মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

ক্রিস্টিনা রিভিয়েরা গার্জা'র গল্প : সাধারণ সুখ । নির্ভেজাল সুখ।


অনুবাদঃ দেব বন্দ্যোপাধ্যায় 

অদ্ভুত ব্যাপার । কোথাও কিচ্ছু নেই, মেয়েটার হঠাৎ সব মনে পড়বে । একদৃষ্টিতে নিজের তর্জনীতে জড়িয়ে থাকা পান্নার আংটিটার দিকে দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়বে । তারপর সেই অন্য আংটিটা চোখের সামনে ভাসবে । কিছুক্ষন চুপ থেকে নিজের অজান্তে বলে উঠবে ‘সত্যি, কি অসম্ভব সুন্দর!’ আংটিতে নিখুঁত খোদাই করা সাপের ফনা, ঢেউ খেলানো শরীরের সূক্ষ্য কারুকার্যে আঙ্গুল বোলাবে । হালকা আদরের ছোঁয়া । তার নিচে নিথর হয়ে থাকবে হাত। স্বচ্ছ শ্বেত পাথরের মতো । মখমলি কোনো দীপান্তরে ।

ট্যাক্সির পেছনের সীটের এক কোনে ভ্যানিটি ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে বসে ছিল মেয়েটা । সেই কাকভোরে শহরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ছোটা । বুকের মধ্যে অনিদ্রা আর অনিশ্চয়তা মেশানো একটা অস্বস্তি । এয়ারপোর্টে পৌঁছালেই অপেক্ষা করছে আরো অনেক লম্বা একটা পথ । এই অনুভুতিটাই যেন অস্বস্তিটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে । এটা প্রতিবার হয় । মনে নেই ঠিক কবে শুরু হয়েছে । কোথাও যাবার আগে ঘুমের মধ্যে নানান দুঃস্বপ্ন নামে । প্লেনের সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতে মনে হয়, ভয়ঙ্কর সব দুঃসংবাদগুলো যেন অপেক্ষা করে আছে; কেউ এখনো বলেনি । কারো একটা অন্তিম দশা , প্রিয় কোনো মানুষের মৃত্যু সংবাদ অথবা হয়তো অন্তহীন নিঃস্বঙ্গতা । 

এসব ভাবতে ভাবতে বিড়বিড় করে প্রতিজ্ঞা করে ফেললো সে ‘এই বারই শেষ, আর না’ 

নিজের কথায় নিজেরই মাথা নাড়তে কেমন অবাক লাগছিলো । 

ট্যাক্সি ড্রাইভারটা বলে উঠলো ‘কিছু বলছিলেন ?’ 

আয়নাটায় চোখে চোখ পড়তে একটু সামলে মেয়েটা বলল ‘না না.. কিছু না , ভাবছিলাম এই যাওয়াই শেষ বার’ । 

কোনো উত্তর ফিরে আসার আগেই জোরে একটা ব্রেক । গাড়ির গতি কমে এলো । সামনে বোধহয় খুব লম্বা জ্যাম । 

ড্রাইভার যেন নিজেকেই বলল ‘এক্সিডেন্ট মনে হচ্ছে’ । 

আস্তে আস্তে জায়গাটায় পৌছিয়ে কিছুই চোখে পড়লো না তেমন । কোনো দুমড়ানো মোচড়ানো গাড়ি তো নেই, ছড়ানো ছেটানো গাড়ির কোনও অংশও দেখা গেলো না । উৎসুক চোখে দুজনেরই জানলায় মুখ । ফ্যাকাসে আকাশ, অন্য গাড়িতে আধঘুমন্ত যাত্রী, হাইওয়ের পাশের নিখুঁত ভাবে কাটা ঘাস। এই সব দেখতে দেখতে চোখ বুজে আসছিলো । 

জটটা একটু হালকা হয়ে এলে হঠাৎ ড্রাইভারের চীৎকার ‘আরে, একটা বডি না ? জামা কাপড়ও নেই যে’ । 

মেয়েটার স্থির গলায় সম্মতি ‘মাথাটাও নেই দেখছি, চট করে কি একবার থামা যায় ?’ 

গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশগুলোকে ইডেন্টিটি কার্ড দেখালো । হলুদ ফিতের ঘেরাটোপ পেরিয়ে মুণ্ডুহীন নিথর শরীরটার চারপাশে বারকয়েক ঘুরল । তারপর কি একটা দেখে থেমে গেলো । মাটিতে জমাট বাঁধা রক্ত । ঠিক পাশে বাম হাতের তর্জনীতে পান্নার একটা আংটি । কেমন যেন বেমানান ভাবে পরিষ্কার । অক্ষত । দুটো জড়িয়ে থাকা সবুজ রঙের সাপ । খুব সূক্ষ্য কাজ । মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেলো । কিন্তু পৌছানো গেলো না । মনে হল অনেক দূর । অন্য কোনো পৃথিবীতে । অথবা মানচিত্রে আঁকা কোনো দ্বীপ । ছুঁয়েও ছোঁয়া যায় না । শুন্যে পাথর হয়ে যাওয়া নিজের হাতটা অনুভব করছিলো সে । 

‘এই যে শুনছেন, আর কতক্ষন? এবার যে দেরি হয়ে যাবে’ ট্যাক্সির ইঞ্জিন টা গর্জে উঠলো ।


মাথার ভেতর একটা শহর

শহরে ফিরে আসার পর অনেককেই জিজ্ঞেস করেছে মেয়েটা । কেউ কিচ্ছু জানে না । পুলিশের কাছেও কোনও খবর নেই । 

অফিসে কদিনের ছোকরা; সেও সন্দেহের চোখে ‘আর ইউ সিওর?’ আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার বললো-- 

‘আমাদের চোখে তো পড়লো না কিছু?’ 

‘খবর কাগজেও বেরোয় নি, না ?’ মেয়েটা বললো । 

‘ও, খবরের কাগজেও নেই?’ ছেলেটা মাথা নাড়তে নাড়তে চোখ সরিয়ে নিলো । আর সহ্য হচ্ছিলো না । কাউকে কিছু না বলে অফিসে থেকে বেরিয়ে গেলো । 

কেবল ট্যাক্সি ড্রাইভারটারই সব কিছু মনে ছিল । পকেটের কাপড় উল্টে খুচরো উজাড় করার মতো যা কিছু মনে ছিল সব খালি করে দিলো গড়গড় করে । তার মনে ছিল এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে দেহটা পরে ছিল হাইওয়ের দ্বিতীয় লেনে । তিন চার জন পুলিশ সেটা ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল । জামা কাপড় ছিল না, অ্যাবস্ট্রাক্ট আঁকার মতো গায়ের নানান জায়গায় ছড়ানো ছিটানো ক্ষত । তার মনে ছিল চাপ চাপ রক্ত । অস্বাভাবিকভাবে মোচড়ান হাত পা। বিকৃত । নিচু হয়ে দেহটা পর্যবেক্ষণ করে উঠতে গিয়ে মেয়েটার হাঁটু ফোটার শব্দও সে নাকি পেয়েছিলো । 

আংটিটা মহিলার হাতে বেশ লাগছিল । অথচ যেন তার সেটার প্রতি বিশেষ কোনও টান নেই । 

‘আমার এই ধরণের আংটি খুব পছন্দ’ আগত্যা মেয়েটাই প্রথম কথাটা পারল । 

মহিলা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে নিজের হাত টা তুলে চোখ বরাবর এনে দেখলো আংটিটা । যেন প্রথম বার দেখছে । 

‘তোমার সত্যি এটা পছন্দ ?’ 

‘হ্যাঁ, পারলে কোনোদিন এরকম একটা আংটি পরবো’ মেয়েটা বলে উঠলো নির্দিধায় । 

মহিলা মুখ ঘুরিয়ে আলো ঝলমলে সুইমিং পুলের জলে চোখ ডুবিয়ে এক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে গেলো । 

তারপর একটা অপরিষ্কার কষ্ট মাখানো গলায় ‘এটা সুদূর প্রাচ্যদেশের, ‘প্রাচ্যদেশ’ জানো ? প্রাচ্যের এক দ্বীপপুঞ্জে এর জন্ম’ । 

কথাগুলো একটু কাব্যিক শোনাচ্ছিল । বলতে বলতে এই সুইমিং পুলের ধার, এই পার্টি, জমায়েত মানুষের মোলায়েম এই গুঞ্জন থেকে সে অনেক দূরে কোথাও চলে গেছে যেন। 

‘গিফট ছিল এটা’ আবার হাতটা শূন্যে তুলে আংটিটা দেখে ‘একটা খুব সেন্টিমেন্টাল ডেট’। 

তার নিখুঁত পরিপাটি নখ গুলো তখন তারাভরা আকাশের দিকে। সেগুলোর মাঝে উজ্জ্বল পান্নার আংটিতে চোখ আটকে মেয়েটার গলায় একটু দুষ্টু সুর ‘ও,লাভার’স গিফট তাহলে’। 

মহিলা ঠোঁটে নরম একটা হাসি ‘বলতে পারো’ । 

তারপর একটু থেমে হাসিটা নিভিয়ে আবার বললো ‘সেরকমই কিছু একটা’। 

আবার সেই পুরনো প্রশ্ন গুলো মেয়েটার মাথায় ঘুরছে । যারই সাথে নতুন আলাপ হয়, এমনটা হয় । গোয়েন্দাগিরির এই মুশকিল । অকুপেশনাল হ্যাজার্ড বলা যায় । ‘এই মানুষটা কি কাউকে খুন করতে পারে ? এ খুনি না আসলে নিজেই একজন ভিক্টিম?’ 

সুইমিং পুলের ধার থেকে চোখ ফেরাতে ফেরাতে মনে হলো মহিলাকে দূরের কোনো একটা অবসন্ন মুহূর্তকে পেছনে ফেলে আসতে হচ্ছে । অবসন্ন হলেও প্রাণবন্ত, গাঢ় । মেয়েটা ঠিক বুঝতে পারছে না। এই মহিলা কি পারবে একজন কে ঠান্ডা মাথায় খুন করে তারপর গলা কেটে হাইওয়েতে ফেলে দিতে? মহিলা কি প্রাচ্যের কোনো চক্রের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছে? ওর মুখে এই উদাসীন ভাবটা আসলে মুখোশ না মুখোশ খোলা মুখ? আসলে এখানে এসেই সব কিছু থেমে যাচ্ছে। মহিলাকে দেখে, কথা বলে তার সম্বন্ধে কোনো একটা পরিষ্কার ধারণা করা যাচ্ছে না । পুরোটাই অন্ধকার । 

‘একটা আংটি আসলে কি?’ হাতটা স্টিয়ারিং হুইল রেখে মেয়েটার প্রশ্ন । 

তার সহকারী গোয়েন্দা ছেলেটা কিছু বলার আগেই আবার প্রশ্ন ‘আসলে কি একটা হাতকড়া? কোনো দলে যুক্ত থাকার চিহ্ন?’ 

‘আরে, কোনো প্রতিশ্রুতি বা প্রমিস-টমিস ও হতে পারে তো?’ বলে উঠলো ছেলেটা ‘রোমান্টিক একটা গিফটের মধ্যে ওতো ষড়যন্ত্র নাও তো থাকতে পারে?’ 

মেয়েটা মুখে একটা বিরক্তি পোষার আওয়াজ করে বললো ‘এই একটা সিগারেট দে তো?’ 

‘সে কি? তুমি তো খাওনা’ ছেলেটা কিছুটা অবাক। 

‘আরে না রে বাবা.. আঙুলের ফাঁকে ধরবো’ । 

‘নাও, আর ইউ সিওর .. এটা সেই আংটিটাই? একই ডিজাইন?’ 

‘ডিজাইন, ইয়েস। অদ্ভুত কোনো কোইন্সিডেন্স হতে পারে ঠিকই .. যাক বাদ দে.. আমাদের আরো অনেক কাজ আছে। বেনামি লোকের খুনের কিনারা করে ফেললেও কেউ একটা টাকাও দেবে না..’ 

দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে পরপস্পরের চোখের কোনে কি একটা খুঁজতে গিয়ে হো হো করে হাসি । সদ্য বৃষ্টি হয়ে গেছে। ট্রাফিক লাইটের লাল আলোয় রাস্তাটা ধুয়ে যাচ্ছে। জানলার কাচ নামিয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ওদের মধ্যে কেউ একটা বলে উঠলো , 

‘কোথায় শুরু করি বলতো?’


মাথার ভেতর চলচ্চিত্র।  

আবার দেখা হয়ে গেলো ওদের । এবার হোলসেল ক্লাবে । প্রতিদিনের ব্যবহারের জিনিস, শাক সবজি, হাতে লেখা দামের ট্যাগ, এই সব। মেয়েটা কফির ফিল্টার খুঁজছিলো । হটাৎ চোখে পড়লো পান্নার আংটি পরা সেই মহিলা, খুব যত্ন করে ওয়াইন বোতলের লেবেল গুলোতে কিছু অনুসন্ধান করছে। মেয়েটা একটু দূর থেকে খেয়াল করছিলো তার সরু কাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা লম্বা চুল, হাই হিলের জুতো। খুব সুন্দরী না হলেও সহজে চোখও ফেরান যায়, তাও নয় । 

‘ এটা একটা কাকতালীয় ব্যাপার হল তো?’ মেয়েটা একটু কাছে এসে বলল । 

মনে হলো মহিলা তেমন অবাক হয়নি ‘এখানে প্রায়ই আসো নাকি?’ আলতো আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে । সেই মৃদু হাসি। 

‘একেবারেই না’ মেয়েটা বলে চলল ‘ যদি না জানি যে আট নম্বর আইলে বেলা তিনটের সময় পান্নার আংটি পরা কারোর সাথে দেখা হয়ে যাবে’ । 

‘তুমি এখনো এটা চাও?’ আবার হাতটা শূন্যে তুলে নিখুঁত নখগুলোর নিচে আংটি টা দেখলো । 

‘আপনি বিক্রি করবেন?’ 

শুনে মহিলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো । তারপর মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে বললো ‘এসো আমার সাথে এসো ’। 

ওরা একটা গাড়িতে চেপে ইঞ্জিন স্টার্ট করলো । মহিলা কাকে একটা ফোন করে এক অচেনা ভাষায় একটু চাপা গলায় কিসব বলতে থাকলো। সরু রাস্তার দুপাশে খাবারের দোকান, ফুটপাথে হরেক জিনিসের বিক্রি, ভাজা চর্বির গন্ধ। সেই গন্ধ আস্তে আস্তে তীব্র আর আরও জটিল হচ্ছে । হাজারো মানুষের পোড়া গন্ধ হয়তো । শেষে গাড়ি থামলে জায়গাটায় নেমে মেয়েটার মনে হলো যেন সে নিজের অজান্তে অল্প সময়ে বেশ কিছু দেশ, বেশ কিছু সময়রেখা পার করে এসেছে । 

ফোনে কথা শেষ করে মহিলা বলে উঠলো 'আমি তোমার কাছে একটা ফেভার চাইবো কিন্তু। আমার জন্য তুমি একটা কেস ইনভেস্টিগেট করতে পারবে? ' 

গাড়ি থেকে বেরোতেই কালো রোদচশমার নিচে তার চোখগুলো একেবারেই দেখা যাচ্ছিলো না । তবে ঠোঁটের হালকা একটা কাঁপুনি ছিল নিশ্চিত ‘তুমি তো ডিটেক্টিভ? এটাই তো তোমার কাজ, তাই না ?’ 

মেয়েটা সম্মতির ঘাড় নাড়তেই, আবার কাঁধে হাত ‘এসো’ । 

আবার সরু গলি, চাঁদোয়া টাঙানো দোকানপাট, প্রচুর মানুষের চলাফেরা। সেসব পাশ কাটিয়ে ওরা পৌছালো কোথাও একটা । মহিলা একটা লাল কাঠের দরজা খুললো । ভেতরে দুটো চামড়ার নরম সোফাতে বসতে বসতে মনে হলো অনেক পথ পেরিয়ে অবশেষে একটা নিরিবিলি কোথাও পৌঁছানো গেছে । একটা রোগা বেঁটে লোক ওদের জল দিলো । পেছনে হালকা একটা মিউসিক চলছে । কি হতে চলেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । একটু আঁচ করতে মেয়েটা একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো 

‘আমাদের দেখা হওয়াটা তাহলে খুব কাকতালীয় কিছু ছিল না। তাই না?’ 

মহিলা একটু বিরক্তির সুরে উত্তর দিলো ‘ আমার রিকুয়েস্টটা কি খুবই অস্বাভাবিক ?’

‘আপনি আমাকে ওই হাইওয়ের বডিটার ব্যাপারে কিছু বলবেন ? আর ওই অন্য আংটিটার ব্যাপারেও?’ 

জলের গ্লাসটায় চুমুক দেবার অছিলায় গ্লাসে মুখ ঢেকে মেয়েটা চারপাশে চোখ বোলালো। ঘরটার জানলাগুলো ভারী ভারী ভেলভেটের পর্দা টাঙ্গানো । নরম কাঠের মেঝেটার কোনে মাকড়সার জাল । সেখানেই যেন সব কিছু শেষ হয়েছে । আর সব কিছুর শেষে আসলে হয়তো কিছুই নেই । 

‘তুমি কি বরাবর এতটাই ব্ল্যান্ট?’ মহিলার গলায় আবার বিরক্তি। চোখ বোজা । 

‘তাই হবে হয়তো। এটাই আমার কাজ, তাই না?’ 

জলের গ্লাসে আর একবার চুমুক দিয়ে ‘ দ্যাটস হাউ আই মেক মাই লিভিং’

‘আমি তোমার যা ফী, তার থেকে তিনগুন বেশি টাকা দিতে পারি’ মহিলা বলল । 

‘মেক ইট ফোর’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটা উত্তর দিলো । ওদের কথা শুরু হলো । 

তার কাছে টাকাপয়সা খুব কাজের জিনিস .. টাকাপয়সা আর খবর । যেন বিনিময় করা যায় এমন দুটো মুদ্রা । সব বিনিময়ের শেষে আয়নায় নিজেকে দেখে তার হাঁসি পায় । ‘এটা কি সত্যি দরকার ছিল তার ?’ জল । বিন্দু বিন্দু জল ওর মুখে । কিছুক্ষন পরে নিজেকে সে বলবে ‘না । সেভাবে ভাবলে তার সত্যি কোনও দরকার ছিল না’ । অথবা দরকার হয়তো ছিল । কিন্তু তার দাম মেটাতে গিয়ে যাকে নিঃস্ব হতে হয়েছে, সেটা আসলে সে নিজেই । তারপর সে আবার হাত টা শূন্যে তুলে আংটিটা দেখবে, যেন এই প্রথমবার দেখছে। একটা হাতকড়া, একটা ফাঁদ, একটা মাথাহীন মৃতদেহের জীবনের সাথে তার শেষ যোগসূত্র । একটা চিহ্ন । প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ । বিছানায় শরীর ঢাকতে ঢাকতে তার মনে হবে চাদরটা রেশমের হলে হয়তো কিছুটা আরাম হোতো । 

মহিলা মেয়েটাকে বলে ‘ ওটা আসলে একটা প্রতিশ্রুতির চিহ্ন, এ প্রমিস। প্রতিশ্রুতি বিনময়ের চিহ্ন । একটা চুক্তি’ । 

মেয়েটা থামিয়ে বললো ‘ রক্ত চুক্তি? মানে ব্লাড প্যাক্ট ?’ বিদ্রূপটা চেনা যাচ্ছিলো । 

মহিলা চোখে চোখ রেখেই বললো ‘কিছুটা সেরকমই’ ।

মহিলা জানায় সেও সেদিন সকালে এয়ারপোর্টের পথে ছিল । গাড়ি আস্তে হয়ে যায় । রাস্তায় পরে থাকা মৃতদেহের কথা সেও শুনেছিলো তখন । ড্রাইভারই কিসব বলছিল । সে এ ব্যাপারে বেশি মাথা ঘামায় নি । তাড়া ছিল । সামনে ছিল বহুদূরের পথ । সুদূর পূর্বের । তার সঙ্গী আসেনি । মহিলা মেয়েটাকে অব্যবহৃত টিকিটদুটো দেখিয়ে বলেছিলো সেদিন অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সমস্ত আশা ছেড়ে ফিরে এসেছিলো সে । একটু কাঁদতেও পারেনি । 

মহিলা জানায় সে এ বিষয়ে কিছু জানতে চায়নি প্রথমে । পরে রাস্তা ঘাটে, কখনো ট্যাক্সিড্রাইভারদের মুখে বডি, মাথা, হাইওয়ে, এয়ারপোর্ট কানাঘুষো কিছু কথা শুনে এব্যাপারে জানতে ইচ্ছে হয় । না চেয়েও প্রতিধ্বনি আর বাতাসের ফিসফিসানিতে ধীরে ধীরে মাথায় ধাঁধার জঠ খুলে যেতে থাকে । ধাঁধার প্রায় সবটা মিলে গেলেও বাকি রয়ে যায় শুধু একটা মাথা । সেখানেই রয়ে গেছে একটা শহর, একটা সিনেমা, পুরো একটা জীবন । সেই মাথাতেই । 

পান্নার আংটিটা আসলে খুবই দামী ছিল । ইন্টারনেটে এক নামি রত্ন ব্যাবসায়ীর ওয়েবসাইটে ঠিক এরকমই একটা আংটির ছবি খুঁজে পেয়েছিলো মেয়েটা। সেটাই যদি হয় তাহলে মহামূল্যবান। আংটিটা এসেছিলো সুদূর এশিয়া থেকে । আংটিতে জড়িয়ে থাকা পান্নার সাপ দুটো অতি প্রাচীন । কেউ জানেনা ঠিক কতটা । একটু দূর থেকে জড়ানো সাপের আলিঙ্গন শৈলীটা প্রেমঘন মনে হলেও আসলে সেটা জিঘাংসারই স্পষ্ট দৃশ্য । একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় । সাপদুটোর মুখোমুখি, খোলা চোয়াল, শক্ত । নিস্তদ্ধ একটা অসাড়তা অথবা কোনো বিপদের পূর্বাভাস । আংটিটার মাপ যেন এমন ভাবে ঠিক করা হয়েছে যে ওদের তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো কাছে এসেও স্পর্শ করতে পারেনি । এক দুর্ঘটনা থেকে ওদের বাঁচিয়ে রেখেছে কেউ । কোনো এক জাদুমন্ত্রে । 

একটার ওপরে আরেকটা সাপ। ওদের শরীর দুটো মিশে আছে । মুখ খোলা । ওদের নিচে গোলাকার আংটির ভিত। কোনো সিনেমার শুরু অথবা কোনো শহরের । টিপটিপে বৃষ্টি। জানলার কাঁচের পেছনে থেকে মেয়েটা সব দেখতে পাচ্ছিলো। থেকে থেকে ট্রাফিক রঙিন লাইট গুলো জ্বলছে আর নিভছে । তার আলো ধুয়ে দিচ্ছে এক নারী আর এক পুরুষের শরীর । সব কিছুর থেকে অনেক দূরে ওরা শুয়ে আছে, এক অজানায় । ওদের শরীরে নিটোল বক্রতা । খোলা ঠোঁট। উষ্ণ চায়ের জল । জুঁই ফুলের গন্ধ । একজনের নিঃশ্বাস আরেক জনকে ছুঁয়ে আছে। ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু শব্দ: চিরদিনের । মখমলি দ্বীপ। এই খানের সবকিছু আমার । একজনের শরীরের নিঃশাস বেয়ে আসছে অন্যের শরীর দিয়ে । 

মাদক পাচার চক্রের তদন্তে অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা নাম উঠে এসেছিলো । বেশি সময় ছিল না। জিজ্ঞাসাবাদ করতে মেয়েটাকে দূরের এক শহরে যেতে হয়েছিল। যখন কথা হচ্ছিলো কার যাওয়া উচিত, একজন সদ্যবিবাহিত আর এক নতুন ছোকরা গোয়েন্দা দুজনেই তারদিকে আঙ্গুল বাড়িয়েছিল । সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ। দূরে কোথাও যাবার চিন্তায় যে অস্বস্তিটা আসে, তার সাথে মাথায় মাথাহীন দেহটার ছবি । এসব সঙ্গী করে প্লেনে উঠতে হয়েছিল । সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে ভাবছিলো আস্তে আস্তে ওর এই সঙ্গীহীন জীবনে কি কি জিনিস প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। যেমন দূরের কোনো শহরে যাওয়া, একটা সদ্যমৃত দেহের পাশে দাঁড়ানো, একটা হারিয়ে যাওয়া মাথার খোঁজ । 

‘ট্রাভেলিং পর প্লেজার?’ পাশের যাত্রী আলাপ করতে চাইছিলো। 

মাথা নেড়ে চোখ বুজেছিলো ও । মনে পড়ছিলো না শেষ কবে নিজের জন্য কিছু করেছে । খুব সাধারণ কিছু । খুব নির্ভেজাল কিছু ।



মাথার ভেতর উড়ন্ত উড়োজাহাজ

‘উপর থেকে চাপ আসছে , তদন্ত বন্ধ করতে হবে’ গাড়িতে চাপতে চাপতে চাপা গলায় বললো ওর ছোকরা সহকারী। 

কিছুক্ষন পর রেস্টুরেন্টে বসে আবার একই কথা । কথাটা মেয়েটার কানে যায়নি বলে মনে হয়ে ছিল বোধহয়। 

অনুরোধের সুরে আরো বলে চললো ‘কোনো ক্লু নেই তো, আর অমনি কত মরছে’ । 

চ্যাটচ্যাটে আঙ্গুল । তাড়াতাড়ি কথাগুলো বলতে বলতে মুরগির একটা হাড় ওর মুখ থেকে বেড়িয়ে একটু একটু নড়ছিলো । 

‘আর দেখো, মাথা টাও তো কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না’ । 



মাথার ভেতর একটা শরীর । শ্বেতস্ফটিক হাত। একটা আংটি । 

দরজা খুলে বাড়ি ঢুকলো মেয়েটা। জুতো খুলে সাজিয়ে রাখলো । চায়ের জল চাপিয়ে গা এলিয়ে বসলো সোফাতে। শরীরে ক্লান্তি আর কেমন যেন কষ্ট মাখা একটা মন । কারোর কিছু আসে যায় না। অনেক অনেক গুলোর মধ্যে হারানো একটা মানুষ । একটা অঙ্ক । পরিসখ্যান মাত্র । তার মন খারাপ করে আসে দূরের কোনো এক শহরের জন্য । সময়ের আঘাতে ক্ষয়ে যাওয়া মানুষের মূর্তি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এক মহিলা টাকা দিয়ে একটা মাথা কিনতে চাইছে, যে মাথার ভেতর একটা শহর, সে শহরে অনেক আলো জ্বলে, সেখানে জড়িয়ে থাকা দুটো শরীর, তাদের নিঃশ্বাসে শত্রুতা আর একটা উড়োজাহাজ উড়তে চাইছে। মন খারাপ নিয়ে আসে এই দরজা খোলা, জুতো খোলা, চায়ের জল বসানো, এই বাড়ি যেখানে একটা মাথা ভেসে উঠে আর একটা মাথার ভেতর। 

মেয়েটা ঘটনাস্থলে ফিরে গেলো। ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করিয়ে হাইওয়ে ধারে ধারে নিখুঁত চাঁটা ঘাসে কি যেন খুঁজতে লাগলো। চমৎকার ঝকঝকে আকাশ । ফুরফুরে হাওয়া । আকাশের দিকে তাকিয়ে একবুক নিঃশ্বাস নিলো । একটু অবাক লাগছিলো । এক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাস হচ্ছিলোনা যে এয়ারপোর্টগামী হাইওয়েতে একা একটা মেয়ে, অজানা কারুর হারিয়ে যাওয়া একটা মাথা খুঁজছে। নুড়ি পাথর। অপরিচ্ছন্ন হাঁটাপথ। খড়কুটো, ছেঁড়া কাপড়, সিগারেটের টুকরো, পাস্টিক, জং-ধরা ক্যান। কিছু কিছু জিনিস খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো । কিছু জিনিস দূর থেকে । বোঝা যাচ্ছিল যে আসলে খুনটা অন্য কোথাও করা হয়েছিল । এখানে নয় । অনেক দূরে কোথাও। হয়তো সুদূর প্রাচ্যে। 

কি এমন করলে এরকম হয় । কি করলে একজন মানুষ তার মাথাটাই হারাতে পারে। মাথার হারালে তার সাথে ভেতরের সব কিছুও তো হারায় : একটা শহর, একটা সিনেমা, একটা জীবন, একটা আংটি। লোকটা যা যা হারিয়েছে, এখন সেগুলো যেন মেয়েটার হয়ে উঠেছে: শহরের আলো গুলোর মধ্যে যে যোগাযোগ, সিনেমার পেছনে যে আলো, জীবনের ভেতরের আলো, আংটির ভেতরের আলো। সমস্ত ঔজ্জ্বল্য যেন বাঁধা আছে একটা গোলাকার ভিতে। মেয়েটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলো সব, মুহূর্তে চোখ ধাঁদিয়ে গেলো । হয়তো একটা স্বপ্ন, অথবা নিশ্চই হালুসিনেশন: আবার দুটো জড়ানো শরীর। উদরের মসৃণতায় মন্থর গতিতে একটা তর্জনীর দ্বিধাহীন চলাচল; আর বাকিসব আঙ্গুল, করতালু আগলে আছে নাভীমুল। লম্বা রেশমি চুলে শক্ত পুরুষালি হাত। লাগাম । লাগাম ছাড়া তৃপ্তির গোঙানি। সাধারণ সুখ। নির্ভেজাল সুখ। অনেকবার মনে হয়েছে এসবের কি দরকার ছিল? এই থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস, নিথর চোখ, হাড়ভাঙার মড়মড় শব্দ। লোকটাকে সাথে পরিচয় ছিল না । তবে জানতে ইচ্ছে তার, হয় এতো বড়ো ঝুঁকি কি সে আবার নিতে পারতো ? 

মাথার ভেতর সাধারণ সুখ, নির্ভেজাল সুখ । 

মহিলা যে খুব সুন্দরী তেমনটা নয়, তবু চোখ টানে । ওর চারপাশে ছড়ান থাকে অজানা আবরণ । সেটাই আকর্ষণীয় । একটা যেন দ্যুতি। তার হাঁটা, অনিচ্ছা মেশানো ভঙ্গিতে হাতটা শূন্যে তুলে দ্যাখানো । ওই আংটিটা। ওই প্রতিশ্রুতি। সব কিছু রুচিশীল, পরিশীলিত। 

মেয়েটা খবরটা দিতে এসেছিলো। আসলে দুঃসংবাদই বলা চলে। কিছুই বিশেষ জোগাড় করতে পারেনি সে । মহিলা যে মানুষটার নাম এতদিন মুখেও আনেনি, সে হারিয়ে গেছে কোনো অজানায়। কোথাও তার চিহ্ন মাত্র নেই। সে অনেক খুঁজেছে, পুরোনো খবরের কাগজ, নানান দস্তাবেজ, গলি, খানাখন্দ, রাস্তায় । যে খুন অনেক দূরে কোথাও হয়েছে তার জন্য ছোটাছুটি করে বেড়ানো সম্ভব নয় । আর সহ্য হচ্ছে না এসব । 

‘আমি আপনার এই তদন্ত আর টানতে পারছি না।’ এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো সে ‘ হয়তো কেউই পারবে না’। 

মহিলা হাসলো কিনা ঠিক বোঝা গেলো না। একটা নরম গদির চেয়ারে বসতে বললো । ‘একটু আইস টি ?’। 

তারপর একটা দরজা খুলে দিলো । ছোটোখাটো চেহারার বয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এলো । মেয়েটির সামনে নতজানু হয়ে বসল সে । স্থির দৃষ্টিতে আস্তে আস্তে তার জুতো দুটো খুলে সরিয়ে রাখলো । তারপর মাথা নিচু করে আবার কোথায় চলে গেলো । একটু পরেই একটা ভেলভেট মোড়া ছোট চৌকি আর একটা গামলায় আধউষ্ণ জল নিয়ে এলো । হালকা ধোঁয়া ধোঁয়া জলে নানান সুগন্ধি জড়িবুটি, আর শুকনো ফুল ভাসছিলো । চোখ নিচু রেখেই সন্তর্পনে মেয়েটার নগ্ন দুটো পা সেখানে ডুবিয়ে দিলো । খুব সাধারণ অথচ গভীর একটা তৃপ্তি। তারপর সে মেয়েটার একটা পা নিজের দু পায়ের মাঝে রাখা চৌকিতে তুলে রাখলো। ধীরে ধীরে পায়ের পাতা, আঙ্গুল, গাঁঠ, গোড়ালি খুব যত্ন করে মালিশ করছিলো। পান্নার আংটি পড়া মহিলা চুপ করে ছিল। সে চুপ করেই থাকলো। কখনো শক্ত, কখনো মোলায়েম করে মালিশ চললো । আরামে কিছুটা ঘুম আসছিলো । কখন খেয়াল নেই হাঁটুটা একটু বেঁকিয়ে টেনে জোরে মোচড় দিলো মহিলা । প্রচণ্ড যন্ত্রণা । জোরে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করলো । ব্যথায় চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছিলো । জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলো সে ।

ঠিক সেই সময় , মহিলা শূন্যে হাত বাড়িয়ে মুখের কাছে মেয়েটার পারিশ্রমিকের টাকাটা এগিয়ে দিলো। 

‘গুড ওয়ার্ক’ বলে অভিনন্দনও জানালো। 

মাথা নিচু করে টাকাটা নিতে নিতে মেয়েটা এক দৃষ্টিতে মহিলার দিকে চেয়ে থাকলো। ওর কনুই টা হাঁটুর ওপর ভাঁজ করা । হাতে টাকা । পায়ের পাতা ডোবানো জল তখনও কুসুম কুসুম গরম । একটা অদ্ভুত ছবি । একটা অন্যরকমের ছবি । ইন্দ্রিয়ের কেমন একটা অস্বাবাভিক বিকৃতি । 

আমি বহুদিন ঐরকম একটা আংটি পরতে চাইতাম । একখনও চাই ।

প্যারিস রিভিউ । গ্রীষ্ম ২০১৮ সংখ্যায় এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল।
লেখক পরিচিতি
ক্রিস্টিনা রিভিয়েরা গার্জা
মেক্সিকোতে জন্ম ১৯৬৪ সালে।
কবি। গল্পকার। ব্লগার। প্রবন্ধকার।  অধ্যাপক।
মেক্সীকোর সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। 
প্রকাশিত উপন্যাস : Nadie me verá llorar , La cresta de Ilión, Nadie me verá llorar ।
ছোটো গল্প : La guerra no importa।




অনুবাদক পরিচিতি
দেব বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিম বঙ্গে বাড়ি। থাকেন মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্রে।

কবি। অনুবাদক। বিজ্ঞানী।  আলোকচিত্র শিল্পী। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন