল, নাকমুখ কেটে রক্তাক্ত হল , সে একটুও রুখে দাঁড়ায় নি। সে কোন রকম প্রতিবাদ করে নি। সে পালিয়েও যায়নি।  টেলেনোভেলাতে এমন সব ঘটনা দেখতে দেখতে সে এরকমই কল্পনা করে নিতো।  

তার নিজের বাড়িতে তার বাবা-মা কখনো তার গায়ে হাত তোলে নি। এমন কি অন্য কোন সন্তানের উপরেও নয়। একমাত্র মেয়ে হিসেবে তারা তাকে ভীষণ যত্নে বড়ো করেছে -- রাজকন্যার মত -- সেখানে এসব সে সহ্য করবে না। কিছুতেই না। 

অথচ, যখন ঘটনাটা প্রথমবার ঘটল সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘটনাটা তাকে সম্পূর্ণ নির্বাক, নিথর, অসাড় করে দিল। শুধু তার আঘাতের স্থানগুলি স্পর্শ করা ছাড়া আর তার হাতের রক্তের দিকে তাকিয়ে দেখা ছাড়া সে কিছুই করতে পারল না। কী ঘটে গেল সে যেন কিছুই কিছুই বুঝতে পারছিল না। 

কিছুই বলবে না বলে সে চিন্তা করেছিল। বলেও নি কিছু। শুধু একজন পুরুষ কাঁদছিল, একেবারে শিশুর মত কাঁদছিল। তার কালো কোঁকড়ানো চুলে সে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। সে কান্না অনুতাপের এবং লজ্জার, এইবার এবং প্রতিবার। 

নিস্তব্ধ বাড়ির পুরুষগণ। কোথা থেকে সে বলা শুরু করে - তার বিয়ের পরে প্রথম এক বছর, তারা যখন নব দম্পতি, স্বামীর সঙ্গে তাকে বিভিন্ন নিমন্ত্রনে যায়। তাদের আলোচনায় স্বামীর পাশে নির্বাক হয়ে বসে থাকা, আর খুব ধীরে ধীরে বিয়ারে চুমুক দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। শেষ পর্যন্ত সে  কখনো কাগজের রুমাল ভাঁজ করে গিট্ দেয়। তারপরে আরেকটি দিয়ে পাখা, একটি দিয়ে গোলাপ ফুল তৈরী করে। মাথা নাড়ায়, অলসভরে হাই তোলে, বিনীতভাবে মুচকি হাসে বা যখনি প্রয়োজন তখনি হাসে। স্বামীর হাতে ঠেস দিয়ে বসে। আবার কখনো তার কনুই ধরে টানে এবং অনুমান করতে পারে যে আলোচনা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে। এ থেকে ক্লেওফিলাস এই উপসংহারে উপনীত হয় যে সমুদ্রের তলায় একটি স্বর্ণমুদ্রা খোঁজার মতই প্রতি রাতেই তারা বোতলের তলানিটুকুর সাথে সাথে জীবনের সত্যিটাকে খুঁজে পেতে চায়। 

তারা একে অনেকে সেই কথাটি বলতে চায় যা তারা নিজেদেরকে বলতে চায়। কিন্তু হিলিয়াম বেলুনের মত মস্তিষ্কের ছাদে গিয়ে অকস্মাৎ ধাক্কা খায়
 সে আর বের হওয়ার পথ খুঁজে পায়না। একটা বুদবুদ উঠে আসে, গলার মধ্যে গড়গড় শব্দ করে, জিহ্বার মধ্যে গড়াগড়ি যায়, এবং ঠোঁটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে- একটা ঢেঁকুর। 

যদি তাদের ভাগ্য ভাল থাকে, তাহলে দীর্ঘ রজনীর শেষে কান্নাকাটি কিছু হয়। যে কোন মুহূর্তে ঘুষোঘুষি শুরু হয়ে যায়। ঘুমোতে যাওয়ার আগে তারা কুকুরের মত নিজেরাই নিজেদের পিছনে ধাওয়া করে, একটা পথ খোঁজার চেষ্টা, একটা রাস্তা, একটা উপায়, এবং - শেষপর্যন্ত- একটু শান্তি। 

ভোরবেলায় সে চোখ খোলার আগে অথবা তাদের দৈহিক মিলনের পরে অথবা সে যখন খাবার টেবিলে তাকে অতিক্রম করে কিছু খাবার মুখে দিয়ে চিবুতে থাকে, তখন ক্লেওফিলাস মনে ভাবে এই কি সেই পুরুষ হার জন্যে সে সারাটা জীবন অপেক্ষা করেছিল। 

এ নয় যে সে একজন ভাল পুরুষ নয়। সে যখন বাচ্চার পামপার্স বদলায়, অথবা যখন সে স্নানঘরের মেঝে মোছে, অথবা যেখানে কোন দরজা নেই সেজায়গার জন্যে পর্দা তৈরী করতে করতে, অথবা কাপড়কে আরো ধবধবে পরিষ্কার করতে করতে সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয় কেন সে তাকে ভালবাসে। অথবা একটু আশ্চর্য হয় সেই সাথে যখন সে ফ্রিজটিকে বিনা কারণে পদাঘাত করে বলে উঠে যে সে এই নোংরা বাড়িকে ঘৃণা করে । এবং সে চলে যাচ্ছে সেখানে যেখানে বাচ্চার চিৎকার, তার বিভিন্ন সন্দেহজনক প্রশ্ন এটা সেটা ঠিক করে দেয়ার অনুরোধ করে তাকে আর বিরক্ত করবে না। কারণ তার যদি সামান্য বুদ্ধি থাকত তবে সে বুঝতে পারত যে তাকে সংসার পালনের জন্যে যায় করতে হয়, তার বেতনেই তার পেট চলে, তার আয়ের জন্যেই মাথার উপরে ছাদ আছে এবং পরের দিন খুব সকালে তাকেই ঘুম থেকে উঠতে হবে । তাহলে এই মহিলা তাকে কেন একটু শান্তি দেয় না। 

না, সে খুব একটা লম্বা নয় এবং টেলেনোভেলার পুরুষদের মত দেখতেও নয়। তার মুখের ব্রণের দাগ দেখলে এখনো ভয় লাগে। বিয়ার খাবার ফলে তার ভুঁড়িও হয়েছে খানিকটা। তবে সে সবসময়ই বলবান। 

সে বাতকর্ম করে, ঢেকুর তোলে এবং নাক ডাকে এবং হাসে, তাকে চুমু দেয় এবং আলিঙ্গন করে। যে কোন ভাবেই হোক না কেন, প্রতি সকালেই তার স্বামীর গোঁফ বেসিনে পাবে, যার জুতা প্রতি দিনই বিকেলে সে বারান্দার বাতাসে রাখে। সে সবার সামনে নখ কাটে, অতি উচ্চ:স্বরে হাসে, পুরুষের মত অভিশাপ দেয়। এবং দেরি করেই হোক বা তাড়াতাড়ি, বাড়ি ফেরার সাথেসাথেই প্রতিটা ডিনার সে পৃথক পৃথক থালায় দাবি করে, যেমন তার মা পরিবেশন করত । এবং যার সংগীত অথবা টেলেনোভেলা সম্পর্কে কোন আগ্রহ নেই। অথবা প্রেম, ফুল বা খাঁড়ির ধরে পূর্ণিমার জোৎস্না উপভোগ কোনকিছুতেই যার কোন আগ্রহ নেই। বরং শোবার ঘরের জানলার খড়খড়ি বন্ধ করে ঘুমানোটা তার জন্যে একটি বিশেষ ব্যাপার ছিল। এই হল পুরুষ, এ এক বাবা, প্রতিদ্বন্দ্বী, রক্ষক, এ প্রভু, এই তারকা। এ হল স্বামী তার নিজ রাজ্যত্বে। 


একটি সন্দেহ। চুলের মত সরু। ধোয়া একটা চায়ের কাপের সেট উল্টো ভাবে সেলফের উপরে রাখা।স্নানঘরে তার লিপস্টিক, পাউডার, চুলের ব্রাশ সবই ভিন্নভাবে সাজানো। 

না। তার কল্পনা। বাড়িটা একই আছে যেমন সবসময় থাকে। তেমন কিছু নয়। 

নবজাতক এবং স্বামীর সাথে সে বাড়ি ফিরে এলো। বাড়ি ফিরে কিছু দেখে সে শান্তি পায়। বিছানার তলায় তার স্লিপার, স্নানঘরের হুকে ঝোলানো তার মলিন হাউসকোট, যেমন সে রেখে গিয়েছিল। তার বালিশ। তার বিছানা। 

ঘরে ফেরাটা সবসময়ই ভারী সুখের। এটা এত মধুর ঠিক যেন বাতাসে তার ফেসপাউডার গন্ধ, জুঁই ফুলের সুবাস, চটচটে মদের ঘ্রান ভেসে বেড়ায়। 

দরজায় নোংরা আঙুলের ছাপ। একটি গ্লাসে সিগারেটের টুকরা। মস্তিষ্কের ভাঁজে ভাঁজে কেমন সব আটকে আছে। 

কখনো কখনো সে তার বাবার ঘরের কথা ভাবত। কিন্তু সেখানে সে কিভাবে ফিরে যায়? সে ভারী অসম্মানের। প্রতিবেশীরা কি বলবে? এক সন্তান কোলে আর এক সন্তান গর্ভে নিয়ে বাড়ি আসা। স্বামী কোথায় গেল? 

গল্পের শহর। ধূলি আর হতাশার শহর। সেখানে সে শুধু গল্পেরই প্রসার ঘটাবে। এটা ধূলি আর হতাশার শহর। বাবার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও কোন গোপনীয়তা নেই। শুধু একই কথার গুনগুন শব্দ ছাড়া, শহরের কেন্দ্রে কোন প্রাণবন্ত চত্বর নেই। রবিবারের গির্জার প্রার্থনায়ও তেমন লোকের গুঞ্জন নেই। কারণ তার পরিবর্তে এখানে সূর্যাস্তের সাথে সাথে নিস্তব্ধ বাড়িগুলিতে গুঞ্জন শুরু হয়। 

সিটি হলের সামনে একটা পোরাম্বুলেটার এর সমান ব্রোঞ্জের পিকান বাদাম নিয়ে এক অর্থহীন দর্পের শহর। টেলিভিশন সারানোর দোকান, ঔষুধের দোকান, লোহালক্কড়ের দোকান। ড্রাই ক্লীনার্স, ডাক্তারের চেম্বার, ভাঁটিখানা, নোটারি, শূন্য দোকানের বারান্দা এবং কিছু না। চিত্তগ্র্রাহী কিছু নেই। ওখানে কিছুর জন্যেই যাওয়ার কোন অর্থ নেই। কারণ শহরটা গড়েই উঠেছে যাতে তুমি তোমাকে স্বামীর উপরে নির্ভর করে থাকো। অথবা ঘরে থাকো। অথবা গাড়ি চালিয়ে কোথাও চলে যাও। তুমি যদি প্রচুর ধনী হও তোমার নিজের গাড়ি চালাতে পারো। 

যাওয়ার কোন জায়গা নেই। যদি না প্রতিবেশীদের অন্তর্ভুক্ত মধ্যে আনা হয়। একপাশে শ্রীমতি সোলেদাদ আর অন্য পশে শ্রীমতি ডলোরেস। অথবা খাঁড়ির ধারে। 

রাতে বাইরে যাবে না । ঘরের কাছাকাছি থাকবে। তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে এবং বাচ্চাও। তুমি অন্ধকারে ঘোরাঘুরি করলে ভয় পাবে এবং তখব বুঝতে পারবে যে আমরা কতটা সঠিক কথা বলছি। 

কখনো কখনো গ্রীষ্মকালে জলপ্রবাহটি কর্দমাক্ত খন্দে পরিণত হয় কিন্তু যদিও এখন বসন্তকাল তাই বৃষ্টির কারণে সে এখন পূর্ণ। সে যেন এক পূর্ণ প্রাণে পরিপূর্ণ, তার নিজেস্ব এক ধ্বনি জেগে উঠছে সে পূর্ণতার মাঝে; দিবারাত্রি সেই সুমধুর ধ্বনিতে যেন সবাইকে সে তার কাছে ডাকে। এ কি লা লোরঁওনা, সেই ক্রন্দনরতা মহিলা যে তার সন্তানদের ডুবিয়ে দিয়েছিল। সে ভাবে, লা লোরঁওনা হয়ত একজন যার নাম অনুসারেই তারা খাঁড়িটির নামকরণ করেছিল। ছোটবেলায় এমন গল্পই তো সে শুনেছিল। 

লা লোরঁওনা তাকে ডাকছে। সে নিশ্চিত। ক্লেওফিলাস বাচ্চার ডোনাল্ড ডাকের কম্বলখানি ঘাসের উপরে বিছিয়ে দেয়। শোনে। দিন গড়িয়ে রাত নামে। বাচ্চা মুঠিমুঠি ঘাস টেনে তোলে আর হাসে। লা লোরঁওনা। আশ্চর্য এতো নিস্পৃহ এমন কোন কিছু এক নারীকে অন্ধকারে তরুতলে টেনে নিয়ে আসতে পারে। 

তার যা প্রয়োজন তা হল ... এবং এক মহিলার নিতম্ব ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিন্মাঙ্গের কাছে আনার মত একটা খারাপ অঙ্গভঙ্গী করল। মাক্সিমিলিয়ানো কদর্য হাসির একটা গর্ধব রাস্তার ওপর থেকে আসে আর পরুষগুলিকে হাসায়। ক্লেওফিলাস বিড়বিড় করে অভদ্র বলে থালাবাসন ধুতে চলে গেল। 

তবে সে জানত সত্যি বলেই শুধু সে এটা বলেনি। তার আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল প্রতি রাতে এই নিস্তব্ধ বাড়িতে বসে মদ্যপান এবং একা বাড়িতে হুমড়ি খেয়ে পরার চেয়ে একটা নারী শরীরের তার অনেক বেশি প্রয়োজন। 

মাক্সিমিলিয়ানো যে কিনা বলত সে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছিল কারণ সুনসান বাড়িতে ঝগড়ার পরে সে তার কাছে একটা ঝাড়ু নিয়ে তেড়ে এসেছিল। সে বলেছিল, আমার গুলি চালাতে হয়েছিল কারণ সে সশস্র ছিল। 

তাদের হাস্যকোলাহল রান্নাঘরের জানলার বাইরে চলে আসে। তার স্বামীর এবং তার বন্ধুদের। মানলো, বেতো, এল পেরিকো। মাক্সিমিলিয়ানো। 

আচ্ছা, ক্লেওফিলাস কি কিছু অতিরঞ্জিত করছে যা তার স্বামী সবসময়ই বলে থাকে? খবরের কাগজ তো এমন সব গল্পেই পরিপূর্ণ থাকে। এই মহিলাকে অন্তরাজ্যের পাশে পাওয়া গিয়েছিল।একে গাড়ি থেকে ধাক্কা দেয়া হয়েছিল। এর বিশীর্ণ দেহ, এর অচেতন দেহ, আর অত্যাচারে বিদীর্ণ দেহ। তার প্রাক্তন স্বামী, তার স্বামী, তার প্রেমিক, তার বাবা, তার ভাই। তার কাকা, তার বন্ধু, তার সহকর্মী। সবসময়। প্রাত্যহিক খবরের কাগজের পাতা এই ভয়াবহ সংবাদে পূর্ণ থাকে। সে মুহূর্তে এক গ্লাস সবান পানি খেয়ে ফেললো। কাঁপছিল সে। 

সে একটা বই ছুড়ে মেরেছিল। ঘরের ওধার থেকে। গালে ভীষণ আঘাত লেগেছিল। সে হয়ত ক্ষমা করে দিতে পারত। কিন্তু তাকে অনেক বেশি দংশন করল অন্য এক জায়গায়। এটা তার ভীষণ প্রিয় একটি বই, কোরিন তেল্লাদ এর একটি প্রেমের গল্প, আমেরিকাতে টেলিভিশন আর টেলিনোভেলা ব্যতীত অন্য যে জীবন তার ছিল। 

এই সময় ব্যতীত, বরাবর যখন তার স্বামী দূরে থাকে তখন কোন না কোন ভাবে সে তার প্রতিবেশী শ্রীমতি সোলেদাদ এর ঘরে কয়েকটা পর্বের কিছু ঝলক দেখতে যেত কারণ ডোলোরেস এর এ সম্পর্কে কোন আগ্রহ ছিল না। সোলেদাদ মাঝে মাঝে এতো দয়ালু হত যে সে মরিয়া দে নাদিয়ে পর্বে গরিব আর্জেন্টেনিয়ান গ্রামের দুর্ভাগা মেয়েটি, যে কিনা অর্রচা পরিবারের সুদর্শন ছেলের প্রেমে পড়েছিল, তার কি হয়েছিল সে গল্পও বলত। সে এই পরিবারের কাজের মেয়ে ছিল এবং সেখানেই সে রাত্রি যাপন করত। সে ঘর পরিষ্কার করত, ধুলা ঝাড়ত। মেঝে পরিষ্কার কর্মীরা তার কাজের সাক্ষী ছিল। জুয়ান কার্লস অর্রচা 'আমার কথা শোন, মারিয়া, আমি তোমাকে ভালবাসি' বলে প্রেম নিবেদন করে। প্রতিউত্তরে সে প্রত্যাখ্যান করে বলে যে আমরা একই শ্রেণীর নই। তাকে আরও মনে করিয়ে দেয়, যে তারা কেউই দুজন-দুজনার সমকক্ষ নয়। অথচ বিশ্বাস করা অসম্ভব এই কঠিন কথাগুলি বলার সময় কষ্টে তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। 

ক্লেওফিলাস মনে ভাবছিল তার জীবনও এখন টেলিনোভেলার পর্বগুলির মত, শুধু বিষন্নতা আর দুঃখে পরিপূর্ণ। একটু নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে কোন বিজ্ঞাপন বিরতি নেই। এবং অন্তে কোন মিলন বা শুভ সমাপ্তিও নেই। যখন সে বাচ্চাকে নিয়ে খাঁড়ির ধরে বসে থাকত তখন সে এসব ভাবত। ক্লেওফিলাস এর ... ? কিন্তু কোন না কোন ভাবে সে নিজেকে ক্লেওফিলাসএর চেয়ে আরো কাব্যিক নামের কোন চরিত্রের সাথে কল্পনা করত - তোপাজিও অথবা ইসেনিয়া, ক্রিস্টাল, আদ্রিয়ানা, স্তেফানিয়া, আন্দ্রিয়া। নামের সাথে সাথে মহিলাদের জীবনে সব ভাল ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু ক্লেওফিলাস এর জীবনে কি ঘটল? কিছুনা। কিন্তু মুখমণ্ডলে শুধু ক্ষত চিহ্ন। 

কারণ ডাক্তার তো তাই বলেছিল। তাকে যেতেই হবে। এটা নিশ্চিত করার জন্যে যে বাচ্চা ঠিক আছে এবং জন্মের সময়ে যেন কোন সমস্যা না হয়। আগামী মঙ্গলবার সাক্ষাতের সময়। সে কি দয়া করে তাকে নিয়ে যাবে। এবং এখন এ পর্যন্তই। 

না, সে এসব কিছুই উল্লেখ করবে না। সে প্রতিজ্ঞা করে। যদি ডাক্তার জিজ্ঞেস করে তখন সে বলতে পারে সামনের সিঁড়ির সামনে পড়ে গিয়েছিল। অথবা পা পিছলে  পড়ে গিয়েছিল। সে সময়ে সে পিছনের উঠোনে গিয়েছিল। পিছলে পড়ে গিয়েছিল এটুকু শুধু সে বলতে পারে। তার আগামী মঙ্গলবার যেতে হবে। ওয়ান পেদ্রো, দয়া কর নতুন সন্তানের জন্যে। তাদের সন্তানের জন্যে। 

সে তার বাবার কাছে কিছু টাকার জন্যে লিখবে। ধারই চাইবে, নতুন বাচ্চার হাসপাতালের খরচের জন্যে। বেশ, সে যদি চায় তবে তাও নয়। না করবে না। দয়া করে আর নয়। দয়া করে নয়। সে জানে যে এতসব বিল দেবার পরে সঞ্চয় করা ভীষণ কঠিন, কিন্তু ট্রাকের ঋণ পরিশোধ থেকে কিভাবে তারা মুক্ত হবে? এবং ভাড়া পরিশোধের পরে এবং খাবার এবং বিদ্যুৎ এবং গাস এবং পানি এবং আরো কত কি। এতো সবের পরিশোধের একটা পয়সাও বাকি থাকে না। কিন্তু দয়া করে অন্তত ডাক্তারের সাক্ষাতের জন্যে। সে আর কিছুই চাইবে না। তাকে যে যেতেই হবে। কেন সে এতো উদ্বিগ্ন? কারণ। 

কারণ সে নিশ্চিত হতে চায় যে এবারে বাচ্চা উল্টো অবস্থানে নেই। হ্যা, আগামী মঙ্গলবার পাঁচটা ত্রিশ এ। আমি ওয়ান পেদ্রিতকে পোশাক পরিয়ে তৈরী রাখব। কিন্তু তার তো একজোড়া জুতাই রয়েছে। আমি সেগুলিকে পালিশ করব এবং তৈরী থাকব। যখনি তুমি কাজ থেকে ফিরে আসো। আমরা কিছুতেই তোমাকে লজ্জিত করব না। 

ফেলিস? আমি গ্রাসিয়েলা। 

না, আমি জোরে কথা বলতে পারছি না। আমি কাজে। 

দেখো। আমার একটু সাহায্য দরকার। একজন রুগী এসেছে। এক মহিলা, তার কিছু সমস্যা হয়েছে। 

এক মিনিট। তুমি কি আমায় শুনতে পাচ্ছ, নাকি? 

আমি জোরে কথা বলতে পারছি না কারণ তার স্বামী পাশের ঘরেই রয়েছে। 

তুমি কি আমায় শুনবে? 

আমি তার সোনোগ্রাম করছিলাম। সে প্রেগন্যান্ট। সে আমায় ধরে কান্না শুরু করে দিল। ছেলে,ফেলিস! এই অসহায় মহিলার শরীরে কালসিটে রয়েছে। আমি তামাশা করছি না। 

তার স্বামীর কাছ থেকে। আবার কার? সীমান্তের ওপর থেকে সেসব বৌদের মধ্যে আর একটি। এবং তার পরিবারের সবাই মেক্সিকোতে থাকে। 

বাজে কথা। তুমি কি মনে কর তারা তাকে সাহায্য করবে? একটু অপেক্ষা করো। এই মহিলা এমন কি ইংরেজিও বলতে পারে না। তার বাড়িতে ফোন করার বা চিঠি লেখার কোন অনুমতি নেই। সে জন্যেই তোমাকে যোগাযোগ করছি। 

তার যাওয়া প্রয়োজন। 

মেক্সিকোতে নয়, বোকা। সান এন্টোনিওর গ্রেইহাউন্ড বাস স্টেশন পর্যন্ত। 

না, ওই পর্যন্ত তার যাওয়া প্রয়োজন। তার নিজের টাকা রয়েছে। তোমার বাড়ি ফেরার পথে শুধু তাকে সান এন্টোনিওতে নামিয়ে দিতে হবে। দয়াকরে কথা শোনো, ফেলিস। আমরা যদি তাকে সাহায্য না করি তবে কে করবে? আমি নিজেই তাকে নামিয়ে দিতাম। কিন্তু তার স্বামী কাজ থেকে বাড়ি ফেরার আগেই তার বসে উঠা প্রয়োজন। তুমি কি বলো? 

আমি জানি না। একটু ধরো। 

অবিলম্বে, এমনকি আগামীকাল। 

ঠিক আছে, আগামী কাল যদি তোমার অসুবিধা থাকে তবে... 

এটা একটা তারিখ, ফেলিস। বৃহস্পতিবার।দুপুর ১.১০ এর সময়ে ক্যাশন কারি বন্ধ হয়। সে তৈরী থাকবে। 

ওহ, তার নাম ক্লেওফিলাস। 

আমি ঠিক জানিনা। তবে অনুমান করতে পারি কোন মেক্সিকান সন্ন্যাসী। কোন শহীদ অথবা হবে হয়ত কেউ। 

ক্লেওফিলাস। C-L-E-O-F-I-L-A-S. ক্লে. ও. ফি. লাস. লিখে নাও। 

ধন্যবাদ ফেলিস। যখন তার বাচ্চাটা জন্মাবে তখন সে তার কাছে আমাদের কথা বলবে, তাইনা? 

ঠিক, তুমি বুঝতে পেরেছো। একটা ধারাবাহিক নাটক। কি এক জীবন, সাথী। ভাল থেকো। রাখছি। 


সারাটা সকাল কিছু ভয় আর কিছু সংশয় মিশ্রিত অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। যে কোন সময় দরজার সম্মুখে ওয়ান পেদ্রোর আবির্ভাব হতে পারে। রাস্তায়। ক্যাশ এন কারিতে। যেমন স্বপ্নের মধ্যে সে দেখতে পায়। 

সেই মহিলা, যে কিনা পিকআপ চালায় সে আসার আগে পর্যন্ত সে এসব চিন্তায় মগ্ন ছিল। শুধু কখন পিকআপ সান এন্টোনিওর উদ্দেশে রওনা করবে  এই চিন্তা অন্য কোনকিছু চিন্তার ফুরসৎ ছিল না তার। তোমার ব্যাগ পিছনে রেখে ভিতরে উঠে এসো। 

কিন্তু যখন তারা খাঁড়িটা অতিক্রম করছিল, তখন ড্রাইভার মুখ খুলেছিল এবং ভীষণ জোরে চিৎকার করেছিল ঠিক যেন মারিয়াচি ব্যান্ডের মত। তার চিৎকারে শুধু ক্লেওফিলাসই নয় ওয়ান পেদ্রিত ও পর্যন্ত সচকিত হয়ে গিয়েছিল। 

তারপরে বলেছিল, দেখো কি সুন্দর। আমি তোমাদের দুজনকেই ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম, তাইতো? আমার তোমাদেরকে সতর্ক করা উচিত ছিল। প্রতিবারই যখন এই সেতুটা পার হই আমি এমনটি করি। কারণটা এর নাম। নিশ্চয়ই এর নাম তুমি জানো। মহিলার তীব্র চিৎকার। তারপর, আমি চিৎকার করি। ইংরেজির সাথে স্প্যানিশ মিশিয়ে সে বলেছিল। তুমি কি লক্ষ্য করেছো, ফেলিস আরো বলেছিল, এখানে মেয়েদের নাম কিছু নেই? সত্যি। যে পর্যন্ত সে কুমারী থাকবে। আমার ধারণা, তুমি যদি কুমারী হও তবেই তুমি বিখ্যাত হতে পারবে। সে আবারো হাসছিল। 

সেই কারণেই আমি এই খাঁড়ির নামটা পছন্দ করি। এটা তোমাকে টারজানের মত চিৎকার করাবে , যদি তুমি চাও? 

এই মহিলা, ফেলিস সম্পর্কে ক্লেওফিলাস যত জানছিল ততই বিস্মিত হচ্ছিল। এমন কি সে পিকআপ পর্যন্ত চালাত। একটা পিকআপ, অবশ্যই লক্ষ্য রাখার মত বিষয়। কিন্তু ক্লেওফিলাস যখন জিজ্ঞেস করছিল যে এটা তার স্বামীর কিনা সে জবাব দিয়েছিল, তার কোন স্বামী ছিল না। পিকআপটা তার ছিল। সে নিজেই এটা পছন্দ করেছিল। সে নিজেই এটার মূল্য পরিশোধ করেছিল। 

আমি সাধারণত পন্টিয়াক সানবার্ড ব্যবহার করতাম। কিন্তু সে সব গাড়ি সাধারণত বয়স্কদের জন্যে। ছোট্ট গাড়ি। এখন এটা একটা আসল গাড়ি। 

একজন মহিলার কাছ থেকে সে কি ধরনের কথা এসেছিল? ক্লেওফিলাস ভাবছিল। কিন্তু, আবারো ফেলিসএর মত মহিলার দেখা সে কখনোই পায় নি। সে পরে তার বাবা ভাইদেরকেও বলেছিল, তোমরা কি কল্পনা করতে পারো যখন আমরা খাঁড়িটি পার হচ্ছিলাম সে কি পাগলের মত চিৎকার করছিল।একেবারে পাগলের মত। কে চিন্তা করবে? 

কে করবে? ব্যথা অথবা রাগ, হয়তবা কিন্তু শুধু পেঁচার ডাকের মত নয় যে ফেলিস শুধুই ছেড়ে দেবে। এটা তোমাকে টারজানের মত চিৎকার করাবে, যদি তুমি চাও, ফেলিস বলেছিল। 

তখন ফেলিস আবার হাসতে শুরু করেছিল কিন্তু ফেলিস ঠিক হাসছিল না। একটা কলকল শব্দ তার গলায় ভিতর থেকে বের হয়ে আসছিল, যেন ঠিক হাসির একটা দীর্ঘ ফিতা, তরঙ্গের মত উচ্ছল। 

পাদটীকা: 

# মারিয়াচি: 

মারিয়াচি (/ mɑːriɑːtʃi /; স্প্যানিশ: [মাɾজাতʃি]) সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র গোষ্ঠী যা ১৮শতাব্দীর দিকে, পশ্চিম মেক্সিকো অঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে বিকশিত হয়ে থাকে। এর একটি বাতিকরণধর্মী স্বতন্ত্র যন্ত্র, বাদ্যযন্ত্র ধারা, কর্মক্ষমতা, গায়ক শৈলী, এবং পোশাক আছে। ২০১১ সালে ইউনেস্কো মারিয়াচিকে একটি অননুভবনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।


অনুবাদক পরিচিতি
কাকলী অধিকারী

বরিশালে পৈত্রিক বাড়ি। ঢাকায় জন্ম। সুইডেনপ্রবাসী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। 
PhD in Comparative Culture and Information Studies at Nara Women's University

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন