রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

উপল মুখোপাধ্যায়'এর গল্প : বাংলা কথা বলি ? বিল্ডিংটা ভাঙলেন কেন ?

মালের গেলাস নানান ভাবে ধরতে দেখেছি কিন্তু নির্মল মণ্ডল যেভাবে সেদিন টইটম্বুর গেলাসটা বাড়িয়ে দিল – রেয়ার । ভেরি রেয়ার আরকি । বিশ্ব ওঁচা অফিসারস চয়েস বুজ বুজ করে উঠল ওই গেলাসে । তারপর সেকি ভক্তি ভরে সপাট নিবেদন রে বাবা ।ডান হাত বাড়িয়ে বাঁ হাত দিয়ে কনুই ছুয়ে কানকি মেরে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল নির্মল মণ্ডল ।
ও আমি আর রাজু হেলা মাল খাচ্ছিলাম মাজেনিন ফ্লরের ঘুপচি তলায় । ঘরটা বলাইদার নামে- বলাই হাজরা, বিল্ডিং এর সুইপার-জমাদার, নাম্বার ওয়ান গুলবাজ, ফেরেপবাজ ও ধূর্ত কুশলী ট্রেড ইউনিয়ন করা লোকটোক। আমিও তাই , এতদিন বাদে বলতে গেলে – বলতে কোন দ্বিধা নেই যে আমি একজন ট্রেড ইউনিয়ন করা লোকটোক। না হলে দুই কেয়ার টেকিং স্টাফের সঙ্গে বসব কেন আর বসলেই বা মাল খাব কেন? যাই হোক এই ভাবে আমাদের মাল খাওয়া চলছিল বলাইদার ঘরে- দেয়ালে একটা বড় মা কালীর ছবি ছিল তাতে মালা আর লোকনাথ বাবার ছোট্ট ছবিটায় কিছুই ছিল না কিসসু না । নির্মল মণ্ডল ছিল ফরাস, মানে জারা টেবিল পরিস্কার করত । সে সব টেবিল যেখানে সিভিল সার্ভিসের হোমরা চোমরা , সব ধরণের মন্ত্রী টন্ত্রী আর নানান ক্যাটেগরির বাবু বিবিরা বসে । সে টেবিলের ময়লা পরিষ্কার করত আর সেই ময়লা ঝাঁট দিয়ে তুলত রাজু হেলার মতো সুইপাররা । এই ভাবে টেবিলের ময়লা মেঝেতে আর মেঝের ময়লা কোথায় কোথায় যেন ফেলা হতো । সে ময়লার একটা সাবস্টেনশিয়াল অংশ সুইপার –ফরাসদের নাকে – মুখে ঢুকত । আর ঢুকতে ঢুকতে তাদের ফুসফুসকে কালো করে ফেলত । ফুসফুস কালো ময়লা ভালো রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিত , আবার ফুসফুস সুন্দর লাল রঙের হয়ে যেত । হার্টের আওয়াজ হত ধক ধক ধক ধক ধক । হার্ট পাম্প করত কারণ ফুসফুস ধুতে হবে তো । এই ভাবে চলতে চলতে সুইপার- ফরাসরা ফুসফুস আর হার্ট দুটোকেই কালো করে ফেলত কারণ কত আর রক্তের যোগান দেয়া যায় , কত আর রক্তের যোগান দেয়া যায় । তারপর তারা মরে যেত । আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলতে পারি সুইপার – ফরাসরা এই বিল্ডিং-এ কেউ ষাট বাছর বাঁচেনই নি । 
আমি নির্মল মণ্ডল কে বললাম , ‘ নির্মল মণ্ডল, এটা কিরকম হল ।’ 
নির্মল মণ্ডল বলল,‘ বল বস।’
আমি বললাম ‘ খাবার দাবার নেই ।’ 
ও তাড়াতাড়ি রাজু হেলাকে একশো টাকার নোট দিয়ে বলল , ‘ চাউমিন নিয়ে আয়।’ 

 রাজু চাউমিন নিয়ে এলে আমরা চাউমিন দিয়ে মাল খাচ্ছিলাম । 
নির্মল মন্ডল আমাকে বলল,‘ গুরু তুমি চলে গেলে, অঞ্জনদা নেই , স্বপনদা নেই , অজিতদা নেই । ’ 

আমি বললাম , ‘ চিন্তা কোরো না নির্মল মন্ডল । আমরা সবাই আছি । ’

রাজু হেলা বলল,‘ সবাই আছি কোথায় ? কেউ তো নেই গুরু । এই তো বিল্ডিংটা ভেঙে দিচ্ছে । ভাঙতে শুরু করেছে দেখছ না । ’ 

আমি নির্মল মন্ডলকে চোখ মেরে বললাম,‘ কই ভেঙেছে সব তো ঠিকই আছে । এই তো বলাইদার ঘরে মা কালী আছে , লোকনাথ বাবা । এত কুত্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বেড়াল । ’
 নির্মল মন্ডল বলল,‘ রাত হলে বড় ভয় করে বস্ । ’ 

রাজু হেলা বলল ,‘ কেন ? ’
- তখন শুধু নানারকম আওয়াজ হয় । 
 - কিসের আওয়াজ ? 
 - বিল্ডিংটার যেদিকটা ভাঙা হচ্ছে সেখান থেকে সব ছুঁচো ইঁদুর গুলো এইদিকে ঠেলে আসতে থাকে । 

- কী রকম ? 
- সব মাটির তলায় পুরনো নর্দমার ভেতর থেকে বাইরে থেকে নানারকম শব্দ হয় । 

রাজু হেলা হো হো করে হেসে উঠল , আমাকে বলল,‘ তুমি চাউমিন খাচ্ছ না যে । ’ বলে আমাকে বেশ খানিকটা চাউমিন দিল । আমি বাজে সসের স্বাদ অনুভব করছিলাম । বাজে মদ আমার পেটে পড়ে জ্বলে জ্বলে উঠল । সেই আলোতে আমি নির্মল মন্ডলের মুখ দেখার চেষ্টা করছিলাম । জবরদস্ত এক চালে এই হেরিটেজ বিল্ডিং মাত হয়েছে ।একদিন যেখানে হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি ঠেসাঠেসি করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নানান নীতি নির্ধারণ করে দেশকে উধ্বার করত সেই বিল্ডিংটা গাঁইতি শাবলের চক্করে পড়ে গেছে । তার নাকি সারাই সুরাই হয়ে একেবারে ব্রিটিশ আমলের চেহারায় ফিরে আসবে । এই করতে গিয়ে একগাদা অফিস উঠে ঘরকন্না চৌপট হয়েছে আর আমরা ঠাঁইনাড়া হয়ে কলকেতার অখাদ্য চৌহদ্দির মধ্যে লাথ খেয়ে এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়েছি । বুঝলাম নির্মল মন্ডল মানতে পারছে না । 
আমি বললাম,’ নির্মল মন্ডল । ’ 
ও বলল,‘ গুরু । ’ 

- ভাঙা বিল্ডিং-এর ভেতর শব্দ শুনছ । 
 - না না দেখছিও! 
 - কী রকম ?
 - এত ইঁট , চূন , সুরকি , লোহার বড় বড় বীম , জয়েস , মোটা মোটা কাঠের প্যানেল - সব খুলে নামাচ্ছে । 
 - তারপর ।
 - তারপর আলাদা করে সাজিয়ে রাখছে । 
 - সাজিয়ে ? 
 - সাজিয়েই তো - রাখছে । তখন বোঝাই যাচ্ছে না ওগুলো ওখানে এতদিন ছিল । 
 - মানে ? 
- আলাদা করার পর বোঝা যাচ্ছে । মানে তুমি বললে না কী দেখা যাচ্ছে । এই সব দেখা যাচ্ছে আরকি।
  
রাজু হেলা আবার হো হো করে হেসে হেসে আমার গেলাসে মাল তুলে দিল । 
আমি বললাম, ‘ রাজু হেলা , বাড়াবাড়ি কর না - তিন টে হয়ে গেছে । ’
 রাজু হেলা বলল,‘তিনটে হয়ে গেছে তো কী ? পুলিশ তোমার গন্ধ পাবে ?আমি তোমায় গেট অবধি পৌঁছে দিয়ে আসব । কোনও চিন্তা নেই গুরু ।’ 
 সত্যি বিল্ডিংটায় এখনও প্রচুর পুলিশ মোতায়েন আছে । তারা বসে থাকে কারণ মন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ অফিসাররা আর কেউ এখানে নেই । কী পাহারা দিচ্ছে কে জানে। হয়ত বিল্ডিংয়ের ভেতর মালপত্র চুরি না হয়ে যায় সে সব দেখছে । নির্মল মন্ডল যেমন বলল পুরনো বিল্ডিংয়ের কম্পোনেন্টগুলো আলাদা আলাদা করার লেবার - তার দাম ও জিনিসগুলোর দাম সব মিলিয়ে ভাঙার কাজটা বড়ই দামি। সেই কাজের জন্যই পাহারা বসেছে । তবে রাজু হেলা পুলিশের কথা বলতে আমার মনে হল সত্যিই তো পুলিশ শুঁখে দেখতে পারে তা হলে তো পুলিশের সঙ্গেই যেতে হবে । নির্মল মন্ডল ভোম মেরে বসেছিল তারপর আমাকে বলল,‘ চল তোমাকে দেখাই । ’ 
 - কী দেখাবে ?
 - ভাঙা । 
 - হ্যাঁ , কেমন করে এক দিক থেকে ধড়াধড়্ড় ভেঙে ফেলছে । 


উঠতে গিয়ে নির্মল মন্ডলের পা একটু টলে গেল আর রাজু হেলা হো হো করে হাসছিল । ম্যাজেনিন ফ্লোরগুলোতে গাদাগাদি করে কেয়ার টেকিং স্টাফেরা থাকে । নানা ভাষাভাষী বিহার, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ড, ওড়িশার লোক । মানিকতলা , টালিগঞ্জ - কলকেতার নানা এলাকার সি আই টি কোয়ার্টারের দমদার টেনিয়ারা, মুচিপাড়া গলির রংবাজরা যারা দলিত সিডিউল অন্ডার কাস্ট । যাদের গায়ে গা লাগলে বাবুরা চমকে ওঠে , বিবিরা নাক সিটকোয় । যারা সকাল সাতটার থেকে ডিউটি মেরে মাল টাল খেয়ে ক্যান্টিন হলের কাঠের পাটাতনের একদিকে পড়ে থাকত । তারপর তাদের ঘুম থেকে তুলে তুলে সরিয়ে ভদ্দরলোকের নানা অনুষ্ঠান । তার মধ্যে রং মেখে নাটক , রং না মেখে বক্তিমে অথবা ভালো ভালো কথার আবৃত্তি সবই হত । কোথায় সেই ক্যান্টিন হল ? কোথায় ? ওই দূর থেকে ভেসে আসছে নানান শব্দ , নানান হুঙ্কার , নানান প্রত্যয়ী ঘোষণা , দাবী বা তার পত্র — সে সব কোথায় ? আমি বিল্ডিংয়ের স্টাফ লাইব্রেরি খুঁজলাম । বাংলা বা ইংরেজি নানান গোত্রের বইরা কোথ্থাও নেই অফিস ঘর নেই , সিঁড়ি নেই , কড়ি বর্গা নেই , কপাট নেই তো কব্জা কোথায় পাওয়া যাবে । এই দিকে ওই দিকে কিছুই নেই দেখে নির্মল মন্ডলকে বলি ,‘ ঠিকই বলেছ । ভাঙা চলছে । ’ 
রাজু হেলা বলল,‘ কী নেই নেই বলছ বস্ এই তো সব পড়ে পড়ে আছে , দেখছ না ?’ 
আমি বললাম ,‘ কী ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, কী বিচ্ছিরি । ’ 
একজন পুলিশ বসেছিল , সে আটকায়নি কারণ আমাদের দেখে বুঝে গেছে ।
 পুলিশ বলল,‘ না না আর একটু এগোন । এগিয়ে যান না দেখবেন বেশ ভালো লাগছে ।

’ আমি , নির্মল মন্ডল আর রাজু হেলা ক্রমশ ভাঙাচোরা বিল্ডংয়ের যে অঞ্চল আছে তার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম । এক পা দুপা করে এগোতে এগোতে ক্রমশ আমাদের পা দ্রুত হতে লাগল । আমরা হাঁটছি তো হাঁটছিই । যেন বহুদূরে কোথাও পৌঁছে যাব সেই উদ্দেশ্যে হেঁটেই চলেছি । কোথাও আর বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে না খালি আকাশের কুৎসিত চাঁদ আলো চুমরে চুমরে ধ্বস্ত করতে লেগেছে আমাদের । আমাদের আপিস গেছে , বিল্ডং গেছে , মিছিল নেই , স্লোগান বহুদূর থেকে ভেসে চলে যায়। এই কালো ফাঁক যা বিল্ডিং এতদিন বুক দিয়ে আড়াল করে রেখেছিল তা যেন ক্রমশ চেপে ধরছে আমাদের । দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা । 
  
পুলিশ বলল,‘ দেখলেন। ’ 
আমি বললাম ,‘ বাংলা কথা বলি ? বিল্ডিংটা ভাঙলেন কেন ?’
পুলিশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল ।

1 টি মন্তব্য: