রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

আফসানা বেগমের অনুবাদঃ নাদিন গোর্ডিমা'র গল্প শেষ যাত্রা

রাতে মা দোকানে গিয়ে ফিরে এল না। আর কখনো এল না। কী হয়েছিল তার? আমি জানি না। আমার বাবাও একদিন চলে গিয়েছিল। তারপর আর কখনো ফেরেনি। বাবা যুদ্ধে লড়াই করছিল। লড়ছিলাম আমরাও। কিন্তু আমরা তো বাচ্চাকাচ্চা, আমার দাদি আর দাদার মতো আমাদের কাছেও কোনো বন্দুক ছিল না। দেশে সরকার যে দস্যুদের ডেকে এনেছিল, আমার বাবা তাদের সাথে যুদ্ধ করছিল। দস্যুরা জায়গাটার আনাচে কানাচে চষে বেড়াচ্ছিল আর আমরা তখন কুকুরের তাড়া খাওয়া মুরগির মতো তাদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত।
কোথায় যাওয়া যায় বুঝতে পারছিলাম না। দোকানে গেলে রান্নার তেল পেতে পারে শুনে মা সে রাতে দোকানে গেল। আমরা খুশি হয়েছিলাম কারণ অনেকদিন খাবারে তেলের স্বাদ পাইনি। তেল হয়ত মা ঠিকই পেয়েছিল।কিন্তু তারপর অন্ধকারে কেউ তাকে ধরাশায়ী করে সেটা কেড়ে নিয়ে গেছে। নিশ্চয় সেই দস্যুদের সাথে মায়ের দেখা হয়ে গিয়েছিল। তারা যদি তোমাকে দেখে তো সোজা মেরে ফেলবে। গ্রামে তারা দুবার এসেছিল আর আমরা দৌড়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়েছি। তারপর চলে গেলে ফিরে এসে দেখি আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে উধাও। কিন্তু তিন বারের বার যখন তারা আবার এল তখন নেয়ার মতো আর ছিল না কিছুই- না তেল, না খাবার। তাই তারা আমাদের ঘরের বেড়াগুলো জ্বালিয়ে দিল। ছাদগুলো ভেতরের দিকে ধসে পড়ল তখন। মা কোথাও কিছু টিনের টুকরো কুড়িয়ে পেয়েছিল। সেগুলো উপরে একদিকে ছাদের মতো করে ছড়িয়ে রেখেছিলাম আমরা। সেখানটায় বসেই মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যে রাতে মা আর ফিরে এল না।


দস্যুদের অত্যাচারে বাইরে যেতে এমনকি কাজকর্ম করতেও আমরা ভয় পেতাম। আসলে ছাদ ছাড়া বাসার ভেতরটা দেখতে এমন লাগছিল যেবাইরে থেকে হয়ত মনে হচ্ছিল বাসায় কেউ নেই। সারা গ্রামে সব শেষ হয়ে গেছে। মানুষের চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যেত শুধু। মানা বলা পর্যন্ত কিছু করতে অথবা ছুটোছুটি করতেও আমরা ভয় পেতাম। ভাইবোনদের মধ্যে আমি মেঝ আর মেয়ে, ছোট ভাইটা আমার ঘাড় ধরে পেটের উপরে ঝুলে থাকে; পা দিয়ে আমার কোমরে এমনভাবে আটকে থাকে যেন বাচ্চা বানর তার মাকে জড়িয়ে ধরে ঝুলছে। পোড়া বাসার একটা ভাঙ্গা কাঠের খুঁটি হাতে বড় ভাই সারারাত বসে ছিল। দস্যুরা এলে নিজেকে বাঁচাবে বলে।

আমরা সারাদিন সেখানেই ছিলাম। মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বলতে পারব না সেদিন কী বার ছিল; ততদিনে গ্রামের স্কুল, চার্চ সব বন্ধ হয়ে গেছে, তাই কেউ জানত না সেটা রবিবার নাকি সোমবার।

সূর্য ডোবার ঠিক আগে দাদি আর দাদা এল। গ্রামের কেউ তাদের খবর দিয়েছিল যে মা ফেরেনি আর আমরা বাচ্চারা বাড়িতে একদম একা। আমি দাদা বলার আগে দাদি বলি। কারণ দাদি বেশ বড়সড় আর শক্তসমর্থ, এখনো বুড়ো হয়নি। আর দাদা ছোট খাটো মানুষ। ঢিলে ঢালা প্যান্ট পরে কোনখানে যে দাঁড়িয়ে আছে তুমি দেখতেও পাবে না। কী বলছ না শুনেই সে হাসবে। আর তার চুল দেখলে মনে হবে যেন সবসময় সাবানের ফেনা লেগে আছে। ছোট ভাই, বড় ভাই, দাদা আর আমাকে নিয়ে দাদি তার বাবার বাড়ির দিকে রওনা দিল। যাওয়ার পথে খানিক ভয় পেয়েছিলাম; দস্যুদের সামনে পড়ে যাই নাকি! (শুধু আমার ছোট ভাই ভয় পায়নি, দাদির পিঠে ঘুমাচ্ছিল) তারপর দাদির বাড়িতে আমরা অনেকদিন অপেক্ষা করেছিলাম। একমাস হবে হয়ত। আমাদের তখন খুব ক্ষিদে পেত। মা আর কখনো আসেনি। দাদি আমাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারত না। একজন মহিলা মাঝে মধ্যে আমার ছোট ভাইকে কিছুটা বুকের দুধ খেতে দিত। অবশ্য বাসায় সে আমাদের মতোই দুধে মেশানো ওট খেত। দাদি আমাদের নিয়ে বনেবাদাড়ে জংলি শাকের খোঁজে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রামের লোকেরা আগে ভাগে নিয়ে যাওয়াতে সেখানে একটা পাতাও আর বাকি ছিল না।

দাদা কয়েকবার অল্প বয়সের ছেলেদের পিছু পিছু হেঁটে কিছু দূর পর্যন্ত গিয়ে মাকে খুঁজেছিল। কিন্তু পায়নি। দাদি একদিন অন্য মহিলাদের সাথে মিলে সুর করে বিধাতাকে ডাকতে লাগল। আমিও তাদের সাথে সুর মেলালাম। খাওয়ার জন্য সামান্য খাবার যোগাড় করা গেল একদিন। কিছু শিম। কিন্তু দুদিন পরে তা-ও ফুরিয়ে গেল। দাদার এক সময় তিনটা ভেড়া, একটা গরু আর সবজি বাগান ছিল। দস্যুরা ভেড়াগুলো আর গরুটা নিয়ে গেছে। তাদেরও হয়ত খিদে পেয়েছিল। তারপর যখন চাষাবাদের সময় এল, দাদার কাছে তখন বোনার মতো একটা বীজওছিল না।

তাই সবাই মিলে নয়, দাদি একাই সিদ্ধান্তটা নিল যে আমরা অন্য কোথাও চলে যাব। দাদা প্রথম প্রথম শরীর এদিক ওদিক দুলিয়ে একটু-আধটু আপত্তি করেছিল বটে। দাদি দেখেও না দেখার ভান করে থাকল। আমরা বাচ্চারা তো মহাখুশি! যেখানে মা নেই, খাবারও নেই--এমন জায়গা ছেড়ে চলে গেলেই আমরা বাঁচি। আসলে আমরা এমন কোথাওচলে যেতে চাইতাম যেখানে দস্যুরা নেই অথচ খাবার আছে। ভাবতে ভালোই লাগত যে এরকম জায়গা নিশ্চয় এই পৃথিবীতেই কোথাও আছে, দূরে।

দাদি চার্চে পরে যাওয়ার কাপড়টা দিয়ে তার বদলে একজনের কাছে কিছু ভুট্টা পেল। ভুট্টাগুলো সিদ্ধ করে ছালায় বেঁধে নিল। ছালাটা নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। দাদি ভেবেছিল রাস্তায় কোথাও নদী থেকে পানি নিয়ে নেবে কিন্তু সামনে কোন নদী না থাকায় ভয়ানক পিপাসায় আমাদের আবার ঘুরে আসতে হলো। অবশ্য একেবারে দাদিবাড়ি পর্যন্ত ফিরে না এসে আমরা একটা গ্রামে এলাম যেখানে পানির পাম্প ছিল।সামান্য কাপড়চোপড় ভরা বাকসোটা খুলে দাদি সেখান থেকে তার জুতা জোড়া হাতে নিল। জুতা বিক্রি করে পানি নেয়ার জন্য বড় একটা প্লাস্টিকের বোতল কিনল। আমি বললাম, দাদি, তোমার কাপড়ও নেই, আবার জুতাও দিয়ে দিলে, চার্চে যাবে কী করে? দাদি আমাকে বুঝিয়ে বলল, আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। তাই এত জিনিস কি সঙ্গে বয়ে নেয়া যায়! সেই গ্রামেও দেখলাম মানুষেরা পালিয়ে যাচ্ছে। মনে হলো, কোথায় যাওয়া যায় তা আমাদের চেয়ে ওরা ভালো জানে। তাই তাদের সাথে আমরাও যোগ দিলাম। আমাদের ক্রুগার পার্কের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ক্রুগার পার্কের ব্যাপারে আমরা জানতাম। সেটা একটা পশুরাজ্য-- যেখানে হাতি, সিংহ, শিয়াল, হায়েনা, গন্ডার আর কুমিরে ঠাসা। যুদ্ধের আগে আমাদের নিজেদের দেশেও কিছু প্রাণী ছিল (দাদা বলে, আমরা বাচ্চারা তখনো জন্মাইনি)। কিন্তু দস্যুরা হাতিগুলো মেরে দাঁতগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। তারপর সৈন্যদের সঙ্গে মিলে খরগোশগুলো খেয়ে সাবাড় করেছে। আমাদের গ্রামের নদীতে একবার একজন লোকের দুটো পা কুমিরে খেয়ে ফেলেছিল। এছাড়া আমাদের দেশ সবসময় এমনিতে মানুষের দেশই ছিল, পশুদের নয়। ক্রুগার পার্কের ব্যাপারে জানতাম কারণ আমাদের গ্রামের কিছু মানুষ সেখানে থাকত। ক্রুগার পার্কের যেখানে সাদা মানুষেরা বেড়াতে বা পশু দেখতে আসত সেখানে কাজ করার জন্য গ্রামের কয়েকজন ঘর ছেড়েছিল।

আমরা আবার রওনা দিলাম। মহিলারা ক্লান্ত হয়ে গেল। আমার মতো কিছু বাচ্চা ছিল যারা আরো ছোটদের পিঠে নিয়ে এগোচ্ছিল। একজন লোক আমাদেরকে ক্রুগার পার্কের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা কি চলে এসেছি? আমরা কি চলে এসেছি? আমি বারবার দাদির কাছে জানতে চাচ্ছিলাম। দাদি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, এখনো আসিনি। বরং তার মতে আমাদেরকে ক্রুগার পার্কের পাঁচিল থেকে দূরে থাকার জন্য একটু বেশি ঘুরপথে যেতে হবে। শহরে আলো পৌঁছানোর জন্য পাঁচিলের গা ঘেঁষে বৈদ্যুতিক খুঁটির উপরে যে তারগুলো গিয়েছে সেগুলো থেকে বাঁচার জন্য। তার কথা শুনে মনে হলো পাঁচিল ছোঁয়া মাত্রই চামড়া ঝলসে আমরা মরে যেতে পারি। পাঁচিলের গায়ে ছবি টাঙানো আছে। মিশন হাসপাতাল পুড়িয়ে ফেলার আগে সেখানে একটা লোহার বাকসের উপরে চোখ, চুল আর চামড়াবিহীন মাথার এই ছবিটা দেখেছিলাম।

আমি আবার জানতে চাইলে লোকটা বলল, ক্রুগার পার্কের উপর দিয়ে আরো এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। কিন্তু যে ঝোঁপঝাড়গুলোর ভেতর দিয়ে দিনভর হাঁটছিলাম, দেখে মনে হচ্ছিল সব একই রকম। বানর, পাখি আর কচ্ছপ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী চোখে পড়েনি। কচ্ছপ হলে অবশ্য আমাদের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। আমার বড় ভাই আর অন্য ছেলেরা মিলে সেটাকে ধরে পথ দেখিয়ে চলা লোকটির কাছে এনেছে কেটে রান্না করবে বলে। লোকটি কচ্ছপটাকে ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ আগুন জ্বালানো নাকি ঠিক হবে না। যেহেতু আমরা ক্রুগার পার্কের ভিতরে ছিলাম, আগুন জ্বাললে ধোঁয়ার কারণে ধরা পড়ে যেতাম। পুলিশ আর নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের দেখলে আবার যেখান থেকে এসেছিলাম আবার সেখানে পাঠিয়ে দিত। লোকটা বলেছিল রাস্তায় পা না দিয়ে, সাদা মানুষদের ক্যাম্প এড়িয়ে আমাদেরকে পশুপাখির মাঝে পশুপাখির মতো করে এগিয়ে যেতে হবে। হঠাৎ যখন ডাল ভাঙ্গার আর ঘাস মাড়ানোর শব্দ আমার কানে এল, জানি আমিই প্রথম শব্দটা শুনলাম, লোকটির কথামতো পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী আমাদেরকে পেয়ে গেছে ভেবে প্রায় আর্তনাদ করে উঠতে গেলাম। শেষে দেখা গেল সেটা একটা হাতি। তারপর আরো একটা হাতি, আরো অনেক হাতি! গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে যেদিকেই তাকাও, শুধু গাঢ় রঙের স্তূপ নড়তে দেখা যাবে। শুঁড় পেঁচিয়ে তারা মোপেন গাছের পাতাগুলো মুখে পুরছিল। বাচ্চা হাতিগুলো মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু বড় হাতিরা আমার বড় ভাই আর তার বন্ধুদের মতো কুস্তি লড়ছিল। হাতের বদলে ব্যাবহার করছিল শুঁড়। আমার এত মজা লাগছিল যে ভয় পেতেই ভুলে গেলাম। লোকটি বলল হাতিগুলো যতক্ষণ পার হবে ততক্ষণ আমাদের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। হাতিগুলো ধীরে সুস্থে চলছিল কারণ শরীর এত ভারী যে তাদের পক্ষে কাউকে দেখে চট্ করে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া সম্ভবনয়।

খরগোশগুলো আমাদের দেখে ছুটে পালিয়ে গেল। তাদের লাফ দেখে মনে হচ্ছিল উড়ছে। আমাদের গ্রামের একটা ছেলে খনি থেকে আনা সাইকেল নিয়ে যেভাবে এঁকেবেঁকে চলত, বন্য শুকোরেরা শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি সামনে থেকে সরে সেরকম আঁকাবাঁকা লাইন করে মরার মতো পড়ে রইল। আমরা প্রাণীগুলোর পিছু নিলাম তারা কোথায় পানি খায় দেখার জন্য। তাদের খাওয়ার পরে গর্তে জমে থাকা পানি আমরা খেতে আরম্ভ করলাম। পিপাসায় যে এত কাতর ছিলাম, পানির খোঁজ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি। আমাদের সামনে প্রাণীগুলো সারাদিন ধরে শুধু খেয়েই চলছিল। তাদের দিকে তাকালে দেখতে পেতে যে তারা ঘাস, গাছ অথবা গাছের শিকড় কিছু না-কিছু খাচ্ছেই। অথচ সেখানে আমাদের খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। সামান্য সিদ্ধ করে আনা ভুট্টাশেষ হয়ে গিয়েছিল। নদীর উপর লতায় জন্মানো কতকগুলো শুকনো, পিপড়েধরা ডুমুর ছিল আমাদের একমাত্র খাদ্য যা আসলে বেবুনরাখায়। সুতরাং ওই জঙ্গলে পশুপাখির মতো হতে চাওয়া খুব কষ্টকর ছিলবটে।

দিনের বেলায় তীব্র গরমে সিংহগুলোকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখতাম। তাদেরগায়ের রঙ ঘাসের রঙের হওয়াতে আমরা প্রথমে তাদের দেখতে পাইনি।কিন্তু লোকটি বুঝতে পেরে আমাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। আমারও সিংহগুলোর মতো করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। ছোট ভাইটা তখন দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমার কাছে খুব ভারী লাগত। ওকে পিঠে উঠিয়ে দেয়ার জন্য দাদি যখন আমাকে খুঁজত, আমি লুকিয়ে থাকতাম। আমার বড় ভাই তেমন কথাবার্তা বলত না; কোথাও জিরিয়ে নিতে বসলে পরে তাকে ধাক্কা দিয়ে ওঠাতে হতো। সে যেন দাদার মতো হয়ে গেছে, কিছুই শুনতে পায় না। একবার দেখি দাদির মুখের উপরে কতকগুলো মাছি হেঁটে বেড়াচ্ছে অথচ দাদি তাড়িয়ে দিচ্ছে না। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পাম গাছের একটা পাতা নিয়ে মাছিগুলোকে ধাওয়া করলাম। 

রাতেও আমরা দিনের মতো করে হাঁটতাম। সাদা মানুষদের ক্যাম্পের রান্নার আগুন দেখা যেত। ধোঁয়া আর মাংসের গন্ধ নাকে লাগত। হায়েনাগুলোকে দেখতাম গন্ধ পেয়ে ঝোঁপের মধ্যে উধাও হয়ে যেত। যেনল জ্জায় তাদের পিঠ ঢালু হয়ে গেছে। তবে তারা কেউ যদি মাথাটা একবার ঘোরাত তো দেখত, তাদের বড়, চকচকে বাদামি চোখগুলো দেখতে ঠিক আমাদের চোখের মতো; অন্ধকারে যখন আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাই। ক্যাম্পে কাজের লোকগুলোর থাকার জায়গা থেকে আমাদের ভাষায় কথাবার্তা ভেসে আসছিল। দলের
একজন মহিলা তখন সাহায্যের জন্য তাদের কাছে যেতে চাইল।
অনবরত চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে সে বোঝাতে চাচ্ছিল যে তারা খাবারের উচ্ছ্বিষ্ট থেকেও তো আমাদেরকে কিছু দিতে পারে। শেষে দাদিকে মহিলার মুখ চেপে ধরতে হলো। যে লোকটি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে বার বার ক্রুগার পার্কে গ্রামের পরিচিত লোকদের থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। আমাদেরকে সাহায্য করলে নাকি কাজ থেকে তাদের ছাঁটাই করে দেবে। সুতরাং তারা যদি আমাদেরকে দেখেও ফেলে তো হয় না দেখার ভান করবে নয়তো ভাব দেখাবে যে কেবল কিছু পশুপাখি দেখেছে। 

রাতে সামান্য ঘুমিয়ে নেয়ার জন্য কখনো আমরা একটু থামতাম। গাদাগাদি করে ঘুমাতাম। যেহেতু প্রতিটি মুহূর্তে আমরা শুধু হাঁটছি আর হাঁটছিই, তাই ঠিক কবে তা বলতে পারব না, তবে কোনো একটা রাতে মনে হলো সিংহগুলো একেবারে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। শব্দটা দূর থেকেশোনা গর্জনের মতো নয়। বরং যেন খুব কাছেই, হাঁফানোর শব্দের মতো, জোরে দৌড়ালে আমরা যেমন করি। তারা কিন্তু মোটেই দৌড়াচ্ছে না, কাছেই কোথাও বসে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে আমরা আরো কাছাকাছিচলে এলাম; একজনের উপরে আরেকজন। হুড়োহুড়িতে কেউ ধারেরদিকে চলে গেলে ক্রমাগত মাঝখানে চলে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।ভয়ের চোটে ঘাম ছুটে যাওয়া এক মহিলার দুর্গন্ধময় শরীরের চাপে আমি পিষে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তবু তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে পেরে ভরসা পাচ্ছিলাম। বিধাতার কাছে মিনতি করছিলাম যে সিংহরা যদি নেবেই তো ধারের দিক থেকে কাউকে টেনে নিয়ে চলে যাক। সামনের একটা গাছ থেকে লাফিয়ে পড়লে একটা সিংহ ঠিক মাঝখানে আমাকে পাবে, সেইদৃশ্যটা যেন দেখতে না হয় তাই আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। লোকটি ভয় পাওয়ার বদলে একটা মরা ডাল নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সব গাছে আঘাত করতে লাগল। সে আমাদের সবসময় শব্দ করতে মানা করত।কিন্তু তখন নিজেই চিৎকার চেঁচামেচি করে হট্টগোল শুরু করে দিল। সিংহদের উদ্দেশ্যে লোকটা এমন শোরগোল করছিল, ঠিক যেভাবে আমাদের গ্রামে মাতাল এক লোক উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে চেঁচায়। একটু পরে লোকটির চিৎকারের উত্তরে দূর থেকে ভেসে আসা সিংহদের গর্জন শুনতে পেলাম।

আমরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পাথরের উপরে পা দিয়ে নদী পার হওয়ার সময়ে আমার বড় ভাই আর লোকটি মিলে দাদাকে তুলে এক পাথর থেকে অন্য পাথরে রাখছিল। দাদি এমনিতে শক্তসমর্থ কিন্তু তার দুই পা থেকে রক্ত ঝরছিল। একমাত্র আমার ছোট ভাইটিকে ছাড়া মাথার উপরের বাকসোগুলো বা অন্য কিছুই আর আমরা বইতে পারছিলাম না। তাই সব জিনিস একটা ঝোঁপের নীচে ফেলে রওনা দিলাম। দাদি বলছিল, সব থাক, আমরা নিজেরা কোনরকমে পৌঁছতে পারলেই হয়! একসময় খিদের জ্বালায় অচেনা কিছু জংলি ফল খেয়ে ফেলাতে আমাদের পেট খারাপ হয়ে গেল। পেটে যখন ব্যথা শুরু হলো তখন আমরা লম্বা লম্বা ঘাস ঘেরা একটা জায়গা পার হচ্ছিলাম। ঘাসগুলো প্রায় হাতির সমান উঁচু। দাদা তো আর আমার ছোট ভাইয়ের মতো যেখানে সেখানে বসে পড়তে পারে না, তাই তাকে বারবার ঘাসের আড়ালে যেতে হচ্ছিল। আমাদের দ্রুত ছোটা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। লোকটি বারবার তাগাদা দিচ্ছিল, তবু তাকে দাদার জন্য একটু অপেক্ষা করতে বলছিলাম।

দাদা যেন আমাদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে তাই সবাই বসে ছিলাম। কিন্তু দাদা পারেনি। মধ্য দুপুরে পোকামাকড়ের টানা ডাকের মধ্যে ঘাসের ভিতরে তার নড়াচড়ার কোনো শব্দ আমাদের কানে আসেনি। ঘাসগুলো অনেক লম্বা আর দাদা এত ছোট যে তাকে দেখা যায়নি। কিন্তু ঢোলা প্যান্ট আর ছেঁড়া শার্ট পরে কোথাও না কোথাও সে ছিল নিশ্চয়ই। শার্টটা সুতো না থাকায় দাদি আর সেলাই করে দিতে পারেনি। দাদা এত দুর্বল আর ধীরে পায়ে হাঁটে যে তার পক্ষে বেশি দূরে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। ছড়িয়ে গেলাম দলে দলে ভাগ হয়ে যেন নিজেরাও আবার ঘাসের মধ্যে হারিয়ে না যাই। ঘাসগুলো আমাদের নাকে-চোখে ঢুকে যাচ্ছিল। নীচু স্বরে দাদাকে ডাকছিলাম কিন্তু পোকামাকড়ের একটানা শব্দের ফাঁকে সে ডাক তার কানে পৌঁছানোর তেমন কোনো উপায় ছিল না। অনেক খুঁজেও শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া গেল না। লম্বা লম্বা ঘাসের উপরে সারারাত আমরা পড়ে থাকলাম। ঘুমের মধ্যে মনে হলো, খরগোশের লুকিয়ে রাখা বাচ্চার মতো কোন রকম কোথাও একটু জায়গা করে নিয়ে গুটিশুটি মেরে দাদা হয়ত শুয়ে আছে। 

জেগে ওঠার পরেও দাদাকে কোথাও দেখলাম না। তাই আবার খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। ততক্ষণে ঘাসের মধ্যে বারবার যাতায়াতের কারণে কতকগুলো রাস্তাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাকে খুঁজে না পেলেও অন্তত তার জন্য আমাদেরকে খুঁজে পাওয়া তো কঠিন ছিল না। সমস্ত দিন আমরা অপেক্ষায় বসে থাকলাম। চারদিক চুপচাপ। বন্যপ্রাণীগুলোর মতো গাছের ছায়ায় শুয়ে থাকলেও সূর্যের প্রখরতা থেকে বাঁচা যেত। চিত হয়ে শুয়ে আকাশে ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকা কুৎসিত, বাঁকা ঠোট আর পালকবিহীন গলাওলা পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আগেও বেশ কয়েকবার মরা প্রাণীর হাড়হাড্ডি চাবাতে দেখেছি ওদের। অবশ্য সেখানে তাদের খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। অনেক উপরে বৃত্তাকারে উড়তে উড়তে তারা নীচে নেমে আসতে থাকে। তারপর নামতে নামতে আবার উপরে উঠে যায়। দেখলাম তাদের গলাগুলো ঘুরিয়ে এদিক ওদিক ঠোকর দেয়ার ভঙ্গি করছে। আবার গোল গোল করে উড়ছে। দদিও আমার ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে পাখিগুলোর দিকে বরাবর তাকিয়ে ছিল। 

দুপুরের পরে লোকটা দাদিকে বলল, এবার আমাদের যাওয়া উচিত। বলল যে তাদের বাচ্চাগুলো যদি এরপরও না খেয়ে থাকে তো মারা যাবে।

উত্তরে দাদি কিছুই বলেনি।

লোকটা দাদিকে আশ্বাস দিল, যাওয়ার আগে আমি তোমাদের খাওয়ার পানি এনে দেব।

দাদি একে একে বড় ভাই, নিজের কোলে ছোট্ট ভাইটা আর আমার দিকে তাকাল। আমরা দেখলাম একের পর এক সবাই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না যে চারপাশের ঘাসগুলো মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল যেখানে একটু আগে তারা বসে ছিল। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে ক্রুগার পার্কে আমরা একদম একা হয়ে যাব আর পুলিশ অথবা বন্য প্রাণীরা সহজেই আমাদের পেয়ে যাবে। আমার নাক-চোখের পানি হাতের উপরে বেয়ে পড়ছিল কিন্তু দাদি লক্ষই করল না। গ্রামের বাড়িতে চ্যালা কাঠ মাটি থেকে তোলার জন্য দাদি যেমন পা ফাঁক করে দাঁড়াত সেভাবে উঠে দাঁড়াল। আমার ছোট ভাইটাকে নিজের কাপড় দিয়ে পিঠে বেঁধে নিল, জামার উপরের দিকটা ছিঁড়ে যাওয়াতে তার বড় স্তনদুটো দেখা যাচ্ছিল। যদিও সেগুলোতে ছোট ভাইয়ের জন্য কিছুই ছিল না। দাদি শুধু বলল, চল।

তারপর সেই লম্বা ঘাসওলা জায়গাটা ফেলে আমরা চললাম। অনেক পেছনে ফেলে চলে এলাম। যে লোকটা আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল, তার আর অন্য সবার সঙ্গে এক হয়ে আমরা আবার যেতে আরম্ভ করলাম।আবারো হাঁটতে লাগলাম। 

চার্চ কিংবা স্কুলের চেয়েও বড় একটা তাবু মাটির সাথে টেনে বাঁধা ছিল। যার জন্য এত দূরে এসেছি তা ঠিক এমন হবে, আগে বুঝতে পারিনি। অবশ্য এরকম একটা জিনিস আমি দেখেছিলাম যখন সৈন্যদের কাছে বাবা কোথায় আছে জানতে মা আমাকে নিয়ে শহরে গিয়েছিল। সেই তাবুর ভেতরে মানুষ বসে প্রার্থনার গান গাচ্ছিল। এটা যদিও একই রকম নীল-সাদায় বানানো কিন্তু প্রার্থনা বা গান গাওয়ার জায়গা নয়। এখানে আমাদের দেশ থেকে ভেসে আসা মানুষদের সঙ্গে আমরা থাকি। ক্লিনিকের সিস্টার বলে, ছোট বাচ্চারা ছাড়াই নাকি আমরা দু’শ মানুষ। আবার ক্রুগার পার্ক থেকে আসার পথে জন্মানো শিশুরাও তো আছে! 

কড়া রোদের মধ্যেও তাবুর ভেতরে বেশ অন্ধকার। মনে হয় পুরো গ্রামটাই ঠেলে ঠুলে এখানে ঢুকে গেছে। প্রতিটা পরিবার বাড়ির বদলে চট অথবা বাকসের মোটা কাগজ দিয়ে ঘেরা নিজেদের ছোট জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। আমরা যেখানে যা পেতাম তাই দিয়েই অন্যদেরকে নিজেদের সীমানা বুঝিয়ে দিতাম যে এর ভেতরে কেউ আসতে পারবে না। যদিও দরজা, জানালা বা দেয়াল বলতে কিছুই ছিল না। তাই বাচ্চারা ছাড়া অন্য যে কেউ উঠে দাঁড়ালে সবার বাড়ির ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পেত। কেউ কেউ আবার মাটির ঢেলা দিয়ে রঙ বানিয়ে চটের উপরে নকশাও করেছিল।

যাই হোক, অনেক উপরে আর দূরে হলেও, তাবুর ছাদটাই ছিল আমাদের সত্যিকারের ছাদ। ছাদটা ছিল আকাশের মতো। মনে হতো সেটা একটা পাহাড় আর পাহাড়ের ভিতরে থাকি আমরা। তাবুর ফাটা ফাটা জায়গাগুলোতে ধুলোর স্তর ভারি হয়ে এম নভাবে নিচের দিকে নেমে এসেছে যেন মনে হয় সেগুলো বেয়ে উঠে যাওয়া যাবে। তাবুর ছাদটা মাথার উপরে বৃষ্টি ঠেকায়। কিন্তু পাশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে।সীমানাগুলোর মাঝখানে, যেখানে শুধু একজন মানুষ চলাচল করতে পারে, সেখানে আমার ছোট ভাইয়ের মতো বাচ্চারা বসে কাদা দিয়ে খেলে। হাঁটতে হলে তোমাকে তাদের মাড়িয়েই যেতে হবে। আমার ছোটভাই একেবারে খেলে না। প্রতি সোমবারে ক্লিনিকে যখন ডাক্তার আসে দাদি তাকে তার কাছে নিয়ে যায়। সিস্টার বলেছে লম্বা সময় ধরে যথেষ্ট খাবার না পাওয়ার কারণে তার মাথার ভিতরে কোনো ক্ষতি হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধ চলছিল। আর বাবা সেখানে আমাদের সাথে ছিল না। তারপর আবার ক্রুগার পার্কেও সে খাবার পায়নি। সে শুধু সারাদিন দাদির গায়ে অথবা শরীরের যে কোনো জায়গায় হেলান দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় কিছু জানতে চায় কিন্তু দেখলেই বুঝবে যেসে তা বলতে পারছে না। অবশ্য কখনো কাতুকুতি দিলে সে হয়ত একটু হাসতেও পারে। ক্লিনিক থেকে একরকম গুঁড়ো দেয় পানির সঙ্গে মিশিয়ে তাকে খাইয়ে দেয়ার জন্য। আর এভাবে ধীরে ধীরে হয়ত একদিন সে ঠিক হয়ে যাবে।

যেদিন আমরা এখানে এসে উঠেছিলাম, আমার আর আমার বড় ভাইয়ের অবস্থাও একইরকম ছিল। তেমন কিছু ভালো করে মনে পড়েনা আমাদের। ক্রুগার পার্ক হয়ে দূর থেকে আসা সবাইকে প্রথমে যেখানে এসে জানাতে হয়, তাবুর আশেপাশে থাকা গ্রামের লোকেরা আমাদেরকে ধরাধরি করে সেই ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা ঘাসের উপরে বসে অপেক্ষা করছিলাম। কী করতে হবে ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না। উঁচুহিলের জুতা পরা, অদ্ভুত মসৃণ চুলওলা সুন্দরী এক সিস্টার আমাদেরকে কিছু প্যাকেট করা পাউডার খেতে দিল তখন। পাউডারগুলো পানির সাথে মিশিয়ে ধীরে ধীরে খেতে বলল। আমরা দাঁত দিয়ে প্যাকেট ছিঁড়ে চেটে চেটেই খেতে লাগলাম। পাউডার আমার মুখে আঠার মতো লেগেগেলে ঠোঁট আর আঙুল থেকে চুষে খাচ্ছিলাম। আমাদের সাথে হেঁটে আসা বেশ কিছু বাচ্চা বমি করতে আরম্ভ করল। আমার অবশ্য শুধু হেচকির জন্য কষ্ট হচ্ছিল আর পেটের ভিতরের সবকিছু যেন সাপের মতো পেঁচিয়ে উপরে-নীচে ওঠা নামা করছিল। অন্য একজন সিস্টার বারান্দায় লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে বলল কিন্তু আমরা উঠতেই পারলাম না। আমরা পুরো জায়গাটাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, একজন আর একজনের গায়ে হেলান দিয়ে কোন রকমে বসে ছিলাম। সিস্টার প্রত্যেকের একটা করে হাত ধরে তাতে সূঁচ ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। আরও কিছু সূঁচ দিয়ে রক্ত নিয়ে ছোট্ট টিউবে ভরছিল। আমাদের সুস্থ করার জন্যই হয়ত এসব করছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কেন, যতবার চোখ বুজে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে তখনো হাঁটছি আর হাঁটছিই, ঘাসগুলো খুব লম্বা আর সামনে অনেক হাতি। বুঝতেই পারছিলাম না যে সেসব অনেক দূরে ছেড়ে এসেছি।

দাদি কিন্তু তখনো মোটামুটি শক্তভাবে দাঁড়াতে পারছিল। লিখতে-পড়তে পারত বলে সে-ই আমাদের হয়ে সাইন করে দিল। দাদি আমাদেরকে তাবুর এক ধারে নিয়ে রাখল। যদিও সেদিক দিয়ে বৃষ্টি আসতে পারে কিন্তু ঝুলানো ঢাকনাগুলো উঠিয়ে রাখলে বেশ রোদ আসে আর তাবুর ভিতরের গুমোট গন্ধটাও বেরিয়ে যায়। দাদির পরিচিত এক মহিলা তাকে পাটি বানানোর মতো ভালো জাতের ঘাসের জায়গাটা দেখিয়ে দিলে দাদি আমাদের ঘুমানোর জন্য বেশ কয়েকটা বানিয়ে ফেলল। দেখলাম মাসে একবার খাবারের ট্রাক ক্লিনিকে আসে। সাইন করে দাদি যে কার্ডগুলো নিয়েছিল তার একটা দেখালে আমরা চটের বস্তায় ভরা ভুট্টার তৈরি কিছুখাবার পাই। ছোট ঠেলাগাড়ি ঠেলে বস্তাগুলো তাবুতে আনতে হয়।আমাদেরটা দাদির বদলে আমার বড় ভাই ঠেলে আনে। তারপর খালি ঠেলাগাড়িগুলো ক্লিনিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে অন্য ছেলেদের সঙ্গে দ্রুত ঠেলার প্রতিযোগিতা চলে। গ্রামে যে লোকটা বিয়ারের জোগান দেয়, কখনো কপালে থাকলে সে ভাইকে কিছু টাকা দিয়ে বলে সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিতে। অবশ্য অন্য কোনো দিকে না গিয়ে ঠেলাগাড়িগুলো সরাসরি সিস্টারদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা। লোকটার কাছ থেকে টাকা পেলে ভাই একটা ঠান্ডা পানীয় কিনে খায় আর আমারকাছে হাতেনাতে ধরা পড়লে আমাকেও ভাগ দেয়। প্রতিমাসের কোনো একদিন ক্লিনিকের সামনে চার্চের লোকেরা পুরোনো কাপড় স্তূপ করে রেখে যায়। দাদির কাছে আরেকটা কার্ড আছে যেটা দেখালে আমরা সেখান থেকে কাপড় পছন্দ করে নিতে পারি। এখন আমার দুটো জামা, দুটো প্যান্ট আর একটা লম্বা হাতাওলা উলের জামা আছে। তাই এখন আমি স্কুলে যেতে পারি।

গ্রামের স্কুলে একদিন আমাদেরকে ভর্তি করে নিল। অবাক হয়ে দেখলাম তারা আমাদেরই ভাষায় কথা বলে। দাদি বলল কেন তারা এখানে আমাদেরকে থাকতে দিল; কারণ অনেক আগে, বাবা যখন ছোট ছিল, আমাদের গ্রাম থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত একই শাসকের আওতায় একটাই দেশ ছিল। তাদের আর আমাদের মাঝখানে ভয়ঙ্কর ক্রুগার পার্ক ছিল না আর ছিল না কোনো সীমানা বা প্রাচীর- যা মানুষের ঝামেলা বাড়ায়, মানুষকে কষ্ট দেয়।

তাবুতে দিনের পর দিন থাকতে থাকতে আমার এগারো বছর বয়স হয়ে গেল। আমার ছোট ভাইয়ের প্রায় তিন বছর, যদিও তার মাথাটাই শুধুবড়। শরীরটা এত ছোট যে তাকে ঠিক তিন বছরের বাচ্চার মতো দেখায় না। তাবুর কিছু মানুষ আশে পাশের পড়ে থাকা জমিতে কিছু শিম, ভূট্টা আর বাঁধাকপি লাগিয়েছে। বয়ষ্করা বসে বসে লতাপাতা দিয়ে নিজেদের বাগানের চারদিকে দেয়ার জন্য বেড়া বানায়। কারো অবশ্য শহরে গিয়ে কাজ করার নিয়ম নেই কিন্তু মহিলারা কেউ কেউ গ্রামেই কাজ পেয়ে গেছে তাই নিজেদের জন্য এটা সেটা কিনতে পারে। সেই গ্রামে আমাদেরও খানকার মতো কাদামাটি দিয়ে নয়, ওরা ইট আর সিমেন্ট দিয়ে সুন্দর বাড়ি বানায়। দাদি যেহেতু এখনো শক্ত সমর্থ আছে তাই সেরকম একটা জায়গায় কাজ পেয়ে গেল। মাথায় করে কখনো ইট আবার কখনো বাকসো ভরা পাথর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এখন তার কাছে চিনি-চা-দুধ-সাবান কেনার পয়সা থাকে। চায়ের দোকান থেকে একটা ক্যালেন্ডার পেয়ে দাদি তাবুর ঢালু দেয়ালে লাগিয়ে রেখেছে। স্কুলে আমি বেশ চালাক-চতুর। দাদি দোকানের বাইরে থেকে মানুষের ছুঁড়ে ফেলা বিজ্ঞাপনের কাগজ কুড়িয়ে এনে আমার বইগুলোতে মলাট লাগিয়ে দেয়। মোমবাতির দাম বেশি আর রাত হলে আমাদেরকে তাবুর ভিতরে সেই ক্রুগার পার্কের মতো ঠাসা ঠাসি করে শুতে হয় তাই সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই দাদি আমাকে আর বড় ভাইকে দিয়ে বাড়ির কাজগুলো করিয়ে নেয়। চার্চে যাওয়ার জন্য দাদি নিজের জুতা এখনো কিনতে পারেনি কিন্তু আমার আর বড় ভাইয়ের স্কুলের কালো জুতা ঠিকই কিনে দিয়েছে। আবার জুতাগুলো মুছে পরিষ্কার করে রাখতেও ভোলে না। প্রতিদিন যখন তাবুর ভিতরে সকাল হয়, শিশুরা খামোখা কাঁদতে থাকে, বড়রা একজন আর একজনকে বাইরের গোসলখানার দিকে ঠেলতে থাকে আর বাচ্চারা কেউ কেউ আগের রাতে যে বাটি থেকে আমরা পরিজ খেয়েছি সেটার শুকিয়ে যাওয়া গুড়ো খুঁটিয়ে খেতে থাকে, ঠিক তখন আমি আর আমার বড় ভাই স্কুলের জুতা গুছিয়ে নিই। দাদি ঘাসের পাটির ওপরে আমাদেরকে একসাথে পা সোজা করে বসতে বলে যেন ভালোভাবে দেখতে পায় যে আমরা ঠিক মতো জুতা পরেছি কি না। তাবুর অন্য কোনো বাচ্চার স্কুলের জুতা নেই। তাদের সাথে তুলনা করে নিজেদের তিনজনের দিকে তাকালে মনে হয় আমরা যেন আবার সত্যি সত্যি নিজের বাসায় আছি, একটুও দূরে আসিনি আর মাঝখানে কোনো যুদ্ধ ছিল না।

কয়েকজন সাদা মানুষ একটা সিনেমা বানাবে বলে একদিন তাবুতে থাকা লোকদের ছবি তুলতে এল। সিনেমার কথা যদিও আগে শুনেছি কিন্তু কখনো দেখিনি। একজন সাদা মহিলা ঠেলে ঠুলে আমাদের ঘেরা দেয়া জায়গাটাতে ঢুকে গিয়ে দাদিকে এটা সেটা প্রশ্ন করা শুরু করল। সাদা মহিলাটার ভাষা বোঝে এমন একজন আমাদের ভাষায় দাদিকে প্রশ্নগুলো বুঝিয়ে বলতে লাগল।

কতদিন ধরে আপনারা এভাবে আছেন?

দাদি জানতে চাইল, ”এখানে” বলতে সে কি ”তাবুতে” বোঝাচ্ছে? দুই বছর এক মাস।

ভবিষ্যতের জন্য আপনি কী আশা করেন?

কিছু না। আমি এখানেই বেশ আছি।

কিন্তু আপনার বাচ্চাদের জন্যও কি কিছু চান না?

আমি তাদের পড়ালেখা শেখাতে চাই যেন তারা বড় হয়ে ভালো কাজ পায় আর রোজগার করতে পারে।                                              
আপনি কি কখনো আপনার নিজের দেশ মোজাম্বিকে ফিরে যেতে চান?

না। আমি ফিরে যাব না।

কিন্তু যুদ্ধ থেমে গেলে তো এখানে আপনাদের আর থাকতে দেয়া হবে না, তখনো কি আপনারা ফিরে যাবেন না?

আমার মনে হলো না দাদি আর কথা বাড়াতে চায়। সে সাদা মহিলার আর কোনো কথার উত্তর দেবে বলেও মনে হলো না। সাদা মহিলাটা আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।

আমাদের কোনো বাড়ি নেই। কিছু নেই।

দাদি এটা কেন বলল? কেন? আমি অবশ্যই ফিরে যাব। আমি আবার সেই ক্রুগার পার্ক পার হয়ে চলে যেতে চাই। মা নিশ্চয় আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে। যুদ্ধের পরে দস্যুরাও হয়ত আর ওখানে থাকবে না। আর দাদাকে যেখানে একলা ফেলে এসেছি, সেখান থেকে কোনো ভাবে ধীরে ধীরে ক্রুগার পার্কের ভেতর দিয়ে এতদিনে নিশ্চয় সে বাড়িতে পৌঁছে গেছে। তারা নিশ্চয় বাসায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আর তাদের কথা তো আমার মনে পড়তেই থাকবে! 


..................................................

‘ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প’(Jump And The Other Stories) সংকলন থেকে নেয়া গল্প, ‘শেষ যাত্রা’ (The Ultimate Safary)

লেখক পরিচিতি 

নাদিন গোর্ডিমার

নাদিন গোর্ডিমার জন্মেছিলেন সাউথ আফ্রিকায় জোহেন্সবার্গের কাছে স্প্রিংস নামে ছোট একটি শহরে। একেবারে তরুণ বয়স থেকেই সাউথ আফ্রিকার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণায় তিনি নিয়েজিত। ছোট বেলায় ক্যাথলিক কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। “দ্যা কোয়েস্ট ফর সিন গোল্ড” নামে একটি বইয়ের মাধ্যমে১ ৯৩৭ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে প্রথম শিশুসাহিত্যের জগতে পা রাখেন। এরপর শিশুদের জন্য আরো রচনা করে যান। পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে সাউথ আফ্রিকার বিভিন্ন ম্যাগাজিনে গল্প লিখতে আরম্ভ করেন। ১৯৪৯ সালে “ফেস টু ফেস” নামে তার প্রথম ছোট গল্পের সংকলন বের হয়। ১৯৫১ সালে দ্যা নিউ ইয়র্কারে তার গল্প প্রথম প্রকাশিত হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। তারপর থেকেই ক্রমাগত ছোট গল্পের আসরে নাদিন গোর্ডিমার একটি বিশেষ নাম। গল্পের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ছোটগল্প এই যুগের সাহিত্যের প্রতিফলন।

১৯৫৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস “দ্যা লাইং ডেইজ” প্রকাশিত হয়। নীতিবর্জিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ফলাফল হিসেবে আসা মানুষের অস্থির সামাজিক জীবনের মর্মান্তিক বর্ণনাই তার লেখার প্রধান উপাদান। তার লেখায় জাতিগত বৈষম্যের নির্ভুল চিত্র ফুটে ওঠেবারবার। কাহিনিগুলোতে ভালোবাসা, ক্ষমতা আর সম্পর্ককে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। গোর্ডিমার কথা বলেন সাধারণ মানুষের কন্ঠে। তাদের চাওয়া-পাওয়া যেন বিমূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে তার কলমের ছোঁয়ায়। সমাজের অবহেলিত মানুষের বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্যই যেন তিনি ক্রমাগত লিখে যান আরো অনেক গল্প আর উপন্যাস। ১৯৭৪ সালে “দ্যা কনজারভেশনিস্ট” নামে উপন্যাস লিখে বুকার প্রাইজ পান। নাদিন গোর্ডিমার ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজসহ আরও নানারকম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। “গেট এ লাইফ”(২০০৫) তার নবীনতম উপন্যাস। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, এইডস সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। জাতিগত এবং নীতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার লড়াই বরাবর অব্যহত ছিল। 

২০১৪ সালের ১৩ জুলাই সাউথ আফ্রিকার জোহেন্সবার্গে তিনি মৃত্যু বর ণকরেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন