মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মিখাইল জোশচেনকো'র গল্প : নারী মৎস

(পাদ্রী ভ্যাসিলি'র গল্প)

ভাষান্তর : কাকলী অধিকারী

১ 

পাদ্রীদের পোষাক পরিচ্ছদ দেখতে বিশ্রী হলেও তাকে কিন্তু লজ্জাজনক মনে করা ঠিক নয়। কিন্তু রাস্তায় গেলে তুমি অস্বস্তি বোধ করবে। বুক চেপে আসছে মনে হবে।

গত তিন বছরে এই পাদ্রীরা অবশ্যই সত্যি সত্যি মর্যাদাহীন অবস্থায় আছে। যে কেউই বলতে পারে, গত তিন বছরে কেউ কেউ তাদের পাদ্রীগিরি ছেড়ে দিয়েছে এবং এমন কি জনসমুখে ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছে। একারণে তারা বিপথে চলেছে।

এই সব আক্রমণ এবং নিপীড়নেরর জন্যে পাদ্রী ত্ৰিওদিনকে সীমাহীন অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। শুধু সরকারি কর্তৃপক্ষের নয়, এমন কি তার স্ত্রীর নিপীড়ন পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছে। তবু তিনি তার পাদ্রী ব্রতও প্রত্যাখ্যান করেননি এবং ঈশ্বরকেও ত্যাগ করেন নি। পক্ষান্তরে, তিনি মনে মনে বেশ গর্বিত ছিলেন - নিপীড়ণ আছে বলেই তিনি ধর্মপ্রচারণায় আছেন। 

একজন পাদ্রীকে ভোরে উঠতে হয় এবং দৃঢ়ভাবে বলতে হয়, "প্রিয় পত্নী, আমি বিশ্বাসী।"
এবং তারপরে তিনি আর সব কাজ করেন।

একজন ব্যক্তিত্বহীন মানুষের মধ্যে এমন শক্তি থাকতে পারে--একথা কল্পনা করতে পারে কেউ? এটা হাস্যকর। যাই হোক, সংসারে পাদ্রীর কোন পাত্তা ছিল না। একেবারেই পাত্তা ছিল না। তার চুল লাল রঙের এবং দেখতে খাটো মানুষ। তার উচ্চতা তার স্ত্রীর কাঁধ সমান। 

এজন্য তার ব্যক্তিত্বহীন চেহারার জন্য  তার স্ত্রী একবারের বেশি তাকে বকাঝকা করে না। এবং তাতেই বেচারার কম্মো ফতে হয়ে যায়।  এখনকার পুরুষেরা কত ছোট --এটা ভাবতে অবাক লাগে। এ এলাকার সব মহিলারাই বেশ বড়সড়ো। কিন্তু পুরুষরা ঠিক সেরকম নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মহিলারা অনায়াসেই পুরুষদের সব কাজ করতে পারে এবং বলা যায়--পুরুষ লোকেরা আগের মতো নেই। মহিলাদের কাজগুলোই পুরুষরা নিয়ে নিচ্ছে।

অবশ্যই এমন পুরুষদের গুলি করা হবে। কিন্তু এটাও সত্যি যে অনেক পুরুষ রাষ্ট্রের প্রাণদণ্ড ভোগ করে মারা গেছে এবং যুদ্ধের জন্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এবং যদি কেউ বেঁচে থাকে তবে জীবন তাকে প্রায় অস্তিত্ত্বহীন করে রেখেছে। 

ওজন বাড়িয়ে মোটাসোটা হওয়ার মতো কোনো পুরুষ কি এখন রাশিয়ায় আছে? এমন কোন পুরুষ নেই। 

পাদ্রীর কপাল কিছুটা ভালোই বলতে হবে। তার স্ত্রীকে পাদ্রী যা বলে থাকে: " তুমি আমায় বকাঝকা করো বটে বউ, তোমার বকাঝকার মধ্যে দিয়ে আমি কিন্তু ডারউইনের মতবাদেরই সত্যতা দেখতে পাই। তিনি বলেছেন, জীবনে স্ত্রী মাছ সবসময় পুরুষ মাছের চেয়ে বড় হয় এবং রেগে গেলে তারা পুরুষ মাছকে খেয়ে ফেলে।"

এর উত্তরে স্ত্রী থালা ছুড়ে মারে। অথবা প্লেট। না হলেও কাপ ছোড়ে। আর তার স্ত্রীর অনুভূতিতে আঘাত লাগে। কেনো লাগে সেটা সে জানে না। 


২ 

গেল তিন বছর ধরে বছর পাদ্রী এবং তার স্ত্রী আলাদা থাকছে। 

এবং শুধুমাত্র যখন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলে, "এ নিপীড়নে জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে, স্বামী। দয়া করে তুমি তাই আমার ভালোবাসা গ্রহণ করো।" তখন স্বামীর সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। কিন্তু পাদ্রীর ক্ষেত্রে ঠিক এমন ঘটে নয়। তার স্ত্রী সেরকম নয়। সত্যি ঘটনা হলো-- তার  স্ত্রী তার দুঃসময়ে তার সঙ্গে ছিল না।  তখন দিনের পর দিন তার স্ত্রী সরে থেকেছে। সন্ধ্যার পরে কুঁড়ের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। এজন্যে মহিলার লজ্জিত হওয়া উচিত। 

আসলে পরিবারের ভিত্তি নড়বড়ে থাকলে একজন পাদ্রীর জীবনে আর কী সাত্বনা থাকে? 

গির্জার ছুটির দিনে খেলার মধ্যে পাদ্রী কিছু সান্ত্বনা পায়। তবে খেলার চেয়েও দেশ নিয়ে আলোচনা করাটা ছিল তার বেশি পছন্দের। এমন কি ইউরোপের বিভিন্ন বিষয় এবং খ্রিস্ট যুগের সম্ভাব্য সমাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা করতেও তার ভালো লাগে। 

এসব আলোচনার শব্দগুলি পাদ্রীের কানে ভীষণ মধুর মনে হয়।  মনে হয় তিনি সঠিক শব্দটি নির্বাচন করেছেন। আলোচনা প্রথমে শুরু হয় কিছু গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে। যেমন, রুটির মূল্য বেড়ে গেছে, কাজেই আমাদের জীবন আর ভালো মত চলছে না। আর যদি আমাদের জীবন সঠিক ভাবে না চলে থাকে, তবে এর কারণ কি? এসব নিয়ে অলোচনা শুরু করলেই পাদ্রী তার বিভিন্ন চিন্তাভাবনা বলতে শুরু করেন। বলেন--দেশের রাজনীতি, সোভিয়েত ক্ষমতা, জীবনের ভীত নড়ে যাওয়ার কথা। 

এবং যখন একটি শব্দ "সোভিয়েত" উচ্চারিত হয়, তখন তিনি আসল আলোচনা শুরু করেন। সোভিয়েত নিয়ে কথাবলার জন্য পাদ্রীর অনেক হিসাবনিকাশ আছে। আছে অনেক  আঘাত এবং আক্রমণের অনুভূতি। একদা এক সময়ে গভীর রাতে তার ঘরে এসে সোভিয়েতের লোকজন তার দাড়ি ধরে টেনে বের করে নিয়ে গিয়েছিল এবং একটুকরা কাঠ দিয়ে পিটানোর হুমকি দিয়েছিল। 

"আমাদের বলে ফেল," তারা বলেছিল, " ধ্বংস করার পরেও আর কোনো পবিত্র কোনো মূর্তি গির্জায় লুকানো আছে? জনগণের সঙ্গে যেসব ছলচাতুরী তোমরা গির্জার মধ্যে করে থাকো তা অবশ্যই তাদের নিজ চোখে  দেখা দরকার।’

এবং গির্জা যদি ব্যাগরিয়ানস্ক জেলার সবচেয়ে দরিদ্র প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে তাহলে আর কী ধরনের পবিত্র মূর্তির সেখানে থাকতে পারে? 

"তেমন কিছু নয়," পাদ্রী বলেছিলেন, "কোন ধরনের পবিত্র মূর্তি নয়। আর দয়া করে আমার দাঁড়ি সহ আমায় যেতে দিন।

কিন্তু তারা হুমকি দিতে থাকল এবং একটুকরা শক্ত কাঠ দিয়ে ভয় দেখতে থাকল।

এবং তারা পাদ্রীকে বিশ্বাস করল না। 

"ঠিক আছে আমাদের নিয়ে চল", তারা বলল, "গির্জায় কি আছে দেখাও আমাদের"।

পাদ্রী তাদেরকে পথ দেখিয়ে গির্জায় নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন।

কিন্তু ইতিমধ্যে অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছিল। এবং কোনো এক আশ্চর্যজনকভাবে ঘটনাটি শেষ হলো।

পাদ্রী পথ দেখিয়ে দেখিয়ে শহরের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানে কোনো গির্জা ছিল না। হয়তোবা তার মন ভয়কে জয় করেছিল। সেজন্য হয়তোবা পাদ্রী ভুল পথে তাদের নিয়ে গেলেন। কিন্তু হঠাৎ অস্বাভাবিক এক আনন্দের অনুভূতি তার শিরায় বয়ে গেল।

"একটা বিষয়" পাদ্রী ভাবল,"অনেকটা ঠিক সুসানিনের মত"। 

এবং সস্তা বাজার পেরিয়ে শহরের প্রান্তে সে সবাইকে নিয়ে গেল। তারা ভয়ানক রেগে গেল। আবার তার দাড়ি ধরে টানাটানি করল। এবং নিজেরা তাদের পথ খুঁজে বের করল।

রাতের বেলায় তারা গির্জার সম্পত্তি ধ্বংস করে দিল। সিগারেট পোড়া গন্ধে বাতাস ভরিয়ে দিল। চারিদিকে তাদের পায়ের ছাপ পড়ল। কিন্তু গির্জার মধ্যে কোনো পবিত্র মূর্তি তারা খুঁজে পেল না। 

‘বেশ।’’ তারা বলল, ‘তুমি একজন কসাক পাদ্রী। কোনো পবিত্র মূর্তি নেই। সুতরাং এর মানে কী তুমি জানো? তোমার গির্জায় আমরা একটা নাট্যশালা বানানো।’’ 

এটা বলে তারা চলে গেল। 

"একটা নাট্যশালা-- এটা কীভাবে হতে পারে?" পাদ্রী তার স্ত্রীকে বললো।"তুমি কি গির্জার স্থানে একটি নাট্যশালা তৈরী করতে পারো? বউ, এটা শুধু আমাকে ভয় দেখানোর জন্য তারা বলেছে। পাদ্রীদের ধর্ম বিশ্বাস ভীষণভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে। তবু পাদ্রী গোষ্ঠী নাট্যশালা গড়তে দেবে না। পাদ্রী গোষ্ঠী এটা কিছুতেই হতে দেবে না।"

এখানে তার স্ত্রীর উচিত আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো। , কিন্তু না -- স্ত্রী তখন তার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। শুধু কোন কাজগুলো তার স্ত্রী করতে করে থাকে --বলো আমাকে? এখানে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে স্ত্রী তার পোশাক পরল এবং তাকে ত্যাগ করে চলে গেল। একটি পরিবারের জন্য মহৎ কিছুই রইল না। 

কিন্তু এ ধরনের ব্যবহার শুধু পাদ্রীর ঘরেই নয়। সব বাড়িতেই মহিলারা একই রকম ব্যবহার করছে। সবাই বলে, রাশিয়ান মহিলাদের কী হয়েছে?



আর তাহলে , কী হয়েছে রাশিয়ান মহিলাদের? রাশিয়ান মহিলারা অনায়াসে পুরুষদের কাজ করছে।

-- এর মধ্যে হাসির কিছু নেই। অথবা ঘটনা এমন যে, এখন আমাদের বলতে হবে, মেয়েরা তাদের বেনী কেটে ফেলেছে।

চাইনিজদের এমন একটা সংকটকাল সময় ছিল। চাইনিজরা জনসম্মুখে চুলের বেনী কাটা শুরু করেছিল।এবং তাতে কি? এর অর্থ বেনী ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাশনের বাইরে চলে গেছে। এতে কৌতুকের কিছু নেই। 

কিন্তু সেটাই মূল বিষয় নয়। উৎকট লজ্জাহীনতা এবং লাম্পট্য আমাদের মহিলাদের গ্রাস করে নিয়েছে। এবং পাদ্রীকে পুনঃ পুনঃ তার আনুষ্ঠানিক বেশে জনসম্মুখে তিক্ত বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা নিয়ে উপস্থিত হতে হচ্ছে : 

"নাগরিকবৃন্দ, পাদ্রীবৃন্দ এবং প্রিয় জনগণ। পরিবার এবং বিবাহের ভীত কেঁপে উঠেছে। পরিবারের অভ্যন্তরে আগুন জ্বলে উঠেছে। শয়তানী লজ্জাহীনতা এবং অবিশ্বাস থেকে তোমরা চেতনায় ফিরে এসো''। 

এবং পাদ্রী এজন্য সুন্দর সুন্দর শব্দ বেছে নিতে থাকেন। সেগুলো সবার হৃদয় স্পর্শ করে। চোখে জল আনে। কিন্তু লাম্পট্য এতে চলে যায়নি। 

এবং এ বছরের মত এমন লজ্জাহীনতা এবং ঠুনকো সম্পর্ক কখনোই আগে মানুষের মধ্য ছিল না। 

বসন্তকালে অবশ্য লাম্পট্যের মাত্রা সবসময়ই বেড়ে যায়। কিন্তু যদি মিলিটারিদের ক্লাবে যাও, তবে শুনতে পাবে, সম্মানিত মহিলাদের ঘিরে কীসব অসহনীয় কথাবার্তা হয়! এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। 

কিন্তু তুমি কী করতে পারো? যদি পাদ্রীর স্ত্রী ঘরে না থাকে, সেটা দেখে পাদ্রী তখন ভালোমন্দ কিছু না বলেন, তাহলে সেখানে কি কিছু হতে পারে? 

পাদ্রী এটা খুব ভালো করেই বোঝেন। তবু তিনি তার ধর্মের তেতো উপদেশের মধ্যে আটকে আছেন। 

এবং এটা ছিল এমনই একটি লাম্পট্য পূর্ণ বসন্ত। একজন রেলশ্রমিক তাদের সঙ্গে থাকত। সে বছরগুলোতে স্ত্রীলোকটির অধঃপতন অতোটা হয়নি। 

ধর্মপ্রচারে পাদ্রী অটল এবং ধৈর্য্যশীল ছিলেন। কিন্তু এই হুজুগে গত দশ বছরের চেয়ে কম সময়  তিনি হারাননি। রেলশ্রমিক সত্যি সত্যি ছিল খুব সুদর্শন আর বলিষ্ঠ।

দেখতে সুন্দর ছাড়াও রেলশ্রমিকটি ব্যতিক্রমী শান্ত। আর নানা বিষয়ে কথা বলতে পারঙ্গম। অনেক বিষয় নিয়ে কথা বললেও তার পছন্দ ছিল সূক্ষ সূক্ষ বিষয়। যেমন, একজন পাদ্রীর কাছে যাওয়ার পরেও কেনো আর কিভাবে মানুষ কীভাবে পথে পাশ কাটানোর সময়ে তার দিকে বুড়ো আঙুল দিয়ে কাঁচ কলা দেখা। এটা এখন একটা প্রথার মতো হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পরে এবং সূক্ষ বিষয়ে আগ্রহ দেখানোর পরে রেলশ্রমিক লোকটি অনিবার্যভাবে নারীদের প্রসঙ্গে চলে আসে। নারীদের সে উচ্চশ্রেণীর মনে করে। আর সে আলাপ করে প্রেম নিয়ে। 

এবং যদি কখনো রেলশ্রমিক বিভিন্ন ইউরোপিয়ান প্রসঙ্গে আলোচনা করে , তবে পাদ্রী কখনো তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। এই শ্রমিককে বাস্তবিকই তার  ভীষণ ভয়ঙ্কর মনে হয়।

‘'একটা সীমার মধ্যে তর্ক করে,’’ পাদ্রী বলে "ইউরোপিয়দের বাদই দিলাম ন হয়, কেনই বা পাদ্রীদের উপরে এমন নিপীড়ন চলছে? উদাহরণ হিসেবে ধরো, কেনো রেলশ্রমিককে সরানো হচ্ছে আমাদের ঘরবাড়িতে? তুমি জানো-- আমাদের সস্তা ঘরগুলো তেমন বড় নয়। খুব বেশি হলে এর মধ্যে একটি ক্যারামবোর্ড  ঢুকতে পারে। কোনো একজনের জন্য উপযোগী নয়। 

এবং লোকজন পাদ্রীর কথায় তাদের মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। বলল, , ঠিক কথা, এটা আপনার পদের লোকজনের জন্য কঠিন। পাদ্রীদের জন্য অনেক বাধ্যবাধকতা আছে। 

কিন্তু পাদ্রীর স্ত্রী বাজে ভাবে মাথা নাড়ে। 



যা ঠিক ঘটেছিল; পাদ্রী রেল শ্রমিকের সাথে কেরাম খেলেছিল। 

সে সময় পাদ্রীর সহকর্মী ও বন্ধু ভেনিয়ামিন নামের যাজক এবং   চার বছর মেয়াদী বালকদের স্কুলের শিক্ষক ইভান মিখাইলোভিচ গুলকা পাদ্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।

যথারীতি গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো এবং তারপরে অবশ্যই পাদ্রীর নিপীড়ন নিয়ে কথা উঠল। কিন্তু যাজক বেনিয়ামিন ছিলেন একজন হিংসুটে যাজক। তিনি এই অস্পষ্ট রাজনীতি নিয়ে খুব কমই আগ্রহ দেখালেন।

পাদ্রী খ্রিস্টীয় যুগ সম্পর্কে কথা বলছিলেন এবং যাজক বেনিয়ামিন তার তাসের প্রশংসা করছিল- - তাসের এক রানীকে আরেক রানীর পাশে রাখলেন ... খুব তাড়াতাড়িই আলোচনায় একটু ছেদ পড়ল। তখনি সে বলছিল, "ঠিক আছে, আর কোনো মূল্যবান সময় নষ্ট না করে..."

তারা তাদের আলোচনা বন্ধ রেখে টেবিলে বসলেন এবং তাস ভাগ করলেন। এবং সেই মুহূর্তে পাদ্রী ঘোষণা করলেন, "আটটি তাস রয়েছে। কে ডাক দেবে?"

এবং সে সময়ে পাদ্রীর হতে কোনো ভালো তাস ছিল না। যাজক বেনিয়ামিন ইস্কাবন তাস দিয়ে ট্রাম্প করলেন। শিক্ষক গুলকা চিড়াতন তাস ফেললেন। কিন্তু এটা কোনো কাজে এলো না। 

এই বিষয়ে পাদ্রী খুব উত্তেজিত হলে পড়লেন। বিকেলের চা খাওয়ার নাম করে পানি খেতে বাইরে চলে গেলেন। 

আকণ্ঠ জলপান করে ফেরার পথে তিনি তার স্ত্রীর দোর গোড়ায় গেলেন। 

"বউ," পাদ্রী বললেন,"মন খারাপ করো না। বিকেলের চায়ের কি হল?"

কিন্তু তার স্ত্রী ঘরে ছিল না। পাদ্রী রান্না ঘরে গেলেন --স্ত্রী নেই। এখানে সেখানে সবখানে খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও তার স্ত্রী কোথাও ছিলেন না।

এবং পাদ্রী তখন রেলশ্রমিকের ঘরে গেলেন। সেখানে স্ত্রীকে রেলশ্রমিকের সঙ্গে অশালীন অবস্থায় দেখতে পেলেন। 

"ওহ" বলে পাদ্রী সন্তর্পনে দরজা বন্ধ করলেন এবং পায়ের আঙ্গুল টিপে টিপে হেঁটে অতিথিদের কাছে ফিরে  এলেন খেলা শেষ করার জন্যে। যেন কিছুই ঘটেনি -- এমন ভাব করে তিনি এসে বসে পড়লেন। 
পাদ্রী খেলতে শুরু করলেন - -শুধু তার চেহারা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। তিনি তার তাসের দান দিলেন। মাথা নাড়ালেন। টেবিলে আঙ্গুল গিয়ে টোকা দিতে দিতে বললেন, "নারী মাছ আমাদের গিলছে"।

'কী ধরণের নারী মাছ, বলো আমাদের'? 

হঠাৎ পাদ্রীর ভাগ্য ফিরে গেল। শিক্ষক গুলকা তার ইস্কাবনের টেক্কা ছুড়ে দিলেন। আর পাদ্রী সেটা ট্রাম্প করলেন। শিক্ষক গুলকা জয়ী হবার চেষ্টায় একইভাবে রুইতনের  টেক্কা ছুড়ে দিলেন এবং পাদ্রী আবার ট্রাম করলেন। মূল্যবান তাসগুলো একের পর এক পাদ্রীর কাছে চলে এলো। 

এবং পাদ্রী খুব ভালোভাবে সে সন্ধ্যায় জয়ী হলেন। পাদ্রী নতুন টাকার নোটগুলো ভাঁজ করলেন। তারপর খুব আরাম করে হাসলেন। 

"হ্যাঁ, সব ঠিক আছে," তিনি বললেন, "কিন্তু কেন এ নিপীড়ন ? কেন রেলশ্রমিকদের সরিয়ে আনা হচ্ছে আমাদের ঘরে? ’

পাদ্রী বেঞ্জামিন এবং শিক্ষক গুলকা তার এ কথায় অপমানজনক মনে করলেন। 

"সে জয়ী হয়েছে," তারা বললেন, " পাদ্রী আমাদের টাকা ছিনিয়ে নিলেও অসুখী হওয়ার ভান করেছে।  অসুখী হবার অভিনয় করছে। এমনকি আজ আমাদের চা পর্যন্ত খাওয়ায়নি আলখাল্লাধারী পাদ্রী।’

দুঃখিত মনে অতিথিরা চলে গেলেন। পাদ্রী তাস রেখে দিয়ে শোবার ঘরে গেলেন। এবং স্ত্রীর জন্যে অপেক্ষা না করে বিছানায় শান্তভাবে শুয়ে পড়লেন। 


৫ 

পৃথিবীতে অনেক বড় দুঃখ রয়েছে। দুঃখগুলো জমা হচ্ছে হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে গেড়ে বসেছে । তুমি এটাকে সরাসরি দেখতে পারছ না।

পাদ্রীর দুঃখটি বড় হাস্যকর বলা যায়। পাদ্রীর স্ত্রী রেল শ্রমিককে কিছু টাকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল--এটাও হাস্যকর। কিন্তু তার স্ত্রী   টাকা  পেল না। । এবং রেলশ্রমিক পাদ্রীর স্ত্রীকে - "একজন প্রকৃত বৃদ্ধা মহিলা" বলেছে --সেটা আরো হাস্যকর। এগুলো এক সঙ্গে জুড়ে নিয়ে ভাবলে তুমি অবশ্যই অনেক দুঃখ পাবে। 

পাদ্রী ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলেন এবং বুকের উপরে তার ক্রুশ স্পর্শ করলেন। 

"বউ, আমি বিশ্বাস করি"-- উচ্চারণ করলেন। 

"বউ" শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে আগের দিনের বিকেলের কথা মনে পড়ল। 

ওহ, সেই নারী মৎস! তার স্ত্রী তাকে গিলে খাচ্ছে। সে যে-পাপ করেছে এটা যতো না খারাপ ব্যাপার তার চেয়েও   খারাপ ব্যাপার সব ঘটছে পাদ্রীর ক্ষেত্রে। সব কিছুই এখন পাদ্রীর বিপক্ষে যাচ্ছে। এখান থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় তার নেই। 

পাদ্রী পোশাক পরলেন। স্ত্রীর দিকে তাকালেন না। এবং চা না খেয়েই করেই বাইরে চলে গেলেন। 

ওহ এবং ঘন্টাটা কী করুণ সুরে কাঁদছে। আর মানুষের জীবন কী বিষাদময় ! এখন জড় বস্তুর মত মাটিতে শুয়ে পড়বেন পাদ্রী। অথবা মানবতাকে বাঁচাতে বীরের মত ফাঁসিতে ঝুলবেন। 

পাদ্রী উঠে দাঁড়ালেন এবং বড় বড় পা ফেলে গির্জার বাইরে গেলেন। 

স্তোত্রপাঠ শেষে তার অভ্যেসবশত নৈতিক বক্তৃতা প্রদান শুরু করলেন, "নাগরিকবৃন্দ" তিনি বললেন, "পাদ্রীগণ, এবং আমার প্রিয় পাদ্রী পল্লীবাসী। পরিবারের ভীত নড়ে গেছে এবং ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির অন্দরমহলে আগুন লেগেছে। এ আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এর দিকে তাকিয়ে আমি এর সঙ্গে কোনভাবে সমঝোতা করতে পারিনা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দিতে পারি না।"

সে বিকেলে কয়েকজন গুন্ডা পাদ্রীর কাছে এলো, তার গির্জার সম্পদ ধ্বংস করল। তারপর পাদ্রীকে তুলে নিয়ে চলে গেল। 


-------------------------------
প্রথম প্রকাশকাল ১৯২৩ .
লেখক পরিচিতি
মিখাইল জোশ্চেনকো
রুশ লেখক ও রসসাহিত্যিক। সেন্ট পিটার্সবার্গে  জন্ম ১৮৯৪ সালে। লেনিনগ্রাদে  মৃত্যু ১৯৫৮ সালে। রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়ে আহতও হয়েছে। ১৯২০ সালে তিনি রসসাহিত্যিক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পান। কিন্তু বেশ দারিদ্রতার মধ্যেই তাকে চলতে হতো। মৃত্যুর আগে তিনি পেনশন পান। তার রস গল্পের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি গল্পে কমিক আখ্যানে কোনো ভাবাবেগ যোগ করতেন না।



অনুবাদক পরিচিতি
কাকলী অধিকারী

বরিশালে পৈত্রিক বাড়ি। ঢাকায় জন্ম। সুইডেনপ্রবাসী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
PhD in Comparative Culture and Information Studies at Nara Women's University

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন